icon

তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার (বাপদিন্যা)

Jumjournal

Last updated Dec 22nd, 2019 icon 312

তঞ্চঙ্গ্যা উত্তরাধিকার প্রথার উদ্ভব

পার্বত্য জেলাসমূহে বাসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা সমাজ ব্যবস্থায় জুম চাষকে অদ্যাবধি তাদের পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ৪২ বিধিমতে পাহাড়ে জুম চাষের জন্য জমির মালিকানা স্বত্বের প্রয়োজন হয় না, যার কারণে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে স্থাবর সম্পত্তি তথা ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা অতীতে তেমন একটা ছিল না বললেই চলে।

এ অবস্থায় সম্পত্তির উত্তরাধিকার অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে অতীতে তেমন সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠেনি।

ইদানীংকালে জুম চাষের জন্য জমির অপ্রতুলতা এবং পর্যায়ক্রমে একই জমিতে বংশানুক্রমিকভাবে চাষাবাদের কারণে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্যান কৃষির প্রতি মনোযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষিত সমাজে ভূসম্পত্তির উপর স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণার উদ্ভব হয়েছে।

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজভুক্ত একটি পরিবারে কেউ মারা গেলে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। সম্পন্ন করার দায়-দায়িত্ব পালন, মৃতের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবার সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং পারিবারিক কর্তব্য হিসেবে সমাজে স্বীকৃত।

 

তঞ্চঙ্গ্যা উত্তরাধিকারের সাধারণ নীতি

উত্তরাধিকার: তঞ্চঙ্গ্যা সমাজভুক্ত পরিবারে কেউ মারা গেলে তার সৎকার, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার বেলায় সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সমাজের অনুশাসন ও রীতি অনুসারে মৃতের আত্মার সদ্গতির জন্য বিশেষ কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হতে হয়।

 

উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি কি কি: সম্পত্তির মালিক মৃত্যুকালে যেসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রেখে মারা যান সেসবই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য। অস্থাবর সম্পত্তি যেমনঃ- আসবাবপত্র, থালাবাটি, কাপড়চোপড়, অলংকার, গবাদিপশু ইত্যাদি উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে আপোষ রফায় ভাগবন্টন হয়।

কিন্তু লিখিত কোনো আইন বা বিধি-বিধানমতে সেগুলো ভাগবন্টন করা হয় না। কেবলমাত্র ভূমি তথা জায়গা-জমিকে স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে সামাজিক বিধি-বিধানমতে ভাগবন্টন করা হয়। তাই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি বলতে সাধারণভাবে স্থাবর সম্পত্তিকেই বুঝানো হয়।

কিন্তু একজন সম্পত্তির মালিকের সম্পূর্ণ স্থাবর সম্পত্তি উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না। সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুর পর তার সৎকার/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয়, তার অনাদায়ী ঋণ (যদি থাকে) এবং জীবদ্দশায় দখল হস্তান্তরিত হয়েছে কিন্তু মালিকানা স্বত্ব হস্তান্তরিত হয়নি এমন ভূ-সম্পত্তির দায়/দেনা মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকবে তার উপরই উত্তরাধিকারীগণের অধিকার বর্তায়।

 

সম্পত্তির উত্তরাধিকার রীতি: তিন পার্বত্য জেলার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউপি চেয়ারম্যান/কার্বারী/পৌর চেয়ারম্যান/সার্কেল চীফ-এর নিকট হতে মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ পূর্বক ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের ৭ নং ধারামতে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট জেলার দেওয়ানী আদালতের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবিধ মামলা মুলে তিনি মৃত ব্যক্তির আইনগত উত্তরাধিকারীগণকে উত্তরাধিকার সনদপত্র প্রদান করেন।

পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারে কারো মৃত্যুর পর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয় খরচ, তার জীবদ্দশায় অনাদায়ী ঋণ এবংজীবদ্দশায় কোনো সম্পত্তির দান বা বিক্রি কিংবা মৃত্যুর পূর্বে সম্পাদিত উইল ইত্যাদির দাবী পরিশোধ বা নিষ্পন্ন করার পর তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি নির্ধারণ করার রীতির প্রচলন রয়েছে।

 

উত্তরাধিকারযোগ্য পদ পদবী: পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি ১৯০০ – এর ৪৮ নং বিধিতে সার্কেল চীফ নিয়োগ এবং হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্তের বিষয়ে লিপিবদ্ধ আছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি ১৯০০-এর ৪৮ নং বিধিতে তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের হেডম্যান(আমু)/কার্বারী এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্কেল চীফের সুপারিশ বা মতামতকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। হেডম্যান/কার্বারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র যদি যোগ্য হন তাকে সেই পদে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

 

তঞ্চঙ্গ্যা সমাজের উত্তরাধিকার প্রশ্নে অগ্রাধিকার ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস:-

চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেলে মৃত ব্যক্তির পুত্র তার অপ্রতিরোধ্য আইনগত উত্তরাধিকারী। তার উপস্থিতি অন্য সকল নিকটাত্মীয়ের অধিকারকে খর্ব করে। অবশ্য এক্ষেত্রে সন্তান বলতে- ঔরসজাত ও দত্তক সন্তানকেও বুঝাবে। পুত্রের মৃত্যুজনিত কারণে মৃত পুত্রের সন্তানগণ আইনগত উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হয়।

খ) পুত্রের অবর্তমানে ঔরসজাত কন্যা এবং দত্তক পুত্র বা কন্যা পিতার সম্পত্তির সমান অংশীদার হয়।

গ) মাতার মৃত্যুর পর তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকার পুত্র সন্তানই লাভ করে। মাতা-পিতার অনুপস্থিতিতে পুত্র সন্তানেরা পিতা-মাতার সমস্ত সম্পত্তির সমান অংশের উত্তরাধিকারী হয়। এমনকি চিররুগ্ন, উন্মাদগ্রস্ত পুত্র সন্তানও সমান অংশের উত্তরাধিকারী হয়।

মাতা-পিতার মৃত্যুর পূর্বে কোনো সন্তানের মৃত্যু হলে, সেই মৃত সন্তানের ওয়ারিশগণ তার জ্যেঠা, কাকার সাথে পিতামহের সম্পত্তি হতে পিতার অংশের উত্তরাধিকারী হয়। উপরন্তু মৃত পিতার ভাইয়ের অবর্তমানে ওয়ারিশগণ পিতামহের সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

পিতার মৃত্যুর পূর্বে পুত্রের মৃত্যু হলে এবং উক্ত পুত্রের কোনো পুত্র সন্তান বা সহোদর ভাই যদি না থাকে সেক্ষেত্রে তার কন্যা পিতামহের মৃত্যুর পর সম্পত্তির পৈত্রিক অংশের উত্তরাধিকারী হয়।

কোনো ব্যক্তি অপুত্রক অবস্থায় শুধু কন্যা ও স্ত্রী রেখে অথবা অবিবাহিত অবস্থায় মারা গেলে তার সম্পত্তি যদি মৌরসী সম্পত্তি হয়, তবে তার নিজ ভাই, ভাইয়ের অবর্তমানে পিতা, পিতার অবর্তমানে জেঠা ও কাকা উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। উক্ত মৌরসী সম্পত্তি হতে কন্যা এবং স্ত্রী শুধুমাত্র ভরনপোষণ পাবার অধিকারী হয়। মৃতের নিজ ভাই, পিতা, জেঠা, কাকা সকলের অবর্তমানে কেবলমাত্র স্ত্রী ও কন্যা উক্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

ঘ) (১) কোনো ব্যক্তি পুত্রহীন অবস্থায় শুধু স্ত্রী ও কন্যা রেখে মারা গেলে তার নিজ অর্জিত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি তার কন্যা ও বিধবা স্ত্রী উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে। তবে স্ত্রী দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করলে প্রথম স্বামীর সম্পত্তিতে তার উত্তরাধিকার লোপ পায়।

ঙ) স্ত্রীর পৈত্রিক সম্পত্তি তার মৃত্যুর পর পুত্র, পুত্রের অনুপস্থিতিতে কন্যা উত্তরাধিকারী হয়। পুত্র-কন্যাহীন অবস্থায় মারা গেলে মৃত স্ত্রীর আপন ভাই, তার অবর্তমানে পিতা, পিতার অবর্তমানে নিজ জেঠা ও কাকা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের অর্জিত বা ক্রয়লব্ধ অথবা স্ত্রীর নামে গচ্ছিত সম্পত্তির বেলায় স্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রথমে স্বামী, তার অবর্তমানে পুত্র, পুত্রের অবর্তমানে কন্যা উত্তরাধিকারী হয়।

চ) মৃত ব্যক্তির যদি দুই বা ততোধিক স্ত্রী থাকে, তবে সকল স্ত্রীর পুত্রগণ পিতার সম্পত্তির সমান অংশের উত্তরাধিকারী হয়।

ছ) একাধিক স্ত্রীর বেলায় কোনো স্ত্রীর যদি শুধু কন্যা সন্তান থাকে, সেই কন্যা তার সৎ ভাইদের অনুরূপ সম্পত্তির সমান অংশের উত্তরাধিকারী হয়। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে পুত্র-কন্যাহীন অবস্থায় মারা গেলে তাদের দত্তক পুত্র অথবা দত্তক কন্যা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়, যদি সে দত্তক পিতা-মাতার সঙ্গে একত্রে বসবাস, সেবা-শুশ্রুষা, ভরনপোষণএবং দাহ ও শ্রাদ্ধক্রিয়াদির দায়-দায়িত্ব সামাজিক রীতি অনুসারে প্রতিপালন করে।

জ) স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী যদি দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করে এবং মৃত স্বামীর ঔরসজাত সন্তান মায়ের দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে লালিত-পালিত হয়ে সাবালকত্ব প্রাপ্ত হয় সেক্ষেত্রে উক্ত সন্তান মৃত স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। আবার মৌরসী সম্পত্তির অধিকারী কোনো স্ত্রী প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পর পুত্রকন্যা থাকা সত্ত্বেও যদি দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণ করে এবং দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে পুত্র-কন্যা জন্মের পর তার মৃত্যু হয়, সেক্ষেত্রে উভয় স্বামীর ঔরসজাত পুত্র, পুত্রের অবর্তমানে কন্যা মৃত মায়ের সম্পত্তির সমান অংশের উত্তরাধিকারী হয়।

 

সম্পত্তির ভাগ: বণ্টন: তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগবন্টন | নিম্নরূপে হয়ঃ-

ক) তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে দান ও উইলের প্রচলন আছে। পিতা বা স্বামীর জীবদ্দশায় দান বা উইলের মাধ্যমে দেয়া সম্পত্তি কন্যা বা স্ত্রী অর্জন করতে পারে। সেক্ষেত্রে সেই সম্পত্তির উপর কন্যা ও স্ত্রীর অধিকার সমাজে নিরঙ্কুশভাবে স্বীকৃত হয়।

 

অবৈধ সন্তানের উত্তরাধিকার স্বত্ব: যে ব্যক্তির ঔরসে অবৈধ সন্তান (জারজ) জন্মগ্রহণ করে সেই ব্যক্তির (জন্মদাতা) সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা অনুসারে সন্তানের উত্তরাধিকার নির্ধারণ হয়। তবে ভিন্ন কোনো ব্যক্তির পিতৃ পরিচয়ে সে যদি পরিচিত হয় সেক্ষেত্রে জন্মদাতা পিতার উত্তরাধিকার দাবী করতে পারে না, কেবলমাত্র নিজ মায়ের নামীয় (যদি থাকে) সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।


তথ্যসূত্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন (গ্রন্থনা ও সম্পাদনা – এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা,  এডভোকেট প্রতিম রায়, সুগত চাকমা)।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply