icon

বিগ ব্যাঙ বা মহাবিস্ফোরণেই কি মহাবিশ্বের সূচনা?

Jumjournal

Last updated Oct 4th, 2020 icon 27

এর আগের পর্বে প্রশ্ন রেখে গেছিলাম যে, বিগ ব্যাঙ তথা মহাবিস্ফোরণে আগে কি ছিল এবং বিগ ব্যাঙ সময় কি ঘটেছিল .! হ্যা, বিগ ব্যাঙ আগে কি ছিল আর কি ঘটেছে একটু পর আলোচনায় আসতেছি।


বিগ ব্যাঙ

একটা সময় মানুষ উপরের নীলাকাশ দেখে অবাক হয়ে যেত, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত রাতের নক্ষত্র খচিত আকাশ দেখে। দিনের আলোয় যেন উপরের মিটিমিটি আলো গুলোকে নীল চাদরে ঢেকে দেয়া হতো, আর রাতে সে চাদর সরিয়ে ফেলা হতো।

অবাক বিস্ময়ে মানুষ দেখতো রাতের আকাশ, সেখানে আবার চাঁদ নামের একটা বড় প্রদীপ মনোরম আলো ছড়িয়ে রাতের পৃথিবীকে রোমাঞ্চকর করে তোলে। হয়তো তখন থেকেই মানুষ কল্পনা করতো, যদি একবার উড়ে সেই চাঁদে যেতে পারতাম..!কৌতূহলী মনে, ঠিক মানুষ যখন প্রশ্ন করত যে, চাঁদ, পৃথিবী, সূর্য, গ্যালাক্সি এমনকি এই মহাবিশ্ব কোথায় থেকে সৃষ্টি হলো।

এভাবে তারা যখন প্রশ্ন করতে করতে পিছনে যেতে থাকে তখন বিগ ব্যাঙ জায়গায় পৌঁছে যায়। না তখন মানুষ তা দিয়েও সন্তুষ্ট নয়, আরো পিছনে যেতে চাই বিগ ব্যাং আগে কি ছিল।

স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসতে পারে, মানুষ কিভাবে জানলো যেবিগ ব্যাঙ থেকে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি। আমরা জানি, আলোর উৎস হতে দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায় এবং এক সেকেন্ডে আলো যে দূরত্ব অতিক্রম করে, সেই দূরত্ব অতিক্রমের জন্য কি পরিমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়, তার হিসাব করা যায়।

প্রতিটি গ্যালাক্সিই যেহেতু নির্দিষ্ট কোন দিকে গমন করছে, সেই দিকের বিপরীত দিকে যদি যেতে থাকেন, তবে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ক্রমাগত কমতে থাকবে। এভাবে কমতে কমতে একটি স্থানে এসে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য জিরো হয়ে যাবে। তখন বুঝতে আর বাঁকি থাকবে না যে, গ্যালাক্সিটি ঐ জিরো আলোক তরঙ্গের স্থান হতেই যাত্রা শুরু করেছিল।

এছাড়াও, প্রতি সেকেন্ড সময়ে তরঙ্গ দৈর্ঘ্য যে পরিমান বৃদ্ধি পায়, যদি আলোক রশ্মির দিক বরাবর গ্যালাক্সির ছুটে চলার বিপরীত দিকের হিসাব করা যায়, তবে সেক্ষেত্রেও কিন্তু হিসাব পাওয়া যাবে যে, গ্যালাক্সির যাত্রা কোথা হতে শুরু হয়েছিল। অনুরুপ সমগ্র গ্যালাক্সির ক্ষেত্রেও একই হিসাব প্রযোজ্য।

এরুপে সকল গ্যালাক্সির আলোক তরঙ্গ দৈর্ঘ্য হিসাব করলে দেখা যাবে যে, প্রতিটি গ্যালাক্সিই একটা নির্দিষ্ট স্থান থেকে যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে, গ্যালাক্সি গুলো সব এক জায়গায় জমা হয়ে ছিল। কেননা, সব গুলো গ্যালাক্সি একসাথে একই সময়ে সৃষ্টি হয় নি। প্রায় প্রতিটি গ্যালাক্সিই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সৃষ্টি হয়েছে।

কিন্তু গ্যালাক্সির ছুটে চলার দিক নির্ণয় থেকে অন্তত এটা স্পষ্ট হয় যে, গ্যালাক্সি যেদিকে ছুটে চলছে, তার সৃষ্টির উপাদানও ঠিক একই দিকে ছুটে চলবে। যদি এমনটি না হতো, তবে মহাবিশ্বের প্রসারন সম্ভবই হত না। এখন এই গতির বিপরীত দিকে গমন করলেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মহাবিশ্ব সৃষ্টির পূর্বে সকল এনার্জি একটি স্থানে পুঞ্জীভূত ছিল। এই পুঞ্জীভূত জিনিস টি কি ছিল তাহলে?

বিগ ব্যাং তত্ত্বানুসারে, ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের মহাবিশ্ব একটি অতিপরমাণুর (Super Atom) আকারে ছিল যা ছিল খুব ঘন ও উত্তপ্ত। এর আগের অবস্থাকে বলা হয় ‘সিঙ্গুলারিটি’। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সিঙ্গুলারিটি কি?

সিঙ্গুলারিটি হচ্ছে একটি বিশেষ ক্ষেত্র যা আমাদের পদার্থবিদ্যা বোঝার ক্ষমতাকে অগ্রাহ্য করে। এর অস্তিত্ব ‘ব্লাকহোল’ এর অন্তস্থলে কল্পনা করা হয়।আমরা জানি ব্লাকহোল হচ্ছে তীব্র মহাকর্ষীয় চাপের অঞ্চল। এই চাপ এত তীব্র যে এর একটি সামান্য পদার্থকে অসীম ঘনত্বের আঁধার ধরা হয়।

ক্লাসিক্যাল থিওরি অনুযায়ী এর ঘনত্ব হয় অসীম। কেননা সসীম ভর একেবারে বলতে গেলে শূন্য আয়তনে সঙ্কুচিত হয়। এই অসীম ঘনত্বের অঞ্চলকেই বলা হয় সিঙ্গুলারিটি। এটা স্থান ও সময়কে নির্দেশ করে এবং এখানে স্থান-কাল জালের বক্রতাও হয় অসীম। এখানে সাধারণ পদার্থবিদ্যার কোন নিয়ম খাটে না।এর বাংলা প্রতিশব্দ হল অদ্বৈত বিন্দু।

এখানে সিঙ্গুলারিটি মহাশূণ্যের ভেতর নয়, বরং মহাশূণ্যের উৎপত্তি সিঙ্গুলারিটির ভেতর হয়েছিল। সিঙ্গুলারিটির পূর্বে কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিলনা। সময়, পদার্থ বা শক্তি কিছুই ছিলনা। তাই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে কোথায় থেকে বা কিসের মধ্যে থেকে সিঙ্গুলারিটির উৎপত্তি হয়েছে? আমরা জানিনা, যে কোথায় থেকে এটা এসেছে বা এটা কোথায় ছিল।

আসলে সিঙ্গুলারিটি সম্বন্ধে আমরা যা জানি তা হচ্ছে আমরা এর মধ্যে আছি এবং একসময় সিঙ্গুলারিটি বলতেও হয়ত কিছুই ছিল না এমনকি আমরাও না। বলতে পারেন Nothing মানে কিছুই নেই।অন্যভাবে বললে বলা যায়, The Universe from Nothing!

হ্যা, আসলেই কিন্তু কিছুই ছিলনা যেখান থেকে এই ইউনিভার্স তথা মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে, এটা বললে হয়ত অনেকে পাগলও বলতে পারেন।আসলে তো, কিছু নাই সেখান থেকে কিভাবে এ মহাবিশ্ব সৃষ্টি হবে।হ্যা সম্ভব, সেটার একটা প্রমাণ হচ্ছে “কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন”।

কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন অনুসারে কোনো কিছু সৃষ্টি হতে পারে শূন্য থেকেই। আবার ঝামেলাও আছে, এখানে ম্যাটার, এন্টিম্যাটার এর ব্যাপারটাও চলে আসে। আগে পর্বে বলেছিলাম যে ম্যাটার আর অ্যান্টিপ্রোটন সংস্পর্শে আসলে নিমিষে ধ্বংস হয়ে যাওয়া।

শূন্য বলতে এখানে “শূন্যস্থান বা ভ্যাকুয়াম” নয়। শূন্য বলতে বোঝানো হচ্ছে “জিরো বা সিরিয়াস শূন্য” প্রতিনিয়তই শূন্য থেকে সৃষ্টি হচ্ছে কণা। প্রতিনিয়ত কণা সৃষ্টি হচ্ছে আর প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে।

বিগ ব্যাঙ

পূর্বে বলেছিলাম যে, সিঙ্গুলারিটির আগে কিছুই নাই অর্থাৎ স্থান ও কালের অস্তিত্ব ছিল না। অসীম ঘনত্বের এই মহাপরমাণুর ভিতরে বস্তুপুঞ্জের ঘন সন্নিবেশের ফলে এর তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছিল ১০১৮কেলভিন। বিগ ব্যাঙ -এর পরের ১ সেকেন্ডে যে ঘটনাগুলি ঘটেছিল, তা কয়েকটা অন্তযুগে ভাগ করা যায়

যেমন বিগ ব্যাং-এর ০ সেকেন্ড থেকে ১০-৪৩ সেকেন্ড  এ সময়কে প্লাঙ্ক-অন্তঃযুগ (Planck epoch) বলা হয়। এই সময় প্রাকৃতিক সকল বল একীভূত ছিল। বিজ্ঞানীরা এই বলের নামকরণ করেছেন অতি বৃহৎ বল (super force) । এই সময় মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হয়েছিল মাত্র  ১০-৩৫ মিটার। উল্লেখ্য এই দূরত্বকে বলা হয় ১ প্লাঙ্ক দৈর্ঘ্য। এই সময় তাপমাত্রা ছিল ১০৩২ কেলভিন।

১০-৪৩ থেকে  ১০-৩৬ সেকেণ্ড, জ্যোতির্বিজ্ঞানীর এই সময়ের নাম দিয়েছেন বৃহৎ একীকরণ অন্তঃযুগ (Grand unification epoch)। এই সময় উৎপন্ন শক্তির পরিমাণ ছিল ১০১৫  গিগা ভোল্ট। আর তাপমাত্রা ছিল ১০২৭ কেলভিন।

এই সময় অতি বৃহৎ বলের অন্তর্গত সবল নিউক্লিয়ার বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল, বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল মিলিত হয়ে ইলেক্ট্রো-নিউক্লিয়ার বল (Electronuclear Force) সৃষ্টি করেছিল। ধারণা করা হয়, এই সময় তৈরি হয়েছিল প্রাথমিক স্তরের অতিপারমাণবিক কণার ভিতরে দুটি বোসন কণা- এক্স এবং ওয়াই বোসন।

এই দুই কণা ক্ষয় হয়ে তৈরি হয়েছিল দুটি কোয়ার্ক কণা (আপ এবং ডাউন) এবং বলবাহী কণা লেপ্টনের দুটি কণা। একই সাথে তৈরি হয়েছিল এদের প্রতিকণাসমূহ (antiparticles) । প্রতিকণার সাথে মূল কণার সংঘর্ষে উভয় কণাই ধ্বংস হয়ে গেলে- থেকে গিয়েছিল শুধু কোয়ার্ক ও লেপ্টন কণাগুলো।একটা সময় কণাগুলো দৈবভাবে অবশিষ্ট থেকে যায়, যা আজকের মহাবিশ্ব তারই প্রতিরূপ।

এর পরবর্তী সময়কে বলা হয় প্রসারণ অন্তঃযুগ (inflationary epoch) ।এই সময়ের মধ্যে তাপমাত্রা নেমে আসে ১০২৭ থেকে ১০২২ কেলভিনে। এই সময় মহাবিশ্ব দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে।সৃষ্টি হয় মৌলিক বলগুলি। দুর্বল নিউক্লীয় বল ও বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল একত্রিত হয়ে, এই বলটি তৈরি হয়েছিল। ফলে সবল নিউক্লিয়ার বল স্বতন্ত্র বল হিসেব আত্মপ্রকাশ করেছিল।

এই সময় তৈরি হয়েছিল উৎতপ্ত কোয়ার্ক-গ্লুয়োন কণা। এছাড়া তৈরি হয়েছিল বোসন শ্রেণির তিনটি কণা। এগুলো হলো- ডব্লিউ এবং জেড বোসন কণা এবং হিগস বোসন কণা।এভাবে, চলে আসে কোয়ার্ক অন্তঃযুগ (Quark epoch) । এই সময় বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র দুটি বল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ফলে এই সময়েই প্রথম চারটি প্রাকৃতিক মৌলিক বল স্বতন্ত্রভাবে বস্তুজগতের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। এই সময় তৈরি হয়েছিল বিপুল পরিমাণ কোয়ার্ক, ইলেক্ট্রন ও নিউট্রিনো। কিন্তু এই সময়ে তাপমাত্রা ছিল  ১০১২ কেলভিন। আর শক্তির পরিমাণ ছিল ১০০ মেগাভোল্ট। এই উচ্চ তাপমাত্রায় কোয়ার্ক কণা থেকে হ্যাড্রোন তৈরি অসম্ভব ছিল।

কোয়ার্ক ছাড়াও সৃষ্টি হয়েছিল লেপ্টন এবং প্রতি-কণাসমূহ। তবে মূল কণা ও প্রতিকণার সংঘর্ষে উভয় কণা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এই সংঘর্ষের কারণে কোয়ার্ক কণা থেকে মেসোন ও ব্যারিয়ন কণার সৃষ্টি হয়েছিল।পরবর্তী পর্যায় ক্রমে সৃষ্টি হলো ইলেক্ট্রন, প্রোটন এবং নিউট্রন। যা পরমাণুর আদি রুপ।

সৃষ্টি হলো একটি ইলেক্ট্রন বিশিষ্ট প্রথম পরমাণু হাইড্রোজেন। শুধু হাইড্রোজেন কেন পরবর্তী সৃষ্টি হল আজকের সকল মৌলিক পদার্থ।বিলিয়ন বছর ধরে চলমান এই ক্রিয়া – বিক্রিয়া মধ্য দিয়ে আজ এই মহাবিশ্ব আমাদের এই সুন্দর সবুজ পৃথিবী।

বিগ ব্যাং নিয়ে হয়ত জেনে গেছি। আর কত যে জানা বাকি রইল এই হিসাব সম্ভবত আমাদের অগোচরে। এ বিশাল মহাবিশ্বকে হয়ত 0.000১% জানতে পারলাম মাত্র। মানে ১% জানা হয়নি।হয়ত একদিন আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু এই সুবিশাল মহাবিশ্বকে জানার শেষ হবেনা। তবুও কেন বসে থাকবো! মহাবিশ্বে জানার আজ অবধি নেই.! হ্যা, জানতে হবে। 

লেখকঃ কেপন চাকমা, Dhaka UniversityDepartment of LPE (3rd year)

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply