icon

চাকমা লোককথা: সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী

reagan07

Last updated Mar 23rd, 2020 icon 447

তখন সৃষ্টির কিছুই ছিল না। ছিল না বায়ু, রোদ, বৃষ্টি, আলো, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, পশু, পাখি এবং মানুষ। এমন কি ছিল না পৃথিবীও।

ছিল কেবল অপার -অনন্ত স্থির জলরাশি এবং নিঃসীম অন্ধকার। এমনই সৃষ্টির আদিকালে একদিন গোজেন ’অর্থাৎ ঈশ্বর নিজ প্রয়োজনে সৃষ্টি করলেন সমুদ্রের ওপর এক বিশাল বটগাছ।

এই বটগাছ থেকে তিনি ছিড়ে নিলেন কয়েকটি পাতা। তা তিনি স্কুলের ওপর বিছিয়ে নিয়ে তার ওপর আসন গেড়ে বসে ধ্যানমগ্ন হলেন।

এই মহা-ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কত শত বছর যে কেটে গেল তার হিসেব নেই। এদিকে এক বিশাল আকৃতির কাঁকড়া-দৈত্য সমুদ্রের তলা থেকে মাটি কুড়িয়ে এনে তা গোজেন-সৃষ্ট সেই বিশাল বটগাছটির চারদিকের শেকড় ঘিরে জমাতে লাগলো।

পৃথিবীর স্থলভাগে তখন ছিল না গাছপালা, ছিল না ঘাস ও লতা-গুল্মরাজী। এমন সময় হঠাৎ একদিন গোজেনের ধ্যানভঙ্গ হলো।

তখন তিনি চোখ মেলে চারদিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন সমুদ্রের ওপর পৃথিবীর সুন্দর স্থলভাগ। তিনি বুঝতে পারলেন এটি তারই সন্তান কাঁকড়া- দৈত্যের কাজ।

তিনি পরম আনন্দিত হলেন এবং আনন্দিত চিত্তে তা ঘুরে ঘুরে দেখার জন্য সমুদ্র থেকে পা বাড়িয়ে উঠে গেলেন পৃথিবীর স্থলভাগের ওপর।

তিনি দেখলেন এই স্থলভাগে কিছুই নেই। চারদিকে কেবল ধু-ধুকরা উন্মুক্ত প্রান্তর। তখন তিনি ভাবলেন-এই পৃথিবীটাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলা দরকার।

তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টি করলেন দিনে আলো দেওয়ার জন্য সূর্যকে – রাত্রে জোছনা ছড়ানোর জন্য চন্দ্র ও গ্রহ-নক্ষত্রদের ।

এরপর তিনি সৃষ্টি করলেন, রুক্ষভূমিকে উর্বরা ও ছায়া-সুশীতল করার জন্য গাছপালা, ঘাস, লতাগুল্মদের। রঙের জন্য ফুল, খাদ্যের জন্য ফল, এবং পৃথিবীর বুকে বিচরণের জন্য পশু-পাখী ও কীট পতঙ্গদের।

এসব বৃক্ষরাজী ও প্রাণীকুলের বেঁচে থাকার জন্য বায়ু ও মেঘমালাকে সৃষ্টি করতে তিনি ভুললেন না। কিন্তু মানুষ তৈরী করার কথা তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন।

সৃষ্টির প্রয়োজনীয় সব কিছুই করার পর গোজেন পরম আনন্দে রৌদ্র করোজুল পৃথিবীতে ঘুরে ঘুরে দেখার সময় একবার তিনি পেছন ফিরে তাকালেন।

তাকিয়েই তিনি দেখলেন তাঁর পেছনে কে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। তখন তিনি সেই লোকটিকে প্রশ্ন করলেন- ‘কে? পেছনের লোকটি কোন উত্তরই দিল না।

গোজেন দ্বিতীয়বার লোকটিকে একই প্রশ্ন করলেন, এবারও লোকটি নিরুত্তর। তিনি তৃতীয়বার প্রশ্ন করলেন, এবারও লোকটি আগের মতাই নিরুত্তর।

পর পর তিন বার প্রশ্ন করার পরও লোকটিকে নিরুত্তর দেখে তিনি আশ্চর্য হলেন। তখন তিনি একটুখানি চিন্তা করেই বুঝতে পারলেন- এতো নিজেরই ছায়া।

গোজেন নিজেই যেন লজ্জিত হলেন। তখন তিনি নিজের এই ছায়াকে প্রাণ দিলেন এবং তার নাম দিলেন ‘কেদুগা। এই কেদুগাই হলেন গোজনের আদলে সৃষ্ট পৃথিবীর প্রথম মানব।

এরপর গোজেন ভাবলেন-এর একজন সঙ্গিনী প্রয়োজন। তখন গোজেন নিজের শরীরের ময়লা (চাকমা ভাষায় ‘ড্রিং’) থেকে সৃষ্টি করলেন এক মানবীকে এবং তিনি তাঁর নাম দিলেন ‘কেদুগী’। এই কেদুগা ও কেদুগী-ইহলেন গোজেন।

সৃষ্ট পৃথিবীর প্রথম মানব ও মানবী। এদের সৃষ্টির পর গোজেন ভাবলেন-এবার এই পৃথিবীর সৃষ্টিকর্ম যথার্থভাবে সম্পূর্ণ হলো।

তখন তিনি মানবসহ যাবতীয় প্রাণীকুলের আহার যোগানোর দায়িত্ব ফলবান বৃক্ষরাজীর ওপর ন্যস্ত করে সৃষ্টির আনন্দে পরম প্রফুল্ল চিত্তে নিজ আবাস স্বর্গরাজ্যে চলে গেলেন।

 গোজেন স্বর্গরাজ্যে চলে যাবার পর কেদুগা ও কেতুগী এই দু’জন আদমানবমানবী বন্য ফলমূল ও আলু ইত্যাদি আহার করে জীবনধারন করতে লাগলেন।

কালক্রমে এদের সন্তান-সন্ততি হলো-হলো নাতি-নাতনী। এক সময় বৃদ্ধ বয়সে কেদুগা-কেদুগী উভয়েই। মারা গেলেন। এদিকে তাঁদের নাতি-নাতনীদেরও হলো সন্তান-সন্ততি এবং নাতি-নাতনী। এভাবে তাঁদের বংশধারা বেড়ে চললো।

 এভাবে প্রকৃতির নিয়মে সংখ্যাতীত বৎসর কেটে যাবার পর এক সময় ঘটলো পৃথিবীতে প্রচন্ড হিমপাত। হিমপাতের ফলে পৃথিবীর গাছপালা মরে যেতে লাগলো।

কমে যেতে থাকলো ফলবান বৃক্ষের সংখ্যা । তাতে প্রাদুর্ভাব ঘোটলো কভাৎ’ অর্থাৎ মন্নস্তরের। পৃথিবী জুড়ে হাহাকার পড়ে গেল।

তখন গোজেন মনুষ্য সহ যাবতীয় প্রাণীকুলও গাছপালাদের রক্ষার জন্য স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পাঠালেন কালেইয়্যা নামক এক দেবতাকে। ক্যালেইয়্যা দেবতার পৃথিবীতে আগমনের পর হিমপাত বন্ধ হলো বটে, কিন্তু কভা’আর কাটলো না।

তখন প্রতিকারের জন্য কালেইয়্যা দেবতা পৃথিবীর যাবতীয় ফলবান বৃদের কাছে জানতে চাইলেন-“তোমরা কতোদিন মনুষ্য ও অন্যান্য প্রাণীকুলকে তোমাদের ফলমূল খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে?”

কোন কোন সুস্বাদু ফলের বৃক্ষপ্রজাতি বললো- “এক – দুমাস কিংবা এক বছর; কিন্তু জঘনা’ প্রজাতির বৃক্ষরা বললো – “আমরা চিরকাল এদের বাঁচিয়ে রাখতে পিরবো”।অথচ কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল এক-দুমাস যেতে নো যেতেই মনুষ্য ও অন্যান্য প্রাণীরা সব জঘনা ফল খেয়ে শেষ করে দিল।

তাতে কালেইয়্যা দেবতা প্রচন্ডভাবে রেগে গিয়ে জঘনা বৃক্ষদের অভিশাপ দিলেন। এই অভিশাপের কারণে এই জঘনা ফলগুলো হয়ে গেল মানুষের অভোক্ষ্য।

 কালেইয়্যা দেবতার ব্যর্থতার পর গোজেন এবার স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পাঠালেন গঙ্গাপুত্ৰ বিয়াত্রাকে। বিয়াত্রা দেবতা পৃথিবীতে এসে প্রাণীকুলের জীবন রক্ষার্থে সুস্বাদু ফলাহার ব্যতীত ভূট্টা, যব, জোয়ার ইত্যাদি খাদ্য আহারের ব্যবস্থা চালু করলেন।

কেবল তাই নয়, তিনি মনুষ্য সমাজকে শেখালেন আগুনের ব্যবহার ও গৃহ নির্মাণের কৌশল। তিনি মনস্থ করলেন- পৃথিবীতে মুনষ্য জাতির খাদ্যাভাব চিরতরে মেটাবার জন্য স্বর্গ থেকে মাহ লখী মা’ (মহালক্ষী মা)-কে পৃথিবীতে নিয়ে আসবেন।

তাই তিনি কালেইয়্যা দেবতাকে স্বর্গে পাঠালেন মালখী মা-কে আমন্ত্রণ জানিয়ে পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য। পরিকল্পনা মতো কালেইয়্যা দেবতা স্বর্গে গেলেন।

এবং স্বর্গে পৌছে তিনি যথারীতি ভক্তি সহকারে মাহ লখী মা-কে পৃথিবীতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।

মাহুলখী মা কোন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে কালেইয়্যাকে মদ্য ও ভাং ইত্যাদির দ্বারা আপ্যায়ন করলেন। কালেইয়্যা সাগ্রহে তা গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত মাতাল হয়ে মালখী মা-কে কখনো মা’ কখনো ‘দিদি’ সম্বোধন করতে লাগলেন।

কালেইয়্যা দেবতার এই মাতলামো অবস্থা দেখে মাহ লখী মা তার সঙ্গে পৃথিবীতে যেতে রাজি হলেন।

 কালেইয়্যা দেবতা ফিরে আসার পর এবার স্বয়ং বিয়াত্রা দেবতা গেলেন স্বর্গে। তিনিও যথারীতি ভক্তিসহকারে মাহলী মাকে আমন্ত্রণ জানালেন।

মাহলী মা তাঁকেও একইভাবে মদ্য ও ভাং সহযোগে আপ্যায়ন করলেন। বিয়াত্রা দেবতা সাগ্রহে তা গ্রহণ করলেন বটে, কিন্তু পান করলেন না, লুকিয়ে এক কোণায় রেখে দিলেন।

তাতে মাহ লখী মা প্রসন্ন হলেন এবং বিয়াত্রার সঙ্গে পৃথিবীতে আসতে সম্মতি জানালেন। মাহ লখী মা পৃথিবীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময় ধান্যসহ যাবতীয় খাদ্যশষ্যের এবং সজীর বীজ একটি করে নিয়ে তা একটি কাপড়ের পুটলিতে বেঁধে সঙ্গে নিলেন।

এরপর তিনি তাঁর প্রিয় বাহন ‘মে-মে ছাগলী’ (এক ধরনের ছোট্ট পাখি)-এর পিঠে চেপে বিয়াত্রার সঙ্গে রওনা দিলেন পৃথিবীর উদ্দেশ্যে।

স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আসার পথে পাওয়া যায় বিশাল এক দুধ-সাগর। মাহ লখী মা তাঁর বাহনটির পিঠে চেপে সেই দুধ-সাগরের পাড়ে এসে থামলেন।

তখন তিনি বিয়াত্রাকে ডেকে বললেন- এই দুধ-সাগরটি পেরোর জন্য কোন একটি উপায় করতে হবে। এমন অবস্থার যে সৃষ্টি হতে পারে তা বিয়াত্রা দেবতা আগেই অনুমান করেছিলেন।

তাই তিনি স্বর্গে যাবার পথে আগে থেকেই একটি কাঁকড়া, একটি শুকর ও একটি মাকড়সাকে দুধ-সাগরের পাড়ে রেখে গিয়েছিলেন। তাই মালখী মার নির্দেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই তিন প্রাণীকে তিনি ডেকে আনলেন।

এরপর বিয়াত্রা দেবতার কথা মতো প্রথমে কাঁকড়াটি ভাসলো জলে। এরপর কাঁকড়াটির পিঠের ওপর শুকরটি গিয়ে দাঁড়ালো। এদিকে করিৎকর্মা মাকড়সাটি তার পেটের আঁশ দিয়ে দুধ -সাগরের এপার-ওপার দিল বেঁধে, যাতে মালখী মা তা ধরে ধরে দুধ-সাগরটি পেরোতে পারেন।

এরা প্রস্তুত হতেই মে-মে ছাগলী পাখিটি মাহ লখী মা-কে পিঠে চাপিয়ে উড়ে গিয়ে বসলো শুকরটির পিঠের ওপর। তখন কাঁকড়াটি দ্রুতবেগে ভেসে চললো দুধ-সাগরের ওপর দিয়ে। এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহ লখী মা অতি স্বচ্ছন্দে দুধ-সাগরটি পেরোলেন।

দুধ-সাগরের ওপারে গিয়ে মাহ লখী মা পরম সন্তুষ্ট হয়ে কাকড়া, শুকর, মাকড়সা এবং বিয়াত্রা দেবতাকে একটি করে বর দিলেন। তিনি বললেন-কাঁকড়াটি এবার থেকে স্থলে ও জলে সমানভাবে বিচরণ করতে পারবে।

শুকরটি পশুকুলের মধ্যে সবচেয়ে বেশী চর্বির অধিকারী হবে। মাকড়সাটির পেটের আঁশ কখনো ফুরোবে না এবং বিয়াত্রা মনুষ্যকুলে দেবপূজার সময় সবার আগে পূজা পাবেন।

বর প্রদানের পর মাহ লখী মা এদের সবাইকে বিদায় জানিয়ে বললেন-“তোমরা এবার সকলে যার যে স্থানে চলে যাও। আমি যথা সময়ে লোকালয়ে গিয়ে আবির্ভূত হবে।

 এরা যার যে পথে চলে যাবার পর মাইলখী মা পেচাকে ডেকে বললেন –“যাও, তুমি এক্ষুনি গিয়ে রাতারাতি সর্বত্র জানিয়ে দাও যে, মাহ লখী মা স্বর্গ থেকে মর্ত্যধামে এসে পৌঁছেছেন।”

নির্দেশ মতো পেঁচাটি সারা রাত ধরে উড়ে উড়ে কু-লু-লু, কু-লু-লু শব্দে মাহু লকুখী মা’র মর্তে আগমনের খবরটি জানিয়ে দিল।

কিন্তু ভোরের দিকে একটু বিশ্রামের জন্য একটি ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসলো। এদিকে মাহ লখী মা’র মর্ত্যে আগমনের খবরটি শুনে গ্রামবাসীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে একটি সোনার টোপর সঙ্গে নিয়ে সেই শুভ-সংবাদ জ্ঞাপনকারী পাখিটির খোজে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই বেরিয়ে পড়লো।

কিছুদূর গিয়েই তারা দেখতে পেলো একটি কাঠঠোকরা পাখি একটি মরা গাছের ডালে বসে ঠোকর মারছে গাছপোকার সন্ধানে। গ্রামবাসীরা ভাবলো—এটিই বুঝি সেই শুভ-সংবাদ জ্ঞাপনকারী পাখিটি!

তাই তারা এই কাঠঠোকরা পাখিকেই সোনার টোপরটি পরিয়ে দিল। এদিকে ঝোপের আড়াল থেকে পেঁচাটি তা দেখতে পেয়ে কেবল আক্ষেপের সুরে স্বগতোক্তি করে বললো সারারাত পরিশ্রম করলাম আমি, অথচ একটুখানি অলসতার দরুণ সোনার টোপরটি বিনা পরিশ্রমে পেয়ে গেল কাঠঠোকরা পাখিটি।

মাহ লকখী মা ভাদ্র মাসের মঙ্গলবারে বেলা অপরাহ্নের সময় লোকালয়ে এসে আবির্ভূত হলেন সাধারণ সাদা পোষাক পরিহিতা মধ্য-বয়েসী এক বিধবা নারীর বেশে।

তিনি প্রথমেই গিয়ে উঠলেন মিচ্ছিভ্যা নামক এক বিপত্মীক গৃহস্তের বাড়িতে। তখন মিচ্ছিভ্যা বাড়িতে ছিলেন না। গিয়েছিলেন খাদ্যের সন্ধানে। তার ছোট ছোট তিন মেয়ে ছিল বাড়িতে।

তারা নিরন্ন অবস্থায় ক্ষুধায় কাতর হয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। মধ্যবয়েসী বিধবা মহিলাটি মেয়েদের জাগিয়ে তুললেন। প্রথমে তিনিই তাদের পরিচয় জেনে নিলেন। এরপর নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে তিনি বললেন- তিনি দূরগ্রাম থেকে এসেছেন।

পরিচয় জানাজানির পর তিনি বারো-তেরো বছর বয়েসী মিচ্ছিঙার বড় মেয়েটিকে ডেকে বললেন-“তুমি একটি বেতের ঝুড়ি নিয়ে এসো।” কথামতো মেয়েটি বেতের ঝুড়ি (লেই’) নিয়ে এলো।

বিধবা মহিলাটি তার কাপড়ের পুঁটলিটি খুলে তা থেকে একটি মাত্র চাল খুঁজে নিয়ে তা ঝুড়িটির মধ্যে রেখেদিলেন এবং একটি কুলো দিয়ে ঝুড়িটি ঢেকে দিলেন।

এবার মেয়েটিকে তিনি বললেন- উনুনের আগুন জ্বেলে তুমি এই ঝুড়িথেকে পরিমান মতো চাল মেপে নিয়ে একটি হাঁড়ি দিয়ে তা রান্না করো।

আমরা সবাই মিলে আহার করবো। মেয়েটি অবাক বিস্ময়ে মহিলাটির দিকে এক পলক তাকিয়ে ঝুড়ি থেকে চাল মেপে নিয়ে তা হাঁড়িতে রান্না বসিয়ে দিল। রান্নার কাজ শেষ হলে নবাগতা মহিলাটি সহ তারা সবাই মিলে পেটভরে আহার করলো।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার একটু আগেই মিচ্ছিখ্যা কয়েক টুকরো বন্যআলু নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। বিধবা মহিলাটি তখন ঘরের এক কোণায় শুয়ে বিশ্রাম করছিলেন।

বাড়িতে এসে মিচ্ছিা নিজের মেয়েদের মুখ থেকে বিধবা মহিলাটির বিষয়-বৃত্তান্ত সবই শুনলেন, কিন্তু তেমন কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না।

পরে নবাগতা মহিলাটির সঙ্গে তার পরিচয় ও আলাপ হলো। বিধবা মহিলাটি জানালেন – তিন কুলে তার কেউ নেই। এ বাড়িতে আশ্রম পেলে তিনি একেবারেই থেকে যাবেন।

তা শুনে মিচ্ছিা মনে মনে খুশিই হলেন এবং মহিলাটিকে থেকে যেতে বললেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই মিচ্ছিঙ্যা ও মহিলাটির পূণর্বিবাহ হলো।

এভাবে বুড়ি ও মিচ্ছিা ঘর-সংসার পেতে তিন মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে থাকতে লাগলেন। একদিন মাঘ-ফালগুন মাস নাগাদ বুড়ি মিচ্ছিঙ্যাকে ডেকে বললেন- “বুড়ো, আজ তুমি জঙ্গলে গিয়ে একটি জুমের ক্ষেত্র চিহ্নিত করে এসো।”

মিচ্ছিা ছিলেন আসলে খুবই অলস প্রকৃতির লোক। তবু বুড়ির কথায় সেদিন তিনি জঙ্গলে গিয়ে একটি উর্বর জায়গা দেখে-টেকে একটি জুমক্ষেত্র চিহ্নিত করে এলেন।

এর ক’দিন পর বুড়ি পূনরায় মিচ্ছিঙ্যাকে ডেকে বললেন—“বুড়ো, আজ তুমি পুনরায় জঙ্গলে গিয়ে চিহ্নিত ঐ জুমক্ষেত্রটির কিছু জঙ্গল কেটে এসো।”

বুড়ির কথায় বুড়ো ইচ্ছা অনিচ্ছা সত্বেও একটি তাল’ (দা) ও একটি কুড়ুল নিয়ে জুমক্ষেত্রটির কিছু অংশের জঙ্গল কেটে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে এলেন।

কিন্তু বুড়ো পরের দিন জুম কাটতে গিয়ে দেখে জুমক্ষেত্রের সব জঙ্গল কাটা হয়ে গেছে। জুমকাটা হয়ে যাবার পর জুমের সব ঝোপ-ঝাড় রোদে শুকোতে লাগলো।

চৈত্রের শেষদিকে বুড়ির কথামতো বুড়ো কাটা ও শুকনো জুমটি আগুনে পোড়া দিয়ে এলো। বুড়ি তার দু’একদিন পরে বুড়োকে বাড়িতে রেখে নিজেই জুমে গেলেন।

তিনি সেদিন জুমের আধপোড়া ডালপালা সব পরিষ্কার করে জুমক্ষেতে ধান ও অন্যান্য ফসলের বীজ রোপন করে এলেন।

এরপর অন্য আরেক দিন বুড়ি জুমে গিয়ে জুমের যাবতীয় বুনোঘাস ও আগাছাগুলো সাফ করে তা জুমের উত্তর প্রান্তের একটি বিরাট গর্তের মধ্যে ঢুকিয়ে গর্তের মুখটি পাথর চাপা দিয়েএলেন।

এর বেশ কয়েকদিন পর বুড়ি বুড়োকে বললেন- “বুড়ো আজ তুমি জুমে গিয়ে কেতটি দেখে এসসা বাঁদর বা অন্য বন্যপশু জুমের ফসল নষ্ট করছে কিনা।

কিন্তু একটি কথা মনে রেখো তুমি কখনো জুমের উত্তর প্রান্তে যাবে না।” বুড়ো সেদিন জুমে গিয়ে দেখলে – সুন্দর জুমক্ষেত।

ঘাসগুলো সব নিড়ানো। কচি-সবুজ ধানের চারাগুলো বাতাসে দুলছে। দেখে বুড়োর মনটি উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। তিনি উৎফুল্ল চিত্তে জুমের এদিকে-ওদিকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন।

কিন্তু হঠাৎ-ই তার মনে পড়লো বুড়ির নিষেধের কথা। তিনি ভাবলেন- বুড়ি কেন জুমের উত্তর প্রান্তে যেতে নিষেধ করলেন! তার মনে কৌতুহল জাগলো।

তাই তিনি নিষেধ অগ্রাহ্য করে গেলেন জুমের উত্তর প্রান্তে। কিন্তু সেদিকে গিয়েই বুড়ো শুনতে পেলেনকাদের যেন গলার চাপা আওয়াজ।

সেই আওয়াজ উদ্দেশ্য করে খোজাখুঁজি করতেই তিনি দেখতে পেলেন একটি গর্তের মুখে পাথর একটি চাপা রয়েছে। গর্তের কাছাকাছি গিয়ে কান পাততেই তিনি শুনতে পেলেন কারা যেন গর্তের ভেতর গুমড়িয়ে কাঁদছে।

বুড়ো কোতুহল নিবারণের জন্য সেই গর্তের মুখে চাপা দেওয়া পাথরটি দু’হাত দিয়ে সরিয়ে দিলেন এবং আশ্চর্যজনকভাবে দেখলেন গর্তের ভেতর ঠাসাঠাসি করে পড়ে রয়েছে অজস্র বুননাঘাস ও আগাছা।

গর্তের মুখটি খুলে দিতেই তারা হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এসে সারা জুমক্ষেত জুড়ে যার যে জায়গায় ঝটপট বসে পড়লো। এ কান্ড দেখে বুড়ো রীতিমতো চমকে গেলেন।

তখন তিনি বুঝতে পারলেন বুড়ি কেন জুমের উত্তর প্রান্তে না যাবার জন্য বারণ করেছিলেন। বুড়ো অপরাধীর মতো কাচুমাচু অবস্থায় বাড়িতে ফিরে এসে সব ঘটনা বুড়িকে খুলে বললেন।

তা শুনে বুড়ি বললেন “বুড়ো, তুমি জুমচাষীদের জুম নিড়ানির কাজটা শুধু শুধু বাড়িয়ে দিয়ে এলে। যা হোক, বুড়ি পরের দিন নিজেই জুমে গেলেন।

বুড়িকে দেখা মাত্রই জুমের বুনোঘাস ও আগাছাগুলো যে যেদিকে পারে দৌড়ে পালাতে লাগলো। তবু তিনি কিছু বুনোঘাস ও আগাছকে ধরে -টরে পূনরায় সেই গর্তের ভেতর পাথর চাপা দিয়ে চলে এলেন।

আষাঢ় ও শ্রাবণ মাস নাগাদ বৃষ্টির জল পেয়ে জুমের ধান ও সজীর চারাগুলো বেড়ে উঠতে লাগলো। এক সময় সেই ধানের চারাগাছে ফুল এলো – ফুল থেকে হলো ধান।

ক্রমশ সেই ধান পোক্ত হতে হতে তা পেকে ওঠার সময় হলো- ধানের শীষে সোনালী রঙ ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। শ্রাবণের শেষ ও ভাদ্রের প্রথম নাগাদ জুমের ধান পুরোপুরি পেকে উঠলো।

তখন বুড়ি বুড়োকে ডেকে বললেন- “বুড়ো, এবার যাও তুমি, প্রতি গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রতিটি গেরস্তকে জানিয়ে দিয়ে এসো যে, তারা সবাই যেন নিজেদের প্রয়োজন মতো জুম থেকে পাকা ধান কেটে নিয়ে যায়।

বুড়ো কথামতো প্রতিটি গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি গেরস্তকে খবরটি জানিয়ে দিয়ে এলেন।

তারপর নির্দিষ্ট দিনে শনিবারে দূর-দূরান্তের প্রতিটি গ্রাম থেকে গেরস্তরা নারী-পুরুষ মিলে হাতে একেকটি কাস্তে নিয়ে, বড় বড় বেতের ঝুড়ি কাঁধে ঝুলিয়ে মিচ্ছিভ্যা বুড়োর জুমক্ষেতে এসে হাজির হলো।

এদিকে বুড়ি বুড়োকে দিয়ে জুমের মাঝখানে একটি উচু মঞ্চ তৈরী করিয়ে রেখেছিলেন।

গ্রামবাসীরা সবাই এসে জড়ো হলেই বুড়ি সেই মঞ্চের উপর উঠে গেলেন এবং নিজেকে মাহ লখী মা’ বলে আত্মপরিচয় দিয়ে সমবেত গ্রামবীসীদের উদ্দেশ্য করে জুমচাষের মহাত্ম, জুম কৃষির প্রতিটি পর্বের কাজ সবিস্তারে বর্ণনা করলেন এবং বললেন-আমি যেই গৃহস্তের বাড়িতে অবস্থান করি সেই গৃহস্তের পরিবার সর্বদা ধনে-সম্পদে, বিত্ত-বৈভবে পরিপূর্ণ থাকে, অভাব বলতে তার কিছুই থাকে না।

কিন্তু আমি কেবল সুগৃহিনী ও সৎচরিত্র ব্যক্তিদের ঘরেই অবস্থান করে থাকি। যে ঘরে সকাল-সন্ধ্যে অকথ্য ভাষা উচ্চারিত হয় সে ঘরে আমি থাকি।

 যে নারী কটুভাষী, হিংসা-পরায়না, পতিভক্তি হীনা, পরগামী অর্থাৎ দুশ্চরিত্রা সে ঘরে আমি থাকি না।

যে নারীর স্বামী অলস, মদ্যপ, জুয়াখেলার প্রতি আসক্ত, ব্যভিচারী, পরনারী হরণকারী এমন ঘরে আমি থাকি না।

তিনি আরো বললেন-আমি বিয়াত্রা দেবতার আমন্ত্রণে মনুষ্যজাতির অন্ন সংস্থানের জন্য পৃথিবীতে এসেছিলাম। এই জুমচাষের মাধ্যমে সেই ব্যবস্থা আমি করে গেলাম।

এখন আমি স্বর্গেঅর্থাৎ স্বগৃহে ফিরে যাবো। স্বশরীরে আমিআর পৃথিবীতে থাকবো না। তবে আমি অদৃশ্যভাবে চিরকাল অবস্থান করবো ধানছড়া’ (অর্থাৎ ধানের শিষ) এবং ধান ও চালের ঝুড়িতে ।

যে আমার প্রদর্শিত নীতিমালা মান্য করে চলবে আমি সদাসর্বদা তারই ঘরে দৃশ্যাতীতভাবে বিরাজমান থাকবে। এই কথাগুলো বলে মাহ লখী মা’ চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে পুনরায় স্বর্গে চলে গেলেন।

তথ্যসূত্র: ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

reagan07

Editor

Follow reagan07

Leave a Reply