icon

চাক রূপকথা: শরিমনবিক মননাং (চাকদের রঙধনু গল্প)

Jumjournal

Last updated Aug 29th, 2020 icon 513

অনেক অনেক দিন আগে যখন পৃথিবীতে প্রলয় (কেয়ামত) হলো তখন গাছপালা, জীবজ পশুপাখি ও মানুষ সবাই মারা যায়।

এমনকি পৃথিবীতে পানি পর্যন্ত শুকিয়ে যায় । সে প্রলয়ে বেঁচে গেল দুই ভাইবোন। নাম য়ুনচকবা ও য়ুনচকমে।

দুই ভাইবোন তৃষ্ণায় চারিদিকে ঘুরে পানি খুঁজতে লাগল। তবু কোথাও পানি খুঁজে পাওয়া যায়নি। কারণ পৃথিবীতে তখন পানি শুকিয়ে গেছে।

একদিন য়ুনচকবা ও য়ুনচকমে পানি খুঁজতে খুঁজতে এক স্থানে গিয়ে পৌঁছাল। সেখানে তারা শুধুমাত্র এক কামারের দোকান দেখতে পেল।

কামারের কাছে য়ুনচকবা ও য়ুনচকমে তৃষ্ণার্ত বলে খাওয়ার পানি চাইল। কিন্তু পানি দেওয়ার আগে কামার প্রথমে তারা সম্পর্কে কি হয় জানতে চাইল ।

কামারের প্রশ্নে য়ুনচকবা বলল যে, আমরা দুইজন ভাইবোন। কথাটি শুনে কামার বলল, ভাইবোন হলে পানি দিতে পারব না।

তবে স্বামীস্ত্রী হলে পানি দিতে পারি। তখনকার আমল কিন্তু সত্যযুগ। যা মুখে বলে তাই ঘটে।

কামারের কথা শুনে তারা ভাবতে লাগল, ভাইবোনকে কিভাবে স্বামীস্ত্রী বলি। এটাতো লজ্জার কথা।

এ ভেবে তারা পুনরায় কোন কিছু জবাব না দিয়ে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় ফিরে চলে গেল কামারের দোকান হতে।

কিছু দূর গিয়ে দেখতে পেল এক বিরাট গাছ। গাছটি খুব সুন্দর এবং তলায় চারপাশে ছায়া পড়ছে। তাই ভাইবোন দুইজনই গাছের তলায় গিয়ে আশ্রয় নিল।

তখন তারা তৃষ্ণার্ত এবং প্রায় মরণাপন্ন। সুতরাং গাছের ছায়ার তলায় বসে আলাপ করতে লাগল কোথায় গেলে পানি পাওয়া যাবে এবং কামারের কাছে কিভাবে পানি পান করা যায়।

আলোচনা করতে করতে এক পর্যায়ে বলে উঠল য়ুনচকমে, মরণের চেয়ে স্বামীস্ত্রী পরিচয় দিয়ে কামারের কাছে পানি পান করি।

কিন্তু য়ুনচকবা (বড়ভাই) স্বামীস্ত্রী পরিচয় দিয়ে পানি পান করতে বা বলতে খুব লজ্জা বোধ করল। তবে য়ুচকমে (বোন) স্বামীস্ত্রী বলতে বা পরিচয় দিতে তেমন লজ্জা বোধ করল না।

যুনচকবাও তৃষ্ণার্ত বলে বাধ্য হলো বোনের প্রস্তাব মানতে। সুতরাং তারা পুনরায় কামারের কাছে ফিরে গেল এবং খাওয়ার পানি দিতে বলল।

কামার আবারও জানতে চাইল, তারা সম্পর্ক কি হয়। কামারের প্রশ্নে য়ুনচকবা লজ্জায় স্বামীস্ত্রী কথাটি বলতে পারল না।

কিন্তু য়ুনচকমে নির্দ্বিধায় জানাল যে, তারা দুইজন স্বামী-স্ত্রী। কামার কিন্তু স্বামী-স্ত্রী বলায় তাদেরকে খাওয়ার পানি দিল।

মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কামারের কাছে পানি পান করে প্রাণে বাঁচল। আবারো বলছি, তখন ছিল সত্যযুগ।

য়ুনচকমে স্বামীস্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিয়ে পানি পান করায় তারপরের দিন য়ুনচকমের গর্ভসঞ্চার হলো। য়ুনচকবা কিন্তু সে খবর জানত না। যুনচকমে মনে মনে। ভাবতে লাগল, বড়ভাই জানতে পারলে কি হবে ?

তারা ভাইবোন দুই জনই কামারের দোকানের অদূরে “ছোয়ংহোয়া তাগ” নামক এক পাহাড়ে জুমচাষ করতে লাগল।

জুমের প্রায় কাজ য়ুনচকবা করত। আর য়ুনচকমে করত বাড়ীর কাজ।

য়ুনচকমে প্রতিদিন ভাত খাওয়ার সময় হলে ঘরে বসে জুমে কর্মরত বড়ভাইকে ভাত খাওয়ার জন্য চাক ভাষায় এ বলে ডাকত—–

অ য়ুনচকবা, য়ুনচকবা

পুকছায়াপা বাইনাকটাইক

 কাইনছায়াগা বাইনাকটাইক

 টকটেমাগ্রাই ইছিকইন

ইপুরকছা উছাইনইন।

 এভাবে দুই ভাইবোনের দিন ভালই কাটতে লাগল। আর তাদের জুমেও ভাল ফসল হলো। তাই তারা জুম হতে ধান, তিল, মরিচ প্রভৃতি পেল।

তাদের আর কোন অভাব বা অসুবিধা থাকল না। তারা ভাইবোন দুইজনই আনন্দে কাটাতে লাগল।

ঠিক এমন সময়ে যুনচকবা কেমন করে যেন জানতে পারল, তার ছোটবোন য়ুনচকমে গর্ভবতী হয়েছে।

তাই সে লজ্জায় কি করা যায় চিন্তা করতে লাগল। কারণ তাদের সংসারে মাত্র দুই ভাইবোন এ ছাড়া আর কোন লোক নেই এবং তাদের আশেপাশে কোন লোকজন নেই।

সুতরাং সে চিন্তা করতে লাগল, এ ব্যাপারে অন্যরা জানার আগে একমাত্র ছোটবোন য়ুমচকমেকে না জানিয়ে।

গোপনে পালিয়ে যাবে। এমন কি কেউই না দেখে মত। য়ুনচকবা একদিন গোপনে পালিয়ে গেল।

য়ুনচকবা যেতে যেতে চাইনবে তাগ” নামক পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছাল। সে পাহাড়ে য়ুনচকবার প্রথমে ঘুঘুপাখির সাথে দেখা হলো।

ঘুঘুপাখি য়ুনচকবাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, বন্ধু কোথায় যাচ্ছো ? ঘুঘুপাখির প্রশ্নে সে বলল, পালিয়ে যাচ্ছি।

তাই কোনদিন য়ুনচকমে বা কোন জন তার খবর জানতে চাইলে না জানানোর জন্য অনুরোধ করে গেল।

ঘুঘুপাখির নিকট হতে বিদায় নিয়ে কিছুদূর যেতেই “লাইশি” হরিণের সাথে দেখা হলো। হরিণও তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করল, বন্ধু কোথায় যাচ্ছো ?

হরিণের প্রশ্নে সে বলল, পালিয়ে যাচ্ছি। তাই হরিণকেও মানা করে দিয়ে গেল, কোনদিন য়ুনচকমে বা কোন জন এসে তার খবর জানতে চাইলেও কোন কিছুই যেন বলে।

হরিণের নিকট হতে বিদায় নিয়ে যাওয়ার পথে দেখা হলো “লামালিং কেন” নামক বনমোরগ -এর সাথে।

বনমোরগ কিন্তু য়ুনচকবাকে দেখে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করল না এবং য়ুনচকবাও ভুলে গেল কোন দিন য়ুনচকমে বা কোন জন এসে তার কথা জিজ্ঞাসা করলে না বলতে বলার জন্য। 

ফুচকমে প্রতিদিনের ন্যায় সেদিন ভাত খাওয়ার সময় হলে বড়ভাই য়ুনচকবাকে বাড়ীতে আসার জন্য ডাকল।

 অ য়ুনচকবা, মুনচকবা

 পুকছায়াগা বাইনাকটাইক

কাহনছায়াগা বাহনকটাইক

 টুকটেমাংগ্রাই ইছিকইন

 কাইনপুরকছা উছাইনইন।

 কিন্তু য়ুনচকবা আসল না। এমনকি সন্ধ্যা হয়ে গেল, তবু আসল না। তাই বড়ভাই-এর জন্য চিন্তা করতে লাগল।

সে দিন বড়ভাইকে খুঁজতে যেতে পারল না। কারণ একজন মেয়ের পক্ষে রাত্রে খোঁজ করা সম্ভব নয়।

পরের দিন য়ুনচকমে ভোরে বড়ভাইকে খুঁজতে প্রথমে জুমে গেল। জুমে পাওয়া গেল না ।

তাই য়ুনচকমে ভাবতে লাগল, আমার গর্ভধারণের খবর জানতে পেরে পালিয়েছে কিনা। সে নানা কিছু ভাবতে ভাবতে এদিক সেদিক খুঁজতে লাগল।

তখন। কিন্তু য়ুনচকমে বড়ভাইকে না পাওয়ায় প্রায় পাগল। সে খুঁজতে খুঁজতে একদিন “চাইনব্রে তাগ” পাহাড়ে গিয়ে পৌঁছাল।

মুনচকমে ক্লান্ত হয়ে পাহাড়ে এক বড় গাছের ছায়ায় বিশ্রাম করল। সে বড়ভাই-এর কথা ভাবতে ভাবতে এবং ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। আবার খুঁজতে যাওয়ার পথে অর্থাৎ চাইনব্রে পাহাড়ে প্রথমে ঘুঘুপাখির সাথে দেখা হলো।

য়ুনচকমে ঘুঘুপাখির কাছে তার বড়ভাই খুনচকবাকে দেখেছে কিনা বা তার খবর জানে কিনা চাক ভাষায় জিজ্ঞাসা করল।

 য়ুনচকমে ঃ        অ লাবাহ্রু, লাবাহ্রু

ঙাগা য়ুনচকছিয়াং পাহালে ?

ভাগা যুনচকবা পকহালে ?

লাবাহ্রু ঃ            প্রিন ফ্রিন প্রিনপ্রাক পাকহেক

(ঘুঘুপাখি)             লাইকলি লাইলাক পনাকহেক আমি

নাংগা য়ুনচকছিলে আসেপ

নাংগা য়ুনচকবালে আসেপ

লা ইশিয়াং কাটালাং।

 ঘুঘুপাখির কথা মত সে হরিণের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল তার বড়ভাই য়ুনচকবা -এর খবর।

 য়ুনচকমে ঃ        অ লাইশি, লাইশি

ঙাগা য়ুনচকছিয়াং পকহালে ?

ঙাগা যুনচকবা পকহালে।

লাইশি ঃ              প্রিন ফ্রিন প্রিক পনাকহেক

(হরিণ)                 লাইকলি লাইলাক পনাকহেক

 নাংগা য়ুনচকছিলে আসেপ

নাংগা য়ুনচকবালে আসেপ 

লা উকেয়াং কাটালাং।

 হরিণের কথা মতো সে এবার বনমোরগ-এর কাছে গিয়ে তার বড়ভাই অনুচকবা -এর খবর জিজ্ঞাসা করল।

 য়ুচকমেঃ    অ লামালিং উকেন, লামালিং উকেন

ঙাগা য়নচকছিয়াং পকহালে ?

ঙাগা মুনচকবা পকহালে?

লামালিং উকেন (বনমোরগ) “নাংগা য়ুনচকছিয়াং (য়ুনচকবা) সিদং তাগ” অর্থাৎ য়ুনচকবা। সিদং পাহাড়ের দিকে গেছে বলে দিল।

কারণ য়ুনচকবা বনমোরগ-কে মানা করে যায়নি। বনমোরগ সত্যকথা বলে দিল। য়ুনচকমেও বনমোরগ-এর কথা মতো সিদং পাহাড়ে গিয়ে দেখল।

সুনচকমে সিদং পাহাড়ে খুঁজতে খুঁজতে এক সময় দেখতে পায়, য়নচকবা একটা বড় গাছের শাখায় গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে ঝুলে আছে।

বড়ভাইকে এই অবস্থায় দেখে। যুনচকমে কাঁদতে লাগল এবং শেষ পর্যন্ত সেও সিদ্ধান্ত নিল আত্মহত্যা করবে।

তাই ফুচকমেও একই গাছের শাখায় সুনচকবা-এর মত গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করল।

চাক উপজাতির বৃদ্ধরা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে রঙধনুর গল্প বলে থাকে। ফুচকবা ও য়ুনচকমে অর্থাৎ দুই ভাইবোন আত্মহত্যা করে মারা গিয়ে রঙধনু হয়েছে।

যেমন আকাশে রঙধনু উঠার সময় একটি স্পষ্ট এবং আর একটি অস্পষ্ট। স্পষ্টভাবে যেটি দেখা যায় সেটি হচ্ছে হেটবোন য়ুনচকমে।

সে স্পষ্টভাবে দেখা দেওয়ার কারণ, সে গর্ভবতী হয়েও লজ্জা করেনি এবং কামারের কাছে স্বামীস্ত্রী বলতেও লজ্জা করেনি।

আর অস্পষ্টভাবে যেটি দেখা যায় সেটি হচ্ছে বড়ভাই খুনচকবা।

সে কামারের কাছে স্বামীস্ত্রী বলতেও লজ্জা করত এবং বোনের গর্ভবতী হওয়ার খবর জেনে লজ্জায় পালিয়ে আত্মহত্যা করেছে।

সুতরাং সে লজ্জায় আকাশে উঠার সময়ে অস্পষ্টভাবে দেখা দেয়।

লেখক: পাই থুই চাক

প্রসঙ্গঃ ,
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply