icon

লেখালেখি নিয়ে আমার ভাবনা আর প্রত্যাশাগুলো

Jumjournal

Last updated Jan 23rd, 2020 icon 327

আশির দশকের সামরিক শাসনামলের সেই অস্বস্তিকর সময়টা আমি কখনো ভুলতে পারি না। জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সংগঠন শান্তিবাহিনীর নেতৃত্বে পার্বত্য আদিবাসীদের স্বাধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম তখন একেবারে তুঙ্গে।

শ্বাসরুদ্ধকর সেই সময়টাতে জনসমাবেশ, সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চা আর প্রগতিবাদী ধ্যান-ধারণার অবাধ বিনিময়, আলোচনা ছিল প্রচ্ছন্নভাবে নিষিদ্ধ।

আমি তখন স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্র। প্রায় সব ফুলের চার/পাঁচ জন এর প্রতিনিধি নিয়ে আমাদের জনা চল্লিশেক ছাত্রের একটা বিশাল বাহিনী ছিল।

স্কুল পালানো, আড্ডাবাজি, ব্যান্ড সঙ্গীত নিয়ে মাতলামিতে তখন যেন এক ঝাঁক প্রজাপতির মত আমরা সারাদিন উড়ে বেড়াতাম। কাঁচা বয়স কিংবা উপচে পড়া তারুণ্যের বিশৃঙ্খল প্রবণতার মধ্যেও একটি নিয়ম আমরা যন্ত্রচালিত রোবটের মত মেনে চলতাম।

সূর্য ডোবার আগেই আমরা আড্ডাস্থল ত্যাগ করে গৃহপালিত প্রাণির মত স্ব স্ব আলয়ে আশ্রয় গ্রহণ করতাম। কারণ সন্ধ্যার পর দল বেঁধে বনরূপার পেট্রোল পাম্প, তবলছড়ির বটতলা, কর্ণফুলীর পাড় কিংবা অন্য কোথাও খোশগল্পে মাতবো সে দুঃসাহস আমাদের অনেকের ছিল না।

প্রকাশনা জগতে সেবা প্রকাশনীর তখন একচ্ছত্র আধিপত্য। এই স্বনামখ্যাত প্রকাশনীর সদ্য প্রকাশিত ‍ওয়েস্টার্ন, মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কিশোর ক্লাসিক এবং থ্রিলারগুলোর প্রতি ছিল আমাদের দুর্দান্ত আকর্ষণ।

এসব বই দৈনিক টিফিনের উদ্বৃত্ত এবং স্কুল বৃত্তির টাকায় আমি, নিকুলিন, আরিফ, বিপ্লব, শাহেদ, সাঈদ, রেজাউলরা মিলে রিজার্ভ বাজারের এক লাইব্রেরি থেকে কিনে নিতাম।

টাকার বিনিময়ে দু’ একদিনের জন্য ভাড়াও নেয়া যেত তবলছড়ির এক বইয়ের দোকান থেকে। আর পালাক্রমে দ্রুততার সাথে পড়ে নিতাম। এমনও নজির আছে প্রচণ্ড আসক্তির কারণে নোট সংগ্রহের দোহায় দিয়ে রাত বিরাতে আমি কোন বন্ধুর বাসায় ছুটে গেছি গল্পের বই আনতে।

আর রাত জেগে লুকিয়ে গোগ্রাসে গিলেছি। তার পরদিন ভোরে বিমল স্যার নতুবা আওয়াল স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার সময় তলে দিয়েছি আরেক বন্ধুর হাতে।

এমনই তীব্র ছিল তখন বই পড়ার প্রতি আমাদের নেশা। এসব করতে গিয়ে আমার লাভ বা ক্ষতি কি হয়েছিল জানি না। তবে বই পড়ার অভ্যাস রপ্ত হয়ে গিয়েছিল।

আর আড়ালে-আবডালে, লুকিয়ে ছন্দহীন ছড়া, আধাখেচড়া কবিতা আর ছোটগল্প লেখার দুঃসাহস গড়ে উঠেছিল। আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রকাশ্য রাজনীতি তখন এক প্রকার নিষিদ্ধ।

এ কঠোর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সেই সময়কার কলেজ পড়ুয়া কতিপয় ছাত্র বৈষমন্ত্রী সমাজ ব্যবস্থা, ন্যায় ভিত্তিক রাষ্ট্র আর মানবাধিকার এর বুলি আমাদের শোনাতে আসতেন।

টিফিন পিরিয়ডে ডিসি বাংলো বা স্কুলের আশেপাশের কোন সুবিধাজনক স্থানে বসে আমরা বিস্ময়ভরা কৌতুহলে তাদের কথাগুলো শুনতাম।

রাজনীতির প্রাথমিক পাঠ আমার তাদের কাছ থেকেই নেয়া। রাজনীতিতে আমার সেই পথচলা অব্যাহত ছিল আমার শিক্ষা জীবনের একদম শেষ পর্যন্ত।

আরও পরে একটা সময় অগ্রজ স্বাগতম চাকমা, পলাশ চাকমা আর প্রয়াত ইউজিন খীসা আমাদেরকে স্কুল থেকে একটা ম্যাগাজিন বের করার উৎসাহ যোগালেন।

আমরা তিন বন্ধু সুজিত নীলোৎপল আর  আমি মিলে তাদের আহবানে সাড়া দিয়ে কণ্টকাকীর্ণ সে পথে পা বাড়ালাম।

সন্ধ্যায় তবলছড়ি আনন্দ বিহারে তখন আমাদের কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা চলতো। কখনো স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে, কোন সময় স্কুল ফাঁকি দিয়ে আমরা তিন বন্ধু সে সময় বিজ্ঞাপনের খোঁজে অর্থশালী ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানের দ্বারে দ্বারে ঢুঁ মারতাম।

আমার মনে আছে সে সময়ই প্রথম দুরু দুরু বুকে আমরা উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (বর্তমানে ক্ষু-নৃ.সা.ই)-এ পা রেখেছিলাম।

তৎকালীন পরিচালক প্রয়াত সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার আন্তরিক ব্যবহারে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। এমন কিছু কিছু সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব আর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সহায়তায় আমরা ফাল্গুনী পূর্ণিমা উপলক্ষে প্রকাশ করতে সক্ষম হলাম ‘ফাল্গনী’ নামে প্রথম স্কুল ম্যাগাজিন।

নিজেদের প্রচেষ্টার ফসল সেই ছাপানো বইটি যখন প্রথম হাতে নিলাম সব তিক্ত অভিজ্ঞতা নিমেষেই ভুলে গিয়েছিলাম। সে এক অভুতপূর্ব অনুভূতি, ভালোলাগা! বই ছাপানোর অভিজ্ঞতা যাদের আছে আমি নিশ্চিত তারা আমার সেই বাঁধভাঙা আবেগকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করতে পারবেন।

কলেজ জীবনের মেঘের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়ে বেড়ানোর সেই দিনগুলিতেও লেখালেখি নিয়ে আমার ভাবনাগুলো আরও পল্লবিত হল।

দেয়ালপত্রিকা, কলেজ ম্যাগাজিনে লেখা জমা দেবার জন্য সর্বদা মুখীয়ে থাকতাম। কলেজে তখন বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলত পুরোদমে। ছাত্রদের মধ্যেও এনিয়ে বেশ মাতামাতি চলতো।

সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম থাকলেও সে সময় আদিবাসী ছাত্র ছাত্রীদের কোন দল বা সংগঠন ছিল না। তাই কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন যখন এগিয়ে এলো তখন নির্বাচনে অংশ গ্রহণ নিয়ে সংকট দেখা দিল।

অবশেষে ‘নির্দলীয় ছাত্র ঐক্য’ এর ব্যানারে উক্ত নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে সময়কার তুখোড় ছাত্রনেতা শুভাশীষ চাকমা, হেমল দেওয়ান, প্রবীন খীসা তাতু, শিমুল চাকমা, কুসুম দেওয়ান, চিরজ্যোতি চাকমা, সজীব চাকমা, সুখের চাকমাদের সাংগঠনিক দক্ষতায় আমরা ২১টি আসনের মধ্যে ১৮টি আসনেই জয়ী হই।

কৌশলগত কারণে বাকি ৩টি আসনও আমরা ছাত্রলীগ নেতৃত্বাধীন জোটকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার জানামতে সেই কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পর আর আজ পর্যন্ত কোন ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যার ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে অন্য কোন প্রক্রিয়ায় এখন নেতা তৈরি হচেই না।

দলীয় আদর্শ আর এজেন্ডার বাইরেও যে ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার নিয়ে রাজনীতি হতে পারে এমন ধারণা তাই এখনকার ছাত্রনেতা, কর্মীদের মধ্যে অনুপস্থিত।

পার্বত্য এলাকার প্রধানতম সামাজিক উৎসব বিঝুকে ঘিরে আমরা কলেজ থেকে একটি সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিলাম। সবাই মিলে সংকলনের নাম ঠিক করলাম ‘বৈসাবি’।

ত্রিপুরা, মার্মা, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যারা নিজেদের ভাষায় এই উৎসবকে যথাক্রমে ‘বৈসুক-সাংগ্রাই-বিঝু’ নামে অভিহিত করে থাকে।

তঞ্চঙ্গ্যা, গুর্খা এবং অহমিয়া আসাম জনগোষ্ঠীরাও একে ‘বিহু’ উৎসব বলে থাকে। তবে এ ব্যাপারটি তখন তাদের আমাদের ধারণায় ছিল না।

আর তাই প্রথমোক্ত চার জাতিগোষ্ঠীর উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে আমরা সংকলনটির এমন নামকরণ করলাম ‘বৈসাবি’ নামে।

এই সংকলনটির সম্পাদক এর দায়িত্বভার দেয়া হয় আমাকে। পরের বছরই একই নামে ‘বৈসাবি-২’ নামে আরও একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে এই ‘বৈসাবি’ নামটি কিভাবে যেন সামগ্রিকভাবে বিঝু উৎসবটির সাথে জড়িয়ে যায়।

প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে এখনো দেখি বৈসাবি উৎসব নামে ঘটা করে এটিকে প্রচার করা হয়।

মূলত চৈত্র সংক্রান্তি বা বিষ্ণু বোঝাতে কোন কোন মিডিয়া বা মহল ‘বৈসাবি’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু পার্বত্য জনপদের আদিবাসীদের ‘বৈসাবি’ নামের কোন উৎসব নেই।

আমার ধারণা এই উৎসবটিকে এই নামে অভিহিত করতে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে বা সমতলের অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী যারা এই উৎসবটিকে পালন করেন তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং বোধের জায়গাটিতে আঘাত দেয়া হয়।

এই বৃহত্তর সামাজিক উৎসবটিকে যারা ‘বৈসাবি’ নামে উপস্থাপন করেন তারা সঠিক ধারণা না থাকার কারণে এই ভুল করে থাকেন।

রাঙামাটিতে ‘বৈসাবি’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট এখনো চালু আছে। কেউ কেউ নিজের সন্তানের নামও রাখছেন ‘বৈসাবি’ নামেই। এটি হতেই পারে; আর আমি কোন সমস্যাও দেখি না।

কিন্তু শত বছর ধরে চলে আসা একটি উৎসব বা ঐতিহ্যমণ্ডিত সাংস্কৃতিক প্রথাকে নিজের মনমত সম্বোধন বা নামকরণ এর চেষ্টা সমর্থনযোগ্য নয়।

আসলে অন্যের সংস্কৃতির প্রতি যাদের শ্রদ্ধাবোধ নেই, আর আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে যারা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে।

থাকেন তারাই সূক্ষ্ম পরিকল্পনা নিয়ে এই কাজটি করে চলেছেন। আশির দশকের শুরু থেকেই বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীরা বছরে দুই তিনটি করে ইস্যু ভিত্তিক ম্যাগাজিন বা প্রকাশনা বের করতেন।

প্রতিকুল পরিস্থিতির কারণে অধিকাংশ লেখকই বিশেষত রাজনৈতিক কলামগুলো তখন লিখতেন ছদ্মনামে।

সেই সময় কারও কার এমনও অভিজ্ঞতা হয়েছিল যে, একটি সংকলন প্রকাশের পরই গ্রেফতার বা জেল-জুলুমের ভয়ে দিনের পর দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হয়েছে।

এ কারণে অধিকাংশ লেখকই তখন সাহস করে ন্যায্য কথাটুকুও লেখার সাহস পেতেন না। ফলে সেসব প্রকাশনাগুলোর ধারাবাহিতা বজায় থাকেনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত রাখঢাক রেখে আর অলিখিত কিছু নিয়ম মেনে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের এই ধারা অব্যাহত ছিল।

বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রায় সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে অন্তত এ ধরনের একটি প্রকাশনা বের হতো।

আদিবাসী সমাজে যারা লেখক হিসেবে পরিচিত বা প্রতিষ্ঠিত মূলত তারাই এতে লিখে থাকেন। আর স্বল্প পরিচিত বা উঠতি লেখকরা লিখেন মূলত কবিতা, ছড়া, ছোটগল্প।

একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা আমাদের কবি, লেখক এবং সাহিতিক্যের সংখ্যা এখনো সেভাবে উল্লেখযোগ্য নয়।

ফলে এসব লেখকদের পিছনে সব সময় লম্বা লাইন থাকে প্রকাশকদের। এদের মধ্যে আবার বেশির ভাগ নিয়মিত লেখেন না।

কেবল ম্যাগাজিনওয়ালাদের তাগিদ থাকলেই তারা লেখালেখি শুরু করেন। সে কারণে বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের মধ্যে এখনো সত্যিকার অর্থে পেশাজীবী লেখক, গল্পকার, কবি সৃষ্টি হয়নি।

এভাবে একটি নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ড বা জনপদের সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ হতে পারে? তাই আদিবাসী সাহিত্য বাংলা ভাষার লেখক, কবি আর সহিত্যানুরাগী পাঠকদের কাছেও শক্ত কোন স্থান গড়ে নিতে পারেনি। আর বহির্বিশ্বের কাছে সেতো এখনো অদৃশ্য বাতিঘর।

আমার নিজস্ব বিশ্বাস মতে, নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি বা সাহিত্যকে লেখালেখির মাধ্যমে অন্যের কাছে তুলে ধরার সব চেয়ে সচল আর কার্যকর মাধ্যম হচ্ছে উপন্যাস।

কারণ এই ধারাতেই তিতা-ঝাল, টক-মিষ্টি স্বাদমত মিশিয়ে অন্যের কাছে নিজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে উপাদেয় হিসেবে পরিবেশন করা যায়। যা প্রবন্ধ, ছোটগল্প, কবিতা দিয়ে সম্ভব হয় না।

শুধুমাত্র নিজের নামের আগে বা পরে কলাম লেখক, গল্পকার, কবি, ছড়াকার এর তকমা জুড়ে দেয়া যায়।

যার কারণে আদিবাসীদের প্রথা, লোকজ সংস্কৃতি, জীবনাচার এবং সর্বোপরি ইতিহাস দেশের শিক্ষিত সমাজের কাছেও অজ্ঞাত।

তাই আদিবাসী মূল্যবোধও এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে অবহেলিত। পরস্পরের সংস্কৃতিকে না জানা, না বোঝার এ অপসংস্কৃতি থেকেই উৎপত্তি সংকট আর সাম্প্রদায়িক সংঘাতের।

১৯৯৭ সালে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর মুক্ত মন আর সাহস নিয়ে পার্বত্যাঞ্চলের লেখকরা লেখা শুরু করেন।

এ সময় থেকে আদিবাসী সাহিত্য অলিগলি পেরিয়ে মহাসড়কের পথে উঠে আসে। এটি খুবই আশার কথা যে, ইদানীং প্রবীণ আর অগ্রজ ব্যক্তিরা কেউ কেউ লেখালেখির দিকে ঝুঁকেছেন।

শ্ৰী শরদিন্দু শেখর চাকমা চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণের পর পরই লেখা শুরু করেন। এ পর্যন্ত স্মৃতিচারণমূলক বেশ কিছু সংখ্যক বই প্রকাশ করেছেন। আরও লিখেছেন শ্রী কুমুদ বিকাশ চাকমা।

এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন শ্রী স্নেহ কুমার চাকমা, ড. মানিক লাল দেওয়ান আর ডা: এ, কে দেওয়ান।

তাদের লেখা থেকে জানা যায় পুরনো রাঙামাটির কথা, সে সময়কার সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের স্বাধীকার আন্দোলনের আংশিক ইতিহাস।

তবে আমার দৃষ্টিতে এসব গ্রন্থগুলির সীমাবদ্ধতা হচ্ছে- লেখকরা সকলেই চলমান ঘটনা প্রবাহের সাথে। নিজেদের সম্পৃক্ততা, অভিজ্ঞতা আর আপনজনদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু একজন প্রকৃত পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমাজ, অর্থনীতি, শাসন ব্যবস্থা, রাজনীতি এবং সর্বোপরি সার্বিক বাস্তবতার চিত্র সেভাবে তুলে ধরতে পারেননি।

এটি আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আমরা পরলোকগত সলিল রায়, সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, কুমার সমিত রায়, মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, ডা: ভগদত্ত খীসার মত গুণী, মননশীল লেখকদের কাছ থেকে পাইনি বৃহৎ আঙ্গিকের ইতিহাস আশ্রয়ী কোন আত্মজীবনী কিংবা উপন্যাস।

রাজা ত্রিদিব রায় তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশ করেছিলেন “The Departed Melody’।

কিন্তু, ইংরেজি ভাষায় লিখিত বিধায় বড় আকারের এই গ্রহটি অনেকের পক্ষে পাঠ করা সম্ভব হবে না।

তাই যদি প্রকাশের ক্ষেত্রে কোন। ধরনের জটিলতা না থাকে বইটি বাংলায় অনুদিত হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কারণ এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, বিশেষ শাসন ব্যবস্থা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে অনেক সাধারণ পাঠক জানতে পারবেন।

প্রাক-বৃটিশ শাসনামল, ১৯৪৭ এর দেশ বিভাগ, অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম, ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, জন সংহতির সমিতি তথা পার্বত্য আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি কোন বড়মাপের রচনাবলী কিংবা উপন্যাস।

অথচ এসব ঐতিহাসিক ঘটনাবলী নিয়ে রচিত হতে পারত বেশ কিছু কালজয়ী বা পাঠক নন্দিত গ্রন্থ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা এত যুগ পরেও এ কাজটি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি।

এটা নিঃসন্দেহে পার্বত্য এলাকার বাসিন্দা হিসেবে সীমাবদ্ধতা আর ব্যাপক অর্থে এক ধরনের ব্যর্থতাও বটে।

তাই আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকা উচিত আদিবাসীদের অগ্রজ লেখকদের মধ্যে যাঁরা এখনো জীবিত আছেন তাদেরকে লেখার জন্য উৎসাহিত এবং সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা।

আমি এক্ষেত্রে সর্বশ্রী বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, নির্মলেন্দু ত্রিপুরা, এড. জানেন্দু বিকাশ চাকমা, প্রমোদ বিকাশ কার্বারী, তারা চরণ চাকমা, প্রফেসর মংশানু চৌধুরী, ড. সুধীন কুমার চাকমা, বোধিসত্ত্ব দেওয়ান, ড, আদিত্য দেওয়ান, ক্য শৈ প্রু (খোকা), সুপ্রিয় তালুকদার, মংক্য শোয়ে নেভী, বিজয় কেতন চাকমা, প্রভাংশু ত্রিপুরা, ড, অমিতাভ চাকমা, জনলাল চাকমা, ড. প্রদানেন্দু বিকাশ চাকমা, মৃত্তিকা চাকমা, ঝিমিত ঝিমিত চাকমা, রাজা দেবাশীষ রায়, প্রশান্ত ত্রিপুরা, মঙ্গল কুমার চাকমার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই।

১ নভেম্বর ২০১৪ তারিখ রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিতব্য আদিবাসী লেখক সম্মেলন নিয়ে তাই আমি বেশ উচ্ছ্বসিত।

বলার অপেক্ষা রাখে না, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে কম বেশি যারা লেখালেখির সাথে জড়িত এটি তাদের প্রথম সমাবেশ। আমি যথার্থই আশাবাদী ও ইতিবাচক, সৃজনশীল অনেক কিছু বের হয়ে আসবে এই আনুষ্ঠানিক বৈঠক থেকে।

আদিবাসী লেখকদের এই উদ্যোগ একটি শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে গেলে লেখালেখির ক্ষেত্রে আমাদের যে প্রতিবন্ধকতাগুলো রয়েছে সেগুলি কেটে যাবে। দায়িত্বশীল একজন লেখকের সাহসকিতা আর ভাবনার বিশালতা নিয়ে আমরা সঠিক পথে এগোতে পারবো।


লেখকঃ অম্লান চাকমা, সাংস্কৃতিককর্মী, রাঙ্গামাটি।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply