icon

খুমী জাতির আদ্যোপান্ত

Jumjournal

Last updated Sep 28th, 2021 icon 196

খুমী দের বসতি, অঞ্চল ও জনসংখ্যা

বাংলাদেশে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে এক-দশমাংশ এলাকাজুড়ে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামে যতগুলো ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে তার মধ্যে খুমী জাতিসত্তাও একটি। জনসংখ্যায় খুমীরা অন্যান্য আদিবাসীর তুলনায় কম হলেও তাদেরও রয়েছে নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি যা অন্য নৃ-গােষ্ঠীদের থেকে ভিন্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলায় রুমা, রােয়াংছড়ি ও থানচি এই তিন উপজেলায় খুমীরা বসবাস করে।

তারা শহর থেকে অনেক দূরে উঁচু পাহাড়ে সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে। বান্দরবান জেলা থানচি উপজেলায় ৩৭৩ নং প্রকয়া মৌজা, ৩৫৯ নং সেকাদু মৌজা, ৩৬৯ নং সিংপা মৌজা, ৩৮৫ নং রাইখ্যং মৌজা এবং ৩৬৭ নং তিন্দু মৌজাগুলােতে সব মিলে ২১টি গ্রাম, রুমা উপজেলায় ৩৫৮ নং রুমা মৌজা, ৩৭২ নং নাইতং মৌজা, ৩৫৩ নং কৌলাদি মৌজা এবং ৩৮৪ নং রােমক্রী মৌজায় সব মিলে ১১টি গ্রাম এবং রােয়াংছড়ি উপজেলায় ৩১৭ নং ক্যছালং মৌজা এবং ৩১৬ নং বেতছড়া মৌজায় সব মিলে ৪টি গ্রাম রয়েছে। বান্দরবান জেলায় ১১টি মৌজায় মােট ৩৬টি গ্রামে খুমীদের বসবাস। মােট জনসংখ্যার এক-দ্বিতীয়াংশ খুমী থানচি উপজেলায় বসবাস করে।

সরকারি আদমশুমারি অনুযায়ী খুমীদের জনসংখ্যা দেখানাে হয়েছে ১৯৩১ সালে ১৫৪৯ জন, ১৯৫১ সালে ১৯৫১ জন, ১৯৮১ সালে ১০৯৪ জন এবং ১৯৯১ সালে ১২৪১ জন। এই সরকারি জরিপ অনুযায়ী খুমীদের জনসংখ্যা ১৯৫১ সাল থেকে১৯৯১ সালের মধ্যে কমে গিয়েছে ৭১০ জন। তবে ২০০৬ সালে সিঅং খুমি (একজন খুমি সাংস্কৃতিক কর্মী) এর নেতৃত্বে এক জরিপ পরিচালনা করা হয়েছিল। সেই জরিপে খুমীদের জনসংখ্যা পাওয়া গিয়েছে ২০৯৪ জন।

বাুংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলা ছাড়া আর জেলা বা উপজেলায় খুমীরা বসবাস করে না। তবে বাংলাদেশের বাইরে বার্মার চীন প্রদেশে (Chin Hill আরাকান রাজ্যের অংশ ‍হিসেবে পরিচিত ছিল) পালেটওয়া (Paletwa) অঞ্চলে ১ লক্ষের বেশি খুমী বসবাস করে বলে জানা এবং ভারতের মিজোরাম অঙ্গরাজ্যেও প্রায় ৩,০০০ (তিন হাজার) জন খুমী বসবাস করে বলে অনুমান করা হয়। খুমীরা চাষাবাদের সুবিধার্থে কিংবা জায়গা-জমি স্বল্পতার কারণে এক পাড়া থেকে অন্য পাড়ায় স্থানান্তর হলেও তাদের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা এখনো দেখা যায়নি।

খুমী জাতির ঐতিহাসিক পটভূমি

খুমী আদিবাসীরা মূলত মঙ্গোলীয় জনগােষ্ঠীভুক্ত একটি দল। তারা তিব্বতি-বার্মীজ-কুকি-চীন ভাষায় কথা বলে। অনেক নৃবিজ্ঞানী, ভাষাবিদ ও সমাজ বিজ্ঞানীদের লেখা হতে জানা যায় যে, খুমী আদিবাসীরা ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী বম, লুসাই, খিয়াং, পাংখােয়া ও ম্রো আবাসীদের গােষ্ঠীভুক্ত একটি দল। তাদের আদি পুরুষরা একই বংশােদ্ভূত বলে।

ধারণী করা হয় বাংলাদেশে অনেক সময় এই বংশােদ্ভূত দলকে কুকি’ নামেও ডাকা হয়ে থাকে তবে বার্মায় তাদেরকে ‘জৌমি’ (Zomi) এবং ভারতে মিজোরাম অঙ্গ-রাজ্যে মিজো নামে ডাকা হয়। এই Kuki, Zomi এবং Mizo শব্দ বা নামগুলি ভৌগােলিক অবস্থান ভেদে সমষ্টিগত অর্থে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে খুমী নৃগােষ্ঠীর আগমন হলাে বার্মার চীন প্রদেশ থেকে। এই চীন হিলস প্রদেশ ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ সালে আরাকান প্রদেশ থেকে আলাদা হয়ে নামকরণ করা হয় চীন হিলস। এই চীন হিলস-এ কোলাডাইন নদীর পাশে পালেটওয়া অঞ্চলে এখনও অনেক খুমী বসবাস করছে।

অনেকের মতে, সতের শতকের মাঝামাঝি সময়ে খুমীরা চীন হিল (তৎকালীন আরাকান প্রদেশ নামে পরিচিত) থেকে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করে। খুমী আদিবাসীর সামথাং (Samthang) গোত্রের পূর্ব-পুরুষদের মৌখিক (অলিখিত) ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, খুমীরা বাংলাদেশে আট পুরুষ (বংশধর) ধরে বসবাস করছে। এই আট পুরুষ বংশধরদের নামের তালিকা পর্যায়ক্রমে তুলে ধরা হলাে :

কেচেং (Kecheng)—১ম পুরুষ
পাইখেং (Paikheng)-২য় পুরুষ
পেলেং (Peleng)-৩য় পুরুষ
থাংনয় (Thangnawi)—৪র্থ পুরুষ
লেংওয়াই (Lengwai)—৫ম পুরুষ
খুলেং (Khuleng)—৬ষ্ঠ পুরুষ
হয়কিং (Hawiking)-৭ম পুরুষ।
লেলুং (Lelung)—৮ম পুরুষ
(সূত্র : হইলু খুমী, মৃংখ্যং পাড়া, রুমা, বান্দরবান, ২০০১)।

আবার অনেকের মতে, চাকমা রাণী কালিন্দির শাসনামলে (১৮৩২-৭৩ খ্রি.) আরাকান অঞ্চল থেকে খুমীরা তৎকালীন কার্পাস মহলে বসতি গড়তে শুরু করে
(সূত্র : উ. গ. প. উসাই, রাঙ্গামাটি, ১৯৯৫ খ্রি.)।

বর্তমান বােমাং সার্কেলের রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরীর মতে, প্রথম বোমাং রাজা (১৭৬০ খ্রি.) আসার পরেই খুমীরা এই পার্বত্য চট্টগ্রামের বসতি শুরু করে (সূত্র : ইত্তুকগুল চাঙমা, খুমী ই অমনাই রাইতা ২০০৫-২০০৬)।

জনশ্রুতি আছে, এক সময় খমীরা ম্রো (সূত্র : ১, ২, ৩) জনগোষ্ঠির সাথে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল এবং তারা বিজয়ী হয়ে ম্রোদের তাড়িয়ে দেয়। ১৮৪১ সালে আরাকানের তৎকালীন সহকারী কমিশনার এ পি ফেইরি সাহেব ‘একাউন্ট অব আরাকান’ নামক এক প্রবন্ধে উল্লেখ করন ‘In October 1838, the Village of Hleng Kreing, a powerful khumi chief of the koladan, was attacked by Lungkhes. The atack took place in the dark of the night and the durprise to a complete.’ (সূত্র : ইত্তুকগ্রলো চাঙমা, পৃ. ১২, ২০০৫-০৬)

খুমী শব্দের অর্থ ও এর উৎপত্তি

‘খুমী’ শব্দের অর্থটি বিশ্লেষণ করা জরুরি বলে অনুভব করছি। কারণ অনেক বিদেশি-দেশি লেখকরা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের আদিবাসীদের বিষয়ে লিখতে গিয়ে বার বার ‘খুমী’ শব্দটিকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন যা সমস্ত খুমী জাতির জন্য অবজ্ঞামূলক এবং অপমানজনকও বটে।

অধিকাংশ লেখক ও গবেষকেরা খুমী শব্দটিকে আরাকানিজ শব্দ বলে দাবি করে ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাই খুমী শব্দের সঠিক অর্থ কখনাে প্রকাশ পায়নি। টি এইচ লুইন তার বইয়ে (1969:48) খুমী শব্দটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন ‘খুমী’ শব্দটি এসেছে আরাকানিজ ” থেকে।

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন Khumi শব্দের Khu শব্দটি আরাকানিজ ভাষা Khe থেকে এসেছে; যার অর্থ হলাে dog এবং Mi শব্দটি আরাকানিজ ভাষা Me ” থেকে এসেছে; যার অর্থ হলাে Race। সুতরাং তার মতে, খুমী শব্দের অর্থ হচ্ছে dog race। তিনি আরাে লিখেছেন খুমীরা কুকুর মাংস খেতে পছন্দ করে বলে খুমীরা হলো ‘কুকুর মানুষ’।

পরবর্তীতেও অনেক লেখক ও গবেষক লুইন-এর সেই বিকৃত খুমী শব্দের অর্থ হুবহু তাদের বইগুলোতে তুলে ধরেন। একজন খুমী সমাজের সদস্য হিসেবে এই লেখক মনে করেন ‘খুমী’ শব্দটি কোনো আরাকানিজ শব্দ নয়। এটি একটি প্রকৃত খুমী শব্দ।

যার আক্ষরিক অর্থ হলাে ‘গভীর জঙ্গলের মানুষ (human being of deep forest)। `খুমী’ শব্দের ‘খু’ শব্দাংশ অর্থ হলাে ‘গভীর জঙ্গল’ ্রএবং ‘মী’ শব্দাংশ অর্থ মানুষ’ বা ‘জীব’। সুতরাং এই শব্দের পূর্ণাঙ্গ অর্থ দাঁড়ায় ‘গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষ’। তারা সাধারণত উচুঁ পাহাড়ে গভীর বন-জঙ্গলে বসবাস করতে পছন্দ করে। ‘খুমী’ শব্দের এই আক্ষরিক বিশ্লেষণের সাথে তাদের জীবনযাত্রার মিল খুঁজে পায় বলে খুমীরা এই বিশ্লেষণকে সঠিক মনে করে।

অধ্যাপক ডেভিড এ পিটারসন, যিনি একজন তিব্বতি-কুকি-চীন ভাষার উপর অভিজ্ঞ আমেরিকান ভাষাবিদ (যিনি এই লেখকের সাথে খুমী ভাষার ব্যাকরণ ও অভিধানের উপর ১৯৯৯ সাল হতে গবেষণার কাজ করছেন) এবং ড. কেনেথ ভানবিক যিনি একজন কুকি-চীন আমেরিকান ভাষাবিদ, তারা মনে করেন যে। Khuni শব্দটি কালক্রমে Zomi শব্দ থেকে বিকশিত হয়ে এসেছে ।

Zomi শব্দটি পরবর্তীতে Hyomi ও Hyomi শব্দটি Khyomi শব্দের রূপ নিয়েছে। এরপর Khyomi থেকে Khomi এবং Khomi শব্দটি থেকে Khumi শব্দটি এসেছে বলে এই দুই বিশিষ্ট কুকি-চীন ভাষাবিদরা ধারণা করেন (সূত্র : Interview, Dr. David A Petterson & Dr. Kenneth Vanbik, 2005)। এই লেখক ও খুমী শব্দের উৎপত্তিগত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই দুই আমেরিকা ভাষাবিদদের সাথে একমত পােষণ করেন। কারণ এটি একটি ভাষাবিজ্ঞান সম্মত ব্যাখ্যা।

খুমীদের সামাজিক সংগঠন

গোত্র

খুমী আদিবাসী সমাজ বিভিন্ন গােত্রে বিভক্ত । আবার একই গােত্রের মধ্যেও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গােষ্ঠী বা উপগােত্র রয়েছে। খুমী সমাজের লােকজন গােত্রভেদে কিছু কিছু পশু-পাখির মাংস আহার করা থেকে বিরত থাকে। এটি একটি সামাজিক বিধি-নিষেধ বা যুগ যুগ ধরে খুমী সমাজে প্রচলিত রয়েছে। এই প্রচলিত রীতি লঙ্গনকারীরা সমাজে সমালােচিত হয়।

অনেক সময় গােত্রের প্রচলিত রীতি-নীতি অমান্যকারীদের বিভিন্নভাবে নিন্দা জানানো হয়। গোত্রভেদে কিছু কিছু পশু-পাখির মাংস খাওয়া থেকে বিরত থাকা শুধু খুমী সমাজে প্রচলিত নয়; এই প্রথাটি বম এবং ম্রো আদিবাসিদের মধ্যেও লক্ষণীয়। কারণ খুমী, বম ও ম্রো, তিন সমাজের মধ্যে আন্ত-গােত্র সম্পর্ক রয়েছে। আবার খুমী সমাজে কিছু গোত্র রয়েছে যা বম ও ম্রো জাতিসত্তাদের মধ্যেও রয়েছে। তবে অনেক গোত্রের নাম পরিবর্তিত হয়ে ভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমন-খুমী সমাজে ‘সামথাং’ গোত্রটিকে বম সমাজে বলা হয় ‘থামবিং’ গােত্র।

খুমী সমাজে ৫০টির বেশি গোত্র রয়েছে। তবে বাংলাদেশে ১৪-১৫টি গোত্রের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বাকি অধিকাংশ গোত্রের লোকজন বার্মায় বসবাস করে। বাংলাদেশে বসবাসকারীর খুমী সমাজের প্রধান প্রধান গোত্রগুলি হলো —১. সামথাং, ২. ভউ ৩. উমসিং, ৪. লামওচে, ৫. অমসাং, ৬. খইসেই, ৭. ক্রিমসাং এবং ৮. লিমলাই ।

পরিবারের ধরন

খুমী সমাজ হচ্ছে একটি পিতৃসূত্ৰীয় সমাজ। খুমী সমাজের বংশধারার লােকজন পিতৃসূত্রানুযায়ী তাদের পরিচয় প্রদান করে। শুধু তাই নয়, খুমী সমাজে পিতার কর্তৃত্ব বেশি। তাদের সমাজে আবার বিভিন্ন ধরনের পরিবার লক্ষ করা যায়। অতীতে খুমী সমাজে বর্ধিত পরিবার ব্যবস্থা থাকলেও আজকাল একক ও যৌথ পরিবার ব্যবস্থা বেশি লক্ষণীয়।

খুমী ব্যক্তির জীবনচক্র

জন্ম ও আচার-অনুষ্ঠান

খুমী সমাজে শিশু জন্মের ২/৩ দিন পর একটি মুরগি জবাই করে ‘আথিক্লো’ অনুষ্ঠান আয়ােজন করা হয়। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় উপস্থিত বয়স্ক মহিলাদের ডাকা হয় এই অনুষ্ঠানে। রীতি অনুযায়ী তাদেরকে মদ পরিবেশন করে আপ্যায়ন করা হয়। খুমী সমাজে শিশু জন্মের পর ৩ মাস পর্যন্ত সাধারণত প্রসূতি মাকে লবণ, মাছ ও মাংস খেতে দেওয়া হয় না।

এটি তাদের মূল্যবােধের অংশবিশেষ। নবজাতকের নাভিরিজ্জু শুকিয়ে ঝরে গেলে শিশুর নামকরণ করা হয়। ক্রামা ধর্মে বিশ্বাসী খুমীরা তাদের সন্তান ১২ বছর হলে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে ছেলেমেয়েকে যৌবন প্রাপ্ত বলে ঘােষণা করা হয়। তবে এই প্রথাটি প্রকৃতি পূজারি ও খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী খুমীরা পালন করে না।

বিবাহ

খুমী সমাজে আন্ত-গােত্র বিবাহ প্রথা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেজন্য একজন খুমীকে নিজ গোত্রের বাইরের মেয়েকে বিয়ে করতে হয়। খুমী সমাজে কয়েক প্রকারের বিয়ের প্রথা রয়েছে। যেমন-ধার্য বিবাহ, অনিয়মিত বিবাহ, বহু বিবাহ ও বিধবা বিবাহ। খুমী সমাজে ধার্য বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের সম্মতি নিতে হয়। পাত্র পক্ষ নিজ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে একটি মােরগ, এক বােতল মদ ও একটি বল্লম নিয়ে পাত্রী পক্ষের গ্রামে যায়।

রাতের বেলায় ঐসব উপঢৌকন নিয়ে মেয়ে ও পিতা-মাতার সম্মতি জানতে চাওয়া হয়। মেয়ে ও মেয়ের অভিভাবকের সম্মতি পেলে মেয়ের বাবাকে বল্লমটি দিয়ে যেতে হয় প্রতীকী চিহ্ন হিসেবে। তা না হলে পাত্রপক্ষ বল্লমটি ফেরত নিয়ে যায়। বিয়ের সিদ্ধান্ত হলে কনের পণ ঠিক করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট দিন ধার্য করে সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহ আয়োজন করা হয় এবং তখনই বিবাহিত দম্পতি সামাজিকভাবে একত্রে বসবাস করতে পারে।

ধার্য বিবাহের বর্হিভূত প্রেমঘটিত কারণে পাত্র পাত্রী উভয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী রূপে গ্রহণ করলে অনিয়মিত বিবাহ হয়ে থাকে। তাছাড়া খুমী সমাজে বহু বিবাহ ও বিধবা বিবাহ প্রথাও অনুমােদিত। আবার কখনাে কখনাে কোনাে মেয়ের স্বামী যদি অকাল মৃত্যুবরণ করে; তবে সেক্ষেত্রে ঐ মৃত স্বামীর ছােট ভাইয়ের সাথেও ঐ মৃত ব্যক্তির স্ত্রীকে বিবাহ করতে দেখা যায়। খুমীরা নিজ সম্প্রদায়ের বাইরে বম, ম্রো ও খিয়াংদের সাথেও বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়।

খুমী সমাজে বরপক্ষ কনের পক্ষকে কনের পণ হিসেবে ১২০টি রুপার পয়সা, ১৯/২১টি বিজোড় সংখ্যক মােরগ-মুরগি, ১১/১৩টি বল্লম দিতে হতাে। কিন্তু বর্তমানে রূপার মুদ্রা ও বল্লম অবৈধ হিসেবে নিষিদ্ধ করায় খুমী সমাজের বৈবাহিক প্রথাটি সংস্কার করার উদ্যোগ নিয়েছে খুমীদের সামাজিক সংগঠন ‘খুমী কুহুং সমিতি’।

বিগত ২০০৭ সালে ‘খুমী বৈবাহিক প্রথা সংস্কারমূলক আলােচনা সভা আয়ােজন করে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সর্বসম্মতিতে বল্লম ও রৌপ্য/রূপার মুদ্রার পরিবর্তে টাকায় কনের পণ দানের ব্যবস্থা করা হয় । সংশােধিত কনের পণ প্রথায় কনের পণ ধরা হয়েছে ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা, মায়ের ভাগ (দুধের দাম) ১,০০০ (এক হাজার) টাকা, ভাইয়ের ভাগ ১,০০০ (এক হাজার) টাকা এবং বল্লম এর পরিবর্তে ৫০০ (পাঁচশত) টাকা। তাছাড়াও রয়েছে ১৭টি মােরগ-মুরগি। এ ২০০৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে বান্দরবান সার্কেল চিফ বােমাং রাজা অংশৈপ্রু চৌধুরী সুপারিশ করার পর প্রথাগত আইন হিসেবে অনুমােদন লাভ করে।

মৃত্যু ও সৎকার

খুমী সমাজের কেউ মৃত্যুবরণ করলে যে যার ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী সকার করা। প্রকৃতি পূজারি খুমীদের মধ্যে কারও মৃত্যু হলে সাথে সাথে খােলা আকাশে ফাঁকা গুলি করে প্রতিবেশীদের জানিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত ২/৩ দিন মৃতদেহ ঘরে রেখে নিকট ও দূরবর্তী আত্মীয়স্বজনদের অপেক্ষা করা হয়। মৃতদেহ যতদিন ঘরে রাখা হয় ততদিন ঢােল বাজানাে হয়। মৃতদেহ দাহ করার পর চিতার পাশে নির্মিত একটি ছােট ঘরে চিতার ছাই ও মৃত ব্যক্তির দৈনন্দিন ব্যবহার্য কাপড়-চোপড়, হাঁড়ি-পাতিল ও দা রেখে দেয়া হয় । সৎকারের দিন থেকে ঘরের ঠিক মাঝখানের

খুঁটিতে একটি বাঁশের তৈরি থ্রুং (ঝুড়ি) ঝুলিয়ে রাখা হয়। ঐ থ্রুং এ প্রতিবার আহারে সময় পরিবারের লোকজন এক মুঠো ভাত রেখে দেয়। ডিসেম্বর মাসে যে কোনোদিন মৃতের আত্নার আয়োজন উপলক্ষে গরু বা শূকর জবাই করে পাড়াপ্রতিবেশী ও গোষ্ঠিদের নিমন্ত্রণ করা হয়।

খুমীদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রতিষ্ঠান

খুমী সমাজের রীতিনীতি ও প্রথাগত আইনসমূহ তাদের সমাজিক আচার-অনুষ্ঠান, বিশ্বাস ও মূল্যবােধের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেও মূলত বােমাং সার্কেল চিফ হলেন খুমী জনগােষ্ঠীর সর্বোচ্চ সামাজিক ন্যায় নির্ধারক ও প্রতিবিধানকারী। খুমীরা প্রতি বছর এই বােমাং চিফকে তাদের জুমের খাজনা দিয়ে থাকে।

ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির আওতায় কার্বারী, হেডম্যান ও সার্কেল চিফ এই তিন স্তর বিশিষ্ট ঐতিহ্যবাহী সামাজিক বিচার কাঠামাে আইনত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে (সূত্র : কপাে সেবা সংঘ, পৃ. ২, ২০০৬)। খুমী সমাজে সাধারণত সব ধরনের পারিবারিক ও সামাজিক বিরােধ নিষ্পত্তি হয় পাড়া প্রধানের (কার্বারীর) মাধ্যমে।

তবে কোনাে কোনাে পাড়া প্রধান যদি নিষ্পত্তি দিতে না পারেন; তবে সেক্ষেত্রে উচ্চ সামাজিক আদালতে (যথাক্রমে হেডম্যান ও সার্কেল চিফ) শরণাপন্ন হয়। তবে সাধারণত উক্ত উচ্চ সামাজিক আদালতে শরণাপন্ন না হয়ে নিজ সম্প্রদায়ের অন্যান্য খুমী কার্বারী, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের জানিয়ে যে কোনাে বিরােধ নিষ্পত্তি করা হয়।

খুমী জাতির অর্থনৈতিক সংগঠন

আর্থ-সামাজিক অবস্থা

খুমীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা মূলত জুম চাষ ভিত্তিক। তাই তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ভালো না। অধিকাংশ খুমী জুম চাষ ছাড়া বিকল্প কোনাে উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল নয়। আজকাল জুম চাষ করে অতীতের মতাে ফসল বেশি উৎপাদন হয় না বিধায় খুমীদের অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন শােচনীয় হচ্ছে।

অধিকাংশ খুমী দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। প্রায় সময় খুমীদের ভোগদখলীয় চিরায়ত জায়গা-জমি অন্যান্য সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠি কর্তৃক বেদখল হতে দেখা যায়। ফলে কিছু কিছু খুমী তাদের ভূমি হারাচ্ছে। তার এভাবে দিন দিন ভূমিহীন জনগোষ্ঠিতে পরিণত হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে খুমী সমাজ ব্যবস্থা বিকাশের প্রাথমিক স্তরে জুম চাষ ও পশু শিকার ছিল তাদের প্রধান পেশী। জুম চাষ হচ্ছে একটি মিশ্র ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা; যেখানে ধান, তিল, তুলা, ভুট্টা, কুমড়া, মরিচ, শশা ও কচুসহ অনেক ফসল চাষ করা হয়। খুমীরা জুম চাষের পাশাপাশি আদা, আনারস কলা, আম ও কমলা চাষও করে।

ধান বিক্রি না করে নিজেদের ভােগের জন্য রাখা অন্যান্য অর্থকরী ফসল বাজারে বিক্রি করা হয়। তাছাড়া খুমীরা গরু, ছাগল, গয়েল, শূকর, মুরগি, কুকুর ও গৃহপালিত পশুপাখি পালন করে থাকে। মুরগি, কুকুর ও শূকর পালিত হয় তাদের বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক আনে ব্যবহারের জন্য।

ভূমি মালিকানা ও ভূমি হারানাে

পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য আদিবাসীর মতাে খুমী জনগােষ্ঠীর ভূমি উপর মালিকানা। সূত্ব প্রধানত প্রথাগত ভূমি অধিকার ভিত্তিক। কিন্তু খুমীদের এই প্রথাগত ভূমি অধিকার পদদলিত করে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ভূমি অধিগ্রহণ ও জবরদখল হওয়ায় খুমীদের আবাদি জমিগুলি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির ৪২ বিধি মােতাবেক পাহাড়ে জুম চাষের জন্য জমি মালিকানা স্বত্বের প্রয়ােজন হয় না (সূত্র : কপাে সেবা সংঘ, পৃ. ২৪, ২০০৬)।

যার কারণে অধিকাংশ খুমী ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব প্রয়ােজন বােধ করে না। তারা মৌজার হেডম্যান কর্তৃক বন্টিত এলাকাটিকে সমষ্টিগত মালিকানাধীন হিসেবে বিবেচনা করে পাড়াবাসী সবাই মিলেমিশে জুম চাষ করে।

খুমীরা জায়গা-জমি স্থাবর সম্পত্তিকে ব্যক্তি মালিকানা স্বত্ব গণ্য না করে সমষ্টিগত মালিকানা স্বত্বে চাষ করাটাকে নিজেদের প্রথাগত অধিকার মনে করে। এই প্রথাগত অধিকারকে বাংলাদেশ সরকার সংবিধানে স্বীকৃতি না দেওয়ায় খুমাসং অন্য আদিবাসীদের ভূমি দিন দিন বেদখল হচ্ছে।

খুমী সমাজে সম্পত্তির মালিক যেসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রেখে যায় সেগুলোই উত্তরাধিকারযােগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়। অস্থাবর সম্পত্তি যথা : আসবাবপত্র, থালা-বাসন, কাপড়চোপড়, অলংকারাদি, গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে ভাগবণ্টন ও হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু কোনাে লিখিত আইন বা বিধি-বিধান মতে সেগুলাে ভাগবণ্টন করা হয় না। খুমী সমাজে পিরবানে মৃত ব্যক্তির জীবদ্দশায় পিতার ইচ্ছা অনুসারে পুত্রসন্তানদের মধ্যে সম্পাত্তি ভাগ-বন্টন করে দেয়া হয়। পিতা-মাতাকে আমৃত্যু যে সন্তান লালনপালন করবে, সে সন্তান স্বাভাবিকভাবে সম্পত্তির বেশি অংশ পাবে। খুমী সমাজে সাধারণত কন্যাসন্তানরা কোনাে সম্পত্তি না পেলেও বিয়ের সময় তাদের প্রাপ্ত অংশ দেওয়া হয়।

পেশার প্রকারভেদ

অধিকাংশ খুমী জুম পেশার উপর নির্ভরশীল। খুব কম সংখ্যক খুমী সরকারি ও বেসরকারি চাকরি করছে। জুম চাষের সময় খুমীরা একে অপরের জুমে পালাক্রমে কাজ করে শ্রম বিনিময়ে করে। আবার কখনো পাড়ায় যে কোনো ঘর ‍নির্মান করলে তখনো এক অপরকে সহযোগিতা করে শ্রম আদান-প্রদান করে থাকে। খুমী সমাজের লোকজনকে ভিন্ন পেশার তাগিদে নগরমূখী হতে এখনও দেখা যায়নি।

বাসগৃহের ধরন

ঘর নির্মাণের জন্য খুমীরা বাঁশ, গাছ ও শন ব্যবহার করে। তারা মাটি থেকে ৩/৪ ফুট উতে মাচাং ঘর নির্মাণ করে। খুমীদের একক পরিবারে সাধারণত একটি রুম ও একটি চুলা থাকে। যৌথ পরিবারের ক্ষেত্রে ২/৩টি রুম থাকে এবং প্রতিটি একটি করে চুলা থাকে। একটি খুমী ঘরে সাধারণত ২টি প্রবেশ পথ; ১/২টি বাঁশের তৈরি উঠান এবং ২/৩টি জানালা থাকে। মূল ঘরে প্রবেশ পথে উপরে দেওয়ালে টাঙানো হয় শিকারে পাওয়া বিভিন্ন জীবজন্তুর এসব চিহ্ন হচ্ছে গৃহকর্তার শিকারে দক্ষতার প্রতীক।

খুমী দের ধর্মীয় অবস্থা

খুমীরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বলে পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে তারা প্রকতি পূজারি। তবে তারা আজকাল তিনটি ধর্মে বিশ্বাসী-প্রকৃতি পূজারি, ক্রামা ও খ্রিস্টান। প্রকৃতি পূজারি খুমীরা বিভিন্ন সময়ে গৃহ পূজা, ছড়া-পূজা, বৃক্ষ পূজা ও পাথর পূজা করে থাকে। খুমীদের বিশ্বাস পৃথিবী সৃষ্টির পেছনে একজন সর্বশক্তিমান দেবতা যাকে খুমী ভাষায় বলা হয় ‘তামিউ’ (Tameuh)।

খুমীদের বর্ণমালা এবং ধর্মী গ্রন্থ হারিয়ে যাওয়ার কাহিনীর সাথে ম্রোদের কাহিনীর যথেষ্ট মিল রয়েছে। বান্দরবান জেলা রােয়াংছড়ি উপজেলায় বসবাসকারী কিছু কিছু খুমীরা ‘ক্রামা’ ধর্ম অনুসরণ করে। তবে রুমা ও থানচি উপজেলায় বসতি স্থাপনকারী খুমীদের মধ্যে ‘ক্রামা’ ধর্মে বিশ্বাসী লােক নেই।

এই দুই উপজেলায় বসবাসকারী খুমীরা কিছু অংশ প্রকৃতি পূজারি এবং কিছু অংশ খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী। খুমী সমাজে খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যা প্রায় ৪৫%, প্রকৃতি পূজারিদের সংখ্যা ৪৫% এবং ক্রামা ধর্মে অনুসারীদের সংখ্যা প্রায় ১০% হবে বলে অনুমান করা হয়। দেখা গেছে খুমী পাড়ায় প্রকৃতি পূজারিদের জন্য কোনাে উপসনালয় না থাকলেও খ্রিস্ট ও ক্রামা ধর্মাবলম্বীদের জন্য গির্জা ও ক্যাং উপাসনালয় রয়েছে।

ক্রামা ও খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী খুমীরা এসব ধর্মে বিশ্বাসী অন্যান্য সম্প্রদায়ের লােকজনের মতাে ধর্মীয় উৎসব পালন করে থাকে। খুমী সমাজে খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রবণতার হার দিন দিন বাড়ছে। খুমীরা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মে অনুসারী হওয়ায় বিবাহ বন্ধন, ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান এবং বিচার আচারে কখনাে কখনাে মত বিরােধ হতে দেখা যায়।

সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই ত্রিমুখী ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাবটা পড়ছে এবং তাদের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। যেমন—ক্রামা ও খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করায় তাদের বিভিন্ন সামাজিক উৎসব, পূজা, রীতিনীতি ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত মদ নিষিদ্ধ করা হচ্ছে।

অতীতে মদ তৈরি এবং পান করা খুমীদের সামাজিক মূল্যবােধের একটা অংশ হিসেবে গণ্য করা হলেও বর্তমানে অনেকে এই মূল্যবােধকে খারাপ চোখে দেখছে । বীরত্বের নিদর্শন স্বরূপ শিকারে পাওয়া জীবজন্তুর মাথার খুলি, পাখির পালকগুলাে দরজার উপরে দেওয়ালে টাঙানাে রেওয়াজ, বাঁশির তালে তালে গো-হত্যা অনুষ্ঠান ও নবান্ন উৎসব ইত্যাদি দিন দিন বিলুপ্ত হচ্ছে খুমী সমাজ থেকে।

প্রকৃতি পূজারি খুমীরা প্রায় সময় নিজ সমাজে বহিঃগােত্রের লােকজনের সাথেে এবং অন্যান্য আদিবাসী মারমা, বম, ম্রো ও ত্রিপুরাদের সাথে শূকর, গরু বা মুরগি জবাই করে রক্ত পান করে বা রক্ত ছুয়ে শপথ করে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে। এই ধরনের বন্ধুত্ব সম্পর্কের আত্নীয়দের মধ্যে সাধারণত বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নিষিদ্ধ রয়েছে। এমনকি শপথ গ্রহণকারী বন্ধুত্ব সম্পর্কের যে কারো মৃত্যু হলেও একজন আরেকজনকে সম্পত্তি ভাগ পাওয়া অধিকার রাখে।

ক্রামা ধর্মাবলম্বীরা ‘ক্রামাদি বনবাস গমন’ উৎসব পালন করে। অন্যদিকে খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী খুমীরা বড়দিন ও ইংরেজি নববর্ষ পালন করে এবং ঐ দিনে তারা থেকে অনেক লোক এসে একটি গ্রামে জড়ো হয়ে এই উৎসবগুলো পালন করে। খ্রিস্ট ও ক্রামা ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।

খুমী দের সামাজিক উৎসব

খুমী সমাজে প্রকৃতি পূজারিরা সাংগ্রাই (বিঝু) উৎসব উদযাপন করে; যদিও এরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতাে বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ পালন করে না। সাংগ্রাই-এর দিনে কিছু কিছু প্রকৃতি পূজারি খুমীরা চাল, কাপড়, জুমে উৎপাদিত বিভিন্ন ফসল টাকা ক্যাং উপাসনালয়ে দান করে।

সাংগ্রাই উৎসবকে খুমী ভাষায় ‘সাংক্রাই’ বলে । খুমীরা সাধারণত ৩ দিন সাংক্রাই পালন করে। সাংক্রাই-এর ১ম দিন ভােরে উঠে থ্রুং (ঝুড়ি) এ ধান-ভুট্টা ভরিয়ে গ্রামের প্রতিটি ঘরে গিয়ে উঠানে ঐ ধান-ভুট্টা ছিটিয়ে প্রতিবেশীদের গৃহপালিত পশু-পাখিদের খাওয়ানাে হয়। এ-কাজ সাধারণত পুরুষরা করে থাকে।

মহিলারা ভালাে ভালাে খাবার রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকে। রান্নার শেষে প্রথমে তারা বাড়ির বুড়াে-বুড়ি (মুরব্বি)দের প্রণাম করে শ্রদ্ধা জানিয়ে খাবার পরিবেশন করে । তারপর, পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে একসঙ্গে খেতে বসে। খাবার শেষে প্রতিবেশীরা কোনাে এক ঘরে জড়াে হয়ে আড্ডায় বসে।

সাংক্রাই এর ২য় দিনে খুমী যুবক-যুবতীরা নানা রকম ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়ােজন করে। যেমন—গিলার খেলা, বাঁশ খেলা ও পানির খেলা। গিলার খেলা হয় পাড়ার যুবক-যুবতীরা দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে। গিলার খেলায় মাতা-পিতারা দর্শক ভূমিকা পালন করে। নানারকম হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়ে এই খেলা সম্পন্ন করা হয়।

বাঁশ খেলাটি হয় সাধারণত পুরুষদের মধ্যে। এই খেলাকে খুমী ভাষায় বলা হয় ‘আথো আচ্কে।’ ৪/৫ ফুট শক্ত লম্বা বাঁশের দুই প্রান্তে দুজন দাঁড়িয়ে ব্যালের নিচে শক্ত করে আটকিয়ে রেখে ঠেলে একপক্ষ প্রটি পক্ষকে মাটিতে ফেলার চেষ্টা করে। যে মাটিতে প্রথমে পড়বে সে হেরে যায়। এই খেলায় গ্রামের যবতীরা দর্শকের ভূমীকা পালন করে করতালি দিয়ে ইৎসাহ ‍দেয়।

পানির খেলা হয় সাধারণত যুবক-যুবতীদের মধ্যে। তারা একটি ঘরে মিলিত হয়ে পাত্রে বা কলসিতে পানি ভরিয়ে একে অপরকে ভিজিয়ে দেয়।

সাংক্রাই- এর ৩য় দিনে দল বেঁধে নদীতে মাছ ধরতে যায় আবার অনেকে শিকারে বের হয়। খুমীদের গ্রামে কোনো ক্যাং না থাকায় তারা অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মতো সাধারণত ক্যাং-এ যায় না। তবে পার্শ্ববর্তী গ্রামে কোনো ক্যাং থাকে তাহলে মুরব্বিরা সেখানে গিয়ে বন্দনা করে।

প্রকৃতি পূজারি খুনী সমাজে জুম চাষের সাথে অনেক ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জুম চাষকে ঘিরে যেসব আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয় সেগুলো হলো–‘নিশা জা’ (শুষ্ক মৌসুম পাড়া বন্ধক পূজা), নিচো জা’ (আষাঢ় পূজা), ‘ল ব’ (জুমে প্রথম আগাছা পরিষ্কার করার সময় পূজা) এবং ‘চো প্ল’ (ধান কাটার সময় পূজা)। ‘ল ব’ পূজা করা হয় মূলত জুমে যেন বেশি আগাছা না উঠে এবং, জুমে কোনো খারাপ দেবতা থাকলে সে যেন রােগ বালাই না ছড়ায়; তাই জুম দেবতাকে খুশি করার জন্যই মুরগি ও ডিম দিয়ে এই পূজা করা হয়।

আর ‘চো প্ল’ পূজাটি করা হয় মূলত জুমের দেবতা যেন অধিক ফসল উৎপাদনে আশীর্বাদ করে। এই দুটি পূজা হচেছ পরিবারভিত্তিক পূজা। অন্যদিকে ‘নিশা জা’ এবং ‘নিচো জা’ উৎসবগুলো হচ্ছে পাড়াকেন্দ্রিক। এই উৎসবগুলো পালন করা হয় ২/৩ দিন পর্যন্ত।

এই পূজার সময় ছাগল, শূকর ও মুরগি জবাই করা হয়। তখন পাড়ার লোকজন বাইরে যেতে পারে না এবং বাইরে লোকজন পাড়ায় প্রবেশ করতে পারে না। এই পূজাটি মূলত পাড়ার দেবতাকে সন্তুষ্ট করার জন্য করা হয়। প্রকৃতি পূজারি খুমীরা বিশ্বাস করে এই পূজা করলে পাড়ার দেবতা পাড়াবাসীদের রোগ-বালাই ও বিপদ-আপদ ধেকে রক্ষা করে।

জুম ও পাড়াকেন্দ্রিক পূজা ছাড়াও খুমী সমাজে বেশ কয়েকটি সামাজিক অনুষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গো-হত্যা অনুষ্ঠান। গো-হত্যা অনুষ্ঠান দুই প্রকারে হয়ে থাকে। যথা- ১. আরেং চেংনাই পই এবং ২. রেইংনাই পই।

‘আরেং চেংনাই পই’ হচ্ছে রাজকীয় গাে-হত্যা অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান খুব কম লোকজন আয়ােজন করতে পারে। কারণ এটি একটি ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠান সাধারণত করে থাকে সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিরা। এই অনুষ্ঠান যারা করে সমাজে তাদের বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করা হয়।

এমনকি মৃত্যুর সময়ও তাদেরকে প্রথাগত রাজকীয় পদ্ধতিতে দাহ করা হয়। এই অনুষ্ঠান করতে কমপক্ষে ৫/৭টি গরু বা মহিষ প্রয়ােজন হয় এবং অনেক শূকর ও মুরগি জবাই করা হয় এই অনুষ্ঠানে।

এই রাজকীয় গাে-হত্যা অনুষ্ঠান করা হয় মূলত সমাজে এক বিশেষ মর্যাদা পাওয়ার জন্য। এই রাজকীয় গাে-হত্যা অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশের খুমীরা বর্তমানে আর করে না বললেও ভুল হবে না। কেননা এখানকার অধিকাংশ খুমী গরিব হওয়ায় এ ধরনের ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান আয়ােজন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

তবে ‘রেইংনাই পই’ গাে-হত্যা অনুষ্ঠানটি এখনাে করে থাকে। এই অনুষ্ঠানটি খুমী সমাজের আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর লােকজনও করতে পরে। কেননা এটি আয়ােজন করতে বেশি খরচ হয় না।

এই অনুষ্ঠান করতে একটি গরু ও একটি শূকরই যথেষ্ট। এই অনুষ্ঠান করা হয় সাধারণত পরিবারে কোনো অসুস্থ ব্যক্তি আরােগ্য লাভের জন্য কিংবা জমে ফসল ভালাে উৎপাদন হলে অথবা ছেলে-মেয়েদের বিয়ের অনুষ্ঠানেও এই অনুষ্ঠান করা হয়। উভয় প্রকার গো-হত্যা অনুষ্ঠানে আত্মীয়-স্বজনসহ অনেক বন্ধু-বান্ধবদের নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়।

এই উভয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বিশেষ সম্মানিত অতিথিরা হলেন আয়ােজকের শ্বশুর শাশুড়ি মামার পক্ষের লােকজন। এই অনুষ্ঠানগুলােতে বিশেষ মূল্যবােধ হচ্ছে- আমন্ত্রিত অতিথিসহ পাড়াবাসী সবাইকে এক টুকরো মাংস উপহাড় দিয়ে বিদায় ‍দিতে হয়। যাকে খুমী ভাষায় বলা হয় ‘মিইচেং’ (Mawichenge)।

তাছাড়াও অনুষ্ঠান আয়োজকের কোনো ফুফু বা বোন যদি অনুষ্ঠানে আসে, তবে তাদেরকে একটি গরুর রান দিয়ে বিদায় জানাতে হয়। বিনিময়ে গরুর রান গ্রহণকারী আয়ােজককে তথা ভাই বা তার ভাগিনাকে একটি বল্লম ও একটি মুরগি উপটোকন হিসেবে দিয়ে সম্মান দেখাতে হয়। নিজেদের প্রথাগত সামাজিক উৎসবের পাশাপাশি খুমীরা রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠানেও অংশগ্রহণ করে। রাজপুণ্যাহর দিনে খুমী মুরব্বিরা তথা পাড়া কার্বারীরা এক বােতল মদ বা রাইসবিয়ার ও একটি মােরগ দিয়ে খাজনা প্রদান করে বােমাং চিফকে।

খুমী ভাষা ও বর্ণমালা

খুমীদের ভাষা তিব্বতি-বার্মিজ-কুকি চীন দলভুক্ত একটি ভাষা। কুকি-চীন ভাষায় অভিজ্ঞ আমেরিকান ভাষাবিদ ড. ডেভিড এ পিটারসন মনে করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বম, খিয়াং, পাংখােয়া ও লুসাই আদিবাসীদের ভাষাও কুকি-চীন দলভুক্ত ভিন্ন ভিন্ন ভাষা। এই আমেরিকান মনে করেন, অনেক ভাষাবিদ যদিও ম্রো ভাষাকে কুকি-চীন দলভুক্ত ভাষা বলে দাবি করেন; কিন্তু এই ভাষার বৈয়াকরণিক (Syntax) আচরণে এটি কুকি-চীন পরিবারভুক্ত ভাষা বলে পুরােপুরি দাবি করা যায় না।

কারণ এই ভাষার বৈয়াকরণিক আচরণ অন্যান্য কুকি-চীন পরিবারভুক্ত ভাষাগুলাের সাথে মিল নেই। খুমী, বম, খিয়াং, লুসাই ও পাংখােয়া ভাষার সাধারণত বাক্যবিন্যাস হয় বিশেষ্য, অব্যয় ও ক্রিয়া আঙ্গিকে; তথা Subject, Object & Verb (SOV)। যেমন খুমী ভাষায়-কাই বিউ চা’ অর্থ হলাে— আমি ভাত খাই। এই বাক্যের ‘কাই’ অর্থ আমি, ‘বিউ’ অর্থ ভাত এবং চা’ অর্থ খাই। অর্থাৎ বিশেষ্য, অব্যয় ও ক্রিয়া যথাক্রমে বসে।

অন্যান্য কুকি-চীন ভাষাসহ বাংলা, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষাগুলােও একই বাক্য বিন্যাসের নিয়ম অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু ম্রো ভাষার বাক্য-বিন্যাস ভিন্নরূপ। ম্রো ভাষায় বিশেষ্যের পরে ক্রিয়া এবং শেষে বসে অব্যয়। যেমন—“আং চা হম’ অর্থ হলাে আমি ভাত খাই। এই বাক্যের শব্দ বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায় ‘আং’ অর্থ আমি, ‘চা’ অর্থ হলাে ‘খাই’ এবং হম’ অথ ভাত।

তথা এই ভাষার বাক্য বিন্যাসটি অন্যান্য কুকি-চীন ভাষা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই অনেক কুকি-চীন ভাষাবিদদের মধ্যে ম্রো ভাষা আসলে কি কুকি-চান পরিবারভুক্ত কিনা তা নিয়ে অনেক দ্বিমত রয়েছে। ভাষাগত দিক বিচারে ম্রোরা কুকি-চীন পরিবারভুক্ত কিনা তা নিয়ে দ্বিমত থাকলেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে মোরা যে কুকি-চীন পরিবারের দল তাতে কোনাে সন্দেহ নেই।

খুমা ভাষা হচ্ছে স্বরযুক্ত (Tonal Language) একটি ভাষা। এই ভাষায় প্রধানত ৩টি সুর (Tone) রয়েছে। তবে এই ভাষায় বিভক্তি ভেদে ৯-১০টি Tone ” করা যায়। খুমীদের নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। তারা রােমান বর্ণমালা ব্যবহার করে খুমী ভাষায় বাইবেল এবং ধর্মীয় সংগীতের বইও রয়েছে। বর্মার চীন প্রদেশের খুমীরা দীের্ঘদিন ধরে এই বর্ণমালা চর্চা করলেও বাংলাদেশের খুমীরা তা সম্প্রতি চর্চা করছে। এই বর্ণমালা মূলত খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসী খুমীরাই চর্চা করছে। খুমী ভাষায় বর্ণমালা নিম্নে দেওয়া হলো-

AYYHAWBCHD
EFHIJKL
MNNGOPRS
TUVZ

খুমী ভাষায় সর্বমোট ২৫টি বর্ণমালা রয়েছে। প্রথম চারটি অক্ষর এবং ৬ষ্ঠ অক্ষর ব্যতীত অন্যান্য অক্ষরগুলির উচ্চারণ ইয়রেজি বর্ণমালার উচ্চারণের সাথে মিল রয়েছে। খ্রিস্ট মিশনারিদের সহযোগিতায় নিজ ভাষায় অক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন খুমীরা অন্যান্য খুমী পাড়ায় গিয়ে অক্ষর জ্ঞান দান করছে। তবে বয়স্কদের তুলনায় অল্প বয়সী ছেলে-মেয়েরাই বেশি এই অক্ষরজ্ঞান নিতে আগ্রহী।

খুমী ভাষায় পশু-পাখির নাম

বাংলা
মুরগি
হাঁস
কবুতর
ঈগল
পাখি
ছাগল
গরু
মহিষ
গয়েন
হরিণ
শূকর
সাপ
বানর

খুমী
আহ্
রংপাই
বহু
আমু
তোও (Tovo)
মে এ
ছাড়া বা সি
পাই নো
স্তাং
স্খী
এউ
পুইউই
ক্লাই

জলজ প্রাণীর নাম

বাংলা
মাছ
চিংড়ি
কাঁকড়া
শামুক
কচ্ছপ

খুমী
ঙো
আছেং
তা আই
আতেং
উইকিই

খাদ্যশস্যের নাম

বাংলা
ধান
ভুট্টা
মরিচ
তুলা
কলা
পেঁপে

খুমী
চো
মেকতে
শামরিং
প্লো
কইতি
সাপ্লা

জ্ঞাতি সম্পর্কের নাম

বাংলা
মা
বাবা
দাদা
বোন
ভাই
মামা/শ্বশুর
মামি/শাশুড়ি
কাকা
দাদা/দাদি

খুমী
আনেই
আই, জা আই
যায়
তুইচো
অমপ্রো
পু
পি
অইচে
আতা

সংখ্যা গণনা

এক-হা, দুই-নি, তিন-থুং, চার-প্লি, পাঁচ-পাং, ছয়-ত্রিউ, সাত-সিরি, আট-তাজা, নয়-তক, দশ-হো। বিশ-অপুং, ত্রিশ-ফাই, চল্লিশ-উইপ্লি, পঞ্চাশ-উইপাং, ষাট-উইত্রিউ, সত্তর-উইসিরি, আশি-উই তা জা, নব্বই-উই ত ক, একশ-চুং ঙাই, এক হাজার-সাং, দশ হাজার-সাং হো, এক লক্ষ-তিসিং।

সপ্তাহের নাম

রবি-তালাং কুনি; সোম-তালাংলা; মঙ্গল-আংকা; বুধ-পুদু; বৃহস্পতি-ক্রাশাপিদি; শুক্র-সেউক্রা; শনি-চিনি

বারো মাসের নাম

জানুয়ারি-লিলু, ফেব্রুয়ারি-দিতো, মার্চ-দিপুই, এপ্রিল-প্রে, মে-সাম হ, জুন-পহু, জুলাই-পারাই, আগস্ট-ক, সেপ্টেম্বর-কোফো, অক্টোবর-কে, নভেম্বর-ত্লাংউই এবং ডিসেম্বর-তারাম/রামতাং।

খুমী ভাষার উপর কোনাে বিদেশি ভাষার প্রভাব লক্ষ করা না গেলেও বান্দরবান স আদিবাসীদের মধ্যে মত বিনিময়ের প্রধান ভাষা হিসেবে পরিচিত মারমা ভাষায় প্রভাব যথেষ্ট লক্ষণীয়। তবে এর অধিকাংশ শব্দই ধর্মীয় শব্দ। অধিকাংশ খুমী বাংলা বলতে না পারলেও নিজ ভাষা ছাড়া ২/৩টি ভাষায় কথা বলতে পারে।

খুমীরা সাধারণত যে ভাষায় কথা বলতে পারে সেগুলাে হলাে- মারমা, ম্রো, বম ও ত্রিপুরা। আনুমানিক ২৫% খুমী নিজেদের বর্ণমালা ব্যবহার করে। খুমীদের এই বর্ণমালা উন্নয়নের জন্য এখনও পর্যন্ত কোনাে প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ নেননি।

ফলে আজ থেকে ৫০/৬০ বছর পর এই বিপদাপন্ন খুমী ভাষাসহ অবহেলিত অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষা বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশংকা করছেন পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষাগুলাের একমাত্র আমেরিকান গবেষক, ভাষাবিদ অধ্যাপক ডেভিড এ পিটারসন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের অনেক শিক্ষক।

খুমী ভাষা উন্নয়নের প্রয়াসে এই আমেরিকান ভাষাবিদ এবং এই খুমী এথনােগ্রাফির লেখক দুজন মিলে ১৯৯৯ সাল হতে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে Khumi to English অভিধান তৈরির কাজ শুরু করেছে। যদিও এই অভিধান তৈরির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খুমী বর্ণমালা উন্নয়ন বা মাতৃভাষায় শিক্ষা সম্প্রসারণ নয়; তবুও স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া খুমী ছাত্রছাত্রীদের অনেক উপকারে আসবে।

খুমী লােক-সংস্কৃতি ও সাহিত্য

খুমীদের কোনাে লিখিত সাহিত্য না থাকলেও সমৃদ্ধ লােক-সংস্কৃতি ও অলিখিত (মাৗখিক) সাহিত্য রয়েছে। তাদের অলিখিত সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে—রূপকথা, গান, বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য।

খুমী গান/নৃত্য

খুমীদের লােক সংগীত খুবই সমৃদ্ধ। এই লােকগীতি সব খুমীদের নিকট বােধগম্য নয়; কেবল শিল্পীরাই বুঝতে পারে । আজকাল এই লােক-গীতি খুব কম সংখ্যক লোকজন চর্চা করছে। এই লােক-গীতির বিশেষ দিক হলাে—শিল্পীরা এই গানের ভাষায় নিজেদের মধ্যে আনন্দ-বেদনা, প্রেম-ভালােবাসা, সুখ-দুঃখের অনুভূতি আদান-প্রদান করতে পারে; যা সাধারণ লােকজন বুঝতে পারে না । এই অলিখিত লােক-সংগীত ছাড়াও আজকাল খুমীরা ধর্মীয় সংগীতও চর্চা করছে।

খুমী নৃত্যের মধ্যে উল্লেখযােগ্য নাচ হলাে—তাং ন’। সাধারণত গাে-হত্যা অনুষ্ঠানে যুবক-যুবতীরা ঐতিহ্যবাহী পােশাক পরিচ্ছদ ও অলংকার পরে হাতে ধরে সারিবদ্ধভাবে বাঁশির সুরের সাথে তাল মিলিয়ে এই নাচটা পরিবেশন করে। এই নাচের জন্য তারা বাঁশি ও ঢােল ব্যবহার করে।

খুমী সাহিত্য, রূপকথা ও লােককাহিনী

বিভিন্ন রকম রূপকথা ও লােককাহিনী খুমীদের অলিখিত সাহিত্যের একটা অংশ হিসেবে স্মরণাতীতকাল থেকে বংশ পরস্পরায় চর্চিত হচ্ছে। উল্লেখযােগ্য লােককাহিনীগুলাের মধ্যে রয়েছে—আংলাে রেইংপা, সিখি আচি, পুইখং আচি, উইকিই আচি, লাকনা নু আচি এবং য়াংপাে চে আচি। এসব রূপকাহিনী মৌখিক সাহিত্য হিসেবে চর্চিত হয়ে খুমী জনগােষ্ঠীর সাহিত্যকে জীবন্ত করে রেখেছে। নিম্নে খুমীদের খুবই প্রিয় ও পরিচিত একটি রূপ-কাহিনী তুলে ধরা হলাে।

উইকিই আচি (কচ্ছপের গল্প)

এক সময় এক বনে একটি কচ্ছপ বসবাস করত। একদিন ঐ বনে একদল বানর। একটি কালােজাম গাছে দলবদ্ধভাবে ফল খাচ্ছিল। কচ্ছপটি ঐ গাছের নিচে ঝরে পড়া জাম ফল খুঁজছিল । এক পর্যায়ে এক দুষ্ট বানর গাছ থেকে নেমে কচ্ছপটিকে উপরে তুলে নিয়ে যায় এবং সেখানে ডালে তাকে আটকিয়ে রাখে।

অসহায় কচ্ছপটিকে সেখানে আটকিয়ে রেখে সব বানর পালিয়ে যায়। গাছের উপর কচ্ছপটি কান্না করতে লাগল। তার চোখের জলে গাছের নিচে একটি জায়গায় কাদা সৃষ্টি হলাে। এ মাটিতে একদিন এক বন্যশূকর স্নান করতে আসলাে। একদিন কচ্ছপটি ঐ বন্যশূকরকে বলল, তুমি আজ কাদা মাটিতে স্নান না করে সরে যাও। আমি যে কোনাে সময় মাটিতে পড়তে পারি।

আমি নিচে পড়লে তােমার গায়ে লাগতে পারে এবং তাতে তুমি আঘাত পাবে। কিন্তু বন্যশূকরা কচ্ছপের কথা না শুনে ঐ কাদা মাটিতে আপনমনে স্নান করতে থাকলাে। এ পর্যায়ে কচ্ছপটি ধুম করে বন্যশূকরের উপর পড়লাে। তারপর বন্যশূকরটি মরে গেল কচ্ছপটি মাটিতে পড়ে ঐ গাছের নিচে আশপাশে খাবার খুঁজে কয়েকদিন অতিবাহিত করে। কয়েকদিন পর কচ্ছপটি স্বাস্থ্যবান হয়ে উঠলে বন্যশূকরেন একটি লম্বা দাঁত উপড়িয়ে একটি বাঁশি বানালাে। কচ্ছপটি সকাল সন্ধ্যায়েঐ বাঁশিটি বাজালাে। ঐ বাঁশির সুর শুনে এক ইঁদুর মাটির গর্ত থেকে বেরিয়ে এল।

তারপর সে বাঁশিটি বাজিয়ে দেখবে বলে কচ্ছপটিকে অনুরোধ করলো। বাঁশিটি বাজাতে বাজাতে এক পর্যায়ে ইঁদুরটি বাঁশি নিয়ে গর্তে ঢুকে গেল। কচ্ছপটি আবার কান্না করতে থাকলো দুঃখে।

অন্য একটি উঁচু গাছের উপরে ডিমে তা দিতে থাকা গােখরো সাপ কচ্ছপের কান্না কত না পেরে নিচে নেমে এসে কচ্ছপকে তার কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলো। কচ্ছপ উত্তরে বলল-তার বন্যশূকরের দাতের বাঁশি ইদুরে নিয়ে গেছে বলে কান্না করছে তারপর গােখরাে সাপটি তাকে বাঁশিটি এনে দেবে বলে আশ্বাস দিল।

কচ্ছপটিকে তার ডিমে তা দিতে বলল সাপটি । কচ্ছপটি যখন সাপটির ডিমে তা নিছিলাে তখন দুটি শ্যামা পাখি এসে কচ্ছপটিকে নড়ে-চড়ে তা দিতে বলল । শ্যামা পাখির কথানুযায়ী নড়ে-চড়ে তা দিতে গেলে সাপের সব ডিম ভেঙে গেল । কচ্ছপটি সাপের ভয়ে আবারও কান্না করতে থাকলাে। কিছুক্ষণ পর সাপটি বাঁশি নিয়ে বাসায় ফিরলাে বাসায় ফিরে আবারও কচ্ছপটিকে কান্না করতে দেখে সাপটি কী হয়েছে তা জানতে চাইলাে।

কচ্ছপটি অজান্তে শ্যামা পাখির কুবুদ্ধি গ্রহণ করতে গিয়ে তার ডিমগুলাে ভেঙে যাওয়ার কাহিনী কাঁদতে কাঁদতে সাপকে বললাে। এরপর সাপ বাঁশিটি কচ্ছপকে ফিরিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে যেতে বলল। কচ্ছপটি বাঁশিটি পেয়ে বাজাতে বাজাতে ঘরে ফিরে গেল । অন্যদিকে সাপটি দুঃখে-ক্ষোভে তার ডিম ভেঙে যাওয়ার প্রতিশােধ নিতে প্রখর রােদে নদীর ধারে এক ঝােপে শ্যামা পাখির অপেক্ষায় রইলাে। এক সময় ঐ দুটি শ্যামা পাখি নদীতে পানি পান করতে আসলে ছােবল মেরে প্রতিশােধ নিলাে সাপটি।

খুমী দের পােশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকার

খুমী মহিলারা সাধারণত নিজেদের হাতে বােনা ‘নেনা’ (থামি) পরিধান করে। খুমী মহিলাদের ব্যবহৃত থামি ১৫/১৬ ইঞ্চি লম্বা এবং বিভিন্ন রঙে নক্‌শা করা। এটি সাধারণত চতুর্দিকে গুটিকা (BEADS) দিয়ে অলংকৃত করা ।

খুমী মহিলারা মাথায় সাদা পাগড়ি, চুলে খােপা, বাহুতে পিতলের বালা, কানে রূপা দিয়ে তৈরি বড় ধরনের দুল, পায়ে খাড় ও কোমড়ে বিছা ব্যবহার করে। খুমী মহিলারা নিজেদের ব্যবহারের জন্য কম্বল বুনে। খুমী পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পােশাক হচ্ছে নেংটি ও লুঙ্গি তবে অধিকাংশ খুমী পুরুষ এখন কোনাে নেংটি ব্যবহার করে না। খুমী পুরুষরাও সাধারণত লম্বা চুল রাখে এবং কানে এক ধরনের দুল পরে। তবে আজকাল খুমী পুরুষরা আর তা করছে না।

আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র

নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক আসবাবপত্র তৈরিতে খুমীরা পারদর্শী। খুমীরা নিজেদের ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন রকমের বাঁশের তৈরি গ্রুং (ঝুড়ি) তৈরি করে থাকে। কৃষি কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন আসবাবপত্র ও তারা দক্ষতার সাথে তৈরি করে। এবং ঐতিহ্যবাহী দামি পােশাক-পরিচ্ছদ ও অলংকার সংরক্ষণ করার কাজে ব্যবহৃত টেকসই ঝুড়িও তারা তৈরি করে। খুমীদের এসব আসবাবপত্র ম্রো ও বম জনগােষ্ঠীদের ব্যবহৃত আসবাবপত্রের সাথে যথেষ্ঠ মিল রয়েছে।

খুমী দের খাদ্যাভ্যাস

খুমীদের প্রধান খাবার হচ্ছে ভাত, মাছ-মাংস ও শাক-সবজি। খুমীরা সাধারণত দিনে ৩ বার আহার করে। সকালে কাজে যাওয়ার পূর্বে একবার, দুপুরে মধ্যাহ্ন ভােজ এবং সন্ধ্যায় নৈশ ভােজ আহার করে। তারা প্রয়ােজনীয় শাক-সবজি জমে চাষ করে এবং জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে।

তাছাড়া খুমীরা মুরগি, গরু, শূকর, মহিষ, ছাগল, কুকুর, সাপ, ব্যাঙ, শামুক, গুইসাপ, কচ্ছপ, হরিণ, বানর ও গয়েল পশু-পাখির মাংস খায়। খুমীরা বন্য পশু পাখি শিকারে খুবই দক্ষ। খুমীরা রান্নার উপাদান (Ingredients) হিসেবে ব্যবহার করে—লবণ, হলুদ, আদা, নাপ্পি, পেঁয়াজ, রসুন এবং নানান সুগন্ধ জাতীয় পাতা ও বীজ। রান্নার জন্য ঘরে পাত্র ব্যবহার করলেও জঙ্গলে রান্নার ক্ষেত্রে অনেক সময় লম্বা বাঁশের চোঙ্গা ব্যবহার করে ।

ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা

খুমীদের বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা রয়েছে। যেমন—আহথো আচ কে (বগলে বাঁশ আটকিয়ে দুপক্ষের মধ্যে শক্তি পরীক্ষা করা) আতিলং আকো (গিলার খেলা) ও কানামাছি খেলা। এসব খেলার মধ্যে ‘আথো আচ্ কে’ খেলাটি হচ্ছে সবচেয়ে পরিচিত ও জনপ্রিয়।

৪/৫ ফুট শক্ত লম্বা বাঁশের দুই প্রান্তে ২/৪ জন লােক দাঁড়িয়ে শক্ত করে বগলের নিচে আটকিয়ে একপক্ষ অপরপক্ষকে মাটিতে ফেলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। যে পক্ষ মাটিতে প্রথমে পড়বে সে হারবে। এই খেলা সাধারণত পুরুষদের জন্য। মহিলারা সাধারণত এই খেলায় অংশগ্রহণ করে না।

প্রবাদ-প্রবচন

ক. সিখি ডিই লে খা সেউঙা বাই (হরিণ শিকারের আগে কলাপাতা মাটিতে বিছানাে-গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল)
খ. লঅং বিলে খা বিউতেলং সােরা বি (পাত্র গরম হওয়ার আগে ঢাকনা হওয়া)

খুমী আদিবাসী জ্ঞান : কৃষি, চিকিৎসা ও ঔষধ, কারিগরি ও বন ব্যবস্থা

খুমী জুম-চাষিরা কৃষিকাজে ব্যবহৃত সকল ধরনের প্রয়ােজনীয় জ্ঞান অর্জন করে। কৃষিকাজে ব্যবহৃত সকল প্রকার ছােট বড় বাঁশের ঝুড়ি ও ধনি শুকানাের জন্য ব্যবহৃত তলয় তৈরির কাজে তারা পারদর্শী। কী ফসল কোনাে ধরনের মাটিতে ভালাে ফলে অনেকে তা মাটি ধরে দেখে অনুমান করে নিতে পারে। বিভিন্ন ধরনের রােগ নিরাময়ের জন্য খুমীরা বিভিন্ন রকম ভেষজ ওষুধ ব্যবহার করে। যেমন—পেটে বাতাস জমলে আদা খায় ও শরীরে সামান্য কেটে গেলে থানকুনি পাতার রস ব্যবহার করে।

মাছ ধরা ও জঙ্গলে পশু পাখি শিকারের জন্য তারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে । মাছ ধরার জন্য বাঁশের তৈরি ‘চেউং (ঝুড়ি) ব্যবহার করে। ঝুড়ির ভিতরে খাবার রেখে নদীতে কোনাে এক জায়গায় ডুবিয়ে রাখা হয়। তাছাড়াও তারা বড় জীব জন্তু ধরার জন্য কয়েক প্রকারের ফাঁদ তৈরি করে। পশু শিকারের কৌশলটা সাধারণত পুরুষরাই শিখে । ১৪/১৫ বছর বয়স থেকে অধিকাংশ পুরুষরা এই জ্ঞান লব্ধ করে থাকে।

খুমীরা তাদের গ্রামের আশপাশে, পানির উৎস ঝিরির চারপাশে বন-জঙ্গল সংরক্ষণ করে রাখে। জুমের আগুন থেকে বন-জঙ্গল রক্ষার জন্য তারা আগুন দেওয়ার আগে জুমের চারপাশে জঙ্গল পরিষ্কার করে নেয় যাতে আগুন জুমের বাইরে না ছড়িয়ে পড়ে।

শিক্ষা

খুমীরা শিক্ষায় অন্যান্য আদিবাসীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। খুমীদের মধ্যে ১৫ জন পুরুষ ও ৩ জন মহিলা এসএসসি পাস করেছে এবং ১ জন এইচএসসি পাস করেছে তাদের মধ্যে এখনও পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী কেউ নেই। এই এথনােগ্রাফির লেখকই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই পুরাে খুমী সমাজ থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, খুমীরা এই দেশে শত শত বছর বসবাস করে আসলেও এখনও পর্যন্ত দেশের কোনাে পাবলিক বা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করার সুযোগ হয়নি। অবিষ্বাস্য হলেও সত্য যে, এই পুুরো জাতির কোনো পাগায় অদ্যাবধি একটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নেই।

খুমীদের অর্থ-সামাজিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় তারা নিজ খরচে তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পড়াতে পারছে না। তবে বান্দরবান জেলার রুমা আবাসিক বিদ্যালয়, ম্রো আবাসিক বিদ্যালয়, লামা কোয়ান্টাম এবং রাঙ্গামাটি মনোগর শিশু সদনে কিছু কিছু খুমী ছেলে-মেয়ে বিনা খরচে কিংবা কম খরচে পড়া সুযোগ পাচ্ছে।

কিছু কিছু পাড়ায় এনজিও কর্তৃক পরিচালিত কয়েকটি স্কুল থাকলেও ঐসব স্কুলে ঠিকমত পাঠদান হয় না। মিশনারিদের সহায়তায় খুমীদের কয়েকটি গ্রামে মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা স্বল্প পরিসরে চালু হলেও কারিকুলাম ভিত্তিক পাঠাদান না হওয়ায় কিংবা শিক্ষকের অভাবের কারণে ফলপ্রসূ হয় না।

অতীতের তুলনায় আজকাল খুমী সমাজের লােকজন তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পড়ানাের ক্ষেত্রে অধিক আগ্রহী হয়ে উঠছে। তবে অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে নিজ খরচে ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে পড়ানাে অধিকাংশ খুমীদের পক্ষে সম্ভব নয় : এই অবহেলিত খুমী আদিবাসীদের শিক্ষার আলাে দানের জন্য বাংলাদেশ সরকারসহ বিভিন্ন এনজিও এই বিষয়ে একটি বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।

বিকল্প ব্যবস্থাটি এই ধরনের হতে পারে—বান্দরবান জেলার খুমী অধ্যুষিত যে কোনাে একটি উপজেলায় একটি আবাসিক স্কুল স্থাপন করে দিয়ে পাঠদানের সুযােগ করে দেওয়া। এ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলে মাতৃভাষায় শিক্ষা দান করাও সুবিধা হবে বলে খুমীরা মনে করে! নতুবা অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে ও শিক্ষার অভাবে এই খুমী আদিবাসী একদিন মূলস্রোতের সাংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।

একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো বৈচিত্র্যময় একটি সংস্কৃতি পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া, কেননা ভাষাবিদদের মতে ভাষাই হচ্ছে সংস্কৃতির মূল উপাদান। ভাষা হচ্ছে একটি সংস্কৃতির ডিএনএ (DNA) : বাংলাদেশের বৈচিত্র্যতা রক্ষার্থে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ সরকারসহ সচেতন মহল এগিয়ে আসবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

খুমী নারীর অবস্থা

খুমী সমাজে নারীরা পুরুষের মতাে ক্ষেতে-খামারে উৎপাদন কাজে অংশগ্রহণ কমে খুমী নারীরা অত্যন্ত পরিশ্রমী। উৎপাদনে খুমী নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণ থাকলেও পরিবারে ও সমাজে সিদ্ধান্ত নির্ধারণে পুরুষের মতামতই প্রাধান্য লাভ করেন। নারীর মতামত অনেকাংশে উপেক্ষিত থাকে।

সামগ্রিকভাবে খুমীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া তার মধ্যে খুমী নারীরা আরাে অধিকতর পরিমাণে পিছিয়ে পড়া পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, খুমী সমাজে মাত্র ১৮ জন এসএসসি পাশের মধ্যে – মাত্র নারী রয়েছে। তার উপরে কোনাে নারী শিক্ষার সুযােগ লাভ করেনি।

খুমীদের সমাজ ব্যবস্থা পিতৃৃতান্ত্রিক হলেও সমাজে নারীদের যথেষ্ট মর্যদা দেওয়া হয়। যদিও পিতৃ সম্পত্তি ভাগ বণ্টনের ক্ষেত্রে নারী পুরুষের মধ্যে কিছু অসমতা দেখা যায়। তবে খুমী সমাজে কোনাে মহিলা বিবাহের পূর্বে বা পরে অথবা পূর্বের স্বামীর সংসারে কিংবা পৈতৃক অথবা মাতৃসূত্রে কিংবা তার আত্মীয় কর্তৃক উপহার হিসেবে উপার্জিত সম্পত্তি লাভ করতে পারবে। বিবাহের পূর্বে নিজ নামে অর্জিত সম্পত্তি মালিকানা স্বত্ব ও অধিকার স্ত্রীর স্থাকবে।

খুমী সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও পিতা-মাতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে আইনগত অধিকার লাভ করে না। স্বামীর সম্পত্তি কেবল তার জীবদ্দশায় অধিকারী হয়। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর যদি স্ত্রী তার পিতা মাতার ঘরে ফিরে না গিয়ে সন্তানদের সাথে আজীবন থাকার কথা তার মা-বাবা এবং শ্বশুর শাশুড়িদের জানিয়ে সম্মতি পেলে স্বামীর সম্পত্তি ভােগ করতে পারবে।

বিবাহের পূর্বে একজন খুমী নারী পারিবারিক যে পদবি ও সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হােন না কেন, বিবাহের পর পরই তিনি স্বামীর পরিবারের পদবি ও মর্যাদার অধিকারী হন এবং বিবাহের পরপরই স্ত্রী তার স্বামীর নিকট হতে ভরণপােষণ পাবার অধিকারী হন। সামাজিক প্রথা অনুসারে বিবাহের পর স্বামী ভরণপােষণ প্রদানে বিরত থাকলে; একজন খুমী পরিবারের স্ত্রী তার দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের জন্য সামাজিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে।

স্বামী পুরুষত্বহীন অথবা দুরারােগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে কিংবা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হলে অথবা স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া স্বামী একাধিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে সেক্ষেত্রে স্ত্রী সামাজিক আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ সম্পাদনের অধিকারী হয়। তবে স্ত্রী তার কোনাে সন্তান সন্ততি পাবে না। কেননা খুমী সমাজ একটি গােত্রভিত্তিক এবং পিতৃসূত্ৰীয় সমাজ এবং সমাজে সন্তানরা পিতৃপরিচয়ে পরিচিতি লাভ করে।

খুমী দের রাজনৈতিক সংগঠন

খুমীরা এখনও পর্যন্ত কোনাে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নেই। রাজনৈতিক দিক থেকে খুমী জনগােষ্ঠী এখনাে তুলনামূলকভাবে অসচেতন ও সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া। বিশেষত শিক্ষার অভাব, স্বল্প জনসংখ্যা, অথনৈতিকভাবে দুর্বল ও যােগ্যতা সম্পন্ন নেতা না থাকার কারণে খুমী জনগােষ্ঠী রাজনৈতিকভাবে অনেক পিছিয়ে আছে ।

আবার ধুমীদের নিয়ে সরাসরি কাজ করে এমন কোনাে এনজিও বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান লক্ষ করা যায়নি। তবে বান্দরবান জেলার ম্রোচেট নামে একটি এনজিও ম্রোদের পাশাপাশি খুমীদের শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প পরিসরে হলেও কাজ করে আসছে।

তাছাড়া ইদানিং কিছু কিছু এনজিও খুমীদেরকে ও বিভিন্ন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করছে। বাংলাদেশে ‘খুমী কুহুং সমিতি’ নামে খুমীদের একটি সামাজিক সংগঠন রয়েছে যা বেশ কয়েক বছর ধরে খুমী জাতির সমষ্টিগত কাজকর্মে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। খুমী সমাজের প্রথাগত প্রতিষ্ঠানের হেডম্যান ও কার্বারী রয়েছে। তারা মূলত জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা, শিক্ষা প্রসার ও অর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যস্থার অধীনে প্রবর্তিত পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদে অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মতো খুমী জনগোষ্ঠীরও আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ খুমী জনগোষ্ঠীর জন্য ১টি সদস্যপদ সংরক্ষিত রয়েছ। তবে ৬টি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত নয় বলে অনেকের অভিমত।

টীকা

১. Tame Chin, Wild Chin
২. অকিয়াব (Akyab), ক্যক্প্যু (Kyaukpyu) এবং সানডোওয়ে (Sandoway)
৩. মিনবু (Minbu) , দেয়েতমোয়া (Theyetmyo), প্রোম (Prome) এবং হেনজাদা(Henzada)

তথ্যসূ্ত্র

১. উপজাতীয় গবেষণা পত্রিকা, উসাই, রাঙ্গামাটি, ১৯৯৫।
২. চাঙমা, ইত্তুকগুল, খুমী ই অমনাই রাইতা, গবেষণাকর্ম ও প্রামাণ্যচিত্র নিমার্ণ প্রকল্প, ২০০৫-০৬।
৩. খুমী হইলু, ম্রংখ্যং পাড়া, রুমা, বান্দরবান (মৌখিক সাক্ষাৎকার), ২০০১,
৪. Peterson, Dr. David A & Vanbik, Dr. Kenneth, 2005, USA (Interviw)
5. চাকমা, এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ; রায়, এডভোকেট প্রতিম; দে, শৈলেন, খুমী ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন, কপো সেবা সংঘ, আদালত সড়ক, বনরূপা, রাঙ্গামাটি, সেপ্টেম্বর ২০০৭।
৬. Lewin T.H, Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein; with Comparative Vocabularies of the Dialects, Calcutta, 1869.

লেখক: লেলুং খুমী

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
RSS
Follow by Email
Facebook
Twitter

আরও কিছু লেখা