icon

আদিবাসী তাঁতী মুক্তিযোদ্ধা

Jumjournal

Last updated Oct 6th, 2020 icon 27

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁতী জাতির আদিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে এই লেখাটিতে।

শহীদ শুভ তাঁতী

চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তান শুভ তাঁতী নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। দরিদ্র পরিবারে তিনিই ছিলেন একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি।

উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের জোয়ার সেসময় তার স্কুলেও আঁছড়ে পড়েছিল যার প্রভাবে তিনি সভা-সমাবেশে যোগ দেন।

কিন্তু পেটের দায়ে পড়াশোনা ও মিছিলমিটিং বাদ দিয়ে শাহজিবাজারের ইলেকট্রিশিয়ানের দোকানে কাজ শুরু করেন কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি আর চুপ থাকতে পারেননি।

যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। পাকিস্তানি বাহিনী এলাকায় পৌঁছানোর আগে পর্যন্ত মিটিং-মিছিলের পুরোভাগে দেখা যেত শুভ তাঁতীকে।

এক সময় নিরাপত্তার প্রশ্নে ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে তিনি ভারত চলে যান এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে একদিন হঠাৎ করে বুকে ব্যথা শুরু হওয়ায় তাকে কমব্যাট অপারেশন থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে তিনি ‘ইনফরমার’ ও ‘সংগঠক’ হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। ঐ কাজের জন্য তাকে নোয়াপাড়া চা বাগানে আসতে হয়েছিল। নোয়াপাড়ায় তখন পাকসেনাদের স্থায়ী ঘাঁটি।

শুভ তাঁতী অতিসন্তর্পণে চা বাগানের জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নিজের ঘরে এলেও রাজাকারদের দৃষ্টি এড়াতে পারেননি। দু-তিন দিন কাজ করার পরই দু-জন রাজাকার এসে জানায় যে তাকে শাহজীবাজারে বিদ্যুৎ মেরামতের কাজে জরুরি ভিওিতে যেতে হবে।

যেতে অস্বীকার করায় তার চোখ বেঁধে নিয়ে যায় ম্যানেজারের বাংলোয়। শুরু হয় অমানবিক শারীরিক নির্যাতন, পাকসেনাদের বুটের আঘাতে তার দেহ রক্তাক্ত হয়ে থেঁতলে গেলেও নির্যাতনের মাত্রা তাতে কমে না।

পরে শুভ তাঁতীকে নিয়ে যাওয়া হয় মাধবপুর ও জগদীশপুরের সংযোগ সড়কের তেমাথায়। পাকিস্তানি সেনারা তার সামনেই তেল গরম করে এবং খানিকক্ষণ পর পর তার গায়ে ছিটানো হয় সেই গরম তেল।

তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করলে তারা উল্লাস ধ্বনি দিয়ে উঠে ‘শালা শুয়ারকা বাচ্চা’। এভাবে গরম তেলের ছিটাতে তাঁর গায়ে বিভৎস ফোসকা উঠে যায়। পরে গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। তাঁর লাশের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

একজন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা

শহীদ কুলচন্দ্র তাঁতী

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কমলগঞ্জের মৃতিঙ্গা চা বাগানের শ্রমিক-সন্তান কুলচন্দ্র তাঁতীর বয়স ছিল ১৭। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা না থাকায় খুব একটা পড়াশোনা করতে পারেননি তিনি।

মৃতিঙ্গা চা-বাগানে পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব দেখে তার মনে প্রতিশোধ গ্রহণের স্পৃহা জাগে। পাক বাহিনী তাদের বাগানের দুজন নারী শ্রমিককে নিপীড়ন করে এবং পরবর্তীকালে দেওয়াড়া চা বাগানে পঞ্চাশ জনেরও বেশি চা-শ্রমিককে হত্যা করে।

তাঁর পরপরই তিনি ভারতের কমলপুর ত্রিপুরা শরণার্থী ক্যাম্পে চলে যান। ঐ ক্যাম্পেই তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য তালিকাভুক্ত হন এবং লোহারবন্দে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

তবে বয়স কম হওয়ায় এবং বয়সের তুলনায় শারীরিক কাঠামো ছোট আকারের ছিল বলে কুলচন্দ্র তাঁতীকে ভারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন যে, খুব কষ্টের ট্রেনিং ছিল বলে অনেক তরুণ সেখান থেকে পালিয়ে যায়।

প্রশিক্ষণ শেষে মুক্তিযোদ্ধা কুলচন্দ্র তাঁতীকে জুড়ি-বড়লেখা অঞ্চলে পাঠানো হয়। চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তান হওয়ায় প্রথমত তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় ছদ্মবেশে সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন বাগানে প্রবেশ করে শ্রমিকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া এবং তাদের বাংকার ও ক্যাম্পের অবস্থান চিহ্নিত করা ও মাইন পুঁতে রাখা।

প্রায় রাতে অগ্রবর্তী দলকে নিয়ে যাওয়া ও অস্ত্র গোলাবারুদ সরবরাহের কাজও তাকে করতে হতো। বয়সের তুলনায় ছোট দেখানোর কারণে রাজাকার ও পাকসেনারা তাকে সাধারণভাবে সন্দেহ করতো না।

কুলাউড়া বড়লেখা অঞ্চলে তিনি ছদ্মবেশে বহুবার গিয়েছেন এবং সেখানে তিনি দেখেছেন যে জুড়ির শিলুয়া কুচাই ও সাগরনল বাগানগুলোতে বাংকার ছিল প্রচুর।

এই বাংকারগুলোর খবর কুলচন্দ্র তাঁতী তার কমান্ডার মাসুক মিয়াকে জানাতেন। শিলুয়া বাগানের রাস্তায় তিনি, বিশ্বনাথ কুমী ও নারায়ণ কুমী মিলে মাইন পুঁতে রেখেছিলেন।

একবার বাংকারের খবর নিতে গিয়ে একটি পুলের কাছে ডিউটিরত রাজাকারদের হাতে তিনি ধরা পড়েন, রাজাকাররা তাকে পাকসেনাদের হাতে তুলে দেয়।

তাকে যে বাংকারে রাখা হয় সেই বাঙ্কারে তিনি ৮ জন মহিলাকে দেখেছেন তার মধ্যে তিনজন ছিলেন বাঙালি ও পাঁচজন মণিপুরী। তাদের সবাইকে বিবস্ত্র অবস্থায় রাখা হয়েছিল এবং তাদের শারীরিক অবস্থা ছিল শোচনীয়।

তখন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল বলে পাকিস্তানি সেনারা রাতে যাওয়া-আসা করতো বেশি। একদিন সন্ধ্যায় একজন পাকসেনা তাকে পার্শ্ববর্তী বাজার থেকে কিছু জিনিসপত্র কিনে আনতে পাঠালে তিনি বাজার-সংলগ্ন ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পালিয়ে যান এবং টিলা-জঙ্গল অতিক্রম করে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে পৌঁছান।

তিন দিন আটকা পড়ায় তার সহযোদ্ধারা ভেবেছিলেন যে তিনি মারা গেছেন। তাকে ফিরে পেয়ে সহযোদ্ধারা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। তিনি বলেন একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে আরেকজনের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে আপন ভাইয়েভাইয়েও সেটা হয় না।

তাঁর সহযোদ্ধা মৃতিঙ্গা চা-বাগানের ইন্দ্রজিৎ বাউরী যুদ্ধে যেয়ে আর ফিরে আসেননি, সেকথা এখনো তার মনে বেদনা ছড়ায়।

ক্যাম্পে ফিরে কুলচন্দ্র তাঁতী তার তিনদিনের অভিজ্ঞতা এবং বাংকারের নির্যাতিত মেয়েদের কথা সহোযাদ্ধাদের জানান। বেদনায় উদ্বেলিত মুক্তিযোদ্ধা নরেশ দাশ পরদিন স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে একাই ছুটলেন, কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তাকে অনুসরণ করেন।

শিলুয়া চা-বাগানের বাংকারের নিকটবর্তী স্থানে পৌছে নরেশ দাশ বাংকার-পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতে বুকের ওপর ভর করে এগিয়ে যান। সে সময় অসাবধানতাবশত তার অস্ত্রের নলের মধ্যে কাঁদা ঢুকে যায়।

ফলে তিনি যখন ডিউটিরত পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ্যে গুলি ছুঁড়তে শুরু করেন তখন বন্দুকের ভেতর থেকে বিকৃত আওয়াজ বের হয় এবং গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।

এই সুযোগে পাকসেনারা পাল্টা গুলি ছোঁড়ে, নরেশ দাস তাতে আহত হন এবং পালাতে না পারায় পরবর্তীকালে এই দেশপ্রেমিককে তারা নৃশংসভাবে গুলি করে হত্যা করে।

তার হত্যার বদলা নিতে মুক্তিবাহিনী এর পরদিন ঐ বাংকারের ওপর শেলিং করে তা বিধ্বস্ত করে দেয়।

শিলুয়া চা-বাগান এলাকায় পাকবাহিনী এতটাই ক্ষয়ক্ষতি করেছিল এবং এত মানুষ হত্যা করেছিল যে প্রতিক্রিয়ায় ঐ অঞ্চল জনবিরল হয়ে পড়েছিল।

কুলচন্দ্র তাঁতী জুড়ি রেলস্টেশনের কাছে একদিন ৩ জন মহিলার লাশ দেখেছেন- দুজনের সিঁদুর পরা, অপরজন সিঁদুর ছাড়া। আরেকদিন তিনি দেখেন ২১টি লাশ পড়ে থাকতে, যাদের সবাই ছিলেন বাঙালি।

নভেম্বর মাসের শেষদিকে গাজীপুর চা-বাগানে কয়েকদিন ধরে যুদ্ধ চলে। সেখানকার বাংলোটিতে পাকসেনাদের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা বাংলোটি আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধা এম এ মুমিত, এস এ মোহিত ও মোহন লালের নেতৃত্বে।

ভারতীয় মিত্রবাহিনী এই অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। অনেক পাকসেনা সেখানে খতম হয়। দেশের স্বাধীনতার জন্য বীরাঙ্গনাদের পরম ত্যাগের কথা কুলচন্দ্র তাতী সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন। মুক্তিবাহিনীর সহযোদ্ধাদের কথাও তিনি বার বার মনে করেন।

শহীদ পবন কুমার তাঁতী

বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের মধ্যে প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তি রাজঘাট চা বাগানের পবন কুমার তাঁতী। তিনি বিকম পাস করেছিলেন। চা-শ্রমিকদের সকলের কাছে এটা গর্বের হলেও কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটা পছন্দ করেনি।

কেন না বাগানে শিক্ষার বিস্তার তাদের কাছে হুমকিস্বরূপ মনে হয়েছিল। তাছাড়া ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যেটা চা-বাগান কর্তৃপক্ষের নজর এড়ায়নি।

পবন কুমার তাঁতী কমিউনিস্ট নেতা মফিজ আলীর নেতৃত্বাধীন চা শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে চা-বাগান এলাকায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

একাত্তরের মার্চে পবন তাঁতী ঢাকায় ছিলেন এমএড কোর্স করতে। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হলে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন এবং খুব কষ্ট করে বাগানে ফিরে যান।

সেখানে যেয়ে তিনি পরিবারের সদস্য ও শ্রমিকদের সাথে যুদ্ধে যাওয়া ও নিরাপদ আশ্রয়ের কথা আলোচনা করেন। তার এই মিটিং-এর কথা পাকসেনাদের কানে যায় এবং একদিন সকালে সেনারা এসে পবন তাঁতীসহ পরিবারের সকলকে লাইনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাদের ঘরে অস্ত্র খুঁজতে থাকে।

অস্ত্র না পেয়ে বন্দুকের নল দিয়ে তারা পবন তাঁতীকে আঘাত করে। তবে ঐ দফায় প্রাণে না মেরে তার সার্টিফিকেট ও পুরনো চিঠিপত্রের বাক্স নিয়ে পাকসেনারা চলে যায়।

পবন তাঁতী ইচ্ছা করলেই নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি দেশে থেকে শ্রমিকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করার জন্য কাজ করতে থাকেন।

এরই এক পর্যায়ে তিনি কালিঘাট বস্তিতে আসেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পবন তাঁতীর উপর নজর রাখতে এবং পাকিস্তানি সেনারা কালিঘাট বস্তিতে এসে তার পরিবারের সদস্যদের উপর অত্যাচার শুরু করলে পরিবারের অন্যদের বাঁচানোর স্বার্থে তার কাকা পবন তাঁতীকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেন।

তাকে শ্রীমঙ্গল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুমাস ধরে তার উপর চলে অমানবিক নির্যাতন। কখনো চলেছে চাবুক, কখনো গরম ঘেঁকা, কখনো গরম পানি গায়ে ঢেলে দেওয়া, কখনোবা পা উপরে আর মাথা নিচে দিয়ে ঝুঁলিয়ে রাখা হতো।

এভাবে শরীরের সব শক্তি নিঃশেষ হলে ৪ ডিসেম্বর রাতে শ্রীমঙ্গলে ওয়াপদা অফিসের বধ্যভূমিতে নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

শহীদ শিবশঙ্কর তাঁতী

টিপারাছড়া চা বাগানের শ্রমিক শিবশঙ্কর তাঁতী একাত্তর সালে ছিলেন তরুণ। শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ তাকে উদ্বেলিত করেছিল।

তিনি এখনো স্মরণ করেন যে, ৭ মার্চের ঐ ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে উপেন্দ্র বুনারজি ও পুলকচন্দ্র দাস তরুণ ছাত্রদের সংগঠিত করে মিছিল নিয়ে শ্রীমঙ্গলের দিকে রওনা দিয়েছিলেন।

যুদ্ধের শুরুতেই শিবশঙ্কর তাঁতী সীমান্ত অতিক্রম করে ত্রিপুরা রাজ্যের খোয়াই থানাধীন শেরবীঘাট শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সেই শিবিরে অবস্থানরত চা-শ্রমিক তরুণদের যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করতে চেষ্টা করেন।

তিনি ত্রিপুরায় লোহারবন ক্যাম্পে ট্রেনিং নেন। এটা ছিল অনেক বড় ক্যাম্প এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কয়েক হাজার তরুণ সেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

তিনি জানান, ট্রেনিং পর্বে তারা স্বল্পকালীন হলেও খুব ভালো প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন বলেই তাদের পক্ষে দক্ষ পাকসেনাদের মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছিল।

ট্রেনিং-এর পর মুক্তিযোদ্ধা শিবশঙ্কর তাঁতী মূর্তিছড়া-চাতলাপুর অঞ্চলে প্রথম অপারেশনে অংশ নেন। এখানকার চা-শ্রমিকরা পাকবাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে খবর দিলে, সে তথ্যানুযায়ী রাতে অপারেশন করা হতো।

একদিন শিবশঙ্কর তাঁতী চালতাপুর বাগানে অস্ত্রবহনরত অবস্থায় বিপদে পড়েছিলেন, কিন্তু মুক্তিবাহিনীর প্রতি চা-শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের কারণে তাদের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান।

শিবশঙ্কর তাঁতী তার সহযোদ্ধা আলীনগর চাবাগানের কার্তিক পাথারের দুঃসাহসিকতার কথা স্মরণ করে জানান, ‘রেকিম্যান’ কার্তিক পাথারের আইডিয়া খুব ভালো ছিল, একবার যা দেখতেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা বলতে পারতেন।

তার তথ্যানুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারা চাতলাপুর বাংলোতে অপারেশন করে ২ জন পাকসেনা খতম ও ৪-৫ জনকে আহত করেন।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসের শেষদিকে সিলেটের শমসেরনগর বিমানবন্দরে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনা ইউনিটের ওপর মুক্তিবাহিনী হামলা করে।

শিবশঙ্কর তাঁতীসহ ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা রাত তিনটায় এ্যাম্বুশ করার জন্য ক্রলিং করে অগ্রসর হবার সময় পাকসেনারা টের পেয়ে যায়। তারা পাল্টা আক্রমণের জন্য বাংকার থেকে দ্রুত বের হওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধারা এলএমজি দিয়ে ব্রাশ ফায়ার করেন, ফলে ৫-৬ জন পাকসেনা নিহত হয়।

পরিস্থিতি সামাল দেবার জন্য সেদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধারা দ্রুত পিছিয়ে আসেন। তবে শমসেরনগর বিমানবন্দর ও বাজার ঘিরে পাকসেনাদের বেশ কয়েকটি বাংকারের অবস্থান সম্পর্কে তারা সেদিন নিশ্চিত হন।

পরের দিন মিত্রবাহিনীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় দল পুনরায় শমসেরনগর আক্রমণ করেন। তুমুল লড়াই, একপর্যায়ে প্রায় হাতাহাতি যুদ্ধের রূপ নেয় এবং পাকবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। তবে তারা পশ্চাদপসরণের সময় চৈতঘাটের নিকটবর্তী পুলটি ভেঙে রেখে যায় ।

যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে শিবশঙ্কর তাঁতীদের ইউনিট মৌলভীবাজারের দিকে এগুচ্ছিলেন। শেরপুর এলাকায় এসে তারা জানতে পারেন যে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করেছে।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply