icon

সর্বত্র, সর্বদা মানব সেবায় – উন্মেষ

Jumjournal

Last updated Aug 25th, 2020 icon 1380

২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী রাংগামাটিতে একদল জুম্ম তরুন-তরুণী মিলে মানব সেবার ব্রত নিয়ে গঠন করেছিলেন স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন ‘উন্মেষ’।

এই বছরের ২৮ তারিখ ‘উন্মেষ’ ৫ম বছর পার করে ৬ষ্ঠ বছরে পদার্পন করেছে এবং সর্বত্র, সর্বদা মানব সেবায় কাজ করার স্লোগান নিয়ে সামনের দিনগুলিতেও জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কাজ করার ব্রত গ্রহণ করেছে। জুমজার্নালের পক্ষ থেকে, তাদের নিয়ে এবারের প্রতিবেদনটি লিখেছেন এডিট দেওয়ান।

২রা সেপ্টেম্বর, ২০১৭। সন্ধ্যা, সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট, রাংগামাটি। একটি মিলনমেলা। সাথে আলোচনা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সেদিন ছিল ‘উন্মেষ’ এর কর্মীবাহিনীর পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। আমিও সেদিন তাদের সাথে কথা বলার উদ্দেশ্য নিয়ে মূলত মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতেই সেখানে গিয়েছিলাম। অনেকটা ‘বড়গাঙ টাও দেখা হল আবার নতুন হাদি টাও ধোয়া হলো’ এর মতন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক ও বর্তমান সদস্যা নিরুপা দেওয়ান ও বাঞ্চিতা চাকমা এবং প্রথম আলোর সাংবাদিক হরিকিশোর চাকমা সহ অনেকে সেই পুনর্মিলনী সভার আলোচনাতে যোগ দিয়েছিলেন।

কথা বলেছিলেন তারুণ্যের দায় এবং দায়িত্ব নিয়ে, যে দায় এর ছাপ পড়ল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রথম পরিবেশনাতেও। পরিবেশনাটি ছিল একটি চাকমা ভাষার নাটিকা যেখানে রক্তদান বিষয়ের যাবতীয় খুঁটিনাটি তুলে ধরা হয়।

‘উন্মেষ’ এই রক্তদান এবং রক্তদানের বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা তৈরীর কাজটা অডিটোরিয়ামের ভেতরে এবং বাইরে করে চলেছে ৬ বছর ধরে। শেষ হতেই অডিটোরিয়াম দর্শকদের করতালিই বলে দিচ্ছিল আমার বড়গাঙ দেখাটা স্বার্থক।

তবে তাদের নানা ব্যস্ততার কারণে সেদিন নতুন হাদি ধোয়া না হলেও পরে ঠিকই তাদের সাথে কথা হয়েছে এর এক সপ্তাহ পর ৯ তারিখে।

Unmesh Logo
উন্মেষের লোগো

আরেকটি কথা না বললেই নয়। সেদিন নাটিকাটি পরিবেশন করেছিল ‘উন্মেষ সাংস্কৃতিক ইউনিট বা দল’ যেটি সম্প্রতি গঠিত হয়েছে। স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে সচেতনটা সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে ‘উন্মেষ’ এর এই ইউনিট পথ নাটক, গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে তাঁদের এ কাজ করার অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন।

৯ তারিখে কথা হচ্ছিল দীপেন চাকমা, পরম চাকমা, ইম্পল ত্রিপুরা, পারমিতা চাকমা এবং সুবিমল চাকমার সাথে। ‘উন্মেষ’ এ বিভিন্ন পদধারী হলেও তারা সবাই মূলত বন্ধু এবং ‘উন্মেষ’ এর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন।

তার মধ্যে দীপেন আর পরম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য। একটি জিনিস সেদিন তারা জোর দিয়ে বললেন, লোকে উন্মেষ কে শুধু রক্তদাতা সংগঠন মনে করলেও উন্মেষ আসলে মানবসেবামূলক বা সমাজসেবামূলক সব ধরনের কাজেই নিয়োজিত আছে এবং থাকবে।

এরই মধ্যে বিভিন্ন দুর্যোগে (মানব সৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক) তাদের কর্মকান্ড মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়াও মাতৃভাষা দিবস, রক্তদাতা দিবস, বিজয় দিবস, বিঝু র‌্যালীসহ জাতীয় ও সামাজিক পর্যায়ের বিশেষ বিশেষ দিবস সমূহ উদ্যাপন করেছেন।

মাত্র ১২ জন নিয়ে শুরু হওয়া ‘উন্মেষ’ এর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৪০০-এর অধিক হলেও নিয়মিত কাজ করেন ১০০ জন এর অধিক তরুণ-তরুণী যারা সর্বত্র, সর্বদা মানব সেবার ব্রত নিয়ে প্রস্তুত থাকেন।

এই মানবতার সৈনিকেরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার পাশাপাশি নানা সামাজিক কর্মকান্ডে তাদের সরব উপস্থিতির জানান দিয়েছেন।

তারা ২০১৪ সালে নানিয়ারচরের বগাছড়িতে জুম্মদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলায় ঘর-বাড়ী হারানো মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করে সেই ত্রাণ যথাসময়ে দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করে মানব সেবায় তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন।

রাংগামাটি সদর সহ বিভিন্ন জায়গায় বাড়ীতে বাড়ীতে, দ্বারে-দ্বারে ঘুরে ঘুরেই ‘উন্মেষ’ তাদের সেই ত্রাণ সংগ্রহ করেছিল। সেই একই কাজ এ বছরও তারা করেছে লংগুদুতে সাম্প্রদায়িক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জুম্মদের সাহায্যার্থে।

সম্প্রতি রাঙামাটিতে স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিধ্বসের দুর্যোগ মোকাবিলায় ‘উন্মেষ’ ৫টি দলে বিভক্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিক তালিকা তৈরী করেছে এবং ত্রাণ তুলে তা রাংগামাটি সদর সহ বিভিন্ন উপজেলায় ভূমিধ্বস এবং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করেছে।

চাকমা রাজ পরিবারের সাথে মিলে অতি সম্প্রতি ‘উন্মেষ’ সাজেকে দুর্ভিক্ষ কবলিত জুম্মদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছে।

Activities of Unmesh
উন্মেষের সামাজিক স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম, ছবিঃ উন্মেষ

‘উন্মেষ’ অসহায় এবং অস্বচ্ছল রোগীদের সুচিকিৎসার সহায়তার উদ্দেশ্যে তহবিল গঠন করে সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। তহবিল সংগ্রহে তারা কনসার্ট, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি ঘুরেও অর্থ সংগ্রহ করে থাকেন।

এতে নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলেও ‘উন্মেষ’ টিম এগুলোকে মানবসেবার জন্যে হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। এরই মধ্যে অগ্নিদগ্ধ সুমনা চাকমা, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত থুইচিং মারমা, ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত নিশান চাকমা, হার্ট অপারেশনের পারমি চাকমা, শ্রবণ প্রতিবন্ধী উজো চাকমা, জরায়ু অপারেশনে নমিতা চাকমা, পাইল্স অপারেশনের নরেশ চাকমার জন্য তহবিল সংগ্রহে তাদের সফলতা তাদের অদম্য মানসিকতাকেই প্রতিফলিত করে।

যদিও চিকিৎসা শেষে বাড়ী ফেরার কয়েক মাস পর নিশান চাকমা মারা যান। বর্তমানে কিডনী অকেজো রোগী স্বপন চাকমার চিকিৎসা সহায়তার জন্য তহবিল সংগ্রহের কর্মসূচি চলমান আছে। চাইলে অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে আপনিও তহবিল সংগ্রহের কর্মসূচিতে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

এমন নয় যে, উন্মেষের জন্মলাভের আগে রাংগামাটিতে কেউ রক্ত দান করতো না। তখন কারো রক্তের প্রয়োজন হলে মানুষ প্রথমে রাংগামাটি সরকারী কলেজে খোঁজ নিতো। তাদেরকে তখন এই খোঁজাখুঁজিতে সাহায্য করতো পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কর্মীরা।

সেই সময় অনেকে রাঙ্গাপানি সিএনজি স্টেশনে ও খোঁজ নিতো কারণ সেখানে একটি তালিকা ছিল। তবে এরকম কোন সংগঠিত কেন্দ্র ছিল না যেখানে মানুষ রক্তের জন্য যোগাযোগ করতে পারত, এমনটাই বলছিলেন দীপেন চাকমা ও পরম চাকমা।

সেই প্রেক্ষাপটে রক্তের অভাবে যাতে কাউকে অকালে ঝড়ে যেতে না হয় সেই উদ্দেশ্যে বিক্ষিপ্ত রক্তদাতাদের বিশেষ করে তরুণদের এক কাতারে সুসংগঠিত করে ‘উন্মেষ’।

যেই কাজটি ‘উন্মেষ’ এখনো করে চলেছে। মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে রক্তদানের মাহাত্ব্য এবং প্রয়োজনীয়তার কথা। মানুষ এখন জানে যে রক্তদান করলে শরীরের ক্ষতি তো হয়ই না, উল্টো শরীরের ভিতরে নষ্ট হয়ে যাওয়া রক্ত মানুষের উপকারে আসে।

এ পর্যন্ত ‘উন্মেষ’ ৭৪ বার ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৪৭০০ এর অধিক জনের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে স্বেচ্ছায় রক্তদানে ইচ্ছুকদের তালিকা তৈরী করেছে। প্রায় সময়ই ‘উন্মেষ’ এর কর্মীরা নিজেদের খরচে রক্তদাতাদেরকে হাসপাতালে আনা নেওয়া সহ রক্তদান পরবর্তী পরিচর্যার কাজটি করে চলেছেন বিনামূল্যে। মানবতার সৈনিক তাদের তাই বলাই যাই!

Activities of Unmesh
রক্তের গ্রুপ নির্ণয় এবং রক্তদাতা সংগ্রহকরণ কর্মসূচী, ছবিঃ উন্মেষ

চলমান বিভিন্ন মানবসেবামূলক কাজের পাশাপাশি ভবিষ্যতে শিক্ষা নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনার কথা জানালেন দীপেন ও পরমসহ উপস্থিত সবাই। ইতিমধ্যে তাঁরা এ উদ্দেশ্যে লাইব্রেরী তৈরীর কাজ শুরু করেছেন যে লাইব্রেরীতে সবাই পড়ার সুযোগ পাবেন।

বর্তমানে তারা একটি অফিস ও নিয়েছেন যে অফিসটির ভাড়া তাঁরা সবাই মিলে কম বেশী করে মিলিয়ে দিচ্ছেন। সংগঠনটি ও চালাচ্ছেন সবাই মিলে মাসিক ফি ২০ টাকা করে জমিয়ে। তাছাড়া মাসিক, ত্রৈমাসিক, ষান্মাসিক, বাৎসরিক বিভিন্ন মেয়াদে আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমেও অনেকেই তাদের ‘দাতা সদস্য’ হয়ে সাহায্য করছেন।

চাইলে ১০,০০০ টাকা বা তথোর্ধ আর্থিক অনুদান প্রদান করে ‘আজীবন সদস্যপদ’ নেয়ার মাধ্যমে ও তাদের এই মানবসেবামূলক কার্যক্রমে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।

‘উন্মেষ’ তাদের মানবসেবামূলক কার্যক্রম বর্তমানে রাঙামাটির পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও ঢাকাতেও সম্প্রসারণ করেছে এবং মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে মানব সেবার মহান বাণী। মানবতার জয় হোক।


একটি জুমজার্নাল প্রতিবেদন

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply