icon

গণমাধ্যম,পার্বত্য চট্টগ্রাম ও প্রান্তিকতাঃ পাভেল পার্থ

Jumjournal

Last updated Jun 2nd, 2020 icon 244

কর্পোরেট বিজ্ঞাপন খুন করছে আপন বারান্দা ও বালিশ

প্রশ্নহীন কায়দায় আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্পোরেট উপনিবেশের দাসত্ব। আমার জন্ম হবে কি হবে না তা নিয়ন্ত্রণ করছে পৃথিবীর বৃহত্তম কনডম কোম্পানি মুডস কি সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি।

গরীব দেশের কালা মানুষের সংখ্যাকে একটি সমস্যা দেখিয়ে দিনে দিনে বাড়ছে মারদাঙ্গা জন্মনিয়ন্ত্রণ বাণিজ্য।

সম্পদের সুষম বন্টনের প্রশ্নকে দাবিয়ে রেখে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে ‘অসম’ বাণিজ্য অর্থনীতির হিসাব নিকাশ।

জন্ম হওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুর পর পর্যন্ত আমাদের গরিষ্ঠভাগ যাপিতজীবন হয়েছে কর্পোরেট ঘেরবন্দী। প্রজন্মকে করে তোলা হচ্ছে কর্পোরেট পণ্যপুতুল।

আর এই পণ্যপুতুলের জামাকাপড়, চুলের কাটিং, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, কথা বলার ধরণ, সম্পর্ক, হাগামুতা, কামড়াকামড়ি, বাদবিবাদ, বিচ্ছেদ ও বিষাদ, আনন্দ ও আহাজারি সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বহুজাতিক কর্পোরেট শাসনের ভেতর।

আর শাসনের বার্তা জনপদের ‘গণের’ মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার ভেতর দিয়ে বিদ্যমান ‘মাধ্যম’ গুলো প্রশ্নহীন কায়দায় হয়ে উঠছে ‘গণমাধ্যম’।

যার মাথা থেকে পায়ের নখ কি নাভী বা কলিজা ও রক্তপ্রবাহ সব কিছুতেই কর্পোরেটের হুকুম-প্রজ্ঞাপন কৌশল ও বাধ্যবাধকতা। গণমাধ্যমের ভাষায় কর্পোরেটের এই লাগাতার উপর্যুপরি রক্তসংঘর্ষের নাম ‘বিজ্ঞাপন’।

চলতি সময়ে তো আর গণমাধ্যমে কর্পোরেটের বিজ্ঞাপন ছাড়া আর কোনো কিছুই থাকে না। পয়লা একটি পত্রিকায় বেশ যত্ন নিয়ে বিজ্ঞাপন সমূহ বসানো হয় বা একটি টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন গুলোর জন্যই পয়লা সময় বরাদ্দ করা হয়।

বিজ্ঞাপনের জায়গা শেষ হলে যে কম বেশী খানাখন্দ থাকে সেখানে জনগণের জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতার কাহিনী তৈরী করে মাধ্যমকে গণমাধ্যম করে তোলা হয়।

আর এইসব বিজ্ঞাপন মারদাঙ্গা গলাকেটে প্রতিদিন খুন করে আমাদের যাপিতজীবনের সকল সম্পর্ক ও অনুভূতি।

তৈরী করে প্রতিনিয়ত ক্ষমতার এক অপ্রতিরোধ্য ছোবল। আমরা মানি বা না মানি বুঝি বা না বুঝি প্রশ্নহীন এই মেনে নেয়া অধিপতি এই কর্পোরেটগিরিই আজকের নয়াউপনিবেশ।

গণমাধ্যম এই কর্পোরেট উপনিবেশের এক কেন্দ্রিক চালিকা। রণকৌশল হিসেবে যেখানে ব্যবহৃত হচ্ছে বিজ্ঞাপন বারুদ ও বোমা।

রক্তাক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বাণিজ্য ফেরিওলার দূরত্বের হিসাব

পার্বত্য চট্টগ্রাম বরাবরই আমাদের কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় তথাকথিত মূলধারায় এক বিশেষায়িত অঞ্চল।

যতনা বেশি ভৌগলিক মাত্রা পার্বত্য চট্টগ্রামকে আমাদের মনস্তত্বে হাজির করে ‘এক বিশেষ অন্য’ হিসেবে তারচে’ বেশি প্রভাব তৈরী করে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী প্রান্তিক জনগণের ঐতিহাসিক যাপিতজীবন।

যে যাপিতজীবনকে ঘিরে উপনিবেশিক সময় থেকে এই কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত চলমান দুনিয়ায় বহাল আছে প্রশ্নহীন অধিপতি ঝাঁঝ ও বলপ্রয়োগ।

এই বলপ্রয়োগ বিশেষ শাসন ও আইনের নথি, জলপাই রঙের বাহাদুরি, বহিরাগত বাঙালি অভিবাসন, অন্যায় কর্পোরেট বাজারের দখল, তথাকথিত উন্নয়ন মারদাঙ্গা সবকিছুকে আগলে নিয়েই পরিবর্তিত হয়েছে।

পাল্টেছে শাসন এবং চোখরাঙানির প্রক্রিয়া কিন্তু বাঙালি পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী মনস্তত্ত্বের পার্বত্যচট্টগ্রামবান্ধব কোনো রূপান্তর ঘটেনি।

আর ঘটেনি বলেই চলমান কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে বহাল থাকা গণমাধ্যমসমূহও পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিবেচনা করছে এক বিশেষ এলাকা হিসেবেই এবং বিদ্যমান গণমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম রূপায়িত হচ্ছে বারবার এক ‘অন্য এলাকা’ হিসেবেই।

যেখানে কিছু ‘অন্য রকমের’ মানুষ থাকেন এবং যারা রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বাঙালিদের চাইতে আলাদা।

যখন কর্পোরেট মোবাইল কোম্পানিরা বাংলাদেশে মোবাইল বাণিজ্য প্রায় চাঙ্গা করে তোলে তখন প্রায় কোম্পানি গুলোই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বাদ রেখে বা বাতিল করে বিজ্ঞাপন ছড়িয়েছিল ‘দেশব্যাপি রয়েছে আমাদের নেটওয়ার্ক’ বা ‘বাংলাদেশ বাংলালিংকড’।

রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান এই তিনটি অঞ্চল মিলে দেশের সবচে’ বড় কৃষিপ্রতিবেশ এলাকাটি ছিল কর্পোরেটের চিহ্নিত ‘বাংলাদেশ’ ভূগোলের বাইরে।

‘নিরাপত্তা’ নামের এক প্রশ্নহীন সাফাই দিয়ে রাষ্ট্র দীর্ঘসময় যাবত পার্বত্য চট্টগ্রামে মোবাইল বাণিজ্য চালু করতে দেয়নি।

পরবর্তীতে যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে এই বাণিজ্য চালু হল তখন গ্রামীণ ফোনের একটি বিজ্ঞাপনে দেখা গেল পাহাড়ের এক সবুজ হাতছানি বিজ্ঞাপন।

সবুজ পাহাড়ের গায়ে এক জুমঘর আর সেখানে ভেসে যাচ্ছে গ্রামীণ ফোনের নীল নীল সিলছাপ্পর।

‘আপনাকে কাছে রাখতেই আমাদের এতো দূরে আসা’ বলে গ্রামীণফোন মোবাইল-বাণিজ্যের ছুতোয় আমাদের মনস্তত্ত্বে একটি ‘দূরত্বের’ হিসাবকেও হাজির করল।

আর এই দূরত্বের মাপকাঠিতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম’ সম্পর্কিত আমাদের অধিপতি মনস্তাত্ত্বিক নির্মাণের যেন কোনো ব্যাঘাত তৈরি না হয় যে দিকেও গ্রামীণফোন তার কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাকে সজাগ রাখল।

কিন্তু গ্রামীণফোন যাবতীয় কর্পোরেট ঘাম ও কষ্টকে জলাঞ্জলি দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এলেও রক্তাক্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের কতোটা কাছাকাছি আসতে পারল বা আসতে চাইল কিনা বা আদতেই আসার কোনো খায়েশ আছে কিনা সেটাই চলতি আলাপের কেন্দ্রীয় গন্তব্য।

কর্পোরেট রাষ্ট্র কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরন্তর জিইয়ে রাখা প্রশ্নহীন গণহত্যার কতটা কাছে আসতে পেরেছে গ্রামীণফোনের এই সবুজ হাতছানির বিজ্ঞাপন?

যে জুম ঘরের কাছে গ্রামীণফোন তার বাণিজ্য ফেরী করতে ঢুকেছে তা কি ঐ জুমঘরের আহাজারিকে টের পায় বা পাওয়ার গর্দান রাখে? অথচ অধিপতি গণমাধ্যম এইসব কর্পোরেট বিজ্ঞাপন ছাড়া যেন হাত পা মেলতে পারে না।


গণমাধ্যমের ‘গণ’ কি পাহাড়ের আদিবাসীরাও
?

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী চাকমা, ম্রাইনমা(মারমা), বম, ত্রিপুরা, লুসাই, পাংখো, খুমী, ম্রো, চাক, তনচংগ্যা, মিজো, কুকি, আসাম, নেপালি, সাঁওতাল, মৈতৈ মণিপুরী, খিয়াংসহ রাষ্ট্রের জনসংখ্যানুপাতিক হিসাবের খাতায় এই প্রান্তিক জনগণের অবয়ব ও সীমানা বিদ্যমান গণমাধ্যমেও বরাবর প্রশ্নহীনভাবে বেশ দাপটের সাথেই উপস্থাপন করা হয়।

এইসব জনগোষ্ঠীর নাক চ্যাপ্টা, এরা পাহাড় জংগলে থাকে, সাপ-ব্যাঙ যা পায় তাই খায়, পাহাড় জংগল ধ্বংস করে জুম চাষ করে, চ্যাং ব্যাং ভাষায় কথা বলে, এদের অনেকেই ল্যাংটা থাকে এবং প্রেতপূজা করে, এরা খুব সহজ সরল আদিম, এরা ভয়ংকর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করতে চায় বলে রাষ্ট্র বারবার এইসব পাহাড়ি উপজাতিদের ঠান্ডা করতে জান জীবন হারায় …।

এই হল পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে রাষ্ট্রের তথাকথিত মূলধারার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, যা অনিবার্যভাবে আমাদের বিদ্যমান গণমাধ্যম সমূহেও বিরাজিত আছে।

রাষ্ট্রের মূলধারার এই উপনিবেশিক কর্তৃত্ববাদী আচরণ এবং বিবেচনা বদলাতে এখনও পর্যন্ত বিদ্যমান গণমাধ্যম প্রক্রিয়া তেমন একটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারেনি।

যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় এক লাখ জনগণের জুম জমিনকে ডুবিয়ে দিয়ে জনজীবনকে উদ্বাস্তু করে রাঙামাত্ত্যার হর্ণফুলী নদীতে ১৯৬২ সালে চালু করা হল ‘কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র’, তখনকার গণমাধ্যম এই অন্যায্য বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়নি।

জনজীবন ও প্রাণবৈচিত্র্যের আহাজারি গণমাধ্যমে কোনোভাবেই জায়গা পায়নি, কারন কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র কাপ্তাই বাঁধকে অনিবার্য মনে করেছে আর কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের গণমাধ্যমও রাষ্ট্রের মনস্তত্বকেই হাজির করেছে বা করতে বাধ্য হয়েছে বা তাই করতে চেয়েছে।

আশির দশকে যখন বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গ থেকে ট্রাকে করে দরিদ্র বাঙালি মুসলমানদের এনে ঢুকানো হল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পাহাড়ে তখনও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী, আদিবাসিন্দা জনগণ এবং অভিবাসিত দরিদ্র বাঙালি কারোর করুণ আহাজারি, দ্রোহ এবং বিবেচনাই আমাদের গণমাধ্যমে জায়গা করতে পারেনি।

১৯৯০ সন পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের সায়ত্ত্বশাসনের আন্দোলনের খবরাখবর আমাদের গণমাধ্যমে জায়গা পায়নি, লোহাং গণহত্যার পর যখন পুরো পার্বত্য জনপদ বুকের কলিজা রাষ্ট্রের বন্দুকের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে রাস্তায় নেমেছিল তারপর থেকে আমাদের গণমাধ্যম পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের অন্যায্য নিপীড়নকে কিছুটা প্রশ্ন করতে সাহসী হয়েছে।

নব্বই এর পর থেকেই গণমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামভিত্তিক গণমাধ্যমের উপস্থাপনের রাজনীতি এবং দৃশ্যমানতার কর্তৃত্ব ও দখলসমূহ অনেক বেশী স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৯৩ সনে আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ, প্রতি বছর ৯ আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস, দুটি আদিবাসী দশক ঘোষণা, কল্পনা চাকমা অপহরণ, ১৯৯৭ সনে রাষ্ট্র এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির ভেতর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তি, দাতা সংস্থা কর্তৃক আদিবাসী বিষয়ক তথাকথিত দরদী প্রকল্প, বাঙালি গবেষকদের পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে হাজারে বিজারে ‘কনসালট্যান্সি’, বহুজাতিক কর্পোরেট পর্যটন বাণিজ্যের প্রসার, জাতিসংঘে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম আরো বিশেষায়িত হয় মূলধারার মনস্তত্ত্বে।

নব্বই পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিভিন্ন সময়ে মনোযোগ এবং জায়গা পেলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপনিবেশিক দৃশ্যমানতা বন্ধ হয়ে যায় না, এই সময়ে ‘উপজাতি’ না বলে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উপস্থাপনের মায়াকান্নায় গণমাধ্যম তার কর্তৃত্ববাদী প্রগতিশীল চরিত্রকেই প্রকাশিত করে তুলে।

ইতিমধ্যে আবার অনেক মিডিয়া ‘সকল মানুষের কথা বলতে পারার’ মতো নিজেদের ক্ষমতা জাহির করার জন্য ‘হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের বম সংস্কৃতি’ বা ‘ম্রো মেয়ের দু:খ’ শীর্ষক উপস্থাপনকে অবধারিতভাবে বৈধ করতে থাকেন।

এরইমধ্যে পাহাড়ি ঝর্ণায় স্নানরত কোনো ম্রো নারীর ছবি তোলার জন্য কোনো কোনো দাতাসংস্থা টাকার বন্যা বইয়ে দেন এবং মারদাঙ্গা গণমাধ্যম উপস্থাপনায় ‘প্রায় ল্যাংটা’ ম্রো নারীর দৃশ্যমানতার নির্মাণই আবারো পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ঘুরেফিরে স্থির হয়।

উপস্থাপনার সেই একই উপনিবেশিক ভঙ্গি, বলপ্রয়োগের সেই একই যন্ত্রণা যার লক্ষ্য বারবার পার্বত্য চট্টগ্রাম। আর এবাবেই আমাদের গণমাধ্যম এবং উপস্থাপনের রাজনীতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রশ্নহীন কায়দায় প্রান্তিক হয়ে আছে বা পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে।

চলতি সময়ে দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ১২০টি দৈনিক পত্রিকা, ৩০০ সাপ্তাহিক পত্রিকা, দশের অধিক টেলিভিশন চ্যানেল এবং বেশকিছু রেডিওসহ সকল গণমাধ্যমেই পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রান্তিকীকরণের জায়গাটি স্পষ্ট।

যে স্পষ্টতাকে মালিশ করে করে তৈরী হয় গ্রামীণফোনের মতো কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত ইতিহাস।

যেখানে বিমানবন্দরে বাংলালিংকের বিজ্ঞাপনে আদিবাসী নারীদের নাচ আর চাবাগানের শ্রমিক নারীর হাসির ছলকানি আমাদের ধারে হাজির করে এক বানোয়াট ও মিথ্যা দলিল।

বিদ্যমান গণমাধ্যমে খুব একটা পাহাড়ের আহাজারি, জনগণের যাপিত জীবনের দ্রোহ ও বিরাজমান নিপীড়ন প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়ে ওঠে না।

পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ও প্রচারিত গণমাধ্যমসমূহও পাহাড়ের আর্তনাদ ও বিরাজমান বহ্নিশিখাকে খুব একটা নজরে আনেনি।

রাঙামাটি চাকমা রাজবাড়ি থেকে রানী বিনীতা রায়ের সম্পাদনায় ১৯৩৬ সালের এপ্রিল-মে মাসে প্রকাশিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম পত্রিকা ‘গৈরিকা’।

গৈরিকার পর বেশ কিছু সাংগঠনিক পত্রিকা, সাময়িকী এবং ছোট কাগজের প্রকাশনা অব্যাহত থাকে। যেমন, ১৯৪০ সালে প্রগতি, ১৯৪৭ সালে রাঙ্গমাটি নিউজ, ১৯৬২ সালে রাঙ্গামাটি, ১৯৬৬ সালে বান্দরবান থেকে ঝরণা এবং ১৯৬৭ সালে পার্বত্য বাণী এইরকমের কিছু পত্রিকা প্রকাশ করে স্থানীয় জনগণ নিজেদের আপন আহাজারিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

যদিও সেসবের অধিকাংশই জাতিগত সংস্কৃতির লড়াইয়ের জায়গা থেকে তেমন একটা কার্যকরী এবং উপনিবেশিকতা বিরোধী ছিল না।

চলতি সময়ে বান্দরবান থেকে দৈনিক মৈত্রী, নতুন বাংলাদেশ, রাঙ্গামাটি থেকে দৈনিক গিরিদর্পণ, সাপ্তাহিক বনভূমি, দৈনিক রাঙ্গামাটি, দৈনিক পার্বত্য বার্তা, এবং খাগড়াছড়ি থেকে দৈনিক অরণ্যবার্তা, প্রতিদিন খাগড়াছড়িসহ অনেক ছোট কাগজ ও পার্বত্য জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ভাষা এবং বর্ণমালায় মূদ্রিত দলিল প্রকাশিত হচ্ছে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হল বিদ্যমান পার্বত্য চট্টগ্রামের গণমাধ্যমেও কি পাহাড়ের বিরাজমান আহাজারি এবং প্রান্তিক স্বর আপন কায়দায় জায়গা করে নিতে পারছে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের ঐতিহাসিক পেশা জুম আবাদ করা, গণমাধ্যম কখনোই জুমনির্ভর জনগণের জায়গা থেকে জুমকে উপস্থাপন করে না।

পাহাড়ে পাহাড়ে প্রশ্নহীন অধিগ্রহণ, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকসহ দাতা গোষ্ঠীর টাকায় প্রাকৃতিক বন কেটে রাবার চাষ, প্রভাবশালীদের পাহাড় বাণিজ্য, কর্পোরেট পর্যটন আগ্রাসন, প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বন্ধ করে চুক্তিবদ্ধ তামাক চাষসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম বিরাজমান নিপীড়ন এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে পার্বত্য জনগণের যাপিতজীবনের দ্রোহ ও অস্তিত্বের সাথে সামিল হতে আমাদের গণমাধ্যম তেমন একটা সাহসী হয়ে ওঠে না।

কিন্তু সমাজে গণমাধ্যমের ভূমিকাই তাই হওয়া জরুরী, জনগণের যাপিতজীবনের আপন ভঙ্গির সাথে নিজেকে কর্তৃত্বহীন কায়দায় সংলগ্ন করা।

যেখানে জনগণের শ্রেণীমুক্তির প্রশ্ন জড়িত সেখানেই গণমাধ্যমের ভূমিকা সবচেয়ে জরুরী এবং অধিপতি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকেও সেখানে জনগণের বিপ্লবী বন্ধু হওয়া দরকার।

পার্বত্য চট্টগ্রাম গণমাধ্যমকে নিজেদের যাপিতজীবনের অংশ হিসেবে দেখতে চায়, কোনো অধিপতি কর্তৃত্বপরায়ণ উপনিবেশিক প্রক্রিয়া হিসেবে নয়।

লেখকঃ পাভেল পার্থ। গবেষক ও লেখক। animistbangla@gmail.com

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply