icon

অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিকণা কি?

Jumjournal

Last updated Nov 17th, 2020 icon 23

একটা সমীকরণ আছে যে, Matter+Anti-matter= annihilation। এখানে ম্যাটার, অ্যান্টিম্যাটার এবং অ্যানিহিল্যাশন আসলে কি?

অ্যান্টিম্যাটার বা প্রতিকণা নাম হয়ত অনেকে শুনেছে।সত্যিকারে আদৌ প্রতিকণা পাওয়া গেছে কিনা না বা আছে কিনা পরে আলোচনা করছি। তাহলে প্রতিকণা আদৌ কি আছে?তবে এ প্রশ্নের উত্তরে আগে প্রথমে কণা কি এই প্রশ্নের অবতারনা করতে চাই।এ মহাবিশ্বে যত বস্তু, গাছাপালা , পশুপাখি, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি দেখি সবই কণা স্বরুপ পার্টিকেল দিয়ে তৈরি ।

আমরা জানি যে, তিনটি মৌলিক কণা সমন্বয়ে পরমানু গঠিত- ইলেক্ট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন। এখানে ইলেক্ট্রন ঋনাত্মক চার্জযুক্ত, প্রোটন ধনাত্মক চার্জযুক্ত আর নিউট্রন ব্যাটা একদম নিউট্রাল মানে চার্জবিহীন। এখানে প্রোটন আর নিউট্রন জমিদারে মত কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত আর ইলেক্ট্রন নর্তকীয় মত চারদিকে নিদির্ষ্ট কোয়ান্টাম নিয়মে ঘুরছে।

এইটো এটাই সাধারণ “ম্যাটার তত্ত্ব”। তাহলে অ্যান্টিম্যাটার কি?অ্যান্টিম্যাটার হচ্ছে কণার প্রতিরুপী এক ধরনের বিপরীত কণা। সহজ ভাষায় বললে কণার বিপরীত চার্জযুক্ত মৌলিক কণিকা সমন্বয়ে গঠিত একধরনের পার্টিকেল। যার ভর এবং স্পিন অন্য একটি কণিকার সমান, কিন্তু যার তাড়িৎ আধান, ব্যারিয়ন সংখ্যা, লেপটন সংখ্যা প্রভৃতি অন্য কণিকাটির সমমানের অথচ বিপরীতধর্মী। যেমনঃ প্রতিপ্রোটন বা অ্যান্টিপ্রোটন হল প্রোটনের বিপরীত এবং পজিট্রন হলো অ্যান্টি ইলেক্ট্রন।

antimatter
antimatter

চিত্রঃ ম্যাটার এবং এন্টিম্যাটার সংঘর্ষ ।

এবার ধারনা করুন কোনো মৌলের একটি পরমানুতে ঠিক তিনটি মৌলিক কণা বিপরীতধর্মী । মানে ইলেক্ট্রন জায়গায় পজিটিভ চার্জযুক্ত(পজিট্রন) আর প্রোটন জায়গায় অ্যান্টিপ্রোটন হবে।এটা কিভাবে সম্ভব? হ্যা সম্ভব..! অবশ্যই বিষয়টা বেশি তালগোল পাকিয়েছি যদিও তা রীতিমত অঙ্ক কষে প্রমাণ দেখিয়েছেন ব্রিটিশ পদার্থবিদ “মরিস ডিরাক”তার “Dirac sea” থিউরি মধ্য দিয়ে।

ডিরাক আসলে সত্যিকারে কিভাবে অ্যান্টিম্যাটার আবিষ্কার করলেন তার প্রশ্নোত্তর পরবর্তী পর্বে দিচ্ছি। হয়ত আপনারা মাঝে মাঝে এরকম গাণিতিক সমাধান করেন (-2)²=4 ; 2²= 4 , অর্থাৎ -2 বর্গ মান 4 হয় আবার 2 বর্গ মানও 4 হচ্ছে, তাহলে এখানে দুটি মানের পার্থক্য কি? এই প্রশ্নটা ছিল প্রাথমিক।হ্যা, দুটি মান 4 হবে। এ মান বস্তু স্বরুপ ধনাত্মক আর ঋনাত্মক পর্টিকেলও থাকা সম্ভব।

ঠিক সেভাবে ধরা হলো যে একটা কণাও তার প্রতিরুপী বিপরীত ধর্মী কণা থাকার সম্ভবনা আছে।কল্পনা করুন, এই মহাবিশ্বে সকল বস্তুগুলো ধনাত্মক চার্জ দিয়ে তৈরি (+ve) । অপর একটি মহাবিশ্ব চিন্তা করি, যেটি সকল বস্তু নেগেটিভ চার্জযুক্ত (-ve) । ধরুন ঐ মহাবিশ্বে আমার চেহারা সম্পন্ন অবিকল একজন মানুষ আছে যিনি আমার বিপরীত কণা দিয়ে তৈরি। কোনো এক সময় তার সাথে একদিন দেখাও হলো আমি হয়ত তার সাথে হ্যান্ডস্যাক করতে গেলাম ।

হ্যা, হ্যান্ডস্যাক করে ফেললাম, তবে কি হলো? যদি সত্যিকারে এখন হ্যান্ডস্যাক করে ফেলতাম, আমি বোধই এই প্রশ্ন করার টাইমও পেতাম না, ঐ যে পূর্বে Annihilation বলেছিলাম, মানে নিমেষের মধ্যে ধ্বংস। যদি সহজে বলি, কোনো কণা যদি তার প্রতিকণা সংস্পর্শে আসে তখন মুহূর্তের মধ্যে মহাবিস্ফোরণ ঘটে যাবে। কোনো অস্তিত্ব থাকবেনা। একমুহুর্ত সময় সম্ভবত লাগবেনা।

বিজ্ঞানীরা এভাবে দেখিয়ে যে -1+1=0 ।যদি সংক্ষেপে বলি নেগেটিভ কোনো ভেরিবলকে তার একই পজিটিভ ভেরিবল দিয়ে যদি যোগ করি শুণ্য হয়। অর্থাৎ দুটি ভেরিয়েবল মুছে যায়। ঠিক তারা এভাবে চিন্তা করেছে যে প্রতিকণা এবং কণা সংস্পর্শ মানে “Annihilation’ মানে কিছুই অস্তিত্ব থাকবেনা ।

একমুটোর পরিমাণ বালি এবং একমুটো পরিমাণ প্রতি বালি যদি সংঘর্ষ হত তাহলে যে পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হবে সে পরিমাণ শক্তি দিয়ে লস এঞ্জেলস পুরো শহরের সমস্ত শক্তি ১০০ বছর পর্যন্ত মিটে যেত। পূর্বে বলেছিলাম প্রতিকণা আদৌ আছে কিনা? হ্যা, আছে যা হাইড্রোজেনের অ্যান্টি-হাইড্রোজেন পরমানু তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

সার্ন (CERN) ফ্যাসিলিটির আলফা (ALPHA) প্রতিষ্ঠানে গবেষণা লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান উদ্দেশ্য প্রতিকণা তৈরি এবং তা নিয়ে গবেষণা করা।এই গবেষণার জন্য অ্যান্টিহাইড্রোজেন তৈরি করতে গবেষকেরা মোটামুটি ৯০,০০০ অ্যান্টিপ্রোটন এবং পজিট্রন মিশিয়ে প্লাজমা তৈরি করেন। এতে প্রতি বারে ২৫,০০০টি অ্যান্টিহাইড্রোজেন অণু তৈরি হয়। এর মাঝে মাত্র ১৪টি গবেষণার জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।

নিখুঁত কম্পাঙ্কে এদের লক্ষ্য করে লেজার ব্যবহার করার ফলে অ্যান্টিহাইড্রোজেনের বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা যায়। মূলত হাইড্রোজেন এবং অ্যান্টিহাইড্রোজেনের ওপরে একটি বিশেষ রঙের আলো ফেলা হয় এবং দেখা হয় এই একই আলোতে তারা কেমন আচরণ করে। মোটকথা অ্যান্টিম্যাটার আজ ল্যাবরেটরি তৈরির বস্তু হিসেবে গবেষণা করা সম্ভব হচ্ছে।

antihydrogen
antihydrogen

যদি চান আপনিও আপনার মত একজন অ্যান্টিম্যাটার সম্পন্ন মানুষ তৈরি করতে পারেন। তবে তার সংস্পর্শে না গেলে হবে। তাছাড়া তাকে অন্যম্যাটারের সংস্পর্শে না এনে ভালোমত যত্ন নিতে হবে। সব সময় খেয়ালে রাখুন, আপনিও বাঁচুন .! নাহয় যদি সংস্পর্শে আসেন তাহলে আপনিও নিঃশ্বেস হবেন যে সেটা নিশ্চয়।  

তবে এখানে অনেক প্রশ্ন থেকে যায় ,বিগ ব্যাং সময় সমপরিমাণ ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটার সৃষ্টি হলেও অ্যান্টিম্যাটার কোথায় হারিয়ে গেলো? এ মহাবিশ্বে শুধু ম্যাটার কেন? অ্যান্টিম্যাটারের জনক ডিরাক প্রথম অ্যান্টিম্যাটার উপস্থিতি কিভাবে বুঝতে পারলেন ?

বলেছিলাম যে বিগ ব্যাং সময় সমপরিমাণ ম্যাটার এবং অ্যান্টিম্যাটার সৃষ্টি হলেও আজ কেন শুধু ম্যাটার দেখি? মহাবিশ্ব সৃষ্টি শুরু মহুর্তে দিকে একটু যাওয়া যাক। আজ থেকে ১৩৮০ কোটি বছর পূর্বে বিগ ব্যাং এর ফলে সৃষ্টি হয় আজকের এই মহাবিশ্ব।

বিগ ব্যাং আবার কি?

বিগ ব্যাং হচ্ছে মহাবিস্ফোরণ।মানে, বিগ ব্যাং আগে কোন স্থান ও কালের অস্তিত্ব ছিল না। অসীম ঘনত্বের এই মহাপরমাণুর ভিতরে বস্তুপুঞ্জের ঘন সন্নিবেশের ফলে এর তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছিল 1018 কেলভিন। যার ফলে ঘটলো এই মহাবিস্ফোরণ।যদিও আরো কারণ আছে সেদিকে গেলাম না।

বিগ ব্যাং নিয়ে  বিস্তারিত এখানে  আলোচনা করা হয়েছে।

বিগ ব্যাংয়ের ১ম সেকেন্ডের কয়েক ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে পুরো মহাবিশ্ব ম্যাটার ও অ্যান্টিম্যাটার দিয়ে ভরে গিয়েছিল। কিন্তু আমরা যা দেখি বা অনুভব করি সব সাধারন পদার্থ বা ম্যাটার দিয়ে তৈরি । পৃথিবীর এককোষী জীবাণু থেকে শুরু করে বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ছায়াপথ সবকিছু ম্যাটার দিয়ে তৈরি।

সেই তুলনায় অ্যান্টিম্যাটার খুব একটা প্রকৃতিতে নেই বললেই চলে। কিন্তু মহাবিশ্বের জন্মের প্রাক্বালে সমপরিমান ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটার তৈরি হলেও বাকী অ্যান্টিম্যাটার গেল কই??কিছু একটা তো ঘটেছিল যার জন্য ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটারের সমপরিমাণের ব্যাঘাত ঘটিয়েছিল। ম্যাটার ও অ্যান্টিম্যাটারের সংখ্যার এই অসামঞ্জস্যতাকে baryogenesis বলে।

পদার্থবিজ্ঞানের সবচাইতে রহস্যজনক প্রশ্ন এটি। কি ঘটেছিল অ্যান্টিম্যাটারের সাথে? কেন আমরা ম্যাটার ও অ্যান্টিম্যাটারের মোট পরিমাণের এত বিস্তর ফারাক দেখছি? আমরা মহাবিশ্বে কেন ম্যাটারের সংখ্যা বেশী ও অ্যান্টিম্যাটার উধাও হওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলি,অ্যান্টিম্যাটারের তৈরি মহাবিশ্ব আদৌ আছে কিনা..!

বিগ ব্যাং পরমুহূর্তে সৃষ্ট ম্যাটার আর অ্যান্টিম্যাটার পরস্পরে সংঘর্ষ হওয়াতে ধ্বংস হয়ে যায় । তাহলে এ হিসেবে ম্যাটারও থাকতো না। কিন্তু দেখা যায় যে, প্রতি ১ বিলিয়ন ম্যাটার এবং অ্যান্টিম্যাটার সংঘর্ষের ১টি মাত্র পার্টিকেল বা ম্যাটার দৈবভাবে অবশিষ্ট থেকে যায়।সহজ কথায় বললে, কোটি বিলিয়ন পার্টিকেল বা ম্যাটার মধ্য একটি ম্যাটার প্রাণে বেঁচে সেটাও দৈবভাবে।

ঠিক যেন লক্ষ শুক্রাণুর মধ্য একটি শুক্রাণু ডিম্বানুতে নিষিক্ত হওয়ার মত। এভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন পার্টিকেল সংঘর্ষের থেকে বেঁচে যাওয়া একটি একটি করে পার্টিকেল দিয়ে কোটি বিলিয়ন পার্টিকেল সমষ্টি। সুতরাং আজ যে মহাবিশ্ব দেখি সবই দৈবভাবে বেঁচে যাওয়া পার্টিকেলগুলোর সমষ্টি। তাই আজকে মহাবিশ্বে অ্যান্টিম্যাটার নেই বললে চলে।

আগের পর্বে দ্বিতীয় একটা প্রশ্ন ছিলো সেটা হচ্ছে, ডিরাক কিভাবে অ্যান্টিম্যাটারে উপস্থিতি বুঝতে পারলেন! শুধু উপস্থিতি কেন বরং সুন্দর ভাবে ব্যাখ্যাও তার ডিরাক থিওরিতে দিয়েছেন।

Antimatter-antihydrogen-atom-min
Antimatter-antihydrogen-atom-min

তিনি প্রথমে আবিষ্কার করলেন কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স। এবার গাণিতিক ভাবে চারটি পৃথক কোয়ান্টাম সংখ্যা বা অবস্থা নির্নয় করা হলো। যার মধ্যে একটি তো অদ্ভুদ। তার নাম- স্পিন কোয়ান্টাম নাম্বার। দেখা গেল, বোসন বলে কণাটি (এ সবই ইলেক্ট্রনের বিভিন্ন কোয়ান্টাম অবস্থার নাম) যা বোস আইনস্টাইন সংখ্যাতত্ত্ব মেনে চলে, তার স্পিন কোয়ান্টাম নাম্বার ভিন্ন অবস্থায় একই থাকে।

আর এক হলো গিয়ে ফের্মিয়ন, যা কিনা ফের্মি – ডিরাক স্ট্যাটিস্টিকস মেনে চলতে থাকে, আর এর একটিকে পালটে দিলে তার চার্জই উল্টে যায়!! কী সৃষ্টিছাড়া ব্যাপার ভাবুন দিকি। আপনাকে যদি তিনশ ষাট ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেওয়া যায়, আপনি কি রামবাবুর জায়গায় রহিমবাবু হয়ে পড়বেন? নিশ্চয়ই না? কিন্তু এ ব্যাটা হয়ে পড়ে।

নির্ভুল গাণিতিক তত্ত্বে এসে তিনি দেখতে পেলেন যে তাঁর সমীকরণ একটি অদ্ভুত ফল দেখাচ্ছে। তিনি সমীকরণটি লিখেছিলেন যা কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং বিশেষ আপেক্ষিকতার সাথে মিল রেখে।

অর্থাৎ একটি আপেক্ষিক গতিতে চলমান ইলেক্ট্রনের আচরণ বর্ণনা করে। যেমন এ সমীকরণে  x= 4  দুটি সম্ভাব্য সমাধান (x = 2 বা x = -2) থাকতে পারে, ডিরাকের ধরে নিলেন, একটি ধনাত্মক শক্তি এবং অপরটি ঋনাত্মক শক্তি।

কিন্তু শাস্ত্রীয় পদার্থবিদ্যা (এবং সাধারণ অর্থে) একটি কণা শক্তি সবসময় একটি ধনাত্মক মান হবে। তাই Dirac সমীকরণটির অর্থ বোঝায় যে প্রত্যেকটি কণার জন্য একটি অনুরূপ অ্যান্টিপার্টিকল রয়েছে ।একই কিন্তু কিন্তু বিপরীত চার্জ দিয়ে। তিনি এখান থেকে উপনীত হলেন যে, কণার তার প্রতিকণার থাকার সম্ভাবনা।

লেখকঃ কেপন চাকমা, Dhaka UniversityDepartment of LPE (3rd year)

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply