icon

আলোকিত তঞ্চঙ্গ্যা পূজনীয় ভিক্ষু রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো

Jumjournal

Last updated Oct 4th, 2020 icon 41

রাজগুরু অগ্রবংশ একটি চেতনা। একটি প্রেরণার নাম। আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের একটি প্রবাদ প্রতীম সংঘ পুরোধার নাম।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতির ধর্মীয় জাগরণের ইতিহাসে অবিস্মরনীয় এক নাম অগ্রবংশ। ভারত বাংলা উপ মহাদেশের বৌদ্ধ শিক্ষা সংস্কৃতি, সমাজ, সংগঠন ও সাহিত্য অঙ্গনে এক বিশিষ্ট নাম।

সদা সর্বদা তেজ দীপ্ত চেতনা ছিল তাঁর অভূতপূর্ব। নিজেকে যেমন গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট আত্মচেতন ও অন্বেষী ছিলেন তেমনি সমাজ ও জাতিকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে আত্মোৎসর্গকৃত।

পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষার আলো বিস্তারে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে সংস্কামুক্ত, সদ্ধর্মের প্রচার প্রসার, স্ব-জাতির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা, বৌদ্ধ সাহিত্যে লেখা-লেখি এবং অনুবাদ কর্মে তাঁর প্রয়াস ও কৃতিত্ব তাকে অনন্য সাংঘিক ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বহু কল্যাণকর জনহিতৈষী কার্যক্রম এবং আলোকিত প্রজন্ম তৈরীর অনন্য সাংঘিক ব্যক্তি হিসেবে তাঁর দূরদৃষ্টি, ত্যাগ ও কৃতিত্ব বিশেষ প্রশংসার দাবী রাখে। আজ তিনি বহুবিধ মাঙ্গলিক কর্মে আলোকিত ও বরেণ্য ব্যক্তি। তিনি চির অমর ও সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাংঘিক ব্যক্তি।

এই পুতপবিত্র মহাসাংঘিক জীবনের খ্যাতি স্বরূপ জাতি ও আন্তজাতিক ভাবে লাভ করেছেন অনেক পুরস্কার এখানে তার সফলতা। সদ্ধর্ম জাগরণের অগ্রদূত এই মহান ব্যক্তিকে সকলে চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। সকল প্রাণ কল্যাণমিত্র বুদ্ধের চেতনায় আলোকিত এই মহান ব্যক্তির প্রতি আমি তারে সশ্রদ্ধ বন্দনা জানাই।

মহাসংঘ নায়ক, প্রয়াত রাজগুরু ভদন্ত অগ্রবংশ মহাথেরোর জীবন ও মানব কল্যাণে মহৎ কর্মের পরিচিতিঃ

২০০৭ খৃঃ অনুষ্ঠিত থাইল্যান্ডে আর্ন্তজাতিক সম্মেলনে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর সঙ্গে মেজর চাকমা রাজা ত্রিদিপ রায়ের কুশল বিনিময়।

জন্মঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলাধীন বিলাইছড়ি থানার বৌদ্ধ অধ্যুষিত জনবহুল একটি গ্রাম কুতুবদিয়া। এই গ্রামের বিশিষ্ট জমিদার এবং কার্বারী পিতা রুদ্রসিং তঞ্চঙ্গ্যা এবং মাতা পুণ্যশীলা ইচ্ছাবতী তঞ্চঙ্গ্যার গর্ভে এক নবজাত সন্তানের জন্ম হয়।

তখন ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ নভেম্বর। পূর্ণচন্দ্র তুল্য ফুটফুটে সন্তানের নাম রাখা হয় ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা। ফুলনাথ ছিলেন পিতা-মাতার ছয় সন্তানের মধ্যে কণিষ্ঠ সন্তান। (সন্তানরা যথাক্রমে অরুন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, কেশবচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা, মেঘনাথ তঞ্চঙ্গ্যা, ফুলনাথ তঞ্চঙ্গ্যা, সরোজিনী তঞ্চঙ্গ্যা, বরুণা তঞ্চঙ্গ্যা)।

উত্তরকালে ফুলনাথ রাজগুরু এবং মহাসংঘনায়ক অগ্রবংশ মহাস্থবির নামে বিশ্বখ্যাত হবে কে জানত? ফুলনাথ বাল্যকাল থেকে সুঠাম দেহধারী এবং অপূর্ব দেবতুল্য চেহারা। দেখতেই তিনি ছিলেন একজন সুপুরুষ।

লেখাপড়ায় যেমন প্রবল অনুরাগী তেমনি ধর্মপ্রবণ এবং মেধাবী। ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হিসেবে অতি আদর-যত্ন, স্নেহ-মমতা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, জলপরিবেষ্টিত জায়গায় এবং প্রাকৃতিক অনুপম সৌন্দর্যের মাঝে ফুলনাথের শৈশব জীবন কাটে গ্রাম্য পরিবেশে।

শিক্ষা জীবনঃ ফুলনাথ যে যুগসন্ধিক্ষণে জন্মেছিলেন সেইসময় অত্র এলাকায় তথা সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে আধুনিক শিক্ষার আলো তেমন প্রবেশ করেনি বললেই চলে। শিক্ষানুরাগী পিতা-মাতা শশীকলাসম বেড়ে উঠা ফুলনাথকে আধুনিক শিক্ষার সুশিক্ষিত করার মানসে প্রাথমিকভাবে আপন গৃহেই লেখাপড়ায় হাতে খড়ি দেন।

সৌভাগ্যক্রমে স্থানীয় পন্ডিত নামে পরিচিত সুদূর আরাকান থেকে জ্ঞানার্জন করে স্বগ্রামে এসে অবস্থান করেন শ্রী ইন্দ্রমুণি মাস্টার তঞ্চঙ্গ্যা। ইন্দ্রমুনি মাস্টার তকালীন পন্ডিত নামে খ্যাত ছিলেন। পিতা-মাতা পুত্র ফুলনাথের পঠন-পাঠন স্পৃহা লক্ষ্য করে উচ্চ শিক্ষার জন্যে ইন্দ্রমুণি মাস্টারের কাছে দায়িত্বভার অর্পণ করেন।

তাঁর আলোকিত জীবনের সংস্পর্শে ফুলনাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কৃতিত্বের সাথে শেষ করেন। শিক্ষক মহাশয় ফুলনাথের সমুজ্জ্বলতা লক্ষ্য করে আশান্বিত হলেন এবং ভবিষ্যতে একটা কিছু হতে পারেন বলে মন্তব্য করেন।

দুর্ভাগ্যবশতঃ তখন অত্র এলাকায় অন্য কোথাও উচ্চ শিক্ষা কেন্দ্র ছিল না, তদুপুরি অন্যত্র গিয়েও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ নেই। ফুলনাথের লেখাপড়ার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও আর বেশি দূর এগোনো সম্ভব হয় নি। এখানেই তার উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে যবনিকাপাত হয়।

সংসার জীবনঃ জমিদার পরিবারের সন্তান। পিতা-মাতার একান্ত অভিপ্রায় ফুলনাথকে সংসারী করা, সুযোগ্য উত্তরসূরি তৈরী করার জন্য ফুলনাথকে সংসার বন্ধনে আবদ্ধ করে দেন। তাদের সুখের সংসারে একপুত্র (নাম জানা সম্ভব হয়নি) এবং এক কন্যা (কণিকা তঞ্চঙ্গ্যা) সন্তানের জন্ম হয়।

ফুলনাথ পারিবারিক যাবতীয় দায়-দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করে চলেছেন। ফুলনাথের কর্মনিষ্ঠা এবং দায়িত্ববেধি দেখে পিতা খুবই মুগ্ধ হলেন। এ সুবাদে পিতা সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমে আরো অধিক সময় ব্যয় করতেন।

ফুলনাথ যদিও সংসারী কিন্তু সংসারের প্রতি একটু উদাসীন এবং ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন। তিনি সংসারী হয়েও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। হঠাৎ করে স্থির সংকল্প করলেন সংসারত্যাগী হয়ে ভিক্ষুত্ব জীবন গ্রহণ করে ভিক্ষু-জীবন অবলম্বন করবেন। তাতে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। পুণ্যশীলা সতীসাধ্বী আন্তরিক সহযোগিতায় তাঁর ব্রহ্মচর্য জীবন ব্রত গ্রহণের পথ সুগম হয়। তাঁর সহধর্মিনী তাতে দ্বিমত পোষণ না করে সানন্দে সম্মতি প্রদান করলেন।

প্রব্রজ্যা জীবনঃ বৈরাগ্যের স্বাদ যিনি অনুভব করেছিলেন তাঁকে কি আর সংসার জীবনে আবদ্ধ করা যায়? ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ, তখন তার বয়স ২২ বছর। পূর্ণ ভরা যৌবন। নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত ও মুক্ত জীবনাচারই তাঁর দীপ্ত যৌবনের প্রত্যাশা।

শুভ বৈশাখীপূর্ণিমা, মন্দির প্রাঙ্গন নানা উৎসব ও লোকে লোকারণ্য। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পিতা-মাতার সম্মতিক্রমে তাঁদেরই পূর্বপুরুষ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত রাইংখ্যং বগলতলী বিহারের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ উঃ তিস্স মহাস্থবিরের নিকট প্রব্রজ্যা ধর্মে দীক্ষিত হন।

প্রব্রজিত জীবনে তার নাম রাখা হয় শ্রামণ ‘অগ্রবংশ’। তাঁর দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয়েছে দেখে তিনি নিজেকে ধন্য মনে করলেন। সেদিন তিনি যেন আর এক নতুন জন্মলাভ করলেন।

গুরুদেবের মেহসান্নিধ্যে শ্রামণ্য জীবন নিয়ম-কানুন,ব্রতাদি শিক্ষা করতে শুরু করেন। শ্রামণও গুরুগত প্রাণ হয়ে গুরুসেবা এবং ধর্মীয় কার্যাদি আন্তরিকতার সাথে পালন করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ধর্ম-বিনয়ের প্রতি লেখাপড়ার প্রবল আগ্রহ বেড়ে যায় তাঁর।

পন্ডিত ধৰ্মানন্দ মহাস্থবিরের সান্নিধ্যেঃ শ্রামণ অগ্রবংশ গুরুদেবের সাহচর্যে কিছুদিন থাকার পর রাঙ্গুনিয়া ইছামতী ধাতুচৈত্য বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত ধৰ্মানন্দ মহাস্থবিরের তত্ত্বাবধানে চলে আসেন। তাঁর নির্দেশনায়ও পাঠ গ্রহণে পালিভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।

আচার্যদেবের ব্যবস্থাপনায় শ্রামণ অগ্রবংশ ত্রিপিটক শাস্ত্রের পালি আদ্য, মধ্য ও উপাধি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। কথিত আছে, তখন তিনি রাঙ্গুনীয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস, এস, সি পাশ করেন।

কয়েক বছর নিষ্ঠার সাথে ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়ন করে পারঙ্গমতা অর্জন করলে আচার্যদেব (পন্ডিত ধৰ্মানন্দ মহাস্থবির) সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সদ্ধর্মের জাগরণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ভিক্ষুর প্রয়োজন অনুধাবন করে শ্রামণ অগ্রবংশকে ভিক্ষুত্বজীবন ধারণ করার জন্যে অনুপ্রাণিত করেন।


উপসম্পদাঃ

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ। শ্রামণ অগ্রবংশের জীবনে এক অবিস্মরণীয় বছর। শুভ বৈশাখী পূর্ণিমার তিথিতে বুদ্ধের বিনয় বিধান মতে অসংখ্য প্রাজ্ঞ ভিক্ষু সংঘ এবং হাজার হাজার ভক্ত অনুরাগীদের সমাবেশে শ্রীমৎ উঃ তিস্স মহাস্থবিরের উপাধ্যায়ত্বে শুভ উপসম্পদা গ্রহণ করেন।

উপসম্পদা হয়েছিল তাঁর জন্ম জনপদের বগলতলী বিহারের পার্শ্বস্থ উদকসীমায়। তখন তাঁর পূর্ব নাম পরিবর্তিত হয়ে নতুন নামকরণ করা হলো ‘অগ্রবংশ ভিক্ষু’। উচ্চতর শিক্ষা এবং বুদ্ধ বাণীর প্রতি প্রবল আগ্রহ তার গৃহী জীবন থেকে ছিল।

জন্মান্তরের পুণ্য পারমীর প্রভাবে তিনি দেব-নর পূজিত ভিক্ষুত্ব জীবনে নিজেকে করেছেন উৎসর্গীকৃত। গুরুদেবের সাথে কিছুদিন অবস্থানের অনুমতি নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন বাগোয়ান ফরাচিং বিহার এবং বেতাগী বনাশ্রমে, অতীতের পুণ্য সংস্কার বিমন্ডিত অগ্রবংশ ভিক্ষু তৎকালীন প্রখ্যাত সাধক ভদন্ত আনন্দমিত্র মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে এসে অবস্থান করেন।

তখন চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সাধকপ্রবর আনন্দমিত্র মহাস্থবির প্রভাব ছিল অভূতপূর্ব। আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবে সমগ্র বঙ্গভূমিতে তাঁর নাম পরিচিত ছিল।

পবিত্র ঐতিহাসিক ফরাচিং বিহারটি সমতল এবং পাহাড়িদের পবিত্র পুণ্যতীর্থ নামে পরিচিত। শতশত পুণ্যার্থী এই প্রাচীন মন্দিরে পূজো দেওয়ার জন্যে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে ভীড় জমাতেন।

তিনি (অগ্রবংশ ভিক্ষু) তাঁর সান্নিধ্যে এসে পুনঃ শিষ্যত্ব গ্রহন করে ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়ন ও বিদর্শন ভাবনা শিক্ষা করেন।

উল্লেখ্য, তখন গুরুদেবের নির্দেশে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক বর্ষ রাউজান থানাস্থ পশ্চিম আধার মানিক নিগ্রোধারামে ছিলেন। গুরুশিষ্য দু’জনে নব উপসম্পন্ন ভিক্ষুর জন্ম জনপদ কুতুবদিয়া গ্রামের (বিলাইছড়ি সদর) লোকালয়ের বাহিরে গভীর বনে অরণ্যচারী হয়ে প্রায় দু’বৎসর ব্যাপী ধ্যান সমাধি অনুশীলন এবং কঠোর ধুতাঙ্গত পালন করেন।

সাধকপুরুষ আনন্দমিত্র মহাস্থবির কুতুবদিয়ার মত জায়গাতে অবস্থান কালীন সময়ে সমস্ত এলাকা জুড়ে ধর্মীয় এক মহাজাগরণের শুভ সূচনা হয়েছিল।

ভিক্ষু অগ্রবংশ তার জন্মজনপদে এ পুণ্য পুরুষকে আনতে পেরে ধন্য মনে করলেন। তিনিও গুরুদেবের অনুকরণে ব্ৰতাদি পালন এবং আধ্যাত্মিক ধ্যান সাধনায় জড়িত হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করলেন।

তাঁর সাহচর্যে থেকে বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন বিষয়ে প্রভূত জ্ঞান আহরণের সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু অত্র এলাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় সভা ও পূজো, পার্বণ ইত্যাদি মহাসমারোহে সম্পন্ন হলেও ইতি পূর্বে কোনদিন কঠিনচীবর দানোত্সব হয়নি।

ভিক্ষু অগ্রবংশের ব্যবস্থাপনায় এবং গ্রামবাসীর সার্বিক সহযোগিতায় বগলতলী বৌদ্ধ বিহারে সর্বপ্রথম কঠিনচীবর দানের আয়োজন করা হয়।

এ বিশাল ধর্মসভায় তল্কালীন রাজগুরু ভদন্ত প্রিয়রত্ন মহাস্থবিরও যোগদান করেন। ভিক্ষু অগ্রবংশের জীবনে এটা বিশাল ধর্মীয় সংস্কার তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় আন্দোলন বলা যায়।

তখন তাঁরই উদ্যোগে বগলতলী বৌদ্ধ সমিতি নামে সংগঠন গড়ে তোলেন। এ সংস্থার মাধ্যমে স্থানীয় যুবকদের একত্রিত করে সামাজিক ও ধর্মীয় জাগরণে বহু কাজ করেন।

উচ্চ শিক্ষার্থে ব্ৰহ্মদেশ যাত্রাঃ ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ। ভিক্ষু অগ্রবংশের আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সুত্রপাত। গুরুদেব আনন্দমিত্রের সুপরামর্শে উচ্চ শিক্ষার জন্যে ভিক্ষু অগ্রবংশ ব্রহ্মদেশের উদ্দেশ্যে স্বদেশ ত্যাগ করেন।

বৌদ্ধপ্রধান ব্রহ্মদেশে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। প্যাগোডার দেশ ব্রহ্মদেশ। সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মন্দির প্রাঙ্গণে শত শত ঘন্টার ধ্বনি, মঙ্গলবাণী পাঠ, হাজার হাজার মহান ভিক্ষু সংঘের পিণ্ডাচরণ, উপাসক/উপাসিকাদের সমাবেশে দান কার্যাদি সম্পাদন প্রত্যক্ষভাবে না দেখলে ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

নতুন পরিবেশের মহান পুণ্যতীর্থভূমিতে এসে নিজেকে ধন্য মনে করলেন। সেখানে তাঁর ধর্মীয় চেতনা বহুগুণ বেড়ে যায়।

আধ্যাত্মিক ধ্যান চর্চা ও শাস্ত্র শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ দেন। বার্মা দেশের প্রখ্যাত বিদর্শানাচাৰ্য অগ্রমহাপণ্ডিত উঃ শোবানা মহাস্থবির (মহাসি সেয়াদ) এর কাছে অবস্থান করে বিদর্শন ভাবনা শিক্ষা করেন।

ইতিমধ্যে তিনি বার্মার লেপেড়াং বিশ্ববিদ্যালয় এবং কামাইয়ুড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে ধারাবাহিক ত্রিপিটক শাস্ত্র অধ্যয়ন করে পালিভাষা ও সাহিত্যে এম, এ, এবং প্রিপিটক বিশারদ উপাধি লাভ করেন।

প্রাজ্ঞ পরম পুরুষদের সংস্পর্শে এসে ভিক্ষু অগ্রবংশের জীবন সর্বদিকে সুষমামন্ডিত এবং জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। বৌদ্ধদেশে তাঁর এই বিরল কৃতিত্ব সত্যিই আনন্দ এবং গৌরবের।

(ফাইল ছবি)

বার্মায় অনুষ্ঠিত ১৯৫৪-৫৬ খৃঃ ৬ষ্ঠ বৌদ্ধ মহাসংগীতিতে সংগীতিকারক হিসেবে অংশগ্রহণ পণ্ডিত অগ্রবংশ মহাস্থবিরের সংঙ্গে অন্যান্য মহাসংঘমনীষীবৃন্দ।

ষষ্ঠবৌদ্ধ মহাসংগীতিতে যোগদানঃ ১৯৫৪-১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ভগবান বুদ্ধের ২৫০০ তম বুদ্ধ জয়ন্তী উপলক্ষে বার্মার রাজধানী রেঙ্গুনে ষষ্ঠ বৌদ্ধ মহাসংগীতির আয়োজন করা হয়।

বার্মার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মিঃ উ নুর ছিলেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক। দেশ-বিদেশের মহাপণ্ডিত এবং ত্রিপিটকশাস্ত্রজ্ঞ মহান ভিক্ষুসংঘ এবং অনেক গৃহীপণ্ডিত ব্যক্তিগণ আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।

শ্রীমৎ অগ্রবংশ ভিক্ষু এই মহাসংগীতিতে সংগীতিকারক হিসেবে আমন্ত্রিত প্রতিনিধি হয়ে অংশগহণ করেন। সেই সময় ব্ৰহ্মদেশ ও অন্যান্য বৌদ্ধদেশ হতে আগত মহাজ্ঞানী ভিক্ষুদের সমন্বয়ে সুপ্রিম সংঘ কাউন্সিল গঠন করা হয়।

তিনি ছিলেন এই সুপ্রিম সংঘ কাউন্সিল এর অন্যতম দিক নির্দেশক সদস্য এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সরকারী পর্যায়ে আমন্ত্রিত একমাত্র ভিক্ষু।

এ সম্মায়নে তিনি সূত্র পিটক, অট্‌ঠকথা, টীকা-টিম্পনী, বিনয় ও অভিধর্ম বিষয়ে বহু পাণ্ডিত্যপূর্ণ পর্যালোচনা করেন এবং ত্রিপিটক বিশোধক সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

দেশ-বিদেশের ২৫০০ হাজার পন্ডিত ভিক্ষুসংঘের মধ্যে তাঁর এই সম্মানজনক সদস্যপদপ্রাপ্তি আনন্দের বিষয়। তার পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ বার্মার “বুদ্ধশাসন কাউন্সিল” তাঁকে “অগ্রমহাপন্ডিত” উপাধিতে ভূষিত করেন।

তার এই বিরল সম্মাননা বঙ্গদেশের বৌদ্ধদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। তখন সদ্ধর্ম প্রবর্ধক চাকমা রাজা মেজর ত্রিদিব রায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগদান করলে শ্রীমৎ অগ্রবংশ ভিক্ষু সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।

উভয়ে মধ্যে তখন দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে দীর্ঘ আলাপ আলোচনার পর রাজা বাবু তাঁকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের জন্যে আমন্ত্রণ জানান। সেই সময় সমতলীয় বৌদ্ধদের মধ্যে কয়েকজন প্রতিনিধি ও এই মহাসংগীততে অংশগ্রহণ করেন।

তম্মধ্যে উপসংঘরাজ পন্ডিত শ্রীমৎ সুগতবংশ মহাস্থবির ছিলেন অন্যতম। তাঁরা দুজনেই বাল্যবন্ধু ছিলেন।

প্রবাস জীবনে স্বদেশের প্রিয়জনের দেখা খুবই আনন্দজনক। সঙ্ঘায়ন শেষে উভয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহাপন্ডিত পটুঠান ছেয়াদ উঃ নারদ মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে আন্তর্জাতিক সাধনা কেন্দ্র ‘কামায়ুড বিদর্শন আশ্রমে’ ধ্যান-শিক্ষার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।

তখন সেখানে বাঙালি আচার্য ছিলেন- সাধকশ্রেষ্ঠ শ্রীমৎ ধর্মবিহারী মহাস্থবির। সৈয়দবাড়ী গ্রামের বৈশাখ তালুকদার এবং ইছামতি গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার অরিন্দম বড়য়া তাদেরকে বিশেষভাবে সহায়তা প্রদান করেন।

ভাবনা কোর্স শেষ করে ব্রহ্মদেশের ঐতিহাসিক প্রাচীন বৌদ্ধতীর্থস্থানসমূহ পরিদর্শনসহ পঠান বিষয়ে আরো শিক্ষা গ্রহণ করেন।

তার জ্ঞান পিপাসার যেন শেষ নেই। প্রব্রজ্জ্যা জীবন গ্রহণের পর থেকে যেখানে সাধক, গুণী-জ্ঞানীদের খবর পেয়েছেন সেখানেই ছুটে গিয়েছেন।

জ্ঞান আহরণের জন্যে তিনি ছিলেন সত্যি একজন জ্ঞান সাধক। ত্রিপিটক শাস্ত্রে পারঙ্গম একজন বিরল সংঘ মনীষী। এখানে তার ব্রহ্মচর্য জীবনের সফলতা।

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনঃ ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে দীর্ঘ ১০ বৎসর বার্মাদেশে ধ্যান-সমাধি এবং ত্রিপিটক অধ্যয়ন শেষ করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে বার্মাদেশ ত্যাগ করেন।

স্বদেশের মাটিতে এসে তিনি স্বজাতির কাছ থেকে বিপুল সংবর্ধনা লাভ করেন। রাঙ্গামাটিস্থ রাজ বিহারে সেই বছর তাঁকে ‘চাকমা রাজগুরু’ পদে বরণ করা হয়।

এর মূলে ছিল চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সানুগ্রহ প্রার্থনা ও আমন্ত্রণ। শাস্ত্রে আছে ‘গুণী গুণং বেত্তি’। গুণীজনেরাই গুণীর কদর জানেন। যোগ্যব্যক্তিকে যোগ্যপদে বরিত করা জাতির মঙ্গল।

সংগঠকঃ ভদন্ত অগ্রবংশ মহাস্থবির ছিলেন একজন সংগঠন প্রিয় ব্যক্তিত্ব। একটা সমাজ বা জাতি সংগঠিত না হলে জাতির অস্তিত্ব, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি রক্ষা করা যায় না। সদ্ধর্মের জাগরণও আশা করা যায় না।

তাই তিনি রাজগুরু পদে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বৌদ্ধ মিশন পরে ’পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ সমিতি’ এবং পার্বত্য চট্টল ভিক্ষু সমিতি প্রতিষ্ঠা করে সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

উপরোক্ত সংস্থার মাধ্যমে মহান ভিক্ষুসংঘ এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নে বলিষ্ট ভূমিকা আমৃত্যু রেখেছিলেন।

এ সংস্থাসমূহে পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থেকে কাজ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শ্রীমৎ বিমলবংশ মহাস্থবির, শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির, শ্রীমৎ তিলোকানন্দ মহাস্থবির, শ্রীমৎ সুগতপ্রিয় মহাথেরো, শ্রীমৎ চিত্তানন্দ মহাথের এবং উচ্চশিক্ষিত ভিক্ষুদের মধ্যে শ্রীমৎ বিমলতিষ্য মহাস্থবির, শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির এবং শ্রীমৎ শ্রদ্ধালঙ্কার মহাস্থবির প্রমুখ।

তারা শাসন সমাজে বিশেষতঃ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সদ্ধর্মের প্রচার ও প্রসারে একান্ত সহযোগী ছিলেন। এমনকি তন্মধ্যে কয়েকজন স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক বিশাল কর্মকান্ড, স্কুল, কলেজ এবং আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে স্ব-জাতি এবং সদ্ধর্মের কল্যাণে অসাধারণ অবদান রেখে যাচ্ছেন।

ইদানিং অনেক তরুণ ভিক্ষু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করে উচ্চতর ডিগ্রী এবং গবেষণা কাজে রত আছেন দেশ-বিদেশে। আজ পার্বত্য অঞ্চলের ধর্মীয় ও সামাজিক অগ্রগতি তাঁর অক্লান্ত প্রয়াসের সুফল বললেও অত্যুক্তি হয় না।

তিনি বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার প্রথমে সহ-সম্পাদক এবং পরবর্তী সময়ে সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অভূতপূর্ব।

১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য চট্টল ভিক্ষু সমিতির গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ করেন তিনি। এই সংবিধানের দ্বারাই সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সুদৃঢ় করেছিলেন।

তিনি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে ক্ষান্ত ছিলেন না। সাংগঠনিক কার্যক্রম গতিশীল করার জন্যে যতটুকু শ্রম, মেধা, ত্যাগ এবং পরস্পরের মধ্যে আন্তরিক সুসম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে তাঁর দূরদৃষ্টি ও ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ঘাটচেক ধর্মামৃত বিহারে একপক্ষকালব্যাপী পবিত্র ভিক্ষু পরিবাস ব্রত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রথিতযশা প্রাজ্ঞ প্রায় ১১৫ জন মহান ভিক্ষুসংঘের সমাবেশে সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার পঞ্চবিংশতিতম সাধারণ বার্ষিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

তিনি (অগ্রবংশ মহাস্থবির) সেই অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ছাপাকারে পনের পৃষ্টার যে অমূল্য ভাষণ দিয়েছিলেন তা প্রজন্মের জন্য একটি মহাসম্পদ।

ঐতিহাসিক এই পুণ্যময় অনুষ্ঠানে সংঘরাজ ভদন্ত অভয়তিষ্য মহাস্থবির আর্য শ্রাবক ভদন্ত জ্ঞানীশ্বর মহাস্থবির, বিনয়াচার্য ভদন্ত বংশদীপ মহাস্থবির প্রমুখ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তখন অত্র বিহারের অধ্যক্ষ ছিলেন পন্ডিত সুগত বংশ মহাস্থবির।

ধর্মীয় জাগরণঃ শ্রদ্ধেয় রাজগুরু ভন্তে পার্বত্য বাসীকে ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে গ্রামে গ্রামে বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এই বৌদ্ধ বিহারগুলি একদিকে যেমন ধর্ম অনুশীলন কেন্দ্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অন্যদিকে এই বিহারগুলি পালন করে সমাজ উন্নয়নের বিশেষ ভূমিকা।

এভাবেই পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজে আসে নব জাগরণ। তখন সমাজে ধর্মীয় শিক্ষার সাথে সাথে সাধারণ শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা এমন কি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যা শিক্ষারও প্রসার ঘটে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্যং বা বৌদ্ধ বিহারের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে স্কুল কলেজ প্রভৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

এভাবে সমাজ ও ধর্ম উন্নয়ন, ছন্দ মিলিয়ে এক সাথে এগিয়ে চলে। ষাট দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্মীয় নব জাগরণের জোয়ার আসার পেছনে শ্রদ্ধেয় রাজগুরু অগ্রবংশ ভন্তের অবদান অপরিসীম।

বিহারকে কেন্দ্র করে আয়োজন হয় ধর্ম সভার। আলোচনা হয় ধর্ম ও সমাজের বর্তমান ও ভবিষ্যত। এসব আলোচনা সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করেন গ্রামের আবালবৃদ্ধবণিতা।

আলোচনা সভায় মিলে তারা একে অপরের সাথে বিনিময় করে মৈত্রী ও শুভেচ্ছা। ফলে একের প্রতি অপরের জাগে ভ্রাতৃত্ববোধ।

সমাজে আসে একতা ও সমৃদ্ধি। শ্রদ্ধেয় রাজগুরু ভান্তে সংঘ দান, অষ্টপরিষ্কার দান এবং কঠিন চীবর দানের ব্যাপক প্রচলন করেন।

এতে দায়ক দায়িকাদের মধ্যে ধর্মচেতনাও বেড়ে যায়। এমনকি প্রবারণা মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামের গ্রামগুলোতে বৌদ্ধ পার্বণাদি মহোৎসবের রূপ ধারণ করে।

সমাজ সংস্কারকঃ ত্রয়োদশ শতক থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ নামেমাত্র বৌদ্ধ ছিলেন। ধর্মীয় কুসংস্কার, নানা প্রকার মিথ্যাদৃষ্টি এবং অবৌদ্ধচিত ধর্মীয় কার্যক্রম ছিল প্রবল।

রাউলী পুরোহিত নামে এক শ্রেণীর ধর্মীয় গুরু ছিলেন তাঁরা সংসার জীবন যাপনও করতেন আবার ধর্মীয় কার্যাদিও পরিচালনা করতেন।

রাজগুরু অগ্রবংশ বার্মাদেশ থেকে এসে পার্বত্য বৌদ্ধ ভিক্ষু সমিতির মাধ্যমে সমগ্র পার্বত্য বৌদ্ধ এলাকাগুলির সচেতন ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিয়ে বহু ক্যাং বা বৌদ্ধ মন্দির প্রতিষ্ঠা করে ভিক্ষুসংঘের মাধ্যমে বুদ্ধপূজা, সংঘপূজা, সংঘদান, অষ্টপরিষ্কারদান, চীবর দান, ত্রিরত্ন বন্দনা, শীল পালন ইত্যাদি মাঙ্গলিক কাজে উদ্বুদ্ধ এবং অনুপ্রাণিত করেন।

তদুপুরি বুদ্ধপূর্ণিমা, আষাঢ়ীপূর্ণিমা, মধুপূর্ণিমা ও প্রবারণাপূর্ণিমায় গ্রামবাসীদের একত্রিত করে পঞ্চশীল এবং অষ্টশীল ব্ৰতাদি পালনের জন্য বিহারে ভিক্ষু রাখারও ব্যবস্থা করেছিলেন।

তাঁরই উপাধায়ত্বে অনেক তরুণ বয়স্ক গৃহী, শ্রামণ ও ভিক্ষুত্ব জীবনে এসেছিলেন। তাঁরাই পরবর্তীকালে সমগ্র পার্বত্যবাসী বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মের জাগরণ এবং সমাজ সংস্কারে ভূমিকা পালন করে চলেছেন।

ভিক্ষুরা বুদ্ধের ধর্ম বিনয় উপাসক-উপাসিকাদেরকে সহজ সরল ব্যাখ্যাসহ বুঝিয়ে দিতেন। এভাবে অনেক চেষ্টা-প্রচেষ্টার দ্বারা ধর্মের জোয়ার এনেছিলেন। এখানে তার ধর্মাভিযানের সফলতা শুনা যায়।

মহাস্থবির বরণঃ ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দ। স্থবির অগ্রবংশের জীবনে আর একটি স্মরণীয় বছর। তখন তার ভিক্ষু জীবনের ২৭ বছর পূর্ণ হয়। তার সুদীর্ঘ ভিক্ষুত্ব যাপনের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সম্মানসূচক ‘মহাস্থবির’ পদে অভিষিক্ত করার আয়োজন করা হয়।

এ উপলক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনেরও ব্যবস্থা করা হয়। তখন অনুষ্ঠানে নেপালের তত্ত্বালীন রাষ্ট্রদূত শ্ৰীকীর্তি নিধি (পরবর্তীকালে নেপালের প্রধানমন্ত্রী) এবং তাঁর সহধর্মিণী, জাপানের রাষ্ট্রদুত ও তাঁর সহধর্মিণী, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত এবং উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিবৃন্দ যোগদান করেন।

সেই বিশাল সমাবেশে সংঘরাজ শ্রীমৎ অভয়তিষ্য মহাস্থবির মহোদয়কে পুনরায় সংঘরাজ পদে নির্বাচিত করা হয়।

মূল অনুষ্ঠানের আগের দিন ৮ই এপ্রিল, ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তান সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সাধারণ অধিবেশন হয়েছিল।

সে সভায় সভাপতিত্ব করেন ত্রিপিটকধর শ্রীমৎ বুদ্ধরক্ষিত মহাস্থবির, তার ১৬ পৃষ্ঠার ভাষণটি অনেক প্রাচীন ইতিবৃত্ত এবং তথ্যবহুল আলোচনা প্রজন্মের জন্যে একটি মূল্যবান দলিল বলা যায়।

পরের দিন মহাসমারোহে এবং অসংখ্য প্রাজ্ঞ ভিক্ষুসংঘের উপস্থিতিতে বিনয় বিধানমতে তাঁকে মহাস্থবির অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়।

এ পণ্য মাঙ্গলিক আয়োজনের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্রীমৎ জ্ঞানশ্রী মহাস্থবির, তষ্টমণি চাকমা, শ্ৰীচিত্রগুপ্ত চাকমা এবং শ্রীসনৎ কুমার চাকমা।

প্রধান পৃষ্টপোষক ছিলেন মেজর রাজা ত্রিদিব রায়, রায় বাহাদুর বীরুপাক্ষ রায়, শ্রীবলভদ্র তালুকদারঅবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট শ্ৰীবিধুভূষণ মুৎসুদ্দী- অবসর প্রাপ্ত এডুকেশন অফিসার, শ্রীশশাংক কুমার দেওয়ান- হেডম্যান, ১২১নং কেংড়াছড়ি মৌজা, মীপরঞ্জয় খীসা, শ্রীবিজয়চন্দ্র চাকমা প্রমুখ।

সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে এ জাতীয় মহোৎসব একটি নব ইতিহাসের সূচনা করেছিল।

শিশু করুণা সংঘ প্রতিষ্ঠাঃ ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ শে অক্টোবর। কলিকাতাস্থ উত্তর ২৪ পরগণা চকপাচুরিয়া রাজার হাট নামক এক বিশাল জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শিশু করুণা সংঘ’।

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শ্রীমৎ বিমলতিষ্য মহাস্থবির এবং সভাপতি ছিলেন রাজগুরু শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবির।

বর্তমানে উক্ত প্রতিষ্ঠান স্কুল এবং কলেজের রূপ লাভ করেছে। প্রায় ৫০০/৬০০ জন ছাত্র/ছাত্রী ইংরেজি বাংলার মাধ্যমে লেখাপড়া করছে। প্রায় সব ছাত্র/ছাত্রী সেখানে আবাসিক হিসেবে অবস্থান করে এবং আহার-বিহারের ব্যবস্থা রয়েছে।

ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য ১৬ শয্যা বিশিষ্ট একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংস্থার প্রধান লক্ষ্য হল জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের শিশু ও যুব সম্প্রদায়ের কল্যাণ সাধন করা।

বিশেষত পার্বত্য এলাকার অনগ্রসর শিশুদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ সুযোগ সুবিধা প্রদান করা মানবতাবাদী এই দুই সংঘমনীষীর দূরদৃষ্টি এবং প্রচেষ্টায় উক্ত সংস্থার মাধ্যমে অবহেলিত এবং সুবিধা বঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা সত্যিই একটি অবিস্মরনীয় কীর্তি।

এর উন্নয়নে ফ্রান্স সরকার এবং ঐ দেশে দানবীরদের সহায়তার বিষয় কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণযোগ্য। জাতি যুগ যুগ ধরে এর সুফল লাভ করবে।

কাপ্তাই বাঁধঃ ১৯৬০ খিস্টাব্দ। পার্বত্যবাসীদের জন্যে বলা যায় মহাদুঃখ। কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে কর্ণফুলী নদী তার উপনদী সমূহ জল ভর্তি হয়ে দু’কুল প্রবাহিত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে যায়। প্রায় ৬০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জলমগ্ন হয়ে পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ বৌদ্ধগ্রাম জলমগ্ন হয়ে যায় এবং লক্ষাধিক লোক উদ্বাস্তু হয়।

জীবিকার একমাত্র উপায় ছিল কৃষিকাজ। অসংখ্য জমি হারানোর ফলে লোকজন বিপদগ্রস্থ হয়ে পড়েন। পার্বত্য এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসরত লোকজন তখন কিংকতর্ব্যবিমূঢ় হলেও ভদন্ত অগ্রবংশ মহাস্থবির তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থার কর্মী ভিক্ষুসংঘের উদ্যোগে ছেলে-মেয়েদের আধুনিক শিক্ষাদানের পাশাপাশি ধর্মীয় আদর্শে গঠন করার প্রয়াস চালান।

এ ব্যাপারে শ্রীমৎ বিমলতিষ্য মহাস্থবির ও শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবিরের অবদান উল্লেখযোগ্য। রাঙ্গামাটি মনোঘর এস মিরপুরে স্কুল ও কলেজ স্থাপন করে অসংখ্য ছাত্র ছাত্রীদেরকে উচ্চ শিক্ষাসত যাপনের ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন।

খাগড়াছড়িতে শ্রীমৎ সুমনালংকার মহাস্থবির এ শ্রীমৎ তিলকানন্দ মহাস্থবির সেবামূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে মানব সেবার রত আছেন।

শ্রীমৎ ক্ষেমাচারা মহাস্থবিরসহ আরো বহু ভিক্ষু বিভিন্ন পার্ক এলাকায় অনাথালয় ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করে মানব সেবায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন।

এদিকে বিস্তৃত এলাকায় জলমগ্ন হওয়ায় চাকমা রাজবাড়ী, গৌতমমনি মন্দির এবং রাজবিহার ধ্বংস হয়ে যায়। অধুনা সুউচ্চ পাহাড়ের উপরে নতুন করে রাজ পরিবারের বাসভবন, গৌতমমুনি মন্দির ও রাজবিহার নির্মাণ করা হয়।

তখন থেকে তিনি বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে ধর্ম প্রচার ও মন্দির, জাদি ও স্তুপ নির্মাণের জন্য উৎসাহিত করেন। এভাবে তিনি ধর্মীয় জাগরণ অব্যাহত রেখেছিলেন। এ সকল কার্যক্রমে ভদন্ত অগ্রবংশ মহাস্থবিরের ভূমিকা ছিল অগ্রণী।

শিষ্য সংগঠনঃ শাসন-সমাজের কল্যাণ সাধন করতে হলে একক প্রচেষ্টা দ্বারা সবকিছু সম্ভব নয়, প্রয়োজন সংঘবদ্ধ প্রয়াস। তথাগত বুদ্ধ তার সদ্ধর্মবাণী প্রচার মানসে সর্বপ্রথমে সংঘসৃষ্টি করেছিলেন, পবিত্র ভিক্ষু সংঘ হচ্ছে বৌদ্ধধর্মের ধারক ও বাহক, পৃথিবীতে যতদিন চারজন সংঘ বিদ্যামান থাকবে ততদিন বুদ্ধ শাসনের শ্রীবৃদ্ধি ছাড়া অবলুপ্তি হবে না।

এর মর্মার্থ উপলব্ধি করে তিনি বহুকুলপুত্রকে প্রব্রজ্যাধর্মে দীক্ষিত করে ধর্ম বিনয় শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার সুব্যবস্থা করেছিলেন।

তাঁর শিষ্যদের মধ্যে শ্রীমৎ তিলোকানন্দ মহাস্থবির, শ্রীমৎ সুমনালংকার মহাস্থবির, শ্রীমৎ নন্দপাল মহাস্থবির, শ্রীমৎ শোভানন্দ মহাস্থবির, শ্রীমৎ ক্ষান্তিকাল মহাস্থবির (প্রয়াত) শ্রীমৎ সুমনা মহাস্থবির, শ্রীমৎ বিমলবংশ মহাস্থবির (প্রয়াত), শ্রীমৎ বিমলাঙ্কুর মহাস্থবির (মিজোরাম, ইন্ডিয়া) শ্রীমৎ বিজয়নন্দ ভিক্ষু (থাইল্যান্ড) সাধক শ্রেষ্ঠ শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির (কম্মবাচা আচাৰ্য) শ্রীমৎ প্রজ্ঞানন্দ মহাস্থবির (কম্মবাচা আচাৰ্য)। এদের মধ্যে অনেকে আধুনিক শিক্ষা এবং ধর্ম বিনয়ে সুশিক্ষিত হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে শাসন ও সমাজ কল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছেন।

তার চিন্তা-চেতনা ছিল সমাজকে আলোকিত করতে হলে উচ্চ শিক্ষিত এবং শাস্ত্রজ্ঞ ভিক্ষু প্রয়োজন।

একজন ভিক্ষু যেভাবে সমাজ কল্যাণ কাজ করতে পারে শতজন গৃহীর পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাই তিনি ভিক্ষু সমাজকে সব সময়ে প্রাধান্য দিতেন বেশি।

পালি শিক্ষা প্রবর্তনঃ পালি ভাষা ও বৌদ্ধ সাহিত্য হচ্ছে বৌদ্ধ সংস্কৃতির ভিত্তিভূমি। বুদ্ধ সমকালীন এবং পরবর্তীকালে বৌদ্ধ বিহারগুলো ছিল পালি ভাষা ও বুদ্ধ সাহিত্য চর্চার আদি পীঠস্থান।

প্রতিটি বুদ্ধ বিহারে এক একটি শিক্ষার কেন্দ্র ছিল। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির দেশ-বিদেশ থেকে ত্রিপিটক শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করে স্বদেশের মাটিতে আসার সাথে সাথে সমগ্র পার্বত্য এলাকায় পালি ভাষা ও ত্রিপিটক শাস্ত্র শিক্ষার পথ সুগম করার লক্ষ্যে রাঙ্গামাটি পালি কলেজ ও পালি পরীক্ষা কেন্দ্র শিক্ষা চালু হয়েছিল।

তিনি কলকাতায় অবস্থানকালীন সময়ে তার পালিভাষা ও সাহিত্যে অনবদ্য পান্ডিত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পালি সাহিত্যে ও ত্রিপিটক শাস্ত্রে পি.এইচ.ডি ডিগ্রী কোর্সে অন্যতম পরীক্ষক হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দিয়ে সম্মানিত করেছিল এবং তিনি বৌদ্ধশাস্ত্রে পন্ডিত নামে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ছিলেন।

এটা তাঁর জীবনে জন্য একটা বিশেষ গৌরবের তেমনি বৌদ্ধ সমাজের জন্য একটি বড় প্রাপ্তি বলা যায়।

রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো

আন্তর্জাতিক সম্মেলনঃ তিনি ভিক্ষুত্ব জীবনে বরিত হওয়ার পর থেকে সর্ব প্রথম ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে বার্মাদেশ যাত্রা করেন। সেখানে থাকাকালীন সময়ে ষষ্ঠ বৌদ্ধ মহাসংগীতিতে যোগদান করেন।

১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে তীর্থ ভ্রমনের উদ্দেশ্যে ভারতে গমন করেন। ভারতে অবস্থানকালীন সময়ে তিনি জাপান, লন্ডন, রাশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালেশিয়া, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইউরোপের অনেক দেশে বৌদ্ধদের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে বহু আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানসহ নেতৃত্ব দিয়ে দেশ ও স্বজাতির নানা বিষয় এবং প্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কে তুলে ধরেছিলেন।

তাঁর সঙ্গে ছিলেন ‘শিশু করুণা সংঘের’ পরিচালক শ্রীমৎ বিমলতিষ্য মহাস্থবির। তিনি All India Bengal Buddhist Association (India), World Fellowship of Buddhists (Thailand), Mahabodhi Society (India), Kalinga Nippon Buddhist Sanga (Japan), Union Buddha Sasana Council (Burma), The Colombo Young men’s Buddhist Association (Srilanka), The Burma Buddhist World Mission (Burma), London Buddhist Society (London) ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে স্বজাতির কল্যাণে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে সিংহলের প্রধানমন্ত্রী, ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পত্রাবলীতে যোগাযযাগ করলে তাঁরা তাঁকে সার্বিক সহযোগিতার অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করেন।

১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা মহাবোধি সোসাইটি হলে (Hall) তিনদিনব্যাপী নিখিল ভারত ভিক্ষু মহাসম্মেলনে এবং বুদ্ধগয়া থাই বৌদ্ধবিহারে দশদিনব্যাপী নিখিল ভারত ভিক্ষু মহাসম্মেলনে সরকারিভাবে আমন্ত্রিত হয়ে যোগদান করেন।

এই উভয় সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। তারপর তিনি বিভিন্ন বৌদ্ধরাষ্ট্রের প্রতিনিধির সাক্ষাৎ লাভ করেন।

তাঁদের সঙ্গে মত বিনিময় করে স্বদেশের বহু ভিক্ষু শ্রামণকে বিভিন্ন বৌদ্ধ রাষ্ট্রে উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করে দেন।

রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের কর্মকান্ড শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে সীমাবদ্ধ ছিল না, তার কর্মকান্ড আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিস্তৃতি লাভ করে।

তিনি বিভিন্ন সম্মেলনে যোগদান করে পার্বত্য বৌদ্ধদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও সামাজিক অবস্থা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেন।

১৯৭৭ খ্রিঃ নেপালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ সম্মেলনে যোগদান করে তিনি পার্বত্য বৌদ্ধদের আর্থ-সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা সবিস্তার বর্ণনা করেন। ১৯৮৫ খ্রিঃ আগষ্ট মাসে United Nations Economic and Social Council Commission on Human Rights এর আমন্ত্রণে Sub-Commission on Prevention of Discrimination and Protection of Minorities উদ্যেগে জেনেভায় অনুষ্ঠিত Working Group of Indigenous population এর সম্মেলনে যোগদান করে পার্বত্যবাসীদের উপর অমানবিক অত্যাচার ও নিপীড়নের বর্ণনা দেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানান।

১৯৮৬ খ্রিঃ নেদারল্যান্ড এর আমাষ্টারডাম শহর ভিত্তিক Organising Commitee Chittagong Hill Tracts Campign আয়োজন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

তাতে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবির মহোদয়কে। তখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে।

গণতন্ত্রকে পদদলিত করে চলছিল সামরিক শাসন। তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠির উপর চলে অমানবিক অত্যাচার ও নিপীড়ন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিপুত্রগণ অমানবিক অত্যাচার ও নিপীড়ণ থেকে বাঁচার জন্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বক্তব্য রাখেন।

উক্ত সেমিনারে যোগদান করে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে অমানবিক অত্যাচার বন্ধ করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

তিনি বৃটেনের লন্ডন, অক্সফোর্ড প্রভৃতি স্থানে গিয়েও পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে প্রচার চালান। এছাড়াও এশিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমনের মাধ্যমে তিনি তথাগত বুদ্ধের মৈত্রী ও করুণার বাণী প্রচার করে বিশ্ব শান্তি স্থাপনের সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

১৯৯৩ খ্রিঃ পৃথিবীর ইতিহাসে এক স্মরণীয় বছর। এই বছরটা, রাষ্ট্রসংঘ ঘোষণা করেছে, আন্তর্জাতিক জনজাতি বর্ষ (INTERNATIONAL YEAR FOR THE WORLD’S INDIGENOUS PEOPLE) এই ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বের ৭২ দেশের ৩০০ মিলিয়ন INDIGENOUS PEOPLE বা জনজাতি লোকদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

চাকমা সম্প্রদায়ও বিশ্ব জনজাতির অন্তর্ভুক্ত হওয়ার গৌরব লাভ করেন। এই মহান উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে বিশ্বের চাক্‌মা চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবিদের এক স্থানের প্রয়োজন অনুভব করে স্বজাতিপ্রেমী কর্মযোগী বিমলতিষ্য মহাস্থবির এবং সদ্ধর্ম ও সমাজসংস্কারক রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের দূরদৃষ্টি ও সুন্দর পরিকল্পনার সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী শহর কলকাতার বুকে আয়োজন করা হয় বিশ্ব চাক্‌মা সম্মেলন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চাৰ্মা তথা পার্বত্য এলাকায় বৌদ্ধধর্ম পুনর্জাগরণের অগ্রদূত চাৰ্মা রাজগুরু ভদন্ত অগ্রবংশ মহাস্থবির, স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশ্ব চাকমা সম্মেলনের আয়োজক এবং আহ্বায়ক কর্মযোগী ভদন্ত বিমলতিষ্য মহাস্থবির।

এ মহতী বিশ্ব চাকমা সম্মেলণের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থা শুভেচ্ছা বাণী প্রেরণ করেন। তন্মধ্যে ভারতের মহামান্য উপরাষ্ট্রপতি Sri K.R. Narayanan, রাষ্ট্র সংঘের পক্ষ থেকে মানবাধিকার দায়িত্বে নিয়োজিত Assistan Secretary General Md. Ibrahim Fall, ভূতপূর্ব মেজর চাকমা রাজা ত্রিদীপ রায়, চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়, আমেরিকা থেকে Buddhist Peace Fellowship National Co-ordinotor Rev. Alam Senauke এবং বিশ্ব ভারতীয় প্রাক্তন উপাচার্য শ্রী নিমাই সাধন বপু প্রমুখ।

এছাড়াও সম্মেলনে সাহায্যের হস্ত প্রসারিত করেন তঙ্কালীন মিজোরামের চাকমা ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের চেয়ারম্যান শ্ৰী আদি কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা, চীফ এক্সিকিউটিভ মেম্বার শ্রীপুলিন বয়ান চাকমা প্রমুখসহ মানবাধিকারের শ্রদ্ধাশীল বহু ব্যক্তিবর্গ।

ভারত যাত্রাঃ ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে বিদেশ গমন এবং ধর্ম প্রচারের জন্য ভারতের উদ্দেশ্যে স্বদেশ ত্যাগ করেন। তিনি ভারতের বিভিন্ন ঐতিহাসিক পূণ্যতীর্থস্থান পরিভ্রমণ শেষে কলিকাতা মহানগরীর বুকে ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে কর্মযোগী কৃপাশরণ মহাস্থবির কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বৌদ্ধ ধর্মান্ধুর বিহারে উঠেন এবং সেখানে বহুবছর তিনি অবস্থান করেন, কলিকাতার বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মপ্রচার করেন।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিশু করুণা সংঘ এবং বোধচারিয়া বিহারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করেন। বৌদ্ধ ধর্মান্ধুর বিহারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘকালের নিবিড় সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত আন্তরিক।

সেই বিহারের বর্তমান অধ্যক্ষ এবং তকালীন বৌদ্ধধর্মান্ধুর সভার সাধারণ সম্পাদক কর্মবীর ধর্মপাল তার একান্ত সুহৃদ ছিলেন, সমাজের যেকোন কল্যাণজনক কাজকর্মে উভয়ের সহায়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখান থেকেই বোধিচারিয়া প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

বৌদ্ধধর্মে সর্বশ্রেষ্ঠ অভিধাপ্রাপ্তিঃ “জীবনের ফুল বড় হয়ে ফুটে মরণের উদ্যানে” ঐতিহাসিক মোহিতলাল মজুমদারের এ উক্তি অনেকের জীবনে বাস্তব সত্য হলেও রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের ক্ষেত্রে ছিল ব্যতিক্রম।

সারাটা জীবন স্বীয় কর্ম প্রতিভা এবং জ্ঞান ভান্ডার দিয়ে শাসন ও সমাজের মহাকল্যাণে যে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন তার যথাযথ স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন স্বদেশের চেয়ে বিদেশ থেকে লাভ করেছেন বেশি।

১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মা সরকার কর্তৃক তাঁকে “অগ্ৰমহাপন্ডিত” উপাধিতে সম্মানিত করা হয়।

২০০৫ খ্রিস্টাব্দে ২২ এপ্রিল পুনরায় বার্মা সরকার তাঁকে “অগগমহাসম্মজ্যোতিকাধ্বজা” সর্বোচ্চ ধর্মীয় উপাধি প্রদান করেন। ১৯৫৮ মেজর রাজা ত্রিদিব রায়ের প্রার্থনায় রাজগুরু পদে ভূষিত হন।

পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গীয় সংস্কৃত পরিষদ থেকে সরকারি সংস্কৃতি কলেজের ব্যবস্থাপনায় প্রতি বছর সংস্কৃত ও পালি বিষয়ক পন্ডিতদের সম্মানি দেওয়া হয়, তিনি তাদের মধ্যে একজন হিসেবে এই সম্মানি লাভ করেন।

২০০৪ খ্রিস্টাব্দে পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ তাঁকে মহাসংঘনায়ক পদে ভূষিত করেন। ২০০১ খ্রিস্টাব্দে সুদীর্ঘ ২৪ বছর ভারতে অবস্থানের পর স্বদেশের মাটিতে এসে উপস্থিত হলে চাকমা রাজা ব্যারিষ্টার দেবাশীষ রায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করে রাজগুরু এবং চাকমা রাজবিহারের অধ্যক্ষ পদে অবস্থান করার জন্যে আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা সাদরে গ্রহণ করে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত চাকমা রাজবিহারে ছিলেন।

সাহিত্য সাধনাঃ একটা জাতিকে পরিচিত করাতে হলে প্রথমে প্রয়োজন জ্ঞান সাধনা ও সাহিত্য সাধনা। তিনি তাঁর সুদীর্ঘ জ্ঞান-সাধনা ও শাস্ত্র চর্চার সুফল হিসেবে বহু অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন।

বৌদ্ধসাহিত্য তার গবেষণা কর্ম ছিল অসংখ্য, বিশেষত ও ত্রিপিটক শাস্ত্রের দর্শনতত্ত্ব অভিধর্ম বিষয়ের মূল অনুবাদ করা খুবই কঠিন কাজ।

তিনি সে সব দুরূহ কাজগুলো সম্পন্ন করে গেছেন। আচার্য বুদ্ধঘোষ কর্তৃক বিরচিত বিশুদ্ধি মার্গ গ্রন্থটি তিনটি খন্ডে বাংলায় অনুবাদ করেন।

তিনি এ পর্যন্ত লিখিত গ্রন্থের মধ্যে ১০টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন যাহা বিদ্বান সমাজে সমাদৃত হয়েছে। যেমন- (১) সমবায় বুদ্ধো উপাসনা (১৯৫৮) (২) বৌদ্ধ পঞ্জিকা (১৯৬১) (৩) বুদ্ধ উপাসনা (লোকোত্তর বিভাগ), (১৯৮২) (৪) বুদ্ধ উপাসনা (লোক বিভাগ), (১৯৮৪) (৫) চাকমা গীদেন্দি মঙ্গল সূত্র (১৯৭২) (৬) পরিণাম নাটক, (৭) শ্রামণ কর্তব্য (১৯৭৭) (৮) Stop Genocide in Chittagong Hill tracts of Bangladesh, (৯) মানবধর্ম পঞ্চশীল এবং (১০) বুদ্ধ সামান্তিকা (২০০৮)। অপ্রকাশিত ২৫টি গ্রন্থাবলী- (১) বিশুদ্ধি মার্গ (৩ খন্ড) (২) বিদর্শন ভাবনা নীতি (৫ খন্ড) (৩) অভিধম্মার্থ সংগ্রহ (৪) ভিক্ষু প্রাতিমোক্ষ, (৫) জন্ম মৃত্যুর কথা (৬) সাম্য বীথিকা; (৭) চন্দ্রগুপ্ত (নাটক) (৮) বাসরে পতে (নাটক) (৯) রূপানন্দা (নাটক) (১০) সঞ্চয়িতা (১১) বাংলাদেশ বড়ুয়া জাতি (১২) মহাকঠিন চীবর বর্ণনা (১৩) বুদ্ধ ও রবীন্দ্রনাথ (১৪) অগ্নিমশাল (গীতিমঞ্জুরী) (১৫) চাঙমা কধাদি ধর্মপদ (১৬) পথে গেয়ে মন (চাকমা ভাষায় নাটক), (১৭) মহামানব গৌতম বুদ্ধ (১৮) আবিলাস্য সংবাদ (চাকমা ভাষায় নাটক), (১৯) সিদ্ধার্থ চরিত্র (২০) মহাস্বপ্ন (চাকমা ভাষায় নাকট) (২১) বেস্সাম্ভর কীৰ্ত্তন (২২) মহাযাত্রী গীতিনাট্য (২৩) দর্শন ও বিদর্শন (২৪) ধর্ম ও সমাজ এবং (২৫) বুদ্ধের অবদান (৩ খন্ড)। তার অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী এবং দানশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

আপনাদেরকে গ্রন্থাকারের কিছু কিছু মূল্যবান পান্ডুলিপি মাতা-পিতার পূণ্যস্মৃতি স্মরণে প্রকাশের সহায়তা করার জন্য আন্তরিক আহ্বান জানাই।

পাঠক ও বিত্ত সমাজ তখন বুঝতে পারবেন তিন কত বড় মাপের সংঘমনীষী ছিলেন। জীবনে তেমন কোন চাহিদা ছিল না।

জ্ঞানতাপস ও অন্যান্য সমাজ কল্যাণ, ধর্মীয় জাগরণ, শিক্ষার প্রসার, আলোকচিত্র, আলোকিত নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক ধ্যান সাধনা এবং সাহিত্য সাধনাই ছিল তাঁর জীবনের মহান ব্রত।

তিনি অন্য কিছুর জন্য বেঁচে না থাকলেও সাহিত্য সৃষ্টির মাঝেই তিনি অমর হয়ে থাকবেন পন্ডিত মহলে। এটাই তার জীবন সাধনার সবচেয়ে বড় সাফল্য।

তিনি শুধু পালি ভাষা ও বৌদ্ধ সাহিত্যে পন্ডিত ছিলেন না। তিনি বাংলা, হিন্দি, চাকমা, মারমা ও বর্মী ইত্যাদি ভাষাতেও তাঁর নিকট যথেষ্ট দখল ছিল।

বিদেশী ভাষা ইংরেজী ভাষাতেও তাঁর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। তিনি ইংরেজীতে কথা বলা, বক্তব্য দেওয়া এবং ইংরেজীতে লিখতে পারতেন।

ইংরেজী ভাষায় তাঁর লেখা গ্রন্থটি তাঁর অভিজ্ঞতার জ্বলন্ত উদাহরণ। তিনি অনেক কবিতা ও নাটক রচনা করেছেন, একদিকে তিনি কবি ছিলেন, অন্যদিকে নাট্যকার হিসেবে পরিচিত। (চাকমা ভাষায়ও তিনি কবিতা ও নাটক রচনা করেছেন) তিনি যে সত্যিই একজন বহুমুখী প্রতিভার অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই তাঁকে বহু ভাষাবিদ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।

মহাসংঘনায়কঃ ১৩ মার্চ ২০০৩ খ্রিস্টাব্দ চাকমা রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের জীবনে সবচেয়ে অবিস্মরণীয় বলা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিক্ষুসংঘ তাদের বিয়াল্লিশতম বার্ষিক মহাসম্মেলনের আয়োজন করে।

দীঘিনালাস্থ তপোবন বিহার ও কলেজ প্রাঙ্গনে। পাঁচশতাধিক মহান ভিক্ষুসংঘ এবং হাজার হাজার নর-নারীর সমাবেশে মহাপন্ডিত শ্রীমৎ অগ্রবংশ মহাস্থবিরকে ‘মহাসংঘনায়ক’ হিসেবে ভূষিত করা হয়।

সে ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেন শ্রীমৎ তিলোকানন্দ মহাস্থবির। পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শ্রীমৎ সুমনালংকার মহাস্থবিরকে উক্ত সংঘ সংস্থার নির্বাচিত সভাপতি ও এবং শ্রীমৎ সত্যানন্দ মহাস্থবিরকে সাধারণ সম্পাদক রূপে দায়িত্ব দেয়া হয়।

এই অনুষ্ঠানের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন তকালীন সভাপতি প্রজ্ঞাজ্যোতি ভিক্ষু, সম্পাদক জ্ঞানমিত্র ভিক্ষু এবং উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন শ্রীমৎ পুণ্যজ্যোতি ভিক্ষু, শ্রীমৎ জ্ঞানপ্রিয় ভিক্ষু, শ্রীমৎ শাসনপ্রয় ভিক্ষু প্রমুখ অনেকে।

তাঁর সুদীর্ঘ ব্রহ্মচর্য জীবনের সর্বোচ্চ পদমর্যাদা প্রাপ্তি শুধুমাত্র সংঘসমাজকে গৌরবান্বিত করেনি সমগ্র পার্বত্য বৌদ্ধদেরকে কৃতার্থ ও ধন্য করেছে।

আদর্শ গুরুঃ অনুপম মানবিক চরিত্রের একজন আদর্শ ভিক্ষু ছিলেন তিনি। বুদ্ধের ধর্ম বিনয়ানুকুল জীবন যাপনই ছিল তাঁর মহান ব্রত।

স্বধর্ম, স্ব-জাতি এবং স্ব-সংস্কৃতি রক্ষায় তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। অন্যায়ের কাছে তিনি কোন দিন মাথা নত করেননি। সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি ছিলেন আপোষহীন।

চাওয়া পাওয়ার প্রতি তেমন আকর্ষণ তাঁর ছিল না বরং ত্যাগদীপ্ত, উদার এবং পপোপকারে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। মানবতার সেবায় তিনি ছিলেন আত্মোৎসর্গীকৃত প্রাণ।

তিনি যেমন ছিলেন তেজস্বী তেমনি ছিলেন স্থিতধী, সত্যনিষ্ঠা, বীর্যবান সিংহ পুরুষতুল্য, অপূর্ব সুন্দর চেহারা, সুদীর্ঘ দেহধারী এবং সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী।

রোগ ব্যাধিতে তেমন কষ্ট পাননি দীর্ঘদিন। স্ব-জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সংকল্প ছিল প্রবল। তিনি তার সারা জীবনব্যাপী যে সুন্দর ত্যাগময় আদর্শ স্থাপন করে গিয়েছেন সমগ্র পার্বত্য অঞ্চল শুধু নয় সমগ্র বিশ্বে আত্মচেতন ভিক্ষু সমাজ এবং সুধীমহলে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

এক কথায় তিনি ছিলেন সংঘরাজ মহাপন্ডিত সারমেধ মহাস্থবিরের সমাজ সংস্কার ও সদ্ধধর্মের মূলধারা থেরবাদী ভাবাদর্শের একজন সুমহান স্থপতি।

স্বদেশ প্রেমঃ স্বদেশপ্রেম ছিল তার অভূতপূর্ব। বার বার তিনি দেশের বাহিরে গেছেন কিন্তু ফিরে এসেছেন দেশের টানে।

১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে স্বদেশের নানা সমস্যার কারণে পাশ্ববর্তী ভারতে গিয়ে অবস্থান নিলেও স্বজাতিকে রক্ষা এবং শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত করার জন্যে ভারত থেকেও দেশের মানুষদেরকে বাঁচানোর জন্য ভারতে কলিকাতা, আসাম এবং আগরতলাসহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে এবং ভিক্ষু শ্রামণদেরকে আশ্রয় ও উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।

দীর্ঘ প্রায় ২৪ বছর ভারতে অবস্থানের পর ১১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারী মাতৃভূমির টানে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ভারত কাগ করেন।

বয়ঃবৃদ্ধ হয়েও সমাজ ও সদ্ধধর্মের কল্যাণে নিজেকে যেভাবে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন বর্তমান সময়ে এ চেতনার মানুষ বড়ই দুর্লভ।

স্মরণীয় যে তিনি অষ্টম সংঘরাজ সর্বোচ্চ বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু সাহিত্যরত্ন ভদন্ত শীলালংকার মহাস্থবিরের শবদাহ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে স্বদেশে এসেছিলেন।

মহাপ্রয়াণঃ ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে ৫ জানুয়ারী শনিবার বিকাল বেলা বয়ঃবার্ধক্যজনিত কারণে তিনি একটু অসুস্থ বোধ করলে বিহারের ভিক্ষুসংঘ এবং বিহার কমিটির কর্মকর্তাবৃন্দ কর্তৃক রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে তাকে চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হয়।

মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সেই দিন রাত ৯.৩০ মিনিটে হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (নিব্বাণং পরমং সুখং)।

তখন তার বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। ভিক্ষু বর্ষা হয়েছিল ৬৯ বছর। সেই রাত্রে তার মরদেহ সাধনভূমি চাকমা রাজবিহারে নিয়ে আসা হয়।

তাঁর মৃত্যুর সংবাদ রেডিও, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রে প্রচারিত হওয়ার সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ এবং বহির্বিশ্বে তার অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী, শিষ্য প্রশিষ্যদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে।

তাঁর মহাপ্রয়াণে বৌদ্ধ সমাজে যে অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার নয়। পরের দিন ৬-১-০৮ ইং তারিখে পরম পুরুষের শবদেহে ডাক্তারী পরামর্শক্রমে ভৈষজ্য দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।

সেই দিন সকাল বেলা হাজার হাজার দায়ক/দায়িকা, রাজাসহ রাজপরিবারের সকল সদস্য এবং মহাভিক্ষু সংঘের উপস্থিতিতে স্মরণ সভা, সংঘদান, অষ্ট পরিস্কারদান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার নির্বাণ শান্তি কামনা করা হয়।

১১/০১/0৮ তারিখ শুক্রবার মহাসমারোহে সারাদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পেটিকাবদ্ধ অনুষ্ঠান ও সাপ্তাহিক পুণ্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।

পার্বত্য ভিক্ষুসংঘ তার মরদেহ সংরক্ষণের জন্য পেটিকা প্রস্তুত করে দিয়ে যথেষ্ট বদান্যতার পরিচয় দিয়েছেন।

অভ্যোষ্টক্রিয়া বা শবদাহ ক্রিয়াঃ ইতিমধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মর্যাদায় রাজগুরু অগ্রবংশ মহাস্থবিরের জাতীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উদ্যাপন পরিষদ গঠিত হয়েছে।

২০০৮ খ্রিস্টাব্দ ডিসেম্বর মাসের (৪-৬ তারিখ) সরকারী-বেসরকারী এবং আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ পন্ডিতদের উপস্থিতিতে তিনদিন ব্যাপী বিবিধ মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান, সেমিনার, শোভাযাত্রাসহ যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদায় শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়।

অনুষ্ঠানের শেষে সেই দিনই তাঁর বর্ণাঢ্য ভিক্ষুত্ব জীবনের দেহ ভষ্ম হয়ে যায়। পার্বত্য অঞ্চলের অতীব গৌরবময় একটা শতাব্দীর অবসান হয়।

উপসংহারঃ চলে গেলেন কল্যাণ মিত্র, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শ্রদ্ধেয় রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো। সবার জন্য রেখে গেলেন সেই বাণী – উঠ, ঘুমিয়ে থেকো না আর।

সুচারুভাবে সদ্ধর্ম আচরণ কর। কর, মানসিক উৎকর্ষ সাধন। মানসিক উৎকর্ষ সাধন ব্যতীত কোন ব্যক্তির উন্নতি হয় উনতি ছাড়া সমাজের উন্নতি হয় না।

রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর এই পার্বত্য বৌদ্ধগণ অনুশীলন করতে পারি তবে তার প্রতি সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করা হবে অন্যথায় মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জা আমাদের।

মানুষকে পালি ভাষায় “মনুস্স” বলা হয়। যেহেতু মানষিক সাধনে সে সচেষ্ট। বৌদ্ধ ধর্মে মানব উন্নয়ন মূলক কাজই সবচেয়ে মহৎ কাজ বদ্ধত্ব লাভের পর সুদীর্ঘ ৪৫ বছর করুণায় বিগলিত চিত্তে বুদ্ধও মানব উন্নয়নের কাজ করেছিলেন; মানব উন্নয়নের জন্য করেছিলেন নৈর্বাণিক ধর্ম দেশনা রাখব, পার্বত্য বৌদ্ধ সমাজ সদা জাগরিত থেকে মানসিক উৎকর্ষ সাধনে সচেষ্ট থাকবে।

তবেই তো আমাদের সমাজে জন্ম নেবে রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো, ন্যায় কল্যাণ মিত্র আবির্ভাব হবে নিবেদিত প্রাণ মহাপুরুষের।

সমাজের এহেন ঘোর দুর্দিনে একমাত্র নিবেদিত প্রাণ মহাপুরুষই পার্বত্যবাসীদের শুনাতে পারেন মুক্তির বার্তা আর দেখাতে পারেন মুক্তির পথ।

আলোকিত অগ্রবংশ মহাথেরো

হে জ্ঞান তাপস
আপনি বহুজন নন্দিত জাতির কৃতি সন্তান।
আপনার আলোকিত বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে আছে
সারা বিশ্ব ও পার্বত্য ভুবনে।

আপনি রেখে গিয়েছিলেন
স্ব-ধর্ম বৌদ্ধ জাতি।
আপনার সেই জ্ঞান দর্শন শান্তিবাদী।
বিশ্ব জুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে।
পূজনীয় মহান পুরুষ অগ্রবংশ ভান্তে
আপনার সেই জ্ঞানের আলো।
ভুলিতে পারিব না আমরা।
আজ অ-ভাগা জাতিকে আপনি
জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
সেই বৌদ্ধবাণী দর্শন দিয়ে
আপনি একজন মানবতাবাদী
সত্যের সন্ধানী ও পথ প্রদর্শক।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply