icon

চাক রূপকথা: চাকদের “য়োছা” কাহিনী

Jumjournal

Last updated Jan 17th, 2020 icon 284

“চাক” শব্দের অর্থ “দাঁড়ানো”। চাক উপজাতীয়রা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার বাইশারী মৌজা, নাইক্ষ্যংছড়ি মৌজা, বাঁকখালী মৌজা, কামিছড়া মৌজা ও ক্রোক্ষ্যং মৌজায় বসবাস করে আসছে। এরা বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্রতম উপজাতি হিসেবে বিদিত।

মূলতঃ হাজার হাজার বছর আগে চাক উপজাতীয়রা বার্মার “শাক্যেংদং”-এ বসবাস করত। চাকদেরও এককালে ঐতিহ্যবাহী রাজ্য ছিলো।

চাকদের এখনও নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। পরবর্তীতে আরাকানী ও চাকদের মধ্যে যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। যুদ্ধে শক্তিশালী আরাকানীদের হাতে চাকরা পরাজিত হয়ে পড়ে।

শাক্যেংদং নামক স্থানে বসবাস করার মতো চাকদের আর কোন প্রকারের অস্তিত্বই ছিলো না। তখন যুদ্ধে বহু লোকের প্রাণনাশ হতে লাগলো অকালে।

এ যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চাকরা বার্মার শাক্যেংদং ত্যাগ করে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দিকে পালিয়ে আসতে শুরু করে। আসার পথে তারা দু’দলে ভাগ হয়ে পড়ে। প্রথম অগ্রসর দল আলীকদমে পৌঁছাতে লাগলো।

ওখানে অস্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করলো। প্রথম দলের লোকজন দ্বিতীয় অর্থাৎ পিছপা দলের সুবিধার্থে পথে পথে কলাগাছ কেটে কেটে এসেছিলো।

চিংড়ি রাঁধতে রাধতে দ্বিতীয় দলের দেরী হয়ে পড়ে। চিংড়ি রাঁধলে কি কখনও সাদা হয় ? কখন যে সাদা হবে —এই অপেক্ষাতেই বেশী দেরী হয়ে যায়।

আর এদিকে কলাগাছের কাটা অংশের উপরে নতুন অঙ্কুর-পাতা গজাতে শুরু করে। এ অবস্থাটি দেখে তারা সেই পথ বেয়ে যেতে যেতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। কারণ সে পথে গেলেও প্রথম দলের সাথে আর দেখা হবে না।

তা-ই ভেবে দ্বিতীয় দলের লোকজন সেই পথে যাওয়া বন্ধ করলো এবং আলীকদমে পৌঁছাতে পারলো না। দ্বিতীয় দলটি ইয়ংছা মৌজায় অস্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করে। এভাবে প্রথম দল ও দ্বিতীয় দল উভয়ই পৃথক পৃথক স্থানে অবস্থান করতে থাকে।

পরবর্তীতে প্রথম দলের লোকজন আলীকদম ত্যাগ করে ক্রমান্বয়ে আরো উত্তরপূর্বাঞ্চলের দিকে চলে যেতে লাগলো। তারাই বর্তমানে “চাকমা” নামে পরিচিত।

আলীকদমে সেই ঐতিহ্যবাহী চাক বা চাকমাদের রাজপুকুরের চিহ্ন রয়েছে এখনো। এই কাহিনীর প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, চাকমারাও চাকদের অন্যতম প্রধান অংশবিশেষ।

চাক উপজাতীয়রা কন্যা সন্তানের জন্ম হলে অন্য কোন নাম রাখা হলেও মো, য়োছা, মে, মেছা, পে, পেছা, মো, মোছা এভাবে ডেকে থাকে। কারণ, এর পেছনে একটি কাহিনী রয়েছে।

দ্বিতীয় দলটি ইয়ংঘাতে অবস্থানকালে একদিন একটি পরিবারের বৃদ্ধা মা আদরের মেয়ে। “য়োছা”-কে নিয়ে পাড়ার নিকটবর্তী ছড়া অর্থাৎ ছোট নদীতে “য়াংহক ” ও “টাৰ্ডছা” নিয়ে মাছ ধরতে গেলো।

আংহক ও টাঊছা হলা মাছ ধরা ও মাছ রাখার জন্য বেতের তৈরী বিশেষ উপকরণ। তাদের বাড়ীতে বুড়ো বাবা ও ছোট একটি ভাই ছিলো। মাছ ধরতে ধরতে ছড়ার উজানের দিকে যেতে লাগলো।

নদীর উজানে একস্থানে গভীর পানিতে একটি গোলাকার বড় পাথর ছিলো। সেই পাথরের চারিধারে হঠাৎ বড় বড় বোয়াল মাছ ৫টি দেখতে পাওয়া গেলো।

মাছগুলো দেখে সুন্দরী গোছর মনে তক্ষুণি ধরে নিতে ইচ্ছে হলো। মাকে ডেকে বলতে লাগলো, “আনো তুলুংনা টানা পোলাংহে” অর্থাৎ পাথরের পাশে মাছ দেখতে পেয়েছি না।

সুন্দরী গোহা ও তার মা পানিতে নেমে মাছ ধরতে শুরু করলো। মাছগুলোকে ছোঁয়ার সাথে সাথে সুন্দরী গোছা ও তার মা দুজনই অদৃশ্য হয়ে পড়ে। কারণ “নেকক্যক” বা দৈত্য পাথরটা তাদের দুজনকেই গ্রাস করে ফেললো।

মাছের লোভে মা ও মোছা দু’জনকেই পাড়ার লোকজনের অজান্তে মর্মান্তিকভাবে অকালে প্রাণ দিতে হলো দৈত্য পাথরের গ্রাসে। কিন্তু এদিকে বাড়ীর লোকেরা অর্থাৎ বুড়ো বাবা ও ছোট ভাই তাদের অপেক্ষায় আসার পথের দিকে চেয়ে থাকলো।

সকাল থেকে দুপুর হয়ে গেলো। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো রাত হলো। তবুও মা ও সুন্দরী মোছা দু’জনই আর বাড়ীতে ফিরে এলোনা।

এদিকে বুড়ো বাবার ভাবতে ভাবতে সারারাত ঘুম নেই। কেননা, বুড়ী ও সুন্দরী গোছ দু’জনই যদি বাড়ীতে আর আদৌ ফিরে না আসে।

বনের কোন হিস্র জন্তু যদি মেরে ফেলে, তাহলে তার উপায় কি হবে? সুন্দরী গোছর পাড়ার সর্দার বা রোওয়াজার ছেলের সাথে একমাস আগে বিয়ের প্রস্তাব ও পাকা কথাবার্তা ঠিক করা হয়েছিলো। ছেলের মা-বাবার কাছ থেকে ১০০০ টি ডিম ও ১০০ টি মুরগী নেয়া হয়েছে। এগুলো বিক্রি করে খেতে খেতে শেষ হয়ে গেলো।

মেয়েটা যদি আদৌ ফিরে না আসে তাহলে ডিম ও মুরগীর দাম ফেরৎ দিতে হবে। এগুলো ফেরৎ দেয়ার সামর্থ তো আর নেই তার। ফেরৎ দিতে না পারলে শাস্তিভোগ করতে হবে তাকে। বুড়োটি তাই ভেবে ভেবে খুবই অস্থির হয়ে পড়লো।

বুড়োটি রাগের চোটে মনে মনে ঠিক করতে লাগলো, “আমি বেঁচে থাকতে সেই ঘাটককে রেহাই দেবো না। কে সেই ঘাটক একটু দেখে নেবো। কষ্ট করে হলেও তাদেরকে খুঁজে উদ্ধার করবোই।”

এই প্রতিজ্ঞায় বুড়ো লোকটি সত্যি সত্যি ভোর হতে না হতেই নিজের ছোট ছেলেটাকে জাগিয়ে নিলো। ছেলেটিকে একটি “কাটাংছা” হাতে নিতে বললো। কাটাংছা। হলো ছোট আকারের ছুরি বিশেষ।

ছেলেটাকে সংগে নিয়ে ছড়া বা নদীর উজানে খুঁজে খুঁজে যেতে লাগলো । যেতে যেতে হঠাৎ করে “য়াংহক” ও টাউছা” দেখতে পেলো, কিন্তু মা ও য়োছা তাদের কাউকেও দেখতে পেলো না এবং কথা বলার শব্দও শুনতে পেলোনা।

একটু উজানে গিয়ে ঐনেকক্য বা দৈত্য পাথরটাকে তাদেরও নজরে পড়লো। আরো দেখতে পেলে, সেই গোলাকার পাথরের চারিধারে কয়েকটা বড় বড় বোয়াল মাছ ঘুরঘুর করছে।

বাপ-বেটা দু’জনই ঠিক করলো —- মাছগুলোকে ধরবে। দুজনই একসাথে পানিতে নেমে মাছগুলোকে ছোঁয়ার সাথে সাথে একটি বড় কালো সাপ গভীর পানির ভিতর থেকে বের হয়ে প্রথমে বুড়োকে ছোবল দিয়ে মেরে ফেললো।

তারপর ছোট ছেলেকে ছোবল দিয়ে আস্তে আস্তে গিলে ফেলতে শুরু করলো। ছেলেটার কোমরে কাটাংছা অর্থাৎ ছুরি বাঁধা ছিলো। তাই সাপটি ছেলেটাকে গিলে ফেলতে ফেলতে যখন কোমর পর্যন্ত গ্রাস করলো, ছুরির ধারের স্পর্শে সাপও কেটে ছিড়ে পড়ে এবং সাপটিও উক্ত ঘটনাস্থলে মরে যায়। 

পাড়ায় ঐ ঘরটির চুপচাপ অবস্থা দেখে পাশের ঘরের লোককে জিজ্ঞাসা করে পাড়ার লোকেরা জানতে পারুলো তাদের বিপদের কথাটা। পাড়ার বেশ কয়েকজন লোক রোওয়াজার ছেলের নেহুত্বে সুন্দরী মোছা অর্থাৎ তার হবু স্ত্রীর এই বিপদের কথা শুনে ত্বরিত গতিতে খুঁজতে খুঁজতে উজানের দিকে ছুটে যেতে লাগলো।

হঠাৎ করে দেখতে পেলো, মোছার বাবার মৃতদেহ আর একটি মৃত বড় কালো সাপ ছেলেটার দেহটাকে অর্ধেক গ্রাস করা অবস্থায়। কিন্তু যোহা ও তার মাকে দেখতে পেলো না। সাপটা ছিলো বিরাট আকারের।

সবাই মিলে ঠিক করলো যে, সাপের মাংস পাড়ার লোকজন সবাইকে ভাগ করে দেওয়া হবে এবং রাতে সবাই যেন রান্না করে খায়। ঠিক তা-ই করা হলো। পাড়ায় মাত্র তিন পরিবার সাপের মাংস খেতে রাজী হয়নি।

তিনটি পরিবারের লোকজন ছাড়া অন্য সকল পরিবারের লোকজন রান্না করে খেতে লাগলো। অবশ্য তার আগেই দু’জনের মৃত দেহকে এনে সামাজিকভাবে তাদের। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিলো। কিন্তু সুন্দরী মোছা ও তার মার মৃতদেহ আর পাওয়া যায়নি।

এই ঘটনার একদিন পর গভীর রাত্রে আকস্মিকভাবে প্রবল ঝড়বৃষ্টি ও বন্যায় প্লাবিত হয়ে। ঐ তিন পরিবারের লোকজন ছাড়া অন্য সকলেরই অকালে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু ঘটে।

ছড়া বা নদীতে সুন্দরী “য়োছা”-র উদ্যোগে মাছ ধরতে যাওয়ার কারণে সকলকেই অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে বলে “য়োছা”-র নামানুসারে ছড়াটির নাম “ইয়ংছা” রাখা হয়েছে। বর্তমানে। “ইয়ংছা” ছড়ার নামানুসারে এলাকাটি “ইয়ংছা” হিসাবে পরিচিত।

জীবিত তিন পরিবারের লোকজন কেউ সাপের মাংস ছোঁয়নি। খায়নি বটে, কিন্তু সাপের মাংস ছুয়েছে যারা তাদেরকেও মরতে হয়েছে অকালে।

আকস্মিকভাবে মর্মান্তিক মৃত্যু হবার পরে ঐ তিন পরিবারের লোকজন মিলে সিদ্ধান্ত নিলো যে, “জায়গাটা বড় খারাপ। এখানে থাকলে আমাদের সকলকেও এভাবে অকালে মরতে হবে।”

তা-ই ভেবে পরবর্তীতে তিন পরিবারের লোকজন ঐ খারাপ স্থানটি ত্যাগ করে আরো দক্ষিণে চলে আসে। তিন পরিবারের লোকজন থেকে আস্তে আস্তে বৃদ্ধি পেয়ে চাকরা বর্তমানে বাইশারী, নাইক্ষ্যংছড়ি ও পূর্বে উল্লিখিত স্থানসমূহে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে এবং কিছুসংখ্যক পুনরায় আরাকান রা বার্মার দিকে গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।

মূলতঃ চাক উপজাতি হলো “য়োছা” কাহিনীর তিন পরিবারের লোকজন। এজন্যে চাক উপজাতির সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য এবং বাংলাদেশের উপজাতিসমূহের মধ্যে অন্যতম ক্ষুদ্রতম।


লেখকঃ চাই ছা অং চাক

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply