icon

ম্রো জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার (কাকশাংমি)

Jumjournal

Last updated Dec 22nd, 2019 icon 311

ম্রো উত্তরাধিকার প্রথার উদ্ভব

পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী ম্রো সমাজে অদ্যাবধি জুম চাষ তাদের প্রধান পেশা। ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ৪২ নং বিধিমতে পাহাড়ে জুম চাষের জন্য জমির মালিকানা স্বত্বের প্রয়োজন হয় না, যার কারণে ম্রো সমাজে স্থাবর সম্পত্তির তথা ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা অতীতে তেমন একটা ছিল না বললেই চলে।

এ অবস্থায় সম্পত্তির উত্তরাধিকার অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী ম্রো সমাজে অতীতে তেমন সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠেনি। পরিবারের সম্পদ বন্টন হয় অলিখিত বা মৌখিকভাবে।

ইদানীংকালে জুম চাষের জন্য জমির অপ্রতুলতা এবং পর্যায়ক্রমে একই জমিতে বংশানুক্রমিকভাবে চাষাবাদের কারণে ম্রো জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্যান কৃষির প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষিত সমাজে ভূ-সম্পত্তির উপর স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণার উদ্ভব হয়েছে।

 

ম্রো উত্তরাধিকারের সাধারণ নীতি

ম্রো সমাজভুক্ত পরিবারের কেউ মারা গেলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার দায়-দায়িত্ব পালন করে মৃতের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবার বিষয়টি সম্পর্কযুক্ত এবং পারিবারিক কর্তব্য হিসেবে সমাজে স্বীকৃত।

মৃত ব্যক্তির সৎকার/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয়, তার অনাদায়ী ঋণ (যদি থাকে), জীবদ্দশায় সম্পাদিত উইল বা দানমূলে দখল হস্তান্তরিত হয়েছে কিন্তু মালিকানা হস্তান্তরিত হয়নি, এমন ভূ-সম্পত্তির দায়/দাবী মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে তার উপরই উত্তরাধিকারীগণের অধিকার বর্তায়। কিন্তু একজন সম্পত্তির মালিকের সম্পূর্ণ স্থাবর সম্পত্তি উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না।

 

উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি কি কি

সম্পত্তির মালিক মৃত্যুকালে যেসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রেখে মারা যায় সেসবই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য। অস্থাবর সম্পত্তি যেমনঃ- আসবাবপত্র, থালাবাটি, কাপড়চোপড়, অলংকার, গবাদিপশু ইত্যাদি উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে আপোষ রফায় ভাগবন্টন হয়।

কিন্তু লিখিত কোনো আইন বা বিধি-বিধানমতে সেগুলো ভাগবন্টন করা হয় না। কেবলমাত্র ভূমি তথা জায়গা-জমিকে স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে সামাজিক বিধি-বিধানমতে ভাগবন্টন করা হয়। তাই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি বলতে সাধারণভাবে স্থাবর সম্পত্তিকেই বুঝানো হয়।

কিন্তু একজন সম্পত্তির মালিকের সম্পূর্ণ স্থাবর সম্পত্তি উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না। সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুর পর তার সৎকার/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয়, তার অনাদায়ী ঋণ (যদি থাকে) এবং জীবদ্দশায় দখল হস্তান্তরিত হয়েছে কিন্তু মালিকানা স্বত্ব হস্তান্তরিত হয়নি এমন ভূ-সম্পত্তির দায়/দেনা মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকবে তার উপরই উত্তরাধিকারীগণের অধিকার বর্তায়।

 

সম্পত্তির উত্তরাধিকার রীতি

তিন পার্বত্য জেলার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, সংশ্লিষ্ট মৌজারহেডম্যান/ইউ.পি চেয়ারম্যান/কার্বারী/পৌর চেয়ারম্যান/সার্কেল চীফ এদের নিকট হতে মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ পূর্বক ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের ৭ নং ধারামতে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট জেলার দেওয়ানী আদালতের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবিধ মামলা মুলে তিনি মৃত ব্যক্তির আইনগত উত্তরাধিকারীগণকে উত্তরাধিকার সনদপত্র প্রদান করেন।

পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী ম্রো পরিবারে কারো মৃত্যুর পর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য ব্যয়িত খরচ, তার জীবদ্দশায় অনাদায়ী ঋণ এবং জীবদ্দশায় কোনো সম্পত্তি দান বা বিক্রি কিংবা মৃত্যুর পূর্বে সম্পাদিত উইল ইত্যাদির দাবী পরিশোধ বা নিষ্পন্ন করার পর নিম্নোক্ত উপায়ে পার্বত্য জেলাসমূহের ম্রো সমাজে উত্তরাধিকার রীতির প্রচলন রয়েছেঃ-

বোমাং সার্কেলে বসবাসকারী ম্রো সমাজে মৃত ব্যক্তির পুত্র সন্তানই পিতার সম্পত্তির অপ্রতিরোধ্য আইনগত উত্তরাধিকারী।

 

উত্তরাধিকারযোগ্য পদ পদবী

পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০-এর ৪৮ নং বিধিমতে সার্কেল চীফ নিয়োগ এবং হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্ত বিষয়ে লিপিবদ্ধ আছেঃ-

ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ এর ৪৮ বিধিতে ম্রো সমাজের হেডম্যান/কার্বারী এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্কেল চীফের সুপারিশ বা মতামতকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। হেডম্যান/কার্বারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র যদি যোগ্য হন তাকে সেই পদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

খ) ম্রো সমাজের সমাজপতির পদটি বংশানুক্রমিক হিসেবে জ্যেষ্ঠ পুত্র এতে অগ্রাধিকার পায়, যদিও উক্ত সমাজপতি পদটি ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধিমতে স্বীকৃত নয়।

ম্রো সমাজের উত্তরাধিকার প্রশ্নে অগ্রাধিকার ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস:-

ক) ম্রো পরিবারে মৃতের পুত্র সন্তানেরা অপ্রতিরোধ্য উত্তরাধিকারী। স্ত্রী বলতে- প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী, সন্তান বলতে ঔরসজাত, অবৈধ ও দত্তক পুত্রকে বুঝায়।

খ) ম্রো পরিবারে মৃত ব্যক্তির পুত্র সন্তান যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে কন্যা সন্তানেরা মায়ের সাথে মৃতের সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হয় এবং কন্যা সন্তানগণ মৃতের সম্পত্তিতে মায়ের সমান হারে সম্পত্তির ভাগ পায়। এক্ষেত্রে মূতের কন্যা সন্তান বলতে ঔরসজাত কন্যা, অবৈধ কন্যা, দত্তক কন্যা সকলেই কন্যা সন্তান রূপে গণ্য হয়।

গ) স্বামীস্ত্রী: স্বামী-স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকলে যে কোনো একজনের মৃত্যুতে অপরজন উত্তরাধিকারী হয়।

ঘ) পিতামাতা: মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, নাতি-নাতনী যদি থাকে, সেক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি যাদের ঔরসজাত অথবা দত্তক সন্তান রূপে যাদের স্নেহে লালিত পালিত হয়েছে সেই পিতামাতা মৃতের উত্তরাধিকারী হয়।

ঙ) রক্ত সম্পর্কীয়: ম্রো সমাজে মৃত ব্যক্তির স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, নাতি, নাতনী, পিতা-মাতা কেউ যদি জীবিত না থাকে অথবা জনুগ্রহণ না করে, সেক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির ভ্রাতা, ভ্রাতার পুত্রকন্যা তাদের অবর্তমানে বোন, বোনের পুত্র-কন্যাগণ মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হয়।

চ) ম্রো পরিবারে মৃতের যদি স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, পিতা, মাতা, ভাই, বোন এবং ভাইপো-ভাইঝি ও ভাগ্নে-ভাগ্নী এ সকল আত্মীয় এবং রক্ত সম্পর্কীয় নাতি-নাতনী কেউ যদি জীবিত না থাকে অথবা জন্মগ্রহণ না করে, সেই ক্ষেত্রে মৃতের কাকা/জেঠা, তাদের অবর্তমানে কাকা/জেঠার পুত্রগণ আইনগত উত্তরাধিকারী হয়।

 

সম্পত্তির ভাগবন্টন

ক) ম্রো সমাজে মৃত স্বামীর অস্থাবর সম্পত্তিতে স্ত্রী আইনগত উত্তরাধিকারী হয়। তবে বিধবা স্ত্রী দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে পূর্বের স্বামীর সম্পত্তিতে আইনগত উত্তরাধিকার হারায়।

খ) ম্রো সমাজে কন্যা সন্তানেরা মৃত পিতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হয় না, যদি না পিতা জীবদ্দশায় কন্যা সন্তানকে তার নিজ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দান বা উইল করে দেয়। তবে পুত্র সন্তান না থাকলে কন্যা সন্তানগণ মৃত পিতার অর্ধেক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

গ) ম্রো সমাজে পুত্র সন্তানেরা মৃত পিতা-মাতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে সমান হারে নিরঙ্কুশ মালিকানা ও আইনগত উত্তরাধিকারী হয়। তবে পিতা-মাতাকে আমৃত্যু লালন-পালনকারী পুত্রসন্তানই সম্পত্তির বেশী অংশ পায়। মৃতের দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানেরা অনুরূপ উত্তরাধিকারী হয়।

ঘ) মৃত ব্যক্তির পরিবারের কোনো সদস্য যদি জাতিচ্যুত, সমাজচ্যুত ও ধর্মচ্যুত হয়, তাহলে উত্তরাধিকার হারায়।

অবৈধ সন্তানের উত্তরাধিকার স্বত্ব

যে ব্যক্তির ঔরসে অবৈধ সন্তান (জারজ) জন্মগ্রহণ করে সেই ব্যক্তির (জন্মদাতা) সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা অনুসারে সন্তানের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হয়। ম্রো সমাজে এরূপ সন্তানকে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করা হয় না। একপ সন্তান কেবলমাত্র নিজ মাতার নামীয় সম্পত্তির (যদি থাকে) উত্তরাধিকারী হতে পারে।

অসামাজিক কাজের জন্য গর্ভজাত সন্তান তার পিতৃ পরিচয় ও উত্তরাধিকার পায় যদি জন্মদাতার সাথে গর্ভধারিনী দাম্পত্য সম্পর্ক থাকে।

ম্রো সমাজে ঔরসজাত বা অবৈধ সন্তান এমন ধারার প্রচলন নেই। বিবাহ নিষিদ্ধ সম্পর্কের কারণে প্রেমিকের সাথে প্রেমিকার বিবাহ না হলে ঐ পাত্রী যার ঘরে বউ হয়ে যাবে পাত্রীর গর্ভজাত সন্তান সেই ব্যক্তির পিতৃ পরিচয় ও উত্তরধিকার হবে।


তথ্যসূত্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন (গ্রন্থনা ও সম্পাদনা – এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা,  এডভোকেট প্রতিম রায়, সুগত চাকমা)।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply