icon

খুমী রূপকথা: তাআই হই চিংল্যাই (কাঁকড়া আর টুনটুনি)

Jumjournal

Last updated Jan 17th, 2020 icon 412

অনেক দিন আগের কথা। কাঁকড়া তার পরিবার নিয়ে এক বর্ণাতে বাস করত। কাঁকড়া ছিল খুব গরিব। তখন কাঁকড়ার কাজ করার মত কোন উপায় ছিল না। তেমন সুর্যের আলেও পড়তো না।

একদিন এক হরিণ তার জুমে ধান শুকাচ্ছিল। হরিণটি ছিল খুব ভীতু। কাঁকড়াটি হরিণকে ভয় দেখাবার জনা বনে গেল।

সে সময় এক বানরের সঙ্গে কাঁকড়ার দেখা হল এবং শাকে বল? ও বন্ধু বানর, তুমি তো গাছে উঠতে পার। তুমি ঐ বন্য আম গাছের উপর উঠে হরিণের দিকে বন্য আম ছুড়ে মারবে। প্রথমে বানর কাঁকড়ার কথায় রাজী হল না।

কাঁকড়া তাকে ভুলাতে লাগল। শেষ পর্যন্ত বানর রাজী হল। বানর কাঁকড়ার কথা মত চলতে লাগল । সে বন্য আম গাছে উঠে হরিণের দিকে বন্য আম ছুড়ে মারতে আরম্ভ করল। সত্যি সত্যি ভীতু হরিণটি ভয়ে এক লাফে দৌড়ে পালিয়ে গেল। তারা দু’জনেই হরিণের ধানগুলো ভাগাভাগি করে নিয়ে গেল।

এদিকে ভীতু হরিণ ভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তার জুমের চালকুমড়ার লতার উপর পা দিল। চালকুমড়াটি লতা ছিড়ে নিচের দিকে গড়াতে গড়াতে এক পিপড়ার বাসায় গিয়ে পড়ল।

ভয়ে পিপড়া চিল্কার করে পালাতে লাগল। পাশে এক বন্য মুরগীর বাসা ছিল। পিপড়ার ভয়ে বন্যমুরগীটি উড়ে এক মরা বাঁশের উপর গিয়ে বসল।

মরা বাঁশটি ভেঙ্গে বন্য শূকরের মাথার উপর পড়ল। বন্য শুকর ব্যথা ও রাগে আশপাশের কলাগাছ সব নষ্ট করে ফেলল। কলার। পাতায় এক বাদুড়ের বাসা ছিল। কলা গাছ ভেঙ্গে যাওয়ায় পাতা থেকে বাদুড়টি বের হয়ে উড়তে উড়তে বিরাট এক হাতির কানের ভিতর গিয়ে ঢুকল।

হাতি ব্যথা সহ্য করতে না পেরে এদিক সেদিক দৌড়াতে লাগল। এমনিভাবে হাতিটি দৌড়াতে দৌড়াতে এক রাজার দেশে গিয়ে পৌছাল। তখন রাজকন্যা ঢেঁকিতে ধান ভানছিল হাতি দৌড়ে এসে রাজকন্যাকে মেরে ফেলল। রাজা তাঁর কন্যা নিহত হবার খবর শুনে খুব রেগে গেলেন।

রাজা হাতিকে তার কাছে বিচারের জন্য ডাকলেন। বিচারের সভায় হাতি বললঃ মহারাজ, হঠাৎ করে বাদুড় আমার কানের ভিতর ঢুকে পড়েছিল, সেই ব্যথায় দৌড়াতে দৌড়াতে অসতর্ক অবস্থায় আপনার কন্যাকে মেরে ফেলেছি। আমাকে মাফ করবেন।

রাজার বিচারের সভায় সবাই হাজির হয়ে একের পর এক রাজার কাছে বলতে শুরু করল। বাদুড় বললঃ মহারাজ, আমার বাসায় বন্য শূকর এসে সব ভেঙে দিয়েছে। তাই আমি দিশাহারা হয়ে হাতির। কানকে আমার বাসস্থান বলে মনে করে ঢুকে পড়ি।

তারপর শুকর বললঃ মহারাজ, হঠাৎ করে মরা বাঁশ আমার মাথার উপর বাড়ি মেরেছিল, সেই ব্যথায় আমি আশপাশে যা পেয়েছি তা-ই কেটে দিয়েছি।

মরা বাঁশটি বললঃ মহারাজ, আমি তো মরা বাঁশ। আমার কোন হাত-পা নেই, নেই কোন শক্তি। তার মধ্যে কেউ যদি ধাক্কা দেয় তাহলে অবশ্যই পড়তে হয়। আমার গায়ের উপর বন্য মুরগী বসেছিল, তাই আমি নিচের দিকে পড়েছি।

তারপর বন্য মুরগী বললঃ মহারাজ, পিপড়া আমার বাসায় এসে আমাকে কামড় দিয়েছিল। তাই হঠাৎ উড়ে মরা বাঁশের উপর বসেছিলাম।

পিপড়া বললঃ মহারাজ, আমাদের বাসার উপর চালকুমড়া এসে পড়েছিল। তাতে আমার মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন অনেকের মৃত্যু হয়েছে। তাই আমরা এদিক সেদিক ছুটাছুটি করেছিলাম।

তারপর চালকুমড়া বললঃ মহারাজ, আমার মালিক হরিণ আমাকে তার জুমে রোপণ করেছিল। তার যখন কোন প্রয়োজন নেই তখন মালিক হরিণ, আমার লতার উপর পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়। আমার তো কোন হাত-পা নেই। লতা থেকে পড়ে কোন দিকে পড়ে চলে যায়, তা আমি নিজেই জানি না।

ভীতু হরিণটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললঃ মহারাজ, আমি জুমের ধানগুলো শুকাচ্ছিলাম। তখন এক বানর এসে আমার দিকে বন্য আম ছুড়ে মারতে লাগল। তাই আমি ভয়ে পালিয়ে যায়। পরে এসে দেখলাম, আমার শুকানো ধান বানর চুরি করে নিয়ে গেছে।

তারপর বানর বললঃ মহারাজ, সেটা ঠিকই, আমি বন্য আম ছুড়ে মেরেছিলাম। সেটা বন্ধু কাঁকড়ার কথা মতো।

অবশেষে কাঁকড়াটি বললঃ মহারাজ, আমি তাকে এমনিভাবে কৌতুক হিসাবে বলেছিলাম। আমি জানতাম না এত বিরাট ঘটনা হবে। মহারাজ, আমি দোষ করেছি তা স্বীকার করলাম। তবে আপনারা এখন আমাকে ফাঁসি দিবেন না। আমাকে পরিবারের জন্য তিন বার পানি তুলতে সময় দিবেন।

রাজা কাঁকড়ার দোষ শিকারের জন্য তার কথা মত পানি তুলতে তিন বার সময় দিলেন। তারপর কাঁকড়া পানি তুলতে আরম্ভ করল। সে প্রথম দু’বার খুব তাড়াহুড়া করে বাড়িতে ফিরেছিল।

তৃতীয় বারে যখন গেল, তখন সে গর্ত খোড়ার জন্য জায়গা খুঁজতে লাগল। কাঁকড়াটির দেরি হওয়ায় রাজা সৈন্যদেরকে ডাকতে পাঠালেন। কাঁকড়া লুকাবার জায়গা খুঁজে পেয়ে বলতে লাগল। আমি খুব ক্লান্ত হয়েছি। তাই স্নান করছি। একটু অপেক্ষা করেন।

কিছুক্ষণ পর রাজার সৈন্যরা আবারও ডাকতে আরম্ভ করল। তখন কাঁকড়াটি পূর্বদিকের ঝরনায়। ছোট কালো রঙের পাথরের নিচে চুপ করে লুকিয়ে রইল। তারা কাঁকড়াটির সাড়া শব্দ শুনতে পেল না।

কাঁকড়ার সাড়া শব্দ শুনতে না পেয়ে রাজা তার সৈন্য এবং হাতি-ঘোড়া নিয়ে কাঁকড়াটিকে খুঁজতে গেলেন। কাঁকড়াটিকে খুঁজতে খুঁজতে সবাই ক্লান্ত হয়ে এক নদীর কূলে বিশ্রাম নিচ্ছিল।

এমন সময় ছোট একটি টুনটুনি উড়ে এসে রাজার সামনে চিকন একটা গাছের ডালে বসে ক্লান্ত অবস্থায় রাজাকে দেখে গানের সুরে বলতে লাগল।

মহারাজ! মহারাজ!

বলবো আমি, দেবে কি?

এভাবে টুনটুনি রাজার সামনে এসে কয়েকবার গানে গানে বলতে লাগল। রাজা বিরক্ত হয়ে বললেনঃ

টুনটুনি টুনটুনি

সত্যি করে বলবে কি ?

দেব তোমায় সোনার মুকুট

দেব তোমায় সোনার বালা।

টুনটুনি বললঃ

চাইনা আমি সোনার মুকুট

চাইনা আমি সোনার বালা

 দেবে আমায় মদের পানি

খাব আমি শূকর মাংস।

রাজা বললেনঃ

টুনটুনি টুনটুনি

দেব তোমায় মদের পানি

 দেব তোমায় শূকর মাংস

সত্যি করে বলবে তুমি?

কোথায় কাঁকড়া আছে?

কোন পাথরে, কোন জায়গায়? তখন টুনটুনি গানের সুরে সুরে রাজার কাছে সব খুলে বলতে লাগল মহারাজ, কাঁকড়া পূর্ব দিকের ঝর্ণাতে যেখানে পানি পড়ে তার নিচে ছোট কালো রঙের পাথরের নিচে লুকি আছে।

টুনটুনির কথা শুনে রাজার সৈন্যরা সেখানে দেখতে গেল এবং লুকিয়ে থাকা কাঁকড়াটিকে ধরে রাজার কাছে নিয়ে আসল। রাজা কাঁকড়াটিকে ফাঁসি দেবার আগে কাঁকড়া টুনটুনিকে নন্দী পানিতে ডুবে মরে যাওয়ার অভিশাপ দিল।

তারপর রাজা কাঁকড়াটিকে ফাঁসি দিয়ে ভাগ করে তার এক ভাগ পূর্ব দিকে এবং আর এক ভাগ পশ্চিম দিকে ফেলে দিলেন।

তার পরের দিন টুনটুনি দম্পতি জুমে কাজ করতে গেল। তখন তাদের সাত সন্তানও জুমে যেতে চাইল। পিতা-মাতা সন্তানদেরকে যেতে নিষেধ করুল। কিন্তু তারা কিছুতেই ও অবশেষে সবাই জুমে গেল।

তারপর টুনটুনি দম্পতি জুমে কাজ করতে দুপুর হয়ে গেল। তখন দেখে তাদের সন্তানদের কেউ নেই। সাত সন্তান পানির পিপাসায় নদীতে গিয়ে নদীর পানিতে স্নান করল এবং পানি পান করল। তারা কাঁকড়ার অভিশাপের ফলে সবাই নদীতে মারা গেল।

টুনটুনি দম্পতি তাদের সন্তানদের মৃত্যু দেখে কিছু উপায় খুঁজতে করুণার পূর্ব দিকে ছোট একটা কচু পাতায় জমে থাকা পানি মুখে করে এনে তাদের মৃত সন্তানদের গায়ে ছিটিয়ে দিল। তারপর সন্তানরা আবার আস্তে আস্তে বেঁচে উঠল। তারা সবাই বাড়ি ফিরল।

এই গল্পের শেষ কথা  কাঁকড়ার অভিশাপের কারণে টুনটুনির নদীর পানি বা নিষেধ।


লেখকঃ লোনাং খুমী

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply