icon

ঐতিহ্যের সংক্রান্তি ও নবযুগে বাংলা নববর্ষ

Jumjournal

Last updated Jul 14th, 2020 icon 271

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে নববর্ষ উদযাপন করা হয় এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে, যখন প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা অনুসারে নিরূপিত সূর্যের আপাত গতিপথ একটা বিশেষ বিন্দু অতিক্রম করে বলে ধরে নেওয়া হয়।

জ্যোতিষশাস্ত্রে এ সময়টা হওয়ার কথা সূর্যের মীন রাশি ছেড়ে মেষ রাশিতে যাত্রার সূচনাকাল, অথবা চিত্রা নক্ষত্রের নামানুসারে আখ্যায়িত মাস পেরিয়ে বিশাখা নক্ষত্রের নামে অভিহিত মাসে প্রবেশের ক্রান্তিলগ্ন।

বারোটি মাস ও রাশিচক্রের  বার্ষিক আবর্তনের প্রেক্ষাপটে এমন সময়গুলিকে বোঝানোর জন্য চালু রয়েছে ‘সংক্রান্তি’ শব্দটি। এভাবে আলাদা নামে পরিচিত অনেকগুলি সংক্রান্তির একটি হল চৈত্র সংক্রান্তি, যা পালিত হয় চৈত্র মাসের শেষ দিন।

এর পরের দিন হল পহেলা বৈশাখ, যে দিনটি বাংলা নববর্ষ হিসাবে পালিত হয়ে আসছে দীর্ঘকাল যাবত।

কিন্তু ঠিক কবে থেকে বাংলা অঞ্চলে ঘটা করে নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ শুরু হল? এই প্রশ্নের একটি সামাজিক-ঐতিহাসিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এই নিবন্ধে।

সেসাথে বাংলাদেশসহ একাধিক দেশে নানান নামে পালিত অন্যান্য সম্পর্কিত আনুষ্ঠানিকতা ও উৎসবের প্রতিও (যেমন বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু, বিষু) খানিকটা নজর দেব।

একটি আধুনিক ‘উদ্ভাবিত ঐতিহ্য’ হিসেবে বাংলা নববর্ষ 

একটি বহুল-প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুসারে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন প্রবর্তিত হয়েছিল মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে, যখন হিজরি সালের পাশাপাশি প্রচলিত সৌর পঞ্জিকা অনুসারে নূতন একটি ‘ফসলি সাল’ গণনার রেওয়াজ চালু হয় পহেলা বৈশাখকে বছরের শুরু ধরে নিয়ে।

উল্লেখ্য, কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থার উৎপত্তির পর একাধিক প্রাচীন রাষ্ট্রে সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন শুরু হয়েছিল।

যেমন পারস্যদেশে প্রচলিত বর্ষপঞ্জী অনুসারে নওরোজ (‘নববর্ষ’) পালিত হত ২১শে মার্চের দিকে, যখন উত্তরায়ণের ঠিক মধ্যবিন্দুতে সূর্য বিষুবরেখার উপর অবস্থান করে এবং দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্য একই থাকে।

একইভাবে এই উপমহাদেশেও বসন্তকালে নূতন বছরের সূচনা ধরে নিয়ে হিসাব করা একাধিক বর্ষপঞ্জীর চল ছিল।

কিন্তু সৌর বর্ষ মাপার দ্বিবিধ পদ্ধতির মধ্যে দীর্ঘকালের ব্যবধানে ধরা পড়ে, হিসাবের এমন একটি সূক্ষ্ম তারতম্য বিবেচনায় না নেওয়ার কারণে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কিছু বর্ষপঞ্জীর সাথে কালক্রমে ঋতুচক্রের ব্যবধান তৈরি হয়ে যায়।

[২] তবে এ নিবন্ধের মূলে যে প্রশ্ন রয়েছে, তার উত্তর জানার জন্য এই বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা আবশ্যক নয়।

কারণ, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, একশত বছর আগেও বাংলা অঞ্চলে পহেলা বৈশাখের দিন ঘটা করে নববর্ষ উদযাপনের রীতি ছিল না।

জানা যায়, ‘আধুনিক’ ধারার নববর্ষ উদযাপনের প্রথম আয়োজন নাকি হয়েছিল ১৯১৭ সালে, প্রথম মহাযুদ্ধ চলাকালে।

[৩] এখানে ‘আধুনিক’ বলতে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিসরে পালিত সেকুলার ধাঁচের অনুষ্ঠানাদির কথাই বলা হচ্ছে, যদিও ১৯১৭ সালের উল্লিখিত উদযাপনের অংশ হিসাবে নাকি যুদ্ধে ব্রিটিশদের জয় কামনা করে হোম কীর্তন ও পূজার আয়োজন করা হয়েছিল!

সেদিক থেকে সত্যিকারের সেকুলার আঙ্গিকে ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত রূপে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের উদ্বোধন দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয় ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত, যখন ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে ঘটা করে বর্ষবরণের নব-উদ্ভাবিত ঐতিহ্য সূচিত হয়।

উপরে ‘উদ্ভাবিত ঐতিহ্য’ কথাটি প্রয়োগ করা হয়েছে সচেতন ভাবে, যে ধরনের অর্থে সমকালীন অনেক ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ধারণাটি ব্যবহার করেন।

[৪]  বাংলা অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের কিছু অভিনব ঐতিহ্যের সূচনা আমরা দেখতে পাই উনবিংশ শতাব্দীতে।

সে ধরনেরই একটি উদ্যোগ ছিল আজ থেকে প্রায় দেড়শত বছর আগে সূচিত ‘হিন্দু মেলা’ বা ‘চৈত্র মেলা’, যেটির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ি।

এটির প্রসঙ্গ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটুখানি উল্লেখ করেছেন তাঁর জীবনস্মৃতি গ্রন্থের ‘স্বাদেশিকতা’ নামক একটি অধ্যায়ে। তবে রবীন্দ্রনাথ-বর্ণিত ‘হিন্দুমেলা’ স্রেফ একটি মেলা ছিল না, বরং এটি ছিল

“বাঙালিদের মাঝে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগরণের উদ্দেশ্য নিয়ে উনিশ শতকের ষাটের দশকের শেষ দিকে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।”

[৫] সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৬৭ সালের চৈত্র সংক্রান্তির দিন, ‘চৈত্র মেলা’ আয়োজনের মাধ্যমে।

তবে আমরা ধরে নিতে পারি, চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখকে ঘিরে আগে থেকে যেসব আনুষ্ঠানিকতার রেওয়াজ ছিল, যেমন সামন্ত অধিপতিদের উদ্যোগে আয়োজিত খাজনা আদায়ের অনুষ্ঠান পুণ্যাহ, ব্যবসায়ীদের হালখাতা,

অথবা কৃষক শ্রেণীর সাধারণ মানুষদের পালিত বিভিন্ন সনাতনী আচার, সেগুলির সাথে গুণগত একটা পার্থক্য ছিল উল্লিখিত মেলার, যেটির সচেতন লক্ষ্য ছিল নববিকশিত শহুরের ভদ্রলোক শ্রেণীর মধ্যে স্বাদেশিক চেতনার প্রসার ঘটানো।

এ ধরনের একটি মেলায় কিশোর রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা পড়েছিলেন বলে জানা যায়। তাঁরই রচিত গান ‘এসো হে বৈশাখ’ গেয়ে রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষ বরণের ঐতিহ্য সূচনা করে ছায়নট, ১৮৬৭ সালে সূচিত ‘চৈত্র মেলার’ একশত বছর পর।

১৯৬০-এর দশকে ছায়ানটের বর্ষবরণ, http://chhayanaut.org/

১৮৬৭ সালের কলকাতার ‘চৈত্র মেলা’ ও একশত বছর পরের

[৬] ঢাকার নববর্ষ বরণের মধ্যে প্রধান কি পার্থক্য আমরা দেখতে পাই? দুটির পেছনেই স্বাদেশিকতা বা জাতীয়তাবাদ কাজ করছে, কিন্তু শত বছরের ব্যবধানে কল্পিত স্বদেশ তথা জাতীয়তার গন্ডী স্পষ্টভাবেই পাল্টে গেছে।

এছাড়া আমরা দেখতে পাই, একশত বছর আগে ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু যেখানে ছিল চৈত্র সংক্রান্তি, সেখানে পরে পহেলা বৈশাখ চলে এসেছে পাদপ্রদীপের আলোয়।

এটিকে বিশেষ অর্থে আমরা ‘ঐতিহ্যের সংক্রান্তি’ বলতে পারি, যা দিয়ে বোঝানো হচ্ছে প্রাচীন গ্রামীণ জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ঐতিহ্য ছেড়ে শহুরে পরিসরের উপযোগী করে সাজানো নূতন ঐতিহ্যের সূচনাকাল।

এ ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন যে শুধু বাংলাদেশের বাঙালিরাই ঘটিয়েছে তা নয়, বরং অন্যান্য দেশেও বিভিন্ন আকারে এটি দেখা গেছে।

খোদ বাংলাদেশেই এমন একাধিক দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যায়, যার একটি হল পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত একটি উপলক্ষ।

বৈসাবি

অনেকেই জানেন, ‘বৈসাবি’ নামটি একটি উদ্ভাবন, যা গাঁথা হয়েছে চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখকে ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যেসব উৎসব হয়, সেগুলির জন্য ভাষাভেদে প্রচলিত বিভিন্ন নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে (যথাক্রমে ত্রিপুরা ‘বৈসু’ বা ‘বৈসুক’, মারমা ‘সাংগ্রাই’, আর চাকমা ‘বিজু’ ও তঞ্চঙ্গ্যা ‘বিষু’কে ভিত্তি করে)।

উল্লেখ্য, আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন মনে হলেও নামগুলির উৎস কিন্তু অভিন্ন, সংস্কৃত ‘বিষুব সংক্রান্তি’, যেটার অংশবিশেষ থেকে বিভিন্ন স্থানিক নাম এসেছে। যেমন ‘বিষুব’ থেকে এসেছে বিষু, বিজু, বৈসু প্রভৃতি নাম।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরেও অনুরূপ বিভিন্ন নামে প্রচলিত উৎসব পালন করে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়, যেমন বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা ‘বিষু’, এবং চট্টগ্রামের বাঙালিরা ‘বিউ’।

বাংলাদেশের বাইরে ভারতেও একই ধরনের নাম প্রচলিত রয়েছে, যেমন কেরালায় ‘বিষু’, আসামে ‘বিহু’ ইত্যাদি।

অন্যদিকে ‘সংক্রান্তি’ থেকে এসেছে মারমা ‘সাংগ্রাই’ বা ‘সাংগ্রাইন’, এবং রাখাইন ‘সাংগ্রেং’। থাইল্যান্ড ও লাওসে প্রচলিত ‘সংক্রান’ উৎসবের নামও এসেছে ‘সংক্রান্তি’ থেকে।

[৭]ব্যুৎপত্তির প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে আমরা যদি উৎসব হিসাবে বৈসু, সাংগ্রাই, বিজু, বিষু প্রভৃতি নামে পালিত অনুষ্ঠানাদির বৈশিষ্ট্যগুলির দিকে নজর দেই, প্রথমেই যে বিষয়টা লক্ষ্যণীয়, সেটা হল, সনাতনী আনুষ্ঠানিকতাসমূহের মূল ভরকেন্দ্র রয়েছে বিদায়ী বছরের প্রান্তে।

পহেলা বৈশাখের দিন নববর্ষ বরণের আনুষ্ঠানিকতাও রয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে মূল উৎসব পালিত হয়ে আসছে চৈত্র সংক্রান্তিকে ঘিরেই।

উল্লেখ্য, সনাতনী রীতিতে এদিন প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ, এবং পড়শিদের বাড়িতে গেলে ঐতিহ্যগতভাবে মাছমাংসের বদলে বিভিন্ন পদের মিশ্রিত নিরামিষ ব্যঞ্জন (ত্রিপুরাদের ভাষায় ‘পান্‌চন’ ও চাকমাতে ‘পাজন’ নামে পরিচিত) আর বিন্নি চালের পিঠাই মূলত পরিবেশন করা হত।

ইউএনডিপির সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসব ২০১১ উপলক্ষে রাঙামাটির একজন শিশুর আঁকা ছবিতে  ‘ফুল বিজু”র দিনে গুরুজনদের স্নান করারনোর দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ইউএনডিপির সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসব ২০১১ উপলক্ষে রাঙামাটির একজন শিশুর আঁকা ছবিতে ‘ফুল বিজু”র দিনে গুরুজনদের স্নান করারনোর দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

এছাড়া চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিনই বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয়স্বজন ও ধর্মগুরুদের সম্মান দেখানো, স্নান করানো, গৃহপালিত গবাদিপশুর যত্ন নেওয়া ইত্যাদি কাজ করা হয় প্রভূত গুরুত্ব দিয়ে।

আসলে ‘চৈত্র সংক্রান্তি’কে উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে পালন করার রেওয়াজ শুধু বিভিন্ন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমিত ছিল না।

বরং দেশের অন্যত্রও বাঙালিসহ বিভিন্ন জাতিভুক্ত একাধিক সম্প্রদায় দিবসটিকে ঘিরে নানান আনুষ্ঠানিকতা পালন করত, যেগুলির মধ্যে পরলোকগত আত্মীয়-পূর্বসূরীদের স্মরণসহ অন্যান্য ব্রতও বিভিন্ন মাত্রায় উপস্থিত থাকত।

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসব ২০১১ চলাকালে খাগড়াছড়ির একজন শিশু শিল্পীর আঁকা ছবিতে ‘ফুল বিজু’র আরও একটি দৃশ্য।
সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসব ২০১১ চলাকালে খাগড়াছড়ির একজন শিশু শিল্পীর আঁকা ছবিতে ‘ফুল বিজু’র আরও একটি দৃশ্য।

উল্লেখ্য, এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য চৈত্রের শেষ বা বৈশাখের শুরু মোটেও প্রাচুর্যের সময় নয়। কাজেই এ সময় ‘নিরামিষ’ আহারের রীতিই সাধারণ কৃষক পরিবারসমূহের জন্য স্বাভাবিক ছিল হয়তবা।

অবশ্য চৈত্র সংক্রান্তির দিন শিশুরা নূতন জামাকাপড় পরে ঘুরে বেড়াবে, বা পহেলা বৈশাখের দিন সামর্থ্য অনুযায়ী আমিষ সহকারে আত্নীয়বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো হবে, এটাও প্রত্যাশিত অনেক জায়গাতেই। তবে এই রীতিগুলি কতটা শ্রেণীনিরপেক্ষ বা প্রাচীন, তা গবেষণাসাপেক্ষ বিষয়।

ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, এ অঞ্চলের জমিদাররা একসময় পহেলা বৈশাখের দিন ‘পুণ্যাহ’ বা খাজনা আদায়ের ‘উৎসব’ পালন করত, আর ব্যবসায়ীরা আয়োজন করত ‘হালখাতা’র।

এসব রীতির প্রেক্ষাপটে আর্থসামাজিকভাবে যাদের অবস্থান ‘ঋণাত্মক’ মেরুতে, তাদের বেলায় ধুমধামের সাথে নববর্ষ পালনের সুযোগ যে ছিল না, তা বলা বাহুল্য।

যাহোক, যে সামন্ত সমাজ ব্যবস্থা ও সনাতনী জ্যোতিষশাস্ত্রের সমন্বয়ে ‘বিষুব সংক্রান্তি’ পালনের রেওয়াজ চালু হয়েছিল, ইতিহাসের সেই ছিন্ন সূত্রসমূহ এখন অতীতের বিষয়।

সেগুলিকে ঢেকে দিয়ে এখন জনসংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে জাতীয়তাবাদী চেতনার জমিনে ফলানো বিভিন্ন ‘উদ্ভাবিত ঐতিহ্য’, যেগুলির বাণিজ্যিক আবাদ ও বিপণনে এগিয়ে এসেছে নয়া জমানার মুক্ত বাজার ব্যবস্থা।

পাহাড়ে প্রাণের উৎসব শুরু হচ্ছে শনিবার থেকে’ ধরনের সংবাদ শিরোনাম (প্রথম আলো, এপ্রিল ১১, ২০১৪) দেখলে ধন্ধে পড়তে হয় ‘প্রাণ’ কোম্পানির কথা বলা হচ্ছে কিনা তা নিয়ে।

উল্লেখ্য, পাহাড়িদের মধ্যে যারা সনাতনী ভাবধারা প্রভাবিত (যেমন খাগড়াছড়ির ত্রিপুরারা) তারা অনেকেই বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা পালন করে চলছেন সনাতনী পঞ্জিকা অনুসারেই, ফলে তাদের ‘সংক্রান্তি’র দিন আর বাংলা একাডেমির ধার্যকৃত চৈত্রের শেষ তারিখ নাও মিলতে পারে।

অবশ্য পাহাড়িদের মধ্যে যারা চাকুরিজীবী, তাদের অধিকাংশই ‘বাংলা নববর্ষ’ উপলক্ষে বরাদ্দকৃত সরকারি ছুটির দিনকে হিসাবে নিয়েই ‘বৈসাবি’ উদ্‌যাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে।

‘বৈসাবি’ উপলক্ষে এপ্রিল ২০১৫-তে ঢাকায় আয়োজিত একটি র‍্যালি (ইন্টারনেট থেকে পাওয়া ছবি)
‘বৈসাবি’ উপলক্ষে এপ্রিল ২০১৫-তে ঢাকায় আয়োজিত একটি র‍্যালি (ইন্টারনেট থেকে পাওয়া ছবি)

পাহাড়িদের মধ্যে অনেকে ‘বৈসাবি’ নামটির ব্যাপারে আপত্তি করেন এই যুক্তিতে যে, এটি একটি কৃত্রিম নাম, রাজনৈতিকভাবে আরোপিত একটি উদ্ভাবন।

কথাটা ঠিক, তবে উদ্ভাবিত হলেই যে কোনো ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করতে হবে বা করা যাবে, এমন কোনো কথা নেই।

যেমন বাঙালি শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের প্রেক্ষাপটে বাংলা নববর্ষ পালন এক ধরনের উদ্ভাবিত ঐতিহ্য হিসাবেই চালু হয়েছিল, এবং কালের পরিক্রমায় এটি নিত্যনূতন রূপে হাজির হচ্ছে।

একইভাবে ‘বৈসাবি’ নামটি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষ কিছু কর্মসূচী (যেমন বিভিন্ন সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের আয়োজিত র‍্যালি, আলোচনানুষ্ঠান, প্রকাশনা প্রভৃতি) ইতোমধ্যে রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

সেসাথে একটু ভিন্ন অন্য একটি বিষয় উল্লেখ্য, সেটা হল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৈসাবি চলাকালে বা বৈসাবির আগে পরে বিভিন্ন সহিংসতা ঘটেছে বহুবার, ফলে সেখানে এ সময় একটা স্বাভাবিক উৎকন্ঠা কাজ করে অনেকের মনেই,

“এবছর বৈসু-সাংগ্রাই-বিজু-বিষু-বিহু নির্বিঘ্নে কাটবেতো?”

এ অর্থে ‘বৈসাবি’ নূতন আরেকধরনের ‘ক্রান্তিকাল’-এর বোধ জাগিয়ে দিয়ে যায় প্রতিবছর।

ঐতিহ্য ও ইতিহাসের ক্রান্তিকাল

‘সংক্রান্তি’ শব্দটির সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রনির্ভর সনাতনী হিসাবনিকাশ জড়িত থাকলেও ‘ক্রান্তিকাল’ বাংলা ভাষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে সমকালীন বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণ বোঝাতে।

এ অর্থে বাংলা অঞ্চলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বড় আকারের যেসব ক্রান্তিকাল আমরা অতিক্রম করেছি, সেগুলির মধ্যে রয়েছে ব্রিটিশ শাসনামলের অবসানে ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক’ যুগে প্রবেশ, এবং পরবর্তীতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

আমরা যদি ব্রিটিশ শাসনামলে ফিরে যাই, তখন দেখতে পাই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে কাজী নজরুল ইসলাম, সবার লেখায় ‘নবযুগ’ শব্দটি উঠে এসেছে, যেটির মধ্যে নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ শাসনোত্তর একটি স্বদেশের কল্পনা নিহিত ছিল।

[৮] এই প্রেক্ষাপটে বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ স্রেফ শুধু নূতন ঋতুর সূচনা বোঝায় না, বরং তা হয়ে ওঠে একটি নূতন রাজনৈতিক বাস্তবতা বা যুগের প্রতীক।

নজরুলের গানে বা কবিতায় এটি ধরা পড়ে খুব সরাসরি, যেমন যখন তিনি ‘কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট’ বলার পর এক পর্যায়ে জুড়ে দেন, ‘নাচে ওই কাল বোশেখী, কাটাবি কাল বসে কি?’

আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে বলেন, ‘তাপসনিশ্বাসবায়ে   মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে, বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’, তিনিও নিশ্চয় প্রকৃতির চাইতে দেশ ও সমাজ-সংস্কৃতির কথাই বেশি ভাবছিলেন।

গানটির রচনাকাল ছিল ১৯২৭ সাল, যাঁর আগের বছর তিনি পশ্চিম গোলার্ধের আর্জেন্টিনা থেকে শুরু করে ইউরোপ, এবং ডাচ শাসনাধীন জাভাদ্বীপ ঘুরে এসেছিলেন।

ততদিনে বিশ্বসভ্যতার সংকট তাঁর সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, এবং তিনি নিশ্চয় নতুন একটি স্বদেশ এবং নতুন একটি বিশ্বের ছবি নিজের কল্পনায় ধারণ করতে শুরু করেছিলেন।

এই পটভূমিতে যে বৈশাখকে তিনি আহবান করেছিলেন ‘মুমূর্ষু’কে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য, সে কি স্রেফ বাংলার চিরচেনা বৈশাখ, নাকি আধুনিকতার ঝোড়ো হাওয়া?

এই প্রশ্নের একটি উত্তরের আভাস মেলে তাঁর ১৯৩৩ সালে (পৌষ ১৩৩৯) রচিত ‘নবযুগ’ নামের একটি প্রবন্ধে:[৯]

আজ অনুভব করছি, নূতন যুগের আরম্ভ হয়েছে। আমাদের দেশের পুরাতন ইতিহাস যদি আলোচনা করি তা হলে দেখতে পাই যে, এক-একটি নূতন নূতন যুগ এসেছে বৃহতের দিকে মিলনের দিকে নিয়ে যাবার জন্য, সমস্ত ভেদ দূর করবার দ্বার উদ্‌ঘাটন করে দিতে।

….নবযুগ আসে বড়ো দুঃখের মধ্য দিয়ে। এত আঘাত এত অপমান বিধাতা আমাদের দিতেন না যদি এর প্রয়োজন না থাকত। … কোনো বাহ্য পদ্ধতিতে পরের কাছে ভিক্ষা করে আমরা স্বাধীনতা পাব না;

কোনো সত্যকেই এমন করে পাওয়া যায় না। মানবের যা সত্যবস্তু সেই প্রেমকে আমরা যদি অন্তরে জাগরূক করতে পারি তবেই আমরা সব দিকে সার্থক হব। … আমাদের শাস্ত্রেও বলছেন, যতি সত্যকে চাও তবে অন্যের মধ্যে নিজেকে স্বীকার করো। সেই সত্যেই পুণ্য এবং সেই সত্যের সাহায্যেই পরাধীনতার বন্ধনও ছিন্ন হবে।

রবীন্দ্রনাথ-কল্পিত নবযুগের নিশ্বাসে যে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তা ও নূতন ধারার বর্ণবাদের বিষ লুকিয়ে ছিল, তা তিনি কতটা বুঝতে শুরু করেছিলেন, আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না।

তবে উপরের উদ্ধৃতিতেই আভাস মেলে যে এটুকু তিনি বুঝেছিলেন, সভ্যতার ক্রান্তিকাল চলবে প্রলম্বিত সময় ধরে, এবং নবযুগের আবাহনকে করে তুলতে হবে সত্যিকার অর্থে সার্বজনীন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা-শ্রেণী নির্বিশেষে।

~~~

টীকা ও তথ্যসূত্র

[১] এই লেখাটি এপ্রিল ২০১৬ নাগাদ প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল, এমন একটি পত্রিকার জন্য তৈরি করা একটি নিবন্ধের সামান্য সংক্ষেপিত ও ব্লগের জন্য উপযোগী করে সম্পাদিত ভাষ্য (কাগজটি  শেষ পর্যন্ত হয়েছিল কিনা তা পরে আর জানতে পারি নি)। লেখার শুরুতে ব্যবহৃত কোলাজটি ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া ছবি দিয়ে বানানো হয়েছে।

[২] ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, রেবতী নক্ষত্র, অয়নচলন, ‘সূর্য-সিদ্ধান্ত’ ও বাংলা নববর্ষ, bdnews24.com মতামত, মে ১০, ২০১১, http://opinion.bdnews24.com/bangla/archives/2790

[৩] মুহাম্মদ লুৎফল রহমান, প্রথম মহাযুদ্ধে বাংলা বর্ষবরণ, প্রথম আলো, এপ্রিল ১৪, ২০০৮

[৪] ‘উদ্ভাবিত ঐতিহ্য’ ধারণাটির ব্যাপক ব্যবহার ঘটে মার্ক্সবাদী ঘরানার ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ Eric Hobsbawm ও তাঁর সহযোগী Terrance Ranger-সম্পাদিত The Invention of Tradition শিরোনামের গ্রন্থের সুবাদে, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৩ সালে, Cambridge University Press থেকে।

[৫] সিরাজুল ইসলাম, হিন্দু মেলা, বাংলাপিডিয়া

[৬] উইকিপিডিয়ার দুই জায়গায় রমনার ‘বটমূলে’ ছায়ানটের বর্ষবরণের সূচনাকাল হিসাবে দুইটি ভিন্ন সাল উল্লেখ করা হয়েছে, একটিতে (পহেলা বৈশাখ) ১৯৬৭, আরেকটিতে (ছায়ানট) ১৯৬৪। বর্তমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে অবশ্য পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

  [আপডেট – ২০১৭ সালের মার্চের শেষ দিকে/এপ্রিলের শুরুতে ‘ছায়ানট’ কর্তৃক রমনা বটমূলে প্রথম বর্ষবরণ আয়োজনের ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের খবর বেরিয়েছে একাধিক পত্রিকায়, কাজেই তা থেকে বোঝা যায় উপরে উল্লেখ করার দুইটি সালের মধ্যে প্রথমটিই ঠিক।]

[৭]  বর্তমান ও পরের কয়েকটি অনুচ্ছেদের বক্তব্য-বিশ্লেষণ কমবেশি একই আকারে ফেসবুকে দুইবার পোস্ট করা হয়েছে আগে, এপ্রিল ২০১৫-তে  ইংরেজিতে, এবং এপ্রিল ২০১৪-তে বাংলায়

[৮] উল্লেখ্য, ১৯২০ সালে শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক নবযুগ নামের একটি দৈনিক পত্রিকা চালু করেছিলেন, যেটি পরে কাজী নজরুল ইসলাম ও কমরেড মুজাফফর আহমেদ যৌথভাবে সম্পাদনা করতে শুরু করেছিলেন।

শেষোক্তজনের জামাতা ছিলেন কবি আবদুল কাদির, যাঁর ‘জয়যাত্রা’ নামের একটি সুপরিচিত কবিতা শুরু হয়েছে এভাবে,

“যাত্রা তব শুরু হোক হে নবীন, কর হানি দ্বারে / নবযুগ ডাকিছে তোমারে।”

[৯] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নবুযুগ, কালান্তর [১৯৩৯ সালে প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন], http://tagoreweb.in

লেখকঃ প্রশান্ত ত্রিপুরা

মুললেখাঃ https://ptripura1.wordpress.com/2016/04/11/sankranti-noboborsho/

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply