icon

মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের অবদান

Jumjournal

Last updated Oct 5th, 2020 icon 89

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গারো জাতির ৩৮ জন আদিবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে এই লেখাটিতে।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিন

বাংলাদেশের গারো সমাজের অবিসংবাদিত নেতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ এডভোকেট প্রমোদ মানকিন, এমপি।

তিনি এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক সংগ্রামী জীবনের অধিকারী। তিনি প্রায় চল্লিশ বছর ধরে যুক্ত আছেন এদেশের বহু রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের সাথে।

১৯৬৯ সালের ছাত্র-গণ-আন্দোলন, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি রেখেছেন অত্যন্ত দুঃসাহসী ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে তার ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়এডভোকেট প্রমোদ মানকিন ১৯৩৯ সালের ১৮ এপ্রিল নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম স্বর্গীয় মেঘা তজু এবং মাতার নাম মৃত হৃদয়মণি মানকিন।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় রানীখং মিশন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বান্দুরা হলিক্রস হাই স্কুলে কিছুদিন লেখাপড়া করেন।

পরবর্তীকালে তিনি ময়মনসিংহ জেলার বিড়ইডাকুনি স্কুলে লেখাপড়া করেন এবং উক্ত স্কুল থেকে ১৯৫৯ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন।

ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে বি.এ. ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি বি.এড, এবং ১৯৮২ সালে এল.এল.বি. ডিগ্রি লাভ করেন।

উল্লেখ্য, গারো সমাজের মধ্যে তিনিই প্রথম এল.এল.বি. ডিগ্রি লাভ করেন। বি.এ. পাসের পর এডভোকেট প্রমোদ মানকিন বিড়ইডাকুনি হাইস্কুলেI শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৬৩ সালে।

১৯৬৯ সালে তিনি উক্ত স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন এবং দশ বছরের বেশি সময় উক্ত দায়িত্ব। পালন করেন অত্যন্ত দক্ষতা এবং সাফল্যের সাথে।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিন ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করে রাজনীতিতে আরো সক্রিয় হন।

১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে তিনি হালুয়াঘাটসহ আশপাশের ব্যাপক এলাকায় আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সভা সমাবেশ মিছিল মিটিংয়ের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার চালান।

গারো হাজংসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে জনমত গঠন করেন।

এসময় তিনি নিজের নেতৃত্বে অসংখ্য সভা সমাবেশ মিছিল মিটিংয়ে সর্বসাধারণের মধ্যে আওয়ামী লীগ তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মসূচি ছড়িয়ে দেন।

তার এসমস্ত কর্মকাণ্ড আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ের পথকে সুগম করে। উক্ত নির্বাচনে হালুয়াঘাট এলাকা থেকে জাতীয় পরিষদে জনাব মোশাররফ হোসেন আকন্দ এবং প্রাদেশিক পরিষদে জনাব কুদরত উল্লাহ মণ্ডল বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে পাকিস্তানি সরকার নির্বাচিত দলের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি শুরু করে।

পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের মোকাবিলার জন্য বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। দেশব্যাপী শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন।

সারাদেশের মতো হালুয়াঘাটেও ছড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলন। এসময়ও এডভোকেট প্রমোদ মানকিন বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর সারাদেশে শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি।

হালুয়াঘাটও এ থেকে পিছিয়ে ছিল না। সেখানেও ছাত্রযুবকদের সংগঠিত করে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এক্ষেত্রে এডভোকেট প্রমোদ মানকিনের অবদান অসামান্য।

একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে ছাত্র-যুবকদের মধ্যে এডভোকেট প্রমোদ মানকিনের প্রভাব ছিল যথেষ্ট। তাই তার ডাকে সারা দিয়ে এলাকার ব্যাপক সংখ্যক ছাত্র যুবক সশস্ত্র প্রশিক্ষণ বা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য এগিয়ে আসে।

তাদের প্রশিক্ষণের জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়া এলাকার বেশ কয়েকজন গারো সৈনিককে দায়িত্ব দেয়া হয়।

সেই সাথে সেনাবাহিনীর এবং পুলিশের লোকজন অবসরপ্রাপ্ত লোকজনও দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে হালুয়াঘাটে চলে মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপক প্রস্তুতি।

২৫ মার্চে পাকিস্তানিদের হামলার পর জীবন রক্ষার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে হাজার হাজার মানুষ এসে আশ্রয় নেয় হালুয়াঘাটে।

এসমস্ত শরণার্থীরা নিরাপত্তার অভাববোধ করায় ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কাছে ডালু বাজারের বিপরীতে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। যার জন্য তাদের সাথে আলোচনায় যান একটি প্রতিনিধিদল।

ঐ প্রতিনিধিদলেও ছিলেন এডভোকেট প্রমোদ মানকিন। প্রতিনিধিদলে আরো ছিলেন শাহ মাজহারুল হান্নান, ফাদার ক্লেমেন্ট রিছিল, সিরাজুল ইসলাম স্বর্ণালি, সিভেস্টার রিছিল প্রমুখ।

আলাপ আলোচনার পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শরণার্থীদের সাহায্য সহযোগিতা করতে রাজি হয়।

এদিকে ক্রমশ শরণার্থীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। যার জন্য একের পর এক শরণার্থী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন দেখা দেয়।

কাজেই শরণার্থী ক্যাম্পও বাড়ানো হয়। মেঘালয়ের শিববাড়ি, ভুমনিকুড়া, গাছুয়াপাড়া, ডালু ইত্যাদি।

এসমস্ত শরনার্থী ক্যাম্প পরিচালনার ক্ষেত্রে এডভোকেট প্রমোদ মানকিন অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দেন। বিশেষ করে শিববাড়ি শরণার্থী ক্যাম্পটি পরিচালনার ক্ষেত্রে তাকে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

হাজার হাজার মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, সেই সাথে রোগ-বালাই সমস্যার মোকাবিলা করা ছিল খুবই কঠিন ব্যাপার।

শিবিরে মেডিকেল সেন্টার খোলার ব্যবস্থা করে রোগীদের চিকিৎসা দান করা। সেখানে কাজ করার জন্য বা সেবা দেয়ার জন্য এগিয়ে যান চামেলি রেমা, ইভা চামুগং, স্বর্ণলতা হাজং, মায়া দত্ত, জয়া দত্ত, সাধনা সরকার প্রমুখ।

শরণার্থী শিবির থেকে ছাত্র-যুবকদের বাছাই করে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন এডভোকেট প্রমোদ মানকিন।

তার চেষ্টায় অসংখ্য গারো, হাজং, কোচ, ভালু, হোদি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রশস্ত্র জোগাড় করে দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি গুরুদায়িত্ব পালন করেন।

শিববাড়িতে অবস্থানকালেই তিনি মেঘালয় রাজ্যের ভারতীয় কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলাপ-আলোচনা করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে দেশ পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করেন। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মুখপাত্র হিসেবে তিনি বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে দেনদরবার করেন।

১৯৭৭ সালে কতিপয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন।

এই অরাজনৈতিক সংগঠনটি বর্তমানে এতদাঞ্চলের একমাত্র পবজনস্বীকৃত সামাজিক সংগঠন, যা দীর্ঘ দিন যাবত বৃহত্তর ময়মনসিংহ, বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ঢাকা এলাকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার সংরক্ষণে নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে।

বর্তমানে তিনি এই সামাজিক সংগঠনের নির্বাচিত চেয়ারম্যান। বিড়ইডাকুনি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক থাকাকালেই তিনি ১৯৭৮ সালে দীর্ঘ ছুটি গ্রহণপূর্বক ময়মনসিংহে আইন অধ্যয়ন করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে পাস করেন।

তিনি বার এসোসিয়েশনের সদস্য পদও লাভ করেন। কিন্তু ব্যস্ততার জন্যে নিয়মিত আইন ব্যবসা তার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে নি।

১৯৮৭ সালে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি সংস্থা কারিতাস বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নিযুক্ত হন।

এই দায়িত্ব পালনকালেই ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি নিজ নির্বাচনী এলাকা হালুয়াঘাট হতে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন।

তিনিই বাংলাদেশের গারো ও খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রথম নির্বাচিত সংসদ সদস্য। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

কিন্তু কতিপয় ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের কারণে সামান্য ভোটে পরাজিত হন। ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় দ্বিতীয়বারের মতো বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিন ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

তিনি অত্যন্ত সফলতা ও সুনামের সাথে পর্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন বেশ কয়েক মাস।

এরপর তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিন রাজনীতির পাশাপাশি বহু সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে আর্তমানবতার কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

এসমস্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি গোবরাকুড়া আমদানি রফতানিকারণ ব্যবসায়ী সমিতি।

চেয়ারম্যান ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন কেন্দ্রীয় কমিটি। সদস্য- উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। সদস্য- বাংলাদেশ ভারত মৈত্রী সমিতি।

তিনি বাংলাদেশ খ্রিস্টান এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি একাধিক মানবাধিকার সংস্থার সক্রিয় কর্মকর্তা, সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।

বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি হিসাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সভা-সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্যে তিনি ইতোমধ্যে কানাডা, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইটালি, ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেছেন।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিন বিবাহিত। তিনি পাঁচ কন্যা ও এক পুত্রসন্তানের জনক এবং সন্তানরা সবাই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিন

শহীদ পরিমল দ্রং

গারোদের মধ্যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যে নামটি প্রথমেই স্মরণ করতে হয় তিনি হচ্ছেন শহীদ পরিমল দ্রং। তিনি ১৯৫২ সালে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার মনিকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তিনি এলাকার বিড়ই ডাকুনি ক্যাথলিক মিশন স্কুলে লেখাপড়া করেন। শহীদ পরিমল দ্রং অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন।

১৯৭১ সালে তিনি বিড়ই ডাকুনি স্কুলের এস.এস.সি. পরীক্ষার্থী ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় অ্যাডভোকেট প্রমোদ মানকিন এবং কুদরত উল্লাহ মণ্ডলের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় শহীদ পরিমল দ্রং মুক্তিযুদ্ধের ডাকে সাড়া দেন এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন।

শহীদ পরিমল দ্রং ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা শহরে এক মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে সহযোদ্ধাদের নিয়ে ১১ নং সেক্টরে যোগদান করেন।

তার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন কমান্ডার আবদুল গফুর। ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষ দিকে শেরপুর জেলার নকলা ব্রিজ অপারেশন করেন। সেখানে পাকিস্তানিদের সাথে লড়াই শেষে আসার পথে রামনগর নামক স্থানে শহীদ পরিমল দ্রং রাজাকারদের হাতে ধরা পড়েন।

রাজাকাররা তাকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। পাকিস্তানি সেনারা তাকে খুর, ব্লেড দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে কয়েকদিন তার উপর নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে শেষে তাকে ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর উপজেলার কংস নদীর তীরে গুলি করে হত্যা করে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার মধ্যবাজারে শহীদ পরিমল দ্রং-এর নামে একটি মার্কেটের নাম করা হয় তার পিতা যজ্ঞেশ্বর মিছিলের উপস্থিতিতে।

বিড়ই ডাকুনি স্কুলের শহীদ মিনারটি শহীদ পরিমল দ্রং-এর নামে উৎসর্গ করা হয়। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দ্রং-এর স্মরণে ময়মনসিংহ কাচিঝুলি ছাত্রাবাসে গারো কলেজ ছাত্রছাত্রীরা প্রতি বছর একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করে।

উক্ত টুর্নামেন্টের নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিমল দ্রং টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিমল দ্রং-এর মত আরো অনেকেই শহীদ হয়েছেন এবং অনেকে আহত হয়েছেন।

লতিকা এন মারাক

নেত্রকোনা বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি জেলা। সুসং দুর্গাপুর এবং কলমাকান্দা এ জেলারই দুটি উপজেলা। টংক আন্দোলনসহ ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনে এ অঞ্চলের গারো জনসাধারণের ছিল অগ্রণী ভূমিকা।

এখানেই জন্ম, সময়ের এক সাহসী সন্তান লতিকা এন মারাক। মাতা রূপবতী মারাক এবং পিতা আমুদ চন্দ্র খসড়া।

পিতা-মাতার প্রথম সন্তান লতিকা এন মারাকের লেখাপড়া বিরিশিরি মিশনারি স্কুলে। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন তিনি।

স্কুলে অধ্যয়নকালেই সমাজের সঙ্গে মানসিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যান লতিকা। মানতে ইচ্ছে হয় না সমাজ যা মেনে চলছে। জড়িয়ে যান সমাজবিরোধী টংক আন্দোলনে। অবশ্য তার এই মানস গঠনে পারিবারিক স্বীকৃতি ও পরবর্তী ঘটনাচক্রও ভূমিকা রেখেছে।

বাবা ছিলেন একজন কমিউনিস্ট। পরিবারের অন্য সবার সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির স্টাডিগুলোতে যেতেন তিনি। এরপর তার পরিচয় ঘটে হাজং নেত্রী কলাবতী হাজংয়ের সাথে। প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে লতিকার লব্ধ আদর্শ।

শোষণমুক্ত একটি সমাজ স্বপ্নের হাতছানি দিয়ে ডাকে তাঁকে। স্বামী গণেন্দ্র জ্যাম্বেল হয়ে গেলেন তার এই স্বপ্নের সহচর।

পরাধীন বাংলায় সংঘটিত পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই দম্পতির ছিল বিশিষ্ট ভূমিকা। এর পর আসে ১৯৭১।

তখনো বেঁচে ছিলেন কলাবতী হাজং। তাঁর বাড়িতে মিলিত হতেন তখনকার কমিউনিস্ট নেতারা।

মার্চের শুরু থেকেই আসন্ন লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকেন তারা। এপ্রিলের প্রথমদিকে উর্মিলা জ্যাম্বেল, রেণুকা মিসহ প্রায় দু’শো জনের একটি দল নিয়ে ট্রেনিংয়ের উদ্দেশ্যে ভারতের বাঘমারায় পৌঁছেন লতিকা এন মারাক।

সেখানে অন্যদের সাথে সংগঠিত হয়ে পার্টির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি তথ্য আদান-প্রদানের দায়িত্ব নেন।

এরপর দায়িত্ব নেন মুক্তিযোদ্ধা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে পত্রিকা বিলির। জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গম পাহাড়ের প্রান্তে প্রান্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেতেন। সাথে থাকত নানা লিফলেট, প্রচারপত্র, চিঠি, কর্মসূচির খবর।

যুদ্ধ শেষে সহযোদ্ধাদের সাথে কলমাকান্দায় ফিরে আসেন তিনি। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকার তার কোনোখোঁজ নেয় নি।

তখনো নেই তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট। বরঞ্চ স্বাধীনতা-উত্তর বিভিন্ন সরকারের আমলে তার নামে একাধিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

তাই দীর্ঘদিন গারো পাহাড়ে আত্মগোপন থেকে পরবর্তীকালে কলমাকান্দাতে ফিরে আসেন তিনি। নতুন উদ্দীপনায় শুরু করেন অধিকার আদায়ের রাজনীতি। এখনো তিনি কমিউনিস্ট পার্টির নেত্রকোনা জেলা শাখার সদস্য।

লতিকা এন মারাক

পৌল মানখিন

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা পৌল মানখিনের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায়।

১৯৭১ সালে তিনি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। বয়স ছিল ১৫ বছর। দেশপ্রেমিক কিশোর পৌল মানখিন মুক্তিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন।

পৌল মানখিনের মনে ছোটবেলা থেকেই দেশের ব্যাপারে আগ্রহ ছিল। দেশের সব খবরাখবর রাখতেন। মুক্তিযুদ্ধকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থাপনা তাকে মুগ্ধ ও উদ্দীপিত করত।

১৯৭১ সালে ২৬ মার্চের পর তাদের গ্রামের ওপর দিয়ে যেভাবে উদ্বাস্তু লোকজন ভারতের দিকে যেত তা তাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছিল।

দৈনিক হাজার হাজার মানুষ চলছে ভারতের দিকে। পথে এসব উদ্বাস্তু মানুষদের টাকা-পয়সা লুটপাট করত ডাকাতরা। তারা মাঝে মাঝে এসব ডাকাতদের প্রতিরোধ করতে যেত। এক সময় তাদের পরিবারও ভারতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল।

১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় একবার তারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এবার আবার যেতে হল। ডালু শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।

এর কয়েকদিন পর ডালু ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে নাম লেখান। এরপর ট্রেনিংয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া হলো মাদরাং পানি। ১ মাস ধরে ট্রেনিং চলল। রাইফেল, এস.এল.আর, এল.এম.জি, এম.এম.জি, মর্টার, গ্রেনেড ইত্যাদি আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রেনিং দেয়া হলো।

ট্রেনিং শেষ করে এক সন্ধ্যায় ফিরে আসে ডালুর কয়নাডুবি। রাতে বলা হলো, দুয়নাকলি অপারেশনে যেতে হবে। তাদের কোম্পানিতে ৮৪ জন ছিল। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন ইপিআর থেকে আসা জিয়াউল হক।

রাতেই রওনা হলো বান্দরঘাটা ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য। কিন্তু সিগনাল না পাওয়ায় ফিরে এল। দুদিন পর রাত ১২টায় আবার গেল।

বৃষ্টি হচ্ছে, অবিরাম বৃষ্টি। আগস্ট মাস। ভারতীয় আর্মি কভারেজ দিবে বলল। বোরাক নদী পার হয়ে ক্যাম্পের কাছাকাছি পৌছে গেল।

ভারতীয় আর্মি সিগনাল দিলে তারা ফায়ার ওপেন করল। সারারাত ধরে গোলাগুলি চলল। তারা তেমন অগ্রসর হতে পারছে না।

আবার পিছাতেও পারছে না। তাদের দুটো ছেলে আজিজ এবং অন্য একজন; দুজনই খুব সাহসী ছিল। তারা জমির আলে দাড়িয়ে গুলি করছিল।

দুজনই মারা গেল। তারা পশ্চাদপসরণ করল। এই যুদ্ধে শত্রুপক্ষেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল বলে তারা পরে প্রাপ্ত খবরে জেনেছিল।

যুদ্ধ যে ধ্বংস, মৃত্যু, রক্ত এটা আগে বুঝেনি পৌল মানখিন। এই যুদ্ধে তা পুরোপুরি বুঝতে পারে। যুদ্ধে জিতলে তাদের ভালো খাবারের অফার দেয়া হতো।

সে সময় ভালো খাবার একটা বিরাট ব্যাপার ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করত। মুক্তিযোদ্ধারা অল্প সময়ের ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল।

প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান আর্মি। একটি দুর্দান্ত বাহিনী, তাদের ছিল উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল দুর্দান্ত সাহস আর দেশপ্রেম।

মুক্তিযোদ্ধাদের এই সাহস আর দেশপ্রেমের কাছেই তারা পরাস্ত হতো। পৌল মানখিন অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

কোথাও পশ্চাদপসরণ করতে হয়েছে নিজেদের, কোথাও শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করেছে।

গাজীর ভিটা অবস্থানকালে তারা পাক আর্মি ও রাজাকারদের দ্বারা আক্রান্ত হন। সূর্য নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হলো এবং সাথে আরো কয়েকজন।

এরপর তারা গুয়াতলি বড়ইকান্দি পাক হানাদার ক্যাম্প আক্রমণ করে। তারা বিষগা গ্রামে ক্যাম্প করে ভারতীয় আর্মির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করত।

শিববাড়ি ঘোষগাঁও হয়ে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করতে গেল। তার কাঁধে দুটো ক্যারিয়ার, একটি এল.এম.জি ও একটি এস.এল.আর।

সে নিজে এসএলআর ব্যবহার করত। বড়ইকান্দি ক্যাম্প আক্রমণে তারা সফল হয়। যুদ্ধের সময় দেশে ঢুকলে দেশের মানুষ ভীষণ যত্ন এবং সম্মান করত।

সহযোগিতা করত সব রকমভাবে। তাদের সহযোগিতার কারণে মুক্তিযোদ্ধারা সফল হতো। তারা কোনো অপরাধ করত না।

কেউ করলে তার উপযুক্ত শাস্তি হতো। কোম্পানিতে তারা কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলত। তেলেখালী যুদ্ধে ভারতীয় আর্মি তাদের সাথে সরাসরি যোগ দেয়।

এতে তাদের শক্তি ও সাহস অনেক বেড়ে যায়। তারা তিন দিক থেকে ঐ ক্যাম্প আক্রমণ করে। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে ঐ ক্যাম্প দখল করে।

এতে তাদের বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধা আহত-নিহত হয়েছিল। কিন্তু তারা শত্রুপক্ষকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। তেলেখালী যুদ্ধ ছিল তার শেষ যুদ্ধ।

১৬ ডিসেম্বর তিনি হালুয়াঘাট হাইস্কুলে ছিলেন। খবর পান, পাক আর্মি আত্মসমর্পণ করেছে। আনন্দে সব গুলি খরচ করে ফেলেন।

তার একশতভাগ বিশ্বাস ছিল, দেশ স্বাধীন হবে। তারা দেশকে স্বাধীন করবেই। ভারতীয় আর্মি সক্রিয় সহযোগিতা না করলেও দেশ স্বাধীন হতো। হয়তো দেরি হতো। হয়তোবা দেশের অর্ধেক মানুষ এই স্বাধীনতার যুদ্ধে মারা যেত, কিন্তু বাংলার স্বাধীনতাকে কেউ আটকে রাখতে পারত না।

স্বাধীনতার পর ময়মনসিংহে ভারতীয় আর্মির কাছে অস্ত্র জমা দেন পৌল মানখিন। এরপর বাড়ি এসে আবার স্কুলে ভর্তি হন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অনেকেই সম্মান দেয়।

তবে পাকিস্তানপন্থীরা আজও অসম্মান করার সুযোগ পেলে ছাড়ে না। বর্তমানে মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান দেবার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের কাছে অর্থ-বিত্ত চান না। সম্মান চান, এটা পেলে মৃত্যুর সময় তার কোনো আফসোস থাকবে না।

প্রাণ কুমার দ্রং

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ কুমারের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার সংরা গ্রামে।

১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ২৩ বছরের যুবক। প্রাণ কুমার দ্রং বর্তমানে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

বর্তমানে নিজের সামান্য কৃষি জমি আর অন্যের জমিতে কঠা-ভাগা করে কোনোরকমে দিনাতিপাত করেন।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের দিকে আসামে ছিল প্রাণ কুমার দ্রং। ঐ বছরের প্রথমদিকে তিনি আসামে তার আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে যান।

আসামে তার চমৎকার দিন কাটছিল। এ সময় তার বাবার চিঠি পেল। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে এবং তাদের পুরো পরিবার ভারতে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।

তাকে দ্রুত চলে আসার নির্দেশ দিলেন। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে তিনি নেত্রকোনায় পরিবারের কাছে পৌছান। ধীরে ধীরে সমস্ত ঘটনা শুনল।

এলাকার যুবক বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হলো। সিদ্ধান্ত নিল মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার। শত্রুকে মোকাবেলা করে দেশে ফিরতে হবে।

বাবা-মায়ের কষ্ট লাঘব করতে হবে। এটা ছিল প্রধান চিন্তা। শরণার্থী শিবিরের কষ্টের জীবন। নানারকম ছোঁয়াচে রোগ ছড়িয়ে পড়ছে।

মুক্তিযুদ্ধে নাম দেবার পর ট্রেনিংয়ের জন্য তাদের নিয়ে গেল তুরা রংনাবাদ। সেখানে একমাস ট্রেনিং হলো। রাইফেল, এস.এল.আর, এল.এম.জি, মর্টার, গ্রেনেড ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবহারের কৌশল শেখানো হলো।

এরপর তাদের চারদিনের জঙ্গল ট্রেনিং দিয়ে সীমান্তে অপারেশন ক্যাম্পে নিয়ে আসা হলো। এখানে অস্ত্র দেয়া হলো। তাকে দেয়া হলো রাইফেল।

দেশের ভেতরে অনেক গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। কমলাপুরে তারা পাক সেনা ক্যাম্প আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে তাদের দুজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

কিন্তু এ যুদ্ধে তারা জয়ী হয়। যুদ্ধে তিনি একটি গ্রুপের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ভারতীয় আর্মির কোনোরকম সহযেগিতা ছাড়াই তারা এ যুদ্ধ করে এবং সফল হয়।

১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ছিলো প্রাণ কুমার দ্রং। পরে মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগ না দিয়ে বাড়ি চলে আসেন। বাবা-মাকে আগে দেশে নিয়ে আসেন।

এরপর এলাকায় রাজাকার বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় তাদের এলাকার বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা সক্রিয় ছিল।

পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু দেশে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের যার যার পেশায় ফিরে যেতে বললেন। এরপর তারা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং হাল গৃহস্থালির কাজ শুরু করেন।

বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সামান্য সম্মান পাওয়া যায়। কেউ করে, কেউ করে না। দেশের ভালোর জন্য যুদ্ধ করেছিলেন।

কিন্তু এখন মনে করেন মুক্তিযুদ্ধ করে দেশের কোনো লাভ হয় নি। যারা স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তারা এখন দেশ চালায়। এ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করেছে।

দিলীপ রিছিল

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার তেলেখালী গ্রামের আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা দিলীপ রিছিল।

১৯৭১ সালে তিনি ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। বন্ধুরা ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকায় তিনি ছিলেন এ ধারার একজন সমর্থক। বর্তমানে জিবিসি মিশনারি স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত।

দিলিপ রিছিল পড়াশোনার কারণে ১৯৭১ সালে ময়মনসিংহে ছিলো। মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে বাড়ি চলে আসেন।২৬ মার্চ গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। ২৬ মার্চের পর এ এলাকার গারো এবং হিন্দুরা দলে দলে ভারতে চলে যেতে থাকে।

এপ্রিল মাসের দিকে স্থানীয় বাঙালিরা সংখ্যালঘুদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে। বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি বেড়ে যায় এবং তাদের ভারতে চলে যাওয়ার জন্য ভয়-ভীতি দেখাতে থাকে।

এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি তাদের পরিবারের সবাই ভারতে চলে যায়। যাওয়ার সময় তেমন কিছুই নিয়ে যেতে পারে নি।

তাছাড়া পরিস্থিতি এমন ছিল যে ধন-সম্পদের চাইতে জীবনের মায়া ছিল বেশি। তার এক মামা সেখানে থেকে গিয়েছিল। সে মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে চাইল না।

পরে পাক আর্মি এ এলাকায় এলে তাদেরকে চাল, ডাল দিয়ে নানানভাবে সহযোগিতা করতে বাধ্য করেছে। মিশনারির কারণে কিছুদিন পাক আর্মি গারো খ্রিস্টানদের কিছু বলেনি।

ভারতে গিয়ে কিছুদিন যাত্রাকোনা থাকল এক আত্মীয়ের বাড়ি। ওখান থেকে দিনপাড়া শরণার্থী শিবিরে গিয়ে উঠল। শিবিরে নানারকম সমস্যা।

ডায়রিয়াসহ নানারকম অসুখে লোকজন মারা যাচ্ছে। শরণার্থী শিবিরের জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। সমসময় তারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকত আর দেশে ফিরে যেতে পারবে কি না।

মুক্তিযুদ্ধে যাবে এমন সিদ্ধান্ত ছিল না। একদিন বন্ধুরা সব ডালু ট্রানজিট হম্পে যাচ্ছিল। তিনিও তাদের সাথে গেলেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

এরকম আকস্মিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়ার পর নিজের মধ্যে অন্যরকম সাহস। এবং আনন্দ পাচ্ছিল। ডালুতে থাকল ১৫ দিন । এখানে পিটি-প্যারেড হতো।

এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হলো তুরা রংনাবাদ ক্যাম্পে। রংনাবাদে এক মাসের অস্ত্র ট্রেনিং হলো। রাইফেল, এল.এম.জি, মর্টার, গ্রেনেড ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবহার কৌশলের ট্রেনিং হয়। এছাড়া এক্সপ্লোসিভ ব্যবহার কৌশলও শেখানো হয়।

তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর-এ গেলেন। রংনাবাদ থেকে ধামালগিরি যান এক সপ্তাহের জঙ্গল ট্রেনিংয়ের জন্য। জুলাই মাসের শেষের দিকে ধামলগিরি থেকে রংনাবাদ ফিরে এল।

এখানে তাদের নামে অস্ত্র ইস্যু হলো। তাকে দেয়া হলো এস.এম.জি। ১ আগস্ট বর্ডারে আসার সিদ্ধান্ত নিল। তাদের গ্রুপে সদস্য ছিল মোট ৮০ জন।

এর মধ্যে পাঁচজন ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের। দাঙ্গা অপারেশনে পাঠানো হলো। ভারতের ভেতর দিয়ে তারা লক্ষ্যস্থানে গিয়ে অপারেশন না করেই ফিরে এল।

তাদের হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র এবং অ্যামুনিশন না থাকায় অপারেশন ব্যর্থ হলো। ডালুতে ফিরে এল ।

একদিন রাত ১২টার দিকে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের ভিতরে ঢুকল। উদ্দেশ্য জনগণের মধ্যে থেকে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করা।

কিন্তু তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি হবার কারণে দলের একটি অংশ ভারতে ফিরে যায়। এতে তারা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মনোবল কমে যায়।

তাছাড়া, যারা ভারতে ফিরে যায় তাদের হাতে অধিকাংশ গুলি এবং অ্যামুনিশন থাকায় তারা অস্ত্রের দিক দিয়েও দুর্বল হয়ে পড়ে।

তবু তারা আব্দুল গফুরের নেতৃত্বে বাকি অর্ধেক অংশ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে নৌকায় করে বোগাই নদী পার হলো।

হাঁটতে হাঁটতে চলে এল হালুয়াঘাট-নালিতাবাড়ির মাঝামাঝি একটি গ্রামে। এখানে রাতে থাকল। এরপর তারা এক একদিন এক একটি গ্রামে থাকত আর রাতে বের হতো অপারেশনে।

এ বাহিনীতে তারা আদিবাসী ছিল আনুমানিক ১০/১২ জন। এ সময় তারা অসংখ্য চোরাগোপ্তা আক্রমণ করে।

বিশেষত রাজাকারবিরোধী অপারেশন। তাছাড়া মাঝে মাঝে আর্মি ক্যাম্পে আকস্মিক গুলি ছুড়ে তাদের মধ্যে আতংক ছড়াত।

এভাবে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে তারা বেশ সাহসী হয়ে উঠল। কিন্তু তাদের গোলা-বারুদ শেষ হয়ে আসছিল এবং নতুন গোলাবারুদ হাতে এসে পৌছল না।

তখন তারা কালিগঞ্জে একদিন পাক আর্মি ও রাজাকারদের দ্বারা ঘেরাও হয়ে যায়। সামান্য কিছু গোলাবারুদ নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু দ্রুত তাদের গোলা-বারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়।

এতে তাদের বাহিনী বেশ এলোমেলো হয়ে পড়ে। এ সময় আরং রিছিল শত্রুপক্ষের গুলিতে শহীদ হন। ধরা পড়েন প্রাণকুমার নামে আরেক আদিবাসী গারো। পরে তাকেও নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

তারা জীবিতরা ডালুতে ফিরে যান। ইতোমধ্যে ভারতীয় আর্মি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ শুরু করেছে।

১৬ ডিসেম্বর ডালুতে ছিলেন দিলীপ রিছিল। পরে ময়মনসিংহ মিলিশিয়া ক্যাম্পে যোগ দেন। পরবর্তীকালে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের স্ব স্ব পেশায় ফিরে যেতে বলেন।

বাড়ি চলে আসেন এবং পুনরায় কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সমাজে আলাদা কোনো সম্মান পেতো না।

তবে বর্তমানে ভাতা এবং মরণোাত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মানের কারণে সমাজে মর্যাদা কিছুটা বেড়েছে।

পংকজ রেমা

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা পংকজ রেমার বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায়।

১৯৭১ সালে তিনি বাঘাইতলী হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে শূকরের মাংসের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

পংকজ রেমা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের দিকে গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে এই খবরে গ্রামের লোকেরা আতংকিত হয়ে পড়ে। খবর আসছে পাক আর্মি যেখানে সেখানে মানুষ মারছে।

গারো এবং হিন্দুরা এ সময় ব্যাপকভাবে ভারতে চলে যেতে থাকে। তাদের সামনে দিয়ে দৈনিক ভারতমুখী মানুষের লাইন।

কাকরঅন্দি, সোহাগপুর, বড়ইজানি, পানিহাটা, তারানী এলাকার গারোরা ভারতে যাওয়ার সময় পাহাড়ের উপত্যকায় তাদের উপর পাক আর্মি গুলিবর্ষণ করে। এতে কিছু লোক আহত-নিহত হয়।

এ খবর পাবার পর তারা নতুন করে আতংকিত হয়ে উঠে। মে মাসের প্রথম দিকে তিনি পরিবারসহ ভারতে চলে যান।

চাল, ডাল, কাপড়সহ কিছু গরু-ছাগল যাবার সময় নিয়ে যান। এলাকার আরো অনেক লোক একসাথে যাচ্ছিল। যাবার সময় ভাবছিল এই অবস্থা একদিন দূর হবে।

আবার দেশের মাটিতে ফিরে আসবে। প্রথমে গিয়ে যাত্রাকোনা উঠল, তারপর ডিমাপাড়া শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিল।

ওখানে জীবিকার জন্য একটি পানের দোকান দিল। একদিন চারকিপাড়ার প্রদীপসহ আরো তিন-চারজন গিয়ে বলল, তুমি এখানে পানের দোকান চালাচ্ছ। ওদিকে দেশের মানুষ সব মারা যাচ্ছে।

চল, দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে হবে। তারপর ঐ দিনই দোকান বাদ দিয়ে ওদের সাথে চলে গেল ডাবগিরি এবং মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখাল প্রাথমিক মেডিক্যাল করার পর।

ওখান থেকে তাদের নিয়ে গেল রংনাবাদ, তুরা এলাকায়। ওখানে আবার মেডিক্যাল করে একদিন বিশ্রাম দেয়া হলো। পরদিন থেকে ট্রেনিং শুরু হলো।

১ মাস ৪ দিন ধরে তাদের ট্রেনিং চলল। বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কৌশল শেখানো হলো। রাইফেল, স্টেনগান, এল.এম.জি, ৩” মর্টার, হ্যান্ড গ্রেনেড ইত্যাদি।

ট্রেনিং কমান্ডার ছিলেন রফিক উদ্দিন ভূইয়া এবং প্রেমচাঁদ। ট্রেনিংকালে জেনারেল অরোরা তাদের ক্যাম্পে একবার এসেছিলেন।

এরপর ট্রেনিংয়ের জন্য তামাদের নিয়ে যাওয়া হয় তুরার ৭ মাইল উত্তর-পশ্চিমে । ৪ দিন জঙ্গল ট্রেনিংয়ের পর রংনাবাদে ট্রেনিং হলো।

এরপর পানিঘাটা মিশন হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এর মধ্যে কয়েকটি ছোটোখাটো অপারেশন করে তারা কাশিগঞ্জে এসে শেল্টার নেয়।

একদিন ভোরবেলা তারা শত্রুপক্ষের দ্বারা আক্রান্ত হয়। কারণ, তারা অস্ত্রে দুর্বল ছিল। তবু সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতিরোধ করে। এ সময় তারা ছোটো ছোটো গ্রুপে ভাগ হয়ে যুদ্ধ করে।

এখানে আদিবাসী গারো পরিমল দ্রং এবং আরং রিছিলসহ বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধা নিহত এবং আহত হয়।

এই যুদ্ধে তারা বাহিনীগতভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। যে যার মতো ভারতে ফিরে যায়। ওখানে সপ্তাহ লাগল বাহিনী নতুন করে তৈরি করতে।

এরপর তেলেখালী ক্যাম্প আক্রমণে অংশগ্রহণ করে। এখানে যৌথবাহিনী অর্থাৎ ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী মিলিতভাবে যুদ্ধ করে। দক্ষিণ-পশ্চিমপূর্ব এই তিন দিক থেকে বিশাল বাহিনী সম্মিলিতভাবে তেলেখালী ক্যাম্প আক্রমণ করে।

প্রথমে তারা সামনে থেকে আক্রমণ করে। পরে ভারতীয় বাহিনী সামনে চলে যায়। পিছন থেকে ভারতীয় আর্মি ক্যাম্পে শেল নিক্ষেপ করতে থাকে।

শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। এরকম অবিরাম গোলাবর্ষণ আর কোনো মুদ্ধে করে নি। অবশেষে তারা তেলেখালী ক্যাম্প দখল করে । পাক আর্মি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরে জেনেছিল পাক আর্মির ২৪ জন নিহত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা ৭ জন শহীদ হয়। আরো অনেকে আহত হয়। এই ক্যাম্প দখলের পর তাদের আত্মবিশ্বাস ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

পর তারা আর একটি বড়ো যুদ্ধ করে পশ্চিম বারোমারিতে। ১২০ জন ভারতীয় আর্মি নিয়ে তারা অ্যাম্বুস করে। সিগনাল, ফায়ারিং, কাভারিংসহ চার পুরো বাহিনীকে ভাগ করা হয়। তিনি ফায়ারিংয়ে ছিলেন।

পাক আর্মির গাড়ি আসছে। প্রথমে একটি জিপ, পরে একটা ট্রাক। রেঞ্জের মধ্যে আসার সাথে সাথে তাদের সবগুলো অস্ত্র একসাথে গর্জন করে উঠল। তারা পাল্টা আক্রমণ করার কোনো সুযোগই পেল না।

পুরো বাহিনী খতম করা হলো। উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও অন্যান্য জিনিস ভারতে নিয়ে গেল।

বারোমারি থেকে সে ছুটিতে এল গ্রামের বাড়ি। ১৬ ডিসেম্বর সে বাড়িতে ছিল। এলাকার লোকেরা ব্যাপক আনন্দ-উৎসব করল।

আর তিনি ছিলেন এ উৎসবের মধ্যমণি। এরপর টিচার্স ট্রেনিং কলেজে থাকলেন বেশ কিছুদিন । বঙ্গবন্ধু দেশে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের যার যার পেশায় ফিরে যেতে বললেন। গ্রামে ফিরে এলেন। বাড়িতে রেখে যাওয়া তাদের হারানো জিনিসপত্র এলাকাবাসী উদ্ধার করে দিল।

বাড়ি এসে বেকার হয়ে গেলেন। পড়াশোনাও করতে পারলেন না আর্থিক কারণে। কোনো কাজ নেই। এ সময় সরকারও তাদের জন্য কোনো উদ্যোগ নিল না।

দেশকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কখনও কোনো সুবিধা নেন নি। এলাকার লোকেরা সম্মান করে। তাছাড়া ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চ উপজেলায় তাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়।

রেভারেন্ড ক্লেমেন্ট রিছিল

বাংলাদেশের গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা রেভারেন্ড ক্লেমেন্ট রিছিলের জন্ম ১৯১৮ সালের পহেলা জানুয়ারি ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার কুসুমধরা গ্রামে।

১৯৩৭ সালে তিনি ঢাকা জেলার বান্দুরা হাইস্কুল হতে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং ধর্মতত্ত্বে উচ্চতর শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে ভারতের রাচিতে গমন করেন।

সেখানে তিনি সেন্ট আলবার্ট সেমিনারীতে ধর্মতত্ত্বে উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৪৩ সালে যাজকপদে অভিষিক্ত হন। যাজকীয় দায়িত্ব পালনাবস্থায়ই তিনি ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এম.এ. পাস করেন।

যাজকীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বান্দুরা হাইস্কুলেও শিক্ষকতা করেন। পরবর্তীকালে তিনি বিভিন্ন সময়ে হাসনাবাদ, ময়মনসিংহ, বিড়ইডাকুনি, মাউছাইদ প্রভৃতি মিশনসমূহে যাজকীয় দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি মেঘালয়ের তুরা শহরে অবস্থান করে সেখানকার আশেপাশে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পসমূহ এবং হাসপাতালে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত পরিদর্শন করতেন।

তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছর পর তিনি যাজক পদ হতে ব্যক্তিগত কারণে পদত্যাগ করেন এবং সুসং দুর্গাপুর মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন।

পরবর্তীকালে ১৯৭৭ সালে তিনি গারো ব্যাপ্টিস্ট কনভেনশনের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন এবং তিন সচরাধিককাল দক্ষতার সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বিরিশিরিতে ধর্মতত্ত্ব প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় ও সেই সঙ্গে প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিটে অধ্যাপনার কাজও দীর্ঘদিন যাবত চালিয়ে গেছেন।

বর্তমানে তিনি বিরিশিরি গ্রামে স্থায়ীভাবে অবসর জীবনযাপন করছেন। অত্যন্ত সহজ সরল বিনম্র স্বভাবের এই ব্যক্তি ধর্মতত্ত্বে তার গভীর জ্ঞানের জন্যে বিখ্যাত।

তিনি ইতোমধ্যে খ্রিস্টমণ্ডলীর ইতিহাস শিরোনামে চারখণ্ড গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা দেশে-বিদেশ যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়ামে তিনি অনেকগুলো সারগর্ভ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন।

অন্যদিকে তিনি অত্যন্ত সমাজ সচেতন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। তার দৃষ্টিতে যেগুলোকে তিনি সামাজিক কুপ্রথা মনে করেন সেগুলোর বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিন্দুনাথ হাউই বাংলাদেশের গারোসমাজে অন্যতম প্রবীণ এই জননেতার জন্ম ১৯২৯ সালে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার টংগীরঘাট গ্রামে।

নিজ গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি বিরিশিরি হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং সেখানকার প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট হতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

ধোবাউড়া থানার চন্দ্রকোনা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। ইতিমধ্যে তিনি বিবাহসূত্রে চন্দ্রকোনা গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন।

সেই চন্দ্রকোনা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্যে তিনি নিজের ভূসম্পত্তি দান করে বিদ্যালয়টিকে নতুনভাবে গড়ে তোলেন।

তার স্বহস্তে গড়া সেই বিদ্যালয়টি বর্তমানে একটি প্রথম সারির বিদ্যালয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি চন্দ্রকোনা, ঘোষগাঁও এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকালে তিনি কারাবরণও করেন। ১৯৭৭ সালে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠাকালে এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।

পরবর্তীকালে ধোবাউড়া থানা শাখার সভাপতি পদেও নির্বাচিত হন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এ খাড়াও তিনি তার এলাকার নানা জনহিতকর কর্মকাণ্ডের সাথে সর্বদাই সম্পৃক্ত মহেন।

বর্তমানে তিনি নিজগহ চন্দ্রকোনা গ্রামে অবসর জীবনযাপন করছেন।

রেভারেন্ড সুভাষ চন্দ্র সাংমা

বাংলাদেশের গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং ধর্মতত্ত্ববিদ এই ধর্মীয় ও সমাজনেতার জন্ম ১৯৩০ সালে বর্তমান নেত্রকোণা জেলার সুসং দুর্গাপুর উপজেলার নন্দেরগোপ গ্রামে।

বিরিশিরি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনান্তে তিনি ময়মনসিংহ শহরের মৃত্যুঞ্জয় হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। হাইস্কুলের পাঠ শেষে তিনি আনন্দমোহন কলেজে অধ্যয়ন করেন।

কলেজে উচ্চশিক্ষা সমাপনান্তে বিরিশিরি হাইস্কুলে তিনি ১৯৫৯ পর্যন্ত শিক্ষকতার কাজ করেন। পরবর্তীকালে ধর্মতত্ত্বে প্রশিক্ষণ লাভের উদ্দেশ্যে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে গমন করেন এবং সেখানে তিন বছরাধিককাল ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন।

সেখানকার অধ্যয়ন শেষে ধর্মতত্ত্বে আরো উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯৬২ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়া গমন করেন।

অষ্ট্রেলিয়ায় দুই বছরাধিককাল প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে বিরিশিরি বাইবেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি দেশত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

সেখানে অবস্থানকালে তিনি বাঘমারা বিজয়পুর এলাকার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও রিক্রুটিং অফিসার হিসেবে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ঢাকায় জাতীয় চার্চ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদে যোগদান করেন এবং চার বছরাধিককাল ঐ পদে অধিষ্ঠিত থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী দেশ পুনর্গঠন পুনর্বাসনের কাজে মূল্যবান অবদান রাখেন।

তিনি ঢাকা কেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় সংগঠনের পরিচালক হিসেবেও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। অত্যন্ত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী এই ধর্মীয় এবং সমাজনেতা সাংগঠনিক কার্যোপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক ভ্রমণ করেছেন।

ধর্মতত্ত্বে অগাধ পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞার জন্যে দেশে-বিদেশে তার সুনাম ছড়িয়ে রয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি এই উভয় ভাষাতেই সমভাবে সুবক্তা হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। বর্তমানে তিনি নিজগৃহে বিরিশিরিতে অবসর জীবনযাপন করছেন।

রেভারেন্ড শশীভূষণ দিও

গারোসমাজের এই বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও ধর্মীয়নেতার জন্ম ১৯৩৩ সালে ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার রাংরাপাড়া গ্রামে।

স্থানীয় বিড়ইছাকুনি হাই স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ শেষে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন যুব সংগঠন, ধর্মীয় সংগঠন, সামাজিক সংগঠন প্রভৃতিতে জড়িত হন।

১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলাকালে তিনি অসীম সাহসিকতার সাথে এলাকার ভীতসন্ত্রস্ত পলায়নপর লোকজনের পাশে দাঁড়ান এবং দাঙ্গা প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে স্বগ্রামেই অবস্থান করেন।

ইতোমধ্যে যারা প্রাণভয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন তাদের অনেকের পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি, অনেক অক্ষম বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, রোগব্যাধি জর্জরিত লোকজনদের দেখাশোনার দায়িত্ব তিনি গ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দেশ স্বাধীনতা লাভের পর সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন সাহায্য সংস্থাকে প্রত্যক্ষ সাহায্য সহযোগিতার মাধ্যমে তিনি দেশ পুনর্গঠনের কাজে অমূল্য অবদান রাখেন।

১৯৮৫ সালে গারো ব্যাপ্টিস্ট কনভেনশনের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানেও তিনি গারো ব্যাপ্টিস্ট কনভেনশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

মার্টিন রেমা

অত্যন্ত স্পষ্টবাদী এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন এই সংগ্রামী গারো নেতার জন্ম ১৯৩৫ সালে নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার বরুয়াকোনা গ্রামে।

নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষালাভ শেষে ঢাকার বান্দুরা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা নটরডেম কলেজ ও ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।

১৯৬০ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের তথ্য বিভাগে মহকুমা জনসংযোগ অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ সাত বছর উক্ত পদে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৭ সালে ব্যক্তিগত কারণে তিনি উক্ত পদ হতে পদত্যাগ করেন এবং স্বগ্রামে প্রত্যাবর্তন পূর্বক একটি হাইস্কুল স্থাপন করে তা পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

দীর্ঘ বার বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে স্কুলটি পরিচালনার পর উক্ত স্কুল হতে বিদায় গ্রহণ করেন।

পরবর্তীকালে তিনি একটি দাখিল মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে মহিষখোলা খারনই ফ্রন্টে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অমূল্য অবদান রাখেন। বর্তমানে তিনি স্বগৃহে অবসর জীবনযাপন করছেন।

মি. থিওফিল হাজং

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন দেশব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়, নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার বালুচরা গ্রামের গারো উপজাতিভুক্ত মৃত হেমচন্দ্র রংদীর পুত্র মি. খিলফিল হাজং তখন বান্দুরা হলিক্রস হাইস্কুলের (ঢাকা) দশম শ্রেণীর ছাত্র।

তখন তাঁর বয়স ১৯ বছর। বালুচরা ক্যাথলিক মিশন ছিল মুক্তিবাহিনীর আড্ডাস্থল। তাদের কর্মতৎপরতা দেখে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।

আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের লেংগুরা সীমান্ত ফাঁড়ি দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে পৌঁছার পরপরই সেখানকার বাঘমারা ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন।

তবে বস্তুতঃ তিনি বাংলাদেশেই মুক্তিযুদ্ধে তার নাম তালিকাবদ্ধ করান। কেননা, তার এলাকাটি স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরু থেকে মুক্তিবাহিনীর দখলে ছিল বিধায় মুক্তিযোদ্ধারাই তাদেরকে সংগঠিত করে ভারতে ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দেন।

অতএব ভারতে যাওয়ার ২/৩ দিন পরই তাকে তুরার রংনাবাগ প্রশিক্ষণ শিবিরে ১ মাস যাবত থ্রী-নট-থ্রী ও মার্ক-৪ রাইফেল, এসএমজি, এসএলআর, দুই ইঞ্চি মর্টার, এলএমজি, এন্টি-ট্যাংক মাইন, ব্রীজ ধ্বংস করার মাইন, ককটেল তৈরি ও গ্রেনেড ব্যবহারের উপর প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন ১১নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন।

তার কোম্পানির নাম ইলিয়াস কোম্পানি। এ কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন জনাব ইলিয়াস চৌধুরী।

তাদের অপারেশন এরিয়া ছিল বাঘমারা, কলমাকান্দা ও নেত্রকোনা। তিনি মুক্তিবাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক ছিলেন। অবশ্য তাকে ৬ জন সৈনিকের নেতৃত্ব প্রদান করতে হতো।

মি. থিওফিল অসংখ্য অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। তাই অপারেশনের সংখ্যা বলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান। তবে প্রায় সব অপারেশনই মোটামুটি সফল ছিল।

তার জীবনের প্রথম অপারেশনটিও সফল ছিল। মাসটি ছিল সেপ্টেম্বর। বিজয়পুর ক্যাম্পে তাকে সহ দু’জনের উপর দায়িত্ব প্রদান করা হয় ক্যাম্পে গ্রেনেড চার্জ করার।

তার গ্রেনেড চার্জ করার পরপরই সহযোদ্ধাগণ পূর্ব পরিকল্পনানুসারে শত্রু ক্যাম্পে গুলি করে সবাই পালিয়ে যান। শত্রু পক্ষের সৈন্যরা হতাহত হয়েছিল এমন একটি অনির্ভরযোগ্য সংবাদ তারা পেয়েছিলেন। কেননা ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ তারা পান নি।

নভেম্বর মাসে তারা পাক বাহিনীর ইনফরমার ধরে ভারতীয় বাহিনীর নিকট হস্তান্তর করেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মি. হাজং পুনরায় লেখাপড়া শুরু করেন।

১৯৮২ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এম.এস.এস ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ওয়ার্ল্ড ভিশন অব বাংলাদেশ নামক বিদেশি সাহায্য সংস্থার নেত্রকোনার এরিয়া ম্যানেজার।

মি. থিওফিল হাজং মুক্তিযোদ্ধা সনদ পান, তবে অনেক অ-মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পাওয়ার কারণে উক্ত সার্টিফিকেট বাতিল করা হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মাধ্যমে বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তিনি পুনরায় উক্ত মুক্তিযোদ্ধা সনদ গ্রহণ করেন নি।

মি. দীপক সাংমা

মি. দীপক সাংমা

বীর মুক্তিযোদ্ধা দীপক সাংমা নেত্রকোণা জেলাস্থ দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি গ্রামের গারো অধিবাসী স্বর্গীয় বরোদা কান্ত সাংমার একমাত্র পুত্র সন্তান। কুড়ি বছরের এক সম্পন্ন যুবক।

বি.কম. শ্রেণীর ছাত্র। তখন থেকেই তার ভিতরে জন্ম নিয়েছিল পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর অ-সাম্য ভিত্তিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ।

বাংলাদেশীদের এ ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে গেল ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাক বাহিনীর অতর্কিত গণহত্যার পর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

পাক বাহিনী তাদের হত্যাযজ্ঞের বিস্তৃতি ঘটালো সারা দেশব্যাপী। দীপক সাংমার জন্মভূমি বিরিশিরি রইলো না আর শংকামুক্ত।

অনেকের মত তিনিও ঐ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি কোনো একদিনে বাঘমারা সীমান্ত ফাঁড়ি হয়ে মেঘালয়ের বাঘমারা শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

যুদ্ধ গমনের পুরো মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ সত্ত্বেও তিনি জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত যুদ্ধে যেতে পারেন নি। কেননা, পরিবারের একমাত্র পুত্রসন্তান হওয়ায় উক্ত সময়ে মারাত্মক অসুস্থ বড় বোনকে (যিনি ১৯৭৭ সালে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমীর পরিচালিকা হয়েছিলেন) দেখাশুনার দায়িত্ব মি. দীপকের উপর অর্পিত হয়।

অতঃপর তিনি জুলাই-আগস্ট এর কোন একদিনে (সঠিক তারিখটি তিনি স্মরণ করতে পারেন নি) মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং তুরা নামক স্থানে ৩ সপ্তাহব্যাপী এলএমজি, এসএমজি, দুই ইঞ্চি মর্টার, গ্রেনেড, বিস্ফোরক, মাইন ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

তিনি ১১ নং সেক্টরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কর্নেল আবু তাহের ছিলেন সেক্টর কমান্ডার। মি. দীপক নিজে উক্ত সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন।

তার নামেই উক্ত কোম্পানির নামকরণ করা হয় ’দীপক কোম্পানি’। তিনি মুক্তিবাহিনীতে কাজ করেছেন, তার অধীনে ১০৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল।

তাদের অপারেশন এরিয়া ছিল বিজয়পুর, বিরিশিরি, মনসাপাড়া এবং এর উত্তরে পূর্বধলা থানার কিছু অংশ।

আগস্ট মাসের শেষ সপ্তহে দীপক সাংমা প্রথম বিজয়পুরে একটি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। উক্ত অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল পাক বাহিনীর ইনফরমার-রাজাকার পাকড়াও করা, কেননা তারা পাক বাহিনীর নিকট মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত সংবাদ সরবরাহ করতো।

যাহোক, তারা উক্ত; অপারেশনে ২/৩ জন রাজাকারকে ধরে এনেছিলেন।

মি. দীপক সাংমা প্রধান প্রধান ৬/৭টি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। তবে তাদের অপারেশনের কৌশল ছিল ‘শুট এন্ড রান’ (অতর্কিতে আক্রমণ কর এবং তাৎক্ষণিক সরে পড়)।

তাই উক্ত অপারেশনের ফলাফল পরিমাপ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তার অংশ নেয়া অপারেশনে পাকসেনা হতাহত হলেও গেরিলা যুদ্ধপদ্ধতিতে তার পক্ষে হতাহতের সঠিক সংবাদ জানা সম্ভব হয় নি।

দীর্ঘ ন’মাস যুদ্ধের পর ১৬ই ডিসেম্বর মাতৃভূমি সম্পূর্ণরূপে শত্রুমুক্ত হলো। দীপক সাংমা বিজয়ীর বেশে মাতৃভূমিতে পদার্পণ করলেন।

কিন্তু বাড়িঘর পেলেন না। পাক বাহিনী বিরিশিরিতে তাদের ঘরবাড়ি ধূলিসাৎ করে দেয় এবং তথায় শিবির ও পরিখা স্থাপন করে। তাদের এই ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক মূল্য দু’লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যখন মি. দীপক সাংমা ভারত অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভূমিতে পদার্পণ করতেন তখন তিনি খুব আনন্দবোধ করতেন।

তবে রাজাকারদের ভূমিকা তাকে পীড়া দিতো। অসুস্থ বোনের কথা মাঝেমধ্যে মনে হলে মনে কষ্ট লাগতো।

মি. দীপক সাংমা স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং উক্ত সালের ১লা আগস্ট ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক সাহায্য সংস্থায় যোগদান করেন।

বর্তমানে তিনি সেখানে মেটিরিয়াল রিসোর্স ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সনদপ্রাপ্ত হলেও সনদটি অযত্নে হারিয়ে গেছে।

ভেরুনিকা সিমসাং ভেরুনিকা সিমসাং আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা।

১৯৭১ সালে তিনি হালুয়াঘাট উপজেলার জয়রামকুড়া মিশন হাসপাতালে নার্সিং প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন। ফাইনাল পরীক্ষার পূর্বেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

২৫ মার্চের বান্ধবী সন্ধ্যা মাকে নিয়ে অন্য মিশনে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে কয়েকদিন পর জনৈক আত্মীয়ের সহায়তায় মরিয়মনগর এলাকায় চলে যান।

নিরাপত্তার অভাবে এখান থেকে মে মাসের শেষের দিকে এলাকার অন্যানা লোকদের সঙ্গে ভারত চলে যান।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মহেন্দ্রগঞ্জের তৎকালীন এম.এল.এ সন্তোষ সিমসাং ছিলেন তার আপন খালাত ভাই।

সেখানে খালাত ভাইয়ের বাড়িতে তারা আশ্রয় নেন। সেখানে গজপাথর এলাকায় ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ও ফিল্ড হাসপাতাল।

ওই হাসপাতালে তখন জয়রামকুড়া মিশন হাসপাতালের ডাক্তার রায় কাজ করতেন। তিনি তাদের অবস্থান জেনে যোগাযোগ করেন। ভেরুনিকা ও সন্ধ্যা ডাক্তার রায়ের আহ্বানে মুক্তিযোদ্ধা ফিল্ড হাসপাতালে নার্সিংয়ের কাজে যোগ দেন।

এই ক্যাম্পে তারা প্রায় ২ মাস কাজ করেন। নভেম্বর মাসে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মেডিকেল টিম দেশে প্রবেশ করে। জামালপুর এলাকায় তারা মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান নেন।

এরপর মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে শেরপুর। চলে আসেন। সেখানে প্রায় ১ মাস অবস্থান করে শেরপুরের বকশীগঞ্জে আসেন। এখানে কয়েকদিন থাকার পর জামালপুর মুক্ত হয়।

জামালপুর মুক্ত হওয়ার পর জনৈক ভারতীয় সৈনিকের সহযোগিতায় ৯ ডিসেম্বর তারা বাড়ি পৌঁছেন। ১০ ডিসেম্বর মধুপুর এলাকায় ব্যাপক গোলাগুলি হয়।

মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা যৌথভাবে পাকিস্তানিদের উপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। পরে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ওই সময় ভেরুনিকা সিমসাং মধুপুর থানার আমলিতলা গ্রামে মায়ের বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন।

বকশীগঞ্জ কামালপুর এলাকায় একযুদ্ধে সিলেট অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধা এন্টনী ম্যাকরিক মাথায় গুলি লেগে খুলি উড়ে যায়। ভেরুনিকা সন্ধ্যার সহযোগিতায় এন্টনী ম্যাকরিকের ব্যান্ডেজ করে দেন।

পরে ওই মুক্তিযোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিলং ও সেখান থেকে লন্ডন পাঠানো হয়। দেড় বছর চিকিৎসার পর ওই মুক্তিযোদ্ধা সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

জনৈক পরিচিত মুক্তিযোদ্ধার নিকট নিজের এ কাহিনী শুনে তিনি অনেক চেষ্টার পর ভেরুনিকার খোজ পান। দীর্ঘ ২২ বছর পর তিনি ভেরুনিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকার তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

স্বাধীনতার পর ভেরুনিকা সিমসাং ১৯৭২ সালে এস.এস.সি পাস করেন। তাকে জিজি ও অন্যানা সরকারি হাসপাতালে চাকরির প্রস্তাব দেয়া হয়।

কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। তিনি এলাকার নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার প্রসারের জন্য জি.বি.সি স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন।

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য ৯ মার্চ ১৯৭২ মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি. ওসমানী স্বাক্ষরিত এক সনদপত্র প্রদান করা হয়।

এছাড়া ৪ জুন ২০০১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য তাকে এক প্রশংসাপত্র প্রদান করেন।

ভেরুনিকা সিমসাং ১৯৪৮/৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা বিশ্বনাথ সাংমা, মাতা কামিনী সিমসাং। মাতৃনিবাস গ্রাম আমলিতলা, মধুপুর, টাংগাইল।

১৯৭৫ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। স্বামী খগেন্দ্র সাংমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক। বিয়ের পর ভেরুনিকা শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দেন।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভেরুনিকা সিমসাং বা তার পরিবার আজ পর্যন্ত কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান নি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিক এই মহীয়সী নারী ২৩ জুন ২০০৫ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি ২ কন্যা লাকী ও দিনা, ১ পুত্র দিপন ও স্বামীসহ অনেক আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

তাকে হারিয়ে এই পরিবার এখন দিশেহারা। এখনও তারা মৃত্যুশোক কাটিয়ে উঠতে পারেন নি।

চিত্তরঞ্জন সাংমা

গারো সমাজের বিশিষ্ট এই এনজিও ব্যক্তিত্ব এবং সমাজনেতার জন্ম ১৯৪৭ সালের ১৪ জুলাই নেত্রকোনা জেলার সুসং দুর্গাপুর থানাধীন খুজিউড়া গ্রামে।

নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে তিনি বিরিশিরি পি.সি. নল মেমোরিয়াল হাইস্কুল হতে ১৯৬৫ সালে মেট্রিক পাস করেন এবং ১৯৬৮ সালের ঢাকার নটরডেম কলেজ হতে আই.এ. পাস করেন।

একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ শেষে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে তিনি ১৯৭২ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজ হতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

শিক্ষকতার মাধ্যমে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। কয়েক বছর শিক্ষকতার পর ১৯৭৯ সালে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কারিতাস বাংলাদেশে যোগদান করেন এবং অদ্যাবধি তিনি এই সংস্থাটিতেই কর্মরত রয়েছেন।

বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কারিতাস বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগে তিনি এতদাঞ্চলে গরিব জনসাধারণের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে সরাসরি জড়িত থেকে নিরলসভাবে গরিব জনসাধারণের সেবা করে যাচ্ছেন।

বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য ইতোমধ্যে তিনি ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, ভারত, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেছেন।

ডা. উইলিয়াম মং

এই নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধার জন্ম ১৯৫২ সালের ১৮ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট থানাধীন চরবাঙ্গালীয়া গ্রামে।

নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে বিড়ইডাকুনী মিশন হাইস্কুল হতে ১৯৬৮ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯৭০ সালে ঢাকাস্থ তদানীন্তন কায়েদে আজম কলেজ হতে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

পরবর্তীকালে তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হতে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন এবং সহকারী সার্জন হিসেবে সরকারি চাকরিতে ১৯৮১ সালে যোগদান করেন।

সহকারী সার্জন ও পরবর্তীকালে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে তিনি ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ প্রভৃতি জেলার বিভিন্ন থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত রয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে ক’জন গারো আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার কথা প্রবাদপ্রতিম হয়ে রয়েছে এদের মধ্যে ডা. উইলিয়াম ম্রং অন্যতম।

সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের পরিচালনাধীনে একজন কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে তিনি হানাদার। বাহিনীর বিরুদ্ধে অনেক অভিযান সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেন।

যতীন্দ্র সাংমা-১

উদীয়মান এই তরুণ সমাজনেতার জন্ম ১৯৫৮ সালের বর্তমান নেত্রকোনা জেলার সুসং দুর্গাপুর থানাধীন বামনপাড়া গ্রামে। নেত্রকোণা জেলার বিরিশিরি পি.সি. নল মেমোরিয়াল হাইস্কুলে অধ্যয়ন শেষে তিনি ময়মনসিংহ শহরের নাসিরাবাদ কলেজ হতে ১৯৭৮ সালে আই.এ. পাস করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে লোক প্রশাসনে অনার্স ডিগ্রি লাভের পর তিনি ১৯৮৬ সালে এম.এস.এস ডিগ্রি লাভ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে স্বগ্রামে প্রত্যাবর্তন করে তিনি সমাজকর্মী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন।

১৯৮৭ সালে তিনি ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের দুর্গাপুর থানা শাখার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৮ সালে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সেক্রেটারি জেনারেল নির্বাচিত হন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তার কার্যকাল সম্পন্ন করেন।

কারিতাস বাংলাদেশ ময়মনসিংহ অঞ্চলে সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্প নামে আদিবাসীদের জন্য পৃথক একটি প্রকল্প যখন প্রতিষ্ঠা লাভ করে তিনি তখন এর জুনিয়র প্রোগ্রামার অফিসার হিসেবে যোগদান করেন এবং অদ্যাবধি তিনি এই প্রকল্পে কর্মরত রয়েছেন।

বর্তমানে তিনি এই প্রকল্পের প্রোগ্রামার অফিসার। এই প্রকল্পের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা সংসদেরও তিনি অন্যতম আহ্বায়ক। এই নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা কিশোর বয়সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের পরিচালনাধীন বিভিন্ন ফ্রন্টে সম্মুখযুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্বের সাথে লড়াই করেন। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কালেও তিনি প্রতিবাদীর ভূমিকা পালন করেন।

মি. এক্সিবিশন বনোয়ারী। অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা মি. এক্সিবিশন বনোয়ারী ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার গামারীতলা (গোয়ালখালী) গ্রামের গারো উপজাতি মৃত রাধাচরণ সাংমার পুত্র।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ষোড়শ বর্ষীয় এই তরুণ। লেখাপড়া স্থগিত রেখে হাতে মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র তুলে নেন।

১৯৭১ সালের ৩ মে তিনি বাংলাদেশের চারুয়াপাড়া সীমান্ত ফাঁড়ির নিকট দিয়ে ভারতের মেঘালয়ের বাঘমারায় পৌছে সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

উল্লেখ্য, যুদ্ধের সময় তার পরিবারের সদস্যবৃন্দ এখানে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এর প্রায় ২ মাস পর তিনি ২৭ জুন বাঘমারা ইয়ুথ ক্যাম্পে রিক্রুট হন এবং তুরা ট্রেনিং সেন্টারে ৩৫ দিন রাইফেল, এসএমজি, এসএলআর, এলএমজি, টু-ইঞ্চ-মর্টার, গ্রেনেড, মাইন, টাইম বোমা ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

অতঃপর মি. বনোয়ারী কর্নেল আবু তাহের ১১ নং সেক্টরে যুদ্ধে নিয়োজিত হন। উল্লেখ্য যে, এই সেক্টরের প্রধান ছিলেন মোঃ হামিদুল্লাহ খান।

তার যুদ্ধক্ষেত্র ছিল নেলুয়াগিরি, টাঙ্গাটি, বিজয়পুর, ফারাংপাড়া, ভবানীপুর, নলুয়াপাড়া, ফান্দা, বারমারী, চণ্ডিগড় ও দুর্গাপুর। উক্ত এলাকাতে আকনজী কোম্পানীর অধীনে তিনি যুদ্ধ করেন।

কোম্পানির নেতৃত্বে ছিলেন ফজলুর রহমান আকনজী। মি. বনোয়ারীও পদাতিক বাহিনীতে সেকশন কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন।

তার অধীনে ১১ জন যোদ্ধা ছিলেন। ১৫ জুলাই, ১৯৭১ ভোর রাতে ফারাংপাড়া (বর্তমান ভবানীপুর ক্যাম্প) পাক বাহিনীর শিবিরে অপারেশনই মি. বনোয়ারীর প্রথম যুদ্ধ অপারেশনে অংশ গ্রহণ।

উক্ত অপারেশনে ২ জন পাক সেনা নিহত ও বহু আহত হয়েছিল। তিনি ২৫টিরও অধিক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন।

তন্মধ্যে ২০টিতে জয়লাভ করেন। অপারেশনে স্বপক্ষের কারো ক্ষতি না হলেও শত্রু পক্ষের ৪ জন নিহত হয় এবং বহু আহত হয়।

ফারাংপাড়া ও গোপালপুরের। অপারেশনের সময় শত্রু সৈন্য নিহত হয়। বিজয় অর্জিত হলে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন।

তবে কেবল বিধ্বস্ত ভিটেমাটিই ফেরত পেয়েছেন। শত্রু সৈন্য কর্তৃক কৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দুই লক্ষাধিক টাকা।

মি. বনোয়ারী মুক্তিযোদ্ধা সনদ পান নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার মানসিক অবস্থার কথা মি: বনোয়ারী বর্ণনা করলেন এভাবে, ‘যুদ্ধ চলাকালে আমার মানসিক অবস্থা মোটামুটি ভালোই ছিল।

যদিও সবকিছু ফেলে দেশত্যাগ করেছি, তথাপি মাতৃভূমিকে স্বাধীন করার চিন্তা-ভাবনাটাই ছিল তখন আমার মুখ্য উদ্দেশ্য।

যুদ্ধের কথা শোনা মাত্রই আনন্দে লাফিয়ে উঠেছি। যুদ্ধের কথা ছাড়া সে সময় আর অন্য কিছুর চিন্তা করি নি।

মি. অনাথ নকরেক মি অনাথ নকরেক নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ভরতপুর গ্রামের গারো অধিবাসী মি. দেওনা মানখিনের পুত্র।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে তার বয়স ছিল ২২ বছর। জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ ও বিক্রয় করে তিনি তার জীবিকা নির্বাহ করতেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি সপরিবারে মার্চের শেষের দিকে বারোমারী সীমান্ত ফাঁড়ির নিকট গাজীপুরের উত্তর দিক দিয়ে ভারতে পদার্পণ করে তথাকার ধামুক শিবিরে অবস্থান গ্রহণ করেন।

উক্ত আশ্রয় শিবিরে অবস্থানকালে তিনি জানতে পারেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে হাজারো বাঙালি জীবন উৎসর্গ করে যাচ্ছেন।

তখন তিনি মনে করলেন যে, এ যুদ্ধে তারও অংশগ্রহণ করা উচিত। তার কথায়, “যখন হাজার হাজার বাঙালি মারা যাচ্ছে তখন আমরাও কি মানুষ না?”

এ উপলব্ধিতে তিনি ২২ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধে যোগদানের পরপরই তিনি তুরাতে এসএমজি, এলএমজি, রাইফেল ইত্যাদি চালনা শিক্ষা লাভ করেন।

একুশ দিন ট্রেনিং লাভের পর তাকে মুক্তিযুদ্ধের ১১ নং সেক্টরে প্রেরণ করা হয়। কর্নেল আবু তাহের ছিলেন সেক্টর কমান্ডার।

এ সেক্টরের অধীনে ইলিয়াস কোম্পানিতে তিনি যুদ্ধ করেন। কোম্পানি কমান্ডারের নাম ইলিয়াস চৌধুরী। তার অপারেশন এরিয়া ছিল বিজয়পুর, কলমাকান্দা, ধবরাম, টাঙ্গাটি ও নেত্রকোনা। তিনি মুক্তিবাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে কাজ করেছেন।

তিনি ৬টি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ৩টি অপারেশনে জয়লাভ করেন। কলমাকান্দায় এক অপারেশনে তারা পাক বাহিনীর লোকজন হত্যা করেছেন।

তবে নিহতের সংখ্যা তিনি জানেন না এবং নিহতের লাশও তারা পান নি। পাক সৈন্যরা লাশ সংগ্রহ করে নিয়ে যায় বলে পরে জানা যায়।

মি. অনাথ নকরেক অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে প্রথম অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। ভারতীয় বি.এস.এফ তাদের বিজয়পুরের পাকবাহিনী ক্যাম্পের অদূরে একটি টিলায় পাহারা প্রদানের দায়িত্ব দেয়।

তারা টিলার উপরে বাংকার তৈরি করে তার মধ্যে অবস্থান করেন পাক বাহিনীকে ঘায়েলের উদ্দেশ্যে। সেদিন পাক বাহিনীর কয়েকজন সৈন্য ক্যাম্প থেকে গোসল করতে নামলে তারা তাদের (পাকবাহিনী) উপর গুলি বর্ষণ করে সরে পড়েন।

গুলিতে ২ জন পাকসেনা নিহত হয়। পাক সৈন্যরাই সে লাশ নিয়ে যায়। তিনি দেশ বাবান হওয়ার পর ভূ-সম্পত্তি যথাযথভাবে ফিরে পেলেও বাড়িঘর ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পেয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর মি. নকরেক অস্ত্র ত্যাগ করে আবার হাতে কুড়োল ধরেছেন জ্বালানি সংগ্রহ ও বিক্রয়ের জন্য। পাশাপাশি কৃষিকাজও তিনি মাঝেমধ্যে করে থাকেন।

তিনি মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট পেয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান (তৎকালীন রাষ্ট্রপতি) ঢাকার মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশ আহ্বান করেন।

উক্ত সমাবেশে যোগদানের পথে ট্রেন ডাকাতির কবলে পড়ে তার নিকট রক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ সার্টিফিকেটটি হাতছাড়া হয়।

মি. অরবিন্দ সাংমা (দিও)

গারো মুক্তিযোদ্ধা অরবিন্দ সাংমা দিও নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার পূর্ব উত্রাইল গ্রামের স্বর্গীয় চন্দ্র রুরাম-এর পুত্র।

স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়ে অরবিন্দ সাংমা স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র। পাক বাহিনী বিরিশিরিতে শিবির স্থাপন করলে জীবন নিরাপত্তার আশায় সপরিবারে তিনি বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) চারুয়াপাড়া সীমান্ত ফাঁড়ি পেরিয়ে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নেলুয়াগিরি নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তার পরিবারের সবাই উক্ত শিবিরে অবস্থান করেন। আঠারো বছরের এ টগবগে তরুণ উক্ত উদ্ধাস্তু শিবিরে গিয়েই জানতে পারলেন তাদের পরিচিত অনেক গারো দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিচ্ছে।

এ সংবাদ অরবিন্দ ও তার ৭/৮ জন সাথীকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের অনুপ্রেরণা যোগায়। তারা আর কালবিলম্ব করে বাঘমারা ইয়ুথ সেন্টারে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য নাম লিপিবদ্ধ করেন।

শুরু হলো এক সংগ্রামী জীবন। যুদ্ধ করতে হলে জানা দরকার যুদ্ধ কৌশল। তাই মেঘালয়ের রংনাবাগ নামক স্থানে ২৯ দিনের এক স্বল্পমেয়াদী ট্রেনিং গ্রহণ করে।

রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি, এসএমজি, গ্রেনেড, দুই ইঞ্চি মর্টার চালনা এবং সেতু উড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা নিক্ষেপ কৌশল রপ্ত করেন।

অতঃপর তিনি ১১ নং সেক্টরভুক্ত হয়ে মাতৃভূমির শৃঙ্খল মুক্তির যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু করলেন। উক্ত সেক্টরে তিনি ফজলু কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন ফজলুর রহমান আকনজী। তাদের অপারেশন এরিয়া ছিল পূর্বে দামুক বর্ডার থেকে পশ্চিমে বাংলাদেশের ভবানীপুর পর্যন্ত এবং দক্ষিণে দুর্গাপুর পর্যন্ত।

তবে যতদূর অগ্রসর হওয়া যায়, তারা অগ্রসর হতেন। অর্থাৎ তারা সুযোগ মতো উক্ত এরিয়ার বাইরেও অপারেশন চালাতেন। তিনি মুক্তিবাহিনীতে সহকারী পাটুন কমান্ডার হিসেবে ৩৩ জন গেরিলাকে নেতৃত্ব প্রদান করেন।

আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের এক সকাল। দিনটি অরবিন্দ সাংমার জন্য স্মরণীয়। কেননা সেদিনই তিনি প্রথম অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন।

বাদুমবাড়ি ও দুর্গাপুর সেনাড়িতে আনুমানিক সকাল ৯/১০টার দিকে তারা গুলি শুরু করেন। শত্রুপক্ষও পাল্টা গুলি করে। তবে কোনো পক্ষেরই হতাহতের সংবাদ জানা যায় নি। অরবিন্দ সর্বমোট ১১টি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন।

তন্মধ্যে ৮টিতে সফলতা অর্জন করেন। অপারেশন চলাকালে তিনি কখনো আহত হন নি। তবে অক্টোবর মাসে এক অপারেশনে ১ জন সহযোদ্ধার পায়ে গুলি লাগে।

সেদিন ভোরবেলা দুর্গাপুরের নলুয়াপাড়াতে পাকসেনারা যখন টহল শেষে ফিরছিল, তখন ৪৫ থেকে ৪৭ জন গেরিলা পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতে লুকিয়ে অতর্কিত আক্রমণপূর্বক তাদের অনেককে আহত ও নিহত করেন।

অতঃপর শত্রু সৈন্যের লাশ আনার জন্য তারা এগিয়ে যান। পূর্বের কথামত ভারতীয় বিএসএফগণ ঐ সময়ে পেছন থেকে কভারিং দিতে ব্যর্থ হন তাদের মেশিনগান বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে।

এমতাবস্থায় শত্রু সৈন্যরা সজ্জিত হয়ে গুলি বর্ষণ শুরু করে। ফলে একজন মুক্তিযোদ্ধা পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তাকে ভারতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

অপরদিকে শত্রুপক্ষের আনুমানিক ১২ থেকে ১৫ জন সৈন্য নিহত হয়। তাদের লাশ মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয় নি, কেননা শত্রু সৈন্যরাই তাদের মৃত সৈনিকদের লাশ আগেই উদ্ধার করে নিয়ে যায়।

মুক্তিযুদ্ধকালে অরবিন্দর মানসপটে ভেসে উঠতো শত্রুমুক্ত বাংলাদেশের ছবি, যে দেশে তিনি প্রত্যাবর্তনপূর্বক মুক্তবিহঙ্গের ন্যায় বিচরণ করবেন, আবার লেখাপড়া শুরু করবেন।

ভাবতেন তিনি কীভাবে অপারেশন চালাবেন, নিজেরা অক্ষত থকে শত্রুকে ঘায়েল করবেন। অবশেষে এলো সেই ১৬ই ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হলো।

কিন্তু বাড়ি ফিরে দেখলেন তার বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি। পাক বাহিনী অরবিন্দর ১টি টিনের ঘর, বাঁশঝাড়, সুপারি, আম ও কাঁঠাল বাগান ধ্বংস করে দেয়, যার আনুমানিক মূল্য পঁচিশ হাজার টাকা থেকে ত্রিশ হাজার টাকার উপর।

সে যা হোক, অরবিন্দ অস্ত্রের পরিবর্তে এবার হাতে বই-কলম তুলে নিলেন। ভর্তি হলেন বিরিশিরি পিএস নল উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে।

১৯৭৩ সালে মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর তিনি কিছুদিন কাদেরিয়া বাহিনীতে ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিরিশিরিতে সাইকেল ও মোটরসাইকেল মেকানিক হিসেবে কর্মরত।

অরবিন্দ মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৩ সালে সিঁদেল চোর তার গৃহে সিঁদ কেটে অন্যান্য মালামালের সঙ্গে উক্ত সনদপত্রটিও নিয়ে যায়।

মি. ধীরেন্দ্র রিছিল

মি. ধীরেন্দ্র রিছিল নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার ১ নং কুল্লাপাড়া ইউনিয়নের একজন গারো মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার।

তিনি দুর্গাপুর থানার বামনপাড়া গ্রামের মি. গোপাল চিছামের পুত্র। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ শুরু হলো।

শুরু হলো পূর্ব পাকিস্তানে ধর-পাকড়, হত্যা-নির্যাতন, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ। দশম শ্রেণীর ছাত্র ১৮ বছর বয়স্ক তরুণ ধীরেন্দ্র তখন প্রাণভয়ে অনন্যোপায় হয়ে সপরিবারে ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের বিজয়পুর সীমান্ত ফাড়ি দিয়ে প্রবেশ করে ভারতের মেঘালয় প্রদেশের বাঘমারা সীমান্ত ফাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

তিনি ১০ মে বাঘমারা ইয়ুথ ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লিপিবদ্ধ করেন। অতঃপর পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভুটানে ১ মাস যাবত এসএমজি, এসএলআর, এলএমজি, স্টেনগান, ২ ও ৩ ইঞ্চি মর্টার এং গ্রেনেড নিক্ষেপের উপর ট্রেনিং নেন।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ভুটান হলো গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দ্বিতীয় রাষ্ট্র। টেনিং সমাপ্তির পর ধীরেন্দ্র ১১ নং সেক্টরে সরাসরি যুদ্ধ করেন।

তার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল আবু তাহের। তাদের কোম্পানির নাম ছিল ডালডা কোম্পানি। এর কমান্ডার ছিলেন চুনু মিয়া। অপারেশন এরিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল ধোবাউড়া থানার গোয়াতলা, চারুয়াপাড়া ও কলসিন্দুর এবং দুর্গাপুর থানার জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে বিজয়পুর, টাংগাটি ও বিরিশিরি এবং পূর্বে কলমাকান্দা থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত।

ধীরেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনীতে এস এফ প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন। তার কমান্ডে ছিল ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা।

ধীরেন্দ্র জুন মাসের ৭ অথবা ৮ তারিখে (সঠিক তারিখ স্মরণ করতে পারলেন না) টাংগাটিতে (দুর্গাপুর থানা) মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। সেদিন ভোরবেলা ১২০ জন সহযোদ্ধাকে নিয়ে পাক সৈন্যদের ক্যাম্প আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নেন।

বিএসএফ তাদেরকে পেছন থেকে সহযোগিতা করতে থাকে। কিন্তু আক্রমণের নক্সা জেনে ফেলায় মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করার পূর্বেই পাক বাহিনী অতর্কিতে গুলি শুরু করে।

এমতাবস্থায় তারাও পাল্টা গুলি চালায়। উক্ত সম্মুখ যুদ্ধে পাক বাহিনীর ১ জন নিহত ও ৩ জন আহত হয়। পক্ষান্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে ১ জন শহীদ ও ১ জন ইপিআর পায়ে গুলি লেগে আহত হন।

মি. ধীরেন্দ্র ১২টি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। সবকটিতেই তিনি সাফল্য অর্জন করেন। যুদ্ধকালে তিনি নিজে আহত না হলেও তার অনেক সহযোদ্ধা হতাহত হন।

নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে (ধীরেন্দ্র রিছিল সঠিক তারিখ স্মরণ করতে পারেন নি) ধোবাউড়া উপজেলার রংশিনপুরের যুদ্ধে ২ জন শহীদ হন ও সুরেশ মৃ নামে একজন আহত হন। শহীদ ২ জনের নাম।

তিনি স্মরণ করতে পারেন নি। তাছাড়া টাংগাটিতে জুন মাসের ৭ অথবা ৮ তারিখের যুদ্ধে টাংগাইল জেলার বাবুল নামে একজন শহীদ হন।

তাদের লাশ মেঘালয়ের নেলুয়াগিরি শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। অতঃপর লাশ দাফনের জনা বাংলাদেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন।

চিকিৎসার জন্য তারা আহতদের নেলুয়াগিরি ইয়ুথ ক্যাম্পে নিয়ে যান। পক্ষান্তরে, তারা শত্রু সৈন্যদের কমপক্ষে ৩০ থেকে ৩৫ জনকে নিহত ও ২৫ জনকে আহত করেন।

তারা শত্রুদের লাশ হস্তগত করতে পারেন নি। কেননা, শত্রুরা তাদের মৃত সৈন্যদের লাশগুলো হেলিকপ্টার ও ৩টি মহিষের গাড়িতে বহন করে নিয়ে যায়।

তবে মুক্তিযোদ্ধাগণ সেদিন শত্রুদের ফেলে যাওয়া ৩টি চাইনিজ রাইফেল ও ২টি স্টেনগান পান এবং নেলুয়াগিরি ক্যাম্পে তা জমা দেন।

১৬ ডিসেম্বর দেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর ধীরেন্দ্র রিছিল ফিরে এসে তার বাড়িঘর, ভূ-সম্পত্তি, ক্ষেতের ফসল, ও গৃহপালিত জন্তু যথাযথভাবে ফিরে পান নি।

পাক বাহিনী কর্তৃক তার ঘরবাড়ি, ক্ষেতের ফসল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং গরু লুণ্ঠিত হয়। ক্ষতির পরিমাণ এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকার মত।

ধীরেন্দ্র রিছিল স্বাধীনতার পর অস্ত্র জমা দিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে যান। স্কুলে ১০ম শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং ১৯৭৩ সালে মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

বর্তমানে তিনি কৃষি পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সনদ পেলেও সেটি হারিয়ে গেছে।

তার মতে, যেখানে গোটা উপজাতীয়রাই বঞ্চিত সেখানে গুটিকয়েক উপজাতীয় মুক্তিযোদ্ধার যথাযথ মূল্যায়নের প্রশ্ন অবান্তর।

তিনি মনে করেন উপজাতীয় নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছার মাধ্যমে উপজাতীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ হতে পারে।

রেনুকা মি

আনুমানিক ১৯২৬ সালে গারো পাহাড়ের কোলে নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দায় জন্মগ্রহণ করেন রেনুকা মি। বাবা শিবরাম ঘাঘরা, মা দিনামনি ম্রি।

পারিবারিক অসচ্ছলতাহেতু প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না হলেও শিক্ষিত হয়েছিলেন কমিউনিস্ট শিক্ষায়। তাঁদের পরিবারের কেউ মিশনারিতে না যাওয়ায় এ নিয়ে মাঝে-মধ্যে বিবাদ হতো।

এতে দমে না গিয়ে রেনুকা বরং দিগুণ উৎসাহবোধ করেন কমিউনিস্ট শিক্ষার প্রতি। এক্ষেত্রে তার সঙ্গী হলেন। লতিকা এন মারাক। স্টাডি সার্কেলগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ ও লতিকা এন মারাকের অনুপ্রেরণায় রেনুকা ম্রি হয়ে ওঠেন কমিউনিস্ট আদর্শে উজ্জীবিত এক পূর্ণাঙ্গ মানুষ।

জড়িয়ে যান ইতিহাসখ্যাত টংক আন্দোলনে। যদিও তখন তিনি ১৩ বছরের বালিকা মাত্র। এরপর আসে ১৯৭১ সাল। মার্চ মাসের শেষের দিকে একটি দল নিয়ে তিনি চলে যান ভারতের বাঘমারা ক্যাম্পে।

সেখানে গিয়ে তিনি পার্টির নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, থাকা-খাওয়া ও সংগঠিত করে মিটিং করার দায়িত্ব পালন করেন।

এ ছাড়াও শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিভিন্ন প্রচারপত্র বিলিসহ সার্বিক দায়িত্ব পালনে অনন্য ভূমিকা রেখেছেন রেনুকা ম্রি।

সন্ধ্যা ম্রি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশিষ্ট অবদানে ভাস্বর আরেক আদিবাসী গারো নারীর নাম সন্ধ্যা ম্রি।

১৯৫৫ সালে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার জানজালিয়া গ্রামে তার জন্ম। পিতা জামিল চ্যাম্বুগম, মা রিনমী ম্রি।

পিতামাতার একমাত্র সন্তান সন্ধ্যা মিশন স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ভর্তি হন জলছত্র জুনিয়র হাইস্কুলে।

এই স্কুলেই অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন সন্ধ্যা ম্রি। এরপর ভর্তি হন হালুয়াঘাট মিশন হাসপাতালের নার্সিং বিভাগে। ১৯৭১ সালে তিনি এই বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।

দেশের উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার সন্ধানে চলে যান পশ্চিমের বারোমারী মিশনে।

রাজাকারদের উৎপাত সহ্য করতে না পেরে দুই সপ্তাহ পরে এপ্রিলের সাত তারিখে ৫ হাজার মানুষের একটি বিশাল দলের সাথে তিনি চলে যান ভারতীয় সীমান্তে। সেখানে আশ্রয় নেন এক দরিদ্র মাসির কাছে।

এভাবে কেটে যায় দীর্ঘ দেড় মাস। এ সময় তাঁর যোগাযোগ ঘটে মাহেন্দ্রগঞ্জ থানার প্রেমাংকর রায়, ক্যাপ্টেন আব্দুল মান্নান, জয় রামকুমার, ডা. পিযুষ কান্তি রায় প্রমুখের সাথে।

তাদের আহ্বানে সন্ধ্যা যোগ দেন ১১ নং সেক্টরের একটি ফিল্ড হাসপাতালে। সেখানে দুই মাস দায়িত্ব পালন করে নভেম্বরের শেষে তিনি মেডিক্যাল টিম ও মুক্তিবাহিনীসহ ১ হাজার লোকের সাথে স্থানান্তরিত হন জামালপুরে।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পাশাপাশি তিনি সে সময় কয়েকটি অপারেশনেও অংশগ্রহণ করেন। এরপর দলের সাথে শেরপুরে এসে অবস্থান করেন ২৯ দিন।

দেশ স্বাধীন হলে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন সন্ধ্যা ম্রি। ১৯৭১ সালেই বিয়ে করেছেন চার্চিল কুবীকে। ২ ছেলে ১ মেয়ের মা সন্ধ্যা বিয়ের ১০ বছরের মাথায় স্বামী হারান।

উর্মিলা জ্যাম্বেল

১৯৪৯ সালের ১৫ মার্চ নেত্রকোনা জেলার পূর্ব নলছাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন উর্মিলা জ্যাম্বেল।

মা সরোজিনী জ্যাম্বেল, বাবা অশ্বিনী নকরেক। মেয়ের পড়াশোনার প্রতি কৃষক বাবার অপরিসীম অনুপ্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় উর্মিলা নলছাপড়া মিশন স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ভর্তি হন বিরিশিরি গার্লস স্কুলে।

সেখানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করে তিনি ভর্তি হন ময়মনসিংহ হলিফ্যামিলি স্কুলে। এখান থেকেই ১৯৬৬ সালে এস.এস.সি পাস করেন উর্মিলা।

এরপর ১৯৬৯ সালে মমিনুন্নেসা গার্লস কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাস করে একই কলেজে ডিগ্রিতে ভর্তি হন।

১৯৭১ সালে তিনি যখন ডিগ্রি পরীক্ষার্থী তখন শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম। দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেলে নিরাপত্তার আশায় তিনি অন্যদের সাথে ভারতের বাঘমারা ক্যাম্পে আশ্রয় নেন।

সেখানে গিয়ে আরো ৫ জন সহপাঠীর সাক্ষাৎ পান ঊর্মিলা। দায়িত্ব নেন শরণার্থীদের নাম লিস্ট করার।

এরপর বিপ্লবী নারী লতিকা এন মারাকের হাত ধরে নামেন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রচারপত্র ও পত্রিকা বিলির কাজে।

খাবারের মতোই খবরের জন্যে অপেক্ষা করতেন তারা। তাই এ কাজে ঝুঁকি থাকলেও উৎসাহ পেতেন উর্মিলা জ্যাম্বেল।

পাশাপাশি বিভিন্ন মিছিল-মিটিং ও অন্যানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতেন তিনি।

চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হওয়ার পর দেশে ফিরে এসে অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন উর্মিলা। ১৯৭২ সালে ডিগ্রি পাস করে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন একটি স্থানীয় হাইস্কুলে। স্বামী প্রলয় জ্যাম্বেল এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। দাম্পত্য জীবনে তারা দুই ছেলে এবং দুই মেয়ের বাবা-মা।

মি. স্তেফান নকরেক

নেত্রকোণা জেলাস্থ কলমাকান্দা উপজেলার কাউবাড়ি গ্রামের প্রতিশ্রুতিশীল গারো যুবক মি. স্তেফান নকরেক। পিতা মি. চোপে রিছিল।

১৯৭১ সালের স্বাধানতাযুদ্ধের শুরুতে তিনি ঢাকাস্থ নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

কিন্তু সে সময় যার বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর, যার মানসপটে মাতৃভূমির উপর বর্বর বাহিনীর পৈশাচিক আক্রমণের ছবি ফুটে ওঠে, তিনি তো উচ্চতর শ্রেণীতে উত্তরণের পরীক্ষাকে বড় মনে করতে।

তাই তো তিনি সেদিন মাতৃভূমি রক্ষার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে করেছিলেন। হাতে অস্ত্র ধরেছিলেন কলম ত্যাগ করে।

মি. স্তেফান ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে বাংলা লেংগুরা সীমান্ত ফাঁড়ির নিকট দিয়ে মেঘালয়ের রংরা নামক স্থানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

তিনি লক্ষ্য করেন যে, পাকিস্তান সরকার উপজাতীয় সমাজের উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি।

স্বাধীন দেশেও তারা যেন পবাধীন। তাই প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জনের জনা তাদের গ্রামের খালেক এমপি ও তারা মিয়াসহ ৩৫ জন একত্রে ভারতে চলে যান।

অতঃপর আগস্ট মাসের ১৫ বা ১৬ তারিখে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং ১ মাস যাবত তুরার রংনারাগ ট্রেনিং সেন্টারে রাইফেল, এসএলআর, মর্টার এবং গেরিলা পদ্ধতির যাবতীয় বিষয়ে ট্রেনিং গ্রহণ করেন।

তারপর বাংলাদেশে ১১ নং সেক্টরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন কর্নেল আবু তাহের।

মি. স্তেফেন নকরেক প্রথমে হাফিজ কোম্পানিতে কোম্পানি কমান্ডার হাফিজের নেতৃত্বে কাজ করেন। পরবর্তীকালে পৃথ্বিরাজ কোম্পানিতে যোগদান করেন।

তার অপারেশন এরিয়া ছিল নাজিরপুর, কলমাকান্দা ও নেত্রকোনা। মি. স্তেফান নকরেক মুক্তিবাহিনীতে প্লাটুন কমান্ডার হিসেবে ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে ছিলেন। তন্মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন আদিবাসী সন্তান।

তিনি ২৫ থেকে ৩০টি অপারেশনে অংশগ্রহণপূর্বক অধিকাংশ অপারেশনে জয়লাভ করেন। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি কোন একদিন তিনি জীবনের প্রথম অপারেশনে অংশগ্রহণ করে।

সেদিনকার অপারেশন স্পট ছিল নাজিরপুর পাক বাহিনীর ক্যাম্প। ভোর ৪:৪৩ মিনিটে তাদের ৩টি কোম্পানি ও ইপিআর দল পাক বাহিনীকে লক্ষ করে গুলি ছুড়তে থাকে।

বিএসএফ তাদের কভারিং দিতে থাকে। শত্রু বাহিনীও পাল্টা গুলি ছুড়তে থাকে। পরে তারা পালিয়ে যান। এ অপারেশনে শত্রুপক্ষের অনেকে হতাহত হয়েছিল। উল্লেখ করার মত যে দু’টি অপারেশনে তিনি অংশগ্রহণ করেন, তা হলো নাজিরপুর ও কলমাকান্দা।

প্রথমটি অক্টোবর এবং দ্বিতীয়টি নভেম্বর মাসে। তবে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ বিধায় তার পক্ষে হতাহতের সঠিক সংবাদ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় নি।

যুদ্ধের সময় তার পরিবারের অন্য সব সদস্য দেশে অবস্থান করেছিলেন। তবে তার ভাগ্নে ফিলিক্স নকরেক মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার বিষয় সম্পত্তির কোন ক্ষয়ক্ষতি হয় নি।

যুদ্ধ চলাকালে তার কেবলি মনে হতো যুদ্ধ কতদিন দীর্ঘায়িত হবে এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের শাসনতন্ত্রের ধরন কেমন হবে।

যুদ্ধ সমাপ্তির পর মি. নকরেক কলেজে ফিরে যান এবং ১৯৭৩ সালে মধুপুর পীরগাছা সেন্ট পল হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।

১৯৮৫ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেয়েছেন। তবে তার মতে, উপজাতীয় মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয় নি।

মি. ভদ্র মারাক (মং)

নিয়মনিষ্ঠার সঙ্গেই রাংরাপাড়া গ্রামের গারো আদিবাসী মি. রজিন্দ্র ঘাগ্রার পুত্র মি. ভদ্র মারাক (মং) লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তখন ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র।

ইতিমধ্যে ১৯৭১ সালের মার্চে দেশে শুরু হয় পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর নির্বিচারে হত্যালীলা।

সতের বছরের দামাল ছেলে বিদ্যালয়ে যে কঠোর শৃঙ্খলা অর্জন করেছিলেন, সে শৃঙ্খলা রূপায়িত হয় মুক্তিযুদ্ধের সুশৃঙ্খল এক গেরিলার ভেতরে। মি. ভদ্র মারাক হলেন গেরিলা যোদ্ধা।

পাক বাহিনীর অভিযান হালুয়াঘাটে সম্প্রসারিত হয়। অনন্যোপায় হয়ে এপ্রিল মাসের ১০ তারিখে তিনি চারুয়াপাড়া সীমান্ত ফাঁড়ির নিকট দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নেলুয়াগিরি নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।

সেখানে তিনি দেখতে পান তারই মতো যুবকেরা দলে দলে মুক্তিবাহিনীতে যাচ্ছে। কিন্তু তার মা-বাবা সম্ভাব্য মৃত্যুর ভয়ে তাকে যুদ্ধে যেতে দেবেন না, কিন্তু তা কি হয়?

শত্রুমুক্ত করার জন্য মাতৃভূমি তাকে ডাকছে। সুতরাং যা করার তা-ই করলেন। বাঘমারা শরণার্থী শিবিরে অবস্থানের সময় মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনের অজ্ঞাতে সম্ভবত ১৫ অথবা ১৬ জুলাই বাঘমারা মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পে যোগদান করেন এবং তুরা (রংনাবাগ) ট্রেনিং সেন্টারে ২৫ দিন এবং অন্যত্র জঙ্গল ট্রেনিং-এ ৫ দিন মোট ৩০ দিন ট্রেনিং গ্রহণ করেন।

প্লেনিং, রেকি, রেইড, এ্যাম্বুশ, সেন্ট্রি সাইলেন্স, ক্যারাত, কেমোফ্লেজ ইত্যাদি বিষয়ে এবং রাইফেল, এসএলআর, এসএমজি, এলএমজি, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ, মাইন স্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন।

ট্রেনিং সমাপ্তির পর তিনি ১১ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেন। তার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল আবু তাহের। তার কোম্পানির নাম ছিল ০১ কোম্পানি।

মোঃ ফজলুর রহমান আকনজী ছিলেন ভক্ত কোম্পানির কমান্ডার । ০১ কোম্পানির অপারেশন এরিয়া ছিল বর্তমান দুর্গাপুর থানার সদর এলাকা।

মি, মারাক মুক্তি বাহিনীর স্থলবাহিনীতে সেকশন ভার হিসেবে ৯ জন গারো ও ২ জন হাজং উপজাতীয় নিয়ে মোট ১১ জন মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে ছিলেন।

বাদামবাড়ি ও ফারাংপাড়া পাক সেনাঘাঁটি অপারেশনই ছিল তার যুদ্ধ জীবনের প্রথম অপারেশন। সেদিন ছিল সম্ভবত ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১।

অপারেশনে বাদামবাড়ি পাক সেনাঘাঁটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। মি. মারাক শতাধিক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ৮০ ভাগ অপারেশনে তারা জয়লাভ করেন।

তারা নিজেরা অক্ষত থাকেন। তবে মুক্তিযুদ্ধগামী মি. সুধীর সরকার নামে শম্বুগঞ্জের এক যুবক গুরুতরভাবে আহত হন।

১৯৭১-এর ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তায় যখন তারা বিরিশিরি পাক সেনাঘাটি আক্রমণ পরিচালনা করেন, তখন উক্ত যুবক বিরিশিরির দক্ষিণে কৃষ্ণেরচর গ্রামে পাক সেনাদের গুলিতে আহত হন।

যুবকটি ট্রেনিংয়ের জন্য পালিয়ে ভারতে যাচ্ছিলেন। মি. মারাক সুধীর বাবুকে ভারতীয় সেনাদের গাড়িতে বাঘমারা হাসপাতালে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মি. ভদ্র মারাকের পরিবার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা আশ্রয় শিবিরে অবস্থান করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সপরিবারে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন।

ভূ-সম্পত্তি যথাযথভাবে ফিরে পেলেও ঘর-বাড়ি ও অস্থাবর সম্পত্তি যথাযথভাবে ফিরে পান নি। তাঁবেদার বাহিনী কৃত ক্ষয়ক্ষতির মূল্য দু’লক্ষাধিক টাকা। দেশ স্বাধীন হলে তিনি পুনরায় লেখাপড়া শুরু করেন।

তিনি এসএসসি পাস করার পর সি-ইন-এড, এমএসটি, এসএফএফ (জিএল-৬) সম্পন্ন করেন এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পেশা বেছে নেন।

প্লাটুন কমান্ডার বীরেন্দ্র সাংমা

বীরেন্দ্র সাংমা আদিবাসী গারো সমাজের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে তিনি স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। তার মায়ের বাড়ি ছিল শেরপুর-ঝিনাইগাতী এলাকায় মরিয়মনগরে।

২৫ মার্চের পর ঝিনাইগাতী এলাকায় নিরাপত্তার অভাবে ১ এপ্রিল তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেচেংপাড়া শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন।

শরণার্থী শিবিরে ঝিনাইগাতী এলাকার অনেক ছাত্র-যুবক ছিল। তিনি এসমস্ত ছাত্র-যুবককে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করেন।

প্রায় ৪০/৫০ জন গারো ছাত্র-যুবককে সঙ্গে নিয়ে ৫ এপ্রিল তিনি আদুগীরি ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের জন্য নাম তালিকাভুক্ত করেন।

সেখান থেকে একসপ্তাহ পর রংনাবাগ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রায় ২ মাস প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে জুন/জুলাই মাসে গেরিলা পদ্ধতিতে হালুয়াঘাট এলাকায় যুদ্ধ শুরু করেন।

তার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন নাজমুল হক। তিনি নিজেই ছিলেন একজন প্লাটুন কমান্ডার। তার অধীনে ৪টি সেকশনে কমান্ডার ছিলেন যথাক্রমে আলবার্ট মং, শহীদ পরিমল দ্রং, রবার্ট ম্রং ও রজেন চিরান।

৪টি সেকশনে মোট ৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল। প্রথম দিকে তাদের ক্যাম্প ছিল সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের পাচ্ছবয়া সীমান্ত এলাকায়।

গেরিলা পদ্ধতিতে হঠাৎ আক্রমণ করে চলে যেতেন। যে কোন অপারেশনের পূর্বে রেকী করা হতো। একদিন রেকী করার সময় পাকসেনাদের হাতে ধরা পড়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

জুলাই মাসে তারা ঝিনাইগাতীর মধ্যকাটাখালী ব্রীজ ধ্বংস করার জন্য প্রায় ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে পাকসৈন্যদের আক্রমণ করেন।

যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক শহীদ হন। পরবর্তী সময়ে কোম্পানি কমান্ডারের দায়িত্ব নেন উইলিয়াম মং।

বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতের শরণার্থী শিবিরেই তিনি প্রেমলা ফ্রং-এর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর আর যুদ্ধ করেন নি।

তিনি কোম্পানি কমান্ডার উইলিয়াম ম্রং-এর নিকট অস্ত্র জমা দিয়ে দেন। স্বাধীনের পর বিয়ের সূত্র ধরে স্ত্রীর সঙ্গে তিনি ভারত থেকে স্ত্রীর বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকা এলাকার মল্লিক বাড়িতে চলে আসেন।

বিরেন্দ্র সাংমা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৭ সালের ১ নভেম্বর। তার মাতার নাম মৃত রিগগা, পিতার নাম মৃত সুরেন্দ্র মারাক। তার মাতৃনিবাস ছিল শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতীর মরিয়ম নগরে।

মাতৃতান্ত্রিক গারো নিয়মানুযায়ী। তিনি বিয়ের পর স্ত্রীর বাড়িতে চলে আসেন। বর্তমানে তার স্থায়ী নিবাস ময়মনসিংহ জেলার ভালুকা উপজেলার মল্লিক বাড়ি গ্রামে।

তিনি তিন পুত্র এবং দুই কন্যা সন্তানের জনক। ছেলেমেয়েদের সবার বিয়ে হয়েছে। তারা সবাই চাকরিজীবী। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে প্লাটুন কমান্ডার বীরেন্দ্র সাংমার নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

মি. যতীন্দ্র সাংমা-২

গারো মুক্তিযোদ্ধা যতীন্দ্র সাংমা নেত্রকোনা জেলাধীন দুর্গাপুর উপজেলার গোহালিদাও গ্রামের স্বর্গীয় নরেন্দ্র রেমার পুত্র।

তিনি নবম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া শেষ করে কৃষিকাজে নিয়োজিত হন। কৃষিকাজের সাথে সাথে তিনি ধান ও চালের ব্যবসা শুরু করেন।

কিন্তু ইতোমধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে যায়। ২৫ মার্চ পাক সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালির উপর সশস্ত্র বাহিনী লেলিয়ে দেয়।

তার আগেই ২৩ মার্চ তিনি সপরিবারে বাংলাদেশের বিজয়পুর সীমান্ত ফাঁড়ি অতিক্রম করে ভারতের বাঘমারা উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নেন।

আশ্রয় শিবিরে অবস্থানরত উপজাতীয় ও অ-উপজাতীয় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে তিনি একদিন আলোচনায় বসেন। দেশে ফেরত আসার সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা চলছিল।

এর মধ্যে নেত্রকোনায় তারা মিয়া এম.পি. অ্যাডভোকেট সাদির উদ্দিন, নজমুল হুদা এম.পি. প্রমুখ নেতৃবৃন্দ অকুস্থলে আগমনপূর্বক তাদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের গোয়েন্দা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।

তখন মি. যতীন্দ্র সাংমা উক্ত প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণপূর্বক ১২ মে ৫০ থেকে ৬০ জনের সঙ্গে একত্রে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।

শুরু হলো তার মুক্তিযোদ্ধা জীবন। তিনি ভুটানে ২১ দিনের একটি ট্রেনিং গ্রহণ করেন। অতঃপর তাকে তুরায় ১১ দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হয়।

ভুটানে ট্রেনিংএর পরই তাদের অস্ত্র সরবরাহ করা হয়। তিনি ৩০৩ রাইফেল, এসএলআর, এসএমজি, এলএমজি, গ্রেনেড, মাইন, ২ ইঞ্চি মর্টার প্রভৃতির ব্যবহার শিক্ষা লাভ করেন।

অতঃপর তাকে ১১ নং সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সে সময় কর্নেল আবু তাহের ছিলেন উক্ত সেক্টরের অধিনায়ক। পরে অধিনায়কের দায়িত্ব পান উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ।

এ সেক্টরের ডেল্টা কোম্পানিতে মি. সাংমা যুদ্ধ করেন। কমান্ডার ছিলেন মি. স্নিগ্ধেন্দু বাউল। তার অপারেশন এরিয়া ব্যাপৃত ছিল ধোবাউড়া, জিকুয়া, ফুলপুর, পূর্বধলা, দুর্গাপুর, কলসিন্দুর, পুরাকান্দুলিয়া ও গোয়াতলা।

মি. সাংমা মুক্তিবাহিনীতে প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন। প্লাটুন কমান্ডার সত্যেন্দ্র হাজং-এর নেতৃত্ব একপর্যায়ে যখন কেউ মানতে চাইলেন না, তখন তাকে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। তার অধীনে ৩৯ জন। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তন্মধ্যে ২২ থেকে ২৩ জনই উপজাতীয়।

তিনি মূলত  গোয়েন্দা বিভাগের লোক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ বাঙালিদের উপর যাতে নির্যাতন না করেন এ বিষয়ে ভারতীয় ক্যাপ্টেন মুরারীর নিকট তাকে রিপোর্ট করতে হতো।

মি. যতীন্দ্র সাংমা প্রধান প্রধান ৭টি অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে কলসিন্দুর মিরখাতলীতে ১টি, দুর্গাপুরে ৩টি, বিজয়পুরে ১টি, কৃষ্টপুরে ১টি, গোয়াতলায় ১টি এবং ফুলপুরে ১টি । ফুলপুরে তারা সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এগুলোর সব কটিতে তারা জয়লাভ করেন।

তুরায় ট্রেনিং সমাপ্তির পরপরই ১৬ জুন প্লাটুন কমান্ডার আলেকজান্ডার ঘাগ্রা, ইপিআর-এর সুবেদার আদম আলী এবং যতীন্দ্র সাংমা মোট ৩ জন ধোবাউড়ার মাইজপাড়াতে রেকীতে আসেন।

মাইজপাড়ার কোহিনুর কোম্পানির কারখানার মধ্যে পাক বাহিনী ও রাজাকার অবস্থান করতো। রেকী করে যাওয়ার পর এখানে পাক বাহিনীর উপর বারবার আঘাত হানা হয়। ফলে এলাকাটি মুক্তিবাহিনীর দখলে চলে আসে।

তবে তিনি ২১ জুন (আনুমানিক) টাংগাটিতে প্রথম অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। রাত ১২টায় তারা পাক বাহিনীর ক্যাম্প ঘিরে ফেলেন।

তাদের পেছনে ইপিআর ও বিএসএফ ছিল। তাদের নিকট অস্ত্র থাকলেও গুলির পরিমাণ ছিল নগণ্য। তাই তারা সকাল ১১টার দিকে শেষ রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে আসেন।

সেদিনকার যুদ্ধে পাক বাহিনীর এক বালুচ নায়েক সুবেদার গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে বিরিশিরি ক্যাম্পে নিয়ে আসার পর মারা যায় বলে তিনি শুনেছেন।

অবশ্য সেদিন যুদ্ধের পর বিকাল ৩টায় তারা যুদ্ধস্থলে এক পুকুর পাড়ে রক্তের ছাপ দেখতে পান।

আগস্ট মাসের ১২ অথবা ১৩ তারিখে তার নেতৃত্বে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা ফুলপুর উপজেলার তারাকান্দা গ্রামে অস্ত্রসহ ১৩ জন রাজাকার ধরেন।

তাদেরকে নিয়ে গিয়ে কোর্ট মাস্টারের নিকট হস্তান্তর করেন। তার অংশ নেওয়া অপারেশনে পাক সেনা হতাহত হয়ে থাকলেও তিনি গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করেছিলেন বিধায় শত্রদলের হতাহতের সঠিক বিবরণ প্রদানে অক্ষমতা প্রকাশ করেছেন।

স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে এসে তিনি ভূ-সম্পত্তি ফিরে পান। কিন্তু বাড়িঘর ও অন্যান্য জিনিসপত্র পান নি।

তার ৪টি ঘর পাক বাহিনী কর্তৃক বিধ্বস্ত হয়েছিল এবং ১৪টি গরু লুণ্ঠিত হয়েছিল, যার বর্তমান বাজার মূল্য ৭০/৮০ হাজার টাকা।

তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধ শেষে পূর্বের পেশায় ফিরে যান। তবে আদিবাসী কালচারাল একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭৭ সালে উক্ত প্রতিষ্ঠানে পিয়ন হিসেবে যোগদান করেন।

তিনি মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৮৫ সালে তার বাড়িতে ডাকাতি সংঘটিত হলে তার বাক্সে রক্ষিত টাকা-পয়সাসহ উক্ত সার্টিফিকেটও ডাকাতরা নিয়ে যায়।

ময়মনসিংহ থেকে পুলিশ সুপার ঘটনা তদন্ত করতে আসেন। কিন্তু তিনি কিছুই ফেরত পান নি। মি. যতীন্দ্র সাংমা বাবা-মায়ের প্রথম পুত্রসন্তান হওয়ায় স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে দেশে ফেলে আসা ঘরবাড়ি নিয়ে তাকে চিন্তা করতে হতো।

তিনি চিন্তা করতেন কীভাবে উক্ত ঘর-বাড়ি আবার ফিরে পাবেন, কখন দেশকে পরাধীনতার শিকল মুক্ত করতে পারবেন।

আইনল সাংমা

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা আইনল সাংমা। বাড়ি নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কমলাবাড়ি।

১৯৭১ সালের তরুণ এ মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে অত্যন্ত দরিদ্র জীবনযাপন করছেন। নিজের কোনো জমি নেই।

শারীরিকভাবে অসুস্থ, চোখে ছানি পড়েছে। তবু জীবনযুদ্ধ থেমে নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আইনলদের বাড়ির পাশে বিজয়পুর ইপিআর (তৎকালীন) ক্যাম্প।

যুদ্ধ শুরু হলে সেখানে প্রায় প্রতিদিন ভারতের সাথে এই ক্যাম্পের গোলাগুলি হতো। এ অবস্থায় তার পরিবারের সবাই ভারতে চলে যায়।

যাবার সময় তেমন কিছুই সাথে নিয়ে যেতে পারে নি। সামান্য কিছু ব্যবহার্য জিনিস সাথে নিতে পেরেছিল। ভারতের বাঘমারা শরণার্থী ক্যাম্পে গিয়ে উঠল।

শরণার্থী শিবিরের কষ্টের কথা সারাজীবনে ভুলতে পারেন নি। ডায়রিয়াসহ নানারকম রোগে প্রতিদিন লোক মারা যায়। এসব আর ভালো লাগছিল না।

সিদ্ধান্ত নিল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিবে। আগস্ট মাসের দিকে নাম দিল। তারা ছিল শেষ ব্যাচ। ভুটানে ট্রেনিং হল এক মাস ধরে। বিভিন্ন অস্ত্রের ট্রেনিং।

রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি, মর্টার, গ্রেনেড ইত্যাদি। ভুটানে ট্রেনিং শেষে তাদের তুরা আনা হল। তুরা ছিল ১৫ দিন। ওখানে অস্ত্র দেয়া হল। তিনি পেলেন ৩০৩ রাইফেল।

তুরা থেকে বাংলাদেশের টাঙ্গাতি এসে ক্যাম্প করল। তাদের কোম্পানিতে অধিকাংশ ছিল গারো, হাজং। অনেক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছে। প্রায় প্রতিদিনই গেরিলা অপারেশনে বের হতো। উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ করেছে রণসিংহপুর এবং ফুল্লাগোরা।

রণসিংহপুর যুদ্ধে তারা মক্কর টিলায় সারারাত এ্যামবুশ করে বসে থাকল। তারা ১৫০ জন যোদ্ধা ছিল। ভোর হয়ে গেছে। তারা চলে আসবে বলে সিদ্ধান্ত নিল।

এরকম সময় জানা গেল পাক আর্মি আসছে। পুনরায় পজিশনে গেল। তারা রেঞ্জের ভেতর আসার পর ফায়ার শুরু করে। তাদের প্রথম আক্রমণে পাক আর্মির বেশকিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।

দীর্ঘসময় ধরে এই যুদ্ধ। চলে। পরে আরো মুক্তিযোদ্ধা ও বিএসএফ এসে তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল।

১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ছিল। মৃত্যুঞ্জয় হাইস্কুলে অস্ত্র জমা দেন। এরপর বাড়ি চলে আসেন। পরবর্তীকালে তেমনভাবে আর ডাকা হয় নি। তিনি সংসারের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

নিজে এবং বউ দুজন মিলে কামলা খাটেনো কোনোরকমে বেঁচে আছেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কেউ কেউ সম্মান করে।

তবে তিনি ওসব সম্মানের তোয়াক্কা করেন না। দেশের জন্য রক্ত দিতে গিয়েছিলেন। কোনো লাভ-ক্ষতির চিন্তা করেন নি। এখনও করেন না।

পুস্পক আরেং

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা পুস্পক আরেং। নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বারইপাড়া গ্রামে ১৯৭১ সালে তিনি পৈতৃক বাড়িতে ছিলেন।

পড়াশোনা করতেন দুর্গাপুর হাইস্কুলে। নবম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

যুদ্ধ শুরু হবার পর কোনো এক শুক্রবার পাক আর্মি বিরিশিরি আসে এবং ক্যাম্প স্থাপন করে। তারা লোকজনকে মারপিট করে এবং কিছু বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ তাদের ভয়ে ছোটাছুটি করতে থাকে।

এর আগে থেকেই এলাকার হিন্দু এবং আদিবাসীরা ভারতে যাওয়া শুরু করে। এ সময় তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। পুস্পকও এ সময় ভারতে চলে যান।

ভারতে গিয়ে কিছুদিন বাঘমারা এক আত্মীয় বাড়িতে থাকল। এরপর গেল শরণার্থী শিবিরে। দুর্গাপুরের সন্তোষ দা (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তোষ) তাদের শরণার্থী শিবিরে নিয়ে যান এবং তাকে মুক্তিযুদ্ধে যাবার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।

তার অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিল। বাঘমারা থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ভুটানে। ওখানে এক মাসের ট্রেনিং হল।

থ্রিনটথ্রি রাইফেল, মার্ক ফোর রাইফেল, এলএমজি, মর্টার, গ্রেনেডসহ বিভিন্ন অস্ত্র ব্যবহারের ট্রেনিং দেয়া হয়। তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক দুই ধরনের ট্রেনিংই দেয়া হয়।

ট্রেনিং শেষ করে তাদের নিয়ে আসা হল ডালুতে। কোম্পানিতে তারা ১৪২ জন ছিল। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন হাবিবুর রহমান। সে ছিল কোয়ার্টার কমান্ডার।

ডালুতে তারা প্রায় ৩ মাস ছিল। এখান থেকে নিয়মিত দেশের ভিতরে অপারেশনে যেত। তাদের কিছু মুক্তিযোদ্ধা বিএসএফ-এর আড়িয়াতলী ক্যাম্পে ছিল।

পাক আর্মি পাঁচ জনকে তুলে নিয়ে যায়। তারা সিদ্ধান্ত নিল তাদের উদ্ধার করবে। ধমনীতলা ক্যাম্পে তাদের রেখেছিল। তারা ধমনীতলা ক্যাম্প আক্রমণ করে।

কয়েকশত মুক্তিযোদ্ধা, সাথে বিএসএফ-এর একটি অংশ। বিকাল ৪টার দিকে যুদ্ধ শুরু হয় এবং পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত থেমে থেমে যুদ্ধ চলে।

অবশেষে তারা ঐ ক্যাম্প দখল করে এবং অপহৃতদের দুজনকে তারা জীবিত উদ্ধার করতে পারে। বাকি তিনজন মারা যায়।

তারা প্রায় প্রতিদিন কোনো-না-কোনো অপারেশনে যেত। গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে তারা পাক আর্মিকে সবসময় ব্যতিব্যস্ত রাখত। দেশের ভেতর থেকে পাক আর্মির সহযোগী রাজাকারদের ধরে আনত।

এসব পরিস্থিতিতে গ্রামবাসী সাধারণ মানুষেরা তাদের ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করত। ১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ছিল। অস্ত্র জমা দিয়ে ওখানে বেশ কিছুদিন থাকল।

পরে ঢাকার মপকোসে মুক্তিযোদ্ধাদের এক সমাবেশ হল। সেখানে বঙ্গবন্ধু বললেন, যে যার জেলায় ফিরে যাও। সে বাড়ি ফিরে এল। ১৯৭২ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন।

তারপর শিমুগঞ্জ মিশনে শিক্ষকতা করেন দীর্ঘদিন। বর্তমানে টিউশনি করে কোনোরকমে চলে।

দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন। দেশ মুক্ত হলে তারা ভালো থাকতে পারবে। দেশ মুক্ত হল বটে, কিন্তু তারা ভালো নেই। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন পূরণ হয় নি।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আলাদাভাবে কেউ তেমন সম্মান করে না। তবে ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চে উপজেলা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা দেয়া হয়।

প্রদীপ কুমার চিসিম

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রদীপ কুমার চিসিম। তার বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার আচকিপাড়া গ্রামে।

১৯৭১ সালে তার বয়স ২০ বছর। ছাত্র ছিলেন মেকানিক্যাল ডিপ্লোমার। ১৯৭১ সালে তিনি ফরিদপুর মিশনারিতে মেকানিক্যাল ডিপ্লোমার ছাত্র ছিলেন।

৮ মার্চ তিনি বড়ো বোনের বাড়ি ঢাকা আসেন। ৯ মার্চ পল্টনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর বক্তৃতা শুনেন।

তিনি সেদিন এক দিকনির্দেশক বক্তৃতা করেন। তার বক্তৃতা শুনে প্রদীপের মনে হয় দেশে বড়ো ধরনের একটা কিছু হতে চলেছে। ১০ মার্চ তিনি ময়মনসিংহ হয়ে হালুয়াঘাট গ্রামের বাড়ি পৌঁছেন।

গ্রামেও তখন দেশের রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। অসহযোগ আন্দোলন, আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের অবস্থা, পাকিস্তান প্রসঙ্গে সব বিষয় নিয়েই আলোচনা চলত।

কিন্তু তখন পর্যন্ত তারা গ্রামের লোকেরা চিন্তা করতে পারে নাই যে দেশে যুদ্ধ হবে এবং তাদের এখনই স্বাধীনতার লড়াই শুরু করতে হবে।

২৬ মার্চের পর থেকে দেখা গেল দলে দলে লোক ভারত চলে যাচ্ছে। হালুয়াঘাট গিয়েও একই দৃশ্য দেখা যায়। বাবাকে পরিস্থিতি বললেন।

তিনি খুব শক্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, এটা ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার মতো একটি ব্যাপার।

তিনি ভারতে যেতে চাইলেন না। বললেন, কিছু হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে। তাকে বললেন এটা ভিন্ন প্রেক্ষাপট। পাক আর্মি বাঙালিদের হত্যা করছে। শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তবু তিনি রাজি হলেন না।

পরিস্থিতি তখন আরো খারাপ হচ্ছে । আশপাশের লোকজন সব ভারত চলে গেছেন এবং তারা প্রায় একা হয়ে পড়ছেন। তখন তিনি মা-সহ পরিবারের এক অংশকে ভারতে যাবার অনুমতি দিলেন।

যাবার সময় গরু এবং মহিষের গাড়িতে এবং তাদের দুটি পাওয়ার টিলার ভুলি ছিল তাতে করে ধান, চাল, গরু, ছাগলসহ যাবতীয় ব্যবহার্য জিনিস সাথে করে নিয়ে গেলেন।

তারা উঠেছিলেন যাত্রাকোনা। ভারতের ভেতরে গ্রাম হলেও এখান থেকে কাছে। ফলে তারা অধিকাংশ জিনিস নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাছাড়া পথেও কোনো বাধার সম্মুখীন হন নি।

যাত্রাকোনা গিয়ে পাহাড়ের ঢালে থাকার জন্য ঘর নির্মাণ করেন। এ সময় কয়েকটা শেল তাদের আশপাশে পড়ল। তারা আরো দূরে সরে গেলেন।

তারা শরণার্থী শিবিরে উঠেননি। পাহাড়ের ঢালে ঘর করে সেখানেই ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে লোক নেয়া হচ্ছে। আদিবাসী ও বাঙালি যুবকরা নাম দিচ্ছে।

তিনিও বন্ধুদের সাথে মুক্তিযুদ্ধে যাবার ব্যাপারে আলোচনা করছেন। এ সময় তার শিক্ষক মতিয়ার রহমানের সাথে দেখা হল।

তিনি ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যাবার ব্যাপারে অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। তাকেও বললেন। তিনি রাজি হয়ে গেলেন।

তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধে যাবার ব্যাপারে তার ব্যক্তিগত একটি কৌতূহল ছিল; অস্ত্র চালনা এবং অস্ত্র সম্পর্কে জানার কৌতূহল। পাক আর্মি মারা বা স্বাধীনতার চাইতে তার মনে তখন অস্ত্রের প্রতি কৌতূহলটাই যুদ্ধে যাবার ব্যাপারে তাকে আগ্রহী করে তুলেছিল।

এরপর ডালুতে গিয়ে নাম লেখালেন। একরাত ডালু ইয়ুথ ক্যাম্পে থাকলেন। পরদিন তাদের নিয়ে গেল তুরা রংনাবাদ। এখানে এক মাসের ট্রেনিং হল।

প্রথমে থ্রিনটথ্রি রাইফেল খোলা-লাগানো শেখানো হল। এরপর এসএলআর, এসএমজি, স্টেনগান, গ্রেনেড, এন্টি পারসোনাল মাইন, এন্টি ট্যাংক মাইন ইত্যাদি আগ্নেয়াস্ত্রের উপর ট্রেনিং দেয়া হল।

এরপর তাকে এক সপ্তাহের একটি বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। এটি ছিল জেএল বা জুনিয়র লিডারশিপ ট্রেনিং। শেখানো হয় নেতৃত্ব। নতুন জায়গা ও নতুন পরিবেশে কীভাবে খাপ খাওয়াতে হবে, জনগণের মধ্যে কীভাবে অবস্থান তৈরি করতে হবে ইত্যাদি।

এ ছাড়া ম্যাপ রিডিং, কম্পাস রিডিং, ট্রপস ম্যানেজমেন্ট এগুলোও ছিল। এরপর আবার এক সপ্তাহের ব্যবহারিক জঙ্গল ট্রেনিং দেয়া হয়।

এটি তুরা থেকে বেশ দূরে গভীর জঙ্গলে নিয়ে এক সপ্তাহের খাবার সাথে দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয় সবকিছু এখানে নিজেকেই করতে হতো।

ট্রেনিং শেষ করে ডালু থেকে পশ্চিমে এক ক্যাম্পে একরাতে ছিলেন। এরপর ডালু আনা হয়। এখানে একরাত থাকার পর সিদ্ধান্ত হয় তারা পাইলের মধুপুর চলে যাবেন।

সেখানে কাদেরিয়া বাহিনীর সাথে যুক্ত হবেন। ২০০ জন সদস্যের এক কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন আব্দুল গফুর।

পুরো কোম্পানিকে আবার ৪টি উপ-কমান্ডে ভাগ করা হয়। তিনি ছিলেন এ রকম একটির কমান্ডার। তাদের কোম্পানিতে ১৫ জন আদিবাসী গারো ছিল।

ডালু ক্যাম্পে অস্ত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে একজনের অস্ত্র থেকে ফায়ার হয়ে যায়। এতে কেউ আহত বা নিহত না হলেও ব্যাপারটি পুরো কোম্পানির মনোবলে আঘাত করে।

আসলে তাদের বাহিনীটি ছিল তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং লেখাপড়া না জানা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষই ছিল বেশি। যুদ্ধ করার জন্য এদের সাহস ছাড়া আর কিছু ছিল না।

এমনকি সকলে ট্রেনিংও ভালোভাবে রপ্ত করে নি। বাংলাদেশে ঢোকার জন্য তাদের দুজন গাইড দেয়া হয়। কংশ নদী পার হয়ে তারা বাংলাদেশে ঢুকবে। পথটি ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

পাকসেনারা এ পথে প্রায়ই এ্যামবুশ করে থাকে। সে কারণে ভারতীয় আর্মি শেল নিক্ষেপ করে পাক সেনাদের ব্যস্ত রাখে; যাতে তারা নিরাপদে পার হতে পারে।

একটা ছোটো কোশা নৌকায় চেপে তারা ৪/৫ জন করে নদী পার হচ্ছিল। ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে, আবার আকাশে চাদও আছে। সকলে নদী পার হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল হঠাৎ সামনে থেকে দেখে সবাই ছুটে পালাচ্ছে তাদের থামাতে সে যা শিখেছিল সব কৌশল প্রয়োগ করল।

কিন্তু কাজ হল না। পরে সে নিজেও ছুটল। দেখে দলের একমাত্র এলএমজির আটটি ম্যাগজিন গামছায় বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে। পরে সব এক জায়গায় হয়ে জানতে চাওয়া হল কী হয়েছে? কিন্তু কোনো সদুত্তর পাওয়া গেল না।

দেখা গেল, তাদের সাতজন নেই। তাদের সন্ধান করার জন্য সবরকম সংকেত ব্যবহার করা হল । কিন্তু কোনো রিপ্লাই পাওয়া গেল না। পরে তারা তিন কমান্ডার বসে সিদ্ধান্ত নিলেন, ফিরে যাব না। অগ্রসর হব।

যদিও দলের এলোমেলো অবস্থা এবং মনোবল অনেক কমে গিয়েছে। বাহিনীতে শৃঙ্খলা এবং মনোবল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেন।

এভাবে তারা কাকরকান্দি পর্যন্ত পৌঁছলেন। এলাকাটা ছিল রাজাকার প্রধান। ফলে রাতে গ্রামে না থেকে তারা গ্রামের পার্শ্ববর্তী এক কাশবনে আশ্রয় নিলেন।

সারাদিন ঐ কাশবনে ঘাপটি মেরে থাকল। সন্ধ্যায় একজনের রাইফেল থেকে অসাবধানে ফায়ার হয়ে গেল। বাহিনীর সকলেই তখন ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, ভাবলেন, জানাজানি যখন হয়ে গেছে তখন কিছু খাবারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা যাক।

পার্শ্ববর্তী এক বাড়িতে গিয়ে দু’কেজির মতো চাল পাওযা গেল। ঐ চাল ভেজে সবাই একমুঠো করে খেয়ে পানি খান। পরে ঐ গ্রামের এক গারো বাড়িতে রাতে খাবারের ব্যবস্থা হল।

তারা রান্না করে কলাপাতায় মুড়ে ভাত-তরকারি পাঠিয়ে দিল। রাতে খেয়ে আবার এগুতে শুরু করলেন। ওভাবে সারারাত পথ চললেন। ভোরের দিকে কোনো গ্রামে শেল্টার নিত এবং সেখানে কারফিউ মতো জারি করে দিত।

গ্রাম থেকে কাউকে বের হতে দিত না। গ্রামে কেউ ঢুকলে তাকেই তারা গ্রাম না-ছাড়া পর্যন্ত আটকে রাখত। এ ব্যবস্থা ছিল নিজেদের নিরাপত্তার জন্য।

তাদের কাছে পর্যাপ্ত যুদ্ধ সরঞ্জাম ছিল না । ফলে, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বার ইচ্ছা তাদের ছিল না। পথে কয়েকটি গ্রামে তারা রাজাকারদের বিরুদ্ধে একশন নিয়েছিল।

নেত্রকোনার কাছাকাছি যাবার পর তিনিসহ ১৪ জন ভারতে ফিরে যান। তারা ফিরে আসার পর বাহিনীর অবশিষ্টরা রাজাকার ও পাক আর্মি দ্বারা আক্রান্ত হয়।

শত্রুরা তাদের শেল্টার তিনদিক দিয়ে ঘেরাও করে। শত্রুর ব্যারিকেড ভেঙে অধিকাংশ বেরিয়ে আসতে পারলেও ধরা পড়েন আরং রিছিল ও পরিমল দ্রং। পরে তাদের হালুয়াঘাটে এনে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

আরং রিছিল ট্রেনিং পিরিয়ডে অসুস্থ ছিল। ফলে সে অস্ত্র ট্রেনিং ঠিকমতো নিতে পারে নি। কোনোরকমে থ্রিনটথ্রি রাইফেল চালনা শিখেছিল।

তাকে সহযোদ্ধারা সাথে নিতে চায়নি। কিন্তু সে ছিল শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং দুর্দান্ত সাহসী। সে জোর করে অন্যদের সাথে চলে আসে।

আবার সে অস্ত্র নিয়েছিল ভারতীয় এসএলআর বা সেমিঅটোমেটিক রাইফেল। এই অস্ত্রটির সমস্যা ছিল একটানা ৫/৭ রাউন্ড গুলি করার পর গ্যাস চেম্বার আটকে যেত।

ফলে বারবার আঙ্গুল দিয়ে পরিষ্কার করতে হতো। আর একবার আটকে গেলে পুনরায় ব্যবহার করা বেশ শক্ত ব্যাপার ছিল। যুদ্ধকালীনে আরং রিছিলের অস্ত্রে কোনো সমস্যা হয়েছিল বলে সে ধরা পড়ে। আবার তার অতি আত্মবিশ্বাস এবং সাহসও একটি কারণ হতে পারে।

অপরদিকে প্রাণ কুমার দ্রং দেশের মধ্যে ঢোকার পর নানাকারণে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কয়েকবার ভারতে ফিরে যেতে চায়। তার সাহস বাড়াবার জন্য অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা তাকে নিয়মিত সেন্ট্রির দায়িত্ব দিত। হতাশা এবং মানসিক দুর্বলতাই তার ধরা পড়ার কারণ।

ঐ যুদ্ধে আরো দুজন মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়েছিল। পাক আর্মি তাদের ছেড়ে দিলে তারা ভারত ফিরে যান। দুদিন পর তারা আবার পালিয়ে চলে আসে।

পরে তাদের দেশ থেকে ধরে নিয়ে ভারতে কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। অনুমান করা হয়েছিল তারা শত্রুর চর হিসেবে কাজ করছে।

তিনি ভারতে ফিরে যাবার পর বাবা-মা সব কথা শুনে বলল, তোমাকে আর যুদ্ধে যেতে হবে না। তাকে পাঠিয়ে দিল বোনের বাড়ি গারো বাজার। কিন্তু সেখানে গিয়ে তার মন টিকল না।

দুদিন পর ক্যাম্পে ফিরে এল। ভারতীয় বাহিনী যখন বাংলাদেশে প্রবেশ করে তখন তিনি তাদের সাথে চলে আসেন । ১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ছিলো। অভূতপূর্ব এক আনন্দ পেয়েছিল সেদিন।

১৬ ডিসেম্বরের পর ময়মনসিংহে কয়েকদিন থেকে বাড়ি চলে আসেন। এরপর আবার ফরিদপুর চলে যান পড়াশোনার জন্য।

স্বাধীনতার পর দেখা গেল যে যে পদে ছিল অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে সেই পদে রয়ে গেছে। যেমন হালুয়াঘাট থানার ওসি হিসেবে আগে যে ছিল পরে সেই রয়ে গেছে।

ঐ একই লোককে দিয়ে ভালো কিছু হতে পারে না। যেখানে একটি ব্যাপক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। সকল সেক্টরে তখন দেশপ্রেমিক লড়াকু মুক্তিযোদ্ধাদের যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ দেয়া উচিত ছিল।

শুধুমাত্র ১ লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাই যদি দেশ চালানোর দায়িত্ব নিত তাহলে দেশের অবস্থা অনেক ভালো থাকত। মুক্তিযোদ্ধাদের ঐ সময় দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে স্থানীয় উন্নয়ন কাজের সাথে যুক্ত করা যেত।

তাহলে একদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান বাড়ত, অন্যদিকে কাজের দক্ষতা থাকত। দেশও অনেক এগিয়ে যেত।

বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রদীপ কুমার চিসিম বলেন- স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব দেশের প্রধানমন্ত্রী হলেন। দেশের অধিকাংশ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়লেও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের তেমন মূল্যায়ন করা হল না।

তাছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হয়নি। তাদের ক্ষমা করা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অপরাধীদের যদি এত বছর পরেও বিচার করা যেতে পারে তাহলে ৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সমস্যা কোথায়? তাদের চিহ্নিত করে আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত।

শেখ মুজিব অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও মানবদরদী মানুষ ছিলেন। আবার তিনি স্বাধীন দেশে সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার সিদ্ধান্তসমূহ যে এক্ষেত্রে ভুল ছিল তা পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মাঝে দীর্ঘকাল পরিচয় দিত না। তবে বর্তমানে অবস্থার কিছু পরিবর্তন হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সমাজে বিশেষ কোনো সম্মান নাই। কিন্তু স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে থাকা উচিত ছিল।

কেন তা হলো না তা আরো ভালো করে বলতে পারবেন দেশের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা।

মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি বিশেষ পাওনা। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক মান-মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে অসুস্থ ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের বাদে অন্যদের ভাতা না দিয়ে স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন কাজের সাথে যুক্ত করা গেলে ভালো হতো।

সকল মুক্তিযোদ্ধার জন্য একই রকম ভরা থাকা উচিত। এক্ষেত্রে আদিবাসী বাঙালি ভেদাভেদ করা উচিত না।

আগস্টিন সাংমা

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আগস্টিন সাংমা। বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ভুবনকুড়া। ১৯৭১ সালে দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন ১৯ বছরের যুবক। বর্তমানে মিশনারি স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত।

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথমদিকে পরিবারের সবাই মিলে ভারতে চলে যান। ২৬ মার্চের পর থেকেই তাদের গ্রামের ওপর দিয়ে অসংখ্য মানুষ দৈনিক ভারতের দিকে যাচ্ছিল। প্রতিদিন নানা ধরনের গুজব এবং আতংক ছড়িয়ে যেত এসব ভারতমুখী পথচলতি মানুষেরা।

এরকম পরিস্থিতিতে মা-বাবা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সামান্য কিছু ব্যবহার্য জিনিস নিয়ে সীমান্তের জাকসো পাড়ায় উঠল। এক আত্মীয় বাড়ি কিছুদিন থাকার পর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিল।

মুক্তিযুদ্ধ হবে, মুক্তিযুদ্ধে লোক নেয়া হবে এটা জানার পর থেকেই আগস্টিন মুক্তিযুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন।

তারা হালুয়াঘাটের অনেক ছেলে একসাথে মুক্তিযুদ্ধে নাম দিল। নাম দেবার পর তাদের ট্রাকে করে নিয়ে গেল তুরা, রংনাবাদ। রংনাবাদ-এর যেখানে তাদের নিয়ে গেল, ওখানে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় শরণার্থী শিবির ছিল।

ঐ এলাকাতেই তাদের ট্রেনিং ক্যাম্প। ট্রেনিং হল একটানা এক মাস ধরে। রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি, হ্যান্ড গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ ইত্যাদির ট্রেনিং হল।

এরপর জঙ্গল ট্রেনিংয়ের জন্য আরো দূরে নিয়ে যাওয়া হয়। এটা ছিল গেরিলা যুদ্ধের ব্যবহারিক ট্রেনিং। বেশ কঠিন ট্রেনিং। নিজেকে রান্না করে খেতে হতো।

কিন্তু বৃষ্টির জন্য তাও পারেনি। প্রচণ্ড জোঁক ছিল ঐ জঙ্গলে। কখন যে গায়ে ধরে যেত বোঝা যেত না। এরপর তুরা এল। এখানে হাতে-কলমে গ্রেনেড নিক্ষেপসহ আরো কিছু গেরিলা যুদ্ধকৌশল শেখানো হল।

এরপর ব্যক্তিগত নামে অস্ত্র ইস্যু হল। তার নামে ইস্যু হল ভারতীয় মার্ক ফোর রাইফেল।

তুরা থেকে তাদের নিয়ে আসল ডালু বারিদাপাড়া। এখানে তারা ক্যাম্প স্থাপন করে। এখান থেকে তারা একটি পাক সেনা ক্যাম্পে আক্রমণ করার সদ্ধান্ত নিল।

কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হকের নেতৃত্বে তারা আক্রমণ করে। গেরিলা আক্রমণ করে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত থাকলেও এখানে তারা সম্মুখ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

এটা ছিল তাদের প্রথম যুদ্ধ। পুরো বাহিনী অনভিজ্ঞ। একসময় পাক আর্মি তাদের তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে। কমান্ডার নাজমুল এদিন দুঃসাহসী ভূমিকা নিয়ে পুরা কোম্পানিকে রক্ষা করেন।

কিন্তু তিনি নিজে পাক আর্মির গুলিতে শহীদ হন। আরো কয়েকজন আহত হন। সাইদ নামে একজন মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হলেও পরে উন্নত চিকিৎসা সেবার কারণে বেঁচে যান।

এরপর তাদের কোম্পানি কমান্ডার-এর দায়িত্ব নেন উইলিয়াম ম্রং। তার নেতৃত্বে তারা অনেক সাহসী সব যোদ্ধা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন স্থানে অবস্থান করতেন। ডালু, যাত্রাকোনা, গাছুয়াপাড়া, ঘমনি, মেনেং ইত্যাদি ক্যাম্পে। এছাড়া দেশের ভেতরে অস্থায়ী ক্যাম্প করে থাকত।

তাদের এরকম একটি ক্যাম্প ছিল। গাছুয়াপাড়া বিএসএফ-এর ক্যাম্পের পাশে, বাংলাদেশের সীমানায়। এ ক্যাম্প থেকে তারা সিদ্ধান্ত নিল- তেলেখালী পাক আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করবে।

তাদের একটি দল এ লক্ষ্যে কমান্ডার উইলিয়াম ম্রং-এর কমান্ডে অগ্রসর হচ্ছিল। মেনেং শরণার্থী শিবির পার হয়েছে। এরকম সময়ে বর্তমান কয়লাডিপোর ওখান থেকে পাক আর্মি তাদের ক্যাম্প আক্রমণ করে।

এ পরিস্থিতিতে তারা বিএসএফ-এর সাথে ওয়ারলেসে যোগাযোগ করল। সিদ্ধান্ত হল- দু’দিক থেকে আক্রমণকারী শত্রুদের পাল্টা আক্রমণ করা হবে।

তারা তখন শত্রুর প্রায় পেছন দিক থেকে অবস্থান নিয়ে নিঃশব্দে পজিশন নিয়েছে। ওদিক থেকে বিএসএফ এবং তাদের ক্যাম্পে অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা মিলে আক্রমণ শুরু করেছে।

তারা পেছন থেকে অতর্কিতে আক্রমণ করে। তাদের এ আকস্মিক আক্রমণে শত্রুসেনারা হতভম্ব হয়ে যায়। তবুও শত্রুরা ৬/৭ ঘণ্টা ধরে লড়াই চালিয়ে পশ্চাদপসরণে বাধ্য হয়।

শত্রুদের সেদিন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। পানিতে ঝাপিয়ে পড়ে প্রাণরক্ষা করেন। এ ছাড়া বাদর কাটাতে তারা আর একটি বড়ো যুদ্ধ করেছিল।

গেরিলা যোদ্ধা ছিল, কোনো বিশ্রাম ছিল না। গুলির শব্দ না শুনলে তার ভাত হজম হতে চাইত না। ১৯৭১ সালে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছিল তারপর এত বৃষ্টি আর কখনও হয় নি।

মানুষজনতো আরাম করে ঘুমাত। কিন্তু তারা গেরিলা যোদ্ধা সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পথ চলত। বিরাট এলাকা চষে বেড়াত। কাদায় হাঁটতে হাঁটতে তাদের পা ক্ষয়ে গিয়েছিল।

একদিন বারোমারি আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করতে যাচ্ছিলেন। বৃষ্টি হচ্ছে আবার আকাশে চাঁদও আছে। সে বছর প্রচুর কাশফুল ছিল।

এরকম রাতে কোনটা কাশফুল আর কোনটা নদী চেনা যায় না। দূর থেকে কাশবন আর নদী একই রকম। তারা চলতে চলতে কাশবন মনে করে বোগাই নদীতে গিয়ে পড়ল।

আকস্মিকভাবে নদীতে পড়ে রাইফেল পানিতে পড়ে গেল। পরদিন সে ফল পানি থেকে তুলে ক্যাম্পে ফিরছিলেন। কিন্তু আগের রাতে ঠিকই বোমারি ক্যাম্পে গিয়ে গুলি চালিয়ে আসে।

তারা দশ/পনেরো মিনিট টানা ফায়ার করে ফিরে আসেন। কিন্তু পাক আর্মি প্রায় তিনঘণ্টা ধরে গুলি চালায়। বা অনেক দূর থেকে তাদের গুলির আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলেন।

সর্বশেষ যুদ্ধ করে তেলেখালী। ভারতীয় আর্মি এবং মুক্তিযোদ্ধারা যৌথভাবে সাঁড়াশি আক্রমণ চালাল। তাদের বাহিনী ক্যাম্পের উত্তরদিকে অবস্থান নেয়।

এটা সবচাইতে ভয়াবহ যুদ্ধ ছিল। এ যুদ্ধে তাদের কোম্পানির সেকেন্ড ইন কমান্ড শওকত আলী নিহত হন। তিনি ছিলেন সদা হাসি-খুশি ছেলে। তার মৃত্যুতে তারা ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন।

ক্যাম্পে সেদিন ভালো খাবারের ব্যবস্থা ছিল। তেলেখালী ক্যাম্প তারা মুক্ত করেছিল অনেক ত্যাগের বিনিময়ে।

যুদ্ধের সময় তাদের একমাত্র স্বপ্ন ছিল দেশ স্বাধীন করা। তারা গারো, হিন্দু, হাজং, মুসলমান একসাথে নেচেছে, খেয়েছে, কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে।

কোনো সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। বিভেদ, হিংসা ছিল না।

সেই সম্প্রীতি তারা ধরে রাখতে পারল না। ভারতীয় আর্মি সরাসরি যুদ্ধে না এলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হতো। তবে সময় বেশি লাগত।

তাদের ভারী অস্ত্র বা উন্নত ট্রেনিং ছিল না। তবু মুক্তিযোদ্ধারা অনেক দুঃসাহসী গেরিলা আক্রমণ করেছে। সামান্য অস্ত্র দিয়ে পাক আর্মির অনেক ক্ষতিসাধন করেছে।

তারা দিনে দিনে আরো অভিজ্ঞ হয়ে উঠছিল। যুদ্ধ করেছিলেন দেশকে মুক্ত করার জন্য। আজ বাঙালিরা দেশের মন্ত্রী, এমপি, বড়ো অফিসার।

বাঙালি না হলেও এদেশের একজন মানুষ হিসেবে গর্ববোধ করেন আগস্টিন সাংমা। আগে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিতে ভয় পেতেন, লজ্জা পেতেন।

বর্তমানে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও ভাতা চালু হবার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান-মর্যাদা একটু বেড়েছে। তিনি মনে করেন যুদ্ধের পর পর মুক্তিযোদ্ধাদের যার যার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।

যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করার খেসারত দিতে হচ্ছে। এখনও তাদের বিচার করা যায়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিছু চাওয়ার নেই। ভালো কিছু দেখলে ভালো লাগে।

স্কুলের শিশুদের সাথে, নিজ সন্তানদের সাথে যুদ্ধের গল্প করেন। তবে দেশে ভালো কিছু হয়নি বলে ঐ সব বীরত্ব গাথার কথাও তাদের পানসে লাগে।

স্বাধীনতার এত বছর পরেও তাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো লেখাপড়া শিখতে পারে না। ইন্টারভিউ ভালো দেয়ার পরেও ঘুষের জন্য চাকরি হয় না। এগুলো তাকে কষ্ট দেয়।

বকুল মারাক

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা বকুল মারাকের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ভুবনকুড়া গ্রামে।

১৯৭১ সালে যুবক বকুল মারাক মুক্তিযুদ্ধ করেন ১১ নং সেক্টরে। কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন প্রথমে নাজমুল হক ও পরে উইলিয়াম ম্রং।

এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে ভারতে চলে যান বকুল মারাক। প্রথমে গিয়ে জাকসোপাড়া আত্মীয় বাড়ি উঠেন। পরে ওখান থেকে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়।

ভারতে আশ্রয় নেয়া সব যুবক-তরুণ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছে। মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে হবে । মাতৃভূমিতে ফিরে এসে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে হবে। হালুয়াঘাটের অনেকের সাথে সেও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিল। তাদের নিয়ে গেল তুরা, রংনাবাদ। এক মাসের অস্ত্র ট্রেনিং হল । রাইফেল, এসএলআর, গ্রেনেড, মর্টার ইত্যাদি অস্ত্রের ট্রেনিং হল।

এরপর আবার সাতদিনের ব্যবহারিক জঙ্গল ট্রেনিং। এরপর আবার তুরা এল। এখানে কী করে গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয় তার ওপর সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং দেয়া হল।

এরপর অস্ত্র দিল। তাকে দেয়া হল মার্ক-ফোর রাইফেল। এরপর তারা সীমান্ত এলাকার যুদ্ধ ক্যাম্পে এল। অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে।

প্রায় প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো অপারেশন থাকত। গেরিলা যোদ্ধা ছিল তাই তাদের কোনো বিশ্রাম ছিল না।

বারিদাপাড়া থাকাকালে তারা একটি পাক সেনার ক্যাম্প আক্রমণ করে। এটা ছিল তাদের কোম্পানির প্রথম অপারেশন। গেরিলা অপারেশন করতে গিয়ে তারা শত্রুদের দ্বারা ঘেরাও হন।

এতে তাদের কমান্ডার নাজমুল হক শহীদ হন। আরো কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। এরপর উইলিয়াম ম্রং তাদের কোম্পানি কমান্ডার হন।

তাঁর নেতৃত্বে অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে উক্ত কোম্পানি। সর্বশেষ যুদ্ধ করে তেলেখালী। ভারতীয় আর্মি এবং মুক্তিযোদ্ধারা মিলিতভাবে আক্রমণ করে।

এই যুদ্ধে তাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড শওকত আলী শহীদ হন। কিন্তু তারা তেলেখালী ক্যাম্প দখল করে। বকুল মারাক ১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ছিল।

শত্রুর আত্মসমর্পণের খবর পেয়ে তারা আনন্দে মেতে উঠেছিল। ময়মনসিংহে অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়ি চলে আসে। মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো একতা ছিল না।

ফলে, এলাকার উন্নয়নে তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারে নি। মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগ এবং সাহসের কথা মানুষ ভুলে গেছে।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সমাজে এখন তেমন সম্মান নেই। এটাই বীর মুক্তিযোদ্ধা বকুলের দুঃখ।

শরচরণ সাংমা

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা শরচরণ সাংমা। তার বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট। ১৯৭১ সালের টগবগে তরুণ এই মুক্তিযোদ্ধা ১১ নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেন।

তার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন নাজমুল হক ও ডইলিয়াম ম্রং। বর্তমানে চোখে ছানি পড়ে অসুস্থ শরচরণ সাংমা অন্যের বোঝা হয়ে বেঁচে আছেন।

২৬ মার্চ দেশে যুদ্ধ শুরু হলে এলাকায় নানারকম গুজব ও আতংক ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া, প্রতিদিন লাইন ধরে অসংখ্য মানুষ তাদের গ্রামের ওপর দিয়ে ভারতে যেত।

তাদের মুখে তারা পাক আর্মির নির্যাতনের কথা শুনত। তাছাড়া, তাদের গ্রামেরও অনেকে ভারতে চলে যায়। এরকম পরিস্থিতিতে তাদের পরিবারের সকলে ভারতে চলে যান এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি।

সামান্য কিছু ব্যবহার্য জিনিস সাথে নিতে পেরেছিল। জাকসো গ্রামের কাছাকাছি একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিল। নানারকম অসুখ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ডায়রিয়ায় অনেকে মারা গেল।

মে মাসের দিকে শরচরণ জানতে পারলেন মুক্তিযুদ্ধ হবে এবং মুক্তিযুদ্ধে লোক নেয়া হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেন। তাদের নিয়ে গেল তুরা রংনাবাদ। এখানে একমাসের অস্ত্র ব্যবহারের ট্রেনিং দেয়া হল।

এরপর সাতদিনের জঙ্গল ট্রেনিং দেয়া হল। এখানে ব্যবহারিকভাবে শেখানো হল কীভাবে গেরিলা যুদ্ধ করতে হবে। আবার তাদের তুরায় অস্ত্র দেয়া হল।

এরপর কোম্পানি কমান্ডার নাজমুল হকের নেতৃত্বে তারা সীমান্তের বারিঙ্গাপাড়ায় ক্যাম্প করল। প্রথম যুদ্ধে নাজমুল হক শহীদ হলেন।

তারা একটি পাক সেনাক্যাম্প আক্রমণ করতে গিয়েছিল। প্রায় ৫ ঘন্টা ধরে যুদ্ধ। হয়। এরপর তারা আরো অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে তাদের কোনো বিশ্রাম ছিল না। প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো অপারেশন থাকত। সর্বশেষ যুদ্ধ করে তেলেখালী। তেলেখালী পাক সেনাদের অনেক বড়ো একটি ক্যাম্প ছিল।

এখান থেকে তারা নানাভাবে তাদের উত্ত্যক্ত করত। ভারতীয় আর্মি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত এক বিশাল বাহিনী মাদক থেকে তেলেখালী ক্যাম্প আক্রমণ করে।

তারা উত্তরদিকে অবস্থান নিয়েছিল। এই যুদ্ধটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও মারাত্মক যুদ্ধ ছিল। এখানে অনেক যোদ্ধা শহীদ হয়। তাদের কোম্পানির সেকেন্ড ইন কমান্ড শওকত আলীও মনে মারা যান।

শেষ পর্যন্ত তারা তেলেখালী ক্যাম্প দখল করে। রচরণ সাংমা ১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ছিলেন। পরে ওখানেই ভারতীয় কমান্ডারের কাছে অস্ত্র জমা দেন।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো বাড়ি এসে নিজ কমান্ডারের কাছে অস্ত্র জমা পেশায় নিয়োজিত হন।

মুক্তিযুদ্ধের পরে দিন যত যেতে থাকে ততই তাদের সম্মান কমতে থাকে ১৯৭৫ সালের পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিত না। বর্তমানে তা মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মান দেবার কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে বলে তিনি মনে করেন।

সুদর্শন চিরান

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা সুদর্শন চিরান। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ভুবনকুড়া তার বাড়ি।

১৯৭১ সালে কিশোর বয়সী এ যোদ্ধা আনুষ্ঠানিক ট্রেনিং না নিয়েও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।

সুদর্শন চিরান ১৯৭১ সালে গ্রামের সবাই যখন ভারতে চলে যায়, তখন পরিবারের সবার সাথে ভারতের জাকসোপাড়া শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। তিনি তখন ছোটো, পরিবারের সাথে শরণার্থী শিবিরে থাকেন।

শিবিরে নানারকম সমস্যা। মুক্তিযুদ্ধে লোক নেয়া হচ্ছে জানতে পেরে তিনিও তাদের সাথে যোগাযোগ করেন। সব সময় তাদের সাথে থাকতেন।

অস্ত্র, গুলি নাড়াচাড়া করতেন। এক সময় তাকে ক্যাম্পে রান্নার দায়িত্ব দেয়া হয়। ক্যাম্পে নিয়মিত যাওয়া-আসা করতেন। মাঝে মাঝে গেরিলাদের সাথে অপারেশনে যেতেন।

আবার তাকে নানারকম খবর আদান-প্রদানের দায়িত্ব দেয়া হতো। সে সব দায়িত্ব পালন করতেন।

ট্রেনিং না থাকার কারণে স্বাধীনতার পর তার নাম তালিকায় আসেনি। এ নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই। দেশ স্বাধীন হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি স্বাধীন দেশের নাগরিক এটাই তার জন্য গর্বের ব্যাপার। যো

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে কোথাও ডাকা হয় না। কিন্তু তিনি নিজে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন।

সুশীল সাংমা

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা সুশীল সাংমা। তার বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার জলছত্র গ্রামে।

১৯৭১ সালে তিনি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। তখন তার বয়স ১৮/১৯ বছর। অনেক দেরিতে স্কুলে গিয়েছিলেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতা ও্র করলেন।

পাক আর্মিরা বাঙালিসহ এই ভূ-খণ্ডের মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করতে লাগল। এপ্রিল মাসে মধুপুরে খসরুর নেতত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। জঙ্গলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। তিনি যোগ দিলেন। সাথে বন্ধু ওয়াল্টার এবং বৃটিশ সাংমা। তাদের রাইফেল দেয়া হল। নিয়মিত ট্রেনিং চলতে লাগল।

তারা এখানে পাক আর্মিকে বাধা দেন। প্রতিরোধ গড়ে তুলেন। কিন্তু সামান্য সঙ্গে আর ট্রেনিং নিয়ে তারা টিকে থাকতে ব্যর্থ হন।

পাক আর্মির পাল্টা আক্রমণে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তারা তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত নেন। ভারতে চলে যাবেন।

কাছে টাকা-পয়সা নেই, তিনজনের টাকা একত্র করে দেখা গেল আট টাকা হয়েছে। তিনি বাড়ি থেকে একটা থলিতে করে ২/৩ কেজি চাল নেন। এরপর একদিন ভোরে পথ চলতে শুরু করলেন।

পথে নানারকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেলেন। পথে তারা সবাইকেই সত্যি কথা বলেছে। বলেছে ভারত যাব এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিব। কেউ সহযোগিতা করেছে, সাহস দিয়েছে। কেউ ভয় দেখিয়েছে।

সন্ধ্যার সময় গিয়ে উঠল শেরপুরের বদরামারী মিশনারিতে। রাতে মিশনে থাকলেন, খেলেন। পরদিন সকালে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে চলে গেলেন।

ভারতে গিয়ে ঘোরাঘুরি করছেন, কিন্তু পরিচিত কাউকে পাচ্ছিলেন না। প্রচুর বাংলাদেশী মানুষ। তারা তিনজন এখানে ওখানে থাকে। কখনও মিশনে কখনও শরণার্থী ক্যাম্পে খায়।

দিমাপাড়াতে গিয়ে হালুয়াঘাটের একজন পরিচিত মানুষকে পান। তিনি তাদের সাথে করে নিয়ে গেলেন। ঐ দিনই গোসল করে আসার সময় মধুপুরের কামরুজ্জামানের সাথে দেখা হল। তাকে সব কথা খুলে বলল।

পরদিন তিনি তাদের গাছুয়াপাড়া হয়ে ডালু নিয়ে গেলেন। ডালুতে ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিল।

মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে যেন মুক্তি পেলেন। টেনশনমুক্ত হলেন। পরদিন দুটি গাড়িতে করে তাদের নিয়ে গেল তুরা। সেখানে ১ মাস ১৩ দিন ধরে ট্রেনিং হল।

রাইফেল, এলএমজি, মর্টার, গ্রেনেডসহ বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্রের ট্রেনিং দেয়া হল। এরপর সাত দিনের জঙ্গল ট্রেনিং।

এখানেই তাদের নামে অস্ত্র ইস্যু হয়। এরপর তারা ডালুতে আসেন। ডালু সীমান্তের কাছাকাছি তারা ক্যাম্প করল। তাদের কোম্পানিতে যোদ্ধা ছিল ১২০ জন।

এখান থেকে তারা প্রথম অপারেশনে যায় শেরপুর জেলার হলুদিয়া। ১৫ জনের একটি গ্রুপ পাঠানো হয়। এই গ্রুপের কমান্ডার ছিলেন গিরেন। হলুদিয়ার একটি পাক আর্মি ক্যাম্পে আক্রমণ করল।

গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই কোনো-না-কোনো অপারেশনে যোগ দিতেন। বিশেষত নানারকম কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পাক আর্মিকে অস্থির রাখতেন।

সর্বশেষ যুদ্ধ করে তেলেখালী। তেলেখালী অনেক বড়ো পাক আর্মি ক্যাম্প ছিল। ভারতীয় আর্মি এবং মুক্তিযোদ্ধারা মিলিতভাবে আক্রমণ করে।

সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত-নিহত হয়। অসংখ্য পাক আর্মি নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত তারা ঐ ক্যাম্প দখল করে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেয়।

১৬ ডিসেম্বর তিনি ময়মনসিংহে ছিলেন । বিজয়ের খবর পাওয়ামাত্র তারা গুলি ফুটিয়ে আনন্দ করল। প্রথমে ক্যাম্প করেছিল ময়মনসিংহ জুট মিলে।

এখানেই মিত্র বাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা দিল। এরপর ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ছিল ৩ মাস। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হল।

বাড়ি এসে আবার স্কুলে ভর্তি হলেন । কিন্তু পড়াশোনা আর ভালো লাগল না। ড্রাইভিং শিখে ড্রাইভার হয়ে গেলেন।

যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার অনেকগুলো কারণ ছিল। কিন্তু যুদ্ধকালীন সবসময় বাবা-মায়ের চিন্তা করতেন। বাবা-মা দেশে ছিলেন। যে দেশ শক্রর দখলে ছিল।

দেশ মুক্ত করে তাঁদের কাছে ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করত। তা ছাড়া, প্রতিটি অপারেশনে এই প্রতিজ্ঞা করে যেত যে পাক আর্মিকে পরাজিত করব।

তাদের দেখাব যে তোমাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নই। বাঙালি নই কিন্তু বাংলাদেশ তার মাতৃভূমি। মাতৃভূমির স্বার্থ তার স্বার্থ।

যুদ্ধের পর কেউ কারো কথা মনে রাখল না। নেতারা সব বড়লোক হল। দেশের জন্য যুদ্ধ করলেও দেশ পরবর্তীকালে তাদের আর মনে রাখে নি।

কোনো কাজে তাদের আর ডাকা হয়নি। যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল তারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। তিনি বর্তমানে ভালো নেই। স্ত্রী মারা গেছে।

ছেলেমেয়েরা দূরে থাকেন। তিনি একা অসুস্থ মানুষ বাড়িতে থাকে। একা একা ভালো থাকা যায় না।

পালখিন সাংমা (পালোয়ান)

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন মুক্তিযোদ্ধা পালখিন সাংমা। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার পূর্বধরাটি গ্রামে তার বাড়ি। সুস্বাস্থ্যের অধিকারী এই মুক্তিযোদ্ধা নিজেকে পালোয়ান নামে পরিচয় দিয়ে থাকেন।

এলাকার লোকেরাও তাঁকে পালোয়ান নামে চেনে। তার শারীরিক শক্তিমত্তা নিয়ে এলাকায় অনেক গল্প চালু আছে।

১৯৭৫ সালের পর কাদেরিয়া বাহিনীতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। পালখিন সাংমা বর্তমানে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মধুপুর এলাকা থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। তিনি ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতে যান। দেশে থেকে যুদ্ধ করেছেন।

কাদের বাহিনীর একজন হয়ে তিনি যুদ্ধ করেন। অনেক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে তাকে ভারতে পাঠানো হয়। ফলে, ১৬ ডিসেম্বর তিনি ভারতে ছিলেন।

ভারতে গিয়ে আনুষ্ঠানিক ট্রেনিং নিতে পারে নি বলে তার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আসে নি। তাতে তার কোনো দুঃখ নেই। দেশের মানুষ তাকে চেনে।

মুক্তিযুদ্ধ করেছি দেশের জন্য। পাকিস্তানিরা তাদের শোষণ-অত্যাচার করত। তাদের হাত থেকে মুক্তি পাবার জন্য যুদ্ধ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এলাকার লোকেরা তাকে সম্মান করে। এটুকুই তার জীবনে বড়ো পাওয়া।

শ্রী চীন সাংমা

আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী চীন সাংমা। তার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ধরাটি গ্রামে। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ৩৮ বছর।

তার বন্ধু ধীরেন একদিন এসে বললেন, দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। তাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা উচিত। এরপর সে, ধীরেন এবং অমল এই তিন বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিল মুক্তিযুদ্ধে যাবে।

কীভাবে যাবে এ ব্যাপারেও বিস্তারিত কথা হল। ভারতে যেতে হবে। ট্রেনিং নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে।

আষাঢ় মাসের ১০ তারিখ সকালে বাগানের ২৫টা কাঁঠাল ১২ টাকায় বিক্রি করল। ঐ ঢাকা নিয়ে বাড়িতে বলল আত্মীয় বাড়ি যাবে। আত্মীয় বাড়ি যাবার কথা বলে সে আর অমল ভারতের দিকে যাত্রা করল।

ধীরেন ঐদিন ভোরে তাদের আগে আর একজনের সাথে ভারতের দিকে যাত্রা করে। পথে নানারকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে চলতে থাকে।

চারাগুরি নামক এক জায়গায় গিয়ে ধীরেনের দেখা পান। ওখানে ধীরেনরা যে বাড়িতে উঠেছিল সে বাড়িতে রাতে থাকলেন।

পরদিন সকালে আবার হাঁটা শুরু করেন। সন্ধ্যার দিকে জামালপুরে এক গ্রামে এক বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। পরদিন কাশিগঞ্জ থেকে তালবাড়ি গিয়ে এক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে উঠলো।

এই বাড়িতে তাদের খুব ভালো আপ্যায়ন করা হল। এখানে বাংলাদেশ থেকে ভারতমুখী আরো কিছু যুবক ছিল। এটি ছিল সীমান্তের কাছাকাছি একটি গ্রাম।

ভারত থেকে কিছু মুক্তিযোদ্ধা এই বাড়িতে আসল। তাদের সাথে কথা বললেন। কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাবে, কী উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিষয়ে তারা জানতে চাহল।

সব সত্যি কথা বলল। উদ্দেশ্য বলল, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। তারা তাদের এই কথায় খুব খুশি হলেন। তারা তাদের সাথে করে নিয়ে গেল।

মা গেল ডালু, বারিঙ্গাপাড়া। এখানেই মুক্তিযুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম লেখালেন। থাকার জন্য তাদেরকে তাঁবু দেয়া হল।

এর মধ্যে তার কিছু আত্মীয়ের সাথে দেখা হল। তারা তিনজন ঐ আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গেল। এসে দেখে তার সাথিরা সবাই ট্রেনিং-এ চলে গেছে।

ফলে তারা তিনজন দুদিন পর রংনাবাদ ট্রেনিং ক্যাম্পে পৌছলেন। এখানে তাদের নতুন করে মেডিক্যাল করা হল।

পরদিন থেকে ট্রেনিং শুরু হয়। যুদ্ধ কৌশল এবং অস্ত্র ব্যবহারের উপর ২৪ দিন ট্রেনিং হল। এরপর ৪ দিনের জঙ্গল ট্রেনিং দেয়া হল।

থ্রিনটথ্রি, মার্ক-থ্রি রাইফেল, এসএলআর, এলএমজি, এসএমজি, গ্রেনেড ইত্যাদি অস্ত্রের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ট্রেনিং হল সেখানে।

ট্রেনিং শেষ করে তারা আবার ডালু ফিরে আসেন। তাদের কোম্পানি কমান্ডার করা হয় আনিসুর রহমান আনিসকে এবং প্লাটুন কমান্ডার কাজী নুরু। তাদের কোম্পানিতে তারা আদিবাসী ছিল ১৭ জন।

তারা প্রথম যুদ্ধ করে কামারপাড়ায়। এখানে তারা আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করে। প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত পাক আর্মি ঐ ক্যাম্প ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। তাদের ক্যাম্প থেকে বেশ কয়েকজন পাকসেনার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।

গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে তিনি অনেক অপারেশনে অংশ নিয়েছেন। দালাল রাজাকার আলবদরদের ধরা, ব্রিজ উড়িয়ে দেয়া, পাক আর্মির ক্যাম্প আক্রমণ ইত্যাদি করেছেন।

অধিকাংশ আক্রমণে তারা সফলতা পান। ১৬ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ছিলেন। এরপর বাড়ি চলে আসেন।

বাড়ি এসে নিজ পেশা কৃষিকাজে নেমে গেলেন।

পরে ধনবাড়ি ক্যাম্পে কিছুদিন ছিলেন। ওখান থেকে তাদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধা সম্মেলনে বললেন, যে যার পেশায় ফিরে যাও।

মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে তার ভালো লাগে, গর্ব হয়। এলাকার লোকেরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান করে। স্বাধীনতার পর এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এলাকার উন্নয়নে কোনো যৌথ উদ্যোগ নিতে পারেনি। তবে ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে তারা তার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply