icon

বিঝু, সাংগ্রাই, সংক্রান ও বিষুব সংক্রান্তিঃ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উৎসবের মিলের সন্ধানে

Jumjournal

Last updated Oct 5th, 2020 icon 30

বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত বিঝু উৎসবের একটি অভিন্ন ভিত্তি রয়েছে। উৎসব পালনের ক্ষেত্রেও অনেক মিল দেখা যায়।

কিছু কিছু সাদৃশ্য চোখে না পড়ে থাকে না। অন্যগুলোর সম্পর্ক অপেক্ষাকৃতভাবে জটিল। এ বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

মিল ও বেমিল উভয় বের করা, উৎস থেকে বর্তমানকালের চর্চাতে। তবে এই লেখাটি সেই গবেষণাকাজ নয়। সেই দায়িত্ব রয়ে গেল অন্যের কাছে।

এই লেখাতে কেবল উল্লিখিত দেশসমূহে পালিত উৎসবের ক্ষেত্রে যেই মিলগুলো আমার চোখে পড়েছে, তা তুলে ধরা হচ্ছে, এই ভেবে যে, এসব কিছুর ক্ষেত্রে লেখালেখি খুব বেশি হয়নি।

আর আমার অজান্তে হয়ে থাকলে, করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা।

বছরের সময়

প্রথমত, বছরের সময়ের ক্ষেত্রে মিলামিল চোখ এড়িয়ে যেতে পারেনা। এই ক্ষণে একটি বছরের সমাপ্তি ও অন্য একটির শুরু হয়।

এভাবে আমরা একই বা নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত বাংলা, উড়িয়া, বর্মি, থাই এবং নেপালি পঞ্জিকা পেয়ে থাকি।

উৎসবের নাম

দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে উৎসবের নাম। পার্বত্য চট্টগ্রামে একে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়ঃ বিঝু (চাকমা), বিষু (তংচংগ্যা), বৈষু/বৈষুক (ত্রিপুরা) এবং সাংগ্রাই (মারমা)।

পার্বত্যাঞ্চলের বাইরে এর নাম অন্য। অসমে একে বলা হয় বিহু ( বহাগ বিহু বা রঙ্গালি বিহু)।

থাই আর লাওরা একে ডাকে সংক্রান হিশেবে, এবং এদের গোত্রীয় আত্মীয় অরুণাচল প্রদেশের খামতিরা একে বলে সাংকেন। উড়িয়ারা একে বলে বিষুব সংক্রান্তি।

বাংলাদেশ সহ বৃহত্তর বঙ্গ অঞ্চলে অনুরূপ নাম অতীতে প্রচলিত ছিল। বলা বাহুল্য, উপরে উল্লিখিত সব নামই ‘বিষুব সংক্রান্তি’ পদের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কযুক্ত।

বছরের এই সময়ে সূর্যটি বিষুব রেখা অতিক্রম করে। তাই ‘সংক্রান্তি’ (এই বিষয়ে বিশিষ্ট লেখক ও মানবাধিকারকর্মী দীপায়ন খীষা তার গতকালকের ফেসবুক পোস্টে সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন)।

চাকমাদের জন্য বিঝু তিন দিনের উৎসব। ফুল বিঝু, মুল বিঝু ও গজ্যেপজ্যে। শেষের দিন হল বাংলা বছরের প্রথম দিন।

জলের গুরুত্ব

তৃতীয়ত, এ উৎসবে জলের ভূমিকা লক্ষণীয়। কোন কোন সমাজে এর তাৎপর্য একেবারেই অপরিহার্য এবং কোন কোন সমাজে তা না হলেও গৌণ বলা যাবে না।

চাকমাদের মধ্যে গৌতম বুদ্ধের মূর্তির ধোওয়া ও বয়োজ্যৈষ্ঠদের স্নান করিয়ে দেয়া, বিশেষ করে নদী বা খালের জল নিয়ে, একটি প্রাচীন প্রথা।

এছাড়া, নদীতে ডুব দিয়ে স্নান করাটাও সামাজিক আচারের অংশ।

অনুরূপভাবে, ভারতের উড়িষ্যা প্রদেশে গাঙে ডুব দেয়া সংক্রান্তি উৎসবের অংশ। অন্য দিকে, দক্ষিণ পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা, বর্মা বা মায়ানমারের বিভিন্ন প্রদেশ, থাইল্যান্ড, লাওস ও কম্বোডিয়ার “জল যুদ্ধ” এ উৎসবে জলের গুরুত্ব আরেক পর্যায়ে নিয়ে যায়।

সনাতনী ক্রীড়া

চতুর্থত, কিছু কিছু জাতির ক্ষেত্রে, যথা চাকমা, বড়ো ও অহম বা অসমীয়দের বেলায়, সনাতনী ক্রীড়ার প্রতিযোগিতা হচ্ছে একটি প্রাচীন প্রথা। পূর্বেকার দিনে কেবল সনাতনী খেলা চলতো। ক্রমে বহির্বিশ্বের ক্রীড়াজগতের আইটেমও ঢুকে পরে।

কাজলং উপত্যকার রুবোগারীতে ১৯৮০ বা ১৯৯০-এর দশকে “বিবাহিত মহিলাদের ১০০ মিটার দৌড়” প্রতিযোগিতা দেখার কথা মনে পড়ছে।

অনুরূপভাবে, দুএকদিন আগে ইউটিউবে দেখলাম অসম প্রদেশের বড়ো বা অন্য কোন সম্প্রদায়ের গ্রামে বিহুর সময় “মহিলাদের ম্যারাথন” প্রতিযোগিতা চলছে (অতএব এই উৎসবের সময় সংশ্লিষ্ট জাতির বিবাহিত এবং অন্যান্য মহিলারা কেবল খাওয়া-দাওয়া পরিবেশন করার দায়িত্বে নিয়োজিত নন!)।

ভোজন ও পানীয়

পঞ্চমত, খাদ্য ও পানীয় উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। চাকমাদের ক্ষেত্রে বিঝুর তৃতীয় দিনের আগে মাছ-মাংস খাওয়া হতো না।

এই প্রথার প্রতিপালনে তারতম্য রয়েছে, চাকমাদের গোত্র ভেদে, এবং অন্যান্য জাতিদের ক্ষেত্রে, নানা ভেদে। চাকমাদের উৎকৃষ্ট পরিবেশনকৃত খাদ্য হলো নানাবিধ সবজির তরকারি ‘পাজন’ (‘পাচন’)।

আমার কাকাতো ভাই, রাহুল রায়, যিনি অসম প্রদেশের প্রখ্যাত জমিদার ও হাতি ব্যাবশায়ী প্রখিতিশ চন্দ্র বড়ুয়া (লালজি) এর নাতি (এবং রাঙামাটির রায় কুমার বিরূপাক্ষ রায় বাহাদুরেরও নাতি), আমাকে বলেন যে অসমে চাকমাদের পাচন-তুল্য তরকারিকে বলা হয় ‘ঝাকুয়া’।

কমপক্ষে সাত ঘরের পাচন খেলে নাকি মঙ্গলময়। একাধিক প্রকারের চালের পিঠাও পরিবেশিত হয়।

মারমাদের ক্ষেত্রে বিঝুর পূর্বেকার দিনগুলোতে পিঠে তৈরি করা সেটা একটা আলাদা উৎসব বটে, যাতে যুবক-যুবতী ও কিশোর-কিশোরীরা অনাবিল আনন্দে মেতে ওঠে।

চাকমাদের ক্ষেত্রে উৎসবের বিশেষ পানীয় হল জগরা। বিনি চাল নিয়ে তৈরী এই মিষ্টি মাদকীয় পানীয় এই বিশেষ দিনের জন্য নারী ও কিশোরদের জন্যেও উন্মুক্ত।

জাতি, দেশ, কৃষ্টি

পৃথিবীর মানচিত্রতে বিঝু প্রতিপালনকারী এলাকা খুঁজতে গেলে পূর্বে পাওয়া যায় কমবোডিয়া (এবং এমনকি ভিয়েতনাম ও চীনের ইয়ুনান প্রদেশ) এবং পশ্চিমে ভারতের উড়িশ্যা রাজ্য।

আর অক্ষাংশের দিক থেকে দেখলে উত্তরে পাওয়া যায় ভারতের অরুণাচল প্রদেশ এবং দক্ষিণে মালয়েশিয়ার সীমান্তের নিকটবর্তী থাইল্যান্ড ও বর্মা (মায়ানমার) এর উপদ্বীপ অঞ্চল।

যেই জাতিসমূহ এর ভিন্ন অঙ্গীকে বিঝুকে প্রতিপালন করে, তাঁদের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ধর্ম বা আধ্যাত্তিক বিশ্বাস এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।

তবে তাঁদেরকে একসাথে ধরে রেখেছে সেই লগ্ন, যখন সূর্য মেশ রাশির আঙ্গিনায় প্রবেশ করে।

এই লেখক, যিনি মেশ রাশির এক সদস্য (আমার সৌর এবং চান্দ্র রাশি উভয়ী মেশ বা Aries), ২০১৯ সনের বিঝুর জন্য পাঠককে বিশেষ শুভেচ্ছা পাঠালো।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply