icon

সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণের রূপরেখা এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যা

Jumjournal

Last updated Oct 5th, 2020 icon 21

সিগমুণ্ড ফ্রয়েড ১৮৫৬ সালের ৬ই মে মোরাভিয়ার অন্তর্গত ফ্রাইবার্গ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তখন মোরাভিয়া অস্ট্রিয়া-হাংগেরীর একটি অংশ ছিল।পরবর্তিতে এটি চেকোস্লোভাকিয়ার অন্তর্গত হয়। মনঃসমীক্ষণ এর জনক হলেন ফ্রয়েড। ফ্রয়েডই হচ্ছেন প্রথম ব্যক্তি যিনি সবচেয়ে যুক্তিসংগত ভাবে স্বপ্নের রহস্যের ব্যাখ্যা করেছেন।

ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণ এর রূপরেখা : মনঃসমীক্ষণ সাধারণত মনোবিজ্ঞান এর কিছু তত্ত্বের সমন্বিত রূপ। যার মূলকথা হচ্ছে সব মানুষ এর মনের অবচেতন স্তরে কিছু বিশ্বাস, মূল্যবোধ, তাড়না, স্মৃতি বিরাজ করে।

ফ্রয়েড মানুষের মনকে দুটি স্তরে ভাগ করেছেন – ১. সচেতন স্তর ( Conscious mind) ২. অবচেতন স্তর ( Unconscious mind)।

অবচেতন স্তর হল আমাদের মনের সেই স্তর সম্পর্কে যেটি সম্পর্কে আমরা জানতে পারিনা। এই স্তরে আমাদের জন্মগত প্রবৃত্তি বা ইচ্ছাসমূহ অবস্থান করে। যা অতি কুৎসিত এবং মনের সচেতন স্তরে গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের কিছু অতীত অভিজ্ঞতা, আবেগ, কামনা – বাসনা আছে যা সমাজের নীতিবিরোধী। এগুলো আমরা মনের গভীর এ নির্বাসন করে দিই এবং সচেতনভাবে এগুলোর কথা আমাদের মনে থাকে না।

ফ্রয়েড মনকে ৩ টি সত্ত্বায় ভাগ করেছেন- ১.Id, ২.Ego, ৩. Superego,

Id: Id হচ্ছে মানুষের ওই প্রকৃতি যা কেবলমাত্র সুখ চায়-বাস্তব প্রকৃতি যাই হোক না কেন, যেটি কোন হিসেব মানে না। Id এর চাহিদাগুলো মনের অবচেতন স্তরে লুক্কায়িত থাকে। এই সত্তার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ভোগ করে না।

এই সত্তার বাস আমাদের অবচেতন স্তরে। Superego: এটি হচ্ছে মানুষের নৈতিক সত্তা। এটি সবসময় মানুষকে নীতি নৈতিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়। আমরা যখনি কোন খারাপ কাজ করি তখন আমাদের মনে অপরাধবোধের সৃষ্টি হয়।

Ego: এটি মানুষ এর বাস্তব সত্তা। Ego ই হলো Id এবং Superego র মধ্যে সেতুবন্ধনকারী সত্তা। এটি সুখের চাহিদাগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফ্রয়েডের স্বপ্নের ব্যাখ্যা : স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বিজ্ঞানী সকলের ই আগ্রহ এবং কৌতুহল এবং আগ্রহ বিদ্যমান ছিল।স্বপ্ন দেখে না বা দেখেন নি এমন লোক পৃথিবীতে নেই। সব লোকই স্বপ্ন দেখে।আর এই স্বপ্নকে কেন্দ্র করে আমাদের আগ্রহের শেষ নেই।

আমাদের মনে অনেকসময় প্রশ্ন জাগে-স্বপ্ন আমরা কেন দেখি? কতক্ষণ দেখি? কিছু স্বপ্ন কেন ভুলে যাই? স্বপ্নে কি আমরা সাদা- কালো ছবি দেখি নাকি রঙিন? আরো অনেক প্রশ্নই আমাদের মনে জাগে। স্বপ্ন হচ্ছে মানুষের অবচেতন স্তরে পৌছানোর রাজপথ।

সিগমুণ্ড ফ্রয়েড

অবচেতন মনে কি হচ্ছে তার প্রতিফলনই হলো স্বপ্ন। স্বপ্নে আমাদের সামাজিক বোধ, অমর্যাদা বোধ, নীতিবোধ ইত্যাদি কাজ করে না। স্বপ্ন আমরা কেন দেখি? সাধারণত আমরা নিজেকে শক্তিশালী চরিত্রে দেখি।স্বপ্নে আমরা উড়তে পারি, নৈতিকতা বিসর্জন দিতে পারি, নিয়ম ভাঙতে পারি। ফ্রয়েডের মতে আমাদের মনের অবচেতন স্তরের সব কিছুই যদিও অগোচরে থাকে তবু এটি আমাদেরকে প্রভাবিত করে।

Ego, আমাদের মনের অবাস্তব অবৈধ ইচ্ছাগুলিকে অবদমন করে মনের অবচেতন স্তরে পৌছে দেয়। কিন্তু, আমরা যখন ঘুমাই তখন Ego দূর্বল হয়ে পড়ে এবং এই সময় Id, Ego-র উপর আধিপত্য বিস্তার করে।

ওই সময় Id তে বিদ্যমান আমাদের অবদমিত বাসনা গুলো জোর করে সচেতন স্তরে প্রবেশ করে এবং আকাঙ্ক্ষিত বস্তুটির একটি কাল্পনিক রূপ সৃষ্টি করে। যার ফলে আমাদের অবদমিত কামনা-বাসনাগুলোর আংশিক তৃপ্তি লাভ হয়।

এই কামনা-বাসনা গুলি স্বপ্নের মধ্যে Symbolic form এ উপস্থাপিত হয়। অনেক সময় এটি বিকৃত হয়ে স্বপ্নে উপস্থাপিত হয়। যার ফলে এসব আমাদের কাছে যুক্তিসংগত মনে হয় না। আমাদের অবদমিত আবেগ, অনুভুতি, তাড়না যা স্বাভাবিক জীবন এ আমরা প্রকাশ করতে পারি না, তা স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ পায় এবং আংশিক পূর্ণতা পায়।

স্বপ্নের স্থায়িত্ব: গবেষণা করে দেখা গেছে যে, আমাদের মোট ঘুমের ১/৪ থেকে ১/৫ ভাগ সময় স্বপ্ন দেখি এবং বেশিরভাগ সময়ই তা মনে রাখতে পারি না।এই হিসেব অনুযায়ী আমরা গড়ে মোট ৩০ থেকে ৬০ মিনিট স্বপ্ন দেখি। আর মনে রাখতে পারি মাত্র কয়েক সেকেণ্ড।

স্বপ্নের বিশ্লেষণ: যদিও স্বপ্ন Symbolic form এ আমাদের নিকট উপস্থাপিত হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বপ্নের ব্যাখ্যা বা সমাধান দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ, ব্যাক্তির স্বপ্ন এবং অবচেতন মনের সম্পর্ক নির্ণয় করা সম্ভব। স্বপ্নে বিভিন্ন ঘটনা সাধারণত এলোমেলোভাবে সাজানো থাকে।

আবার কিছু স্বপ্ন দেখার পরপরই স্বপ্নের ঘটনাগুলি টুকরো টুকরো হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যার কিছু অংশ আমরা ভুলে যাই। আমরা তখন স্বপ্নদ্রষ্টার ভাবানুষঙ্গের কিছু যোগসূত্র নিয়ে ওই শুন্যস্থানগুলি পূরণ করে স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারি।

স্বপ্নের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃত তথ্যকে গোপন রাখা এবং এই উদ্দেশ্যে স্বপ্নে নানান বিকৃতি আনা হয়। উদাহরণসমূহ; স্বপ্নদ্রষ্টা একজন ডাক্তার, সকালে ঠিক সময়ে তাকে হাসপাতালে পৌঁছোতে হবে।

কিন্তু সে ঘুমিয়েই রইলো এবং স্বপ্নে দেখলো যে সে হাসপাতালে আছে কিন্তু রোগী হিসেবে। স্বপ্নের অর্থ বুঝতে হলে এসব বিকৃতি বুঝতে হবে। স্বপ্নের ব্যাঘাত কেন ঘটে? মাঝেমাঝে স্বপ্নের কিছু অংশ দেখার পর উৎকণ্ঠাজনিত কারণে স্বপ্নদ্রষ্টার ঘুম ভেঙে যায়। এই উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ হচ্ছে বিপদ সংকেত।

Id-র অবদমিত ইচ্ছেগুলি যখন সচেতন স্তরে পূর্ণ হতে থাকে Ego-র নিকট তা গ্রহণযোগ্য হয় না। এক্ষেত্রে Id এর চাহিদা এতোটাই প্রবল হয় যে Ego তার অস্ত্র-শস্ত্র দিয়ে রুখতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ঘুমের ইচ্ছেটা ত্যাগ করে জাগ্রত অবস্থায় ফিরে আসে।

অনেকটা রাতের প্রহরীরা বিপদকাল এ সংকেত বাজানোর ন্যায় তখন উৎকণ্ঠা এসে স্বপ্নদষ্টার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে যায়। একজন মনোবিশ্লেষক হিসেবে সিগমুণ্ড ফ্রয়েডের প্রথম লিখা বই ছিল “ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস”।

যশ কোহেনের মতে, “ইন্টারপ্রিটেশন অফ ড্রিমস “(১৮৯৯) বইটি সাইকো অ্যানালাইসিস বা মনঃসমীক্ষণ এর ভিত্তিরূপে কাজ করে।আধুনিক মনঃসমীক্ষণ এর এই তত্ত্বকে ঘিরে বিংশ শতাব্দীতে মানুষের মনে আগ্রহ সৃষ্টি হলে মানুষের মনোজগৎ অধ্যয়নের জন্য এটি হয়ে ওঠে মূল শাস্ত্র।

তথ্যসূত্র :

১.Understanding Psychology (Andrew B. Crider)

২.Developmental Psychology. (Edward P. Sarafino& James W. Armstrong)

৩.Outline of Psychoanalysis (Translated by Pushpa Mittra & Madhobendrabath)

৪.মন ও মনোবিজ্ঞান ( ড: আব্দুল খালেক, এস. ইউ. আহমেদ)

লেখকঃ উমেচিং রাখাইন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply