icon

তিলিপের সন্ধানে

Jumjournal

Last updated Feb 20th, 2020 icon 312

কুয়াশায় ঢাকা পড়েছে জনজীবনের বিচরণ। কি শহর কি গ্রাম তা বুঝে উঠা দায়। অর্ধশিক্ষিত তিলিপের এমন চিত্র অপরিবর্তনীয়। শীতকাল বলে কথা নয়, কয়েক দশক ধরে তিলিপের একই অবস্থা।

জন-জীবন বাইরে থেকে স্বাভাবিক যতই মনে হোক জটিল সমস্যা ঠিকই অভ্যন্তরে পুঁতে আছে। এক সময় তিলিপের দবদবা চেহারা ছিল, এমনই গল্পের দীর্ঘশ্বাস মাঝে মধ্যে চর্চা হয়, শুনেছিলাম। তবে কেমন ছিল? গভীরে গেলে হয়তো ব্যাপারটি উদঘাটন করা যাবে।

‘তিলিপ’ ভ্রমণের সুযোগ আসে চাকুরির সুবাদে। বাংলাদেশে ‘তিলিপ’কে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ নেই। আর দশটা মফস্বল শহরের মত তবে পাহাড়- অরন্যে ঘেরা।

এখানে দেখেছি শিক্ষার ভেতর অশিক্ষা, অশিক্ষার ভেতর নবজাগরণ। এখানকার মানুষ তিন-চার সারিতে পাশাপাশি থাকে দোসরের মত। আপাত দৃষ্টিতে দোসর মনে হলেও অভ্যন্তরে জিয়ে রাখা আছে দা-কুমড়ার সম্পর্ক।

বেশি না, মাসখানেক থাকলে এই ধারণাই মনে হবে যে কোন আগন্তুকের। পিচ ঢালা, উঁচু-নিচু ও মাঝখানে মাঝখানে সমতল পথ দিয়ে ঢাকা থেকে আসা শ্যামলী বাসটি ‘তিলিপ’ শহরের চৌমুহনী ছেড়ে বাস স্ট্যান্ডে এসে থামল। অপরিচিত জায়গা।

অপরিচিত মানুষ জন। সরকারি রেস্ট হাউজের কথা আগেই শুনে এসেছি। বাসস্ট্যান্ড থেকে একজন আদিবাসী রিকসাওয়ালার রিকশায় চেপে বসে পড়লাম। রিকসাওয়ালা বুঝতেই পেরেছিল এই শহরে আমি নতুন, সে অমনি আমার ক্যাজুয়াল ড্রেস দেখে ‘স্যার’ সম্বোধন করে বলল, ‘কোথায় যাবেন স্যার?’ আমি উত্তরে রেস্ট হাউজের কথা বলি।

আমি পথ চিনি না, সে নিজেই নিয়ে চলল। লোকটি বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী। মনেই হচ্ছিল, তার পায়ের প্যাডেলের টানে রেস্ট হাউজ যত দূরেই হোক দ্রুত পৌঁছে যাব।

প্রায় ২০ মিনিটে পৌঁছালাম। পৌঁছে রিকসা থেকে নেমে ভাড়া কত জিজ্ঞেস করতেই বলল, ১০ টাকা। আমি ভাবলাম, নতুন মানুষ ভেবে সে বেশি টাকা চায় কিনা। ঢাকা শহরে রিকসাওয়ালাদের ভাড়া চাওয়া মানেই মুহূর্তে নয়-ছয়, আর এখানে সুঠাম-দেহী রিকসাওয়ালার সারল্য এবং প্রতারনাহীন উত্তর প্রথম দিনেই এই এলাকার মানুষদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণার জন্ম দিল।

রেস্ট হাউজে এক মাস কেটে যাচ্ছিল। পরের মাসে কোথাও বাড়ি ভাড়া নিব, ভাবছি। এর মধ্যে অনেক বাঙালী-অবাঙালী মানুষের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠতে লাগল। ভার্সিটিতে পড়াশুনাকালে কৌতূহলবশত এক-আধটুক এই অঞ্চলের ইতিহাস পড়েছিলাম।

পত্র-পত্রিকায় মাঝে মধ্যে এই এলাকার বিষয়ে নানা ঘটন- অঘটন খবর পড়া হত। ভার্সিটিতে পড়াকালে এই এলাকার কিছু বন্ধুর সংস্পর্শে এসেছিলাম। তাদের কাছ থেকে তিলিপের সুখ-দুঃখের কথা এবং বর্তমান ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পরিস্থিতিসহ বই বহির্ভূত বহু অজনা সত্য কথা জেনেছিলাম।

জেনেছিলাম, এই এলাকায় এক সময় কোন বাঙালীই ছিল না। স্বাধীনতার বহু পূর্বে বাঙালীরা আসত তবে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নয়। শুনেছি, পাকিস্তান আমলে আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কিছুসংখ্যক এবং ক্রমান্বয়ে এরশাদ, জিয়াদের আমল থেকে ধাপে ধাপে বহু বাঙালীর স্থায়ী অনুপ্রবেশ ঘটে।

এখানে আসা ও স্যাটেল হওয়া বাঙালীরা আদি অধিবাসীদের কাছে স্যাটেলার নামে পরিচিত। বলে রাখি এখানে আসার আগে আমি ঢাকায় জেনিছিলাম, ‘সেনাবাহিনী’ প্রভূর একছত্র রাজকীয় অবস্থার কথা।

‘সেনাবাহিনী’ যাদেরকে জাতিসংঘের শান্তি মিশনের শান্তির দূত বলা হয়, অবাঙালীদের কাছে তাদের এই ধারণা উল্টো। সত্যিকার অর্থে অবাঙালীদের দৃষ্টিকোণ কবি গুরুর দৃষ্টিতে ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের ব্রিটেনে থাকা ভালো ইংরেজ আর ভারতীয় উপমহাদেশে শাসন করতে আসা খারাপ ইংরেজদের মত।

তিলিপের আদিম অধিবাসীদের ক্ষেত্রে এই দৃষ্টিকোণ অবান্তর কিংবা অস্বাভাবিক নয়। পাশা-পাশি বিভিন্ন সময় আদিবাসীদের ন্যায্য জায়গা-জমি দখল করে স্যাটেল করা হয়েছে যাদের তাদের দৃষ্টিতে ‘সেনাবাহিনী’ মানেই উপকারী বন্ধু।

তিলিপে ‘সেনাবাহিনী’ ধারণাটি বাঙালী ও আদিবাসীদের নিকট দ্বৈত সত্তার প্রতীক। আমার প্রশ্ন ‘সেনাবাহিনী’ প্রভূর এই দ্বৈত চারিত্রিক সত্তা হবে কেন? সহজাতভাবে জানি যে, সেনাবাহিনীর মত নির্ভরশীল পেশায় যোগদানকালে অঙ্গীকার করতে হয় যে, দেশ ও দেশের সকল জনগণকে সমানভাবে নিরাপত্তা ও সহায়তা প্রদান করার কথা।

অঙ্গীকারের এই কথাগুলো মনে রাখা উচিত ছিল তাদের। সাথে এটাও মনে করা উচিত যে, তিলিপের বাঙালিদের মত অবাঙালি আদিবাসীরাও রাজস্ব, ভ্যাট, কর, খাজনা দিয়ে সেনাবাহিনীকে সরকারের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে অন্ন যোগাচ্ছে।

একদিন ফিল্ড ভিজিটকালে এক আদিবাসী মহিলার কাছে বলতে শুনেছি সেনাবাহিনীরা নাকি রক্ষক আর ভক্ষক দুই। তার কাছে জেনেছি স্যাটেলার ও সেনা সদস্যদের দ্বারা আদিবাসী নারীদের ধর্ষণ ও লাঞ্চিত হওয়ার কথা।

এই সব কথা আজ থাক পরে আরেকদিন হবে। তবে এটা বোঝার বাকি নেই, সোনার বাংলা স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু মানুষ স্বাধীন হয়নি। এখনো মানবতাহ আর্তনাদ করে ফেরে এই বাংলার মাটিতে। ‘তিলিপ’ কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের  ‘তেলানাপোতা’ গ্রাম নয়, যেখানে মহামারি, অশিক্ষা, কুসংষ্কার লেগে থাকে।

তিলিপের মানুষ-জন বেশ শিক্ষিত, দক্ষ, পরিশ্রমী তবে সহজ সরল। নয়-ছয় বোঝে না। সহজেই মানুষকে আপন করে নেয়। আমি এখানে ধীরে ধীরে অনেক কিছু আবিষ্কার করছি। আমি পেশায় সরকারি উন্নয়ন কর্মী।

সেই সুবাদে বিভিন্ন জনের সান্নিধ্যে এসেছি এবং বিভিন্ন জন কাছে আসতে চেয়েছে। কেউ স্বার্থ হাসিলের জন্য কেউ বা সখ্যতা ও মায়া বাড়ানোর জন্য।

আমার রেস্ট হাউজের পিয়ন খাওয়া-দাওয়াসহ নানান বিষয়ে যথেষ্ট সহযোগিতা করে আসছে। নাম রথীন্দ্র। সে বেশ সখ্যতা গড়ে তুলেছে আমার সাথে। বয়সে প্রবীণ, তবে তিলিপের অনেক পুরাতন ইতিহাস তার জানা।

সন্ধ্যায় তার সাথে চায়ের চুমুকে বহু জিজ্ঞাসা , কথার ঝুড়ি নিয়ে বসি। মানুষটি বেশ সহজ সরল, রসিক প্রকৃতির। দাড়ি গোঁফ কামানো, লম্বা ও পাতলা গড়নের। ঢিলেঢালা হালকা কিংবা ফ্যাকাসে এক রঙা শার্ট আর কালো প্যান্ট তার নিত্য দিনের বেশভুষা।

রেস্ট হাউজে আমার পাশের কামরায় আরো একজন সরকারি চাকুরে থাকে। তার সাথে রথীন্দ্রের তেমন সখ্যতা নেই, আমার মতো। কথায় কথায়, একদিন রথীন্দ্রকে বলি “আচ্ছা তিলিপের বহু ঘটনা মাঝেমধ্যে বেশ ঘটাকরে পত্রিকা ও মিডিয়াতে ছাপানো হয়। যেমন; বাঙালী স্যাটেলারদের দ্বারা আদিবাসীদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, আদিবাসী নারীর উপর ধর্ষণ ঘটনা, পার্টি-বিপার্টির অপহরণ, চাঁদা আদায় ইত্যাদি।

এগুলোর সত্যতা ও কারণ কি জানেন?” বলে রাখি, এক সময় আদিবাসীদের দাবি আদায়ের সংগ্রামে রথীন্দ্র তুখোর যোদ্ধা ছিল। তার সাথে আলাপাকালে নিজের সম্পর্কে বলতে শুনেছিলাম।

আমার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে রথীন্দ্র একটু কষ্ট চাপা সুরে আপন মনে বলতে লাগল- “এখানকার আদি অধিবাসীরা মূলত শাসক গোষ্ঠীর দ্বারা প্রতারিত হয়ে আসছে বহুকাল আগে থেকে। ভেবেছিলাম বহু যুগের দুঃখের অবসান বুঝি ১৯৯৭ সালের ২রা ডিম্বেরে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ঘটবে।

যে চুক্তির জন্য বহু যুগ সংগ্রাম করে এসেছি তা আজ কেবল কাগুজে হয়ে আছে। অথচ এই চুক্তির জন্য ঘটে গেছে বহু গণহত্যা, বাড়ি-ঘর জ্বালাও-পোড়াও, ভূমি দখল, নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং হত্যাসহ লোমহর্ষক বহু ঘটনা।

কথা বলতে বলতে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে এক সময় সে থেমে গেল। পাশে রাত হয়ে আসছিল প্রায়। অমনি, সে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করল। অবশ্যই নিরাশও করল না, পরবর্তীতে এর বাকি কিস্তি বলার ওয়াদা করে সে বিদায় নিল।

এদিকে সন্ধ্যার পর তিলিপে মানুষের ঘোরাঘুরি কমে আসে। কেননা তিলিপের আঞ্চলিক রাজনীতির গতিবিধিও দ্বান্দ্বিক হয়ে উঠছে দিনের পর দিন। অন্যদিকে দেশে এ নিয়ে ১৫ বার সংবিধান পরিবর্তনও হয়ে গেছে।

তাছাড়া দেশে প্রায় সময় রাজনৈতিক অবস্থা ভালো থাকে না । আমি সেদিন রাতের খাবার শেষে ঘুমুতে গেলাম। অফিসের ফাইল দেখাই হল না। রাত ১২টা বেজে যাচ্ছিল তবুও ঘুম দু-চোখে আসছিল না, কেবল রথীন্দ্রের কথাগুলো কানে বাজছিল, আর চিত্রকল্প হয়ে ধরা দিচ্ছিল।

পাশে কৌতুহল জাগছিল পরবর্তীতে সে কি কি ঘটনা শোনাবে? এভাবে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোর সাতটায় পরের দিন ঘুম থেকে উঠলাম। প্রতিদিন আমার ভোর হয় সকাল ছয় টায়। একটু দেরিই হয়ে গেল আজ।

অফিসের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক আজকে ফিল্ড অফিসারকে নিয়ে তিলিপের ‘হরিচরণ কার্বারি পাড়া’ গ্রামের উদ্দেশ্যে বের হলাম। ফিল্ড অফিসারটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোক। আদিবাসী গ্রাম ও মানুষ সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল।

আমি মনস্থির করলাম হাঁটতে হাঁটতে গ্রামটির সচিত্র পরিদর্শন করব। তার সাথে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়লাম। অফিসের মোটর সাইকেলটির অলস সময় কাটবে আজ, পাশে এমনটি মনে হচ্ছিল আর হাঁটছিলাম।

শহর থেকে মাইল খানেক পশ্চিমে হেঁটে গ্রামের মুখে এসে পড়লাম। গ্রামের মুখ থেকে ভেতরের দিকে কিছু দূর হেঁটেই একজন মুরুব্বী গোছরের হাইস্কুল শিক্ষকের দেখা মিলল। তার সাথে সৌজন্য কথাবার্তা সহযোগে পরিচিত হলাম।

পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক মশায় বিনম্র সুরে তার স্কুলে চায়ের দাওয়াত দিয়ে বসলেন। আমি না বলতে পারলাম না। তাকে দুপুর ১২টার পর দাওয়াত রাখার স্বীকৃতি দিলাম।

এরপর ফিল্ড অফিসারকে নিয়ে গ্রামের গভীরে ঢুকার কথা বলে বিদায় নিলাম। তিনিও হাঁটতে হাঁটতে আকাবাকা উঁটু- নিচু পথ বেয়ে স্কুলের দিকে ধাবিত হলেন। পথেই গ্রামের কার্বারির দেখা মিলল, তার সাথে প্রকল্পের উপকার ভোগীদের বিষয়ে সামান্য আলোচনা করলাম।

এভাবে দুই একজন রাস্তার ধারের বাসা-বাড়ির মহিলাদের সাথে কথা বলতে লাগলাম। তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম প্রকল্পের বিষয়- আশয় । তাদের কথাও শুনলাম। এতে মনে হল সরকারি ও বেসরকারি কর্মকান্ড নিয়ে তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

তাদেরও কেউ কেউ বেশ আগ্রহী হলেও কেউবা পাশ কাটিয়েও চলে যাচ্ছে। এক সময় ঘড়িতে চোখ পড়তেই ১২টা বাজার কথা মনে হল। তখন মহিলাদের সহিত কথার পাঠ চুকিয়ে স্কুলের দিকে রওনা দিলাম।

এঁকে বেঁকে রাস্তা আর পাহাড় চড়ার শখ হয়তো পূরন হত না যদি, মোটর সাইকেল দিয়ে আসতাম। চারিদিকে গাছপালা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে টিলার উপরে স্কুলটিতে পৌঁছে গেলাম।

শিক্ষক মশায় বেশ আগে থেকে আমাদের আসার অপেক্ষায় ছিলেন, চোখে মুখে ব্যস্ততা দেখে বুঝতে দেরি হল না। শিক্ষকদের অফিস রুমে দুটি চেয়ার এগিয়ে দিতেই বসে পড়লাম। বসতে না বসতেই এক পলক কক্ষটির অভ্যন্তর চোখ বুলিয়ে উঠার আগে স্কুলের পিয়ন পাশে দাঁড়িয়ে।

তার হাতের এক পাশে দুটি চায়ের কাপের ট্রে আর অন্য হাতে টিপ বিস্কুতের একটি প্যাকেট নিয়ে হাজির। সম্ভবত তিনি আগে থেকেই আনিয়ে রেখেছিলেন। আমি কৌতূহলী দৃষ্টিতে চা খেতে খেতে অমনি শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বসলাম, “এখানকার শিক্ষার অবস্থা কেমন?”

তিনি অত্যন্ত অনুযোগের সহিত প্রশ্নের উত্তরে বলতে লাগলেন, “এই গ্রামে এক সময় শিক্ষার মান মোটামুটি ভালোই ছিল। পূর্ব থেকেই গ্রামে যারা একটু শিক্ষিত হয়েছে তারা আর থাকেনি, শহরের দিকে ছুটেছে। গ্রামে প্রাইমারি ও হাইস্কুল আছে।

পয়সাকড়ি থাকলে অভিভাবকেরা প্রাইমারি শেষ তো সেনাবাহিনীদের হাইস্কুল ও কলেজে ছেলে মেয়েদের ভর্তিও জন্য শহরে দৌড় দিয়েছে কিংবা সন্তানদেরকে পাঠিয়ে দিয়েছে। পাশে গরীব অভিভাবকদের যাদের কোন উপায় নেই তাদের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ে আছে।”

শান্তি চুক্তি পরবর্তী এই কয় বছরে এলাকার শিক্ষার হার যেমন বেড়েছে তেমনি ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের উপর অবুঝ ভাতৃঘাতি রাজনীতিরও প্রবেশ ঘটেছে। যার ফলে ছাত্রদের মধ্যে প্রাইমারিতে যাদের সম্ভাবনা দেখা গেছে তাদের হাই স্কুল লেভেলে গিয়ে ধারাবাহিকতা আর থাকেনি।

এস এস সি ও এইচ এস সি তে গিয়ে তাদের মধ্য থেকেই বেশি ঝড়ে পরার সংখ্যাটা বেড়ে যাচ্ছে। এই পরিত্যক্ত ছাত্ররাই জীবনের দিশাহীনতায় কোন একসময় পার্টি কিংবা গ্রুপে নাম লেখাচ্ছে।

এককালে শিক্ষা ক্ষেত্রে গ্রামের একটি সুনাম ছিল। আশেপাশের গ্রাম থেকেও এখানে পড়তে আসত। এমনকি গ্রামের অনেক মেধাবী ছেলে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যালসহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে গিয়েছে কিন্তু বর্তমানে তার ভাটা পড়েছে।

আজকাল ছাত্রদের একটা বৃহৎ অংশ হাটবাজারে, শহরে- গ্রামে বিভিন্ন সময় চাঁদা, দাবি-দাওয়া, অপহরণসহ পার্টির নানা কাজে জড়িয়ে নিজেদের স্বর্ণালী শিক্ষা জীবনকে বিনষ্ট করছে। এর সাথে সাথে পিতা-মাতার কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নগুলো কবরে দাফন হচ্ছে। বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে আদিবাসীদের মধ্যে মেধাশূন্য হয়ে পড়বে।

এই আশংকা প্রকাশ করে আবার শিক্ষক মশায় নির্দ্বিধায় বলে উঠলেন যে, শিক্ষার এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে হয়তো একদিন মেধাহীন আদিবাসী প্রজন্ম উৎপাদিত হবে।

‘হরিচরণ কার্বারি পাড়া’ গ্রামের মত আরো অনেক গ্রাম আছে যার পরিস্থিতি অনেকটা এমনই। গ্রামের মানুষ শিক্ষাকে চিনেছে কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারছে না। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই প্রতিকূল অবস্থা তিলিপ’কে ধীরে ধীওর আড়ষ্ট ও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শিক্ষক মশায়ের বক্তব্যে ধারণা পেলাম। এভাবে চলতে থাকলে ‘তিলিপ’ অর্ধ শিক্ষিত ও অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করীদের পর্যায়ে পতিত হবে। শিক্ষক মশায়ের সাথে আজকের আলাপ বেশ জমে উঠছিল, অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুপুর দু-টার আগেই আলোচনা থামিয়ে দিতে হল।

ঠিক দু-টা বাজতেই ফিল্ড অফিসারকে নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে রওনা দিলাম। দিনের পর দিন নিত্য নতুন মানুষের সঙ্গ আমাকে তিলিপের গভীরে ধাবিত করছে। তিলিপের বহু সত্যাবৃত ঘটনা ও সমস্যা উম্মোচিত হচ্ছে একের পর এক।

‘তিলিপ’কে জানতে আরো বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠছি। অফিসে আজ তেমন না বসে রেস্ট হাউজের দিকে পা বারালাম। রাস্তা দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। আসার পথেই দেরি হল। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এল প্রায়।

তাই আজকে দুপুর আর রাতের খাবার সন্ধ্যাতে খাওয়া হয়ে গেল। প্রতিদিনের মত আজও অঘোষিত কারণে বিকেল কাটতেই চারিপাশে সন্ধ্যার মধ্যে পাহাড়ি জন-জীবনের কোলাহল শান্ত ও গম্ভীর হয়ে এল। আমিও ক্লান্ত – শ্রান্ত দেহে অসমাপ্ত কথার পূর্ণতা নিয়ে উন্মুখ হয়ে আছি আগামীর ভোরের অপেক্ষায়।

লেখকঃ স্মরনিকা চাকমা (ফ্রিল্যান্স হিউম্যান রাইটস এক্টিভিস্ট )
, হিল ব্লগার ও লেখক।

লেখার তারিখ: ৫/০৭/২০১৪

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

2 thoughts on “তিলিপের সন্ধানে

Leave a Reply