icon

শেকড়ের সন্ধানে : রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস (১)

MUKUL KANTI TRIPURA

Last updated May 20th, 2020 icon 356

বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করা অদৃশ্য শক্তি ‘কোভিড-১৯’ এর বিরুদ্ধে বর্তমান যুদ্ধকালীন সময়ে পুরো বিশ্বের প্রতিটি নাগরিকই এখন এক একজন যোদ্ধা।

হ্যাঁ, হয়তোবা কেউ যুদ্ধ করছেন সম্মুখ সমরে আবার কেউবা বাড়িতে অবস্থান করে। তফাৎটা শুধু এইটুকুতেই।

আর বাড়িতে বসে থাকার সময়টাকে আমরা যদি এই ‘কোভিড-১৯’ বিষয়ের বাইয়ে গিয়ে একটু নিজের মতো ভাবি তাহলে কেমন হয়?

আর সেই ভাবনায় যদি এসে যায় নিজের শেকড়, তাহলে নিশ্চয় ভাল লাগারই কথা। তাই এমনই এক শেকড় বিষয়ক “রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস” বিয়য়ক আলোচনা আমার আজকের ক্ষুদ্র প্রয়াস।

তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনাদের অসাধারণ মন্তব্যগুলোই আমার এই আলোচনাকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করবে।

“আমরা বারংবার বলিয়াছি, ত্রিপুর রাজবংশ অতি প্রাচীন এরূপ প্রাচীন বংশ ভারতে দ্বিতীয় নাই।”

ত্রিপুরার প্রখ্যাত রাজমালা প্রনেতা শ্রীকৈলাসচন্দ্র সিংহ যখন তাঁর ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ গ্রন্থের উপক্রমিকার চতুর্থ অধ্যায়ে ত্রিপুরা সম্পর্কে এমন উক্তি করেন তখন স্বাভাবিকভাবে যে কোন ত্রিপুরার বুক গর্বে ভরে যাওয়ার কথা।

কারণ এমন গৌরবান্বিত মহিমা কয়টি জাতিরইবা থাকে। তখন এমন প্রাচীন রাজবংশের উৎপত্তি কিভাবে হল? ত্রিপুরা নামইবা কিভাবে এল? এমন প্রশ্নগুলো বারংবার তাড়িত করতে থাকে আমার এই অনুসন্ধিৎসু মনটাকে।

আসলে, পৃথিবীর কোন সমাজ, সভ্যতা বা সংস্কৃতি তাৎক্ষণিকভাবে এক দিনে গড়ে উঠেনা। সবকিছুর থাকে এক একটি সংগ্রামী ইতিহাস।

আর এ উৎপত্তির ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক গবেষক ও ইতিহাসবেত্তাগণ বারংবার হোচৎ খাওয়া সত্বেও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও আবিস্কারের নেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন বিভিন্ন গবেষণা কর্মে।

যার ফলশ্রুতিতে আমরা আজ অনায়াসে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ইতিহাস জানতে সমর্থ হয়েছি।

ঠিক তেমনি ভারতীয় উপমহাদেশের একটি প্রাচীন জাতি ত্রিপুরাদেরও রয়েছে তেমনই উৎপত্তির ইতিহাস, যার লিখিত ইতিহাস রচনা শুরু হয়েছিল ‘রাজরত্নাকর’ বা ‘রাজমালা’র মাধ্যমে।

আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, প্রচীন ও মধ্যযুগে এ ত্রিপুরা রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল ব্যাপক। তাই বর্তমান বাংলাদেশের অনেক ভূখন্ডই তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত ছিল, এতে কোন সন্দেহ নেই।

তাই বলতে কোন দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ত্রিপুরাদের স্থায়ী বসবাস সুপ্রাচীনকাল থেকেই পাকাপোক্ত।

যেমন, অদ্যাবধি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য ছাড়াও বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবন, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা (পূর্ব নাম ত্রিপুরা), চাঁদপুর, সিলেট ও রাজবাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে ত্রিপুরারা ।

তাই ত্রিপুরাদের সংস্কৃতিতে পাহাড় এবং সমতলের সংস্কৃতির নিবিড় আলিঙ্গন বেশ লক্ষনীয়।

এখন রাজমালা কি এবং রাজমালায় ‘ত্রিপুরা’ জাতির উৎপত্তি বিষয়ে কি কি উল্লেখ রয়েছে সেটিই  আলোচনার মূখ্য বিষয়।

একটি বিষয়ে আমরা কম বেশি সকলেই অবগত যে ‘রাজমালা’ নামক গ্রন্থেই পদ্যাকারে জায়গা করে নিয়েছে ত্রিপুরা রাজ্যের অধিকাংশ রাজার কাহিনীগুলো।

যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও পরিলক্ষিত হয়। তবে এই রাজমালা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নামও ধারণ করেছে। যেমন কখনও রাজরত্নাকর, কখনও রাজমালা আবার কখনও কৃষ্ণমালা ইত্যাদি।

তাই ত্রিপুরা রাজন্যবর্গের ইতিহাস লেখার অধিকাংশ তথ্যের যোগানদাতা এই রাজমালা গ্রন্থটি। এখানে একটি কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার যে, মূল রাজমালা কিন্তু বর্তমানে সহজলভ্য নয়।

কালের গর্ভে এমন মহা মূল্যবান গ্রন্থটি হারিয়ে যাওয়ার আবছা ইতিহাসটাও বেশ রহস্যজনক।

কথিত আছে, প্রাচীনকালে ত্রিপুরা রাজাদের ইতিহাস সংরক্ষণ করার জন্য ককবরক বা ত্রিপুরা ভাষায় কলমা বা কোলোমা লিপিতে দুর্লবেন্দ্র চোনতাই লিপিবদ্ধ করেছিলেন ‘রাজরত্নাকর’ নামক একটি গ্রন্থ।

পরবর্তীতে শুক্রেশ্বর ও বাণেশ্বর নামের দুই ব্রাহ্মণ সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করেন এবং পরবর্তীতে সংস্কৃত থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা হয়।

পূর্বের রাজমালা যে ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়েছিল তার ঐতিহাসিক প্রমাণ ‘শ্রী রাজমালা’র দ্বিতীয় লহরের ধর্ম মাণিক্য খন্ডের ৬ নং পৃষ্ঠায় নিম্নরূপ সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে-

“পূর্ব রাজমালা ছিল ত্রিপুর ভাষাতে।পয়ার গাথিল সব সকলে বুঝিতে॥সুভাষাতে ধর্ম্মরাজে রাজমালা কৈল।রাজমালা বলিয়া লোকেতে নাম হৈল”

অর্থাৎ ত্রিপুর ভাষার রাজমালাটিকে অন্যভাষী বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষীদের বুঝার সুবিধার্থে অনুবাদ করা হয়েছে।

তবে কৈলাস বাবু, কালীপ্রসন্ন বাবু ও ভূপেন্দ্রচন্দ্র বাবু সহ যাঁরাই রাজমালা লেখার চেষ্টা করুক না কেন তাঁদের বিভিন্ন গ্রন্থের উপর নির্ভরশীলতা থেকে কম-বেশি অনুমেয় যে, মূল রাজমালার অনেক অংশই বর্তমান রাজমালাতে স্থান পায়নি অথবা বর্তমান রাজমালার অনেক অংশই মূল রাজমালাতে ছিল না।

যাহোক, শ্রীকালীপ্রসন্ন সিংহ বিদ্যাভূষণও রাজন্যবর্গের ইতিহাস সম্পাদনা করতে গিয়ে রাজমালাসহ আরো অন্যান্য গ্রন্থের উপর নির্ভর করেছিলেন। তার সম্পাদিত রাজমালার রচনা শুরু হয়েছিল মূলত মহারাজা ধর্মমাণিক্যের শাসনামল থেকে।

রাজমালা মোট ৬ টি লহরে বিভক্ত। যথা: প্রথম লহর, দ্বিতীয় লহর, তৃতীয় লহর, চতুর্থ লহর, পঞ্চম লহর ও ষষ্ঠ লহর।

প্রথম লহরের বিষয় ছিল দৈত থেকে মহামাণিক্য পর্যন্ত বিবরণ। উক্ত লহরের বক্তা ছিলেন বাণেশ্বর, শুক্রেশ্বর ও দুর্ল্লভেন্দ্র নারায়ণ এবং শ্রোতা ছিলেন মহারাজ ধর্ম্যমাণিক্য। রচনাকাল ধরা হয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে।

দ্বিতীয় লহরের বিষয় ছিল ধর্ম্মমাণিক্য থেকে জয়মাণিক্য পর্যন্ত বিবরণ । এই লহরের বক্তা ছিলেন রণচতুর নারায়ণ। উক্ত লহরের শ্রোতা মহারাজা অমরমাণিক্য। এই লহরের রচনাকাল ছিল খৃ: ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ।

তৃতীয় লহরের বিষয় ছিল অমরমাণিক্য থেকে কল্যাণমাণিক্য পর্যন্ত বিবরণ। উক্ত লহরের বক্তা ছিলেন রাজমন্ত্রী, শ্রোতা ছিলেন মহারাজ গোবিন্দমাণিক্য এবং এই লহরের রচনাকাল ছিল খৃ: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ।

চতুর্থ লহরের বিবষয় ছিল গোবিন্দমাণিক্য থেকে কৃষ্ণমাণিক্য পর্যন্ত বিবরণ। বক্তা ছিলেন জয়দেব উজীর এবং শ্রোতা ছিলেন মহারাজ রামগঙ্গামাণিক্য। উক্ত লহরের রচনাকাল ছিল খৃ: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ।

পঞ্চম লহরের বিষয় ছিল রাজধরমাণিক্য থেকে রামগঙ্গামাণিক্য পর্যন্ত বিবরণ। বক্তা ছিলেন দুর্গামণি উজীর এবং শ্রোতা ছিলেন মহারাজা কাশীচন্দ্রমাণিক্য। এই লহরের রচনাকাল ছিল খৃ: উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে।

ষষ্ঠ লহরের বিষয় ছিল রামগঙ্গামাণিক্য থেকে কাশীচন্দ্রমাণিক্য পর্যন্ত বিবরণ। উক্ত লহরের বক্তা ছিলেন দুর্গামণি উজীর এবং শ্রোতা ছিলেন মহারাজা কৃষ্ণকিশোরমাণিক্য। এই লহরের রচনাকাল ছিল খৃ: উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে।

শ্রীকালীপ্রসন্ন সিংহ বিদ্যাভূষণ কর্তৃক সম্পাদিত রাজমালাতে মহারাজা কৃষ্ণকিশোরমাণিক্যর পরের রাজাদের বিষয়ে আর তেমন কিছু জানার সুযোগ থাকে না।

কৈলাসচন্দ্র বাবুর ‘রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস’ গ্রন্থেও বীরচন্দ্রের পরবর্তী রাজন্যবর্গ সম্পর্কে খুব বেশি লেখা নেই। তবে ভূপেন্দ্র চন্দ্র বাবু লেখার চেষ্টা করেছেন ত্রিপুরার শেষ স্বাধীন মহারাজার সময়কাল অবধি।

তবে ত্রিপুরা রাজন্যবর্গের ইতিহাস যাঁরাই লিখার চেষ্টা করুক না কেন কম বেশি সকলেই ত্রিপুরার উৎপত্তি নিয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করেছেন যা আমার ‘রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস’ বিষয়ে আলোচনায় অনেক সহায়তা করবে বলে আমার বিশ্বাস।

আর আমার আজকের আলোচনার বিষয় রাজমালা না হলেও উপরোক্ত আলোচনাটি টানলাম এই কারণে যে, রাজমালা সম্বন্ধে এমন কিঞ্চিৎ পরিমাণ ধারণা পরবর্তী আলোচনায় অংশগ্রহণে অনেক বেশি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

শেকড়ের সন্ধানে: রাজমালার আলোকে ত্রিপুরার উৎপত্তির ইতিহাস(পর্ব-২)

লেখক: মুকুল কান্তি ত্রিপুরা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

MUKUL KANTI TRIPURA

Author

Follow MUKUL KANTI TRIPURA

Leave a Reply