icon

তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়

Jumjournal

Last updated Nov 17th, 2020 icon 1078

সূচনাঃ

বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত নৃ-তাত্ত্বিক স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমন্ডিত সকল জাতিসত্তার সুদূর অতীতকাল থেকে স্ব-স্ব পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দেয়।

তাঁরা তাঁদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বকীয় সত্তাকে পরম যত্নসহকারে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙ্গালিদের পাশাপাশি ১১ ভাষাভাষি ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি বা আদিবাসী বসবাস করে।

তৎমধ্যে অন্যতম আদিবাসী জনগোষ্ঠি হল তঞ্চঙ্গ্যা। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্বাতন্ত্র স্বকীয় সত্তা ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারা।

তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার উদ্ভব সম্পর্কিত ধারণা:

তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার লোকেরা মনে করে গৌতম বুদ্ধ যে বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেই শাক্যবংশের উত্তরসূরি তঞ্চঙ্গ্যারা অর্থাৎ এক কথায় শাক্যবংশীয় লোক।

‘History of Myanmar’ গ্রন্থে ড. খিন মং নগুনি গি মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে অবস্থিত দ্যোত্তয়াদির অধিবাসী দৈনাকদের সাথে কপিলাবস্তুর শাক্যবংশের সম্পর্ক থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।

নৃ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে তঞ্চঙ্গ্যাগণ দেহের গঠন ও চেহারাগত দিক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠির বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। কর্ণেল এ.পি ফেইরার মতে, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভিন্ন জাতি। তঞ্চঙ্গ্যাদের সামাজিক আচার-আচরণ ও সংস্কৃতি চাকমাদের থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র।

ক্যাপ্টেন লুইনের মতে, তঞ্চঙ্গ্যা বা দৈনাকরা অভিন্ন সম্প্রদায়। দৈনাক জাতির উৎপত্তি সম্পর্কে বিরাজ মোহন দেওয়ান মহাশয় তাঁর ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বিবরণ দিয়েছেন।

বিবরণে দেখা যায়- ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে (৬৯৫ মঘী) ব্রহ্মদেশ বা আরাকানের অক্সা রাজা মেঙ্গদি উত্তর ব্রহ্মের বা আরাকানের চাকমা রাজার রাজধানী মনিজগিরিতে চাক্‌মা রাজা অরুণ যুগকে (ব্রহ্মবাসী বা আরাকানীরা বলেন ইয়ংজ এবং চাকমারা বলেন ইয়ংচ) বিশ্বাসঘাতকার কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে আক্রমণ করলে যুদ্ধে রাজা অরুণযুগ পরাজিত হন এবং দশ হাজার সৈন্য বা প্রজাসহ তিনি বন্দি হন।

আরাকান রাজা মেজদি সেই দশ হাজার সৈন্য বা প্রজাকে আরাকানের অন্তর্গত, এংখ্যং ও ইয়ংখ্যং নামক স্থানে বসবাস করার অনুমতি প্রদান করেন।

সঙ্গে সঙ্গে আরাকান রাজা মেজদি তাদেরকে পূর্বের উপাধি পরিবর্তন করে দৈনাক অর্থাৎ অস্ত্রধারী যোদ্ধা নামে আখ্যায়িত করেন।

তখন চাকমা রাজা অরুণযুগের শাক্যবংশীয় সৈন্যগণ কালো রঙের ঢাল বা তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করতেন। আরাকানি ভাষায় কালো রঙের ঢালকে দাইন অর্থ তলোয়ার আর নাক অর্থ যোদ্ধা অর্থাৎ দৈনাক বা দাইন তলোয়ারধারী বা অস্ত্রধারী যোদ্ধা বুঝায়।

আরাকানি রাজা মেঙ্গদি সম্ভবত কারণে দশ হাজার সৈন্য বা প্রজাকে দৈনাক বা অস্ত্রধারী যোদ্ধা নামে অভিহিত করেছিলেন। এভাবে দৈনাকদের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।

প্রাচীন আরাকান ইতিহাস দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদফুং গ্রন্থে দৈনাক শব্দের পরিচয় পাওয়া যায়। তঞ্চঙ্গ্যা জাতির বিশিষ্ট লেখক শ্রীরতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যার মতে, দৈনাক নামে সম্প্রদায়গণ মূলতঃ তঞ্চঙ্গ্যা জাতির মধ্যে দৈন্যা গছা নামে লোকদেরকে বুঝায়।

বর্তমানে মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের এদের অধিক সংখ্যক বসবাস। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪১৮ খ্রিষ্টাব্দে চাপ্রেই গোত্রের একদল মানুষ অর্থাৎ দৈনকদের একাংশ স্বজাতীয় লোকদের অনুসরণ করে গভীর অরণ্য পাড়ি দিয়ে আরাকান থেকে আলেই খ্যংদ্যং বা আলীকদমে প্রবেশ করেন যাহা বর্তমান বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় মাতামুহুরী নদীর কাছে তৈনগাঙ (মারমারা বলেন তৈনখ্যং) নদীর তীরবর্তীতে তাদের সর্বপ্রথম বসতি গড়ে তোলেন।

তৈনগাঙ হচ্ছে মাতামুহুরী নদীর একটি উপনদী। কালের পরিক্রমায় তারা সেখান থেকে পশ্চিম ও উত্তর দিকে বিস্তৃত হয়ে চাকমা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু তৎকালীন চাকমা রাজা তাঁদেরকে চাকমা হিসেবে স্বীকার না করে সর্ব প্রথমে তৈনগাঙ এর বসতি স্থাপনকারী অধিবাসী বলে তাদেরকে তিনি জুমতৌজীতে তৈনছংগা/তৈনতংগা নামে দলিলভুক্ত করেন।

তৈনছংগা/তৈনতংগা শব্দগুলি পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে এই তঞ্চঙ্গ্যা শব্দটি সকল সরকারি বেসরকারি নথিপত্রে সর্বত্র লিখিত হয়। এই তঞ্চঙ্গ্যা নামে তাঁরা বর্তমানে দেশে বিদেশে সুপরিচিত।

সাধারণত: একটি জনগোষ্ঠি উৎপত্তি ও বিকাশ যে অঞ্চলে ঘটে, সে অঞ্চলে নামানুসারেই অনেক ক্ষেত্রে সে জনগোষ্ঠি বা জনধারা নামকরণ হয়ে থাকে। বাংলাদেশ সংসদে আইন পাশ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য তঞ্চঙ্গ্যাদের তিনটি আসন সংরক্ষণ করা হয়।

বর্তমানে তঞ্চঙ্গ্যারা একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃত। জনসংখ্যার দিক থেকে স্বল্প হলেও দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠির সঙ্গে তঞ্চঙ্গ্যাগণ একাত্ম অনুভব করেন।

Tanchangya traditional dress (For women)
স্বকীয় পোষাক ও অলংকারে তঞ্চঙ্গ্যা কিশোরী, ছবিঃ তঞ্চঙ্গ্যা পরিচিতি – বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা

তঞ্চঙ্গ্যাদের বর্তমান ভূ-খন্ডে আগমনের ইতিহাসঃ

জনশ্রুতি আছে, তঞ্চঙ্গ্যারা পূর্বেকার পরিচয় ‘দৈনাক’ নামে মিয়ানমার বা আরাকান থেকে এসেছিল। মিয়ানমারের রাখাইন ইতিহাসের আলোকে ধারণা পাওয়া যায় দৈনাকদের উৎপত্তি ঘটেছে মিয়ানমার ভু-খন্ডে আরাকানে অবস্থিত প্রাচীন দেঙ্গ্যাওয়াদি।

আরাকানে কলদান নদীর অববাহিকায় অবস্থিত দেঙ্গ্যাওয়াদি নগর। এই দেঙ্গ্যাওয়াদি হচ্ছে আরাকান ভূ-খন্ডের প্রাচীনতম নগরী।

প্রাচীন দেঙ্গ্যাওয়াদির সেই অধিবাসীগণ দৈনাকদের একটি অংশ অতীতে কোনো এক সময় আরাকান থেকে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের ভূ-খন্ডে প্রবেশ করেছিল।

শ্রীরতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যার ‘তঞ্চঙ্গ্যা জাতি’ গ্রন্থে (পৃ-৯) অনুসারে আরাকানিরা দৈনাক বা তঞ্চঙ্গ্যাদেরকে খুবই অত্যাচার করত। সেই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ১৪১৮ খ্রিষ্টাব্দে তারা আরাকানে অবস্থিত চাপ্রেই নামক স্থান পরিত্যাগ করেন।

অতপর গভীর জঙ্গলের ভিতর দিয়ে নাফ নদী পার হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছেন। তৎকালীন চট্টগ্রামের শাসনকর্তা জামাল উদ্দিন তাদেরকে বর্তমানে আলীকদম উপজেলার অন্তর্গত মাতামুহুরী নদীর কাছে তৈনগাঙ নদীর অববাহিকায় ১২টি গ্রামে বসবাস করার অনুমতি দেন।

তিনি ১২টি গ্রামের ১২ জন দল নেতা/গ্রাম প্রধান তালুকদার/আমু নিয়োগ করেছিলেন। সেই বারটি গ্রাম প্রধান/দল/ গোত্রে/আমু থেকে তঞ্চঙ্গ্যাদের ১২টি গছা বা গোত্র সৃষ্টি হয়েছিল। উক্ত ১২টি গ্রামকে বলা হয়েছিল বারতালুক।

এই বারটি গ্রামের ১২টি দল নেতা বা গছা বা গোত্রের নাম তাদের বৈশিষ্ট্য ও আচরণের উপর রাখা হয়।

গছাগুলোর নাম নিম্নরূপঃ

দৈন্যা গছা, ২. মো গছা, ৩. কারবয়া গছা, ৪. মংলা গছা, ৫. স্মেলং গছা, ৬. ল্লাং গছা, ৭. অঙ্য গছা, ৮. তাসসি গছা, ৯. রাঙ্যা গছা, ১০. লাপস্যা গছা, ১১. তামুলুক গছা ও ১২. হাং গছা। প্রতিটি গছা বা গোত্রের মধ্যে অনেকগুলো গুত্তি বা গোষ্ঠীতে বিভক্ত।

আবার প্রতিটি গুত্তির মধ্যে অনেকগুলো ডেল রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে উক্ত ৭নং ক্রমিক পর্যন্ত ৭টি গছার তঞ্চঙ্গ্যা লোক পাওয়া যায়।

অবশিষ্ট ৫টি গছার লোক কালের বিবর্তনে তঞ্চঙ্গ্যাদের উক্ত ৭টি গছার মধ্যে কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসরত চাকমা জাতিতে অন্তর্ভূক্ত হন। অথবা চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁর আমলে পুনরায় তারা আরাকানে চলে যান বলে মনে হয়।

তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়
তঞ্চঙ্গ্যা গছা ও গুত্তির পরিচিতি
তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়
তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়

১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চাকমা রাজা ধরম বক্স খাঁর আমলে ৪০০০ জন দৈনাক বা তঞ্চঙ্গ্যা পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করেন। এ দলের দলনেতা ছিলেন ফাপ্রু।

তিনি তঞ্চঙ্গ্যাদের দলনেতা হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য রাজা ধরম বক্স খাঁর সাথে সাক্ষাতের আবেদন জানান। কিন্তু রাজা ধরম বক্স খাঁ তাকে দলনেতা হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে তার আবেদন প্রত্যাখান করেন।

নিজের মান সম্মান ও ব্যক্তিত্ব ক্ষুন্ন হবার মনোভাবে তিনি আর দেরি না করে আগত অধিকাংশ তঞ্চঙ্গ্যা/দৈনাকদেরকে সঙ্গে নিয়ে পুনরায় আরাকানে প্রত্যাবর্তন করেন।

ইতিহাস সূত্র থেকে জানা যায় ১৮১২-১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে একইভাবে তঞ্চঙ্গ্যা জাতির নেতা শ্রীধন আমুর নেতৃত্বে আর এক দল ৩০০ শত তঞ্চঙ্গ্যা পরিবার পার্বত্য চট্টগ্রামে আগমন করেন। পরঙী নামে এই ৩০০ পরিবার তঞ্চঙ্গ্যা সবাই আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন।

তারা চাকমা রাজা ধরম বক্স খাকে প্রচুর স্বর্ণ ও রৌপ্য উপঢোকন দিয়ে বিলাইছড়ি উপজেলার রাইংখ্যং নদীর তীরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করার সম্মতি লাভ করেন।

সেই কারণে হয়ত রাইংখ্যং উপত্যকা এবং ফারুয়া এলাকাসহ খুব প্রাচীন তঞ্চঙ্গ্যা জনপদ এবং বর্তমানে তঞ্চঙ্গ্যা অধ্যুষিত এলাকা। কথিত আছে, তঞ্চঙ্গ্যারা চাঁদা সংগ্রহ করে সকলে মিলে চাকমা রাজা ধরম বক্স খার জন্য চট্টগ্রামে এক অনুচ্চ পাহাড়ের উপর একটি মনোজ্ঞ সুবৃহৎ দালান তৈরী করে দিয়ে রাজাকে উপহার দিয়েছিলেন।

বর্তমানে তাহা (লালকুঠি) চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারের বাস ভবন রূপে বিদ্যমান রয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যাদের ইতিহাস কোন রাজবংশ বা দলনেতার ইতিহাস নহে। তাদের ইতিহাস তাদের সাধারণ জন মানুষের ইতিহাস।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তঞ্চঙ্গ্যাদের আগমন ও বিকাশের ইতিবৃত্ত যাই হোক না কেন সুদীর্ঘকাল নিজেদের স্বতন্ত্র সত্ত্বার অনুভূতিতে ক্রমে ক্রমে তঞ্চঙ্গ্যাদের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতির জন্ম লাভ ঘটেছে যা এতদঞ্চলের অপরাপর জনগোষ্ঠির কৃষ্টি-সংস্কৃতি থেকে সহজেই আলাদা মনে হয়।

ভৌগলিক অবস্থান ও পরিবেশঃ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থান। এটির আয়তন ১৩,২৯৫ বর্গ কি.মি. (৫,০৮৯ বর্গ মাইল) যাহা সমগ্র বাংলাদেশের এক দশমাংশ ভূমি আয়তন বিশিষ্ট। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, অরণ্য, গাছ-পালা ও নদী উপত্যকা পরিবেষ্টিত আর জীব বৈচিত্র্যময় নানা রকম পশু পাখির সমারোহ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম ১৮৬০ইং সালে এটি একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে এর জন্ম হয়। বর্তমানে উক্ত জেলাটি রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি নামে এই তিন পার্বত্য জেলায় বিভক্ত।

বর্তমানে রাঙ্গামাটি জেলার রাঙ্গামাটি সদর উপজেলায় বিলাইছড়ি, কাপ্তাই ও রাজস্থলী প্রভৃতি উপজেলায় এবং বান্দরবান জেলায় বান্দরবান সদর উপজেলায়, রোয়াংছড়ি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি প্রভৃতি উপজেলায় তঞ্চঙ্গারা বসবাস করছে।

চট্টগ্রাম জেলায় রাঙ্গুনীয়া উপজেলায়, কক্সবাজার জেলায় উখিয়া ও টেকনাফ প্রভৃতি উপজেলায় তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠি বসবাস করছে।

এ ছাড়াও দেশের বাইরে ভারতে ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল ও মণিপুরে এবং মিয়ানমারে আরাকানে তঞ্চঙ্গ্যাদের বসবাস রয়েছে বলে জানা যায়। মিয়ানমারে তঞ্চঙ্গ্যাদেরকে দৈনাক বলে।

তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়
উপজেলার নামসহ তিন পার্বত্য জেলার মানচিত্রের তঞ্চঙ্গ্যা অধ্যুাষিত এলাকাসমুহ

তঞ্চঙ্গ্যাদের জনমিতি ও সামাজিক গতিশীলতাঃ

বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা মতে, বাংলাদেশে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় বসবাসরত মোট তঞ্চঙ্গ্যা জনসংখ্যা ৫১,৭৭৩ জন (সূত্র: ‘দৈনিক প্রথম আলো’ ৩রা জানুয়ারি ২০১২ইং)।

ভারত এবং মিয়ানমারসহ মোট তঞ্চঙ্গ্যা জনসংখ্যা চারি লক্ষাধিক বলে জানা যায়। পূর্বে বলা হয়েছে তঞ্চঙ্গ্যাগণ মঙ্গোলীয় জাতির দলভূক্ত। এরা খর্বাকায়, এদের গালের হার উন্নত, মাথার চুল কালো, গায়ের রং ফর্সা, ছোট চোখ বিশিষ্ট হয়ে থাকে।

তঞ্চঙ্গ্যাদের স্বভাব চরিত্র নম্র, বিনয়ী। তারা সাধারণত সরল সাদাসিধা, বন্ধুভাবাপন্ন, অতিথি পরায়ণ, কঠোর পরিশ্রমী ও উপকারীর প্রতি তারা সর্বদা কৃতজ্ঞচিত্ত।

মানুষের সামাজিক জীবনধারা সর্বদা পরিবর্তনশীল ও গতিশীল। পিতা-মাতার পূর্বের পেশা কৃষিকাজ পরিবর্তন করে বর্তমানে তঞ্চঙ্গ্যা ছেলেমেয়েরা উচ্চ শিক্ষা লাভ করে কিছু সংখ্যক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কলেজের শিক্ষক সরকারি বেসরকারি অফিসে মর্যাদাপূর্ণ পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত আছেন।

তঞ্চঙ্গ্যাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য ‘বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা’ নামক একটি সংস্থা আছে। এই সংস্থায় বর্তমানে বাবু প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা- সভাপতি এবং এ্যাড. দীননাথ তঞ্চঙ্গ্যা- মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

এছাড়াও তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষা, ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষণের জন্য তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা কমিটি কাজ করে যাচ্ছে। এই কমিটির বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ার নব কুমার তঞ্চঙ্গ্যা- আহ্বায়ক এবং শিক্ষক সত্য বিকাশ তঞ্চঙ্গ্যা সদস্য-সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বিবাহ পদ্ধতিঃ

সমাজের মূল ভিত্তি হল বিবাহ। বিবাহ অনুষ্ঠানকে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘সাঙা’ বলা হয়। ইহা পরিবারের পূর্বশর্ত। পরিবার সমাজের স্তম্ভস্বরূপ। তঞ্চঙ্গ্যা পুরুষ বিবাহযোগ্য হলে বিবাহের পূর্বে তাকে অবশ্যই ন্যূনপক্ষে তিনদিন শ্রমণ হয়ে শ্রামণ্য ধর্ম পালন করতে হয়।

সমাজে কতিপয় বিবাহ পদ্ধতি চালু রয়েছে। প্রয়াত শ্ৰী যোগেশচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা তাঁর “তঞ্চঙ্গ্যা উপজাতি” গ্রন্থে বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে সাধারণতঃ ৩ প্রকারের বিবাহ পদ্ধতি রয়েছে।

১। যোগাযোগের মাধ্যমে কন্যার গৃহে বরকে নিয়ে বিবাহ।
২। মনঃ মিলনে পলায়নের মাধ্যমে বিবাহ।
৩। রাণী মেলার সাঙা অর্থাৎ বিধবা বিবাহ।

১। যোগাযোগের মাধ্যমে কন্যার গৃহে বরকে নিয়ে বিবাহঃ

বর্তমানে যোগাযোগের বা আলাপ আলোচনার মাধ্যমে প্রায় যুবক-যুবতীর সে উক্ত সাঙার পদ্ধতি অনুসৃত হয়ে থাকে। এই সাঙার পদ্ধতি অতি সাধারণ এবং অনাড়ম্বর।

এতে বিবাহের কথা পাকাপাকি হয়ে গেলেই নির্দিষ্ট সময়ে করে বিবাহ কর্ম সম্পাদিত হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ভিক্ষু দ্বারা বিবাহ মন্ত্রের মাধ্যমে বিবাহ কর্ম সম্পাদন করা হয়।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে যতপ্রকার বিবাহ পদ্ধতি থাকুক, উহাদের মধ্যে একটি মাত্র সামাজিক প্রথাসিদ্ধ বিবাহ রীতি হলো আলাপ আলোচনা মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ কর্ম সম্পাদন করা।

ছেলের জন্য বৌ আনয়নের সময় হলে ছেলের বাবা কোন এক মনোনীত মেয়ের বাবার কাছে খবর দেন যে, তিনি মেয়ের বাবার কাছে এক পিলাং মদ উপস্থাপন করতে ইচ্ছা পোষণ করেন।

মেয়ের বাবা পর পর ৩ বার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মেয়ের বাবার গৃহে যাতায়াত করেন। অতঃপর বিবাহের দিনে বরকে সাজিয়ে কনের গৃহে নেওয়া হয়।

বরের পেছনে বরের ছোট বোন অথবা ঐ সম্পর্কের পাড়ালীয়া কোন কিশোরী অথবা যুবতী মেয়ে বরের মাথায় পাগড়ীর এক পান্ত হস্তে ধারণ করতঃ মাথায় “ফো কালং” চাপিয়ে কনের গৃহে যাত্রা করে।

(ফোকালং অর্থ কনের জন্য নতুন পোশাক ও গহনাপত্রাদি ভর্তি একটা শিল্প সম্মত বেতের ঠুরুং বিশেষ।)। যথাসময়ে বর পক্ষ কনের গৃহে পৌঁছলেও তাদেরকে সরাসরি গৃহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। বর পক্ষ পৌছার সঙ্গে সঙ্গে কনেকে গৃহের মধ্যবর্তী কোন এক কক্ষে কাপড়ের আড়ালে রাখা হয়।

ইহাকে বলা হয় “বৌ-লুগানা’ অর্থাৎ বৌলুকানো। কনের সহিত আরও একজন যুবতী মেয়ে সম্ভবতঃ কনের বান্ধবী ও লুকানো অবস্থায় থাকে। মজার ব্যাপার, যতক্ষণ কনেকে বিবাহ বাসরে লুকানোর কাজ সম্পন্ন না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বর পক্ষকে গৃহ উঠানেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

কনে লুকানোর কাজ সমাপ্ত হলে কনে পক্ষের একজন খুব সম্ভব করে? ভগ্নীপতি সম্পর্কের এসে বরের মাথার সামান্য উপর ভাগে শূন্যের উপর এক মুরগীর ডিম বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে দিয়ে ডিমটা বরের পেছনের দিকে দূরে ছুরে ফেলে দেয় এবং বরের হস্তধারণ করতঃ যেখানে কনে লুকানো আছে তথায় বরণে নিয়ে বসিয়ে দেয়। ইহাকে বলা হয় ‘জামাইতুলা’।

অতঃপর ফোকালং থেকে যাবতীয় পোশাক ও গহনা পত্রাদি বের করে একস্থানে সাজিয়ে রাখা হয় এবং কনের সহিত যে মেয়েটি লুকানো থাকে সে কাপড় উন্মোচন করতঃ কনেকে সর্ব সমক্ষে প্রকাশ করে দেয়।

বরকে এমন স্থানে বসানো হয় যাতে কাপড় উন্মোচন করা সত্ত্বেও সে কনেকে দেখতে না পায়। কনেকে বর পক্ষে আনীত বস্ত্র ও গহনাদি দ্বারা সজ্জিত করতঃ চুল আচড়িয়ে ভালোভাবে খোঁপা বেঁধে দিয়ে বরের বাম পাশে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়। বরকে যে ব্যক্তি উঠান থেকে বিবাহ বাসরে আনয়ন করে এবং কনের সহিত যে মেয়েটি লুকানো থাকে ওদেরকে বলা হয় ‘ছাবালা’। ছাবালা অর্থ ঘটক। উক্ত ছাবালাদ্বয় বিবাহের যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি পরিচালনা করে থাকে।

প্রথমতঃ ছাবালাদ্বয় মিলে বর ও কনেকে পাশাপাশি করে একটা শ্বেতবস্ত্রখন্ড দ্বারা কোমড়ে বন্ধন করে দেয় এবং উপস্থিত গণমাণ্য লোকদের উদ্দেশ্যে বলে “ও বুড়াবুড়ী পাড়াল্যা গণ্যমান্য লোক, অমূক অমূকীর লাত্তং বাণিদিত্ত্যে, তা-নে ফংগুই দিবার হুম্ আগেনে নাই? অর্থাৎ হে পাড়ার বৃদ্ধ-বৃদ্ধা গণ্যমান্য লোক সকল, অমূক অমূকীর বিবাহের জোড়া বেঁধে দিচ্ছি; এতে আপনাদের হুকুম অর্থাৎ সম্মতি আছে কি নাই?” (লাত্তং অর্থ বিবাহ এবং ফং অর্থ একত্র করা)।

উক্ত প্রকারের পর পর ৩ বার প্রশ্ন করা হয় কিন্তু কেবলমাত্র শেষের বারে একবার ‘আগে’ (আছে) বলে উত্তর দেওয়া হয়। এরপর পুরুষ ছাবালা বরকে এবং মেয়ে ছাবালা কনেকে জড়িয়ে ধরে ৭ বার বসা অবস্থাতেই উঠানো নামানো করে দেয়। একে বলা হয় ‘নাচাই দেনা’। এর অর্থ হলো বিবাহে সম্মতি প্রাপ্ত হওয়ায় বরকনের আনন্দে নৃত্য করা।

অতঃপর বর ও কনের ডান হাতে একত্রিত করে দিয়ে মঙ্গল ঘটের পানি সিঞ্চন করে দেওয়া হয়। এইরূপে বিবাহ কর্ম সম্পন্ন হলে, বর ও কনেকে উপস্থিত বয়োবৃদ্ধদের নিকট নিয়ে গিয়ে একজন একজন করে প্রণাম করতে দেওয়া হয় এবং ঐ সময়ে বয়োজ্যেষ্ঠরা পৈদাং থেকে তুলা ও তুলসহযোগে বর কনের মাথায় খবঙে পাগড়ীতে গুজে দিয়ে আর্শীবাদ করেন।

ইহাকে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বলা হয় “ছে দেনা’ অর্থাৎ আর্শীবাদ দেওয়া। বিবাহের পর ৭ দিন যাবত বরকে শ্বশুরালয়ে অবস্থান করার নিয়ম আছে। অতঃপর কনেকে নিয়ে বর নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করে।

২। মনঃ মিলনে পলায়নের মাধ্যমে বিবাহঃ

মনমিলনে পলায়নের মাধ্যম বিবাহ পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। যেমনঃ কোন যুবক যুবতী, বিবাহের উদ্দেশ্যে রাতে কিম্বা দিনের বেলায় গোপনে কোথাও বা ছেলের গৃহে পালিয়ে যায়। উহাকে বলা হয় ‘ধাইযানা’। ধাইযানা অর্থ পালিয়ে যাওয়া।

পরের দিন ওদের পালিয়ে যাওয়ার সংবাদ মেয়ের বাবা মায়ের নিকট তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় পৌঁছানো হয় এবং অন্য আর একদিন ছেলের বাবার অবর্তমানে অভিভাবকেরা মেয়ের বাবার গৃহে ‘পোই’ গছাতে যান।

এখানে ‘পোই’ অর্থ সম্মান প্রদর্শনের নিমিত্ত নাড়িভূঁড়ি বর্জিত একটা গোটা সেদ্ধ করা মোরগ ও দুই বোতল মদ উপঢোকনকে বুঝায়।

বাবা-মা তাদের মেয়েকে বিবাহ দেবার ইচ্ছা থাকলে উক্ত পোই গ্রহণ কহেন. পলায়ণের মাধ্যমে যে বিবাহ হয় উহাকে বলা “ছিনালী সাঙা”। “ছিনালী সাঙা” অর্থ দোষণীয় বিবাহ।

উক্তরূপ বিবাহে ছেলেকে ১২ টাকা এবং মেয়েকে ৬ টাকা জরিমানা করা হয়। (বর্তমানে ছেলেকে ২৫ টাকা এবং মেয়েকে ১২ টাকা জরিমানা করায়)। বিবাহ হউক বা না হউক উক্ত জরিমানার টাকা অবশ্যই পরিশোধ করতে হয়।

ইহা ব্যতীত পাড়ালীয়ার মান হিসাবে একটা মর্দা শুকর ছেলে ও মেয়েকে জরিমানা করা হয় এবং ওই শুকর বধ করে কোনও এক অবস্থাপন্ন বা পাড়ার কার্বারী গৃহে পাড়ালীয়ারা একত্রে মিলে বন্ধন করে খায়।

কোন কোন ক্ষেত্রে উক্ত শুকরের পরিবর্তে ৫ টাকা জরিমানা করা হয় এবং বিচারকালে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত যতজন পুরুষ উপস্থিত থাকে উক্ত টাকা তাদের মধ্যে সমান হারে বন্টন করে দেওয়া হয়। ইহাকে বলা ছিনালী শুগর খানা। শুকরকে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বলা “শুগ” বা “শুগর”।

বিবাহ কর্ম সম্পাদিত হয় মেয়ে পিতৃগহে। বিবাহে কোনরূপ আড়ম্বরতা নেই। কেবল ছেলে ও মেয়ে উভয়ে মেয়ের বাবা মায়ের কাছে একটা ‘পোই’ গছিয়ে আশীর্বাদ নেয়। ইহাকে বলা হয় “সেপ মাগানা”। “সেপ মাগানা” অর্থ আর্শীবাদ চাওয়া।

ছেলে ও মেয়ে পলায়নের পর মেয়ের বাবা ও মা ইচ্ছা করলে বিচারের দিন মেয়েকে ফেরৎ নিতে পারেন, উহাতে কেহ বাধা দিতে পারে না।

কিন্তু পর পর যদি ছেলে ও মেয়ে একত্রে মিলে তিনবার পালিয়ে যায় তৎক্ষেত্রে শেষবারে মেয়ের বাব তাদের মেয়ের উপর আর কোন দাবী করতে পারে না। বিচারের আগে ছেলে মেয়ে যতবার পালিয়ে যাক না কেন, উহাদের কেবল একবারই জারমানা দিতে হয়।

মেয়ের বাবা যত টাকা ইচ্ছা ছেলের নিকট দাবী করতে পারেন এবং ৩৭ অবশ্যই পোই গ্রহণের আগে করতে হয় নতুবা পরবর্তীকালে তার কোন করার উপায় থাকে না।

উক্ত দাবী করাকে বলা হয় “দাবা” দাবা অর্থ মাতা দুধালী টাকা হিসাবে ৭ টাকা পর্যন্ত দাবী করতে পারেন। মনমিলনে পলায়নের মাধ্যমে বিবাহ আজকাল তঞ্চঙ্গ্যা দৈন্যাগছা ও মোগছাদে বেলায় অধিক প্রচলিত। এর কারণ আর্থিক অস্বচ্ছলতা, সামাজিক অবক্ষয় ইত্যাদি।

৩। রানী মেলার সাঙা অর্থাৎ বিধবা বিবাহঃ

যদি কোন বিবাহিত পুরুষ অথবা বিধবা রমণী পুনঃ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে যায় তৎস্থলে অতি সাধারণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেই বিবাহ কর্ম সম্পাদন করা হয়। উহাকেই বলা হয় ‘রাণী মেলা সাঙা’। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিধবা রমণীকে ‘রাণী’ এবং মেয়ে বা স্ত্রী লোককে বলা হয় ’মেলা’।

Traditional attire of Tanchangya
স্বজাতীয় পোষাকে তঞ্চঙ্গ্যারা, ছবিঃ বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা জাতীয় ঘিলা খেলা গোল্ডকাপ টুর্ণামেন্টের ফেসবুক পেজ

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে বিবাহে বৈধ ও অবৈধঃ

বৈধঃ

সম্পর্কের বেলায় ঘনিষ্ঠ কিম্বা দূরের হোক মামাতো, পিসতুতো, মেসতুতো ভাইবোনদের মধ্যে বিবাহ হতে পারে। বড় ভাই এর শালীকা, বড়বোনের ননদ, বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তার বিধবা অথবা তালাক দেওয়া স্ত্রীকে বিবাহ করা চলে।

শালীকা কিম্বা একই পরিবারভুক্ত না হলে পিতামহ অথবা মাতামহ সম্পর্কের নান্নীর বিবাহ হতে পারে।

অবৈধঃ

সহোদরাভগ্নী, বিমাতা, ভাগ্নী, ভাইঝি, মামী, পিসী, মাসী, চাচী, জেঠি ইত্যাদি সম্পর্কীয়া হলে বিবাহ করা চলেনা। সহোদয় ভ্রাতাদের ছেলেমেয়েদের মধ্যে, একই পিতার ঔরসে ভিন্ন মাতার ছেলেমেয়েদের মধ্যে, স্ত্রীর বড় বোন অথবা স্ত্রীর বিমাতা, স্ত্রী ভাইঝি ইত্যাদি বিবাহ করা চলে না।

কেহ অবৈধ সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ করলে জরিমানা ও সমাজ থেকে বহিস্কার উভয় শাস্তিই একত্রে করা হয়ে থাকে।

যদি কেহ উপরোক্ত অবৈধ বিবাহ করে, জাতীয় বিচারে হেডম্যান সর্বোচ্চ ২৫ টাকা ও রাজাবাহাদুর (চাকমা রাজা) ৫০ টাকা অপরাধীকে জরিমানা করতে পারেন। তদুপরি উপরোক্ত অবৈধ সম্পর্কের বিবাহিত নরনারী দু’জনকেই মাথার চুল খন্ড খন্ড করে হেঁটে দিয়ে কোন এক বটবৃক্ষের গোড়ায় বহু ছিদ্র বিশিষ্ট কলসী দ্বারা ১০০ কলসী, ৫০০ কলসী জল ঢালতে দেওয়া হয়।

পুরুষ অপরাধীকে অতিরিক্ত শাস্তি স্বরূপ মুরগীর খাঁচা গলায় বেঁধে দিয়ে চেরা বাঁশের ঢেরা পিটিয়ে নিজের অপরাধের কথা বলে বলে সারা গ্রাম প্রদক্ষিণ করতে দেওয়া হয়।

অতঃপর পরিশুদ্ধিতার জন্য অপরাধী দু’জনকে বৌদ্ধ ভিক্ষুর কাছে পবিত্র মঙ্গল সূত্রাদি শ্রবণ করতে হয়। উপরোক্ত শাস্তিপ্রাপ্ত নারী কিম্বা পুরুষ উক্ত নির্দেশগুলো প্রতিপালন না করা পর্যন্ত তাদেরকে সমাজচ্যুত বলে গণ্য করা হয় এবং এই সময়ের মধ্যে তাদেরকে নিয়ে সামাজিক ক্রিয়াকলাপাদি করা নিষিদ্ধ। ইহাকে বলা হয় “জাতের বার বা সমাজচ্যুত করা”।

বিবিধঃ

(১) কোন স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যদি মনের মিল না হলে তৎক্ষেত্রে আপোষে উভয়ে মধ্যে ছাড়াছাড়ি অর্থাৎ তালাক হতে পারে। এক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রী উভয়ে পাল কার্বারী কিম্বা মৌজার হেডম্যানের নিকট গিয়ে ছাড়াছাড়ি বা তালাকনামা সম্পাদন করে। ইহাকে বলা হয় “শুগ কাগচ্ দেনা”।

(২) যদি স্বামী দোষে ছাড়াছাড়ি হয় তাহলে বিবাহের সময় পাওয়া বস্তু এ অলঙ্কারাদি তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীর ফেরত দিতে হয় না। স্বামী কোন প্রকার খরচাদিও পায় না। অধিকন্তু স্ত্রীর মানহানির জন্য স্বামীর অর্থ দন্ড দিতে হয়। ইহাকে বলা হয় “মানহানিতেঙা”।

(৩) স্ত্রীর দোষে যদি ছাড়াছাড়ি হয়, তাহলে স্ত্রীকে বিবাহের সময় দেওয়া যাবতীয় বস্ত্র ও গহনা পত্রগুলো স্বামী ফেরত পায়। এতদ্ব্যতীত বিবাহের সময় স্বামীর দেওয়া কন্যাপণ বা ‘দাবা’ ও বিবাহের খরচ সম্পূর্ণ কিম্বা আংশিকভাবে তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীর দিতে হয় এবং ঐ সাথে স্বামীকে মান হানি তেঙাও দিতে হয়।

(৪) স্ত্রীকে অযথা উৎপীড়ন অথবা নিষ্ঠুরভাবে মারধর করলে সেই অত্যাচারীতা স্ত্রীকে স্বামীর স্ত্রীত্ব থেকে ছাড়াছাড়ি করে দেওয়া হয়। অপেক্ষাকৃত লঘু অপরাধে প্রথম বারের মত স্ত্রী ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিতে অপরাধী স্বামীর নিকট থেকে ‘মুছুলেখা’ নিয়ে স্ত্রীকে স্বামীর হেফাজতে দেওয়া হতে পারে।

(৫) স্বামী কর্তৃক স্ত্রীসহবাসে অক্ষম প্রমাণিত হলে, সমাজ ছাড়াছাড়ি হওয়ার ব্যাপারে কিছু করতে সমর্থ নহে। যদি স্ত্রী স্বামীকে উপরোক্ত অভিযোগে প্রমাণাদিসহ ছাড়াছাড়ি অর্থাৎ তালাক নামা দিতে চায় তৎক্ষেত্রে ছাড়াছাড়ি করে দেওয়া হয়।

(৬) বিবাহিতা কিম্বা অবিবাহিতা নারীর সহিত যদি অপর বিবাহিত কিম্বা অবিবাহিত পুরুষের গুপ্ত প্রণয় এবং দৈহিক মিলনের অপরাধ প্রমানিত হয় তৎক্ষেত্রে তাদের উভয়কেই ‘ছিনালী’ অপরাধে দন্ডিত করা হয়।

এই দন্ড আর্থিক এবং সামাজিক খানার জন্য নির্দিষ্ট মাপের একটা মর্দা শুকর আদায় করা হয়। অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে বড় ছোট মাপের শুকর জরিমানা করা হয়। যেমন“তিন মূট্যা” “পাঁচ মূট্যা” “সাত মূট্যা শুকর” ইত্যাদি।

(৭) কারো বাড়ীতে বিবাহের সম্বন্ধ ঠিক করতে কেহ আনাগোনা শুরু করলে, ” একটা চড়ান্ত ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোন দ্বিতীয় পক্ষ ওই বাড়িতে একই মেয়েকে বৌ দেখতে যাওয়া সামাজিক রীতিমতে নিষিদ্ধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ।

(৮) কোন পুরুষ বিবাহ করার সময় অন্ততঃ যেন তেন প্রকারের একটা সামাজিক খানা না দিলে তার সামাজিক অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়।

সামাজিক খানা না দিয়ে বিবাহিত কোন লোকের মৃত্যু হলে তার মৃতদেহ কাঁধে বহন করে শ্মশানে নেওয়া নিষিদ্ধ। সামাজিক রীতিমতে তার মৃতদেহ অসম্মানজনকভাবে হাঁটুর নীচে রেখে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।

(৯) ভাগ্নে-বৌ, পুত্র বধু, ছোটভাই এর স্ত্রী এবং স্ত্রীর বড় বোনকে স্পর্শ করা সামাজিক রীতিমতে নিষিদ্ধ। এই অপরাধে অভিযুক্ত হলে অপরাধীর জরিমানা হতে পারে, এমনকি অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে ‘জাতের বার’ করা হয়ে থাকে।

(১০) বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের কর্থাবার্তা পাকাপাকি হয়ে গেলে কন্যাকর্তা কোন কারণেই ওই পাত্রের সহিত মেয়ের বিবাহ দিতে অসম্মত কিম্বা অপারগ হলে বরকর্তার আপত্তি ক্রমে সামাজিক বিচারে তাকে চুক্তিভঙ্গের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা এবং বৌ দেখতে যাওয়া আসর সম্পূর্ণ খরচসহ মানহানির দন্ডে দন্ডিত করা হয়।

(১১) কোন পুরুষ অথবা স্ত্রীলোক যদি অপর কোন পুরুষ কিম্বা স্ত্রীলোকের নামে গুপ্ত প্রণয়ের অপবাদ দিয়ে থাকে, সামাজিক রীতিমতে তা প্রমাণ করতে অপারগ হলে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার কারণে এবং মানহানির জন্য তাকে জরিমানা করা হয়।

(১২) কুমারী কিম্বা বিধবা স্ত্রীলোকের অবৈধ গর্ভ সঞ্চার হলে, তাকে ব্যভিচার দোষে সামাজিক আদালতে (হেডম্যান কিম্বা কার্বারী গৃহে) অভিযুক্ত করা হয়ে থাকে।

তখন সে তার অবৈধ গর্ভের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে সামাজিক আদালতে হাজির করে উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারলে ছিনালী অপরাধে পুরুষটির সাজা হয়।

কিন্তু প্রমাণ করতে না পারলে অবৈধ গর্ভবর্তীর একাকিনীই দন্ড এবং পাড়ালিয়াকে মানহানির টাকা দিতে হয়। তঞ্চঙ্গ্যাদের মধ্যে রয়েছে সামাজিক আইন।

রয়েছে বৈধ বিবাহ পদ্ধতি। তাছাড়া আরো রয়েছে অবৈধ বিবাহ ঘটিত জাতীয় বিচার ও দন্ডবিধি প্রদান। ছেলেমেয়েদের বিয়েতে পিতা-মাতাদের মতামতই প্রাধান্য দেয়া হয়।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রথাঃ

তঞ্চঙ্গ্যাদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রথা চাকমাদেরই মত। যেমনঃ

(১) পিতার মৃত্যুর পর পুত্র সন্তানেরাই উত্তরাধিকার সূত্রে সমান অংশে সম্পত্তির মালিক হয়।  (এখানে সম্পত্তি বলতে জমিজমা, গৃহের আসবাবপত্র, গরু, মহিষ ইত্যাদিকে বুঝানো হচ্ছে।

কন্যা সন্তানেরা পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা দাবী করতে পারে না, তবে পিতার যদি কোন পুত্র সন্তান না থাকে কেবল তৎক্ষেত্রেই কন্য সন্তানেরা পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা দাবী করতে পারে।

(২) মৃত ব্যক্তির একাধিক পত্নী থাকলে উহাদের পুত্র সন্তানেরা সম্পত্তি পেয়ে থাকে।

(৩) উন্মাদ অথবা সংসার ত্যাগী অথবা পিতার জীবিতাবস্থায় পথ সন্তানেরা পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির সমান অংশ পায়।

(৪) মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত কোন পুত্র বা কন্যা সন্তান না থাকলে যদি তার পালিত পুত্র থাকে; তৎক্ষেত্রে সেই পালিত পুত্রই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু তাকে অবশ্যই মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর ভরণ পোষণ করতে হয়; অন্যথায় মত ব্যক্তির বিধবা স্ত্রী সম্পত্তির একাংশ পায়।

(৫) পিতার মৃত্যু পূর্বে যদি কোন পুত্রের মৃত্যু হয় এবং সেই পুত্রের ঔরস জাত পুত্র সন্তানাদি থাকে তৎক্ষেত্রে পিতামহের মৃত্যু পর দৌহিত্র সূত্রে তারা সম্পত্তির অংশ পায়।

(৬) কোন স্ত্রীলোক যদি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তালাক প্রাপ্ত হয় এবং সেই গর্ভে যদি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়, তবে সেই সন্তান পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির অংশীদার হতে পারে।

(৭) যদি কোন বিধবা অথবা তালাক প্রাপ্ত স্ত্রীলোকের পুত্র সন্তান থাকে এবং সে অবস্থায় যদি সে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করে, সেই পুত্র সন্তানেরা তাদের মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর তত্ত্বাবধানে থাকলেও উহারা মায়ের পূর্ব স্বামীর মৃত্যুর পর সম্পত্তির অংশ থেকে বঞ্চিত হয় না।

(৮) অবৈধ সন্তানেরা সম্পত্তির অংশীদার হতে পারে না। তবে তারা যে ঔরসজাত সেই ব্যক্তির মৃত্যুর পর উহার সম্পত্তির অংশ পেতে পারে।

(৯) যদি কোন ব্যক্তি অবিবাহিত অবস্থায় অথবা বিবাহ করেও নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায় তৎক্ষেত্রে তার প্রাপ্য অংশ তার জীবিত সহোদর ভ্রাতাগণ সমা বন্টন করে নিতে পারে।

(১০) যদি কোন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তার সম্পত্তির কোন অংশ কাহাকেও দানপত্র করে দিয়ে যায় তৎক্ষেত্রে দাতার মৃত্যুর আগে বা পরে দান গ্রহিতা ব্যাক্তি সম্পত্তির মালিক হতে পারে।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের শবদাহ বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াঃ

কোন লোকের মৃত্যু হলে সঙ্গে সঙ্গে মৃত ব্যক্তির মুখের ভিতর একটা রৌপ্য মুদ্রা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ওই টাকাকে ‘মুঅতেঙা’ অর্থাৎ মুখের টাকা বলা হয়।

উক্ত টাকা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো মৃত ব্যক্তির পরলোকে পরপারে অর্থাৎ ভব নদী অপর পাড়ে পাড়ি দেওয়ার খরচ সঙ্গে দেওয়া।

অতঃপর শবকে স্নান করানো হয় এবং নুতন শ্বেত বস্ত্র পরিধান করিয়ে বাঁশ দ্বারা তৈরী পর্যঙ্কের (তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় আলং) উপর নতুন শ্বেতবস্ত্র খন্ড আপাদ মস্তক ঢেকে শয়নাবস্থায় রাখা হয়।

আত্মীয় ও হিতৈষী লোকেরা শবের বুকের উপর টাকা পয়সা যা যেমন ইচ্ছা রেখে দিয়ে যায় ওই টাকা পয়সাকে বলা হয় “বুগতেঙা” অর্থাৎ বুকের টাকা।

সাধারণতঃ শবকে গৃহ বারান্ডায় ওইভাবে এক বা একাধিক রাত্রি পর্যন্ত রাখা হয়। বুধবার কিম্বা অমাবশ্যার দিন শবকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া রীতি বিরুদ্ধ।

যে দিন শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয় সেদিন সকালে বাড়ীর উঠানে কাঠের কফিন প্রস্তুত করতঃ শবকে উহাতে স্থাপন করা হয় এবং শবের জন্য ভাত সিদ্ধ করতঃ শবের মুখে কিঞ্চিৎ গুঁজে দিয়ে অবশিষ্টাংশ কলাপাতা দিয়ে ’মোচা’ বেঁধে সঙ্গে দেওয়া হয়।

এর অর্থ হলোঃ- কোন লোক দীর্ঘ দিনের জন্য দূরে যেতে হলে যেমন বাড়ীতে ভাত খেয়ে আর একটা ভাতের মোচা সঙ্গে নিয়ে যায়; দ্রুপ মৃত ব্যক্তিকেও দেওয়া হয়।

শবকে গৃহ থেকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার পূর্বেই শ্মশানে শুকনা কাঠ দিয়ে চিতা প্রস্তুত করে রাখা হয়। চিতা-পুরুষের বেলায় ৫ স্তর এবং স্ত্রীলোকের বেলায় ৭ স্তর করা হয়। শবকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে পুরুষ হলে পূর্ব মুখী এবং স্ত্রীলোক হলে পশ্চিম মুখী করে চিতায় স্থাপন করা হয়।

অতঃপর ভিক্ষুর নিকট শবযাত্রীরা পঞ্চশীল গ্রহন ও মঙ্গল-সূত্রাদি শ্রবণ করতঃ মৃত ব্যক্তির পারলৌকিক সদগতি কামনায় সাধ্যমত টাকা পয়সা ভিক্ষুকে দান করে এবং উহা উৎসর্গ করে দেয়।

যথারীতি পূণ্য কর্মাদি করণান্তে প্রথমে জ্যেষ্ঠ পুত্র কিম্বা জনৈক আত্মীয় চিতাকে ৭ বার প্রদক্ষিণ করতঃ শবের মুখে অগ্নি স্থাপন করে এবং চিতায় অগ্নি সংযোগ করে দেয়।

(কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি মহামারী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শবকে দাহ না করে কবর দেওয়া হয়। দাহকার্য সমাপ্ত হলে শ্মশান হতে ফেরার সময় স্নান অথবা হাত পা মুখ ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ্যাদি ধৌত করনান্তে শুদ্ধ হয়ে নিজ নিজ গৃহে প্রবেশ করতে হয়।

শবদাহের পরের দিন প্রাতেঃ শ্মশানে গিয়ে স্বগোত্রীয় একজনের দ্বারা শবের ভবিশিষ্টের অস্থির বিভিন্ন অংশ থেকে সামান্য গ্রহণ করতঃ একটা নতুন মাটির হাঁড়িতে প্রবিষ্ট করিয়ে নতুন শ্বেতবস্ত্র দ্বারা হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে আত্মীয় লোকটি জলে ডুবন্ত উক্ত মাটির হাঁড়িটা পেছনের দিকে মাথার উপর দিয়ে ফেলে দেয় এবং ডুবন্ত লোকটি ডান হাত পানির উপরে রাখার সঙ্গে সঙ্গে অন্য একজন ডসন লোকটির কনিষ্ঠ অঙ্গুলীতে সূতা দিনে বন্ধন করতঃ টান দিয়ে তুলে।

তঞ্চঙ্গ্যাদের বিশ্বাস, উক্ত প্রকারে অস্থি নদীতে ফেলে দিলে ওই অস্থিসমূহের কোন অংশ এক সময় না হয় আর এক সময় ভেসে দিয়ে পবিত্র গঙ্গানদীতে ও বদ্ধগয়ায় পতিত হবে এবং এতে মৃতব্যক্তির সদগতি হতে পারে।

অস্থি বিসর্জনের পূর্বে অবশ্য অস্থিগুলো নেওয়ার পর শ্মশানের উপরিভাগে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে চারকোন ঘিরে ৭ নাল সাদা সূতা বেড়িয়ে দেওয়া হয় এবং উপরে চাঁদোয়া খাটিয়ে দেওয়া হয়।

বেড়ার মাঝখানে একটা জলপূর্ণ কলসী সাদা কাপড় দ্বারা মুখ বাঁধা অবস্থায় রেখে দেওয়া হয় এবং উহার সহিত বই, কলম, চিরুণী, আয়না, পাংখা, সুগন্ধি দ্রব্যাদিও রেখে দেওয়া হয়। অতঃপর ৪টি বাঁশের আগায় ৪ খানা লম্বা সাদা বস্ত্র খন্ড শ্মশানের ৪ কোণায় পুঁতে দেওয়া হয়। এগুলোকে বলা হয় “টাংকোআইন”।

শবদাহের ৬ দিন পর সাপ্তাহিক ক্রিয়া করে দেওয়া হয়। উহাকে বলা হয় “সাতদিন্যা”। উহাতে যথারীতি ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ ও সমাজের বিভিন্নস্তরের লোকদিগকে নিমন্ত্রণ করা হয় এবং গৃহীর সাধ্যমত বিবিধ ভোজ্য উপকরণাদি দ্বারা উপস্থিত সকলকে ভোজের তৃপ্তিদানের চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

ওই সময়ে মৃতব্যক্তির উদ্দেশ্যে টাকা পয়সাসহ বিবিধ গৃহ সামগ্রী ভিক্ষু সংঘকে দান করা হয়। এবং দানের সময় সকলে উপবেশন করতঃ ধর্মদেশনাদি শবণান্তর দানীয় বস্তুসমূহ উৎসর্গ করে দেওয়া হয়।

অবস্থাপন্ন পরিবারের বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মৃত্যু হলে দাহ করার পূর্বে স্বাধীন রাজার অনুকরণে গাড়ী টানার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। তবে উহার কোন বাধ্যবাধকতা নেই।

বোধিসত্বের পূর্ব জন্ম বৃত্তান্ত জাতকে স্বাধীন রাজা স্বশরীরে দেবলোকে গমন করেন বলে উল্লেখ আছে। দেবলোকে তিনি দিব্য রথে আরোহন করে যান- ইহার স্মরণে রথ টানা হয়।

Tanchangya people by Heronmoy Tanchangya Emon
Tanchangya people by Heronmoy Tanchangya Emon

তঞ্চঙ্গ্যাদের সমাজ কাঠামো অর্থনীতিঃ

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে পিতার মৃত্যুর পর পুত্ররা সম্পত্তির মালিক হন। কন্যারা পিতার সম্পদে উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক হয় না।

অর্থাৎ পিতৃতান্ত্রিক পরিবার পদ্ধতি বিদ্যমান। তঞ্চঙ্গ্যাদের সমাজের বিচারিক কার্য পরিচালনা করেন পাড়া বা গ্রাম প্রধান কার্বারী। তাকে জনগণ নয়, হেডম্যান নির্বাচন করেন। তিনি গ্রামের লোকে বিচার কার্য সম্পন্ন করেন।

ছোট-খাট সামাজিক বিষয়ে কার্বারী মত প্রদান এবং সমাধান দেন। জটিল বিষয় নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে হেডম্যানের সাহায্য গ্রহন করেন।

জুম প্রধান অর্থনীতির উপর নির্ভর করে অধিকাংশ তঞ্চঙ্গ্যা জীবিকা নির্বাহ করেন। তারা পাহাড়ে ঢালু জমিতে চাষাবাদ করে ধান ও বিভিন্ন মৌসুমী ফসল উৎপাদন করেন।

ইহাকে জুম চাষ বলে। উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করণের মাধ্যমে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর উপকূলবর্তী এলাকায় অনেক তঞ্চঙ্গ্যা নদীতে মাছ ধরে বিক্রি করেও জীবিকা নির্বাহ করেন। তবে বর্তমানে কৃষি কাজের বাইরেও তঞ্চঙ্গ্যারা বিভিন্ন পেশায় সরকারি বেসরকারি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন।

তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষাঃ

তঞ্চঙ্গ্যা জাতির নিজস্ব ভাষা রয়েছে। ড. জি.এ. গিয়ারসনের মতে, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা আলাদা আলাদা হলেও উভয় ভাষাকে ইন্দো-এ্যারিয়ান ভাষার অন্তর্ভূক্ত বলে উল্লেখ আছে।

তাদের ভাষার মূল উৎস হচ্ছে পালি, প্রাকৃত ও সংস্কৃত ইত্যাদি ভারতীয় আর্য ভাষা। তঞ্চঙ্গ্যাদের নিজস্ব লিপি বা বর্ণমালা রয়েছে। তাদের লিপি বার্মিজ লিপির অনুরূপ।

বর্তমানে তঞ্চঙ্গ্যা বর্ণমালা হলো দৈনাক বর্ণমালা। সাম্প্রতিকালে বিবিধ কারণে বহু বাংলা শব্দ সরাসরি তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় প্রবেশ করেছে এবং এই প্রবেশের ধারা অব্যাহত রয়েছে; সম্ভবত তা ভবিষ্যতেও থাকবে।

আগেকার দিনে বৃদ্ধজনেরা আরাকানি ভাষায় কথা বলেন এবং বর্তমানে তরুণেরা দৈনন্দিন কথাবার্তায় তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার সঙ্গে কিছু কিছু বাংলা শব্দ ব্যবহার করেন।

তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়
তঞ্চঙ্গ্যা আদি লিপি বা বর্ণমালা
তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়
তঞ্চঙ্গ্যা আদি লিপি বা বর্ণমালা
তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়
তঞ্চঙ্গ্যা আদি লিপি বা বর্ণমালা

তঞ্চঙ্গ্যাদের আচার-অনুষ্ঠানঃ

তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান সামাজিক উৎসব হল ‘বিষু’। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায় অনুষ্ঠানকে অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তিকে বিষু বলে। এ  বিষুকে তিন দিনে বিভক্ত করে তিন নামে অভিহিত করা হয়।

২৯ শে চৈত্র ও ৩০ শে চৈত্র মূল বিষু এবং নববর্ষের বৈশাখ মাসের প্রথম দিনকে নোয়া বছর বা নতুন বছর হিসেবে পালন করা হয়। এই ফুল বিষু ও মূল বিষু দিনে বছরকে বিদায় ও বৈশাখ মাসের প্রথম দিন নতুন বছরকে বরণ করা হয়।

ফুল বিষু দিনে তঞ্চঙ্গ্যা যুবক-যুবতীরা পানিতে ফুল ভাসায়, জল বুদ্ধকে বন্দনা করে, ফুল দিয়ে ঘর সাজাই, ঘরের আশ-পাশ ও ঘরের আঙিনা পরিষ্কার করে।

মূল বিষু দিনে তারা পাড়ার বৃদ্ধ লোকদেরকে সেবা যত্ন করে ও বাড়ীতে গিয়ে তাদের করায় এবং তাদের নিকট পায়ে ধরে প্রণাম করেন। আশীর্বাদ প্রার্থনা করে, নতুন বছরে সবাই সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারেন।

আর নোয়া বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ বৈশাখ মাসের প্রথম দিন সকলে বৌদ্ধ বিহারে যান। বুদ্ধ পূজা করে, পঞ্চশীল গ্রহন করেন। অনেকে অষ্টশীল পালন করেন। বিষুর সময় ঘরে ঘরে আনন্দ উৎসবের সাড়া পড়ে যায়। আত্মীয় স্বজন একজন অন্যজনের বাড়ীতে বেড়াতে যান এবং আসেন।

এ তিন দিন মুখরোচক খাবার বিন্নি পিঠা, চান্যা পিঠা, কলা পিঠাসহ নানারকম পিঠা এবং শাক-সবজি ও ফলমূল দিয়ে পাঁচন নামক বিশেষ খাবার রান্না করে অতিথিদেরকে সাদরে পরিবেশন করা হয়।

বিষু দিনে তঞ্চঙ্গ্যা যুবক-যুবতীরা ঘরের উঠানে ঐতিহ্যবাহী ঘিলা খেলা আয়োজন করে আনন্দ করে থাকেন। আগেকার দিনে সামাজিক অনুষ্ঠানে মদের ব্যবহার থাকলেও বর্তমানে আস্তে আস্তে তঞ্চঙ্গ্যাদের মদের ব্যবহার কমে আসছে।

তঞ্চঙ্গ্যারা নবান্ন উৎসব পালন করে থাকেন। জুমের ধান ঘরে তুলে তারা নবান্ন উৎসব করে থাকেন। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ইহাকে নোয়া ভাত খাওয়া বলে। পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে নিমন্ত্রণ করে সাধ্যমত মাছ, মাংস দিয়ে ভাত খাওয়ানো হয়।

এছাড়াও তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে আরও কতিপয় সামাজিক অনুষ্ঠানাদি প্রচলিত আছে যেমনঃ ছেলেদের ‘ধুতী পোই’ও মেয়েদের ‘কানফোড়া পোই’, ‘খার পরিবারের জন্য ঔয়্যা পোই হয়ে থাকে। সাধারণতঃ এসব পোই পারিং করা হয়। পোই অর্থ অর্ঘ বা পূজা।

এই সমস্ত পোই কিন্তু সকলের জন্য অবশ্য করণীয় নহে। এগুলো এক প্রকার ‘মানস’ করার জন্য করা হয়ে থাকে।

যেমনঃ কোন স্বামী স্ত্রী মানস করে যে যদি পুত্র সন্তান জন্ম নেয় তাহলে উক্ত ধূতী পোই করাবেন। অতপরঃ যদি পুত্র সন্তান জন্ম নেয় তাহলে উক্ত ধুতী পোই আয়োজন না করা পর্যন্ত ছেলে ধূতী পরিধান করতে পারবে না।

মেয়েদের কানফোড়া, খারি পোই উক্তরূপ মানসের কারণে করা হয়ে থাকে। মেয়ে সন্তান জন্ম নেওয়ার পর উক্ত পোই না করা পর্যন্ত মেয়েকে কানফোড়া ও খারি (বক্ষ বন্ধনী) দিতে পারে না।

পরিবারের মঙ্গলের জন্য ঔয়্যা পোই করা হয়ে থাকে। এ ধরনের অনুষ্ঠানে সাধ্যানুসারে দুই চারটি শুকর, বিশ চল্লিশটি মোরগ এবং প্রচুর পরিমাণে মদ, জগা, কাইঞ্চো প্রয়োজন হয়।

অনেকেই মহিষ দিয়ে পোই করে থাকে। তবে মদ, কাইঞ্চো ইত্যাদি ছাড়াও মোরগ অবশ্যই প্রয়োজন হয়। পোই করতে হলে সেদিন প্রথমে আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে শুধুমাত্র মাংস ইচ্ছে মতো খেতে দিতে হয়।

উক্ত পোই বা মানস সম্পাদনের মাধ্যমে বয়োজ্যেষ্টদের আর্শীবাদ নিয়ে মানসকৃত ছেলে ও মেয়েদের ভবিষ্যত জীবনের সুখ, শান্তি ও মঙ্গল কামনাও করা হয়। আর্শীবাদ প্রদানকারী বা সিবলী প্রদানকারীগণকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।

যেমন, মাংখোয়াইন (বিবাহিত), রানা-রানী (বিপত্মীক ও বিধবা) এবং গাবুজ্যা-গাবুরী (যুবক-যুবতী)। প্রতিটি দল আলাদাভাবে পোই পেয়ে থাকে এবং তাদের দলে যিনি সবার জ্যেষ্ঠ কিংবা সম্মানীত তিনিই সর্বপ্রথম পোই গ্রহণ করেন এবং টাকা প্রদান করেন।

তিনি আর্শিব্বাদ স্বরূপ যতো টাকা বখশিষ দেবেন তার পরবর্তী লোক তত টাকা দিতে পারবেন।

প্রথম ব্যক্তির চেয়ে বেশী দিতে পারবেন। যদি প্রথম জ্যেষ্ঠ ও সম্মানী ব্যক্তির চেয়ে অন্য কেহ বেশী টাকা প্রদান করেন তাহলে টাকার বাহাদুরী কিংবা প্রথম ব্যক্তির মানহানীর প্রতিবাদে বিবাদ এমন কি পক্ষ বিপক্ষ হয়ে মারামারিও হয়ে যায়।

তঞ্চঙ্গ্যারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী হয়ে অনেকে গাঙ পূজা, ভূত পূজা, চুমুলাঙ পূজা, মিত্তিনী পূজা, লক্ষ্মী পূজা, খে পূজা, মাড়াধয়ানা ইত্যাদি পূজা করে থাকে।

উক্ত পূজা সম্পাদনের জন্য সমাজের এক ধরণের লোক থাকে যাদেরকে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বৈদ্য অসা বলে। কাল্পনীক দেব-দেবীর নামে মোরগ-মুরগী, শুকর, ছাগল, হাস, কবুতর ইত্যাদি গৃহপালিত পশু-পাখি বধ করে পূজা দিয়ে থাকেন।

তবে সিন্নি পূজা এবং ফুগির পূজা এই দুটি পূজার কোন জীববধ করা হয় না। নারিকেল, কলা, ইক্ষু, গুড়, পান, সুপারি, পিঠা জান এবং পাকা ফলাদি দ্বারা পূজা করা হয়। বর্তমানে ধ্যান-জ্ঞানী বৌদ্ধভিক্ষুদের আগমনের কারণে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে এই সমস্ত কাল্পনীক দেব-দেবীর আচার-অনুষ্ঠান কমে গেছে।

তঞ্চঙ্গ্যাদের সাহিত্য সংস্কৃতিঃ

তঞ্চঙ্গ্যাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য ও লোক-সংস্কৃতি রয়েছে। তাদের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন উবাগীত, বারোমাসী, আধুনিক সংগীত, রূপকথা, লোক কাহিনী, কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। উবাগীত বা চাপ্রেগীত হল তাদের নিজস্ব গান।

আরাকানে চাপ্রে নামক তাদের প্রাচীন আবাস ভূমির স্মরণে তারা উবাগীত বা পালা গান গায়। উবাগীত বা পালা গান সাধারণত প্রেমের গান হয়ে থাকে। তঞ্চঙ্গ্যারা রাধামনের মধ্য দিয়ে তাদের যুদ্ধ জয়ের পূর্ব সুখ স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়ায়।

তঞ্চঙ্গ্যা গীংখুলীরা সাধারণত বেহালা বাজিয়ে রাধামন-ধনপুদি উবাগীত বা পালাগান গেয়ে সারারাত্রি শ্রোতাদের মনে প্রচুর আনন্দ সঞ্চার করে থাকেন। উবাগীত তঞ্চঙ্গ্যাদের সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।

নাটকেও রয়েছে তাদের বিশেষ দক্ষতা। আদিকাল থেকে তারা মন্দিরনৃত্য পরিবেশন করত। এখন তারা জুম নৃত্যসহ দৈনন্দিন নান্দনিক ঘটনা তুলে ধরে চমৎকার নৃত্য পরিবেশন করে। সাহিত্য, সংস্কৃতিতেও তাদের বিচরণ অবাধ ও স্বত:স্ফুর্ত।

তঞ্চঙ্গ্যাদের পোশাক পরিচ্ছদঃ

তঞ্চঙ্গ্যাদের পোশাকের বিশেষ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিশেষত তঞ্চঙ্গ্যা মহিলাদের পোশাকে বৈচিত্র্যতা রয়েছে। চাকমা মহিলা কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্ৰ জনজাতির আদিবাস মহিলাদের মধ্য থেকে পোশাকে আচ্ছাদিত তঞ্চঙ্গ্যা রমণীকে সহজেই চেনা যায়।

নারীদের পরিধেয় পোশাককে পেরোইন (থামী) বলে। দেখতে রঙধনুর মত এটির দৈর্ঘ্য ৪ হাত। ওদের বিভিন্ন গছার নারীদের পোশাকের অনুসঙ্গ হিসেবে মাথায় খবং (পাগড়ি), ফারদ্দরি (কোমড় বন্ধনী), ব্লাউস (সালুম) ভিন্ন ভিন্ন ডিজাইনের হলেও পেরোইন ও খাদি (বক্ষ বন্ধনী) সকল গছার নারীদের একই ডিজাইনের হয়ে থাকে।

তঞ্চঙ্গ্যা পুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক হল সাদা জামা, সাদা কিন্তু বর্তমানে পুরুষরা তাদের পছন্দমত প্যান্ট, শাট, লুঙ্গি ইত্যাদি পরিধান করেন।

তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় নারীরা পায়ে রূপার তৈরী খাড় পড়ে। কজি, কনুই বা হাতে রূপা বা সোনার তৈরী কচি খাড়, বাঘোর, কিঞ্চিক, বাঙড়ী বা চুড়ি ব্যবহার করে।

বাহুর মধ্যে তাজজোড়, কানে রাজজুর কিংবা ঝংগা পরিধান করে। গলায় রূপা বা সোনার চেইনসহ চন্দ্রহার বা সিকিছড়াযুক্ত হাচুলি বা রূপার টাকার ছড়া এবং চুলের খোঁপায় রূপার তৈরী চুলের কাটা ইত্যাদি ব্যবহার করে।

তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে এইসব ব্যবহার প্রায় বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে তঞ্চঙ্গ্যা ছেলে মেয়েরা হাতের আঙুলে রূপার এবং সোনার তৈরী আংটি পরিধান করে এবং শিক্ষিত নারীরা বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় শাড়ি বা শার্ট প্যান্ট পড়েন।

তঞ্চঙ্গ্যাদের ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রঃ

বাঁশি, বেলা, খেংখং, ঢুটুক ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বিভিন্ন উৎসব, আচার অনুষ্ঠানের সময় ব্যবহার করেন তঞ্চঙ্গ্যারা। তঞ্চঙ্গ্যা যুবকেরা উবাগীতের সুরে যখন এই বাঁশি বাজায় তখন শ্রোতাদের মন প্রাণ মুগ্ধ হয়ে যায়।

বেলা বা বেহালা তঞ্চঙ্গ্যা গেঙ্গুলীরা ইহা বাজিয়ে সারারাত উবাগীত বা পালা গানের সুর তুলে শ্রোতাদের মনে প্রচর আনন্দ সঞ্চার করে থাকেন। বাঁশের ফালি দিয়ে তৈরী খেংখং বা মাউথ অর্গান তঞ্চঙ্গ্যা যুবতীরা এই যন্ত্র ঠোটের দু ফাঁকে স্থাপন করে একটু বা ঈষৎ টেনে টেনে শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করে উবাগীতের সুর তোলে শ্রোতাদের রোমাঞ্চকর আনন্দ দিয়ে থাকেন।

ঢুটুক বা ঢোল ইহা সাধারণত তঞ্চঙ্গ্যারা জুমের পাকা ধান রাত্রে বন্য প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য জুমের ঘরে উচ্চ শব্দ করে বাজিয়ে থাকেন।

এই শব্দের ভয় পেয়ে বন্য শুকর বা অন্যান্য প্রাণীরা পালিয়ে যায়। এই ঢুঢুকের শব্দের তাল এক ধরণের আবহ সৃষ্টি করে থাকে।

তঞ্চঙ্গ্যাদের খাদ্যাভাসঃ

তঞ্চঙ্গ্যাদের প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতের সঙ্গে সব রকমের মিঠে পানির মাছ ও সামুদ্রিক মাছ, শুটকি মাছ নানা রকম খাবার উপযোগী মাংস খায়।

তারা প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি, ফলমূল, বাঁশ কড়ল, মাশরুম ইত্যাদি খেয়ে থাকেন। অল্প সিদ্ধ শাক-সবজিকে তারা ‘উসনা চন’ বা অল্প সিদ্ধ তরকারি বলে।

এই উসনা চন তারা প্রতি বেলায় ভাতের সাথে একটু মরিচের গুড়া দিয়ে খায়। এছাড়া তারা তরকারিতে এক ধরণের শুটকি গুড়া দিয়ে তৈরি নাপ্পি ব্যবহার করেন। তারা পূজা পার্বণে, আচার অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নে নানা প্রকার পিঠা, বিন্নী ভাত, কোইন ভাত ও নানাবিধ সুস্বাদু খাবার তৈরী করেন।

তঞ্চঙ্গ্যারা নিজেদের তৈরী চুরুট বা কেউ কেউ হুক্কা টানতে পছন্দ করেন। দুধ-চিনিসহ গরম লিকার চা এবং রং চা প্রায় অবিরত তারা পান করেন। বিবাহ সামাজিক অনুষ্ঠানে বয়স্ক লোকেরা মদ পান করে থাকেন। তবে বর্তমানে তঞ্চঙ্গ্যাদের মদের ব্যবহার কমে গেছে।


তঞ্চঙ্গ্যাদের ধর্মসংস্কৃতিঃ

আদিকাল থেকে তঞ্চঙ্গ্যারা বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। মিয়ানমার আরাকানে দৈনাক হিসেবে পরিচিত থাকার সময়ও তাদের একমাত্র ধর্ম ছিল মহামতি গৌতম বুদ্ধ প্রচারিত বৌদ্ধধর্ম।

তঞ্চঙ্গ্যারা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে বুদ্ধ পূর্ণিমা, আষাঢ়ী পূর্ণিমা, ভাদ্র পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা ও মাঘী পূর্ণিমা ইত্যাদি অনুষ্ঠান যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে পালন করেন।

এছাড়াও বিভিন্ন সময় তারা বুদ্ধ পূজা, সীবলী পূজা, সংঘ দান, অষ্টপরিষ্কার দান, প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ে কঠিন চীবর দানসহ ইত্যাদি ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করে থাকেন।

প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ভিক্ষুসংঘকে আমন্ত্রণ (ফাং) করা হয় এবং পূণ্যার্থীগণ ধর্মীয় দেশনা শ্রবণপূর্বক ভিক্ষুসংঘকে পিন্ড দানসহ নানাবিধ দানীয় বস্তু দান করা হয়।

ইহা ছাড়াও তঞ্চঙ্গ্যাদের আরও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে (১) জারি (স্তুপ), (২)ম্রাংডং / শলা-ঘ (প্রদীপঘর), (৩) চ্যাপ-ঘ (পথচারীদের বিশ্রামাগার, পানি ঘর, পান্থশালা), (৪) বটবৃক্ষ উৎসর্গ, (৫) শামণী ও শ্রমণ হওয়া (৬) থামাং টং (ভাত পাহাড় দান) এবং (৭) ফারিক শোনা (সুত্র শোনা)।

এই সমস্ত ধর্মীয় কাজে প্রাণী হত্যা, মদ সম্পূর্ণ বর্জন করা হয় এবং নিরামিষ রান্না করে আমন্ত্রিত অতিথিদেরকে খাওয়ানো হয়।

অনেক তঞ্চঙ্গ্যা বয়স্ক ব্যক্তিগণ প্রতি মাসের অমাবস্যা ও পূর্ণিমার তিথিতে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে উপবাস থাকেন এবং অষ্টশীল পালন করেন।

বৌদ্ধধর্মের বিনয়মতে, তারা চিত্ত পরিশুদ্ধির জন্য দান-শীল-ভাবনায় মনোনিবেশ করেন এবং জগতের সকল প্রাণীর সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

তঞ্চঙ্গ্যাদের খেলাধুলাঃ

তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষুর দিনে সবচেয়ে আকর্ষনীয় উপভোগ হলো যুবক-যুবতীদের মিলে সারারাত ব্যাপী ঘিলাখেলা প্রতিযোগিতা।

ঘিলা হল তঞ্চঙ্গ্যাদের একটি খেলাধুলার উপকরণ। ঘিলাখেলা সাধারণত: পাঁচ প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন: মকখেলা, কুইচুকখেলা, গামাইত খেলা, ব্যংখেলা ও পাইচে খেলা।

তঞ্চঙ্গ্যাদের ঐতিহ্যবাহী ঘিলাখেলা ছাড়াও রয়েছে গয়াং খেলা, পুত্তি খেলা, গুদু খেলা, বলি খেলা, আংগী খেলা, লুগালুগি খেলা, কক্কেমা বা খাবাম খেলা, নারেং খেলা, চামুক খেলা, বাইত খড়ং খেলা, ডলা খেলা, বাইত খেলা ইত্যাদি।

বর্তমানে কিছু অঞ্চল ছাড়া ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলো খুব একটা দেখা যায় না আধুনিক অপ-সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের কারণে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে এই খেলাগুলোর বিভিন্ন ধাপ ও কলাকৌশলগুলো।

ঐতিহ্যবাহী এই খেলাগুলো সংরক্ষণ ও প্রচলন করতে পারলে আমাদের তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের এক বুক থেকে সংস্কৃতির একটি অংশ চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে।

উপসংহারঃ  

ইতিহাস ও নৃ-তাত্ত্বিক গবেষকগণের গবেষণামূলক তথ্য-উপাত্ত, প্রমাণ, অভিমত, জনশ্রুতি প্রভৃতি পর্যালোচনা করে প্রতীয়মান হয় যে, তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী এতদঞ্চলের বহুকাল আগে থেকেই বসতি করে আসছে।

তাদের মূল রাজ্য বা ভূ-খন্ড থেকে তারা বিভিন্ন কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে তাদের বসতি ও অস্তিত্ব ছিল। তারা আরাকানে দৈনাক নামেই পরিচিত ছিল এবং এখনও আছে।

মিয়ানমারে দেঙ্গ্যাওয়াদি তথা আরাকান রাজ্য ছিল তঞ্চঙ্গ্যাদের মূল আদি নিবাস। তঞ্চঙ্গ্যাগণ স্বতন্ত্র সত্তা নিয়ে ইতিহাসের দীর্ঘপথ অতিক্রম করে আজ বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা সমূহে রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার প্রভৃতি জেলায় এবং দেশের বাইরে ভারত ও মিয়ানমারের বিভিন্ন স্থানে তারা ইতঃস্তত: বিক্ষিপ্তভাবে আপন স্বাতন্ত্র্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতি বজায় রেখে বসবাস করছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসর তঞ্চঙ্গ্যা শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক স্তর হতে নিজস্ব মাতৃভাষায় ও বর্ণমালায় শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি হলে তাদের বিদ্যালয় ঝড়ে পড়ার হার কমে যাবে।

ফলে তাদের প্রাথমিক স্তরে শিক্ষা ক্ষেত্রে কাঙ্খিত অগ্রগতি বা উন্নয়ন সাধিত হবে। বাংলাদেশে সকল আদিবাসী শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক পর্যায় হতে শিক্ষা অর্জনের অধিকার থেকে যাতে কেউ বঞ্চিত না হয় তৎজন্য সংশ্লিষ্ট সকল মহলের নিকট সদয় সুদৃষ্টি কামনা করছি।

তথ্যসূত্রঃ তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, লেখক – মিলন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা।

আরো পড়ুন,

তঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

দৈংনাককের নব জন্ম: ভাগ্যের সন্তান তঞ্চঙ্গ্যাগণ

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply