icon

২০৫০ সালের পৃথিবীতে সফল হওয়ার জন্য ভবিষ্যত প্রজন্মকে কী শিখতে হবে- ইয়ুভাল নোয়া হারারি

Parban Chakma

Last updated Apr 25th, 2020 icon 508

নব চিন্তার কৌশল-ই হবে এই শতাব্দীর জন্য অত্যাবশ্যক দক্ষতা

মানবজাতি অভূতপূর্ব সব বিপ্লবের মুখোমুখি হচ্ছে, আমাদের পুরোন সব গল্পগুলো ধীরে ধীরে কালের স্রোতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের রেখে যাওয়া শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য এখন পর্যন্ত কোন নতুন গল্প উদিত হয়নি।   

তাহলে কীভাবে আমরা নিজেদেরকে এবং আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে এমন অভূতপূর্ব পরিবর্তন এবং আমূল পরিবর্তনের অনিশ্চিত এক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করতে পারি?   

আজকে জন্মগ্রহণকারী একটি শিশুর বয়স ২০৫০ সালে গিয়ে ত্রিশের কোঠায় গিয়ে ঠেকবে। সব কিছু ঠিকঠাক চললে এই শিশুটি ২১০০ সালেও বেঁচে থাকবে, এমনকি বাইশ শতাব্দীতে গিয়েও সে একজন সক্রিয় নাগরিক হিসেবে থাকতে পারে। 

তাহলে আজকের শিশুদেরকে আমাদের কি শেখানো উচিত যা তাদেরকে সামনের ২০৫০ সালের কিংবা বাইশ শতাব্দির পৃথিবীতে টিকে থাকতে এবং আত্মবিকাশ ঘটাতে সহায়তা করবে?  

পেশাগত জীবনের সফলতার জন্য বা চারপাশে কী ঘটছে তা বুঝার জন্য এবং জীবনের গোলকধাঁধাকে সমাধান করার জন্য তাদের কী ধরণের দক্ষতার প্রয়োজন হবে?

দুর্ভাগ্যক্রমে, এটা কেউ জানে না যে ২০৫০ সালে গিয়ে বিশ্ব ব্যবস্থা  কেমন হয়ে দাঁড়াবে – একবিংশ শতাব্দীর কথা নাহয় নাই বা ধরলাম – এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই। অবশ্যই মানুষ কোনদিনই  নির্ভুলভাবে ভবিষ্যৎ কে আন্দাজ করতে পারেনি।

তবে বর্তমানে এটি আগের তুলনায় আরও বেশি জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে কারণ প্রযুক্তি যদি একবার আমাদের দেহ, মস্তিষ্ক এবং মনকে যান্ত্রিক করতে সক্ষম হয় তাহলে আমরা কোনও কিছু সম্পর্কে কখনোই নিশ্চিত হতে পারব না – এমনকি সে বিষয়বস্তুগুলোর ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারবো না যাদেরকে আমরা  আগে থেকে স্থায়ী এবং চিরন্তন বলে মনে করতাম।       

হাজার বছর আগে, আনুমানিক ১০১৮ সালে, মানুষ ভবিষ্যতের অনেক কিছুই জানতো না, তবুও তাঁরা  নিশ্চিত ছিলো যে মানব সমাজের প্রাথমিক যে বৈশিষ্ট্যগুলি আছে তার আদৌ কোন পরিবর্তন হবে না।   

আপনি যদি ১০১৮ সালে চীনে বাস করতেন তাহলে আপনি নিজের থেকে ধারণা করতে পারতেন যে ১০৫০ সালে সং সাম্রাজ্যের (Song Empire)  পতন হতে পারে, খিতানরা (Khitan) উত্তর থেকে আক্রমণ করতে পারে এবং প্লেগ (Plague) রোগে কয়েক লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে।   

তবে অন্তত আপনার কাছে এই ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা থাকতো যে ১০৫০  সালেও বেশিরভাগ মানুষ কৃষক এবং তাঁতি হিসাবে কাজ করতো, শাসকরা এখনও তাদের সেনাবাহিনী, আমলা এবং কর্মচারী নিয়োগের জন্য জনগণের উপর নির্ভর করতো, পুরুষরা তখনও নারীদের উপর আধিপত্য বজায় রাখতো, মানুষের গড় আয়ু তখনও প্রায় ৪০ বছর ছিলো এবং মানব শরীরের গঠন ও তখনো ঠিক আগের মতোনই ছিলো।

ঠিক  একই কারণে, ১০১৮ সালের দিকে দরিদ্র চীনা পিতা-মাতারা তাদের বাচ্চাদের কীভাবে চাল রোপন বা সিল্কের কাপড় বোনাতে হয় তা শিখিয়েছিল; ধনী পরিবাররা তাদের ছেলেদেরকে কীভাবে কনফুসীয় ক্লাসিক পড়তে হয়, কীভাবে ক্যালিগ্রাফি লিখতে হয় বা ঘোড়ার পিঠে লড়াই করতে হয় তা শিখিয়েছিল এবং তারা তাদের মেয়েদের বিনয়ী ও স্বামীর প্রতি অনুগত স্ত্রী হতে শিখিয়েছিল।

তারা ধরেই নিয়েছিলো যে এইসব দক্ষতাগুলি  সামনের ১০৫০ সালে এসেও প্রযোজ্য থাকবে।

২০৫০ সালের বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আপনাকে কেবল নতুন  নতুন চিন্তা ও পণ্য উদ্ভাবন করার চেয়ে আরও বেশি কিছু করতে হবে এবং সর্বোপরি নিজের আত্মস্বত্ত্বাকে বারে বারে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে।

অন্যদিকে বর্তমানে আমাদের কোন ধারণা নেই যে চীন বা অন্যান্য বিশ্ব ২০৫০ সালে কীরুপ ধারণ করবে। আমরা জানি না তখনকার সেসময়ে মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য কী করবে, আমরা জানি না সেনাবাহিনী বা আমলারা কীভাবে কাজ করবে এবং নারী পুরুষের মধ্যেকার সম্পর্ক কিরকম হবে।

কিছু লোকের গড় আয়ু সম্ভবত বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি হবে এবং জৈব প্রযুক্তি ও মানব মস্তিষ্ক এবং কম্পিউটারের দরুন হয়তো মানুষের শরীরে একটি অভূতপূর্ব বিপ্লব ঘটবে।

আজকের শিশুরা যা যা শিখবে তার বেশিরভাগই হয়তো ২০৫০ সালের পৃথিবীর কাছে অপ্রাসঙ্গিক হবে।  

বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের মস্তিষ্কে গাদা গাদা তথ্য ঠেসে দিচ্ছে। অতীতে হয়তো এর যৌক্তিকতা ছিলো যেহেতু  সেসময়ে তথ্যের ঘাটতি ছিলো এমনকি তখনকার তথ্যের ক্ষীণ যে গতিপ্রবাহ ছিলো তাও বার বার সংশোধনের নাম করে অবরুদ্ধ করে রাখা হতো।

এখন ভেবে দেখুন যদি আপনি ১৮০০ সালে মেক্সিকোর একটি ছোট্ট প্রাদেশিক শহরে বাস করতেন, তখন আপনার পক্ষে বিশাল এই বিশ্ব সম্পর্কে জানা খুব কঠিন ছিল কারণ সেসময় না ছিলো কোনো রেডিও, টেলিভিশন, দৈনিক পত্রিকা কিংবা না ছিলো কোনো জাতীয় গ্রন্থগারে প্রবেশের সু্যোগ।

 এমনকি যদি আপনি শিক্ষিতও হতেন এবং ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারে  প্রবেশাধিকার যদি পেয়েও থাকতেন তবুও উপন্যাস ও ধর্মীয় গ্রন্থ ছাড়া অন্য কিছু পড়ার সুযোগ হতো না।

স্পেনীয় সাম্রাজ্য স্থানীয়ভাবে মুদ্রিত সমস্ত পুস্তককে অন্যায়ভাবে নিষিদ্ধ করেছিল এবং শুধুমাত্র গুটিকয়েক প্রকাশনাসমূহের অধিকার ছিলো বাইরে থেকে বই আমদানি করার।

আপনি যদি রাশিয়া, ভারত, তুরস্ক বা চীনের কোনও প্রাদেশিক শহরে বাস করতেন তখন সেখানেও একই ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হতেন। 

যখন আধুনিক বিদ্যালয়ের উদ্ভব ঘটে তখন প্রতিটি শিশুকে পড়তে এবং লিখতে শেখানো হয় এবং একই সাথে ভূগোল, ইতিহাস এবং জীববিজ্ঞানের সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য ও জ্ঞান বিতরণ করা হয় যা পরিবর্তিতে তাদের মধ্যে এক বিপুল পরিবর্তন সৃষ্টি করতে সাহায্য করে।   

অপরদিকে এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই তথ্যের সংখ্যা এতোই বেড়ে গিয়েছে যে আমরা বলতে গেলে তথ্যের এক বিশাল সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি এবং সেন্সরশীপ কোন চেষ্টা করছে না এইসব তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করার।   

বরং তার পরিবর্তে তারা এখন ব্যস্ত ভুল তথ্য ছড়িয়ে বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে রাখতে।

আপনি যদি মেক্সিকোর কোন  প্রাদেশিক শহরে বাস করেন এবং আপনার কাছে যদি কোন স্মার্টফোন থাকে তবে আপনি আপনার জীবনের সিংহভাগ সময় শুধুমাত্র উইকিপিডিয়া (Wikipedia) পড়ে, টেড টকস (Ted Talks) দেখে এবং বিনামূল্যে অনলাইন কোর্স গ্রহণ করে কাটিয়ে দিতে পারেন। 

কোন সরকার আশা করতে পারে না যে তার অপছন্দের সবকয়টি  তথ্যেকে সে গোপন করতে পারবে।   

তবে অপরদিকে এটাও চিন্তার বিষয় যে কতো সহজেই অসঙ্গত প্রতিবেদন এবং চটকদার সংবাদ দিয়ে জনসাধারনের মনোযোগকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখা সম্ভব।    

সারা পৃথিবীর মানুষ যেখানে সিরিয়ার আলেপ্পো (Aleppo) শহরের বোমা হামলা বা আর্কটিকের (Arctic) বরফ গলে যাওয়ার মতো সাম্প্রতিক খবর গুলো থেকে শুধুমাত্র মাউস কিংবা মোবাইলের একটি ক্লিক দূরে, সেখানে ইন্টারনেটে অসঙ্গত তথ্যে ভরপূর অ্যাকাউন্ট এর সংখ্যা এতো বেশী যে সেগুলো তাদের মনে এসব সত্য ঘটনাগুলো নিয়েও সন্দেহ জাগিয়ে তুলছে।      

তদুপরি, এসব সাম্প্রতিক খবর গুলো বাদেও অন্যান্য অনেক বিষয় রয়েছে যেগুলোও মাউস কিংবা মোবাইলের শুধুমাত্র একটি ক্লিক দূরে, যার ফলে কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এবং তখন রাজনীতি বা বিজ্ঞান এর মতোন জটিল বিষয়গুলোর চাইতে মজার কোন বিড়ালের ভিডিও, সেলিব্রিটি গসিপ (Celebrity Gossip) বা পর্ণ (Porn) ভিডিও গুলোকে বেশি লোভনীয় বলে মনে হয়।   

এক কথায় বর্তমান বিশ্বে একজন শিক্ষকের কোন কিছু থেকে যদি বিরত থাকা লাগে তবে তা হবে তার ছাত্রদের উপর অপ্রাসঙ্গিক তথ্য চাপিয়ে দেওয়া। কারণ ইতিমধ্যেই তারা দরকারের চাইতেও বেশি অপ্রাসঙ্গিক তথ্য জানে। 

তার পরিবর্তে এখন মানুষের দরকার তথ্যকে বুঝতে পারার দক্ষতা যাতে করে তারা কোন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কোন তথ্যটির গুরুত্বপূর্ণ নয় এর মধ্যেকার পার্থক্য বুঝতে পারে এবং সর্বোপরি সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে যাতে সে যেন এইসব অসংখ্য তথ্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশকে একত্রে জোড়া লাগিয়ে এই বিশ্বের বিস্তৃত একটি চিত্র তৈরি করতে পারে।   

তবে এটা সত্যি যে বহু শতাব্দী ধরে উদারপন্থী পশ্চিমাতে এটিকে আদর্শ শিক্ষাপদ্ধতি হিসেবে ধরা হয়ে আসছে, কিন্তু তবুও বর্তমানে অনেক পশ্চিমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই পদ্ধতি ঠিকমতো অনুসরণ করা হচ্ছেনা। 

শিক্ষকরা তথ্য প্রদানে বেশী গুরুত্ব প্রদান করছে এবং একই সাথে শিক্ষার্থীদেরকে উৎসাহিত করছে সেইসব তথ্য নিয়ে “নিজে নিজে চিন্তা করতে”।নকর্তৃত্ববাদকে ভয় পাওয়ার কারণে মহান আখ্যান (Grand Narrative) নিয়ে উদারপন্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে একটা আতংক কাজ করতো।     

তারা ধরে নিয়েছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা শিক্ষার্থীদের প্রচুর তথ্য এবং সেইসাথে ধরাবাঁধার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের স্বাধীনতা দেব ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা তাদের মতো করে বিশ্বের নিজস্ব একটি চিত্র তৈরি করবে এবং যদি এই প্রজন্ম সমস্ত তথ্যকে ব্যবহার করে একটি সুসংগত এবং অর্থপূর্ণ গল্পেও যদি রূপান্তরিত করতে ব্যর্থ হয় তবুও ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু সমন্বয় তৈরি করার জন্য পর্যাপ্ত সময় থাকবে।   

আমাদের সময় এখন ফুরিয়ে গিয়েছে। পরবর্তী কয়েক দশকে আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নেব সেগুলি পরবর্তীতে গিয়ে ভবিষ্যতে রূপান্তরিত হবে এবং এই সিদ্ধান্তগুলো আমরা শুধুমাত্র আমাদের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করে নিতে পারবো।

যদি এই প্রজন্মের কাছে মহাবিশ্বের একটি বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ না থাকে তবে ভবিষ্যৎ জীবনের সিদ্ধান্তসমূহ বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়াবে।

 ইয়ুভাল নোয়া হারারি
ইয়ুভাল নোয়া হারারি

মূল লড়াই শুরু

তথ্যের পাশাপাশি অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদেরকে পূর্বনির্ধারিত দক্ষতাসমূহ যেমন ক্যালকুলাসের সমীকরণ সমাধান করা, সি++ দিয়ে কম্পিউটারকে নির্দেশনা দেওয়া, রাসায়নিক ল্যাবে টেস্ট টিউবের মাধ্যমে রাসায়নিক দ্রব্য সনাক্তকরণ করা কিংবা চীনা ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা, এসবের উপর বেশি জোর দেয়।

আমরা যেহেতু জানি না ২০৫০ সালে বৈশ্বিক ব্যবস্থা ও চাকরীর ক্ষেত্র  কেমন হবে সেহেতু সেসময়ে নির্দিষ্ট কী কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন   হবে সে বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত নই।  

আমরা হয়তো শিশুদের সি++ সাংকেতিক ভাষা ও চীনা ভাষায় কথা বলতে শেখানোর পিছনে অনেক বিনিয়োগ করতে পারি শুধুমাত্র পরে গিয়ে  এটা আবিষ্কার করার জন্য যে ২০৫০ এর মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) মানুষের চেয়েও নির্ভুলতার সাথে কম্পিউটার সফটওয়্যার (Computer Software) তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং নতুন গুগল ট্রান্সলেশন অ্যাপও (Google App) নিখুঁতভাবে মান্দারিন

(Mandarin), ক্যান্টোনিজ (Cantonese) ও হাক্কা (Hakka) ভাষায় যোগাযোগ করতে সহায়তা করতে পারবে কিন্তু সেসময়ও আপনি/আমি “নি হাও”(Ni Hao) কীভাবে বলতে হয় সেটি ছাড়া আর কোনকিছুই জানবো না।   

তাহলে, আমাদের কী শেখানো উচিত? অনেক শিক্ষাবিদ যুক্তি দিয়েছেন  যে  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিখন প্রক্রিয়ায় “চারটি সি”(4C’s) যোগ করা দরকার, যেগুলো হলোঃ

১. বিশ্লেষণী চিন্তাভাবনা (critical thinking)

২. যোগাযোগ (communication)

৩. সহযোগিতা (collaboration) এবং

৪. সৃজনশীলতা (creativity)।

আরও ব্যাপকভাবে ব্যাখা করতে গিয়ে তাঁরা দেখিয়েছেন যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের উচিত প্রযুক্তিগত দক্ষতা কমিয়ে দিয়ে বহুমুখী জীবন দক্ষতার উপর বেশি জোর দেওয়া।    

এসব দক্ষতার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিজেকে কোন পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পারার সক্ষমতা, নতুন জিনিস শিখতে এবং অনভ্যস্ত পরিস্থিতিতে নিজের মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে পারার দক্ষতা অর্জন করা। ২০৫০-এর বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য শুধুমাত্র নতুন ধারণা কিংবা পণ্য উদ্ভাবন করলেই চলবে না বরং আরও বেশি কিছু করতে হবে এবং নিজেকে বারেবারে নতুন করে পুনর্গঠন করার মানসিকতা থাকতে হবে। 

যদি কেউ আপনার কাছে মধ্য একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বকে বর্ণনা করে এবং তা যদি কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো না শোনায় তবে  ধরে নিন অবশ্যই সেটি মিথ্যা।

পরিবর্তনের গতি যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে কেবল অর্থনীতিই নয়, “মানুষ হওয়া” অর্থটির মাঝেও বিশাল পরিবর্তন আসতে পারে। ইতোমধ্যে ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহারে (Communist Manifesto) ঘোষণা করা হয়েছিল যে “কঠিন পদার্থ জাতীয় যতো বস্তু আছে তার সবগুলো কর্পূরের মতো করে বাতাসে উবে যায়।”

যদিও মার্কস এবং এঙ্গেলস (Marx and Engels)তখন মূলত সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তবে ২০৪৮ সালের মধ্যেই শারীরিক এবং জ্ঞান ভিত্তিক কাঠামোগুলি হাওয়ায় বা অসংখ্য সব তথ্যের দ্বারা সৃষ্ট মেঘের ভিতরে হারিয়ে যাবে।          

১৮৪৮ সালে, কয়েক মিলিয়ন মানুষ গ্রামাঞ্চলের খামারগুলোতে তাদের চাকরি হারানোর কারণে বড় বড় শহরের কারখানাগুলোতে কাজ করতে এসেছিলো। 

কিন্তু তারা যখন বড় শহরগুলোতে পৌঁছায়, তাদের কাছে এটা অসম্ভব ব্যাপার ছিলো যে তারা তাদের লিঙ্গকে পরিবর্তন করতে পারবে কিংবা নিজের মধ্যে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে যুক্ত করতে পারবে। যদি তারা কোন টেক্সটাইল  কারখানায় চাকরি পেয়ে থাকতো তখন তারা আশা করতো যে সারাজীবন সেই একি পেশাতে তারা নিযুক্ত হয়ে থাকতে পারবে।      

২০৪৮ সালে গিয়ে, মানুষকে সাইবার স্পেসে (Cyber Space) স্থানান্তর,   নিরপেক্ষ লৈঙ্গিক পরিচয় (Fluid Gender Identification)  এবং কম্পিউটার ইমপ্লান্টসের (Computer Implants) মাধ্যমে ইন্দ্রিয়  সংবেদনশীল অভিজ্ঞতার (Sensory Experience) মতোন জিনিষসর সাথে মানিয়ে নিতে হবে। 

তারা যদি ত্রিমাত্রিক পরাবাস্তব ভিডিও গেমে (3D Virtual Reality Game) চলতি ধারায় নকশা করার চাকরী পায় এবং সেই চাকরীর কাজের মধ্যে অর্থও খুজে পায়, তাও সামনের এক দশকের মধ্যে, শুধু এই পেশাটি নয়, বরং এটি সহ আরো অন্যধরণের শৈল্পিক কর্ম সম্পর্কিত যত পেশা আছে সব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দখলে চলে যাবে।         

সুতরাং, বর্তমানে ২৫ বছর বয়সী আপনি হয়তো একটি ডেটিং সাইটে নিজেকে পরিচয়  দিবেন যে “আপনি একজন ২৫ বছর বয়সী বিপরীতকামি (Heterosexual) নারী যিনি লন্ডনে থাকেন এবং একটি ফ্যাশন হাউসে কাজ করেন।”   

কিন্তু পরবর্তীতে ৩৫ বছর বয়সে গিয়ে আপনি হয়তো বলতে পারেন যে “আপনি একজন লিঙ্গ নিরপেক্ষ (Gender-nonspecific) ব্যক্তি যিনি বয়সের সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ও যার নিউওকোর্টিকাল ক্রিয়াকলাপ (Neocortical  Activity) মূলত নিউকসমস ভার্চুয়াল (Newcosmos Virtual) বিশ্বে সঞ্চালিত হচ্ছে এবং আপনার জীবনের লক্ষ্য হলো এমন এক জায়গায় নিজেকে নিয়ে যাওয়া যেখানে কোন ফ্যাশন ডিজাইনার আগে পৌঁছাতে পারেনি।”

যখন ৪৫ বছর হবেন তখন হয়তো ডেটিং করার কিংবা নিজের আত্ম পরিচয় দেবার কোন দরকারই পরবে না। অ্যালগরিদমই আপনার হয়ে আপনার জন্য নিখুঁত কোন সঙ্গীকে খুজে দিবে কিংবা তৈরি করে দিবে।  

ছবি আঁকা থেকে শুরু করে ফ্যাশন ডিজাইনের শিল্প পর্যন্ত অ্যালগরিদম আপনার থেকে শতগুণে এতোই উঁচুমানের যে হবে যে আপনি যখন নিজের  সর্বোচ্চ কৃতিত্বগুলোর দিকে ফিরে তাকাবেন তখন নিজের উপর গর্বিত হবার পরিবর্তে লজ্জিত হবেন এবং সামনের কয়েক দশকগুলোতে আপনাকে এইরকম অনেক আমূল পরিবর্তনের সাথে মুখোমুখি হতে হবে।    

অনুগ্রহ করে এই দৃশ্যকল্পটিকে সোজাভাবে নিবেন না। কেউ জানে না ভবিষ্যতে আমরা কি ধরণের পরিবর্তনের সাক্ষী হবো। ভবিষ্যতের যেই দৃশ্যই ভেবে দেখা হোক না কেন, আসল সত্য থেকে তার দূরে থাকার সম্ভাবনা বেশি।    

এখন কেউ যদি আপনার কাছে মধ্য একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের বর্ণনা দেয় এবং সেটি যদি আপনার কাছে কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো লাগে তাহলে ধরে নিবেন সেটা খুব সম্ভবত মিথ্যা। একইভাবে সেটি যদি আপনার কাছে কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর মতো নাওবা শোনায় তাহলেও ধরে নিবেন যে সেটা নিশ্চিত মিথ্যা। আমরা সুনির্দিষ্টতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারিনা, পরিবর্তন নিজেই শুধুমাত্র নির্দিষ্ট।     

 এই ধরনের গভীর পরিবর্তন হয়তো জীবনের মৌলিক গঠনের মাঝে পরিবর্তন আনবে, বিচ্ছিন্নতা তখন একটি লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়াবে।  স্মরণাতীত কাল থেকে মানুষের জীবনকে পরিপূরক দুটি ধারায় বিভক্ত করা হয়েছে-

শিক্ষা অর্জনের কাল এবং সেই সাথে কর্মজীবন কাল। প্রথম ভাগে, আমরা জ্ঞান অর্জন করি, দক্ষতার বিকাশ ঘটাই, বিশ্বের প্রতি একটি দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণ করি এবং নিজের একটি স্থিতিশীল পরিচয় তৈরি করি।     

এমনকি ১৫ বছর বয়সে আপনি যদি সারাদিন শুধুমাত্র নিজের জমিতে  ধান লাগানো নিয়ে ব্যস্ত থাকেন (বিদ্যালয়ে যাওয়ার পরিবর্তে), তখনও আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করছেন তা হচ্ছে আপনি শিখছেনঃ যে কীভাবে ধান চাষ করতে হয়, বড় বড় শহর থেকে আসা লোভী ব্যবসায়ীদের সাথে কীভাবে আলাপ আলোচনা করতে হয়, পানি এবং জমি নিয়ে গ্রামবাসীদের দ্বন্দ্ব লাগলে তা কীভাবে সমাধান করতে হয়।

জীবনের পরবর্তী দ্বিতীয় অংশে আপনি আপনার পুঁজি করা দক্ষতাগুলোর উপর  নির্ভর করবেন এই পৃথিবীতে নিজেকে পরিচালনা করতে, জীবিকা নির্বাহ করতে এবং সমাজে নিজের অবদান রাখতে। অবশ্য ৫০ বছর বয়সেও আপনি ধান, ব্যবসায়ী এবং দ্বন্দ্বের ব্যাপারে অনেক নতুন কিছু জানতে পারবেন, কিন্তু সেগুলো আপনার এতো বছরের শাণ দেওয়া সক্ষমতার কাছে একটা সামান্য আঁচড় ছাড়া আর কিছু নয়।  

একুশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এসে, দ্রুত বাড়তে থাকা পরিবর্তন এবং সেইসাথে দীর্ঘ গড় আয়ু, এই চিরাচরিত কাঠামোকে অপ্রচলিত করে দিবে। জীবন তখন অনেকগুলো স্তরে ভাগ হয়ে যাবে এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যেকার ধারবাহিকতা কমতে থাকবে।

“আমি কে?” এই প্রশ্নটি আগের থেকেও বেশি জরুরী এবং জটিল হয়ে যাবে। এর সাথে প্রচন্ড মানসিক চাপ জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পরিবর্তন সবসময়ই মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, এবং পরবর্তীতে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর মানুষ আর এই চাপ গ্রহণ করতে চায় না।

যখন আপনার বয়স ১৫ হয়, তখন আপনার পুরো পৃথিবীটাই পরিবর্তিত হয়ে যায়। আপনার শরীর বাড়তে থাকে, আপনার মনের বিকাশ ঘটতে থাকে, আপনার সম্পর্কগুলো আরো গভীর হতে থাকে। সবকিছুই তখন একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, সবকিছুই তখন  নিজের কাছে নতুন লাগা শুরু করে। আপনি তখন ব্যস্ত হয়ে পড়বেন নিজেকে উদ্ভাবন করতে।    

অধিকাংশ কিশোর কিশোরীর কাছে এই পরিবর্তনকে ভয়ের মনে হতে পারে, কিন্তু একই সাথে এটি উত্তেজনাপূর্ণও। আপনার সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথ উন্মুক্ত হয়েছে এবং আপনার জন্যে পুরো এক পৃথিবী পরে আছে জয় করার জন্য।   

বয়স যখন ৫০ এর কোঠায়, আপনি আর পরিবর্তন চাইবেন না এবং বেশির ভাগ মানুষই এই বয়সে এসে হাল ছেড়ে দেয় বিশ্বকে জয় করার। “ঐখানে গিয়েছিলাম, এই কাজটা করেছিলাম, এই টি-শার্টটি কিনেছিলাম”।  আপনি স্থিতিশীলতার মাঝে থাকতে পছন্দ করবেন।    

আপনি আপনার নিজের দক্ষতা, জীবিকা, পরিচয় এবং এই বিশ্বের প্রতি আপনার যে দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে, সেসবের পিছনে এতোই খেটেছেন যে আপনি  আর  নতুন করে সবকিছু শুরু করতে চাইবেন না।

কোন কিছু তৈরি  করতে আপনি যত বেশি শ্রম দিবেন, ততো বেশিই আপনার কষ্ট হবে সেটিকে ছেড়ে দিয়ে তার জায়গায় নতুন অন্য কিছুর জন্যে জায়গা তৈরি করতে।

আপনি হয়তো নতুন অভিজ্ঞতাকে মনের ভিতরে পোষণ করবেন, কিন্ত ৫০ বছরের কোঠায় থাকা বেশির ভাগ মানুষই নিজেদের পরিচয় এবং ব্যক্তিত্ত্বের যে গভীর কাঠামো রয়েছে, সেটির কোন পরিবর্তন আনতে চাইবে না।

এইসবের পিছনে স্নায়ুতাত্ত্বিক কারণ জড়িত। যদিওবা আগে ভাবা হতো প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্ক বেশি নমনীয় এবং প্রাণবন্ত, তবুও কিশোর মস্তিষ্কের তুলনায় এটি অনেক কম নমনীয়।

মস্তিষ্কের নিউরনগুলির (Neuron) মাঝে নতুন করে সংযোগ ঘটানো এবং সিনাপেসসগুলিতে (Synapses) যোগাযোগ করানো অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া।  

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে, আপনার আর সামর্থ্য থাকবে না স্থিতিশীলতার মাঝে বাস করার। তখন যদি আপনি আপনার স্থিতিশীল পরিচয়, পেশা এবং দৃষ্টীভঙ্গি নিয়ে পড়ে থাকেন তবে চলমান পৃথিবীর সাথে তাল মেলাতে গিয়ে আপনার হিমশিম খাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

বলা যায় যে সামনে গড়আয়ু আরো বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এর ফলে পরবর্তীতে সামনের কয়েক দশক আপনি হয়তো নির্বোধ এক জীবাশ্ম হিসেবে কাঁটিয়ে দিবেন।   

প্রাসঙ্গিক হিসেবে থাকতে চাইলে – শুধুমাত্র অর্থনৈতিক কারণে নয় বরং সর্বোপরিভাবে সমাজে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে চাইলে – ৫০ বছর বয়সে গিয়েও আপনাকে প্রতিনিয়ত জানতে হবে এবং নিজেকে   নতুন করে গড়ে তুলতে হবে।

একজন ১৫ বছর বয়সীর প্রতি আমি শ্রেষ্ঠ যে উপদেশ তা হলোঃ  বড়দের উপর খুব বেশি নির্ভর হবেনা। তাদের বেশিরভাগই সংজ্ঞা ভালো দিতে পারে কিন্তু তবুও তারা এই পৃথিবীটাকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনা।      

বৈচিত্রতাকে যেখানে স্বাভাবিকতা হিসেবে ভাবা হবে, সেখানে আপনার নিজের অতীতের অভিজ্ঞতা, সেই সাথে পুরো মনুষ্যতা নিয়ে আগের যে পূর্বঅভিজ্ঞতা, এসবের কোনটি আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে না।  

ব্যক্তিগতভাবে এবং সামগ্রিকভাবে পুরো মানবজাতিকে এমনসব নিত্য নতুন জিনিসের সাথে মোকাবেলা করতে হবে যা একসময় কল্পনার বাইরে ছিল যেমন – সুপার ইনটেলিজেন্ট মেশিন (Super Intelligent Machine), কৃত্রিম মানবদেহ (Engineered Body) ও অ্যালগরিদম (Algorithm) যা মানুষের আবেগকে, মনুষ্য সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে এবং প্রতি দশকে আপনার নিজের পেশা পরিবর্তনের যে প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, সেইসব বিষয়গুলোকে অস্বাভাবিক অবিকলতার সাথে নিয়ন্ত্রণ করবে।

তাহলে এইধরণের অভূতপূর্ব  পরিস্থিতির  মুখোমুখি হলে  কোন কাজটি করা সঠিক হবে? যখন সমুদ্র পরিমাণ তথ্যের সাগরে আপনি হাবুডুবু খেতে থাকবেন এবং এতো সংখ্যক তথ্যকে শুষে নিয়ে বিশ্লেষণ করা যেখানে অসম্ভব, তখন আপনার কি ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?   

কীভাবে এমন এক পৃথিবীতে বাস করবেন যেখানে গভীর অনিশ্চয়তাকে কোন ক্রুটি নয় বরং একটি বৈশিষ্ট্য হিসেবে ভাবা হবে?   

এই ধরণের বিশ্বে টিকে থাকতে চাইলে এবং সেইসাথে নিজেকে সমৃদ্ধশালী হিসেবে তৈরি করতে চাইলে আপনার দরকার প্রচুর মানসিক নমনীয়তা  এবং সেই সাথে দরকার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা।

আগে আপনি যেসব বিষয় অনেক ভালোভাবে জানতেন বলে মনে করতেন তার থেকে কিছু কিছু অংশ আপনাকে প্রতিনিয়ত ছেড়ে দিতে হবে, এবং অজানাকে জানার জন্য নিজেকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। 

দুর্ভাগ্যক্রমে, শিশুদের মানসিক ভারসাম্যকে বজায় রেখে অজানা নতুন  কিছু শেখানোটা পদার্থবিজ্ঞানের সমীকরণ বা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস  শেখানোর চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। কোনও বই পড়ে বা বক্তৃত্তা  শোনার মাধ্যমে আপনি কাউকে সহনশীল থাকার কৌশল শেখাতে পারবেন না। একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষকদের মাঝেই মানসিক নমনীয়তার অভাব আছে, যেহেতু তারা নিজেরাই পুরনো শিক্ষাব্যবস্থার পণ্য।  

শিল্প বিপ্লব আমাদেরকে শিক্ষার উৎপাদনরেখার তত্ত্বটি দিয়ে গেছে। ধরা যাক, কোনো শহরের মাঝখানে একটি বড় কংক্রিটের বিল্ডিং রয়েছে যেটি একই ধরণের অনেকগুলো কক্ষে বিভক্ত, প্রতিটি ঘরেই সারি সারি ডেস্ক এবং চেয়ার রয়েছে।

এখন বেলের শব্দে আপনি এমন একটি  কক্ষে যাবেন যেখানে আপনিসহ সাথে আরো ৩০ জন রয়েছে যারা কিনা সকলে আপনার সাথে একই বছর জন্মগ্রহণ করেছে। প্রত্যেক ঘন্টায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক বের হয়ে কথা বলা শুরু করে।

এখানে সবাই সরকারের পক্ষ থেকে এইকাজ করার জন্য মজুরি পায় এবং এর মধ্যে একজন আপনাকে পৃথিবীর আকৃতি সম্পর্কে বলে, অন্যজন আপনাকে মানুষের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে এবং তৃতীয়জন আপনাকে মানব দেহের কথা বলে।

এই মডেল বা কাঠামোটিকে হয়তো সহজে হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় এবং বলতে গেলে সবাই একমত যে অতীতের যা কিছুই অর্জিত হোক না কেন, এখন তার সব কিছুই দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু তবুও এখন পর্যন্ত আমরা টেকসই কোন বিকল্পের সৃষ্টি করতে পারিনি। ক্যালিফোর্নিয়া্র আলিশান শহরতলী তো দূরের কথা, গ্রামীণ মেক্সিকোতে প্রয়োগ করতে পারার মতোন মাপযোগ্য কোন বিকল্পই আমাদের কাছে নেই।  

মানুষকে নিয়ন্ত্রণ 

সুতরাং মেক্সিকো, ভারত কিংবা আলবামায় সেকেলে নিয়মের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আটকে থাকা একজন ১৫ বছর বয়সীর প্রতি আমার সেরা যে উপদেশটি থাকবে তা হলোঃ বড়দের উপর খুব বেশি নির্ভর হবেনাতাদের বেশিরভাগই সংজ্ঞা ভালো দিতে পারে কিন্তু তবুও তারা এই পৃথিবীটাকে ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারেনা    

অতীতে, প্রাপ্তবয়স্কদের অনুসরণ করা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ছিল কারণ তারা তখনকার পৃথিবী সম্পর্কে অনেক ভালো জানতো এবং তখনকার পৃথিবী ও এতো দ্রুত পরিবর্তিত হতো না । কিন্তু একবিংশ শতাব্দী এর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে।  

যেহেতু পরিবর্তনের গতি ক্রমে বেড়েই যাচ্ছে সেই কারণে আপনি কখনো নিশ্চিত হতে পারবেন না যে প্রাপ্তবয়স্করা আপনাকে যা বলছে তা সময়ের সাথে আসলেই প্রাসঙ্গিক নাকি অপ্রাসঙ্গিক।

তাহলে এর পরিবর্তে কিসের উপর আপনি নির্ভর করবেন? খুব সম্ভবত প্রযুক্তি? কিন্তু প্রযুক্তির উপর নির্ভর করা এখন জুয়া খেলার চেয়েও ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রযুক্তি আপনার কাজে সহায়তা করবে ঠিকই কিন্তু প্রযুক্তি আপনার জীবনের উপর এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলবে যে আপনি নিজের অজান্তে তার মায়াজালে জিম্মি হয়ে পরবেন।

হাজার বছর আগে মানুষ কৃষির উদ্ভাবন করেছিল, কিন্তু এই প্রযুক্তি একসময়ে গিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদেরকে দাসত্বের বেড়াজালে জড়িয়ে ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণিগোষ্ঠীকে সমৃদ্ধশালী বানিয়েছিলো।

অনেক মানুষকে সেসময় বাধ্য করা হয়েছে তপ্ত দুপুরে আগাছা তুলতে, জলের বালতি বহন করতে এবং জ্বলন্ত রোদের নীচে শস্য সংগ্রহের কাজ করতে। আপনার ক্ষেত্রেও ঠিক একি জিনিষ ঘটতে পারে।   

প্রযুক্তি আসলে খারাপ কিছু না। আপনি যদি জানেন জীবনে আপনি কি চান তবে প্রযুক্তি সেটি পেতে আপনাকে সহায়তা করবে। তবে আপনি যদি জীবনে কী চান সে সম্পর্কে অবগত না থাকেন, তবে প্রযুক্তি খুব সহজেই  আপনার লক্ষ্যগুলিকে যান্ত্রিকতায় রূপায়ণ করতে এবং আপনার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

বিশেষভাবে প্রযুক্তি যেভাবে মানুষকে বুঝতে পারার সক্ষমতায় পারদর্শী হয়ে উঠছে, একটা সময়ে গিয়ে আপনি হয়তো দেখবেন যে প্রযুক্তি আপনাকে নয় বরং আপনি গিয়ে প্রযুক্তির সেবা করছেন।

আপনি কি সেই জম্বিগুলোকে রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন যাদের মুখ সারাক্ষণ তাদের স্মার্টফোনে আঠা দিয়ে লেগে থাকার মতোন করে গুঁজে থাকে? কি মনে হয় আপনার, যে তারা প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করছে নাকি প্রযুক্তি তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করছে?      

 তাহলে কি আপনার আত্মনির্ভরশীল হওয়া উচিত? সেটা শুধুমাত্র সিসিমপুর (Sesame Street) বা পুরানো ধাঁচের ডিজনির (Disney) কোন ছায়াছবিতেই শুনতে ভালো লাগে কিন্তু বাস্তব জীবনে তার কোন কার্যকারিতা নেই।

এমনকি ওয়ার্ল্ড ডিজনিও আস্তে আস্তে এটি উপলব্ধি করতে পারছে। রাইলি অ্যান্ডারসনের (Riley Anderson) মতো, বেশিরভাগ মানুষই নিজেদের সম্পর্কে নিজেরা খুব কম জানে এবং যখনই তারা “নিজের মনের কথা” শোনার চেষ্টা করে ঠিক তখনই খুব সহজেই  বিভিন্ন বাহ্যিক ছলকলার শিকার হয়ে সেই চেষ্টা থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়।   

আমাদের মাথার ভিতরে প্রতিনিয়ত আমরা যে কন্ঠস্বরকে শুনতে পাই তা কখনই বিশ্বাসযোগ্য নয় কারণ এটি সর্বদা রাষ্ট্রের রটনা, মস্তিষ্ক ধোলাই করে দেওয়ার মতোন চিন্তাধারা এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনকে প্রতিফলন করে, সেই সাথে জৈবরাসায়নিক অনুঘটকের যে প্রভাব আছে সেটি  উল্লেখ না করলেই নয়। 

যেহেতু বায়োটেকনোলজি (Biotechnology) এবং মেশিন লার্নিংয়ের (Machine Learning) উন্নতি হচ্ছে, মানুষের গভীর অনুভূতি এবং আকাঙ্ক্ষাগুলোকে প্রভাবিত করাও অনেক সহজ হয়ে যাবে এবং নিজের হৃদয়কে অনুসরণ করাও তাই আগের চেয়ে আরও বেশি বিপজ্জনক ও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। কোকাকোলা (Coca- Cola), অ্যামাজন (Amazon), বাইদু (Baidu) কিংবা সরকার যেখানে আপনার মনস্তাত্ত্বিক চিন্তাধারা এবং একই সাথে আপনার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে, সেখানে কীভাবে আপনি আপনার নিজের এবং তাদের মার্কেটিং এক্সপার্টদের( Marketing Expert) মধ্যেকার পার্থক্য ধরতে পারবেন?    

যদি আপনি না জানেন আপনি আপনার জীবনে কী চান তবে প্রযুক্তির পক্ষে খুব সহজ আপনার লক্ষ্যগুলিকে আকার দেওয়ার এবং আপনার  জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার । 

এইরকম কঠিন কাজে সফল যদি হতে চান, আপনাকে আপনার নিজের অপারেটিং সিস্টেমটিকে (Operating System) আরও ভালভাবে জানার জন্যে আরো বেশি কষ্ট করতে হবে – যাতে করে আপনি কে এবং আপনি আপনার জীবন থেকে কী চান সেটা জানতে প্রচলিত কিন্তু অতি প্রাচীন একটি প্রবাদ আছে : নিজেকে জানুন।  

হাজার  হাজার বছর ধরে, দার্শনিক এবং মুনি-ঋষিরা মানুষকে অনুরোধ করেছেন নিজেকে জানার জন্য। এই প্রবাদটি একবিংশ শতাব্দীর চেয়ে আগে কখনো বেশি জরুরী ছিল না, কারণ লাওজি বা সক্রেটিসের সময়ের থেকে বর্তমান সময় আলাদা, এখন আপনার সামনে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিযোগিতা আছে। 

কোকা কোলা (Coca-Cola), অ্যামাজন (Amazon), বাইদু (Baidu), এবং সরকার সবাই আপনাকে হ্যাক (Hack) করার জন্যে ছুটছে। আপনার স্মার্টফোনকে নয়, আপনার কম্পিউটারকে নয়, আপনার  ব্যাংক অ্যাকাউন্টকে নয়; তারা আপনাকে এবং আপনার জৈবিক অপারেটিং সিস্টেমটিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ছুটছে।

আপনি শুনে থাকতে পারেন যে আমরা কম্পিউটার হ্যাকিংয়ের যুগে বাস করছি, তবে এটি আসল সত্যের অর্ধেকও নয়। বস্তুত, আমরা মানুষ হ্যাকিংয়ের যুগে বাস করছি।

ঠিক এই মুহূর্তেও অ্যালগরিদমগুলো আপনাকে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা সবসময় দেখছে আপনি কোথায় যাচ্ছেন, আপনি কী কিনছেন, কার সাথে সাক্ষাৎ করছেন।

শীঘ্রই তারা আপনার সমস্ত পদক্ষেপ, আপনার সমস্ত শ্বাস-প্রশ্বাস এমনকি আপনার সমস্ত হৃদস্পন্দনকেও নিরীক্ষণ করবে, যাতে করে তারা যেন আপনার ব্যাপারে আরো ভালোমতো করে জানতে পারে।

সেজন্য তারা এখন বিগ ডেটা (Big Data) এবং মেশিন লার্নিংয়ের (Machine Learning) উপর নির্ভর করছে। এবং যখনই এই অ্যালগরিদমগুলি আপনার সম্পর্কে সবকিছু ভালভাবে জানতে পারবে, তখন তারা আপনাকে খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করতে পারবে এবং আপনি এর বিরুদ্ধে তেমন কিছুই করতে পারবেন না।  

আপনি তখন ম্যাট্রিক্সে (Matrix) বা দ্য ট্রুম্যান শোতে (The Truman Show) বাস করবেন। পরিশেষে, এটি খুব সহজ একটা গবেষণার বিষয়ঃ আপনার নিজের মধ্যে যা ঘটছে তা যদি আপনার নিজের থেকে অ্যালগরিদমগুলো বেশি ভালমতোন বুঝতে পারে, তাহলে নিজের থেকেই সকল কর্তৃত্ব অ্যালগরিদমদের কাছে চলে যাবে।

অবশ্যই, আপনি সকল কর্তৃত্ব অ্যালগরিদমের হাতে তুলে দিয়ে খুশি মনে থাকতে পারেন এবং নিজের ও পুরো পৃথিবীর ব্যাপারে কোন সিদ্দ্বান্ত নেওয়ার জন্যে তাদের উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিন্তে থাকুন।

আপনাকে কিছুই করা লাগবে না। অ্যালগরিদম আপনার হয়ে সব কাজ করে দিবে।

 তবে, আপনি যদি নিজের ব্যক্তিগত অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যত জীবনের উপর একটু হলেও নিয়ন্ত্রণ  রাখতে চান তবে আপনাকে অ্যালগরিদমের চেয়ে দ্রুত, অ্যামাজন এবং সরকারের চেয়ে দ্রুত ছুটতে হবে এবং তারা আপনার ব্যাপারে সবকিছু জেনে নেওয়ার আগেই আপনার নিজেকে নিজের জেনে নিতে হবে।

দ্রুত ছুটতে গিয়ে, সঙ্গে বেশি কিছু নেওয়ার দরকার নেই, শুধু আপনার সমস্ত বিভ্রমকে ছুড়ে ফেলে দিন। তারা আপনার জন্যে খুব ভারী।  

From the book 21 LESSONS FOR THE  21ST CENTURY by Yuval Noah Harari. Copyright © 2018 by Yuval Noah Harari. Published by Spiegel & Grau, an imprint of Random House, a division of Penguin Random House LLC. All rights reserved.

মূললেখাঃhttps://medium.com/s/youthnow/yuval-noah-harari-21-lessons-21st-century-what-kids-need-to-learn-now-to-succeed-in-2050-1b72a3fb4bcf

অনুবাদকঃ পার্বন চাকমা

সম্পাদনায় টরা তনচংগ্যা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Parban Chakma

Editor
Pursuing his undergraduate degree in Law at University Of Dhaka.

Follow Parban Chakma

Leave a Reply