icon

ত্রিপুরা লোককাহিনী: রক্তপিয়াসি দেবতা

Jumjournal

Last updated Apr 30th, 2020 icon 279

অনেক অনেক কাল আগের কথা। তখন ত্রিলোচন নামে এক রাজা ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করত।

সে রাজা ছিল হিরাবতী রানির একমাত্র ছেলে। রানি-মা হিরাবতী ছিলেন অসাধারণ নারী। রানি হওয়া সত্ত্বেও নিজের ঘরের কাজ নিজেই করতেন।

একদিন বিকালে রানি-মা নদী থেকে জল আনতে গেলেন। তখন ছিল বর্ষাকাল। নদীর তীর ছিল নির্জন। রানি-মা নদীতে গোসল করলেন।

তারপর কলসে জল ভরছিলেন প্রাসাদে নিয়ে আসার জন্য। তখন তিনি শুনতে পেলেন কান্নার আওয়াজ। কেউ যেন কেঁদে কেঁদে বলছে, মা আমাদের বাঁচান, মা আমাদের বাঁচান…।

রানি-মা চারদিকে তাকালেন। কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? কে কাঁদছে? কে তোমরা?

তিনি শুনতে পেলেন কেউ যেন বলছে, আমরা চৌদ্দ দেবতা। একটা ভয়ঙ্কর মহিষ আমাদের পিছু নিয়েছে।

ওটা আমাদের আক্রমণ করতে পারে। তাই আমরা এই শিমুল গাছে আশ্রয় নিয়েছি। আমরা নেমে আসতে পারছি না।

গাছের নিচে ভয়ঙ্কর মহিষটি দাড়িয়ে আছে। সে আমাদের হত্যা করতে পারে। আমরা গত সাত দিন ধরে গাছের উপরে আছি।

এই সাত দিন আমরা কিছুই খাইনি। দয়া করে আমাদের বাঁচান মা।

আপনি একজন ধর্মপ্রাণ মহিয়সী নারী। আপনিই আমাদের এই ভয়ঙ্কর মহিষের হাত থেকে বাঁচাতে পারেন।

রানি-মা বললেন, তোমরা বলছ তোমরা দেবতা, তাহলে তোমরা নিজেদেরকে বাঁচাতে পারছ না কেন? আমি একজন বৃদ্ধা, তোমাদের কীভাবে বাঁচাতে পারি?

দেবতারা বলল, আমরা দেবতা, কিন্তু আমরা এখন অভিশপ্ত। তাই আমাদের এখন কোনো ক্ষমতা নেই।

রানি-মা বললেন, তোমরা বল আমি কীভাবে তোমাদের সাহায্য করতে পারি?

দেবতারা রানি-মাকে বলল, তুমি প্রথমে তোমার ওড়নাটা মহিষটাকে দেখাও, তারপর ওটা মহিষের উপর ছুড়ে মারো। তাহলে ওটা তোমার পোষ মেনে যাবে।

তুমি তখন ওটাকে ধরে ফেলতে পারবে। আর আমরাও তখন নিরাপদে নেমে আসতে পারব।

এ কথা শুনে রানি-মা রাজপ্রাসাদে চলে গেলেন। তারপর অস্ত্রশস্ত্র, লাঠিসোটাসহ অনেক ভৃত্য আর রাজ কর্মচারীদের নিয়ে আবার ফিরে এলেন।

ভয়ঙ্কর মহিষটাকে দেখে তাদের কেউ ওর কাছে যেতে সাহস করল না। অনেক ইতস্তত করে অবশেয়ে একজন বৃদ্ধ ভৃত্য একাজটি করতে রাজি হল।

বৃদ্ধ ভূত্য বলল, হে দেবতাগণ, তোমাদের ইচ্ছার জয় হোক, রানি-মার মর্যাদা চিরজীবী হোক। আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোমাদের জন্য একাজটি করব।

তারপর সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ভয়ঙ্কর মহিষের কাছে। সাহস নিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মহিষ ভয়ঙ্কর শব্দে গর্জে উঠল।

কিন্তু ভৃত্যটির কোনো ক্ষতি করতে পারল না। সে প্রথমে মহিষকে রাজমহিষীর ওড়না দেখাল। তারপর ওর উপর ছুড়ে দিল ওড়নাটি ।

মুহুর্তের মধ্যেই মহিষটি শান্ত হল। ভৃত্যটি তৎক্ষণাৎ মহিষকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল।

আর তার সঙ্গে নেওয়া দা দিয়ে তড়িৎগতিতে মহিষের মাথা কেটে আলাদা করে ফেলল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল কাটা মহিষের ধর থেকে।

তখন দেবতারা নেমে এলো গাছ থেকে। তারা তৃপ্তি করে মহিষের রক্ত পান করল। তারপর ভৃত্যরা দেবতাদের নিয়ে এলো রাজপ্রাসাদে।

রাজপ্রাসাদে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হল। এটা ছিল আষাঢ় মাসের কৃষ্ণ অষ্টমীর দিন।

ধর্মীয় সকল আচার অনুষ্ঠানের পর দেবতাদের স্থান হল রাজপ্রাসাদে। এরপর থেকে রাজপ্রাসাদে চৌদ্দ দেবতার পূজা করা হতো।

এর কিছু দিন পর হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটল। তখন ত্রিলোচন ছিল খুবই ছোট। সে বেশির ভাগ সময় থাকত দেবতাদের ঘরে।

রানি-মা দেখলেন, ত্রিলোচন দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। তাকে দেখতেও খুব মলিন লাগছে।

রানি-মা এ নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তার ছেলের কী হয়েছে তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন।

ভিতর মেঝেতে একটি ছাগল শুয়ে আছে। ছাগলের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন।

আর দেবতাদের একজন ছাগলের ধর থেকে রক্ত পান করছে। রক্ত পান করা শেষ হলে ছাগলের মাথা ও ধর জোড়া লেগে গেল।

দেবতারও রূপ বদলে গেল। সে ত্রিলোচনের রূপ ধারণ করল। এটা দেখে রানি খুব অবাক হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তার ছেলে কেন দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে।

রানি-মা রাগে-দুঃখে গর্জে উঠলেন। চিৎকার করে বললেন, অকৃতজ্ঞ দেবতা, তোমাদের প্রতি আমার বিশ্বাস, আরাধনা আর যত্নের বিনিময়ে তোমরা একি করছ?

দেবতারা খুব লজ্জিত হল। তাদের একজন বলল, আমরা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ।

কিন্তু তুমি যা খেতে দাও তা আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা রক্তপান বিনে সারাক্ষণ ক্ষুধার্ত অনুভব করি।

তারপর থেকে ত্রিপুরার রাজ পরিবারে বার্ষিক পূজা উৎসবে চৌদ্দ দেবতার উদ্দেশ্যে ছাগল বলি দেওয়া একটা প্রথা হয়ে দাঁড়াল।

চৌদ্দ দেবতার পূজা আষাঢ় মাসের শুক্লা অষ্টমী থেকে শুরু হয়ে সাত দিন ধরে চলে।

লেখক : আবু রেজা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply