icon

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ৫)

Jumjournal

Last updated Aug 20th, 2020 icon 651

থান্ মানা

সম্বৎসরে একবার প্রতি চাকমা পাড়ায় থান্ মানা পূজা করা হয়ে থাকে। এ’টি একটি সমষ্টিগত পূজা। পাড়ার প্রত্যেক গৃহস্থই এতে অংশ গ্রহণ করে থাকে।

তবে বিশেষ কারণে কাউকে সমাজে একঘরে করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এই পূজায় অংশগ্রহণ করার অধিকার থাকেনা। অনেকে একে গঙাপূজা বা গাঙ্ পূজাও বলে।

এই পূজার উদ্দেশ্য বহুবিধ যেমন – পাড়ার ধনৈশ্বর্য্য বৃদ্ধি রোগ মহামারী ইত্যাদি থেকে পরিত্রাণ, অজন্মার সময় সুবৃষ্টি কামনা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পূজা ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মধ্যেও প্রচলিত আছে যদিও পূজা পদ্ধতিতে কিছুটা বিভিন্নতা রয়েছে।

চাষের ধান গোলায় উঠলে সুদিনে সুক্ষণে পাড়ায় পাড়ায় এই সম্মিলিত পূজা অনুষ্ঠান করা হয়ে থাকে। এ পূজায় একসঙ্গে চৌদ্দজন দেবদেবীর পূজা করা হয়।

তাদের মধ্যে প্রধানা হলেন পূর্বে বর্ণিতা গঙ্গাদেবী। তারপরে আসেন বিয়াত্রা, যিনি গঙ্গার স্বামী, ভূত, যিনি একাধারে গঙার ছেলে এবং সেনাপতি আহ্ত্যা, মোত্যা, বড়শিল্, মগনী আর সাত বোন কঙরী বা কুঙারী। যথা: বত্ কুঙারী (শীতল দেবী), জুরো কুঙারি (ওলা দেবী), শিব কুঙারী, বিনি কুঙারী, ওলু কুঙারী, ফুল কুঙারী এবং ক কুঙারী। এরা বিবিধ রোগ ব্যাধির জন্য দায়ী।

একই ভূমিকা নিয়ে এই সাতবোন কুমারী পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলেও পূজিত হয়ে থাকেন।

পাড়ার লোকের সামর্থ্য বিবেচনা করে প্রথমে পূজার জন্য একটা বাজেট তৈয়ার করে নিতে হয়। ঐ হিসেবে প্রত্যেকের বাড়ী থেকে চাঁদা উঠিয়ে পূজার জন্য শূকর পাঁঠা ইত্যাদি যাবতীয় পূজার উপকরণ কেনা হয়ে থাকে।

অবস্থা বিবেচনা করে অনেক সময় এই পূজায় গঙার নামে মোষও বলি দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট দিন সকালবেলা পূজার উপকরণগুলো নিয়ে পাড়ার লোক ঘাটে এসে জড় হয়।

ঐখানে জলের কিনারায় পূজার জন্য প্রায় কোমর সমান উচু একখানা বাঁশের মাচান তৈরী করে তার উপর মাটি দিয়ে পূজার বেদী তৈয়ার হয়। বেতের ধ্বজা আর নানা রকমের বেতের কারু-কাজ দিয়ে এটাকে তখন সাজানো হয়ে থাকে।

এরপর অঝা মন্ত্রপাঠ করে ‘আগ্ পাতা’ ফেলে এক এক দেবতা এবং দেবীর উদ্দেশ্যে বলি দিতে শুরু করে। গঙা আর আহ্ত্যা ও মোত্যার জন্য পাঁঠা, ভূতের জন্য শুকর, বড় শীলের জন্য কবুতর, মগনীর জন্য হাঁস (অভাবে মুরগী) এবং বাকীদের সবার জন্য একটা মোরগ বলি দিতে হয়।

গঙার জন্য মোষ বলি দেওয়া হলে মোত্যাও তাতে অংশ পায়। গঙা শুকর বলি গ্রহন করে না। ভূতের আবার পাঁঠা চলে না। এমনি বাছবিচার রয়েছে এদের মাঝে। কথিত আছে, বিয়াত্রারও নিষেধ আছে বলেই গঙা শুকর বলি গ্রহণ করে না, কিন্তু খাওয়ার বিষম লোভ আছে।

তাই অনেক সময় মরণাপন্ন রোগীর রোগ মুক্তির জন্য শুকরের গায়ে পিটুলি মাখিয়ে গভীর রাতে সকলের অগোচরে এবং সম্ভত: বিয়াত্রারও অগোচরে সাদা শুকর গঙার নামে বলি দেওয়া হয়। এভাবে স্বামী ভাঁড়িয়ে শুকর খেয়ে গঙা নাকি খুবই প্রীত হয়ে থাকেন। তাই অনেক সময় রোগী নাকি ধীরে ধীরে নিরাময় হয়ে উঠে।

পূজা শেষে সাধারণত গ্রামের প্রান্তে কোন ছায়া বহুুল বড় গাছের নীচে বলি দেওয়া পশুপাখীর মাংস রান্না করা হয়। এখানে কিন্তু ভাত রান্না করা হয় না।

এটাও এই পূজার বিশেষত্ব। মাংস রান্না হয়ে গেলে পাড়ার ছেলে বুড়ো সবাই যে যার বাড়ী থেকে ভাত এনে এখানে সরকারী ভোজে শরিক হয়। ভোজের সময় মদ অপরিহার্য আর সেটা প্রায় প্রত্যেকক বাড়ী থেকেই প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

এই সমষ্টিগত পূজা আর সম্মিলিত ভোজের মাধ্যমে গ্রামবাসীদের মধ্য একতা, সহযোগিতা আর ভ্রাতৃত্ব সুলভ মনোভাব বৃদ্ধি পায়। এটা যেন পূজার ভিতর দিয়ে গ্রামের সকলের আনন্দের জন্য একটা পিকনিকের বিধান দেওয়া হয়েছে।

এতে আর কিছু না হোক সম্বৎসারে অন্তত একবার সমস্ত গ্রামবাসী একত্রে মিলে সব কাজ, সব চিন্তা ভাবনা একপাশে ফেলে রেখে সারাদিন প্রচুর আনন্দ উল্লাস আর হৈ হল্লার মধ্যে দিয়ে অবকাশ যাপনের সুযোগ পায়।


মালেইয়া

মালেইয়া ঠিক কোন পূজা পার্বণ নয়। এটি চাকমাদের একটি প্রাচীন সামাজিক রীতি, এখন প্রায় লোপ পেতে চলছে। এতে কোন দেবতার পূজা হয় না। কোন গৃহস্থ যদি কোন কাজে পিছিয়ে থাকে, ইচ্ছে করলে সে পাড়ার লোকের সাহায্য নিতে পারে।

হয়ত কোন কারণে কারও জুম কাটা দেরি পড়ে গেছে; ঠিক সময়ে জঙ্গল কাটা না হলে কাটা জঙ্গল শুকাবেনা, ভালো পোড়া যাবেনা, ফলে ভাল ফসলও হবে না।

তখন পাড়া পড়শীর সাহায্য নিয়ে সে কাজে সমতা আনতে পারে। সেক্ষেত্রে সে পাড়ার ঘরে ঘরে গিয়ে সাহায্য আবেদন জানিয়ে আসে। তার পরদিন প্রতি বাড়ি থেকে দা, কুড়াল নিয়ে এক একজন লোক এসে তার কাজটা একদিনে সম্পন্ন করে দিয়ে যায়।

এদের কোন মজুরী দিতে হয় না। শুধু খানাটা দিলে চলে। তা’ অবশ্যই একটু ভালোই দেওয়ার রেওয়াজ আছে। তখন এ উপলক্ষে সে বাড়িতে ছোটখাট একটা ভোজের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

গৃহস্থের অসচ্ছলতা থাকলে কিন্তু অনেক সময় এমনিই সবাই কাজ করে দিয়ে আসে। জুমে নিড়ানি দেওয়ার বেলায় কিংবা ফসল কাটার সময়ও মালেইয়া ডাকা হয়।

নিসন্দেহে এটি একটি খুব ভালো প্রথা এতে পারস্পরিক সহানূভূতি আর সহযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পায়, সামাজিক বাঁধন সুদৃঢ় থাকে। এক কথায় এই প্রথা প্রাচীন চাকমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্যেরই পরিচয় বহন করে। এমন সহজ ভাতৃত্ববোধ সভ্য জগতের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

এই প্রসঙ্গে পুরনো দিনের মিজোদের একটা ব্যাপার এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে মিজোদের মধ্যে কারো কোন অপরাধে জেলের হুকুম হলে তখন তার যতদিনের জেলের মেয়াদ তার ততজন আত্মীয় এসে জেলে কাজ করে দিয়ে দিনে দিনে তাকে খালাস করে নিয়ে যেত। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টও তাদের সরলটা দেখে তাই মেনে নিতেন। এটাও তাদের একধরণের মালেইয়াই বলা চলে।


আহল্ পালানী 

প্রত্যেক বছর ৭ আষাঢ় অম্বুবাচী প্রবৃত্তি থেকে তিন দিন চাকমারা হালচাষ বন্ধ রাখে। হিন্দুমতে এই সময় বসুমতি ঋতুমতী হয় আর তার উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পেয়ে শস্যধারণ ক্ষমতা জন্মে। এই কয়দিন হালকর্ষণ কিংবা কোন প্রকার মাটি খোঁড়াখোঁড়ি নিষিদ্ধ।

এই সময়ে চাকমারা অন্য কোন কাজকর্ম কিংবা মুজুরীও করে না। সবাই বাড়ী বাড়ী ঘুরে মদ খায় আর আমোদ ফূর্তি করে অবসর যাপন করে। এই উৎসবকে বলে আহল্ পালানী। অর্থনৈতিক কারণে তিনদিন কাজকর্ম বন্ধ রাখা এখন অবশ্য সকলের পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই কেউ কেউ হয়ত একদিন মাত্র এই উৎসব পালন করে থাকে।


লেখকঃ শ্রী বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান

চাকমা পূজা পার্বণ, ১৯৮৯ ইং
 

আরো পড়ুন..

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ১)

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ২)

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ৩)

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ৪)

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal