icon

নির্বাসন থেকে ফিরে দেখাঃ এক চাকমা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা

Sayak Chakma

Last updated Sep 1st, 2021 icon 4377

এই লেখাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের “ ঐতিহ্যগত জীবনধারা”-র শেষোক্ত দিনগুলোর বর্ণনা রয়েছে। লেখাটিতে বর্ণিত আছে এক চাকমার শৈশব এবং যৌবন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তার অন্তর্বেদনা, আতঙ্ক থেকে বাঁচার জন্য তার পালিয়ে বেড়ানো এবং শেষে ভিনদেশে তার পাড়ি জমানোর গল্প।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আমার শৈশব:

আমার পিতার দিককার প্রপিতামহরা (Great Grandfathers) ছিলেন দীঘিনালার নিবাসী[1]। তাঁরা ছিলেন লারমা গোজা এবং চার্ব্য গুত্তির লোক।

তাঁদের গ্রাম ছিল লারমা গোজার আবাসস্থল[2]। আমার মায়ের দিককার প্রপিতামহ দেওয়ানদের[3] অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তাঁর ভাইকে নিয়ে উত্তরের দিকে চলে যান এবং জঙ্গল পরিষ্কার করার পর সেখানে একটি গ্রামে বসতি গড়ে তোলেন[4]

আমার পিতার দিককার প্রপিতামহ তাঁর গ্রামেই থেকে গিয়েছিলেন। ফলে তাঁকে প্রতিবাদ কিংবা অভিযোগ ছাড়া দেওয়ানদের অত্যচার সহ্য করে যেতে হয়।

দেওয়ানরা সাধারণ লোকদেরকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভৃত্য-চাকরের কাজ করাতো, বিনা পারিশ্রমিকে শষ্যক্ষেতে কাজ, কাঠ কাটার কাজ, পানি আনার কাজ, আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে কাজ- এসব কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল[5]

চাকমাদের মধ্যে কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিকের রেওয়াজ ছিল না। তারা বিনা পারিশ্রমিকে একে অপরের ঘরবাড়ি বানানোর কাজে, জুম কাটার কাজে, ফসল বুনা এবং তোলার ইত্যাদি কাজে সাহায্য করত এবং এসব করা হতো পারষ্পরিক সহযোগিতা এবং সমান শ্রদ্ধাশীলতার ভিত্তিতে।

কিন্তু দেওয়ানরা কখনও সাধারণ চাকমাদের জন্য কোন কাজ করত না। তারা পারষ্পরিক সহভাগিতার ঐতিহ্যগত ধারণাকে উপেক্ষা করত (যে ব্যক্তি ধনসম্পত্তি পুঁজিত করে কিন্তু কারো সাথে ভাগাভাগি করে না, তাকে আমরা বলি ‘হুলি্’ , একজন কৃপণ ) এবং সাধারণ চাকমাদের গ্রামে বাস করে তারা নিজেদেরকে সাধারণ চাকমাদের কর্তা হিসেবে গড়ে তুলেছিল।

ছায়াচিত্রে একটি চাকমা গ্রাম, Photo Courtesy: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

দেওয়ানরা সাধারণ চাকমাদের আবেগ-অনুভূতিকে কখনও তোয়াক্কা করত না। অনেক সাধারণ চাকমা দেওয়ানদের গ্রাম থেকে পালিয়ে দেওয়ানদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিজস্ব স্বাধীন গ্রাম গড়ে তুলেছিল।

এই ধরণের কাজ চাকমা সমাজে প্রোথিত সাম্যবাদী (Egalitarian)  ধারণার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষার উপর জোর দেওয়া ছিল চাকমা সমাজের ক্রমাধিকারতন্ত্রকে টপকানোর আরেক মাধ্যম।

দেওয়ানদের অত্যাচার ছিল বাংলার জমিদারদের অত্যাচারের মতো। সাধারণ চাকমারা দেওয়ানদের সামনে ভালো জামাকাপড় কিংবা জুতা পরতে পারতো না।

সামাজিক এবং ধর্মীয় সব অনুষ্ঠানে সাধারণ চাকমাদের বসতে হত অধস্তন জায়গায় এবং বিশেষ সুযোগ-সুবিধাগুলো ছিল দেওয়ানদের জন্য বরাদ্দকৃত।

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সাধারণ চাকমারা টিনের চাল কিংবা ইটের তৈরি বাড়িঘর বানাতে পারত না। ভালো বাড়িঘর তোলার জন্য এবং ছেলেমেয়েদের ভালো শিক্ষাদানের জন্য অনুমতি লাগত।

সাধারণ চাকমা ছেলেদের জন্য শিক্ষা ছিল সীমাবদ্ধ। দেওয়ান এবং চাকমার মধ্যে বিয়ে হতে পারত না। দেওয়ানদের অত্যাচারের তালিকার নজির বেশ লম্বা, উল্লেখিত অত্যাচারগুলো তার কিছু উদাহরণ মাত্র।

এটি বলা চলে, সময়ের পরিক্রমায় দেওয়ানদের অত্যাচার এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে যে এখন একজন সাধারণ চাকমা কোন দেওয়ানকে বিয়ে করতে নাকচ করবে।

আমার পিতার দিককার প্রপিতামহ তার এক ছেলেকে রাঙ্গামাটির স্কুলে পাঠান। তিনি ছিলেন প্রবল আগ্রহপূর্ণ এবং পরিশ্রমী বালক, তিনি সাফল্যের সাথে সব পরীক্ষায় পাস করে হয়ে ওঠেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করা চাকমাদের প্রথম একজন।

সুশিক্ষিত ছিলেন বলে তিনি সিভিল সার্ভিসে চাকরি পান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারের জন্য অবদান রাখেন। চাকমাদের শিক্ষিত করে তোলা ছিল ওনার সারা জীবনের স্বপ্ন, তারা যেন দেওয়ানদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জেগে উঠতে পারে।

দেওয়ানদের অহংকার ভাঙার জন্য তিনি গ্রামের এক দেওয়ানকে বিয়ে করেন এবং যতটুকু সম্ভব তার স্ত্রীর আত্মীয়দের সাথে কম সম্পর্ক বজায় রাখেন। তিনি তার বউকে বাকি সব চাকমা বউদের মতো নদী থেকে পানি আনার কাজ, জ্বালানি কাঠ  সংগ্রহের কাজ ইত্যাদি করাতেন।

সাঙ্গু নদী, ডিসেম্বর ১৯৯০, Photo Courtesy: Jenneke Arens

উনাকে চাকমাদের মধ্যে শিক্ষার অগ্রদূত মানা হত। অনেকেই বলেন যে উনিই নাকি সেই লোক যিনি দেওয়ানদের অহংকার ভেঙে বাধ্য করেছেন সাধারণ চাকমাদের মত সমান হওয়ার জন্য।

উনার তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে বিভিন্ন প্রাইমারি স্কুল এবং তিনি সেখানে চাকমা শিক্ষক নিয়োগ দেন। চাকমা ছেলেমেয়েদের শিক্ষায় অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য তিনি গ্রামের পর গ্রাম সাইকেলে করে এবং অনেকসময় পায়ে হেঁটে ঘু্রে বেড়াতেন।

উনি ক্লান্তহীনভাবে পরিশ্রম করেছেন যতক্ষণ না উনি টি.বি. রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং উনার যাত্রা সেখানেই শেষ হয়ে যায়। তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

আমার পিতা যেসময় তাঁর পিতাকে হারান তখন তিনি ১০-১২ বছরের মাঝামাঝি বয়সের বালক ছিলেন। তিনি তার লেখাপড়া অনেক কষ্টে চালিয়ে নিয়ে যান এবং কলকাতা মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হন।

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ফলে তাঁকে মেডিকেল স্কুলে পড়া ছাড়তে হয়। পরে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষিবাহিনীতে যোগ দান করেন এবং লেফটেন্যান্ট পদপ্রাপ্ত হন। কয়েক বছর পর তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে সরকারি চাকরি করা শুরু করেন।

আমার মা-ও লারমা গোজা থেকে। তিনি ৮ সন্তানের পরিবারের দ্বিতীয়তম মেয়ে। আমার ছোট মামা ব্যতীত বাকি সব মামারা ছিলেন কৃষক।

শৈশবকাল:

আমার মায়ের আত্মীয়দের বসবাস ছিল মহালছড়ি এলাকায়, সেখানেই আমার জন্ম। গ্রামের লোকেরা ছিল সমতল ভূমির চাষী, তন্মধ্যে কয়েকজন ছিল জুমিয়া (জুমচাষী)। সেখানে কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং দিনমজুরও ছিলেন।

পঞ্চাশের দশকে গ্রামের লোকসংখ্যা বড়জোর ছিল ৩০০ জনের মত। ১৯৬৬ সালে যখন আমি পুনরায় গ্রামে যাই, তখন আমি সেখানে অনেক নতুন বসতি স্থাপনকারীদের অবস্থান দেখতে পাই। কাপ্তাই বাঁধের কারণে উদ্বাস্তুদের সংখ্যাই সেখানে বেশি ছিল।

আমার তিন ভাই এবং চার বোনের মধ্যে এক বোন ছিলেন সবার বড়। আর ভাইদের মাঝে জ্যেষ্ঠ আমি। আমার জীবনের শুরুর দিকে, ১৯৪০ সালের সময়, তখন আমরা পিতার কর্মসূত্রে পানছড়িতে বসবাস করতাম।

সেখানে আমাদের একটি বাড়ি ছিল। তখন এলাকাটি ছিল প্রধানত মারমা অধ্যুষিত। ছোট শহরতলীর চারদিকে ছিল অসংখ্য মারমা পরিবারের বসবাস। আমাদের পরিবারের সাথে তাদের সকলেরই অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আমার বড় বোন এবং আমাকে সকলেই অনেক স্নেহ করত।

আমার পিতা মারমা ভাষা সাবলীলভাবে বলে যেতে পারতেন আর সেজন্য তারা তাকে ভালোবাসত। প্রায়ই বাড়িতে তাদের তরফ থেকে শাকসবজী, ফল, উৎকৃষ্ট মানের চাল এবং বাড়িতে তৈরি মদ উপহার হিসেবে পাঠানো হত।

কিছুদিনের মাথায় আমার পিতাকে রাঙামাটি বদলী করা হয় এবং আমরা সপরিবারে জায়গাটি ছেড়ে যায়। রাঙামাটিতে আমরা থাকতাম আমাদের পিতার আত্মীয়স্বজনদের সাথে। আমাদের পানছড়ির বাড়ি এবং লাগোয়া ধানক্ষেতটি একজন মারমাকে প্রদান করা হয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।

শর্ত মোতাবেক সে প্রতি বছর ধানক্ষেতের ফলন থেকে কিছু চাল আমাদেরকে পাঠাচ্ছিল। কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পরে আমরা তার কাছ থেকে আর চাল পাইনি। আমার পিতা একজন উদার মনের মানুষ হিসেবে তাকে এ ব্যাপারে কোনো চাপ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

আমাকে ভর্তি করানো হয় ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত একটি খ্রিস্টান মিশনারী স্কুলে। আমার বড় বোন এবং একজন জ্যাঠাতো ভাইও আমার স্কুলে পড়ত।

আমাদেরকে চার্চের সিস্টার এবং ব্রাদাররা বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ে পাঠদান করতেন। কেবলমাত্র একজন চাকমা নারী সেখানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আমরা চার্চ থেকে মাঝে মাঝে নতুন কাপড়, মাখনের টিন এবং দুধ পেতাম। স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই ছিল চাকমা। তবে কিছু লুসাই শিক্ষার্থীও আমাদের সাথে পড়াশোনা করত। তারা বাস করত চার্চ সংলগ্ন ছাত্রাবাসে।

ছায়াচিত্রে বম পাড়ায় আখের ক্ষেত,
Photo Courtesy: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

পরবর্তীতে আমি জুনিয়র হাই স্কুলের প্রাথমিক শাখায় ভর্তি হই। নদীর তীরে অবস্থিত ইংরেজি এল আকৃতির একটি স্থাপনায় ছিল স্কুলটি।

স্কুলের দেওয়াল মাটির প্রলেপ দেওয়া আর চালা হিসেবে দেওয়া ছিল টিন। নদীর একদম উলটো পাড়ে আমার দাদার সরিষার শষ্যক্ষেত আর তার থেকে একটু দূরে উত্তরে আমাদের গ্রাম।

পানছড়িতে থাকাকালীন আমি আমাদের পিতামহ-পিতামহীর স্নেহেই দিন কাটিয়েছি। রামায়ণ ও মহাভারতের অনেক সুন্দর সুন্দর গল্প তারা আমাকে শুনিয়েছেন।

আমার পিতামহ গ্রামে পরিচিত ছিলেন একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে। গ্রামপ্রধান যাকে কার্বারি বলা হয়; তিনিও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পিতামহর সাথে বসে পরামর্শ করতেন।

তিনি সাধাসিধে জীবনযাপনে আগ্রহী ছিলেন। তবে তার দৃষ্টিভঙ্গী ও আদর্শে ছিলেন সুদৃঢ়। শেষ বয়সে এসে তিনি ধর্মের দিকে খুবই আকৃষ্ট হন এবং গ্রামে একটি বৌদ্ধ মন্দির গড়ে তোলা হলে সেখানেই দিনের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করতেন। আমার পিতামহী তার স্বামীকে অনেক মান্য করতেন।

বছরের শেষ দিকে উদযাপন হওয়া বিঝু উৎসব আমার অনেক প্রিয় ছিল। বছরের শেষ দুইদিন যথাক্রমে ফুলবিজু এবং মূলবিজু নামে পালিত হত।

ফুলবিজু অর্থ ফুল দ্বারা পালিত বিজু আর মূল বিজু দ্বারা মূল বিজু অনুষ্ঠানের দিন বোঝানো হয়। ফুলবিজুর দিন আমরা খুব ভোরে উঠে গোসল সেরে নিই, তারপর নতুন পোষাক পরিধান করি, পোষা মুরগিদের খাবার দিই, ফুল সংগ্রহ করি, বাড়িঘর সুন্দর করে সাজাই এবং পোষা প্রানীগুলোকে মালা পরিয়ে দিই।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলে আমরা বুদ্ধ মূর্তির সামনে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করি। মূলবিজু পালনের প্রথাও প্রায় একই; তবে সেদিন আমরা ফুল তুলি না।

প্রতিটি ঘরে ঘরে হালকা খাবারের ব্যবস্থা থাকে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা একসাথে দল বেঁধে দূরের গ্রামগুলোতে ঘুরতে যায়। তারা খুব গর্বের সাথে বলে বেড়ায় যে তারা অন্য গ্রাম থেকেও বিজুর খাবার খেয়ে এসেছে।

এদিনে সকলেই সবার গৃহে অতিথী বলে গণ্য হয়। একই গ্রামে থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ তার আত্মীয় বা বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে না যায় তাতে তারা খুবই দুঃখ পেয়ে থাকে। তবে তা হয় কদাচিৎ ।

দুপুরবেলায় গ্রামের অবিবাহিত তরুণীরা নদী বা কুয়া থেকে পরিষ্কার পানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। তা দিয়ে তারা গ্রামের বয়স্ক ও গুরুজনদের গোসল করিয়ে দেয়। তারপর গুরুজনেরা আশির্বাদ করেন যেন তরুণীরা সকলেই একদিন এক ভালো পরিবারের ভালো স্বামী পায়।

এ দিনটি বিজুর খাদ্যদ্রব্য ও মদজাতীয় পানীয় দ্বারা খুবই আনন্দের সাথে পালন করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরণের মদ তৈরি করা হয় শুধু এই দিনটির জন্যই।

এর পরদিনটি “গজ্জেপজ্জে দিন” নামে পরিচিত। যার অর্থ হচ্ছে “শুয়ে থাকার দিন”। এ দিনটি কেবলই বিশ্রামের। এ দিনে সাধারণত কোনো কাজ করা হয় না। তবে ঘরের মোরগ মুরগি জবাই করে ভোজের আয়োজন করা হয় এবং তাতে আত্মীয়স্বজনেরা আমন্ত্রিত হন।

রাঙামাটি থেকে আগরতলার উদ্দেশ্যে আমার প্রথম যাত্রা:    

১৯৭১ সালে আমি ছাত্রাবস্থায় ঢাকায় অবস্থান করছিলাম। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে আমি ৮ই মার্চ ঢাকা ত্যাগ করি।

আদিবাসী জনগোষ্ঠী স্বতস্ফূর্তভাবে আওয়ামী লীগের আহবান করা অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন দেয়। আওয়ামী লীগের নায্য দাবিতে সমর্থন থাকা সত্ত্বেও জাতীয় নির্বাচনে দলটি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে কোনো আসনে জয়লাভ করতে ব্যর্থ হয়।

২৫শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতারের পরপরই এ আন্দোলনটি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের আন্দোলন হিসেবে রূপলাভ করে।

এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নেতৃবৃন্দ আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। আমার স্মরণে আছে শ্রী এম এন লারমা[1] মুক্তিযুদ্ধকালীন দাতব্য তহবিল গঠনে কাজ করছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মাঝেই বাঙালি ও পাহাড়িদের মাঝে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়।

তৎকালীন কোনো আদিবাসী নেতাকেই নেতৃত্বের পদ দেওয়া হয় নি। আমার ছোট ভ্রাতা এবং একজন জ্যাঠাতো ভাই উভয়েই রাইফেল বা অস্ত্র চালনা প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশগ্রহণ করেছিল। এটি আয়োজন করা হয় আওয়ামী লীগ এবং স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক। কিন্তু তাদের অভিযোগ, বাঙালি যুবকেরা সত্যিকার রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণ নিলেও আদিবাসী যুবকদের দেওয়া হয় কাঠের তৈরি ডামী রাইফেল (Dummy Rifle)।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে চট্টগ্রামের পতন হয়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং বাঙালি বিদ্রোহী সামরিক অফিসারগণ রাঙ্গামাটি হয়ে ভারতে চলে যান। যাওয়ার সময় তারা রাঙ্গামাটি ট্রেজারির সকল টাকা সাথে নেন।

এমনকি বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান (যিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ছিলেন একজন মেজর পদস্থ কর্মকর্তা) পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিতর দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। চাকমা এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর লোকজন তাদেরকে খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত পৌঁছাতে সাহায্য করে। 

ছায়াচিত্রে কাপ্তাই হ্রদ,
Photo Courtesy: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

উক্ত ব্যাপারে আমি একটা ঘটনার বিবরণ দেব। আশা করি তা প্রসঙ্গের সাথে অতটুকু অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

জনাব জিয়াউর রহমানকে ভারত বর্ডার পার করে দেওয়ার জন্য প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছিলেন শ্রী মৃগাঙ্ক চাকমা নামে একজন পাহাড়ি। তিনি ছিলেন কমলছড়ি গ্রামের বাসিন্দা।

তিনি জনাব জিয়াকে নিজের পিঠে করে নদী পার করে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৮ সালে এই শ্রী মৃগাঙ্ক চাকমাই জিয়ার অনুগত সামরিক বাহিনীর সদস্যদের হাতে শান্তিবাহিনী সদস্য সন্দেহে আটক এবং নিহত হন।

বিজু উৎসব পালনের পরপরই আমরাও ভারতীয় সীমান্তের দিকে অগ্রসর হতে থাকি। সেখানে আমাদের এক জ্যাঠা ছিলেন। আমরা তার বাড়িতে এক রাত থাকি এবং ভারতে থাকা তার কিছু বন্ধুর ঠিকানা সংগ্রহ করি।

এরপর পায়ে হেঁটে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। আমার জ্যাঠার পরামর্শ মোতাবেক উত্তরের পাহাড়গুলো পার হয়ে যাওয়া ছিল ভারতের আগরতলা পৌছাবার সবচেয়ে সহজ উপায়।

পাহাড় পার হলে সামনেই বিস্তীর্ণ ভারত সীমান্ত। পাহাড়টি পার হওয়া ছিল আমার জীবনের সবথেকে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা। রীতিমত এক গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উত্তপ্ত ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আমরা পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও সরু পথ ধরে হেটে যাচ্ছিলাম।

আমরা এ পাহাড়ের ঢালের মানববসতির চিহ্ন দেখে যারপরনাই বিষ্মিত হই। কিছু সংখ্যক চাকমা ও ত্রিপুরাদের বসবাস ছিল সেখানে। মূলত এরা ভূমিহীন চাষী। আমরা দুটো পাহাড় পার হই। যার মধ্যে একটি পাহাড় এতটাই খাড়া যে একটা মাত্র ভুল পদক্ষেপে এক হাজার ফুট নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল তারিখে আমরা সীমান্তে পৌঁছাতে সক্ষম হই। এরপর আমরা সীমান্তের নিকটবর্তী একজন চাকমা ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নিই। তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তি ছিলেন। তার বাড়িতে আমরা খাবার ও পানি গ্রহণ করি এবং বিশ্রাম নিই।

তিনি আমাদের কি করে সীমান্ত পার হতে হবে সেই পরামর্শও প্রদান করেন। আমাদের হাতে তখন ছিল বাংলাদেশী মুদ্রা টাকা। তার সহায়তায় আমরা টাকাগুলোকে ভারতীয় মুদ্রা বা রূপির সাথে বদলিয়ে নিই।

আমরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে আমাদের নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করিয়ে ছাড়পত্র নিয়ে নিই। এ কাগজ ছাড়া বিএসএফ (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী) কাউকে বর্ডার পার হতে দেয় না।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ নাগাদ আমরা ভারত সীমান্ত পার হই এবং সীমান্তের অন্য পারের নিকটবর্তী বিএসএফ চেকপোস্টে যোগাযোগ করি। গোটা সীমান্ত এলাকা জুড়েই ছিল মারমা সম্প্রদায়ের গ্রাম। আমরা লক্ষ্য করেছি যে তাদের স্বভাব অত্যন্ত নম্র।

আমরা অবশেষে আগরতলা শহরে পৌঁছাই। সেখানে আমাদের এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়ি খুজে বের করতে সক্ষম হই। আমাদের আত্মীয় আর্থিকভাবে কিছুটা অসচ্ছল হলেও তিনি আমাদেরকে সাদরেই বরণ করে নেন।

আমরা ভেবেচিন্তে বুঝতে পারি যে কারো আশ্রয়ে থাকা উচিত নয়। সিদ্ধান্ত হয় নিজেরাই নিজেদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে নেওয়ার। আমরা চারদিকে অসংখ্য চাকমা সম্প্রদায়ের শরনার্থীর দেখা পাই।

তাদের সাথে আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথাবার্তা হয়। আমাদের আগরতলা পৌছাবার পরদিনই আমরা একজন চাকমা ব্যক্তির বাড়িতে নিমন্ত্রণ পাই। সে ব্যক্তি ছিলেন আমার সফরসঙ্গী বন্ধুবরের একজন আত্মীয়।

চাকমারা সাধারণত দূর থেকে আসা আত্মীয়দেরকে নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানায় এবং নানান খাদ্যদ্রব্যের সাথে আপ্যায়ন করে। এটি চাকমা সম্প্রদায়ের একটি প্রথা। যার মাধ্যমে আমাদের পারষ্পরিক বন্ধন আরো সুদৃঢ় হয়।

কর্ণফুলী পেপার মিল, Photo Courtesy: Philip Gain

আমরা ইতোমধ্যে জানতে পারি যে আগরতলায় আওয়ামী লীগ একটি কার্যালয় স্থাপন করেছে। তারা কার্যালয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং তাদের সমন্বয় করা হচ্ছিল। আমরা সে সময়কালে কোনো কাজ খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

হাত গুটিয়ে বসে না থেকে আমরা সেখানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেওয়ার সংকল্প করলাম। একদিন আমাদের এক বন্ধু স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগদান করতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতা আমাদের ব্যক্ত করে। “তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা কিংবা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের কাউকেই স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গ্রহণ করে না”- তার এ বক্তব্যে হতাশার সুর ছিল লক্ষণীয়।

এর প্রেক্ষিতে আমরা সকলে অনেক আশাহত হই। রাঙামাটি ফিরে গিয়ে নিজেদের বাড়িতে নিজেদের খাবার খেয়ে দিনাতিপাত করার চিন্তাও করতে থাকি। তখন অতিথী হিসেবে আত্মীয়ের বাড়িতে এতদিন থাকাটা বেমানান মনে হচ্ছিল।

যদিও আমাদেরকে তারা সাদরে গ্রহণ করেছিলেন এবং আতিথেয়তা ও আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখেন নি। আমাদের আত্মীয়ের বাড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এসে অনেকেই উপস্থিত হতেন।

কিন্তু আমাদের অবস্থানরত দেখে তারা দু একদিনের মধ্যেই চলে যেতেন।  “যা হবে তাই হোক, আমরা ফিরেই যাব” – অবশেষে আমরা এ সংকল্প নিই।

পাকিস্তানের শাসনাধীন অসহায়ত্ব:

আমরা যে রাস্তায় ভারতে পালিয়েছিলাম ঠিক সেই রাস্তা দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রামে ফিরে আসি। তবে আমরা বিএসএফ জওয়ানদের সন্তর্পনে এড়িয়ে যাই। আমরা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারত ত্যাগ করি।

এ সময় স্থানীয় লোকজন আমাদেরকে সহায়তা করে। আমরা আবারো সেই কলজে কাঁপানো খাড়া ও উঁচু পাহাড় অতিক্রম করি। আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা এবং বন্ধুদেরকে আত্মীয়স্বজনের কাছে রেখে আমি রাঙামাটি এসে পৌঁছাই।

আমাকে এবং অন্যান্য যাত্রীদের বহনকারী স্টিমারটি ডিসি ঘাটে এসে ভিড়তেই কিছু সৈন্য এসে যাত্রীদের তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদে শুরু করে। কয়েকজনকে ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিছুসংখ্যক যাত্রীকে আটক করা হয়।

আমি একজন ছাত্র তা জানার পর একজন সৈন্য আমাকে আঘাত করে। কিন্তু আমাকে তারা আটকায় নি। আমি বাড়ি ফিরি এবং বাবা মা ও ভাইবোনদের সুস্থ ও নিরাপদেই দেখতে পাই।

তবে আমার ছোট ভাইকে (তৎকালীন রাঙামাটি কলেজের ছাত্র) প্রতিদিন সামরিক বাহিনীর ক্যাম্পে হাজিরা দিয়ে আসতে হত। শুধু তাই নয়, আমার পিতার বন্দুকটিও তারা বাজেয়াপ্ত করেছিল।

জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী জুম্ম আদিবাসী নারীবৃন্দ,
Photo Courtesy: Philip Gain

আমি আমার প্রত্যক্ষ করা অভিজ্ঞতা সবাইকে জানাই। আমি জানতে পারি যে চাকমা রাজা টি রায়  (ত্রিদিব রায়) এর ভূমিকার জন্য বেসামরিক জনগণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছে। এ কথা আমি আমার পিতামাতা এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে জানতে পারি।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সকল নেতা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর রাজা ত্রিদিব রায় একটি সভা আহবান করেন। এখানে রাঙামাটির আদিবাসী ও অ-আদিবাসী সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে রাঙামাটি শহরে প্রবেশের আহবান জানানো হবে।

রাজা ত্রিদিব রায় ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের নেতারা একত্রে গিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সাদরে অভ্যর্থনা জানায়। শহরে প্রবেশ করে পাক বাহিনী অনেককে হত্যা করে এটা ঠিক। কিন্তু তারা আদিবাসী ও মুসলিম যারা আওয়ামী লীগ সমর্থক নয় তাদের কোনো ক্ষতি করেনি।

কয়েক মাস কেটে যায়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ঘোষণা দিয়ে পুনরায় শুরু হয়।  শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানানো হতে থাকে। এ অবস্থায় আমি দোটানায় পড়ে যায়।

আমি যদি নির্দেশ অমান্য করে রাঙামাটি থেকে যাই তখন সেনাবাহিনী আমাকে আটক করতে পারে কেননা আমি ঢাকার একজন ছাত্র। তার উপর আমার ফাইনাল পরীক্ষার দিনতারিখও ঘোষিত হয়। আমি পিতামাতার সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিই ঢাকা চলে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাবার।

এদিকে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়ার রাস্তা ধ্বংস হয়। উপায় না থাকায় আমি বিমানে করে ঢাকা এসে পৌঁছাই।

ক্লাসে আমি খুব অল্প সংখ্যক শিক্ষার্থীরই দেখা পাই, বেশিরভাগই ছিল অনুপস্থিত। একদিন শ্রেণীকক্ষে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। শত প্রতিকূলতার মাঝেও আমি আমার বিএ ডিগ্রীর জন্য প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে থাকি।

দ্বিতীয়বারের ভয়াল যাত্রা, ঢাকা থেকে রাঙামাটিঃ

ডিসেম্বর মাস, ১৯৭১ এ ঢাকা বিমানবন্দরে তুমুল গোলাবর্ষণ হয়। জনসাধারণকে ঢাকা ত্যাগের আহবান জানিয়ে ভারতীয় বিমান থেকে অসংখ্য প্রচারপত্র (Leaflet) ফেলা হয়।

আমার সহপাঠীরা পরীক্ষা ফেলে রেখেই ঢাকা শহর ত্যাগ করে। ৩রা ডিসেম্বর আমি সদরঘাট যাই। আমি চট্টগ্রামগামী একটি স্টিমারে উঠব এটিই ছিল আগে থেকে ঠিক করা। কিন্তু প্রচণ্ড যুদ্ধের কারণে ঘাটটি আগে থেকেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সেখানে ক’জন বাঙালির সাথে আমার আলাপ হয়। তারাও চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। আমি তাদের সাথে যোগ দিই একমাত্র আদিবাসী ব্যক্তি হিসেবে। একটি ট্যাক্সি নিয়ে আমরা প্রথমে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছাই।

সেখান থেকে নৌকায় চড়ে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। আমরা চাঁদপুরে পৌছালেও সেখানে বিমান হামলা চলাকালীন থাকায় আমরা দ্রুত সরে যায়।

এক একজন এক এক দিকে চলে যান। কয়েক ঘন্টা পর আমি আমাদের দলের সবাইকে খুঁজে পাই। তারপর আমাদের আরেকটি ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক যাত্রা আরম্ভ হয়।

কিছু সময় পায়ে হেঁটে ও কিছুটা রিকশা দিয়ে আমরা ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকি।

রাস্তায় আমরা অসংখ্য মৃতদেহ প্রত্যক্ষ করি। শকুনের ঝাঁক দলবেঁধে এসে লাশগুলোকে খুবলে খুবলে খাচ্ছিলো।

সীতাকুণ্ড পৌছালে আমরা মুক্তিবাহিনীর হাতে আটক হই। আমার ভ্রমণসঙ্গীদের সামান্য জিজ্ঞাসাবাদ করেই অব্যাহতি দেওয়া হয়।

চাকমা গ্রাম,
Image Source: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

কিন্তু আমাকে আটকানো হয় একটি আলাদা কক্ষে। প্রায় এক ডজন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে ঘিরে ছিলেন। তাদের মধ্যে সকলেই সশস্ত্র এমনকি অনেকে তাদের অস্ত্র উদ্যত করে রাখে আমার দিকে।

তারা আমাকে গালিগালাজ করতে থাকে। তারা আমাকে একপর্যায়ে মারধোরও করে। আমি রীতিমত বাঁচার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম। অত্যাচারের এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।

জ্ঞান ফিরলে আমি আমার একজন সহযাত্রীকে দেখতে পাই। তার সাথে যাত্রাপথে আমার বেশ হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

সেই সহযাত্রীটি মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝাতে চেষ্টা চালাচ্ছিলেন যে তারা আমাকে বহুদিন যাবৎ চেনেন এবং আমি বহু আগে থেকেই আওয়ামী লীগের একজন সমর্থক।

মুক্তিযোদ্ধারা সে কথায় মোটেই কর্ণপাত করেনি। তারা সাফ জানিয়ে দেয় যে তাদের নেতা না আসা পর্যন্ত আমাকে ছাড়া হবে না।

সেই নেতা উপস্থিত হন এবং কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেই আমাকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি যে একজন ছাত্র নেতা ছিলেন তা আমি পরে জানতে পারি।

সেখান থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে আমি আমার সহযাত্রীদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। তারা সত্যিই আমাকে অনেক সাহায্য করেছিল।

এ ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের বাহিনীকে আমরা এড়িয়েই সামনে অগ্রসর হবো।

বোমাং সার্কেলে বৌদ্ধ বিহার,
Image Source: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

আমরা জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা ধরে রাউজানের কিছুদূরে এসে পৌঁছাই। সেখানে যে আরেকটি মুক্তিবাহিনীর শিবির ছিল তা সম্পর্কে আমরা জ্ঞাত ছিলাম না।

তারা আমাদের থামতে বলে এবং আমাকে আটক করে। আমাকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেটি ছিল একটি পরিত্যাক্ত বিদ্যালয়। তাদের ভাষ্যমতে আদিবাসী বৌদ্ধ রাজারা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সহায়তাকারী এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী।

তারা বলতে থাকে যে এর আগেরদিন একজন আদিবাসী গুপ্তচরকে আটক করে তারা তাকে হত্যা করে। তারাও আমাকে গুপ্তচর ভেবে নেয়।

কিন্তু এবার তারা মারধোরের চেয়ে মানসিকভাবে আমার উপর নির্যাতন চালাতে থাকে। ঘন্টার পর ঘন্টা তারা আমার দিকে অস্ত্র তাক করে রাখে।

আমাদের দলটির বন্ধুবৎসল সহযাত্রীটি এবারও এগিয়ে আসেন আমাকে রক্ষা করতে। তিনি মুক্তিবাহিনী ক্যাম্পের একজন নেতার সাথে কথা বলেন এবং আমার ব্যাপারে তাকে নিশ্চিত করেন। আমি বিকাল নাগাদ ছাড়া পাই।

আমার অনুরোধে মুক্তিবাহিনী থেকে আমাকে একটি পাস বা ছাড়পত্র প্রদান করা হয়। যেন ভবিষ্যতে অনুরূপ হয়রানি ও বিড়ম্বনা থেকে আমি বেঁচে যাই।

আমি আমার বন্ধুপ্রতিম সহযাত্রীর প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ ও ঋণী। ছাড়া পাবার পর আমাদের দলের সকলকেই আমি খুশি হয়ে উঠতে দেখি।

স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য মতে রাউজান থেকে রাঙামাটির সড়কটির পুরোটাই ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এখান থেকে আমার গন্তব্য আলাদা হয়ে পড়ে।

আমার সহযাত্রী ও বন্ধুরা অন্য আরেকটি পথে তাদের গন্তব্যে আগাতে থাকেন। আমরা একে অপরের ঠিকানা আদানপ্রদান করি। পরবর্তীতে একে অপরকে চিঠি পাঠাব এ প্রতিজ্ঞা করে আমি বিদায় নিই।

তাদের ছেড়ে আসার পর আমি আমার ছাড়পত্রটি (Pass) জুতার মধ্যে লুকিয়ে রেখে বাস স্টেশনের দিকে যেতে থাকি। পথিমধ্যে চিৎকার শুনি, “হল্ট!”। এক পাকিস্তানী সৈন্য সশস্ত্র অবস্থায় আমার দিকে এগিয়ে আসে।

ঐতিহ্যবাহী দাবায় (বাঁশের তৈরি হুক্কা বিশেষ) তামাক সেবনরত চাকমা ব্যাক্তি, বেতছড়ি, খাগড়াছড়ি জেলা; Image Source: Christian Erni

তার হাতে থাকা লাঠি দিয়ে সে আমাকে আমার ব্যাগ খোলার নির্দেশ দেয়। আমি তার নির্দেশ মেনে ব্যাগ খুলে তাকে সব দেখাই। কিন্তু ভিতরে ভিতরে আমি ভয়ে কাঁপছিলাম ঠিকই। কারণ আমার কাছে ছিল মুক্তিবাহিনীর দেওয়া ছাড়পত্র।

আমাকে বরাবরের মতই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন একজন ব্যক্তি যিনি সৌভাগ্যক্রমে স্থানীয় চেয়ারম্যান। তিনি আমাকে দেখে আমাকে সাহায্য করতে আসেন। অথচ আমাদের দুজনের মধ্যে কোনো পূর্বপরিচয়ই ছিল না।

ঐ ব্যক্তি পাকিস্তানী সৈন্যটির কাছে আমাকে চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সম্প্রদায়ভুক্ত বলে পরিচয় দেন। তিনি এও বলেন যে ত্রিদিব রায় পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তা করে আসছেন।

এ বক্তব্যে সৈন্যটি খুব একটা সন্তুষ্ট না হয়ে অনিচ্ছার সাথেই আমাকে যেতে দেয়। চেয়ারম্যান আমাকে অতিসত্বর আমাকে এলাকা ত্যাগ করার পরামর্শ দেন।

অন্যথায় আবারও আটক হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। অনেক সময় পাকিস্তানী সৈন্যরা মূল্যবান জিনিস লুট করার জন্যও অনেককে আটক করে থাকে।

সৈন্যটির চোখের আড়াল হতেই আমি দৌড়াতে থাকি। ছোট একটা ট্যাক্সি ধরতে সক্ষম হই এবং তাতে চড়ে আমি একটা মারমা গ্রামের রাস্তার সামনে এসে পৌছালাম। গ্রামটির নাম ছিল “তারাবন্যে মগ পাড়া”।

পালিয়ে বেড়ানো এবং বারবার আটক হওয়ার ঘটনায় আমি অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। জঙ্গলের রাস্তায় এসে যে কাজটি সবার আগে করলাম তা হল ছাড়পত্রটি চিড়ে টুকরো টুকরো করে উড়িয়ে দেওয়া।

মনে হচ্ছিল কোনোরকম কাগজপত্র না থাকাই আমার জন্য সুবিধাজনক। একজন মারমা ব্যক্তি আমাকে তার বাড়িতে আশ্রয় দেন। তার উষ্ণ আতিথেয়তায় আমি যেন ভ্রমণকালীন সকল দুর্দশাই ভুলে যাই।

তিনি আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বড় গ্রামে পৌঁছাতে সহায়তার জন্য একজন পথপ্রদর্শককে সাথে দেন। গ্রামটি ছিল চট্টগ্রাম-রায়ানোক সড়কে এবং ঘাগড়া নামে পরিচিত। ঘন জঙ্গলে আচ্ছাদিত ছিল সেই গ্রামে পৌছাবার রাস্তা।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আদিবাসীরা যে কাউকেই বিপদের সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করত না। হোক সেই ব্যক্তি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা বাঙালি।

সুরিদাত পাড়ায় চাকমা গ্রাম, খাগড়াছড়ি জেলা, Image Source: Christian Erni

১৯৭১ সালে ভারতগামী বাঙালিদের স্থানীয় আদিবাসীরা সর্বাত্মক সাহায্য সহযোগিতা করেছে। অথচ সমতলের নোয়াখালি, চট্টগ্রাম এবং কুমিল্লা জেলার দিকে  সীমান্ত পাড়ি দেওয়া বাঙালিদের সহায় সম্বল চুরি আর লুট করে নিয়ে যায় সেখানকার বাঙালিরাই।

ঘাগড়া পৌঁছাবার পর আমি আরেকটি ট্যাক্সিতে করে রাঙামাটির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। ৮ অথবা ৯ ডিসেম্বর নাগাদ আমি রাঙামাটিতে আমাদের বাড়িতে এসে পৌঁছাই।

আমার পিতামাতা ও আত্মীয়স্বজন আগ্রহ নিয়ে আমার যত গা শিউরে ওঠা যাত্রার কাহিনী শুনলেন। আমার নিরাপত্তার তাগিদে আমাকে তারা পরামর্শ দিলেন।

তারা বলেন আমাকে শ্রমণ (শিক্ষানবিশ ভিক্ষু) হয়ে যেতে, যা আমার জন্য সবথেকে নিরাপদ বলে প্রতীয়মান হচ্ছিল।

যেহেতু আমি নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি, সেজন্য আমার উচিত বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে শ্রমণ হওয়া এবং আমাকে রক্ষাকারী মঙ্গলকারী ও কল্যাণকর ধর্মের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার। এতে করে হয়ত অন্যান্য ঝামেলা থেকেও আমি মুক্ত থাকতে পারব।

ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত হই। বিহার বা কিয়াং এর প্রধান ভান্তে (ভিক্ষু) আমার মাথা মুড়িয়ে দিয়ে হলুদ রঙ এর কাপড় (চীবর) প্রদান করেন।

আমি নিজেকে পরিষ্কার করে গোসল করি, হলুদ চীবরটি গায়ে জড়াই এবং শ্লোক উচ্চারণের মাধ্যমে শ্রামণ্য ধর্ম গ্রহণ করি।

প্রথমদিকে এ জীবনে আমার বেশ কষ্টই হত। ভিক্ষু এবং শ্রমণেরা বেলা ১২ টার পর থেকে কোনো খাদ্য গ্রহণ করতেন না। ফলে রাতে উপোস থাকা শুরুতে সমস্যা হলেও কিছুদিন পরে আমার অভ্যাস হয়ে যায়।

এ বিহারে আমি আদিবাসীদের হত্যা ও উচ্ছেদের অজস্র ভয়াবহ কাহিনী শুনি। রামগড় মহকুমা (Sub-division) (বর্তমানে খাগড়াছড়ি) এর ফেনী ভ্যালিতে এ ঘটনাগুলো ঘটে।

ইতিপূর্বে ভারত যাওয়ার আগে যে ব্যক্তির বাসায় আমি কিছুদিন থেকেছিলাম, তিনি বর্তমানে নিঃস্ব ও ভূমিহীন। অন্যান্য বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের সহায়তায় তিনি জীবনযাপন করছিলেন।

অথচ তিনি ছিলেন একজন অবস্থাসম্পন্ন ব্যক্তি। যুদ্ধের শেষদিকে সেই এলাকায় উগ্র বাঙালি আগ্রাসন শুরু হয়।

এ সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা স্থানীয়দের উপর হামলা চালায়। যার একমাত্র কারণ ছিল যে স্থানীয় বাসিন্দারা আদিবাসী। তারা অনেককে হত্যা করে এবং জমিজমা ঘরবাড়ি থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে।


বেইন বুননরত চাকমা নারী, Image Source: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

আমাদের পরিচিত ব্যক্তিটিও এর শিকার হন। শুধু ফেনী ভ্যালি নয়, চেঙ্গী ভ্যালির দিকেও মুক্তিবাহিনী গিয়ে নিরীহ আদিবাসীদের গ্রামে হামলা চালায়। তারা অগণিত মানুষকে অত্যাচার করে এবং হত্যাও করে।

তবে হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ায় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের উপর কোনো আক্রমণ চালানো হয় নি। মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিল চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়। আমরা খবর পাই যে রাজস্থলীতে  (চন্দ্রঘোনা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে)  একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা হত্যা করেছে।

সেদিকের মারমা অধ্যুষিত গ্রামগুলোর লোকজন প্রাণভয়ে বার্মা (মিয়ানমার) এর দিকে পাড়ি জমাচ্ছিল।

তখনও পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী রাঙামাটি পৌঁছায় নি। ১৩ই ডিসেম্বর একদল ভারতীয় সেনাসদস্য কিছু তিব্বতী সৈন্যকে সাথে নিয়ে রাঙামাটি শহরে প্রবেশ করে।

মিজো গেরিলারা তার আগেই রাঙামাটি শহর ছেড়ে পালাতে চেষ্টা চালায়। অধিকাংশই পালিয়ে যেতে পারলেও কয়েকজন গ্রেফতার হয়। এদিকে কিছু আওয়ামী লীগ নেতা চেষ্টা চালায় চাকমা রাজার রাজবাড়িটি পুড়িয়ে দিতে।

এ কথা উল্লেখ্য যে শেষদিকে কর্তৃপক্ষ চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়কে পাকিস্তানের দূত হিসেবে  বিদেশে প্রেরণ করে। তার উপর দায়িত্ব ছিল বৌদ্ধ দেশগুলি থেকে পাকিস্তানের পক্ষে সমর্থন আদায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সময়কালে তিনি বিদেশেই অবস্থান করছিলেন।

চাকমারা শুরু করে তাদের আগের বসতি ছেড়ে আরো ঘন জঙ্গলের দিকে গিয়ে বসবাস করতে। আর মারমারা বান্দরবান মহকুমা (Sub-division) দিয়ে বার্মার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময়কালে মুক্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে রীতিমত ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে ফেলে।

তৃতীয়বারের পরিত্রাণ, রাঙামাটি থেকে বার্মাঃ

তখনও ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাস চলছে। এদিকে আমি অব্যাহত হত্যা, নির্যাতন আর উচ্ছেদের যত খবর পাচ্ছিলাম ঠিক তত বেশি উত্তেজিত, ভীত এবং শঙ্কিত বোধ করছিলাম।

আমার এক ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বন্ধুর সাথে আমি প্রায়ই আলাপ করতাম। বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা[1] দের হাতে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সার্বিক অবস্থা কি হতে চলছে এ নিয়েও আমরা দুজন কথা বলতাম।

“আমরা কিভাবে বাঁচতে পারি? পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাগ্যে কিই বা লেখা আছে? বাঙালিরা আমাদের নির্মূল করেই ছাড়বে। পাহাড়ি আদিবাসীরা পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে[2] সাহায্য করেছিল- এ অজুহাত দিয়ে পাহাড়িদের উপর হামলা, হত্যা ও ভূমি থেকে উচ্ছেদের পাঁয়তারা করা হচ্ছিল”।

ভোরের কাপ্তাই হ্রদ, Image Source: Andreas Torhaug/ Flickr

এ জিজ্ঞাসাগুলো প্রতিটা মুহূর্ত অন্তর্দগ্ধ করছিল আমাদের। আমরা রাঙামাটিতে থাকাটা নিজেদের জন্য নিরাপদ বলে মনে করছিলাম না।

তখনও শহরটিতে ভারতীয় সৈন্যদের অবস্থান ছিল। কিন্তু তারা চলে গেলেই বাঙালি মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সম্ভাবনাই ছিল অধিক।

একজন চাকমা ভিক্ষুর সাথে আমাদের একদিন দেখা হল। তিনি বার্মা (মিয়ানমার) এ পালিয়ে যাচ্ছিলেন এবং আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করলেন তাঁকে অনুসরণ করার।

কিন্তু আমরা তখন ছিলাম কপর্দকশূণ্য। তাই আমরা তার সাথে যেতে পারলাম না।

তারপরেও তিনি আমাদেরকে পথ চিনিয়ে দিলেন এবং জানালেন কোথায় গেলে তাঁকে পাওয়া যেতে পারে।

তিনি আরো জানালেন যে তিনি আমাদের জন্য চট্টগ্রাম এবং বার্মার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে সাহায্যের বার্তা জানিয়ে যাবেন। 

এরপর আমরা কিছুদিন চেষ্টা করে কিছু অর্থ জোগাড় করলাম। রাঙামাটি ছেড়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হল।

আমরা কক্সবাজারে পৌঁছে একটি কিয়াং (বৌদ্ধ বিহার) এ আশ্রয় নিলাম। পরেরদিন আমরা আবারও বের হই এবং বেশ কিছুদূর পাড়ি দিয়ে বার্মার সীমান্তে এসে পৌঁছাই।

পরিচিত ভিক্ষুর নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা নিকটবর্তী একটি বৌদ্ধ বিহারের প্রধান ভিক্ষুর সাথে কথা বলি।  

তিনি আমাদের বক্তব্য শোনেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দুঃখ দুর্দশার জন্য আন্তরিকভাবে সমবেদনা প্রকাশ করেন।

তাঁর মতে দুর্ভাগ্যবশত পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা সংগঠিত নয়, যার কারণে তারা একতাবদ্ধ হয়ে হত্যাযজ্ঞ ও উচ্ছেদের প্রতিবাদে লিপ্ত হতে পারে না।

এরপরে প্রধান ভিক্ষু আমাদেরকে সীমান্ত পার হওয়ার জন্য সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস  প্রদান করেন।

তার পরদিন বেলা প্রায় ১২টার দিকে আমরা একদল মারমার সাথে সীমান্ত পার হই। ইতিপূর্বে প্রধান ভিক্ষু আমাদেরকে মারমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন এবং আমাদেরকে সাহায্য করতে তাদের অনুরোধ করেন।

নাফ নদ পার হলেই আমরা স্টিমার পেয়ে যাব, যা সেখান থেকে মঙডু (Maungdaw) (একটি বার্মিজ সীমান্তবর্তী শহর) এর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। নদী পার হওয়ার আগে আমরা আমাদের সাথে থাকা টাকা বদলে নিই।

দুই ম্রো শিশু, Image Source: JCH Travel/ Flickr

স্টিমারটি আনুমানিক ২টার দিকে এসে পৌঁছায় এবং আমরা তাতে উঠে বসি।

সেখানে কিছু বার্মিজ পুলিশ সদস্য দেখে আমরা চিন্তিত হয়ে পড়ি; কিন্তু আমাদের মারমা সাথীরা আমাদের সাথে তৎক্ষণাৎ আরাকানী ভাষায় কথা বলতে থাকে।

যেহেতু আমরা সেই ভাষা জানতাম না, সে কারণে আমাদের কথাবার্তা ছিল একপাক্ষিক। কিন্তু এ পন্থায় আমাদেরকে পুলিশেরা কোনো সন্দেহ করে নি।

দুই থেকে তিন ঘন্টার মধ্যেই আমরা মঙডু (Maungdaw) পৌঁছালাম। আমাদের সাথে থাকা একজন আরাকানী যিনি আবার ইংরেজিও জানতেন তিনি আমার বন্ধুকে সাথে নেন এবং আমাকে একটা বিহারে রেখে আসেন।

বিহারটিতে আমাদের পরিচিত চাকমা ভিক্ষুটি সংবাদ রেখে গেছিলেন। তাঁর কথা মোতাবেক তিনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফিরে আসবেন।

মঙডু (Maungdaw) এর পুরোটাই ছিল চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে আসা মারমা শরনার্থীতে সয়লাব। এদের বেশিরভাগই ছিল বান্দরবান মহকুমা (Sub-division) থেকে।

তখনকার সময়ে প্রায় ১৫০০০ শরনার্থী বার্মায় আশ্রয় নিয়েছিল বলে জানা যায়।
মঙডু (Maungdaw) এ তখন অবৈধ অভিবাসী বাঙালিদের সংখ্যাও ছিল চোখে পড়ার মতন। তারা প্রায়ই সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসত একটু সচ্ছল জীবনযাপনের প্রত্যাশায়।

আমি শ্রামণদের কাছ থেকে বার্মিজ ভাষা শিখতে শুরু করি। তার বিনিময়ে আমি তাদের ইংরেজি শিখাতাম।

বিহারে ঘুরতে আসা অনেকের সাথেই আমি কথাবার্তা বলি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে থাকি।

মঙডু (Maungdaw) নামের ছোট্ট শহরটিতে ছিল অজস্র কাঠের তৈরি ঘরবাড়ি এবং ধূলিধূসর রাস্তাঘাট।

শহরের  অনেক বাসিন্দা ছিল ছোট ছোট দোকানের মালিক। কিন্তু এই ব্যবসার আড়ালে তাদের আরেকটা গোপন পেশা ছিল চোরাকারবার।

তারা চাল, পান, বাদাম ইত্যাদি বাইরে পাঠাত এবং প্রসাধণ, রকমারি সামগ্রী, বিভিন্ন বিলাসী দ্রব্য আর ওষুধপত্র বার্মায় নিয়ে আসত।

বার্মিজ সরকার বিদেশী জিনিসপত্র আমদানি করত না। এ কারণে ব্যবসা হিসেবে চোরাকারবার ছিল অনেক বেশি আর্থিকভাবে লাভজনক।

লামায় সূর্যাস্ত, Image Source: Asif Yousuf/ Flickr

আমরা নিজেরাই আকিয়াব (Akyab) এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করে আমাদের পরিচিত চাকমা ভিক্ষুর কাছে যাব বলে ঠিক করেছিলাম। কিন্তু আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করা হয়।

বিহারের প্রধান ভিক্ষু এবং আমাদের বন্ধুদের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে বুথিডঙ (Buthidong) এ একটা তল্লাশী চৌকি অবস্থিত এবং এটি অতিক্রম করা খুবই দুষ্কর।

বার্মিজ সরকারের প্রদান করা পরিচয় পত্র ছাড়া সেখানে যাকেই পাওয়া যায় তাকেই আটক এবং গ্রেফতার করা হয়ে থাকে।

তবে উল্লেখ্য যে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আগত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সাথে তাদের নিজেদের ধর্ম মিলে যাওয়ায় তারা কিছুটা হলেও সহানুভূতিশীল।  কিন্তু তাদের কাছ থেকে ছাড় পেতে হলে অবশ্যই আরাকানী বা বার্মিজ ভাষা জানা চাই।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ভাষা দুটোর মধ্যে কোনোটিই জানতাম না। তার উপর স্থানীয় পুলিশ আমাদের মঙডু (Maungdaw) ত্যাগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তাদের অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়াতেও ছিল বারণ।

অবশেষে চাকমা ভিক্ষু মঙডু (Maungdaw) ফিরে এলেন। তাঁকে পেয়ে আমরা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

পরদিন খুব ভোরেই আমরা মঙডু (Maungdaw) ছেড়ে যেতে উদ্যত হলাম। তখন ছিল শীতকাল আর সকালে ছিল হাড়কাঁপানো ঠান্ডা।

বুথিডঙ (Buthidong) এর আগের তল্লাশী চৌকিটি আমরা নির্ঝঞ্ঝাটে পার হয়ে যাই। আমাদের পরিকল্পনা ছিল সেখান থেকে আকিয়াব (Akyab) গামী স্টিমারে ওঠা।

স্টিমারটি বেলা ১১টার দিকে ছেড়ে যায়। সুতরাং আমাদের হাতে আরো পাঁচ ঘণ্টার মত সময় ছিল।

আমরা আমাদের পথপ্রদর্শকের পরিচিত একটি বিহারে বিশ্রাম নিতে যাই। সেখানে আমাদের খাবার সামগ্রী দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।

আমি স্টিমারে উঠে অন্য সকল ভিক্ষু ও শ্রমণদের সাথে গিয়ে বসে পড়ি। বার্মায় ভিক্ষুদের খুবই সম্মান করা হয় বিধায় প্রায় প্রতিটা যানবাহনেই তাদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু আসন থাকে।

এখানে একজন ভিক্ষুর সামনে যে কেউই দ্বিধাহীনভাবে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে শ্রদ্ধা জানাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য বোধ করে না।

বসার পর পরই আমার সঙ্গী আমাকে ডাকতে থাকে সেখান থেকে চলে আসার জন্য।

কুকুর ছানার সাথে এক ম্রো শিশু, Image Source: JCH Travel/ Flickr

আমি তার ওখানে গিয়ে হাজির হই। কিছু বার্মিজ শুল্ক কর্মকর্তা তাকে ঘিরে ছিলেন।

বার্মিজ ভাষায় তাঁকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমার সঙ্গীও বার্মিজ ভাষায় জবাব দিলেন এবং অনুরোধ করলেন আমাদেরকে যেন আকিয়াবে যেতে দেওয়া হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে মারমা সম্প্রদায়ের লোকেরা খুব সহজেই আকিয়াব (Akyab) এবং রেঙ্গুনে (Rangoon) যেতে পারত এ কথার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়।

আমরাও একই সুযোগ পেতে পারি কিন্তু তার আগে মঙডু (Maungdaw) থেকে আমাদের আরাকানি ভাষা শিখে নিতে হবে।

তারপরেই আমরা আকিয়াব (Akyab)যেতে পারব। এসব জেনে নিয়ে আমরা এক প্রকার হতাশ হয়েই মঙডু (Maungdaw) এ ফিরে আসি।

শুল্ক কর্মকর্তারা আমাদের সাথে একজন প্রহরীকে পাঠান। আমাদেরকে মঙডু (Maungdaw) পুলিশ স্টেশনে একটা প্রতিবেদন দাখিল করতে হয়।

আমাদেরকে তারা এর পরদিন দেখা করতে বলে। তারা এখন কি দেখতে পারে?

ইতিপূর্বে তারা আমাদের নির্দেশ দিয়েছিল এলাকা ত্যাগ না করার জন্য কিন্তু আমরা নির্দেশ পালন করি নি।

আমার সঙ্গী গ্রেফতারের আশঙ্কায় খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জেলে যাওয়া এড়ানোর জন্য তিনি খুব শীঘ্রই বার্মা ত্যাগ করতে চাচ্ছিলেন।

তিনি আমাকেও সাথে নিতে চান। তবে আমি তখনকার সময়ে একজন বৌদ্ধ শ্রমণ হওয়ার আমার এ  ভয় খুব একটা ছিল না।

বার্মায় যদি একজন শ্রমণকে পুলিশ আটক করে জেলে দেয় তখন সেখানকার জনগণের মধ্যে যে রোষানলের সৃষ্টি হবে তা বলার অপেক্ষা  রাখে না। 

কিন্তু আমরা দুজনই একসাথে এসেছি, সেজন্য যে কোনো পরিস্থিতিতে একসাথে থাকাটাই হবে যথাযথ সিদ্ধান্ত। তাই সে রাতেই আমরা একটা নৌকায় করে মঙডু (Maungdaw) ত্যাগ করি।

স্বাধীনতা-উত্তর প্রতিরোধ এবং অত্যাচারঃ

নতুন বাংলাদেশ ফিরে এসে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণের খবর পাই।

আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে একতাকে শক্তিশালী ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতিসত্বর একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে কাজ শুরু করি।

বাঙালিত্বের আগ্রাসনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তোলা এবং আত্মপরিচয় সম্পর্কে নিজেদের সচেতন করা তোলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে আমি অনুভব করতাম।

চাকমা সমাজ ও সংস্কৃতিতে যেসব বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব অনুপ্রবেশ করছিল সেসব থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে আমরা বদ্ধপরিকর ছিলাম।

বেইন বুননরত বম নারী, Image Credit: JCH Travel/ Flickr

আমরা আমাদের সংগঠনের নামকরণ করি “পাহাড়ি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী” (Hillman Cultural Group)। আমাদের প্রাথমিক পর্যায়ের উদ্যোগটি ছিল একটি ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠা করে আমাদের চিন্তাভাবনাগুলোকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া।

ম্যাগাজিনটি বাংলা ও চাকমা- উভয় ভাষাতেই প্রকাশিত হয়। তবে চাকমা বর্ণমালার পরিবর্তে আমরা আমরা বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করি।

আমাদের যে এক পৃথক আত্মপরিচয় বিদ্যমান এবং সেই সাথে নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনাচরণকে যে আমরা সমুন্নত রাখতে চাই তা বুঝানোর প্রচেষ্টা হিসেবে এ প্রকাশনাটি ছিল দ্বিভাষিক।

সমাজের শিক্ষিত শ্রেণী একে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু দুর্গম অঞ্চলে আমরা এ প্রকাশনা প্রচারের উদ্দেশ্যে ক’জন সদস্যকে পাঠিয়েছিলাম, কিন্তু তারা দীঘিনালায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন।

আটক অবস্থায় তারা পুলিশ কর্তৃক হয়রানির শিকার হন। এরপর আমরা তাঁদের ছাড়িয়ে আনি।

একইভাবে অন্যান্য আদিবাসী যুবকেরাও সংস্কৃতি এবং রাজনীতিতে বিভিন্নভাবে সক্রিয় ছিলেন।

পাকিস্তান আমলে গঠিত হওয়া সংগঠন “পাহাড়ি ছাত্র সমিতি” (Pahari Chatra Samiti) ইতিমধ্যেই কাজেকর্মে বেশ তৎপর হয়ে উঠেছিল।

এছাড়া একটি সাংস্কৃতিক শাখাও গঠন করা হয়। এর নাম দেওয়া হয় “গিরিসুর” (Tune of the Hills)।

এ সময়টায় পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠি নিজেদের পৃথক আত্মপরিচয় সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠছিল এবং তার ছোঁয়া গিয়ে  লেগেছিল পাহাড়ের দুর্গম ও দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতেও।

শিক্ষার্থীরা সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার কার্যক্রমে দায়িত্ববান ছিল। আমি নিজেও চাকমা ও বাংলা এ দুই ভাষাতেই কবিতা আর প্রবন্ধ লিখে সাহিত্য সম্পর্কিত কার্যক্রমে যুক্ত ছিলাম।

১৯৭২-৭৩ সালের দিকে আমি প্রায়ই এমপি (সংসদ সদস্য) হোস্টেলে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যদের সাথে আলাপ করে সংসদ অধিবেশনে তাঁদের কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত থাকতাম।

এক বম পাড়ায় বাড়ি নির্মাণ,
Image Source: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

শ্রী এম এন লারমা কেবলই হতাশা প্রকাশ করে থাকতেন। তার ভাষ্যমতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংসদ সদস্যদের পেশকৃত দাবিদাওয়া সংসদীয় ঘটনাপঞ্জিতে লিপিবদ্ধ করা হত; যে দাবিদাওয়াসমূহ তুলে ধরা হত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজ স্বার্থরক্ষায়।

এসব দাবি লিখিত হত কিন্তু কখনো সংসদ কর্তৃক স্বীকারপূর্বক মেনে নেওয়া হয় নি।

তাঁর (এম এন লারমা) নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে একটা প্রস্তাবনা পেশ করে যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের[1] স্বায়ত্বশাসন দাবি করা হয়।

১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ এস সায়েমের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে আরেকটি প্রতিনিধি দল। 

সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্য পুনরায় আবেদন করা হয়।

এরপর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন রাঙামাটিতে সফরে আসেন তখনও তাঁর কাছে একই দাবি জানিয়ে আদিবাসী নেতাদের স্বাক্ষর সংবলিত স্মারকপিলি দেওয়া হয়।  

১৯৭৫ সালে জনাব শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

তিনি সেসময়ে রাঙামাটিতে সফরে যান। তখন ছিল জুন মাস।

স্থানীয় প্রশাসনের আহবানে শতশত পাহাড়ি আদিবাসী জনতা দূরদূরান্ত থেকে এসে হাজির হন জনসভায় তাঁর বক্তব্য শুনতে।

সেখানে তিনি আদিবাসীদের ভাতৃস্থানীয় বলে সম্বোধন করেন, এবং তাঁদের বলেন বাঙালি হয়ে যেতে। তাদেরকে ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাস  ভুলে গিয়ে মূলধারার বাঙালি সংস্কৃতিতে যোগ দেওয়ার আহবান জানান।

এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আদিবাসী জনগণ সভা ত্যাগ করতে থাকেন। এটা লক্ষ্যণীয়ভাবে পরিষ্কার ছিল যে উপস্থিত কেউই বাঙালি হয়ে যাওয়ার আহবানে খুশি হন নি।

শেখ সাহেব রীতিমত হুমকি দিয়েও বলেন যে আদিবাসীরা এর বিরোধীতা করলে তার পরিণাম ভাল হবে না।

চাকমা গ্রাম,
Image Source: Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

ফলশ্রুতিতে সেখানে দৃশ্যমান হয় সেনাবাহিনী প্রেরণ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ এবং সমতল থেকে আসা বাঙালিদের বসতি স্থাপনের সূচনা।

ধাপে ধাপে এসব প্রয়োগ করা হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সৈন্য প্রেরণ করা হতে থাকে; দীঘিনালা, রুমা ও আলীকদমে সেনানিবাস (Cantonment) স্থাপন করা হয় এবং ঘাগড়ায় একটি আনসার ব্যাটালিয়ন স্থাপিত হয়।

শুরু হয়  নিপীড়নের অধ্যায়। ইচ্ছামত গ্রেফতার চলতে থাকে।

একের পর এক  হত্যা এবং ধর্ষণ সংঘটিত হতে থাকে। গ্রামের পর গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল।

শেখ মুজির নিহত হলেন, তাঁর পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ অব্যাহত নিপীড়ন চালু রাখেন।

১৯৭৫ সালে আমি একজনকে হারাই যিনি ছিলেন আমার বন্ধু ও আত্মীয়ের মধ্যে অন্যতম।

তিনি তাঁর আত্মীয়ের সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে দীঘিনালা যান এবং সেনাবাহিনীর হাতে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হন। তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানকার সেনা ক্যাম্পে।

তাঁর পিতামাতা সহকারী কমিশনারের কাছে আবেদন জানান। কিন্তু আমার বন্ধুবরের মৃতদেহটি প্রদান করার ছাড়া তিনিও আর কিছু করতে পারেন নি।

আমার বন্ধুকে নিষ্ঠূরভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল, এবং আঘাতগুলো এতটাই মারাত্মক ছিল যে তাঁকে রীতিমত চেনাই যাচ্ছিল না।

অত্যাচারের মাত্রা ক্রমশ বাড়তে থাকে। সেই সাথে সাথে আদিবাসী যুবকেরাও দলে দলে গহীন অরণ্যে আত্মগোপন করে এবং যোগদান করে ‘শান্তি বাহিনী’তে, যা ছিল আদিবাসীদের গেরিলা বাহিনী। 

আমার অনেক বন্ধু এবং আত্মীয়ই সেখানে যোগ দেয়। অন্যদিকে আমি সহিংস এ পন্থাটিকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারি নি।

ফলে আমি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থে দূরেই রয়ে যাই এবং সাহিত্য লেখালেখি ইত্যাদি নিয়ে শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করি।

সে সময়ে সকল আদিবাসী যুবকের উপর নজরদারি বহাল ছিল।

রাঙামাটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল সেনাবাহিনীর হাতে।

ম্রো পুরুষ, Image Credit: JCH Travel/ Flickr

১৯৭৭ থেকে ১৯৭৮ সাল- এ সময়ের মাঝে পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য মানুষ সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন এবং এক ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি হয়।

রাঙামাটি এবং অন্য সকল স্থানগুলোতে সেনাবাহিনীর দ্বারা অভিযান পরিচালিত হত গভীর রাতে। এ সময় অনেককে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হত।

আটক হওয়ার আশঙ্কায় আমার কলেজের এক আদিবাসী সহকর্মী রাতে নিজের বাড়িতে পর্যন্ত ঘুমাতেন না।

১৯৭৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজ পরিদর্শনের একটি দলে সদস্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হই।

দলটি কেবলমাত্র তিনজন সদস্য নিয়ে গঠিত ছিল যার মধ্যে দুজনই ছিলেন বাঙালি।

আদিবাসী হওয়ার কারণে দায়িত্ব পালনের সময় বেশ কিছু জায়গায় আমি হয়রানির শিকার হই।

আমার সহকর্মীরা সবসময়ই আমাকে রক্ষায় এগিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু আমি বুঝতে পারি যে আমার সরকারি চাকরি বা সরকারি দায়িত্ব পালন আমাকে সেনাবাহিনীর আক্রমণ বা হয়রানি থেকে বাঁচাতে পারবে না। 

১৯৭৮ সালে আমার বাবা এবং জ্যাঠা সেনাবাহিনীর হাতে অত্যন্ত বাজেভাবে মারধোরের শিকার হন। অথচ তারা উভয়েই সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন।

১৯৭৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তল্লাশি অভিযান ও আটকের পরিমাণ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে রাঙামাটির আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রচন্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে পাকিস্তানীদের অনুকরণে সকল আদিবাসী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে ফেলা হবে।

ঠিক এ সময়টাতে আমি সিদ্ধান্ত নিই আমার এলাকা ত্যাগের। আমি এক দুঃসহ আতঙ্কে রাতে ঘুমাতে পারতাম না। রাঙামাটির সকল আদিবাসী জনগন এক ভয়াল পরিস্থিতিতে দিন এবং রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছিলেন।

১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাস, আনুমানিক ৭০ জন আদিবাসী ব্যক্তি যার মাঝে অনেকেই ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী- সেনাবাহিনীর এক বড় অভিযানে আটক হন।

আমি মে মাসে রাঙামাটি ছেড়ে ঢাকা চলে আসি। আমি বদলির জন্য একটা আবেদন পেশ করি কিন্তু তা গৃহিত হয় নি।

সাঙ্গু নদী, Image Credit: Muhammad A Zahid/ Flickr

তারপর আমি এক বিদেশী সরকারের অধীনে চাকরিতে যোগদানের উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎকার দিই। চাকরিটা আমি পেয়ে যাই।

মন্ত্রনালয় থেকে একজনের সহযোগিতায় আমি বাংলাদেশ সরকার থেকেও অনুমতি পেয়ে যাই।

কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট করতে আমাকে ঘুষ প্রদান করতে হয়েছিল। আমি বিদেশে পাড়ি জমাই ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে।

১৯৮০ সালে আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং পুলিশের দ্বারা আদিবাসী জনগণের নির্মূলকরণ বন্ধের আর্জি জানিয়ে আহবান পেশ করি এবং তা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিতে থাকি।

এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের আদিবাসী সম্পর্কিত সরকারি নীতির বিরুদ্ধে জোর প্রচারণা চালাই।

আমি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে চিঠি দিই। সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের উপর হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে এবং তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার পুনর্বহাল করার জোরালো আহবান ছিল।

চুক্তি মোতাবেক আমার চাকরির মেয়াদ উর্ত্তীর্ণ হওয়ার পরে আমি সেই দেশটি ত্যাগ করি। সেখান থেকে আমি ইউরোপে চলে আসি এবং রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমার আবেদন গ্রহণ করা হয়।

তার পর থেকেই আমি একজন শরনার্থী হিসেবে ইউরোপে বসবাস করে আসছি।  

আরও পড়ুন –

তথ্যসূত্রঃ

Ackermann, M.  Goza und Gutti. Zwei sozio-politische Gruppier-ungen
bei den Chakma, Chittagong Hill Tracts (Bangladesh)
Freidberg 1977
Amnesty
International (AI)
Recents Developments in the Chittagong Hill Tracts
and AI Concern 1.11.1980 London
Mey, W.Politische Systeme in den Chittagong Hill Tracts,
Bangladesh, Bremen 1980
Mills, J.P.Report on the Chiefs of the Chittagong Hill Tracts
(unpublished manuscript) 1927
Montu, K.Tribal Insurgency in Chittagong Hill Tracts, Economic and Political Weekly, 6.9.1980, Bombay

[1] প্রতিনিধি দলটি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণের পক্ষ্য থেকে নিম্নোক্ত চার দফা দাবি নিয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলঃ

১) পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসন ও নিজস্ব আইন পরিষদ গঠন।

২) বাংলাদেশের সংবিধানে ১৯০০ সালের শাসনবিধির অনুরূপ সংবিধির অন্তর্ভুক্তি।

৩) আদিবাসী সার্কেল চীফ বা রাজাদের দপ্তর সংরক্ষণ।

৪) ১৯০০ সালের শাসনবিধি সংশোধনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অ-আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ।


[1] এই লেখাটিতে সকল নাম এবং তারিখ পরিবর্তিত করা হয়েছে।

[2] গোজা হচ্ছে আসলে জ্ঞাতিকূল। আগেকার সময়ে তারা কমবেশি নির্দিষ্ট একটি জায়গায় বসবাস করত। একটি গোজা আবার কয়েকটি গুষ্টি কিংবা গুত্তিতে বিভক্ত।

গত শতাব্দীতে চাকমা রাজা কর্তৃক রাজনৈতিক এককেন্দ্রিকরণের ফলে সুচিহ্নিত এইসব এলাকাভিত্তিক এককগুলো তুলনামূলকভাবে ভেঙে পড়ে।

[3] দেখুন Mey 1980:144ff। যতই দেওয়ানদেরকে রাজার সৃষ্ট ক্রমাধিকারতন্ত্রে যুক্ত করা হল, তারা ততই অত্যাচারী হয়ে উঠল এবং তারা গোজাপ্রধান হিসেবে তাদের ঐতিহ্যগত দায়িত্বে অবহেলা করতে লাগল।

‘দেওয়ান’ শব্দের অর্থটি শীঘ্রই একটি পদাধিকারের নাম থেকে সরে এসে হয়ে উঠল একটি শ্রেণির পরিচয় (Mills 1927I:32)।

[4] দেওয়ানদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিভাজন (Segmentation) একটি কার্যকরী প্রতিবন্ধক ছিল।

[5] ঐতিহ্যগতভাবে দেওয়ানরা গোজার প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা ভোগ করত (দেখুন, Mey 1980:12)।

[6] চাকমা জাতিগোষ্ঠীর একজন সংসদ সদস্য। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭১-১৯৭৪/১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সংসদে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ১৯৭৫ সালের দিকে আত্মগোপনে চলে যান এবং ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে শান্তিবাহিনী অভ্যন্তরীন অন্তর্দ্বন্দ্বে নিহত হন।

[7] মুক্তিযুদ্ধের সময়কালেই বৃহৎ পরিসরে পাহাড়ে বাঙালি অভিবাসন শুরু হয়ে যায়। এ সময়কালে আনুমানিক ৩০,০০০-৫০,০০০ বাঙালি রামগড় মহকুমাতে (Sub-division) প্রবেশ করে এবং মারমা ত্রিপুরা এবং চাকমা সম্প্রদায়ের জায়গাজমিগুলি দখল করে নেয়। একই প্রক্রিয়ায় অভিবাসন এর পরবর্তী সময়কালেও পরিলক্ষিত হয়।

[8] স্বাধীনতা যুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী চেষ্টা করে উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী গোষ্ঠিগুলো থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ করে তাদেরকে বাঙালিদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিতে। কিন্তু খুব অল্পসংখ্যক লোক অনিয়মিত যোদ্ধা হিসেবে সেখানে যোগ দিয়েছিল। সাবেক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিকে পরবর্তীতে আদিবাসীদের বাঙালি মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধাচরণের একটা বড় প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। যদিও এটা পরবর্তীকালে পাহাড়ি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপর গণহত্যা ও বৃহৎ পরিসরে ভূমি থেকে উচ্ছেদের অজুহাত হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে (আরও দেখুন Montu 1980:1510)।  


মূল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছেঃ Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, Wolfgang Mey (ed.), IWGIA Document 51

লেখকঃ এ.বি. চাকমা (ছদ্মনাম)

লেখাটির অনুবাদকারীঃ সায়ক চাকমা, আইন বিভাগের শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।
RSS
Follow by Email
Facebook
Twitter

আরও কিছু লেখা

Leave a Reply