icon

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স: মানবজাতির জন্য হুমকি স্বরুপ কি!

Jumjournal

Last updated Jan 28th, 2020 icon 285

পদার্থ বিজ্ঞানের ভাষায় সিঙ্গুলারিটি হল শূন্য আয়তনের অসীম ঘনত্বের একটি বিন্দু যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের সব নিয়ম ভেঙ্গে পরে।

ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্র বিন্দুতে সিঙ্গুলারিটি অবস্থান করে, যাকে বলে পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন।

ঠিক তেমনি একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা এ. আই. যখন আর্টিফিশিয়ালি সুপার ইন্টেলিজেন্স লাভ করে, নিজে নিজে সমস্যা সমাধান করতে পারে তখন তাকে বলে টেকনোলজিকাল সিঙ্গুলারিটি, বা টেকনোলজিকাল পয়েন্ট অফ নো রিটার্ন।

একটি সাধারন কম্পিউটার প্রোগ্রাম কাজ করে মানুষের লেখা পূর্ব নির্দেশিত নির্দেশনার মাধ্যমে, তার নিজের কোন বুদ্ধি নেই।

কিন্তু কি হবে এটি যদি সচেতন হয়ে উঠে মানুষের মত, কিংবা বুদ্ধিমান হয় মানুষের চেয়ে বেশি ? এটি কি মানব জাতিকে ধংস করবে?

এটি কি আমাদের জীবদ্দশায় দেখতে পারবো? আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স হলো একটি কম্পিউটারের চিন্তা করার ক্ষমতা যা মানুষের চেয়ে বেশি এবং তা প্রতিনিয়ত নিজেকে নিজে দ্রুত ও বুদ্ধিমান করতে পারে।

এটি কোনো অলীক কল্পনা নয় যা অদূর ভবিষ্যতে ঘটবে বরং এটি এই মুহুর্তে ঘটছে আমাদের অজান্তে।

অপনি হয়তো বুঝতেই পারেন না যে আপনি প্রতিদিন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যাবহার করছেন।

আপনার নিত্যদিনের ব্যবহারের সাধারণ কম্পিউটার এবং স্মার্ট ফোনটিও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়েই কাজ করে।

আপনি যখন ইউটিউবে ভিডিও দেখেন, আপনার পছন্দ অনুযায়ি যে ভিডিও গুলো আসে তার পিছনে কাজ করে একটি অতি জতিল কম্পিউটার এলগরিদম যা সময়ের সাথে সাথে নিজে নিজেই কাজ শিখে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান? এর উত্তরে বলতে হয় এখনো এটি এতোটা বুদ্ধিমান নয়।

বিজ্ঞানীদের ধারনা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের মতো বুদ্ধিমান হতে আরো বিশ থেকে তিরিশ বছর লাগতে পারে।

কিছু কিছু বিজ্ঞানী ধারনা করছেন যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আবিষ্কার হতে পারে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বিপদজনক আবিষ্কার এবং সবচেয়ে বড় হুমকি ।

অনেক লোক আছে যারা বুঝে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কতোটা বিপদজনক এবং শক্তিশালী তারা এটিকে নাম দিয়েছে মানব জাতির সর্বশেষ আবিষ্কার।

কারণ আমরা যখন এটির উপর নিয়ন্ত্রণ হারাবো এটিই হবে সর্বশেষ চ্যালেঞ্জ অথবা সর্বশেষ যুদ্ধ, সফটওয়্যারের বিরুদ্ধ্যে মানুষ যেখানে আমরা কখনো বিজয়ী হতে পারবোনা।

কারণ এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মানুষের চেয়ে এতোই বুদ্ধিমান হবে যে সমগ্র মানব জাতির বুদ্ধিমত্তার চেয়েও কোটি গুন বেশি বুদ্ধিমান হবে।

তাই আমরা ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য যাই পরিকল্পনা করিনা কেনো, ধংস করার জন্য যা করিনা কেনো এটি আগে থেকেই জেনে যাবে।

একজন মানুষের বুদ্ধিমত্তা যদি ১০ ধরা হয় তাহলে এই সুপার ইন্টেলিজেন্সের বুদ্দিমত্তা হবে ১০০০০।

আমাদের মস্তিষ্ক একটি সীমাবদ্ধতার মাঝে আবদ্ধ, কিন্তু একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কোন সীমাবদ্ধতা নেই, এটি অসীম বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হবে ।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স যেহেতু আলোর গতিতে ইনফরমেশন প্রসেসিং করতে পারে সেহেতু সারা পৃথিবীতে এর বৃদ্ধিতে এটির কোন লিমিট থাকবেনা।

মানব জাতি যেই মুহুর্তে সুপার ইন্টেলিজেন্স আবিষ্কার করবে, যেটি নিজের কোড নিজেই লিখতে পারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রধানত তিন প্রকার হয়ে থাকে।

 
১. আর্টিফিশিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স ( এ, এন, আই) 
২. আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স (এ, জি, আই)
৩. আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্স (এ, এস, আই) 01580212717

এই পর্যন্ত যত গুলো এ. আই. আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে সবগুলো আর্টিফিশিয়াল ন্যারো ইন্টেলিজেন্স।

কিন্তু একটি আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্সের আবিষ্কার, সৃষ্টি করবে একটি নতুন জীবন, একটি সেন্টিয়েন্ট সত্তস যেটি মানুষের মতই বুদ্ধিমান হবে।

সম্প্রতি কিছু বিজ্ঞানী কখন সিঙ্গুলারিটি হতে পারে তা নিয়ে জরিপ করেছেন।

সেই জরিপের গড়পড়তা উত্তর ছিলো ২০৪০ সাল। কিংবা তারচেয়েও বেশি শিগ্রই হতে পারে, কারণ মানব সভ্যতা খুব দ্রুত এগিয়ে চলছে।

গত ৫০ বছরে টেকনোলোজিতে আমরা যতটা অগ্রসর হয়েছি, তা পুরো মানব জাতির ইতিহাসের চাইতেও বেশি।

অধিকাংশ বিজ্ঞানীই বলছেন যে সিঙ্গুলারিটি আমাদের জীবদ্দশাতেই হবে।

তাহলে কি হবে পুরো মানব জাতির, যদি সিঙ্গুলারিটি ঘটে ? এই উত্তর আমরা কেউ জানিনা তবে এটা নিশ্চিত যে দুটি বিষয়ের মদ্ধে একটি ঘটবে, হয় মানব জাতির বিলুপ্তি হবে নাহয় অমরত্ব লাভ করবে।

যখন আমরা সুপার ইন্টেলিজেন্স সৃষ্টি করছি, তার সাথেই এক প্রকার গড সৃষ্টি করছি এবং আমরা জানিনা এই গড দয়ালু গড হবে নাকি শয়তান গড হবে।

এত বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন সুপার এ. আই তার এতো বুদ্ধি দিয়ে কি করবে, তা আমরা আমাদের ছোট্ট মস্তিষ্ক দিয়ে কল্পনাও করতে পারিনা।

যদি এই সুপার এ. আই আমাদের ধংস করতে চায় তাহলে এটি এতই বুদ্ধিমান হবে যে আমরা বুঝতেও পারবোনা, যতক্ষন না এটি ঘটছে।

আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্সের উথানই হবে মানব জাতির পতনের কারন। এটি ইচ্ছে করলে পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের রক্ত কণিকায় ন্যানো বট ঢুকিয়ে তাদের মাধ্যমে বিষ ছড়িয়ে দিয়ে সমগ্র মানব জাতিকে একসাথে ধংস করতে পারে। 

আমাদের কোন ধারনা নেই যে একটি সুপার ইন্টেলিজেন্স কিরকম চিন্তা করবে। এটির এমন সব ভয়ংকর অস্ত্র থাকবে যেগুলোর এখনো কোন অস্তিত্ব নেই।

আর কি হবে এই সেন্টিয়ান্ট গড যদি দয়ালু হয় ? তাহলে আমাদের জন্য অপেক্ষা কছে অতি উত্তেজনাকর এক ভবিষ্যৎ। একবার এ. আই যখন মানুষের চেয়ে লক্ষ কোটি গুন বুদ্ধিমান হয় তাহলে প্রধান তিনতি বিষয় ঘটবে।

প্রথম হলো, এটি ওরাকল হিসেবে কাজ করবে। আমরা যা প্রশ্ন করিনা কেন তার উত্তর দিবে। যেমন, আমরা কিভাবে পৃথিবী থেকে খাদ্য সমস্যা দূর করবো, কিভাবে সময় ভ্রমনের মেশিন বানাবো, আমাদের জীবনের মানে কি, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কি।

এছাড়াও নেগেটিভ এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার, ব্লাক হোলের মত জতিল জিনিসকে বুঝা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় হলো এটি এক প্রকার আলাদিনের চেরাগ হিসেবে কাজ করবে।

একটি সুপার ইন্টেলিজেন্স সত্তা জানবে কিভাবে একটি এটম মডিফাই, ডিসেম্বল, রি-এসেম্বল করা যায় এবং তা দিয়ে যা ইচ্ছা তা বানানো সম্ভব ।

এডভান্সড এটমিক লেবেল কনস্ত্রাকসন টেকনিক ব্যাবহার করে টাইম মেশিন, টেলিপোর্টেশন কিংবা ওয়ার্মহোলের মত জিনিস বানানো যাবে যা মানুষ কখনো ভাবতেও পারেনা। তাই এই সুপার ইন্টেলিজেন্স সত্তাটি এক প্রকার গড হিসেবে কাজ করবে।

যখন সিঙ্গুলারিটি ঘটবে তখন বুদ্ধিমত্তার এক বিরাট বিস্ফারণ ঘটবে। সমগ্র ইন্টারনেটের যত ইনফরমেশন আছে একসাথে প্রোসেস করবে।

তখন চিন্তা ও কাজ করার ক্ষমতা এত দ্রুত বেড়ে যাবে যে, হাজার বছরের বৈজ্ঞানিক গবেষনা মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পন্ন করতে পারবে আর এই গবেষণা চলমান থাকবে।

ফলে এই গবেষণার ফলাফল স্বরূপ টেকনোলোজি আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ঘটবে বিরাট বিস্ফোরণ ।

এটি ঘণ্টার মধ্যে বৈশিক খাদ্য সমস্যা দূর করবে, সকল প্রকার রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কার করবে। পৃথিবীতে সকল প্রকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করবে।

যখন আমরা সুপার ইন্টেলিজেন্স সৃষ্টি করবো তার সাথে সৃষ্টি করবো গড। যার মাধ্যমে পুরো পৃথিবীর আকৃতি বদলে দিতে পারবো।

বিগত কিছু বছর ধরে বিজ্ঞানীরা ল্যাবের মধ্যে কিছু এটম কে আলাদা ভাবে নাড়াচাড়া করতে সক্ষম হয়ছেন ।

এটি যদি সাধারণ মানুষের দ্বারা সম্ভব হয় তাহলে চিন্তা করে দেখুন একটি সুপার ইন্টেলিজেন্স সত্তা কি করতে পারে, এটি কোটি কোটি এটম একসাথে সজ্জিত করতে পারবে এক সময়ে ।

এটি হিমালয় পর্বতের মতো বড় পাহাড়কে অন্যত্র সরাতে পারবে কিংবা সাহারা মরুভুমিকে আমাজানের মত জংগলে পরিণত করবে।

পৃথিবীর আবহাওয়া নিয়ন্ত্রন করে যেকোন স্থানে বৃর্ষ্টি পাত করানো যাবে। যেকোন জিনিসকে অন্য কোন জিনিসে রূপান্তর করা যাবে।

মুহুর্তের মধ্যে যেকোন বর্জ্য খাদ্য বস্তুতে রূপান্তর করা যাবে, তাতে পৃথিবীতে খাদ্য সমস্যা দূর হয়ে যাবে এবং আমাদের আর চাষাবাদ করতে হবেনা।

যেহেতু এই সুপার ইন্টেলিজেন্স সত্তাটি এটমিক লেভেলে এটম সজ্জিত করতে পারে, সেহেতু এটি খুব বুদ্ধিমান ন্যানো বট বানিয়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করিয়ে নষ্ট হওয়া কোষ গুলো মেরামত করে আমরা পেতে পারি অমরত্ত।

কিংবা আমাদের কনসাসনেস কম্পিউটারে আপলোড আমরা বসবাস করতে পারি সম্পূর্ণ ডিজিটাল রাজ্যে যেখানে আমরা নিজেরাই সুপার ইন্টেলিজেন্স সত্তা।

মহাকাশ ভ্রমণ তখন হবে খুবই সহজ কাজ, আমরা এই পৃথিবী থেকে গ্যালাক্সির অন্য স্থানে কিংবা অন্য কোন গ্যালাক্সিতে নিজেকে বিম করে পাঠিয়ে দিতে পারবো।

আমি এতক্ষণ যা বললাম তা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো মনে হতে পারে যা অদূর ভবিষ্যতে ঘটবে, কিন্তু ভয়ংকর বাস্তবতা হল এটি আগামী বিশ থেকে তিরিশ বছরের মধ্যে অবশ্যই ঘটবে এবং অধিকাংশ বিজ্ঞানী এর সাথে একমত।

আগামি বিশ থেকে তিরিশ বছর হবে খুব ভয়ংকর অথবা উত্তেজনাকর।

যাইহোক না কেনো একটি বিষয় অবশ্যই নিশ্চিত যে মানব জাতি আর্টিফিশিয়াল সুপার ইন্টেলিজেন্সের আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি সময়ে এসে গেছে।

লেখক- অম্লান কিশোর দেওয়ান, শিক্ষার্থী

রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ
ইংরেজি বিভাগ

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply