icon

চাকমা জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার

Jumjournal

Last updated Dec 23rd, 2019 icon 544

চাকমা উত্তরাধিকার প্রথার উদ্ভব

পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী চাকমাদের মধ্যে জুমচাষ অন্যতম প্রধান পেশা। ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধির ৪২ বিধিমতে পাহাড়ে জুম চাষের জন্য জমির মালিকানা স্বত্বের প্রয়োজন হয় না, যার কারণে গ্রামীণ চাকমা সমাজে স্থাবর সম্পত্তির তথা ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব অতীতে তেমন একটা ছিল না বললেই চলে।

এ অবস্থায় গ্রামীণ সমাজে সম্পত্তির উত্তরাধিকার অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী চাকমাদের মধ্যে অতীতে তেমন একটা গড়ে উঠেনি, যদিও জুম চাষের জন্য জমির অপ্রতুলতা এবং পর্যায়ক্রমে একই জমিতে বংশানুক্রমিকভাবে অবস্থানের কারণে গ্রামীণ চাকমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমানে উদ্যান কৃষির প্রতি মনোযোগের পাশাপাশি শিক্ষিত চাকমা সমাজে ভূ-সম্পত্তির উপর জমিসহ মালিকানা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণার উদ্ভব হয়েছে।

এ নিয়ে সমাজে এ যাবত খুব একটা জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়নি, যার ফলে সমাজ এখনও জটিল সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধের মুখোমুখি হয়নি।

চাকমা সমাজে উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি অর্জন ও সঞ্চিত হওয়ার পর সম্পত্তির মালিকের মৃত্যু হলে সে সব ভাগবন্টনের প্রশ্নের উদ্ভব হয়। আর এই ভাগ বন্টের একটি নিয়মনীতির প্রয়োজন সাধারণভাবে দেখা দেয়।

স্বাভাবিকভাবে সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুজনিত কারণে সম্পত্তি হস্তান্তরই শুধু নয়, তার উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে ভাগবন্টনের প্রশ্নও দেখা দেয়। সম্পত্তির হস্তান্তর ও উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে ভাগবন্টনের বিষয়টি দিনে দিনে গুরুত্ব পেতে থাকে এবং একসময় তা সমাজের সচেতন ব্যক্তি ও সমাজপতিদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়, এভাবেই চাকমা সমাজে সম্পত্তির উত্তরাধিকারের একটি রীতির প্রচলন হয়েছে।

চাকমা সমাজভুক্ত পরিবারের প্রধান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করার দায়-দায়িত্ব পালন মৃতের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবার সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং পারিবারিক কর্তব্য হিসেবে সমাজে স্বীকৃত।

 

চাকমা উত্তরাধিকারের সাধারণ নীতি

উত্তরাধিকার: চাকমা সমাজভুক্ত কোনো পরিবারের প্রধান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার সৎকার, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের বেলায় সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সমাজের অনুশাসন ও রীতি অনুসারে মৃতের আত্মার সদগতির জন্য বিশেষ কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির আইনগত উত্তরাধিকারী হতে হয়।

 

উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি কি কি: সম্পত্তির মালিক মৃত্যুকালে যেসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রেখে যায় সেগুলোই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য। অস্থাবর সম্পত্তি যেমনঃ- আসবাবপত্র, থালাবাটি, কাপড়-চোপড়, অলংকার, গরু, মহিষ, ছাগল ইত্যাদি উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে আপোষ রফায় ভাগবন্টন হয়। কিন্তু লিখিত কোনো আইন বা বিধি-বিধানমতে সেগুলো ভাগবন্টন করা হয় না।

কেবলমাত্র ভূমি তথা জায়গা-জমিকে স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে সামাজিক বিধি-বিধানমতে ভাগবন্টন করা হয়। তাই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি বলতে সাধারণভাবে স্থাবর সম্পত্তিকেই বুঝানো হয়।

কিন্তু একজন সম্পত্তির মালিকের সম্পূর্ণ স্থাবর সম্পত্তি উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না। সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুর পর তার সৎকার/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয়, তার অনাদায়ী ঋণ (যদি থাকে) এবং জীবদ্দশায় দখল হস্তান্তরিত হয়েছে কিন্তু মালিকানা স্বত্ব হস্তান্তরিত হয়নি এমন ভূ-সম্পত্তির দায়/দাবী মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে তার উপরই উত্তরাধিকারীগণের অধিকার বর্তায়।

চাকমা উত্তরাধিকার প্রথা অনুযায়ী পরিবারের যে ব্যক্তি/সদস্য প্রথমে মৃতের চিতায় আগুন দেয় এবং পরদিন সকালে পানি ঢেলে চিতা পরিষ্কার করে মৃতের হাড় ভাসায় (দেহাস্থি নদীর পানিতে বিসর্জন দেয়) তাকেই মৃত ব্যক্তির ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়।

চাকমা পরিবারের একজন ছেলে বিয়ে হওয়ার পরপরই পিতার পরিবার থেকে প্রায়ই পৃথক হয়ে যায়। পিতার সম্পত্তির লাভের জন্য অন্ততঃ একজন পুত্র যেন পিতার মৃত্যুকাল পর্যন্ত এক সাথে থেকে তাদের দেখাশুনা করে সম্ভবতঃ সেই উদ্দেশ্যেই এই হাড়ভাসা সুদোম (রীতি) চাকমা সমাজে চালু করা হয়েছিল। এই সুদোম (রীতি) অনুযায়ী চাকমা সমাজে আজও পরিবারের পুত্রই মৃত ব্যক্তির চিতায় প্রথমে আগুন দেয়।

 

নারীর উত্তরাধিকার: চাকমা সমাজে মেয়েরা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। মেয়েদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। চাকমা সমাজের রক্ষণশীল মনোভাবই প্রধানতঃ মেয়েদেরকে পিতৃ সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কারণ।

এছাড়া ভিন্ন ধর্মাবলম্বী পুরুষকে বিবাহের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করাও অন্য একটি কারণ হতে পারে। চাকমা মেয়েদেরকে পরোক্ষভাবে ভিন্ন ধর্ম ও জাতির পুরুষ বিবাহ করা থেকে বিরত রাখা না হলে চাকমাদের সম্পত্তি ভিন্ন জাতির কাছে চলে যেতে পারতো

চাকমা মেয়েরা একেবারে যে সম্পত্তি পায় না তাও পুরোপুরি সত্য নয়। সম্পত্তির মালিকের যদি কন্যা সন্তান ছাড়া কোনো পুত্র সন্তান না থাকে তাহলে মেয়েরা পিতৃ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। সেক্ষেত্রে মেয়েরা পুত্রগণের মতোই হারাহারিভাবে সম্পত্তির মালিকানা স্বত্ব লাভ করে।

তাছাড়া নাবালিকা মেয়েরা বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে ভরনপোষণ লাভ করে। তাই চাকমা সমাজে মেয়েদেরকে যে পুরোপুরি পিতৃ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সে কথাও সম্পূর্ণ সত্য নয়।

 

উত্তরাধিকারীগণের অগ্রাধিকারের ক্রম: চাকমা সমাজে একজন মৃত বা মৃতার উত্তরাধিকারীগণের অগ্রাধিকারের ক্রমপর্যায় নিম্নোক্তভাবে নিরূপণ করা হয়ঃ

পুত্র সন্তান, পুত্র বধু পৌত্র এবং অবিবাহিত কন্যা সন্তান পুত্র সন্তান: পিতামাতার সম্পত্তির অপ্রতিরোধ্য ও একক উত্তরাধিকারী। অন্য না কোনো কুদুমের (আত্মীয়/আত্বীয়ার) উপস্থিতি তাকে তার এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না। বরং তার উপস্থিতি অন্য সকল আত্মীয়কে বঞ্চিত করে। পিতার মৃত্যুর পরে জাত (Posthumous Child) পুত্র, দত্তক পুত্র এবং অবৈধ সন্তান, তার সন্তান হিসেবে গণ্য হয়। পিতার জীবদ্দশায় মৃত পুত্রের বিধবা স্ত্রী ও পুত্র/পুত্রের পুত্র (নাতি) নাবালিকা বা অবিবাহিতা কন্যা সন্তান বিবাহ না হওয়া পর্যন্ত পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে ভরনপোষণলাভের অধিকারী হয়।

 

নজিরঃ উত্তরাধিকারী হিসেবে কন্যাদের চেয়ে পুত্র/পুত্রদের অগ্রাধিকারের এই ক্রম পর্যায়ের নজির স্বরূপ রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কাউখালী উপজেলাধীন ৯৯নং ঘাগড়া মৌজার হেডম্যান প্রয়াত দীন মোহন দেওয়ানের ৪ জন কন্যা ও পুত্রের মধ্যে সম্পত্তি বন্টনের বেলায় পুত্র স্নেহ কৃমার দেওয়ান কর্তৃক উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার সমুদয় সম্পত্তির মালিকানা লাভের ঘটনার উদাহরণ আছে, যা নামজারী মামলা ১৪৬/৫২-৫৩ মূলে নিষ্পত্তি হয়েছিল

কোনো ব্যক্তি একাধিক সন্তান রেখে মারা গেলে পুত্রগণ সবাই হারাহারিভাবে (সমান অংশে) মৃত পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

 

নজিরঃ ১১৬নং রাঙ্গামাটি মৌজার রামচন্দ্র কার্বারী, তার উত্তরাধিকারী হিসেবে অনিল কুমার চাকমা ও আনন্দ কুমার চাকমা নামে দুই পুত্র রেখে মারা যান। তারা উভয়ে তাদের পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির সমান অংশে উত্তরাধিকার লাভ করে, যা রাঙ্গামাটি সদর মহকুমার নামজারী মামলা নং- ৫৯/৫০-৫১ মূলে তাদের নামে নামজারী হয়

কোনো ব্যক্তি একাধিক স্ত্রীর গর্ভজাত একাধিক পুত্র সন্তান রেখে মারা গেলে পুত্রগণ সবাই হারাহারিভাবে পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

 

নজিরঃ ১১৮নং ধনপাতা মৌজার সুধন্য চাকমা তার প্রথমা স্ত্রীর গর্ভজাত (১) শান্তিপদ চাকমা (২) গৌরপদ চাকমা (৩) কালিপদ চাকমা (৪) কৃষ্ণপদ চাকমা ও (৫) করুনাময় চাকমা এবং দ্বিতীয়া স্ত্রীর গর্ভজাত একমাত্র পুত্র বিনিময় চাকমাকে রেখে মারা যান। তারা সবাই মৃত পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তি সমান অংশে উত্তরাধিকার লাভ করে, যা নামজারী মামলা নং-১৫৫/৬০-৬১ মূলে তাদের নামে মৌজা জমাবন্দীতে রেকর্ড করা হয়

কোনো পুত্র তার পিতার জীবদ্দশায় পৃথকান্নে চলে গেলে পিতার মৃত্যুতে সেই পুত্রও অন্যান্য পুত্র/পুত্রগণের সাথে সমান অংশে পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

 

নজিরঃ ১১৩নং তৈমিদং মৌজার চন্ডিয়া চাকমার দুই পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র কালিকুমার চাকমা পিতার জীবদ্দশায় পৃথকান্নে চলে যায়। কনিষ্ঠ পুত্র রামকুমার চাকমা পিতার মৃত্যুকাল পর্যন্ত পিতার সঙ্গে বসবাস করে। জ্যেষ্ঠ পুত্র পিতার জীবদ্দশায় পৃথকানে চলে গেলেও পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির অর্ধেক অংশের উত্তরাধিকারী হয়। পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির সমান অংশে নামজারীর জন্য দায়েরকৃত নামজারী মামলা নং১০৬/৪৯-৫০-এতে কনিষ্ঠ পুত্র রামকুমার চাকমা আপত্তি জানালে সদর মহকুমা প্রশাসক তা নাকচ করে দেন

উম্মাদ কিংবা শারীরিক প্রতিবন্ধী পুত্র ও অপর ভাইদের সাথে পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ও সমান অংশের অংশীদার হয়।

 

নজির: প্রাক্তন এম,এল,এ, প্রয়াত কামিনী মোহন দেওয়ানের জ্যেষ্ঠ ভাই মনমোহন দেওয়ান মানসিক প্রতিবন্ধী (উন্মাদ) ছিলেন। তার বাবা ত্রিলোচন দেওয়ানের মৃত্যুর কিছুদিন পরে তার মৃত্যু হয়। তার একমাত্র পুত্র খগেন্দ্র লাল দেওয়ান তখন তার পিতামহের সম্পত্তি থেকে তার পিতার প্রাপ্য অংশের উত্তরাধিকারী হন। কোনো অবিবাহিত/নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্পত্তি রেখে মারা গেলে তার সহোদর ভাই/ভাইগণ, ভাইয়ের অবর্তমানে বোন/ বোনগণ তার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়

 

নজির: ১২২নং কুতুবদিয়া মৌজার বাসিন্দা জ্ঞানেন্দ্র নাথ চাকমা, পিতাঃ কৃষ্ণ চরণ চাকমা অবিবাহিত অবস্থায় মারা গেলে তার সহোদর ভাই বীরেন্দ্র লাল চাকমা তার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে। নামজারী মামলা নং- ২৫১/৪৯-৫০ মূলে জ্ঞানেন্দ্র নাথ চাকমার ত্যাজ্য সম্পত্তি বীরেন্দ্র লাল চাকমার নামে মৌজা জমাবন্দীতে রেকর্ডভুক্ত হয়

 

 

কন্যা সন্তান:

কোনো ব্যক্তি পুত্র সন্তান ছাড়া কন্যা সন্তান রেখে মারা গেল, কন্যা কন্যাগণ মৃত পিতার যাবতীয় সম্পত্তির উত্তর হয়।

নজির: ৫৮নং হাজারিবাগ মৌজার বাসিন্দা জরৎকার মুনি চাকমা কোনো পুত্র সন্তান ছাড়া এক কন্যা উর্মিলা চাকমাকে রেখে মারা গেলে সে তার মৃত পিতার সমূদয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় এবং নামজারী মামলা নং- ৬৮/৪৮-৪১ মূলে উক্ত সম্পত্তি তার নামে নামজারী ও মৌজা জমাবন্দিতে রেকর্ড করা হয়

চাকমা প্রথামতে সাধারণত বিধবা স্ত্রী মৃতস্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। সে দ্বিতীয়বার বিয়ে না করা সাপেক্ষে স্বামীর ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে মৃত্যুকাল পর্যন্ত ভরণপোষণ পায়। তবে কোনো ব্যক্তি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তার বিধবা স্ত্রী মৃতস্বামীর যাবতীয় ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

 

নজির: ১২৪নং নারাইছড়ি মৌজার বাসিন্দা তিলক চন্দ্র দেওয়ান নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তার দুই বিধবা স্ত্রী যথাঃ- মালতি দেওয়ান ও খুলাবি দেওয়ান ১২২নং কুতুবদিয়া মৌজাস্থ জমির সমান অংশে উত্তরাধিকারী হন

কোনো ব্যক্তি অবিবাহিত অবস্থায় বোন ব্যতীত পিতা-মাতা ও আপন ভাই কিছু না রেখে মারা গেলে বোনই তার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

 

নজিরঃ ১২২নং কুতুবদিয়া মৌজার বাসিন্দা সতীন্দ্র লাল চাকমা অবিবাহিত অবস্থায় মারা যায়। তার কোনো সহোদর ভাই ছিল না। তার পিতা-মাতাও তার মৃত্যুর আগেই মারা যায় । সতীন্দ্র লাল চাকমার মৃত্যুর পর তার তিন সহোদর বোন যথাঃ- (১) ইন্দ্রমুখী চাকমা (২) বিনয়মুখী চাকমা ও (৩) সুরজবালা চাকমা তার ত্যাজ্য সম্পত্তির সমান অংশে উত্তরাধিকারী হয়১০

যদি কোল বিপত্নীক ব্যক্তির পুত্র-কন্যাদের মধ্যে কন্যাই যদি সর্বশেষে পিতার পরিবার থেকে পৃথকান্নে বৈবাহিক কারণে) চলে যায়। বিপত্নীক পিতার আমৃত্যু ভরণপোষণ করে থাকে, তাহলে সে তার পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে তার পৃথকান্নে যাওয়া ভাই-এর পুত্রদের থেকে অগ্রাধিকার পায়। এক্ষেত্রে তাদের পৃথকান্নে যাওয়ার সময়টা একটি যুক্তিসঙ্গত সীমার মধ্যে থাকতে হয়১১

 

যদি কোনো পুত্র ও সহোদর ভাই একান্ন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে আলাদাভাবে বসবাস করে, অন্যদিকে কোনো বিবাহিত কন্যা স্বামী-সন্তান নিয়ে পিতার পরিবারে বসবাস করে আমৃত্যু পিতা-মাতার। ভরনপোষণ দিয়ে যায়, তাহলে সেই কন্যা তার মাতার সাথে মৃত পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

কোনো বিবাহিত কন্যা ভাইয়ের অবর্তমানে স্বামী ও সন্তান নিয়ে পিতার পরিবারে বসবাসকালে যদি মারা যায় এবং তার স্বামী ও পুত্র/পুত্রগণ তার পিতা-মাতার আমৃত্যু ভরনপোষণ করে যায়, তাহলে তার পুত্র/পুত্রগণ ও বিধবা মাতা যৌথভাবে তার পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়৫৮

কোনো ব্যক্তি একমাত্র কন্যা সন্তান রেখে অপুত্রক অবস্থায় মারা গেলে কন্যা এবং বিধবা স্ত্রীই যৌথভাবে তার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়১৩

ইতোপূর্বে ৩৫.৪.১০(খ)নং ক্রমিকে উল্লেখিত ব্যক্তির একমাত্র কন্যা যদি পুত্র সন্তান রেখে পিতার আগেই মারা যায়, তাহলে তার পুত্রই (মৃত ব্যক্তি দৌহিত্র) মৃত ব্যক্তির (নানা) ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়১৪

কোনো ব্যক্তি যদি চিরকুমার বা নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যায়, তাহলে তার নিকটাত্মীয়রা যথাঃ- সহোদর ভাই অবর্তমানে বোন এবং পিতামাতা তার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়১৪

পিতা-মাতার একমাত্র পুত্র সন্তান নিজের একমাত্র নাবালক পুত্র বা কন্যা রেখে পিতা-মাতার জীবদ্দশায় মারা যাওয়ার পর তার বিধবা স্ত্রী তার একমাত্র পুত্র বা কন্যা সন্তান নিয়ে শ্বশুরের পরিবার থেকে পৃথকাত্রে চলে গেলে, পরে সে বিয়ে করুক বা না করুক, তার একমাত্র পুত্র বা একমাত্র কন্যা সেক্ষেত্রে তার মাতামহের সাথে থাকলেও মৃত পিতামহের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। যদি লোকটির (সম্পত্তির মালিক) কোনো অবিবাহিত কন্যা পিতার পরিবারে থেকে তাদের মৃত্যুকাল পর্যন্ত ভরনপোষণ করে যায়, তাহলে সেই অবিবাহিতা কন্যা ও তার মাতা এবং নাবালক ভ্রাতুস্পপুত্র/ভ্রাতুস্পুত্রীদের সাথে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়১৫

 

ক) উপরে বর্ণিত ব্যক্তি যদি বিপত্নীক অবস্থায় মারা যায়, তাহলে অবিবাহিত কন্যা ও পৌত্র/পৌলী যৌথভাবে তার ত্যাজ্য সম্পতি উত্তরাধিকারী হয়।

সাধারণ রীতি অনুযায়ী পুত্রগণ মৃত পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। তবে স্ত্রী তার ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে আজীবন ভরনপোষণ পেয়ে থাকে যদি কোনো বিবাহিত কন্যা তার বিধবা মাতার আমৃত্যু ভরনপোষণ করে, তাহলে সেই তার মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

মন্তব্য: চাকমা উত্তরাধিকার প্রথার সাধারণ এবং প্রাথমিক নীতিই হলোঃ পিতার সম্পত্তিতে পুত্র/পুত্রগণের একক এবং অপ্রতিরোধ্য উত্তরাধিকার এবং বিধবা স্ত্রীর আজীবন ভরনপোষণ-এর অধিকার। ভরনপোষণ(পাবার) অধিকার আর উত্তরাধিকার এক জিনিস নয়।

রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বলবৎ ১৯০০ সনের ১নং রেগুলেশনে ৭ ধারামতে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জেলা প্রশাসকগণই একজন মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীগণকে উত্তরাধিকার সনদপত্র দিয়ে থাকেন। চাকমাদের বেলায় তাদের মধ্যে প্রচলিত রীতি ও প্রথা অনুযায়ী উত্তরাধিকারী নির্ধারিত হয়ে থাকে।

কোনো কোনো সনদপত্রে উত্তরাধিকারী হিসেবে মৃত ব্যক্তির স্ত্রীর নাম থাকে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার নাম থাকে না।

 

কেইস রেফারেন্স: রাঙ্গামাটি সার্কেলের চাকমা রাজ পরিবারের অন্যতম সদস্য সলিল চন্দ্র রায়ের পরলোকগমনের পর তাঁর বিধবা স্ত্রী ও চার পুত্রসহ মোট পাঁচজনকে ওয়ারিশ হিসেবে জেলা প্রশাসক পার্বত্য চট্টগ্রাম তাদের উত্তরাধিকার পত্র প্রদান করেন।

অবিভক্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক আলী হায়দার খান তাঁর কার্যালয়ের স্মারক নং৮৮০/এম তারিখঃ ৩০/০৬/১৯৮১ইং মিচ কেইস নং- ৫৪/৮১ মূলে প্রয়াত সলিল চন্দ্র রায়ের উত্তরাধিকার পত্রের এক নং ক্রমিকে সলিল চন্দ্র রায়ের বিধবা স্ত্রী সুনিতা রায় এবং চার পুত্র ক্রমানুসারে (১) তন্ময় রায় (2) সঞ্চয় রায় (৩) শ্রীময় রায় (৪) প্রতিম রায় মোট পাঁচজনকে ওয়ারিশ হিসেবে উত্তরাধিকার পত্র প্রদান করেন।

চিটাগাং হিলট্রেক্ট রেগুলেশন ১৯০০ (১৯০০ সনের ১নং এ্যাক্ট) আইনের ৭ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জেলা প্রশাসক এই পাঁচজনকে উত্তরাধিকার পত্র প্রদানের পাশাপাশি প্রয়াত সলিল চন্দ্র রায়ের বিধবা স্ত্রী সুনিতা রায়কে নাবালক পুত্রের অভিভাবক নিযুক্ত করেন।

যদি কোনো নিঃসন্তান বিপত্নীক লোক কোনো উইলনামা না করে সম্পত্তি রেখে মারা যায়, তাহলে তার আপন ভাই-বোন এবং তাদের অবর্তমানে তাদের সন্তান-সন্ততি ও জীবিত পিতা-মাতা তার সাথে একান্নভূক্ত পরিবারে বসবাস না করেও তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

পুত্র সন্তান, আর পুত্র সন্তানের মৃত্যুজনিত কারণে পুত্রবধু ও পৌত্র ও অবিবাহিত কন্যা সন্তান/পুত্র সন্তান মৃত বা মৃতার অপ্রতিরোধ্য ও একক উত্তরাধিকারী হয়।

 

কন্যা সন্তান: মৃত বা মৃতার কোনো পুত্র সন্তান না থাকলে বিবাহিত বা অবিবাহিত কন্যা সন্তানই মৃত বা মৃতার অপ্রতিরোধ্য উত্তরাধিকারী হয়। কন্যা সন্তানের মধ্যে পিতার মৃত্যুর পরে জাত সন্তান (Posthumous Child), দত্তক পুত্র এবং এক্ষেত্রে অবৈধ সম্ভানও অন্তর্ভুক্ত হয়।

নজির: ১১২নং উলুছড়ি মৌজার বাসিন্দা জনৈক চিন্তাহরন চাকমার মৃত্যুর কিছুদিন পর একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। ফুলরানী চাকমা নাম রেখে তার মাতা তাকে লালন-পালন করে। মৃত চিন্তা হরন চাকমার দুই ভাই সুবল চন্দ্র চাকমা এবং নকুল চন্দ্র চাকমা তাদের মৃত ভাই-এর উত্তরাধিকারী হিসেবে তার ত্যাজ্য সম্পত্তি দাবী করলে নামজারী মামলা নং- ১৬/৫০-৫১ ও মিচ মামলা নং- ১৯৪/৫০-৫১-এর উদ্ভব হয়।

মৃত চিন্তা হরন চাকমার একমাত্র কন্যা সন্তান এবং তার ভাইদের উত্তরাধিকারের দাবীর বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য আদালতের পক্ষ থেকে তদানীন্তন চাকমা চীফের মতামত চাওয়া হয়। চাকমা চীফের মতামতের ভিত্তিতে ফুলরানী চাকমাকেই আদালত মৃত চিন্তা হরন চাকমার একমাত্র উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত করে।

এমনকি উত্তরাধিকার সংক্রান্ত উপরোক্ত মামলা দুইটি বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মৃতের বিধবা স্ত্রী কুমারী চাকমা দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করলেও তাকেই নাবালিকা ফুল রানী চাকমার অভিভাবক নিযুক্ত করা হয়।

 

স্বামী কিংবা স্ত্রী: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যে কোনো একজনের মৃত্যুতে পুত্র/কন্যার অবর্তমানে জীবিত স্ত্রী বা স্বামী মৃত বা মৃতের উত্তরাধিকারী হয়।

নজির: ১২৪নং নারাইছড়ি মৌজার হেডম্যান তিলক চন্দ্র দেওয়ান নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে তার দুই বিধবা স্ত্রী তার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

 

মন্তব্য: স্বামী বা স্ত্রী শুধুমাত্র নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলেই বিধবা বা বিপত্নীক স্বামী একে অপরের উত্তরাধিকারী হয়। তাছাড়া সন্তান থাকলে পিতা বা মাতার একে অপরের উত্তরাধিকারী হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

পিতামাতা: কোনো মৃত বা মৃতার পুত্র বা পৌত্র, কন্যা এবং স্ত্রী কিংবা স্বামী না থাকলে যাদের ঔরসে মৃত বা মৃতা জন লাভ করেছে তারা ঐ মৃত বা মৃতার উত্তরাধিকার স্বত্ব পায়। যথাঃ- মৃতব্যক্তির পিতা আর পিতার অবর্তমানে মাতা১৭

রক্তের সম্পর্ক ও সহ-অংশীদার (Blood Relations and Co-share) কোনো মৃত বা মৃতার পুত্র বা পৌত্র, কন্যা, স্ত্রী কিংবা স্বামী ও পিতা-মাতা কেউই না থাকলে মৃত বা মৃতা পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ না করলে যে ব্যক্তি এই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতো সেই উত্তরাধিকারী কিংবা সেই সম্পত্তির পূর্বসূরী থেকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রাপ্তিতে যে তার সহ-অংশীদার ছিল সেই উত্তরাধিকারী কিংবা সহ-অংশীদার, এরূপ ব্যক্তি মৃত বা মৃতার উত্তরাধিকার স্বত্ব পায়। যেমনঃ- আপন ভাই। এরূপ ভাইয়ের অবর্তমানে আপন বোন, ভাইয়ের মধ্যে বৈমাত্রেয় ভাই এবং ধর্মীয় ভাই (পিতার পালক পুত্র), অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

নজির: ১২২নং কুতুবদিয়া মৌজার বাসিন্দা সতীশ লাল চাকমা চিরকুমার অবস্থায় মারা যায়। তার কোনো ভাই ছিল না। তার পিতামাতা তার মৃত্যুর আগেই মারা গিয়েছিলেন। তারপর তার আপন বোন ইন্দ্রমুখী চাকমা, বিনয়মুখী চাকমা ও সুরজ বালা চাকমা নামজারী মামলা নং- ৯৭/৪১-৪২ মুলে তার ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে।

 

ভরনপোষণ দাতা: কোনো মৃত মৃতার ৩৫,৪,১৭ থেকে ৩৫.৪.২১ নং ক্রমিকে বর্ণিত কোনো উত্তরাধিকারী না থাকলে রক্তের ও ভরনপোষণ সম্পর্কের দিক থেকে উত্তরাধিকার স্বত্ব নির্ধারিত হয়। যেমনঃ- পিতামহ, পিতামহের অবর্তমানে আপন জেঠা, কাকা, তাদের অবর্তমানে কাকাতো ভাই এবং তার বা তাদের অবর্তমানে পিসি ইত্যাদি।

 

একক পরিবারভিত্তিক উত্তরাধিকার পদ্ধতি: কোনো মৃত বা মৃতার কেবলমাত্র স্ত্রী বা স্বামী (যা, যেখানে প্রযোজ্য) কিংবা কেবলমাত্র পুত্র কিংবা পৌত্র কিংবা কেবলমাত্র কন্যা সন্তান বিদ্যমান থাকলে অন্যান্য ‘কুদুম’ (আত্বীয়) বিবেচনাভুক্ত হয় না।

ব্যাখ্যা: কোনো ব্যক্তি, পিতা-মাতা, স্ত্রী, ১ পুত্র, ২ শিশু কন্যাসহ ১ বিধবা পুত্রবধু, বড় ভাই, আপন কাকা ও অবিবাহিত কন্যা রেখে মারা গেলেন। এখানে মৃতের উত্তরাধিকারী হয় মৃতের স্ত্রী, পুত্র, ২ শিশু সন্তানসহ পুত্রবধু। অন্যান্যরা বিবেচনাভুক্ত হয় না।

 

উত্তরাধিকার সম্পত্তি হারাহারি নিয়মে ভাগবাটোয়ারা হয়:- উত্তরাধিকারীদের মধ্যে উত্তরাধিকার জনিত সম্পত্তি বন্টনকালে সমপর্যায়ের সহ-অংশীদারদের মধ্যে হারাহারি নিয়মে বন্টন হয়।

বন্টন নীতি: সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে সব উত্তরাধিকারী সমান অংশ পায়। এমনকি অনেক তালিকাভূক্ত উত্তরাধিকারী মোটেই সম্পত্তি পায় না। যেমনঃ- মৃত পুত্রের সন্তান, নাবালিকা এবং অবিবাহিত কন্যা এবং স্ত্রী বা স্বামীর নাম একজন মৃত বা মৃতার উত্তরাধিকার সনদপত্রে তালিকাভুক্ত হয়।

কিন্তু সম্পত্তি বন্টনকালে প্রায় ক্ষেত্রে সম্পত্তি তার সন্তানরাই পায়। মৃতের স্ত্রী তার পুত্রগণ সাবালক না হওয়া পর্যন্ত পুত্রদের দেহ/সম্পত্তির অভিভাবকত্ব করে থাকে। আর পুত্রগণ সাবালক হলে তাদের সম্পত্তি বন্টন করে দিয়ে তাদেরই ভরনপোষণের আওতায় চলে আসে।

আর বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত ভাইদের ভরনপোষণের আওতায় থাকে। এই ‘সুদোম’ গড়ে উঠার কারণ হলো, মায়ের আমৃত্যু এবং বোনদের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত পিতৃ সম্পত্তি থেকে ভরনপোষণ নিশ্চিত করা।

তাই সম্পত্তি বন্টনকালে মা কোনো সম্পত্তি নেয় না। আর বোন/বোনদের বিয়ে হয়ে গেলে তারাও আর সম্পত্তি পায় না। কাজেই সম্পত্তি বন্টিত হয় মৃতের পুত্র-সন্তানদের সংখ্যার অনুপাতে হারাহারিভাবে।

 

মন্তব্য: উত্তরাধিকার সনদপত্র লাভের পর উত্তরাধিকারীদের পক্ষ থেকে যে কোনো একজনকে পিতার নামীয় সম্পত্তি তাদের নামে নামজারী করার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করতে হয়। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি নামজারী মামলার উদ্ভব হয়।

উত্তরাধিকারীগণের সকলের মতামতের ভিত্তিতে নামজারীর আদেশ হয় এবং এজমালিতে সম্পত্তি রেকর্ডভূক্ত হয়। উত্তরাধিকারীগণের যার যার প্রাপ্য অংশ নিজেদের নামে আলাদা করে নামজারী করার জন্য আরও একটি মামলা দায়ের করতে হয় এবং তা হয় একটি বন্টন মামলা।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক বিভিন্নভাবে উত্তরাধিকার সনদপত্র দিয়েছেন। কোনো কোনো জেলা প্রশাসক কন্যাগণকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পুত্রদের নামে এবং পুত্রগণ সবাই নাবালক থাকায় তাদের অভিভাবক হিসেবে থাকার জন্য মৃতের স্ত্রীকেও উত্তরাধিকারীগণের তালিকায় রেখেছেন।

কন্যাগণকে উত্তরাধিকারীর তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিরুদ্ধে দু’একজন মহিলা ইতিমধ্যে মামলাও করেছেন। সম্ভবতঃ সেই কারণেও জেলা প্রশাসকগণ স্ত্রী ও কন্যাদের উত্তরাধিকার সনদপত্রে অন্তর্ভূক্ত করছেন।

স্ত্রী ও কন্যা/কন্যাগণ উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হয়েও মৃত স্বামী বা পিতার সম্পত্তি পায় না, এই কথাটি কোনো যুক্তিতেই খাটে না। উত্তরাধিকারী হয়েও পুত্র বা ভাই- এর জন্য সম্পত্তি পায় না তা কেননা নীতি বা প্রথা হতে পারে না।

প্রকৃত ঘটনা হলো, পুত্র-সন্তানই মৃত পিতার সম্পত্তি পায়, স্ত্রী বা কন্যা সন্তান সম্পত্তি পায় না। তাই পুত্রদের সাথে যদি স্ত্রী ও কন্যাকে সনদপত্রে উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে তা সম্পূর্ণ ভুল। এতদিন যাবত ভুলভাবেই তা করা হয়েছে।

 

হারাহারি নিয়ম প্রয়োগে পূর্বসূরী থেকে মৃত্যুর পূর্বে প্রাপ্ত অংশও অন্তর্ভূক্ত হয়: কোনো ব্যক্তি যদি তার পূর্বসূরীর মৃত্যুর পরে প্রাপ্তব্য অংশ তার (পূর্বসূরীর) মৃত্যুর আগেই পেয়ে থাকে, তাহলে সে পূর্বসূরীর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হিসেবে অন্যান্য সহ-উত্তরাধিকারীগণের সাথে হারাহারি নিয়মে অংশ প্রাপ্তি কালে পূর্বসূরী থেকে তার মৃত্যুর পূর্বে প্রাপ্ত অংশও অন্তর্ভূক্ত হয়।

ব্যাখ্যা: উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তিই কেবল উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে হাৱাহারি নিয়মে ভাগবন্টন হয়। কিন্তু কোনো কোনো পূর্বসূরী তার মৃত্যুর আগেই কোনো এক পুত্রকে পৃথকাত্রে পাঠিয়ে তার প্রাপ্য অংশ দানসূত্রে নামজারী করে দখল বুঝিয়ে দেয়। বাকী সম্পত্তি তার মৃত্যু পর্যন্ত তার নামে থেকে যায়।

কিন্তু তার (সম্পত্তির মালিক) অবশিষ্ট সম্পত্তি অন্য পুত্রদের মধ্যে হারাহারি নিয়মে ভাগবন্টন হয়। যে পুত্র আগেই পিতার সম্পত্তিতে তার নিজ অংশ পেয়েছে, সে পিতার অবশিষ্ট সম্পত্তি থেকে আর কোনো অংশ পায় না, যদি সে দাবী করে, তাহলে পূর্বে যে সম্পত্তি সে পেয়েছে, তাও হিসাবের মধ্যে রেখে পুরো সম্পত্তি উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে হারাহারিভাবে বন্টন হয়।

 

হারাহারি নিয়মের ব্যতিক্রম বা বৃদ্ধি প্রাপ্তি: কোনো উত্তরাধিকারী যদি (ক) পৃথকান্নে গিয়ে তার পূর্বসূরী থেকে কোনো সম্পত্তি খরিদ করে, কিন্তু নামজারী করতে পারেনি, সেই সম্পত্তি কিংবা (খ) পূর্বসূরী কর্তৃক তার ও তার স্ত্রীর বৃদ্ধকালের ভরনপোষণ ও মৃত্যু পরবর্তী দাহ ক্রিয়া বা ‘সাতদিন্যার’ (শ্রাদ্ধ ক্রিয়া) ব্যয় বাবদ কোনো সম্পত্তি বরাদ্দ রাখে এবং সে উত্তরাধিকারী যদি পূর্বসূরী ও পূর্বসূরীর স্ত্রীর বার্ধক্যকালের ভরনপোষণ ও মৃত্যু পরবর্তী দাহ ক্রিয়া ও ‘সাতদিন্যার’ ব্যয়ভার বহন করে, তাহলে সেই বরাদ্দকৃত সম্পত্তি, কিংবা (গ) পূর্বসূরী যদি এরূপ কোনো সম্পত্তি বরাদ্দ না রাখে, তাহলেও সে উত্তরাধিকারী যদি পূর্বসূরী ও পূর্বসূরীর স্ত্রীর বার্ধক্যকালের ভরনপোষণ ও মৃত্যু পরবর্তী দাহ। সাত দিন্যার ব্যয়ভার বহন করে, সেই ব্যয়ের পরিমাণ/অংকের সম্পত্তি হারাহারি নিয়মে প্রাপ্ত অংশের চাইতে বৃদ্ধি পায়।

ব্যাখ্যা (): ‘ক’ ধরা যাক যদি কোনো পিতা তার কোনো পুত্রকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্তব্য সম্পত্তিতে তার অংশ বুঝিয়ে দিয়ে পৃথকান্নে পাঠিয়ে দিয়েছে এবং সে অন্যত্র তার আলাদা পরিবারে বসবাস করছে। ইতিমধ্যে হঠাৎ জরুরী প্রয়োজনে পিতার সম্পত্তির কিছু অংশ বিক্রি করতে হচ্ছে, এমতাবস্থায় পৃথকান্নে চলে যাওয়া পুত্র যদি তার পিতার সেই সম্পত্তি কিনে রাখে, কিন্তু কোনো কারণে সেই খরিদকৃত সম্পত্তি (জমি) তার পিতার জীবদ্দশায় নিজের নামে নামজারী করে নিতে না পারে, সেক্ষেত্রে পিতার মৃত্যুর পর তার ত্যাজ্য সম্পত্তি হারাহারি নিয়মে বন্টন করার সময় এভাবে খরিদ করা সম্পত্তি হারাহারি নিয়মে বন্টন বহির্ভূত থাকবে।

কারণ পিতার এই সম্পত্তি সে সময় পৃথকান্নে যাওয়া পুত্র খরিদ না করলেও কোনো তৃতীয় ব্যক্তি তা খরিদ করতো; তদুপরি এই পুত্র একজন সহ-অংশীদার হিসেবে এই সম্পত্তি অগ্রক্রয়ের অধিকারও পেয়ে থাকে।

 

 

মন্তব্য: Law of Pre-emption আইনটা মূলতঃ মুসলমানদের যৌথ মালিকানাধীন সম্পত্তি হস্তান্তরে কিছু বাধা নিষেধ আরোপের উদ্দেশ্যই প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই অগ্রক্রয় আইনে (Law of Pre-emption) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলাসমূহের জেলা প্রশাসক আছে ইদানিংকালে কিছু কিছু মামলা হচ্ছে। তবে সেই আইনটি অত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বলবৎ হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে আদালতে মামলার পক্ষগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যদিও এ বিষয়টি নিষ্পতির জন্য উচ্চ আদালতে এ যাবৎ কোনো মামলা হয়েছে বলে জানা যায়নি।

তাছাড়া অগ্রক্রয় আইনটি আদিবাসীদের বেলায় প্রযোজ্য হয় কিনা, সেটিও একটি বিবেচনার বিষয়। চাকমাসহ অন্যন্যা আদিবাসীদের মধ্যে উত্তরাধিকারের ধারণাটি এতই নুতন যে অংশীদারী সম্পত্তি অগ্রক্রয়ের প্রথা গড়ে না উঠাই স্বাভাবিক১৮

ব্যাখ্যা (): ‘খ’ যে কোনো পিতা তার জীবদ্দশায় তার সম্পত্তি থেকে পুত্রদের/কন্যাদের প্রাপ্তব্য সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়ে নিজের ও স্ত্রীর বার্ধক্যকালীন ভরনপোষণ ও মৃত্যু পরবর্তী দাহ কর্ম ও শ্রাদ্ধ ক্রিয়ার ব্যয় বহনার্থে তার সম্পত্তির একটি অংশ নিজের হেফাজতে রেখে দিতে পারে। এই সম্পত্তি নিয়ে সে যে কোনো একজন পুত্রের ভরন-পোষণে থাকে। এই পুত্র, পিতা-মাতার মরণকাল পর্যন্ত তাদের ভরনপোষণ ও লালন-পালন করে এবং মৃত্যু পরবর্তী দাহ কর্ম ও শ্রাদ্ধ ক্রিয়া (সাতদিন্যা) সম্পন্ন করে। এরূপ ক্ষেত্রে সেই পুত্র পিতার হেফাজতে থাকা সম্পত্তি পায়, যা হারাহারি নিয়মে বন্টনের আওতার বাইরে থাকে। সেক্ষেত্রে আইনের দৃষ্টিতে উইল করতে হয়।

ব্যাখ্যা (): ‘গ’ মতে যদি পিতা-মাতা প্রকাশ্যে কোনো সম্পত্তি বরাদ্দ করে না রাখে তাহলেও পিতা-মাতা যে পুত্রের ভরনপোষণে থেকে মৃত্যুবরণ করে এবং যার দ্বারা মৃত্যু পরবর্তী দাহ কর্ম ও শ্রাদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন হয় সে পুত্র মৃত পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তি থেকে হারাহারি নিয়মে প্রাপ্য অংশের চেয়ে বেশী পায়। উত্তরাধিকারীগণ যাতে পূর্ব পুরুষদের বৃদ্ধকালে ভরনপোষণ দিতে অবহেলা না করে তজ্জন্যই এই সুদোম (প্রথা) গড়ে উঠেছে।

 

 

উত্তরাধিকারয্যেগ্য পদ জ্যেষ্ঠপুত্র এবং একাধিক স্ত্রীপুত্রদের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর পুত্রের জন্য সংরক্ষিত থাকে। কোনো পুত্র সন্তান না থাকলে এই নিয়মে কন্যা সন্তান এই পদ পায়: উত্তরাধিকারযোগ্য রাজপণ সর্বদা জ্যেষ্ঠ পুত্রের জন্য এবং একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর পুত্র সন্তানের জন্য সংরক্ষিত থাকে। তবে শর্ত থাকে যে, উভয় ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পূর্ণ সামাজিক ও বৈধ বিবাহ হতে হয় এবং এরূপ পুত্রের জন্য বৈধ বিবাহের ফলেই হতে হয়।

ব্যাখ্যা: চাকমা সমাজে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের রীতি প্রচলিত থাকলেও বিশেষ কারণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাই একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অধিকার সবসময় অগ্রগণ্য হয়। প্রথম স্ত্রীর গর্ভের ভূমিষ্ট পুত্র সন্তান দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভের ভূমিষ্ট সন্তানের চেয়ে বয়োকনিষ্ঠ হলেও তার অধিকার অগ্রগণ্য হয়।

 

মন্তব্য: চাকমা রাজপদ সম্পত্তির উত্তরাধিকার প্রথার আওতায় পড়ে না। নিজস্ব বংশ পরম্পরাগত পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারেই নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্রই সাধারণতঃ রাজপদ বা রাজ পরিবারের সমুদয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকেন।

কিন্তু রাজার পুত্র সন্তান না থাকলে রাজ পরিবারের কোনো সদস্য বা রাজ বংশের কোনো নিকটতম আত্মীয় রাজপদে অধিষ্ঠিত হয়। কারণ রাজা ধরম বক্স খাঁনের প্রথম স্ত্রী কালিন্দী রাণী এবং তার মৃত্যুর পর ধরম বক্স খাঁনের কন্যার ঘরের নাতি রাজা হরিশ্চন্দ্র চাকমারাজপদে অধিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা মাত্র দেড়’শ-সোয়া’শ বছরের পুরানো১৯

হেডম্যান পদ সরাসরি উত্তরাধিকারযোগ্য নয়। Rules for the Administration of Chittagong Hill tracts- এর ৪৮নং বিধিতে হেডম্যানের যোগ্য পুত্র থাকলে হেডম্যান পদে নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কাজেই হেডম্যানের পুত্রই উত্তরাধিকার সূত্রে হেডম্যান পদ লাভ করে তা বিধি দ্বারা নির্ধারিত নয়।

মৌজা হেডম্যান প্রথা ১৮৯২ইং সালের Rules for the Administration of Chittagong Hill tracts বলেই প্রবর্তন করা হয় এবং সে বিধিবলেই সার্কেল চীফের সুপারিশের ভিত্তিতে মৌজা হেডম্যান নিয়োগ প্রথা চালু হয়।

কার্বারী পদটি সার্কেল চীফ এবং মৌজা হেডম্যানের একটি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা মাত্র। সাম্প্রতিককালে সার্কেল চীফ, মৌজা হেডম্যান ও কার্বারীদেরকে সরকারী ভাতা প্রদান চালু হওয়ার পর কার্বারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিতে (Rules for the Administration of Chittagong Hill tracts) গ্রাম্য কার্বারীর কোনো পদ নেই।

 

পৃথকান্নে বসবাস কোনো উত্তরাধিকারীকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করে না: কোনো উত্তরাধিকারী পূর্বসূরীর মৃত্যুকালে কিংবা তৎপূর্বে পৃথকানে চলে গেছে, এই অজুহাতে পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তিতে তার প্রাপ্তব্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা যায় না।

ব্যাখ্যা: কোনো পুত্র পিতার জীবদ্দশায় পৃথকান্নে চলে গেলেও পিতার মৃত্যুর পর তার ত্যাজ্য সম্পত্তিতে তার অপরাপর ভাইদের সাথে সমান অংশে উত্তরাধিকারী হয়।

নজির: ১১৩নং তৈমিদং মৌজার বাসিন্দা চন্ডিয়া চাকমার দুই পুত্র ছিল। তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র কালি কুমার চাকমা পিতার জীবদ্দশায় পৃথকান্নে চলে যায়। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র রাম কুমার চাকমা তার পিতার মৃত্যুকাল অবধি পিতার পরিবারে বসবাস করে।

চন্ডিয়া চাকমার মৃত্যুর পর কনিষ্ঠ পুত্র রাম কুমার চাকমা তার বড় ভাই পিতার জীবদ্দশায় পৃথকান্নে চলে গেছে- এই অজুহাতে পিতার সমস্ত ত্যাজ্য সম্পত্তির উত্তরাধিকার দাবী করে নামজারী মামলা নং- ১০৬/৪৯-৫০ রুজু করে । জ্যেষ্ঠ পুত্র কালি কুমার চাকমা পিতার সম্পত্তির অংশ দাবী করলে জেলা প্রশাসক তার দাৰী গ্রহণ করে সমস্ত ত্যাজ্য সম্পত্তি সমান অংশে নামজারী করে। দেয়ার আদেশ দেন২০

 

মন্তব্য: পিতার জীবদ্দশায় কোনো পুত্র পিতার পরিবার থেকে পৃথক হয়ে গেলে পিতৃ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় ঠিকই কিন্তু যে সকল পুত্র পিতামাতার মৃত্যুকাল পর্যন্ত তাদের সাথে থেকে তাদের ভরনপোষণ, বৃদ্ধকালে সেবা-শুশ্রুষা, দাহ ও শ্রাদ্ধ ক্রিয়াদি সম্পন্ন করে, তারা পৃথকান্নে চলে যাওয়া ভাইয়ের সাথে আদৌ হারাহারি নিয়মে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় কিনা কিংবা তারা পৃথকান্নে চলে যাওয়া ভাইয়ের চেয়ে বেশী পায় কিনা তা সুস্পষ্ট নয়। তবে ভিন্ন রূপ নজির না থাকায় প্রচলিত রীতির যথার্থতা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

যে ব্যক্তি সম্পত্তির মালিকের রোগ-শোক, আপদ-বালাইয়ের কোনো দায়-দায়িত্ব বহন করেনি সেই ব্যক্তি, আর যারা সম্পত্তির মালিকের (পিতা-মাতা) আমরণ ভরনপোষণ, রোগ-শোক, সেবা-শুশ্রুষা করেছে, তাদের সাথে পিতার ত্যাজ্য সম্পত্তিতে কোনো রীতিনীতির দ্বারাই সমান অংশীদারিত্ব দাবী করতে পারে না।

ত্যাজ্য পুত্র-কন্যা উত্তরাধিকারের অযোগ্য বিবেচিত হয় কোনো পূর্বসূরী তার কোনো উত্তরাধিকারীকে স্বতঃস্ফুর্তভাবে ত্যাজ্য ঘোষণা করলে সে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

 

নজির: খাগড়াছড়ি নিবাসী সহকারী দারোগা প্রিয়তম খীসা কর্তৃক তার কন্যা ও উত্তরাধিকারী শৈল বালা দেওয়ানকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে বিবিধ মামলা নং- ৩১১ (ডি)/৬৭-৬৮ মূলে তার সমুদয় সম্পত্তি পালিতা কন্যা গীতা দেবী (কন্যার গর্ভজাত), ইন্দিরা দেবী (কন্যা শৈল বালার গর্ভের ও প্রথম স্বামীর ঔরসজাত কন্যা), ইন্দু বালা এবং স্ত্রীর ভাইয়ের কন্যা মঞ্জিলা দেবীকে উইলনামা মূলে দিয়ে যাবার ঘটনা রয়েছে২১

 

মন্তব্য: আদালতে হলফনামা সম্পাদন করে কোনো পুত্র/কন্যাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করা চাকমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত প্রচলিত রীতি নয়। চাকমা সমাজে এ ধরণের সামাজিক বিরোধ ইদানীং কালেই সৃষ্টি হচ্ছে। এ ধরণের বিরোধ দেখা দিলে তার নিষ্পত্তি এ যাবৎ তা আদালতেই হয়ে আসছে। দেওয়ানী আদালতের নিজস্ব এখতিয়ার ও ক্ষমতাবলেই এসব বিরোধের নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। চাকমা সমাজের প্রচলিত রীতি অনুসারে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হচ্ছে না। তাই ত্যাজ্য পুত্র/কন্যা ঘোষণা করে পুত্র/কন্যাকে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করার নিয়ম/প্রথা আজও একটি প্রতিষ্ঠিত রীতি নয়।

 

অবৈধ সন্তানের উত্তরাধিকার স্বত্ব: যে ব্যক্তির ঔরসে অবৈধ সন্তান (জারজ) জন্মগ্রহণ করে সেই জন্মদাতার উত্তরাধিকার স্বত্ব উক্ত সন্তান দাবী করতে পারবে। তবে ভিন্ন কোনো ব্যক্তির পিতৃ পরিচয়ে সে যদি পরিচিত হয়, তবে পিতার উত্তরাধিকার সে দাবী করতে পারে না। এরূপ সন্তান কেবলমাত্র মাতার নিজ নামীয় সম্পত্তির (যদি থাকে) উত্তরাধিকারী হয়।

 

তথ্যসূত্র:

১। চাকমা জাতীয় বিচার পদ্ধতি ও চাকমা উত্তরাধিকার প্রথা- শ্ৰী ৰঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান।

২। প্রাগুক্ত

৩। প্রাগুক্ত

৪। প্রাগুক্ত

৫। প্রাগুক্ত

৬। প্রাগুক্ত

৭। প্রাগুক্ত

৮। প্রাগুক্ত

৯। প্রাগুক্ত

১০।  প্রাগুক্ত

১১। চাকমা সামাজিক প্রথা ও শাসন বিধি- শ্রী যামিনী রঞ্জন চাকমা।

১২। প্রাগুক্ত

১৩। প্রাগুক্ত

১৪। প্রাগুক্ত

১৫। প্রাগুক্ত

১৬। প্রাগুক্ত

১৭। প্রাগুক্ত

১৮। প্রাগুক্ত

১৯। শ্রী সুদোমঃ এডভোকেট করুনাময় চাকমা (ক্রমিক নং (ক) থেকে (ঘ) পর্যন্ত)

২০। চাকমা জাতীয় বিচার পদ্ধতি ও চাকমা উত্তরাধিকার প্রথা- শ্ৰী বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান


তথ্যসূত্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন (গ্রন্থনা ও সম্পাদনা – এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা,  এডভোকেট প্রতিম রায়, সুগত চাকমা)।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply