icon

বৃটিশ শাসনে চাকমা জনগোষ্ঠী

Jumjournal

Last updated Mar 11th, 2020 icon 1465

পলাশীর যুদ্ধের তিন বছর পরে, মুর্শিদাবাদের নতুন নবাব মীর কাশিম বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে চট্টগ্রাম বর্ধমান এবং মেদিনীপুর উপহার হিসেবে দিয়ে দেন।

দিনটি ছিল ৫ জানুয়ারী ১৭৬১ সালে, কোম্পানির প্রতিনিধি হ্যারি ভেরেলস্ট চট্টগ্রামের শাসনভার সুবেদার মোহাম্মদ রেজা খানের কাছ থেকে গ্রহণ করেন।

তবে তখনো চাকমা রাজা শের দৌলত খাঁ স্বাধীনভাবে তাঁর রাজ্য পরিচালনা এবং মুঘলদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং কোম্পানির শাসন মেনে না নিয়ে কোম্পানি কর্তৃক ধার্য নির্ধারিত খাজনা প্রদানে বিরত ছিলেন।

ফলে কোম্পানির সাথে একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, যা ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত চলেছিল। কোম্পানি চাকমা রাজের বিরুদ্ধে চারটি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল। সেগুলো হল – ১৭৭০, ১৭৮০, ১৭৮২ এবং ১৭৮৫ সালের যুদ্ধ।

যুদ্ধে কোম্পানি বিশেষ সুবিধে করতে না পারায় এবং চাকমা রাজ্যে বাণিজ্য অবরোধের ফলে সৃষ্ট সমস্যায় – দুই পক্ষই ১৭৮৫ সালে একটি শান্তি আলোচনা চালায়। চাকমা রাজের পক্ষে রাজা জানবক্স খাঁ, শের দৌলত খাঁর পুত্র অংশ নেন।

পরবর্তীতে ১৭৮৭ সালে কলকাতায় চাকমা রাজের সাথে কোম্পানির একটি শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তি অনুযায়ী চাকমা রাজা কোম্পানির আধিপত্য মেনে নেওয়ার পাশাপাশি বছরে ৫০০ মণ তুলা দেওয়ার প্রতিশ্রতি দেন, বিনিময়ে কোম্পানি চাকমা রাজার আঞ্চলিক আধিপত্য মেনে নিয়ে বাণিজ্য অবরোধ তুলে নেয়।

জানবক্স খাঁ তাঁর রাজ্যের রাজধানী রাজানগরে সরিয়ে নেন, যা বর্তমান রাঙ্গুনিয়ার রানীরহাটে অবস্থিত। ১৮০০ সালে জানবক্স খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র টব্বর খাঁ রাজা হন, কিন্তু কিছু সময়ের ব্যবধানে তিনিও মারা গেলে, তাঁর ছোট ভাই জব্বর খাঁ রাজা হন। জব্বর খাঁ ১০ বছর পর্যন্ত শাসন করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরই সন্তান ধরম বক্স খাঁ ১৮১২ সালে রাজা হন। ধরম বক্স খাঁ ১৮৩২ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। ১৮৩২ সালে তাঁর মৃত্যুর পর পুরুষ উত্তরাধিকারের অভাবে রাজ্য শাসনে অরাজকতা দেখা দেয়।

ফলে কোম্পানির হস্তক্ষেপে সুখলাল দেওয়ানকে অন্তর্বতীকালীন ম্যানেজার নিয়োগ দেয়া হয়। এই সময়কালে ধরম বক্স খাঁর বিধবা স্ত্রী রাণী কালিন্দী কোম্পানির কাছে রাজ্য পরিচালন ভার দেওয়ার আবেদন করেন। কোম্পানির সরকার রাণীর আবেদন গ্রহন করে ১৮৪৪ সালে একটি আদেশ জারি করে।

Chakma Royal Palace, Rangunia
প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত রাঙ্গুনিয়ায় রাজানগরের চাকমা রাজবাড়ি, ছবি: কালেরকণ্ঠ

১৮৬৪ সালে নতুন খাজনা ধার্য করা হয়, যার পরিমান দাঁড়ায় বছরে ১১,৮০৩ টাকা। সিপাহী বিদ্রোহের পরে ১৮৫৭ সালে বৃটিশ সরকার কোম্পানির কাছ থেকে ভারত শাসনভার নিয়ে নেয়, এর মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনভারও অন্তর্গত ছিল, যা তখনো পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ভাবে চট্টগ্রাম থেকে আলাদা করা হয়নি।

তবে, বৃটিশ সরকার নতুন দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা নির্দেশ করে একটি প্রত্যাদেশ বাংলা ৬ শ্রাবন ১১৭০ সনে জারি করে। প্রত্যাদেশ অনুযায়ী ফেনী নদী হতে শঙ্খ নদীর মধ্যবর্তী সকল পাহাড় এবং চট্টগ্রামের নিজামপুর রোড হতে কুকি হিলস পর্যন্ত অঞ্চলকে চাকমা রাজ্যের সীমানাভুক্ত করা হয়।

১৮৭৩ সালে রাণী কালিন্দীর মৃত্যুর পর, তাঁর প্রপৌত্র হরিশ চন্দ্র কার্বা‌রি চাকমা রাজা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন এবং রায় বাহাদুর উপাধী প্রদান করা হয়। ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে চাকমা সামরিক বাহিনী ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

কুকি জনগোষ্ঠী, যারা আরো উত্তরের অঞ্চলে স্বাধীন ভাবে বসবাস করত, তারা ১৮৪৭, ১৮৪৮, ১৮৫৯ ও ১৮৬০ সালের দিকে ত্রিপুরা, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও রাণী কালিন্দী শাসিত চাকমা অঞ্চলে একাধিকবার আক্রমণ চালায়।

এর ফলশ্রুতিতে, আক্রান্ত এলাকা রক্ষা এবং চাকমা ভূখন্ড দখলে নেয়ার মানসিকতা থেকে বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নর, হিল ট্রাক্ট রেগুলেশন থেকে চাকমা শাসিত অংশটির অপসারন এবং একজন সুপারিন্টেনডেন্ট নিয়োগের সুপারিশ করেন।

এই সুপারিশগুলো ১৮৬০ সালের ২২ নং আইনে পাশ করানো হয় এবং তা একই বছরের ১৮ অগাস্ট থেকে আইন হিসেবে প্রয়োগ করা হয়।

রাণী কালিন্দী শাসিত চাকমা অঞ্চলকে প্রশাসনিক ভাবে চট্টগ্রাম থেকে আলাদা করে ফেলা হয় এবং এই অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে একজন সুপারিন্টেনডেন্ট নিয়োগ করা হয় যার সদর দপ্তর ছিল বর্তমান রাঙামাটি জেলার চন্দ্রঘোনায়।

এই সুপারিন্টেনডেন্ট-এর অধিভুক্ত এলাকাকে, তখন থেকেই প্রথম বারের মত চিটাগাং হিল ট্র‍্যাক্টস হিসেবে নির্দেশ করা হয়। সুপারিন্টেনডেন্ট নিয়োগের পরবর্তী কয়েক বছর শান্তি শৃংখলা বজায় রাখাটাই হয়ে দাড়ায় মূল কাজ।

১৮৬৯ সালে সুপারিন্টেনডেন্ট-এর সদর দপ্তর চন্দ্রঘোনা থেকে রাঙামাটিতে স্থানান্তর করা হয়। স্থানান্তর করার আগেই সুপারিন্টেনডেন্ট পদটিকে ডেপুটি কমিশনারে রুপ দেয়া হয় এবং তাঁকে এই অঞ্চলের রাজস্ব আদায় থেকে স্থানীয় শাসন ও বিচার ব্যবস্থার সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করা হয়।

পার্শ্ববর্তী জনগোষ্ঠীগুলোর ক্রমাগত আক্রমণ এবং বৃটিশ কর্মকর্তাদের চাপের মুখে চাকমাদের রাজধানী ১৮৭৪ সালে রাজানগর থেকে রাঙামাটিতে স্থানান্তরিত হয়। সেই সময় গুলোয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচুর পরিমাণে তুলা উৎপাদিত হত, যা বৃটিশদের কাছে তাদের দেশের সুতার কলকারখানার কাঁচামাল বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন অত্যন্ত গুরুত্ববহন করতো।

১৮৮১ সালের দিকে বৃটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এই সার্কেলের নামমাত্র শাসকদের “সার্কেল চীফ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এই সার্কেল গুলো হল – চাকমা সার্কেল, বোমাং সার্কেল এবং মং সার্কেল। চাকমা সার্কেল চাকমাদের নিয়ে, আরাকানী বংশোদ্ভূত বোমাং প্রধানের দায়িত্বে বোমাং সার্কেল এবং আরাকানী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ও ত্রিপুরা অঞ্চলের অভিবাসীদের নিয়ে গঠিত হয় মং সার্কেল।

Old Chakma Royal Palace, Rangamati (Ramatti)
বর্তমানে জলনিমগ্ন রামাত্তির (রাঙ্গামাটির) চাকমা রাজবাড়ি, ছবি: Walk Bangladesh

পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভাগ করার পিছনে মূল কারণ ছিল এই যে, বৃটিশ সরকার এই অঞ্চলের অন্যান্য পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের কাছে চাকমা রাজার গ্রহণযোগ্যতাকে ভালো ভাবে নিতে পারছিলো না।

উপরন্তু, বৃটিশ সরকার এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় ক্রমানয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিলো। যার ফলে, বৃটিশ সরকার এই অঞ্চলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত্তি আরোপ করে। যার অন্যতম উদ্দেশ্য গুলো ছিল –

  • চাকমা রাজের শাসন ক্ষমতার তদারকী এবং কতিপয় ক্ষমতার কাটছাঁট করা।
  • কুকী আক্রমণের হাত থেকে বৃটিশ কর্মকর্তা এবং বৃটিশ সম্পদ রক্ষা করা।
  • পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্ত অবস্থা বজায় রাখা যাতে, এই অঞ্চলে তুলার উৎপাদন আরো বৃদ্ধি করানো যায়।

তিনটি আলাদা সার্কেল গঠন করার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকী আক্রমণ চলতে থাকে। এর মধ্যেই শেন্দু জনগোষ্ঠী ১৮৬৫ থেকে ১৮৮৮ সালের মাঝে পার্বত্য চট্টগ্রামে আক্রমণ শানাতে থাকে।

এর মধ্যে ১৮৭২ সালে লেফটেন্যান্ট স্টুয়ার্ড ও তাঁর জরিপ দলের উপর হামলা অন্যতম। এই ক্রমাগত হামলার মুখে, ১৮৯০ সালে বাংলা ও আসামের বৃটিশ প্রশাসনের সহায়তায় লুসাই পাহাড় থেকে চট্টগ্রাম ও বার্মা পর্যন্ত সেনা অভিযান চালানো হয়। ফলশ্রুতিতে, স্বাধীন কুকীদের আবাস ভূমি বৃটিশ শাসনের অধীনে চলে আসে।

১ এপ্রিল ১৯০০ সালে, দক্ষিণ ও উত্তর লুসাই পাহাড় যা আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ ছিল, তা আসাম প্রদেশের সাথে সংযুক্ত করা হয়। বর্তমানে লুসাই হিল ভারতের মিজোরাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ভাঙন নিশ্চিত ও চাকমা আধিপত্য খর্ব করার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ প্রণয়নের মাধ্যমে, বৃটিশদের পক্ষে ডেপুটি কমিশনার এই চাকমা শাসিত অঞ্চলের পরিপূর্ণ শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতে বৃটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত না দেখিয়ে, স্বতন্ত্র এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।


তথ্যসূত্র : নিঝুম তালুকদারের ব্লগ 

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply