icon

ত্রিপুরা লোককাহিনীঃ সারস বালিকা

Jumjournal

Last updated Mar 26th, 2020 icon 258

পাহাড়ের ওপরে ছোট্ট সবুজ এক গ্রাম। সেই গ্রামে মানিক নামে এক জুমিয়া পরিবার নিয়ে বাস করত।

দীর্ঘদিন রোগে ভুগে মানিকের স্ত্রী মারা গেল। তার ছিল দুই মেয়ে। বড় মেয়েটির নাম আরতি, আর ছোটটির নাম তৃপ্তি।

কিন্তু ওদের দেখাশোনা করার কেউ নেই। মানিক জুমচাষ আর গৃহস্থালি কাজে খুব ব্যস্ত থাকে। মেয়েদের একটুও দেখাশোনা করতে পারে না।

সে মেয়ে দুটিকে নিয়ে সারাক্ষণই ভাবনায় থাকে। তাই সে মেয়ে দুটিকে নিয়ে ছোট ভাইয়ের বাড়িতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

মেয়ে দুটিকে দেখাশোনার ভার ওদের কাকির দায়িত্বে ছেড়ে দেয়।দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। দুই বোন আরতি আর তৃপ্তি বড় হয়।

এখন তারা কিশোরী। আরতি খুব আত্মবিশ্বাসী। ওর আত্মমর্যাদা বোধ বেশ টনটনে। স্বাধীন স্বভাবের কারণে কাকি আরতিকে পছন্দ করত না।

কাকি তাকে ছোটখাটো ঘটনার জন্যও প্রায়ই বকাঝকা করত। একদিন আরতি কাকির কাছে খাবার চাইল। কাকি তাকে হাঁস-মুরগির খাওয়া এটো খাবার খেতে বলল।

আরেক দিন আরতি কাকির কাছে পানি চাইল। কাকি থুতু ছিটিয়ে বলল, নাও এটাই খাও।
কাকির ব্যবহারে আরতি খুব ব্যথিত হল।

সে কাকির দুর্ব্যবহার সহ্য করতে পারল না। একদিন তার বাবা বাড়ি ফিরলে কাকিমার বিরুদ্ধে বাবার কাছে নালিশ করল।

মানিক কাজ শেষে মাত্রই বাড়ি ফিরেছে। সে ছিল খুবই ক্লান্ত। সে নালিশ শুনে উল্টো আরতিকেই বকাঝকা করল।

মানিক বলল, তুমি নিশ্চয় কাকিকে বিরক্ত করেছ, তাই সে তোমার ওপর রাগ করেছে।
একথা শুনে আরতি কাঁদতে শুরু করল।

সে বলল, আমি এখানে আর থাকব না। আমাকে যেখানে খুশি যেতে দাও, না হয় মেরে ফেল।

একথা শুনে মানিক আরতিকে খুব মারল। আরতি মার খেয়ে কাঁদতে লাগল। মানিক এ অবস্থায় আরতিকে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

আরতি যখন কাঁদছিল তখন একঝাঁক সারস পাখি উড়ে যাচ্ছিল। ওরা আরতির কান্না শুনতে পেল। নেমে এলো আরতির কাছে।

আরতিকে বলল,তুমি কাঁদছ কেন? তোমার দুঃখ কী? আমরা তোমাকে সাহায্য করতে পারি?

আরতি সারস পাখিদের সব ঘটনা খুলে বলল। তারপর বলল, তোমরা প্রত্যেকে আমাকে একটা করে পালক দাও।

তোমাদের পালক পরে আমিও সারস পাখি হয়ে যাব।সারস পাখিদের সবাই আরতিকে একটি করে পালক দিল। সবগুলো। পালক আরতি কুড়িয়ে নিল।

তারপর কাকির কাছে একটা সুই আর সূতা চাইল। একথা শুনে কাকি ওকে আরও তিরস্কার করল। আরতি গেল এক পড়শির কাছে।

তার কাছ থেকে সুই-সুতা চেয়ে নিল। তারপর সুই-সুতা দিয়ে সেলাই করে পালকগুলো দিয়ে দুটি পাখা বানাল। পাখা দুটো দুই বাহুতে লাগিয়ে নিল।

অনেক চেষ্টার পর আরতি এই পাখা দিয়ে উড়তে সক্ষম হল।আরতি যখন উড়ে যাচ্ছিল তখন তৃপ্তি জিজ্ঞেস করল, তুমি কোথায় যাচ্ছ?

আরতি বলল, আমি সারস পাখিদের কাছে যাচ্ছি।

একথা বলেই আরতি উড়তে শুরু করল। উড়ে উড়ে সারসের ঝাকের সঙ্গে মিশে গেল।

এর মধ্যে মানিক বাড়িতে চলে এলো। তৃপ্তির কাছে শুনতে পেল আরতির পাখি হয়ে উড়ে যাওয়ার কথা।

একথা শুনে মানিক চিৎকার করে বলল, তুমি আমাকে ছেড়ে কোথায় যাচ্ছ মা? আমার কাছে ফিরে এসো লক্ষ্মী সোনা মেয়ে আমার।

আরতি বলল, আমি সারস পাখি হয়ে গেছি। এখন থেকে ওদের সঙ্গেই থাকব। আমি আর কোনো দিন তোমার কাছে ফিরতে পারব না।

ওর কথা শুনে মানিক কপাল চাপড়ে অনেক কাঁদল। কিন্তু মানিকের মেয়ে আরতি আর কখুনো ফিরে আসে নি।

লেখক : আবু রেজা

তথ্যসূত্র : ত্রিপুরা আদিবাসী লোককাহিনী

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply