icon

সমসাময়িক সাহিত্য ভাবনা: প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম

Jumjournal

Last updated Jun 3rd, 2020 icon 874

সংস্কৃতি হল মানব জীবনের প্রবাহমান জীবনধারার সাথে প্রতি পদে-পদে ওতপ্রতোভাবে জড়িত সীমাহীন গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ক্রমাগত অনুশীলনের মধ্য দিয়ে সমাজ কাঠামোর (বস্তুগত ও অবস্তুগত) বিকাশ ও উৎকর্ষ অর্জিত হয়।

সমাজবিজ্ঞানীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, আচার-বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতিবোধ, আইন-কানুন, রাজনীতি ও জীবন বাস্তবতার স্রোতধারায় চলমান প্র্যাকটিস বা চর্চাকে সাংস্কৃতিক উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহের অনুশীলন দ্বারা এই ধারাটি উন্নত থেকে উন্নততর হয়ে উঠে। এই প্রক্রিয়ায় সকল উপাদানকে ঐক্যবদ্ধকরনের গুরুদায়িত্ব শিল্পকলা ও সাহিত্যতত্ত্বের উপরই অর্পিত হয়েছে। মানব সভ্যতার বিকাশের প্রাথমিক স্তর থেকে অদ্যবধি এটিই আমরা লক্ষ্য করে আসছি।

তাই, বলা চলে শিল্প-সাহিত্যকলা এমন একটি উপাদান যা গতিশীল জীবনপ্রবাহের মৌলিক সাংস্কৃতিক কাঠামোর সাংকেতিক রূপকে উপস্থাপনের এক রাডার। শিল্প-সাহিত্যের মধ্য দিয়ে সমাজের উপাদানগুলো যেভাবে উপস্থাপিত হয় তা সমাজের বৃহত্তর অংশদ্মাদ্জিবাক ও জৈবমানসিক চিন্তার উপযুক্ত উপস্থাপন।

কেননা, শিল্পী হচ্ছেন তিনিই যিনি মূল সমাজের সেই বৃহত্তর অংশকে ধারণ করেন। মাধ্যমের সঙ্গে শিল্পীর ব্যক্তিচৈতন্যের যে সম্পর্ক পরিলক্ষিত হয়, তা সামাজের সর্বস্তরে বিস্তৃতি লাভ করে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় সংকেত পৌঁছে দিতে পারে।

এভাবেই সর্বস্তরে চলমান সিস্টেমটির পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠে। এজন্য প্রতিটি বিপ্লব ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মীরা ঘূণেধরা বাতিল অংশকে উচ্ছেদ করে নতুন সৃষ্টিশীল সামাজিক কাঠামো নির্মান করে সমাজ পরিবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে।

এটা অস্বীকার করা যায় না যে সংস্কৃতি-চর্চা-কেন্দ্রগুলিই হচ্ছে সমাজে উন্নত মনন তৈরির সূতিকাগার। তাই প্রতিটি সমাজে সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম।

আমাদের মত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসমূহের ওস্তিত্ব রক্ষার জন্যও এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য, যেখানে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের মত মরণব্যাধি(পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতময় বাস্তবতার কথা বলা হচ্ছে) জাতিকে ধবংসের দ্বারে নিয়ে গেছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য নেতৃত্বের কাছে আশু সংকেত প্রেরণ, এর সমান্তরালে সৃষ্টিশীল মনন তৈরি অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। শোষণ-নিপীড়ন-বৈষম্য-আগ্রাসনমুক্ত ভবিষ্যত-সুন্দর সমাজ গঠনের জন্য এর কোন বিকল্প নেই।

রাষ্ট্রঈয় শাসনে বহুমাত্রিক আগ্রাসনে কোনঠাসা হেজিমনাইজড প্রান্তিক জুম্মসমাজ। ভ্রাতৃঘাতী রাজনীতির দরুণ সর্বস্তরে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও নৈরাজ্যবাদ বাড়ছে এক্সপোন্সিয়ালি। সমস্যাগুলো প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে।

এ সমস্যাগুলোই শিক্ষিত তরুণদেরকে “হেইট পলিটিক্স” হতে উৎসাহিত করছে এবং নিষ্ক্রিয়তার মত নিশ্চিত আত্মবিনাশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এমনই বাস্তবতায়, বিচ্ছিন্নতা নয়, সংঘাত নয় বরং ঐক্য, সংহতি ও একত্রীকরণই হতে পারে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংকটকে দক্ষ হাতে মোকাবেলা করার প্রধান শক্তি, আর এক্ষেত্রেই সচেতনতা তৈরি, মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হওয়া এবং  সমাজের অনাগত পরিবর্তনের সংকেত উদ্ধারে কবি-লেখক, শিল্পী-সাহিত্যিকদের অগ্রসর ও প্রগতিশীল চিন্তাধারায় হতে হবে আরো সক্রিয়।

ভ্রাতৃঘাতী চলমান যুদ্ধে এখনো আমরা চরমভাবে বিভ্রান্ত, শত্রু-মিত্র নির্ণয় এখানে দূরহ, পারষ্পরিক অবিশ্বাস ও সন্দেহের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে আপামর জনতা।

এছাড়াও অবাধ তথ্যপ্রবাহের কারণে রাষ্ট্রীয় মিডিয়াসহ বিভিন্ন মিডিয়ার প্রপাগান্ডা, অর্ধসত্য বা ছদ্মসত্যের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, যা প্রতিনিয়ত মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছে।

এর সাথে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন তত্ত্ব, যাদের সমান্তরালে হাঁটতে গিয়ে উপড়ে পড়ছে আমাদের শিকড়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানোর জন্যই আমাদের আরো বেশি সতর্ক পদক্ষেপ দরকার। আমাদের সাহিত্যকে এই গুরুদায়িত্বটিই সতর্কতার সাথে পালন করতে হবে।

সাহিত্যে সামাজিক বুর্জোয়া-এলিটদের অর্থনৈতিক, আইনকানুন ও সামাজিক নীতিনিয়মের মত গতবাঁধা ব্যাকরণ আমাদের জুমিয়া সমাজে দিনকে দিন বিকশিত হচ্ছে, আগ্রাসন চালাচ্ছে আমাদের শ্রেণিবৈষম্যহীন শিল্পজগতেও।

এ বিষয়ে আমাদেরকে অবশ্যই চোখ কান খোলা রাখতে হবে। একজন প্রকৃত শিল্পী কখনোই এ ধরনের বৈষম্য মেনে নিতে পারেন না। এ সমাজমননে খুঁটিগেড়ে বসা সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের উপনিবেশবাদী ভাবাধিপত্যের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা প্রতিটি কলমযোদ্ধার নৈতিক কর্তব্য ও দায়িত্ব।

মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির অস্তিত্ব রক্ষার এক বৈচিত্রময় সংগ্রামে আমাদের তরুণদের আরো বেশি করে যুক্ত হতে হবে। আর এভাবেই মানবিক বিকাশের বৈচিত্রপূর্ণ ধারা তার সাংস্কৃতিক কাঠামোকে “পার্ভেসিভনেস” করে এমন এক সর্বময়তায় পৌঁছে দেবে যেখানে আমাদের ইন্দ্রিয়-চৈতন্য সর্ব উৎকৃষ্ট মানে উন্নীত হবে।

জুমিয়াদের শিল্প-সাহিত্যে শ্রেণিহীন প্রিমিটিভ, ইন্ডিজেনাস সোসাইটিই আমাদের কাম্য, যেখানে তারুণ্যকে ভুল সহানুভূতি দেখিয়ে ছোট করার রেওয়াজের কোন স্থান নেই। বরং কবি বা লেখকের শক্তিকে দেখতে হবে তার লেখায়, হাড়ের বয়সে নয়।

সংস্কৃতিক কর্মীরা মানবীয় ইচ্ছাশক্তি, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রতি আস্থা রেখে, মানুষের সক্ষমতায় আস্থা রেখে প্রতিটি উপাদানের সমন্বয়ে পলিমরফাস প্রকৃতি সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করবেন।

এভাবে পরিমানগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন সাধনের পরিশ্রমে যার যার শক্তি নিয়ে নিয়োজিত হতে হবে।

উন্নত চিন্তাশীল মননগুলো সমাজের প্রতিটি স্তরে সমবন্টনের মাধ্যমে আমরা উন্নত, সিমেত্রিক, বৈষম্যহীন সাংস্কৃতিক সমাজ গঠন করতে পারলেই আমাদের এ সমাজের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে আমরা উঁচু থেকে উঁচুতে উঠতে সামর্থ হবো সৃষ্টিশীল শিল্প-কর্ম মাত্রই মানুষের সংবেদনশীল ইন্দিয়কে আক্রান্ত করে যায়।

পাঠক-পাঠিকাদের মনের গহীনে চলতে থাকা ক্ষোভ, দূঃখ, বিচ্ছেদ, বিরহ-বেদনাকে নিরঞ্জনের দায়িত্ব এই শিল্পের ঘাড়ে যেমন বর্তায়, তেমনি সামাজিক অন্যায়, বৈষম্যকে তুলে ধরা এবং সমাজের পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করার গুরুদায়িত্বও পালন করে আসছে সমাজের রাডার নামে পরিচিত শিল্প-সাহিত্য।

তাই জুম পাহাড়ের আহত নির্মলতায় রঙ ছিটিয়ে স্বকীয় শিল্প সাহিত্য চর্চার বন্ধুর পথেই খুজতে হবে অসমাপ্ত পথ থেকেই আবার শুরু করার নব উদ্যোম,নব প্রেরণা।

লেখকঃ হেগা দা


জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply