icon

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ৩)

Jumjournal

Last updated Feb 20th, 2020 icon 728

চামনী

মরণাপন্ন ছেলের আরোগ্য কামনায় অনেক সময় চাকমা জনক-জননী ছেলের জন্য চামনী মানত করে থাকেন। চামনীর পালি সামঞঞ্য বা শ্রামণ্যব্রত। ছেলে ভালো হয়ে গেলে একদিন ঘটা করে তাকে বিহারে নিয়ে শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত করা হয়ে থাকে।

এভাবে সে রংবসস্ত্র নিয়ে অন্ততঃ সপ্তাহকাল বিহারে অবস্থান করে এবং বিহারবাসী ভিক্ষুর নিকট শ্রামণ্যধর্মে ধর্মের পাঠ নিয়ে ব্রত পালন করেন। এসময় ভিক্ষান্নে জীবিকা নির্বাহ করাই নিয়ম।

ব্রত পালনের জন্য অন্ততপক্ষে একদিন ধারে ধারে গিয়ে ভিক্ষা করতে হয়।বৌদ্ধধর্মে এরূপ ব্রতধারী শিক্ষার্থীকে বলা হয় শ্রামেণর। সপ্তাহান্তে সে আবার চীবর পরিত্যাগ করে মা বাবার সঙ্গে গৃহে ফিরে যায়।তখন এ উপলক্ষ্য ভিক্ষু ভোজনসহ লোকজন খাওয়ানো হয়ে থাকে।

অনেক সময় অনেক বয়স্ক ব্যক্তি ও বিপদের সময় চামনী মানত করে। তারপর বিপদ কেটে গেলে এক সময় বিহারে গিয়ে মানত শোধ করে আসে।

পুরোপুরি ভিক্ষুজীবন গ্রহণের জন্য যারা দীক্ষা নেই তারা বিহারেই থেকে যায় এবং শিক্ষা সমাপনান্তে উপসম্পদা লাভ করে। চাকমা সমাজে জীবনে অন্তত একবার বিশেষত:বিবাহের পূর্বে বিহারে গিয়ে কিছুদিনের জন্য শ্রামণ্য ব্রত পালন করা প্রত্যেক পুরুষের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

এর প্রায় বিশেষ কোন হেরফের হয় না। শীল পালন এবং ব্রক্ষ্মাচর্য্য আচরণের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের নীতিশিক্ষা গ্রহণেরই এটা মূল উদ্দেশ্য। এই সাময়িক ব্রত পালনের জন্য ও অন্ততপক্ষে সপ্তাহখানেক বিহারে অবস্থান করতে হয়।

 


চুমুলাং

যখনই কোন চাকমা বিপদে পরে তখন বিপদে রক্ষা পাওয়ার জন্য ‘চুমুলাং’ মানত করে। দূর্যোগ কেটে গেলে তখন সে ঘটা করে চুমুলাং পূজা করে। চুমুলাং আসলে বিয়ের পূজা।

এই পূজায় একজন দেবী আর দুজন দেবতার পূজা করতে হয়। দেবীর নাম পরমেশ্বরী আর দেবতাদের মধ্য একজনের নাম কালাইয়া। আর অন্য দেবতার নাম শাস্ত্রে বলা হয় নি তাই একে শুধু “নাইনাঙ্গ্যা” অর্থাৎ অনামী বলা হয়ে থাকে।

এই দেবদেবীগণ আবার সর্বসিদ্ধি দাতারুপে ও পরিচিত হন। আগেকার দিনে তাই প্রায় গৃহস্থই বছরে একবার গৃহ দেবতার পূজার মতো চুমুলাং পূজা করতো। এজন্য এ পূজাকে অনেকে “ঘর-তাত্তা”বলে থাকে।

এটা অনেকটা বার্ষিকি উদযাপনের মতো যদিও ঠিক। বিয়ের দিন এটি করা হয় না। চুমুলাং পূজার উৎপত্তি সম্বন্ধে এক চমকপ্রদ কাহিনী আছে। স্মরনাতীত কালে চাকমাদের মধ্য বোধহয় চুমুলাং পূজা করা কিংবা লেককে খাওয়ানোর রেওয়াজ ছিলনা।

উপোরক্ত দেবতা কালাইয়া এই প্রথার প্রবর্তক যিনি পরমেশ্বরী দেবীর প্রথম স্বামী। কথিত আছে, পরমপশ্বরী দেবীকে বিয়ের পর কালাইয়া বাণিজ্যেদ্দেশ্য বিদেশ গমন করেন।

এজন্য কালাইকে সওদাগর ও বলা হয়ে থাকে। কথা থাকে যে, বারো বছরের মধ্য কালাইয়া ফিরে না আসলে পরমেশ্বরী দেবি সেচ্ছায় দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করতে পারবেন।

এখানে বিশেষ লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, সেই দূর অতীতে চাকমারা বিদেশে গিয়ে বাণিজ্যে করতো। কালাইয়া অবশ্য দৈবগতিকে ঠিক সময়ে ফিরিয়ে আনতে পারেন নি আর পরমেশ্বরী দেবী ও বার বছর পর আরেক জনকে বিয়ে করেন।

এরপর কালাইয়া ফিরে এসে দেখতে পান যে, তার স্ত্রী বেহাত হয়ে গেছেন। তখন তিনি চুমুলাং পূজা করে লোককে খাইয়ে সম্ভবত: তাদের মতামত নিয়েই স্ত্রীকে ঘরে ফিরে আনেন।

সেই থেকে বিয়ের সময় চুমুলাং পূজা করা হয় আর লোকজনকে খাওয়ানো চাকমা সমাজে প্রচলিত হয়ে গেলো। কালে কালে উপোরক্ত তিনজন ও এই পূজায় দেবদেবীর আসনে কায়েম হয়ে গেলেন।

এখন আর চুমুলাং না করে বিয়ের কাজ সিদ্ধ হয়না। আর যেনতেন প্রকারের একটা বিয়ের খানা দিতে হবে। অন্যথায় সেই লোকের মৃত্যু হলে তাকে কাঁধে করে শ্মশানে না নিয়ে হা্টুর নীচে ঝুলিয়ে অসম্মানজনক ভাবে শ্মশানে নেওয়াই বিধি।

চুমুলাং পূজায় মদ, তিনটি মুরগির বাচ্চা হলে ও ক্ষতি নেই, অধিকন্ত একটি শূকর লাগে। অভাব পক্ষে শুধু তিনটি মুরগির বাচ্চা হলে ও চলে। অঝা বা পুরোহিত ঘরের মধ্য চাটাইয়ের উপর ধান, চাল, কার্পাস ইত্যাদি পাশে নিয়ে দুটো পূজা সাজায়।

সামনে এক একটি সরষে তেলের পিদিম জ্বলে। তারপর পূজার শূকর আর মুরগিগুলো বলি দিয়ে অঝা সেগুলোর মাথায় এবং রক্ত মদ্য পানীয় সহযোহে পূজায় নিবেদন করেন।

অঝার পূজাপাঠ শেষ হলে স্বামী স্ত্রী জোডায় এসে পূজা প্রণাম করে। এই পূজায় সিদ্ধ অবস্থায় দ্বিতীয়বার ভোগ নিবেদন করতে হয়। এই শেষবার ভেগ দেওয়ার পর অঝা এবং পাড়ার বুড়োরা মিলে পূজার ফলাফল নিয়ে আলোচনায় বসে।

এই সময় ভোগের জন্য নিবেদিত সিদ্ধ ডিম মুরগির ঠ্যাং, মাথা ইত্যাদি নিয়ে অঝা দম্পত্তির শুভ অশুভ বিচারে প্রবৃত্ত হয়। এই পূজা মানসিক করার পূজা হলে তা’ দেবতার সন্তুষ্টি বিধান করে ভালোভাবে উত্তরে গেলো কিনা তাও নিরুপণ করা যায়। এই অনুষ্ঠানকে বলা হয় “চাম্বা চানাহ্।


অহ্ইয়া

অপুত্রক ব্যাক্তি কামনা বা অনেকগুলো পুত্র সন্তানের পর একটি মেয়ে পাওয়ার বাসনায়, আর্থিক সমৃদ্ধি কিংবা কোন বিপদ থেকে মুক্তির জন্য লোকে এই পূজা মানত করে। যদি মানস পূর্ণ হয় সে ঘটা করে এই পূজার অনুষ্টান করে।

এই পূজার বিশেষত্ব এই যে, অতপর: যতদিন সামর্থ্য কুলায় সে ততদিন এই পূজা করতে বাধ্য থাকে। যখন সামর্থ্য চলে যায় তখন সে দেবতাদের কাছে মাফ চেয়ে পূজার ইতি টানে। এই পূজাটা একটা মিশ্রিত বিশেষ অনুষ্ঠান।

এতে একাধারে চাকমা, ত্রিপুরা এবং মুসলমানী ধর্ম বিশ্বাসের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। এই পূজায় অহ্ইয়া,গরেইয়া এবং গাজী এই তিনজন দেবতার পূজা করা হয়ে থাকে।

এদের মধ্য অহ্ইয়া চাকমাদের,গরেইয়া ত্রিপুরাদের এবং মুসলমানরা গাজী পীরের পূজা করে থাকেন। এই পূজার জন্য প্রথমে উঠানে একপাশে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন জায়গায় একটা বড় বাঁশের চোঙা, ভিতরে একটা ডিম ঢুকিয়ে ,মাটিতে পোঁতা হয়ে থাকে।

তারপর পতাকা দণ্ডের মতো দীর্ঘ একটি বাঁশের দণ্ড আস্তে করে চোঙের ভিতর অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে খাড়া করানো হয়। ঐ দণ্ডে নতুন নতুন খাদি, যেগুলো চাকমা মেয়েরা বুকে জড়িয়ে বাধে, সারি সারি ঝুলানো হয়ে থাকে।

গৃহস্থ যত বছর এই পূজা করে, অনুক্রমে এই কাপড়গুলোর সংখ্যা ও বেড়ে যায়।এইভাবে কাপড়গুলোর সংখ্যা গুনে যে কেউ বলে দিতে পারবে গৃহস্থ কত বছর ধরে এই পূজা করে আসছে। পূজা শেষে কাপড়গুলো সযত্নে তুলে রাখা হয় পরের বছর ব্যবহারের জন্য।

পূজা শেষে বাঁশের দণ্ডটি নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এই পূজায় নয়টি মুরগি লাগে তন্মধ্য কমপক্ষে একটি মোরগ চাই। অধিক সঙ্গতি থাকলে এই পূজায় পাঠাও বলি দেওয়া হয়। অঝা বা পুরোহিত আগ পাতা ফেলে পূর্বোক্ত দণ্ডটির গোড়ায় এগুলো বলি দেয়। পূজা শেষে বলির মাংস রান্নাবান্না করে করে নিয়ন্ত্রিত অতিথিবর্গসহ মদ্যপানের মধ্য দিয়ে ভুরিভোজ চলে।


লেখকঃ শ্রী বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান

চাকমা পূজা পার্বণ, ১৯৮৯ ইং

আরো পড়ুন..

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ১)

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ২)

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ৪)

চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ (পর্ব – ৫)

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal