Last updated Oct 9th, 2026
1964

আমার নাম বুদ্ধধন চাকমা, পিতা কামিনী কান্ত চাকমা, মাতা নন্দমুখি চাকমা, ৯ নম্বর মারিশ্যা চর মৌজা, রাঙামাটি, কাপ্তাই বাঁধের পর মধ্য বাঘাইছড়ি, রাঙামাটি।
আমরা হাম্বে গোজার থিইয়ে গোষ্ঠীর বংশধর। কাজলং নদীর পার ঘেঁষেই ছিল আমাদের বাড়ি, ‘গুদাম ঘর’ মানে মাটি দিয়ে বানানো। আমাদের আর কাকাদের পরিবার নিয়ে বিশাল যৌথ সংসার। আসলে তখনকার সময়ে সবারই যৌথ সংসার ছিল। আমার বাবা দুই বিবাহ করেছিলেন। আমরা ছোট মায়ের সস্তান। আমার বাবার প্রথম স্ত্রী মানে বড়মা অসুখে ভুগে মারা গেলে বাবা আমার মাকে বিয়ে করেন। আমার বাবার প্রথম ঘরের ৪ (চার) সন্তান। তারমধ্যে অনিল বরণ চাকমা বড়।
তিনি চাকমাদের সমাজে একজন কবি ছিলেন। কাজলং নদীর পারের সন্তান হওয়াতে প্রতিবছর কাজলং নদীর নানা রূপ আমরা দেখতে পেতাম। বর্ষার সময় কাজলং নদীর চেহারা ভয়ংকর হয়ে যেতো, শান্ত নদীর জল উত্তাল হয়ে দুকূল ভাসিয়ে নিয়ে যেতো, নদীর পাড় থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে দেখতাম বিশাল বিশাল গাছ, বাঁশ আর মাঝে মাঝে পশু পানিতে ভেসে যাচ্ছে।
আর বন্যার সময় কাজলং-এর চেহারা বদলে যেতো! যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। আর শীতকালে! শান্ত একেবারে। আমি জানি না এখনও কাজলং নদীতে এইরকম বন্যা হয় কিনা!! এই দূর প্রবাসে বসে ভাবি এখনো কি বন্যার সময় আগের মতো পানি হয়! আমার এখনো বর্ষার কাজলং নদীকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। কোনোদিন আর দেখা হবে না আমার সেই কাজলং নদী (দীর্ঘশ্বাস!)।
আসলে ১৯৫৩ খ্রি. কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ হবার কথা ছিল অন্য একটা জায়গায় রঙরাঙহুল মোন, চিলাক ঢাক’-এর গোড়ায়। এই বাঁধ নির্মাণের জন্য বিদেশ থেকেও ইনঞ্জিনিয়ার এসেছিল। পরে কোনো এক কারণে সেটা বন্ধ করে কর্ণফুলির কাপ্তে/কাপ্তাই নামক জায়গায় এই বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়।
যে নতুন জায়গায় বাঁধ নির্মাণ শুরু হয় সেটার আরেক নাম হচ্ছে রাম-লক্ষ্মণ-সীতাদের ঘাট। রেইভং বা রেইখ্যং বাজারের একটু নিচে এই জায়গাটি শিকার করার স্থান হিসাবে বিখ্যাত ছিল। প্রচলিত ছিল মগরা এই জায়গায় শিকার করতে গেলে শিকার ধরা পড়তো না। রাম-লক্ষ্মণরা নাকি শিকারদের তাড়িয়ে দিতো। সেখানেই বাঁধ নির্মাণের জন্য কাজ শুরু হলো। যেটাই বর্তমানে কাপ্তাই বাঁধ নামে পরিচিত।
কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দেয়ার পর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে, সে তলিয়ে যাওয়ার জায়গার পরিমাণ কতটুকু হতে পারে সে নিয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে জরিপ করা হয়েছিল। আর সেই জরিপের ভিত্তিতে বাঁধের পানিতে ডুবে যাওয়া জমির মালিকদের ও এলাকার মুরব্বিদের ডেকে ক্ষতিপূরণ নেয়ার জন্য সরকারপক্ষ থেকে বলা হয়।
কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেল সরকারের হিসাবের চেয়েও বেশি জায়গা বাঁধের পানিতে তলিয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষের গ্রাম দেখতে দেখতে পানিতে তলিয়ে যায়। খুব কমসংখ্যক মানুষ প্রথমেই বিশ্বাস করেছিল যে এই বাঁধের পানিতে এতো বিশাল এলাকা ডুবে যাবে। তারা এটা স্বপ্নেও ভাবেননি।
আমি এখনো সন্দিহান বাঁধের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত সকল জায়গার মালিকরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিল কিনা। আসলে তখন এইসব কাগজে হিসাব কেউ রাখার সময় পায়নি। বিশ্বাস-অবিশ্বাস দোলাচালের ভেতরেই বাঁধের পানি একেবারে নিজের দোর গোড়ায় হাজির হয়ে গেল! পানিতে বাড়ি ডুবে যাচ্ছে আর সকলেই নৌকায় উঠছে- এই দৃশ্য ছিল তখনকার সময়ে খুবই স্বাভাবিক। যদিও আমরা পানি আসার আগেই চলে এসেছিলাম। সম্ভবত আমাদের পরিবারই প্রথম যারা বাঘাইছড়িতে এসে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু যখনই আমরা জানলাম যে কাপ্তাই এলাকায় একটা বাঁধ হবে তাতে আমাদের গ্রাম ডুবে যাবে এবং এই জায়গা ছেড়ে অন্য কোনো এক জায়গায় চলে যেতে হবে। এই কথা শোনার পর থেকেই আমাদের সুখশান্তি সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। গ্রামের সবাই দিশেহারা হয়ে পড়েছিল কোথায় যাবে, ভেবে। আজু পিজুদের* জন্মভূমি ড় যাওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। এখন যতটা সহজে কথা বলছি তখন এতো সহজ ছিল না।
যদ্দুর মনে আছে, তখনকার সময়ে আমার আজু এবং বাবা আমাদের জায়গাজমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা হাতে পেয়েছিলেন। বাবা আজুকে নিয়ে তখনকার রাঙামাটি গিয়ে এই ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে এসেছিলেন। তখন বাবার নামে জমি কম ছিল, সবই ছিল আজুর নামে। আমাদের তো সে সময় দুনকে দুন জমি ছিল।
তখন তো জমি জিরাত হিসাব হতো দুন’ দিয়ে। এখন ‘একর’ হিসাব। বধের পানিতে সব তলিয়ে যাবে, এই জায়গা ছাড়তে হবে- এলাকায় এই খবর পৌঁছানোর পর এলাকার লোকেরা মিটিং-এর পর মিটিং করতে শুরু করে দিয়েছিল। তখন সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন ছিল যে কে কোন দিকে যাবে, কোথায় বসতি গড়ে তুলবে? এরই ভেতর গাছ কাটিং শুরু হয়ে গেল। আমরা দেখলাম কিছু শ্রমিক এসে গ্রামের বড় বড় গাছ কাটা শুরু করে দিয়েছে।
কিন্তু এই গাছ কাটিং কেন? বাঁধের পানিতে তলিয়ে যাওয়া জায়গার ওপর দিয়ে যাতে নৌকা বা লঞ্চ চলাচলের ব্যাঘাত না ঘটে, তাই এই গাছ কাটিং। অবশ্য আমরা আমাদের বড় বড় গাছের জন্য ক্ষতিপূরণ পেয়েছি। কত পেয়েছি জানি না। কিন্তু সকলে পেয়েছে কিনা আমি সেটা জানি না।
তো বাঁধ দেওয়ার সময়ই আমরা চলে এলাম বাঘাইছড়িতে। নতুন জায়গায় আমাদের পরিবারের জন্য যে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হলো সেটা আমাদের পরিবারের। জন্য ছিল অনেক কম।
তারপরও আজু বাবারা পুরনো গ্রামবাসীর সঙ্গে নতুন জায়গায় নতুন গ্রাম পত্তন করলেন। আমাদের পাশাপাশি ছিল ধামেই গোজা ও হাম্বে গোজার বংশধরেরা। হাম্বে গোজার লোকজন এসেছে জীবতলী থেকে। এই বাঘাইছড়িকে তিন ভাগে ভাগ করে নাম দেয়া হলো মধ্য বাঘাইছড়ি, নিচের বাঘাইছড়ি আর বড় বাঘাইছড়ি। আমরা মধ্য বাঘাইছড়ির বাসিন্দা হয়ে গেলাম। আসলে এলাকার লোকজন সবাই তো সবারই আত্মীয়।
তখনকার সময়ে বালু-হালে- আর ঝগড়াবিলের লোকদের মাঝে আত্মীয়তা থাকলেও তাদের মধ্যে সৎভাব ছিল কম। এসব এলাকায় ধামেই গোজার পিড়ি তাপ গোষ্ঠী, বাপ হাবা গোষ্ঠী লোকদের বসতি ছিল অনেক।
আমার মা পিড়ি ভাঙ্গা গোষ্ঠীর মেয়ে। আমাদের সমাজের প্রথাগত নিয়ম অনুসারে ঐ গোষ্ঠীর মেয়েরা সুগুরি গুলো মানে মিষ্টি কুমড়োর বিচি মাটিতে পুততে পারতো না। নিষেধ ছিল। এই মধ্য বাঘাইছড়ি থেকেই আমরা পরে বর-পরং-এ সবার সাথে ভারতে চলে আসি এবং পরবর্তীকালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আন্ধার ছড়াতে বসতি গড়ে তুলি। এই গ্রামেও ধামেই গোজার তিন পরিবারের বসতি গছে। সেটা ১৯৬৫/৬ খ্রিস্টাব্দের কথা। সব কথা এখন আর মনেই নেই।
এভাবেই আমাদের মধ্য রাঘাইছড়িতে নতুন জীবন শুরু হলো। সংসার একেবারে নতুন করে শুরু করতে হলো। সূর্যের আলো যে এলাকায় পড়ে না, এমন জঙ্গল কেটে সাফ করে, হিংস্র পশুপক্ষী রোগ শোককে মোকাবিলা করে নতুন আশায় সংসার আবার শুরু করলাম আমরা। কোন উপয়ান্তর না দেখে সবকিছু আর আগের মতো হবে না মেনে নিয়েই শান্তভাবে আমরা আমাদের নতুন জীবন শুরু করলাম নতুন এলাকায়- মধ্য বাঘাইছড়িতে।
আমাদের নতুন জায়গা বাঘাইছড়িতে বাঙালি বলতে তখন শুধু কয়েক পরিবারের সে ছিল। তাদেরকে আমরা ‘সাহা’ বলে থাকি। তাদের সাথে আমাদের কোনো না ছিল না। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি আমাদের সেই কঠিন নতুন জীবনে নতুন উৎপাত শুরু হলো। নতুন এই উৎপাতের নাম আনসার কোম্পানি।
দেশের বিভিন্ন জয়গা থেকে মুসলমান বাঙালি শ্রমিকদের নিয়ে গঠিত একটি কোম্পানি। যে কোম্পনি জঙ্গলে বড় বড় গাছ কাটে আর হাতি ধরার কাজ করে থাকে। তাদের সাথে থাকা বিশাল বিশাল মেশিন, যেগুলো গাছ কাটতে ব্যবহৃত হতো আর পশু মানে হাতি ও অন্যান্য জীবজন্তু ধরার কাজেও ব্যবহৃত হতো।
অনেক সব জঙ্গলের ভেতরের নদীতে এই কোম্পানির শ্রমিকেরা বাধ দিতো। আর দূরবর্তী জায়গায় আসতে যেতে সুবিধার জন্য এই আনসার কোম্পানি কাজলং নদীর পারে তাদের ক্যাম্প বসায়।
আর এই কোম্পানি আসার পরপরই আমাদের এলাকায় নানান ঝামেলা শুরু হয়ে যায়। তবে এই কোম্পানি আমাদের গ্রামে ঢুকেনি। বংশা গোজার এলাকা দিয়ে ঢুকেছে। কোম্পনির শ্রমিকদের আর এলাকার চাকমাদের মধ্যে কোনো কিছুতেই মিল ছিল না।
আমি জানি না ঠিক কী কারণে আমাদের চোখে তারা ছিল খুবই আর অবিশ্বাসী। অথচ বহু বছর ধরে রাঙামাটিতে বাস করা যেসব বাঙালি এসেছে তাদের সাথে কোনো সমস্যা হয়নি, জীবনভর আমাদের মধ্যে ওঠাবসা ছিল। কিন্তু এই আনসার কোম্পানির আসার কারণে আমাদের জীবনে অনেক সমস্যা শুরু হয়ে যায়।
এদিকে নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে বিভিন্ন রোগশোকে আর শত শত মানুষের মৃত্যু- বিশেষ করে নারী, বৃদ্ধ এবং শিশুদের অসুস্থতায় করুণ মৃত্যুতে সকলেই হতাশ হয়ে পড়ে। নতুন করে প্রিয়জন হারানোর বেদনায় আমরা সকলেই কাতর হয়ে পড়ি।
সেসময় কলেরা ম্যালেরিয়া টাইফয়েডসহ কত ধরণের রোগে মানুষ মারা গেছে। প্রায় খবর আসতো অমুককে বাঘে ধরে নিয়ে গেছে, অমুককে ‘ভুতে গুলি’ করেছে। কত যে ‘মিথ’ মানুষের মুখে মুখে। এরই ভেতর এলাকায় আনসার কোম্পানির আগমন, তাদের স্বেচ্ছাচারিতা আমাদের সমাজের লোকদের মনে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি করে।
মানুষের মনে নতুন করে প্রশ্ন জাগে এভাবে বাঙালি বেড়ে যেতে থাকলে আমাদের এই জায়গায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তাছাড়া এমনিতেই এই এলাকায় মানুষ বেশি কিন্তু জায়গা কম, সকলের জন্য জায়গা ঠিকমতো সংকুলানও হচ্ছিল না।
যাই হোক, এভাবেই আমাদের দিন চলে যাচ্ছিল। এরই মধ্যে আমাদের এলাকার মুরব্বি বসন্ত তালুকদার মারা যান। তিনি মারা গেলে গ্রামের সকলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে গাড়ি টানা হবে। আর এই গাড়ি টানা হয় ধামেই গোজা বনাম হাম্বেই গোজার মধ্যে। বালুকাল্যে বনাম ঝগড়াবিল কুল্যে।
তখন তো গাড়ি টানার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। গাড়ি টানার জন্য কেরেট’র দড়ি, চাকা সব কিছু আছে। কিন্তু সেদিন এই ধর্মীয় গাড়ি টানাটানিতে এলাকার তিনজন লোক মারা যায়। রূপকারী থেকে ২ জন আর মাচ্যে ছড়া থেকে ১ জন।
ভাগ্য ভালো আমাদের গ্রাম থেকে কেউ মারা যায়নি কিন্তু তিন জন মানুষের মৃত্যুতে আমরা সকলেই দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ি। আর এভাবেই নানা ঘটনা দুর্ঘটনায় সমস্যায় ধীরে ধীরে আমাদের জীবনে, সমাজে উরোতুল/বিশৃংখলা শুরু হয়। আমরা সকলেই হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়ি।
এরই মধ্যে এলাকার কিছু লোক ভারতে আসা-যাওয়া শুরু করে দিলো। তারা ” থেকে ফিরে এসে এলাকার লোকদের ভারতে চলে যেতে নানা ধরণের প্রলোভন দেখাতে শুরু করে।
তাদের কথা শুনে বাকিরা ভারতে যাওয়ার বিষয়ে উৎসাহিত হয়ে ওঠে। বাবার কাছ থেকে শোনা= সে সময়ে ভারতের সরকার নাকি আমাদের জন্য ভালো কিছু করবে, নানান কিছু দেশে এই রকম খবর ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রচারিত হয়েছিল। এমনকি রেডিওতেও নাকি প্রচার হয়েছিল।
আর সেই খবরও আমাদের এখানে পোজালে এলাকার লোকদের মধ্যে ভারতে চলে যাওয়া নিয়ে কথা শুরু হয়। তো এই হিড়িকের মধ্যে পড়ে আমার বাবা আজুরাও আলোচনায় বসলেন ভারতে চলে যাওয়া নিয়ে।
শুধু আজু বাবার না, প্রত্যেক ব্লকে ব্লকে মৌজাতে মুরুব্বিরা আলোচনা শুরু করে দিলেন। তখন তো প্রত্যেক মৌজাতে হেডম্যান খীজা মানে খীসা, দেবান মানে দেওয়ানদের প্রভাব ছিল অনেক। এসব দেওয়ান খীসা আর গ্রামের মুরুব্বিরা আলোচনা করে ঠিক করলেন ভারতে চলে যাবেন।
যে হারে বাঙালি বাড়ছে তাতে আমাদের জীবনেও চাপ পড়ছে। এই বাঙালিদের সাথে সুখে থাকতে পারবো না, এটা নিশ্চিত বুঝে এলাকার মুরুব্বিরা কীভাবে কখন কোন সময় নিরাপদে এই দেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া যায় তা নিয়ে মিটিং করতে লাগলেন।
ঠিক এই আলোচনার সময়ে সতীশ কানুনগো নামে একজন চেনাজানা লোক রাঙামাটি থেকে বাঘাইছড়িতে ফিরলেন। তিনি সেখানে চাকরি করতেন। সাথে আর একজন ফিরেছেন রাঙামাটির কলেজের ছাত্র কুসুম চাকমা।
শোনা কথা, এই কুসুম চাকমার সাথে এক বাঙালি বড়ুয়া মেয়ের ‘আই পাই’ মানে ‘প্রেমের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মেয়ের বাবা কিছুতেই এই সম্পক মানবে না, তাই তার বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে নালিশ দিয়ে দিলেন। এই নালিশের ভিত্তিতে পুলিশ তাকে খোঁজা শুরু করলো। ফলে সে রাঙামাটি থেকে বাঘাইছড়িতে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলো।
সে হাম্বে গোজার বংশের ছেলে। তার সাথে আরেকজন এসেছে, সে ললিত কানুনগোর ছেলে খোকন। খোকন এখন সাধু হয়ে এখানে মাছমারাতে ধ্যান নিয়ে থাকে। সতীশ কানুনগো, কুসুম চাকমা এবং খোকন এদের সবার এই বাঘাইছড়িতে দেখা।
এই তিনজনে মিলে সকলের সাথে আলোচনায় বসলেন এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়। কী করা উচিত। অনেক আলোচনার পর ঠিক হলো যে ভারতে গিয়ে দেখা উচিত সেখানে যাওয়া যায় কিনা। কারণ সবাই একমত যে এখানে আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর কুসুমকে পাঠানো হয় ভারতের দেমাগ্রীতে। সে আবার আমার দূরসম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে হয়। সে রাঙামাটি থেকে ফেরত এসেই আমাকে বলেছিল কাকা ভালো হোক মন্দ হোক। আমাদের জেঠা সতীশ তালুকদার হেডম্যান ছিল। আমাদেরকেই সবাইকে পথ দেখাতে হবে। আমি আগে দেমাগ্রী গিয়ে সেখানে যাবার রাস্তাটা পরিষ্কার করে আসি। আমার জানামতে তখন পর্যন্ত কেউ দেশ ছেড়ে যায়নি। শুধুমাত্র কয়েকজন মিজোরাম আর এইজশ আসা-যাওয়া করছিল।
তো কুসুম দেমাগ্রী চলে যায় ওখান থেকে শিলচরে, তার সাথে একজন কুকি ছিল তাকে সাহায্য করার জন্য। দেমাগ্রী থেকে ফিরে সে বললো যে ভারত সরকার চলে যেতে বলেছে। ভারতে গেলেই তারা আমাদের দায়িত্ব নেবে।
তখন জহুরলাল নেহেরুর সরকার ছিল। এই কথার ভিত্তিতেই ‘বরপরং’ বা ভারতে যাওয়া সিদ্ধান্ত হয়। এরপরেই তো বাঘাইছড়ি সাজেক হতে দিঘীনালার মইনী চেঙেই থেকে দলে দলে মানুষ চলে গেল বর-পরং-এ।
প্রাথমিকভাবে ঠিক হলো একটা গ্রামের মানুষ চলে যাবার পর আরেকটা গ্রামের লোক যাবে। আবার এটাও ঠিক হলো যে, পাশাপাশি দুটো গ্রামের বাসিন্দারা কই সাথে যাবে।
প্রথমে একটা গ্রাম যাবে কিছু দূর যাবার পর তারা ‘গোলাক’ মানে বাজি ফুটিয়ে সংকেত পাঠাবে এবং সেই বাজি ফোটানোর শব্দ শুনেই আরেকটি গ্রামের লোকজন চলে যাবার জন্য গ্রাম ছাড়বে। এইভাবে ঠিক হয় আরেকবার গ্রাম ছাড়ার। একদেশ থেকে আরেক দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা। যেখানে আমাদের কেউ নেই।
সিদ্ধান্ত অনুসারে যারা ভারতে যেতে চাইছে তারা গ্রাম ছাড়ছে। কিন্তু কোন একটা কারণে আমরা মানে আমাদের পরিবারের সময়মতো গ্রাম ছাড়া হলোনা। আমি মনে করি এই গ্রাম না ছাড়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে নিজের জায়গার প্রতি ভালোবাসা।
মায়া। নিজের দেশ, জন্মভূমি বলে কথা। তো একদিন বাবা আমাকে ডেকে বললেন, ভালো থোক আর মন্দ হোক তুমিই একমাত্র যে কথা বলতে পারো আর বুঝতে পারো। আর কিছু পড়াশুনাও জানা আছে তোমার। ভারতে যাওয়ার আগে তুমি একবার ভারতের দেমাগ্রী ঘুরে আসো আর দেখে আসসা সেখানকার পরিস্থিতি।
এখন পর্যন্ত কত মানুষ সেখানে গেল এবং সেখানে কোন কোন এলাকার লোক বেশি, সব কিছু দেখে আসো। বাবার কথামতো আমি পথা চলে গেলাম। সেখানে আমাদের এক আত্মীয় আগে থেকে বসতি “ছিলেন, তিনি সম্পকে আমার জেঠা হন। তাঁর কাছে গেলাম। তিনি আমাকে দেখেই বললেন ‘ভাইপত তুমি এসেছো! এখানে থাকলে ঠিকমতো জায়গা পাবো ” পামনের দিন কীভাবে কাটাবো? আমরা অন্য জায়গায় চলে যাবো।
সব কিছু পণ্ডেনে আমি আর আমার ঐ জেঠাকে সাথে করে বাঘাইছড়িতে ফিরে এলাম। শঙ্কা এসেই বাবা আজুকে বললেন, ভারতে যাওয়া নিরাপদ। ভারত সরকার আমাদের জন্য সবকিছু করে দেবে। তাছাড়া ভারতে এমন ধুতি পাওয়া যায় সে ধুতিটা একটা ছোট্ট বোতলে ঢুকানো যায়। শুনেই আমার বাবা বললেন, তাহলে আর এখানে থাকবো না। চলে যাবো।
একদিন সতীশ কানুনগো বলল, সরকার থেকে আমরা যে জায়গা পেয়েছি তাতে বিক্রি করা যাবে না, সেসব তো রেখে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের মন্দিরের যে ‘গোঁয়েই’ মানে বুদ্ধমূর্তি আছে, সেটার কী হবে! এই ‘গোয়েই’কে ফেলে রেখে আমরা যেতে পারি না।
সবাই ভাবল, তাই তো। এই বুদ্ধমূর্তিটা দান করেছেন একজন মগ ভান্তে। সুদূর বার্মা থেকে এনে দিয়েছিলেন। কি সুন্দর ঝকঝকে মূর্তি! তো ঠিক হলো আমরা এই বুদ্ধমূর্তিটাকে সঙ্গে নিয়ে যাবো!
ভারতে চলে যাবো, সব ঠিকঠাক হওয়ার পর আমরা বুদ্ধমূর্তিটাকে কাল্লোং-এ ঢুকিয়ে ঢাকনা দিয়ে রেডি করে রাখলাম। নতুন করে বানানো জায়গা-জমি বাড়ি তো আর বিক্রি করা যাবে না। তবে বাড়ির পোষা মুরগি গরু-ছাগল যে যেভাবে পেরেছে বিক্রি করে দিয়েছে। সতীশ কানুনগো একদিন আমায় বললো, তুমি যেভাবে পারো সেভাবে গরু বিক্রি করে দাও। বাবা বললেন, সাবধান এইসবে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। টাকা পয়সার ব্যাপার।
তবুও আমি যেভাবে পারলাম সবাইকে সাহায্য করলাম। কিন্তু বছর পাঁচেকের মধ্যে আরেকবার ভিটা ছাড়া হওয়া। বাপের আজন্ম ভিটে ডুবে যাওয়া আর সেখান থেকে উচ্ছেদের বেদনা অনেক গভীর অনেক আক্ষেপের।
কিন্তু নতুন করে আবার ভিটা বা দেশ ছাড়ার বেদনাটাও কম না। বরং অনেক বেশি গভীর কষ্টের। আসলে এই দুঃখ আক্ষেপ বোঝানো কঠিন। আমরা যে ধান চাষ করেছিলাম তখন মাত্র সেই ধান পাকতে শুরু করেছে, সেসব ফেলে এলাম। যারা আগে যাচ্ছে তারাই গোলাক মেরে মেরে জানান দিয়ে যাচ্ছে যে আমরা চলে যাচ্ছি।
আর যারা ভোর বেলায় ওষুধ-এর দোকানে যেতো ওষুধ কিনতে, যেমন কুইনিন, তখন তো এখনকার মতো ট্যাবলেট জাতীয় পাওয়া যেতো না, তখন কুইনিন ছিল পাউডার সেসব কিনলেই বুঝতে হবে তারাও দেশ ছাড়ার জন্য রেডি।
এরই মধ্যে পাকিস্তান সরকারও জেনে গেছে যে দলে দলে শ’তে শ’তে চাকমারা ভারতে চলে যাচ্ছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকে ইসলাম কানুনগো এবং হায়দার সাহেব নামে দুজনকে পাঠানো হয় চাকমাদের সাথে আলোচনার জন্য।
যেন তারা ভারতে চলে না যায়। কিন্তু আমরা চলে এলাম ভারতে। তখন আমার ছেলে জন্মায়নি। আমার ছেলের জন্ম ৬৩-এর শেষের দিকে। আমি বলছি ৬৩-এর আগের কথা। যাবো যাবো করেও অনেক সময় মাস চলে গেল। তো ভগবানের ভাস্যা ছাড়াই আমরা ভারতে ঢুকলাম আর দেমাগ্রীতে ভর্তি হলাম। মানে হাজারো মানুষের সাথে শিবিরে নাম লেখালাম।
আমার স্মরণশক্তি বলছে দেমাগ্রী শিবিরে ২২টা গ্রুপে আমাদেরকে ভাগ করা হয়েছিল। এক একটা গ্রুপে ছিল ১০০০ জনের বেশি মানুষ। তবে আমার গ্রুপের নাম্বার হচ্ছে ২২ সদস্য সংখ্যা ছিল ৬৬২ জন। আর আমিই হচ্ছি এই গ্রুপের নেতা। ভালো-মন্দ মিলিয়ে আমাকে নেতা মেনে আমার গ্রুপের লোকেরা আমার সাথে সাথে চলে এসেছিল।
আমাদের গ্রামের বুদ্ধমূর্তিটা আমার গ্রুপের সঙ্গে। এখনো সে বুদ্ধমূর্তিটা আমাদের গ্রামের মন্দিরে রক্ষিত আছে। বুদ্ধমূর্তির – চল ১ কেজি কম ১ মণ। সাথে মং একটা ছিল ২ কেজি ওজনের।
আমাদের গ্রুপের যে ব্যক্তি বুদ্ধমূর্তিটাকে বহন করে এনেছে সে কোনো অভিযোগ বেনি। বরং সে বার বার বলছিল যে এতো ওজনের জিনিস পিঠে করে আনছে নব কখনো মনে হয়নি।
তাকে আমরা দিন ১০ টাকা করে পারিশ্রমিক দিতাম। দেমাগ্রীতে মানুষ আর মানুষ। ভারত সরকার আমাদের থাকার জন্য ক্যাম্প বানিয়ে দিয়েছে। শিলছড়া, মনা ছড়া, আনিপুর- হাজা জেলাসহ অনেক জায়গায়। পথে পথে ক্যাম্প বানিয়ে রেখে দিয়েছে।
দেমাগ্রীতে মানুষ বেশি হয়ে যাওয়াতে সরকার ঠিক করলো এইবার রওয়ানা দেয়া দরকার। এখান থেকে নেফা বর্তমান অরুণাচলে আমাদের নিয়ে যাবে। আইজল থেকে নেফার দূরত্ব অনেক। দেমাগ্রী থেকে হেঁটে আমরা আনিপুরের ক্যাম্পে পৌছাই। আমার মনে আছে তখন আমাদের বলা হয়েছিল দূরত্ব ৭০০ মাইল।
কিন্তু এখন মনে হয় আরো অনেক বেশি। দেমাগ্রীতে যখন আমাদের নাম লিস্টে লেখা হচ্ছিল তখন আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আমাদের কাছে মূল্যবান জিনিস মানে সোনা রুপা টাকা আছে কিনা। থাকলে জমা দিতে হবে।
আমার মা বেশ বুদ্ধিমতি ছিলেন। মা ছিলেন ধামেই গোজার মেয়ে। মা তৎক্ষণাৎ চিন্তা করলেন এখন এখানে জমা দিলে পরে যদি ফেরত না পাই? তো মা কী করলেন, তার কাছে যা ছিল জমা না দিয়ে তার পরা পিনন-এর লাল পাড়ে লাল কাপড় দিয়ে পকেট সেলাই করে কিছু টাকা, মানে ২২/২৩ হাজার টাকা সেলাই করে লুকিয়ে মাখলেন।
তখন পাকিস্তানের ১০০ টাকা দিলে ইন্ডিয়ার ১৩০ টাকা পাওয়া যেতো। শুধু টাকা না, যাদের কাছে দেশীয় বন্দুক, কার্তুজ ছিল সেসবও জমা দিতে হয়েছে। বলা হয়েছিল কোনো বন্দক ফেলে না আসতে। যেকোনো ধরণের বন্দুক থাকলেই সাথে করে নিয়ে এসে জমা দিতে।
যতদূর মনে পড়ে দেমাগ্রী থেকে মোট ৩১ দিনের মতো আমাদের হাটতে হয়েছে। প্রথমেই গেছে সুমতি তালুকদার।তার বাবার নাম আদেচন্দ্র হেডম্যান। দেমাগ্রী থেকে যাত্রা শুরু হবার পর শুধু হাঁটতে হতো।
রাস্তায় ৬ মাইল পর পর বিশ্রামের জন্য ক্যাম্প বানিয়ে রাখা ছিল। রাস্তায় রাস্তায় ভলানটিয়ার হিসাবে ইন্ডিয়া সরকার মানুষ রেখে দিয়েছিল। যারা অসুস্থ, বৃদ্ধ আর গর্ভবতী না তাদের জন্য ছিল গাড়ি।
যারা রাস্তায় মারা যাচ্ছে বা যাবে বলে বুঝা তাদেরকে ছেড়ে আসতে হয়েছে। অবশ্য সাথে ১ বা ২ জন ভলানটিয়ার থাকতো। তাদের জন্য শেষ যাত্রা বলে কোনো কিছুই থাকতো না।
মারা যা পর পথের ধারে কোনোরকমে আগুনে দিয়ে আসতে বা মাটিতে চাপা দিতে আর যেসব গর্ভবতী মা সন্তান জন্ম দেবে বা দিচ্ছে তাদেরকেও রেখে আসতে হয়েছে ক্যাম্পে। সন্তান জন্ম দেবার পর নিজেরাই পথ চিনে নিয়েছে সেসব মা। কত মানুষ যে রাস্তায় অসুখে বিপদে পড়ে মারা গেছে সেসব হিসাব কেউ কোনোদিন আর পাবে না। আমরাই তখন কেউ এই হিসাব রাখতে পারিনি।
মানুষের ঢলে মানুষের বিষ্ঠার গন্ধ ৩ (তিন) মাইল দূর থেকেও পাওয়া যেতো। রাস্তার দু’ধারে দেখা মিলতো বাচ্চাদের মৃতদেহ, অর্ধেক মাটির নিচে পুতানো। তাড়াহুড়াতে পুরোটা মাটি চাপা দেওয়া সম্ভব হয়নি। অনেক মানুষ মারা পড়েছে অর্ধেক রাস্তায়।
পরিবেশ, ঠিকমতো খেতে না পাওয়া, পরিশ্রম- সব মিলিয়ে অসুখে ভুগে এক বুড়ো আর ছোট বাচ্চারাই বেশি মারা গেছে। যারা একেবারে চলতে অক্ষম ছিল তাদেরকে রাস্তায় ফেলে আসতে হয়েছে। কি করুণ পরিস্থিতি!
অনার আজো চোখে ভাসে আমাদের সেই হাঁটার দৃশ্য। রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ। কোথায় যাচ্ছি জানে না কেউ। শুধু জানে ভারত সরকার এখন যেখানে নিতে চাইছে সেখানে যেতে হবে।
তবে ভাগ্য ভালো বলতে হবে, আমাদের গ্রুপে মানুষ হতাহত কম হয়েছে। শুধুমাত্র একজন মারা গেছে। সম্ভবত আমাদের সাথে ভগবান মানে বুদ্ধমূতি ছিল, হয়তো সে কারণে। অন্য গ্রুপে বেশি মারা গেছে। আমরা চেষ্টা করতাম এই বুদ্বমুর্তিকে বন্দনা করতে।
মনছড়া নামের জায়গা আমাদের জন্য ক্যাম্প বানিয়ে দিয়েছে ভারত সরকার। শন দিয়ে সব ক্যাম্প বানানো। ক্যাম্পে আসার পর আমাদের জন্য চাল, চালগুলো খুবই ভালো ছিল, জেত্তেল মানে সরিষার তেল আর শুটকি দেয়া হলো।
আমি যদিও লিডার ছিলাম কিন্তু আমি তো ইংরেজি জানি না। আমাদের সেই ক্যাম্পের দ্বায়িত্বে ছিল একজন আসামিজ ক্যাম্প কমান্ডার। একদিন একটা ত লেখা কাগজ নিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আমার নাম বুদ্ধচন্দ্র কিনা।
আমি তো ইংরেজি জানি না, তাই আরেকজনকে ডেকে কাগজটি দেখিয়ে দিয়ে বললো, এখান থেকে তোমাদের নেফা মানে বর্তমানের অরুণাচল যেতে হবে। কাগজে সেটাই লেখা আছে। এই কাগজটি হাতে পাবার পর আমাদের আবার পথে নামতে হলো। এইবার আনিপুর ক্যাম্প।
আবার মনছড়া ক্যাম্প থেকে হাটা ধরলাম আমরা। এইবার আনিপুর। সেখানে আমাদের জন্য ক্যাম্প বানিয়ে রাখা হয়েছে। শুনেছি আমরা সেখানে পৌছার আগে সরকার সেখানকার স্থানীয়দের বলে রেখেছিল যে সাবধানে থাকবে। চাকমারা কিন্তু মানুষ খায়।
তোমাদেরকে যদি তারা খেয়ে ফেলে তাহলে সরকারের দোষ নাই। আমরা আনিপুর ক্যাম্পে পৌছালাম। আমাদেরকে স্থানীয়রা ভয় পেতো যদি সত্যি সত্যি আমরা তাদের খাওয়া শুরু করি।
শিবিরে আসার পর রেশন দেয়া হলো। মাথা পিছু ১ ঢ’ চাল। চাল, কেরোসিন তেল, সরিষার তেল, শুটকি ও বের্মা। চাল ভাগ করে দেয়ার দায়িত্ব প্রথমেই মোহন্তকে দেয়া হয়। পরে আমাকে দেয়া হয়।
চাকমারা শুধু খাওয়া নিয়ে চিন্তা করে। আর হিন্দুরা শুধু সম্পত্তি বানায়। আমার মা লুকিয়ে যে ২২/২৩ হাজার টাকা এনেছিল সে টাকা নিয়ে আমি করিমগঞ্জে গেলাম। পাকিস্তানী টাকা থেকে ইন্ডিয়ান টাকা বদলানোর জন্য। সেখানে গিয়ে দেখলাম এক হাতের পাতা সমান বদলা ছুড়ি শুটকি। আর আমারে মানা করে কে! সেসব কিনে শিবিরে ফিরলাম।
আমি এমনিতেই একটা দুষ্ট প্রকৃতির লোক ছিলাম। তাছাড়া মদও খেতাম। লিডার ছিলাম তাই সবাই ভয় পেতো। কাউকে যদি বলতাম মদ তৈরি করে দিতে সে ভয়ে আমার জন্য মদ তৈরি করে দিতে বাধ্য হতো।
এখানে আসার পর ভারত সরকার আমাদেরকে একটা করে কাগজ দিলো আর এই কাগজ পেয়েই আমাদের বেড়ে গেল। এখন আমাদেরকে আর কেউ ভারত থেকে বের করে দিতে পারবে না।
আনিপুর ক্যাম্পে আসার পর থেকে আমার মদ খাওয়ার সাথে সাথে জুয়া খেলাও যোগ হলো। এমনকি ক্যাম্পের বাইরেও আমার মদ আর জয়ার সাথী জটে গেল। ভারত সরকার ১৭ টাকা মাসে ২ বার করে টাকা দিতো, যাতে আমরা টাকাগুলো একেবারে শেষ করতে না পারি। সেখানে তো লাকড়ি সস্তা ছিল খুব ১০ পয়সা করে। তখন আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের টাকার বেশ দাম ছিল।
মদ আর জয়ায় আমি সব টাকা সেখানে ফেলে আসতাম। আনিপুর ছিল মুসলিমদের জায়গা। তারা আমাদের বন্ধু বলে সম্বোধন করতো। ক্যাম্পে কারোর কাছে ধার পাওয়া যেতো না। সবারই তো একই অবস্থা। সুখ বলতে কিছুই নেই।
এতো দুঃখের ভেতরেই জীবন চলতে থাকে। জীবনের নিয়মে বিয়ে হতো, কিন্তু এই শরণার্থী শিবিরে আমাদের সমাজের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে বিয়েতে দাবা* ধরাধরিও বন্ধ হয়ে গেল। কোনো রকমে সুধোম** অনুযায়ী মেলা মানে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করতে হতো। কারণ কারোর হাতে টাকা নেই। সবাই ভারত সরকারের রেশনের উপর নির্ভরশীল। এভাবে থাকতে থাকতে এই আনিপুর ক্যাম্পেই ছোট করে একটা বৌদ্ধমন্দির বানিয়ে দিলো সরকার।
ক্যাম্পের বাইরে বাগান বাজার নামে এক দোকানে ক্যাম্পের সকল লিডার গোছের পুরুষরা মদ খেতে যেতো। সেখান থেকে ক্যাম্পে কেউ মদ আনতে চাইলে একটা কাগজ নিতে হতো ক্যাম্পের দায়িত্বে যারা ছিল তাদের থেকে এমনিতে মুসলমানদের এলাকা। তার ওপর আমরা মদ খেয়ে প্রায় ঝামেলা করতাম। এতে এলাকার লোকেরা আমাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।
একদিন আমাদেরই একজন রাস্তায় সাইকেল চড়ে আসা এক স্থানীয় ব্যক্তিকে লাঠি মেরে ফেলে দেয়। এই নিয়ে ঝামেলা শুরু হয়। আমাদের সাথে স্থানীয় মুসলমানদের মারামারি লেগে গেল। ক্যাম্পের যারা চোর ছিল তারা মুসলমান এলাকায় গিয়ে খুঁজতো কার গরু কী রকম। এভাবে স্থানীয় লোকদের গরু মহিষ হারিয়ে যেতে লাগলো।
আর এসব অপর্কম আমাদের ক্যাম্পের লোকেরাই জড়িত সে নিয়ে কোন সন্দেহ ছিল না। বেচারা মুসলমানদের গরু মহিষ আঁখবাগানসহ সব ধরণের অস্থায়ী সম্পত্তি শেষ করে দিয়েছিলাম আমরা।
এই আনিপুর ক্যাম্পে প্রথমে আমাদের ২ মাস থাকার কথা থাকলেও থাকতে থাকতে ৩ (তিন) বছর রয়ে গেলাম। এভাবে বিভিন্ন ক্যাম্পে গ্রুপ গ্রুপ করে রয়ে গেলাম। এরই মধ্যে কেউ কেউ গ্রুপ করে নেফা মানে অরুণাচল গিয়েছে সেখানকার এলাকা দেখতে। আমার এক পিসীত ভাই ফণিভূষণও সেখানে গিয়েছে পরিস্থিতি দেখতে। আমাদের বরপরং প্রথম গ্রুপে সেও ছিল।
তো সে নেফা থেকে ফিরে এসে বলল, ‘নেফায় গিয়ে থাকবো কী করে। খুবই ঠাণ্ডা। এতো ঠাণ্ডায় আমরা মরে যাবো। আমাদের আগের জায়গার সাথে কিছুই মিলে না। আর এতদূর নেফা!’ এইসব শুনে আমাদের নেফা যাওয়ার ইচ্ছেই চলে গেল।
আমরা সরকারকে বললাম আমরা নেফা যাবে না। শুনে সরকার বললো, তোমরা যদি নেফাতে যেতে না চাও না যাও, তারপরও নিজে গিয়ে একবার দেখে আসো জায়গাটা।
এরপর আমাদের ক্যাম্প থেকে আরেকটা গ্রুপ নেফায় যায়। কী একটা কারণে আমার নেফা যাওয়া হলো না। আমি গেলে হয়তো অন্যরকম হতো। যাই হোক। তারা গিয়ে দেখলো জঙ্গল আর জঙ্গল। বৃষ্টি হলেই সে বৃষ্টির পানিতে হাতি ভেসে আসে।
শুধু হাতি না ‘গবও’* ভেসে আসে। এই ঝড়- এই পানি। আর কনকনে ঠাণ্ডা। সেই গ্রুপ ফিরে এসে জানালো, যদি নেফা যায় যাওয়া মাত্র সকলেই মারা পড়বো। কী বৃষ্টি! বৃষ্টির সাথে ঠাণ্ডা। মরে যাবো। আমরা কেউ যাবো না, এই সিদ্ধান্ত হলো।
আমরা এখন কী করবো? বাবা আমাকে বললো, তুমিতো একটু লেখাপড়া জানো। এক কাজ করো, তুমি ত্রিপুরা একবার ঘুরে আসো। সেখানে আমাদের ভাই অনিল বরণ চাকমা বাস করে।
ভারত পাকিস্তান ভাগ হবার সময়ে একটা গ্রুপ পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে আসে। সেই গ্রুপে জ্ঞানেন্দু চাকমা, রেবতি রজ্ঞন চাকমা, বিপিন তালুকদার মাস্টারসহ অনেকে ছিলেন। এবং তারা তখন চলে আসাতে ভালো জায়গায় বসতি স্থাপন করতে পেরেছে। বাবা আমাকে বলল বড় ভাই অনিল চাকমার সাথে যোগাযোগ করতে।
এদিকে ভারত সরকার ঠিক করেই রেখেছে আমাদের নেফায় নিয়ে যাবেই। আর আমরা যাবো না। আমরা ইতোমধ্যে ঠিক করেছি (আমার গ্রুপ আর ফণীভূষণ গ্রুপ) নেফায় না যাওয়ার। এইটা শুনে ভারত সরকারের প্রতিনিধি বললো এই সব গ্রুপের লিডার আর মেম্বারদের রেশন বন্ধ করে দিতে হবে আর রেশন বন্ধ করলেই নেফা চলে যাবে।
এবং সত্যি সত্যি রেশন বন্ধ করে দিলো। এখন আরেক মরণ দশা। কী খাবো কীভাবে বাঁচবো। তারপর আমি বাধ্য হয়ে ক্যাম্প কমান্ডারকে বলে আসলাম ঠিক আছে আমরা যাবো। কিন্তু আমাদের একটু সময় দিতে হবে। এদিকে সরকার শিবিরের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছে নেফাতে নেওয়ার জন্য। রেশন বন্ধ হবার ভয়ে অনেকের ইচ্ছে না থাকা সত্বেও নেফা যেতে বাধ্য হলো।
এই ফাকে আমি বাবাকে বললাম, তুমি বরং বড় ভাই অনিল বরণের বাড়ি ত্রিপুরায় একবার ঘুরে আসে। তারপর সিদ্ধান্ত নেবো কোথায় যাবো কী করবো। এরই ভেতর আমরা ক্যাম্পের লোকজন আবার ভেতরে ভেতরে আলোচনা করলাম যাবো যাবো কোথায় যাবো, কেমন করে যাবো, থাকলে কীভাবে থাকবো।
সবাই মিলে ঠিক করলাম, আমরা ভারত সরকারকে দস্তখত দিয়ে আসি, এই বলে আমরা আর পাকিস্তান ফিরবো না। এখানেই থাকবো, এই ভারতেই।
এরপর ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা লোকজন আমাদের জিজ্ঞেস করলো থাকবে তো থাকবে, কিন্তু কোথায় থাকবে ঠিক করেছো?
এরই ভেতর বাবা ত্রিপুরাতে বড় ভাই অনিল বরণ চাকমার বাড়ি ঘুরে আসার পর বললেন আমরা নেফায় না গিয়ে ত্রিপুরাতেই চলে যাবো। ত্রিপুরাতে এখনো জায়গা আর জঙ্গল আছে অনেক। সেখানেই আমরা সেটেলড় হবো।
যেই কথা সেই কাজ। আমরা একদিন সুযোগ বুঝে গভীর রাতে চুপিসারে আনিপুর ক্যাম্প ছাড়লাম। প্রথমেই আমরা কয়েক পরিবার ক্যাম্প ছেড়ে চলে আসি। পরবর্তীকালে আরো ৩৭ পরিবার চলে আসে ত্রিপুরাতে।
আমাদের বড় ভাই থাকাতে ত্রিপুরাতে বসতি করে স্থায়ী হওয়া আমাদের পরিবারের জন্য সহজ ছিল। কিন্তু বাকিদের জন্য ছিল কঠিন। কারণ এখানে ভারত সরকারের রেশন ছিল না, ছিল না কেউ যে একবেলা খেতে সাহায্য করবে। শুধু প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল হয়ে লড়াই করতে হয়েছিল তাদের।
আমরা আসার পরে ঘন জঙ্গল ২ বছরের মধ্যে সাফ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে আমরা আন্ধার ছড়াতে স্থায়ী হয়ে গেলাম আর বাকি ৩৭ এর অধিক পরিবার বাঁচার তাগিদে পং ছড়ার দিকে বসতি গড়ে তুললো। সেখানে দাড়বো মানে লাকড়ি বিক্রি করা যায় শন বিক্রি করে টাকা পাওয়া যায়।
আপনাদের ভারতে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কে ছিল?
আমি যতদূর জানি উদোংগো মুনি চাকমা নামে একজন ব্যক্তি চাকমাদের ভারতে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে। সেও দেশ থেকে এসেছে। এই ব্যক্তিই আগে থেকে জায়গা ঠিক করে রেখেছিল। পরে কুসুম চাকমা আমাদের নিয়ে আসে।
অবশ্য পরে এই উদোংগো মুনি চাকমারা কুসুম বাবুকে নেফা থেকে বের করে দেয়। আমি যতদূর জানি, বর্তমানে এই কুসুম চাকমা লামডিং-এ বসতি গড়েছে। সেখানকার একটা বড়ুয়া মেয়েকে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে ডিব্রুগড়ে বসবাস করছে। অবশ্য কুসুম চাকমা দেশে থাকতে এক চাকমা মেয়েকে বিয়ে করেছিল।
আমি যতটুকু জানি, ভারত সরকার কিছু চাকমাদের বিহারেও নিয়ে গেছে। আন্ধামানেও কিছু নিয়ে যায়। বিহারে যারা যায় তাদের সংখ্যা ২০/৩০ পরিবার হবে। বিহারে যারা গিয়েছেল তারা সেখানে গিয়ে দেখে যে সে এলাকায় কোনো বৃষ্টি নাই শুধু রোদ আর রোদ। চালের অভাব, শুধু গম খেতে হতো। মেশিন দিয়ে পানি তুলতে হতো।
অবশ্য তারাও তিন বছর পর ফিরে আসে বিহার থেকে। ত্রিপুরার কুমার ঘাট এলাকায় একটা মাঠ আছে, সেখানে রিফুজি ক্যাম্প করে রেখেছিল চাকমাদের। এখনো ঐ জায়গাটা খালি আছে। ঐ ক্যাম্পে যারা ছিল তারাই বিহারে যায়।
আমাদের পানিতে ডুবে যাওয়া গ্রামে তাল গাছ, বিশাল কলা বাগান আর গাব গাছের বাগান ছিল। তখনও আমাদের মানুষদের হুঁশ জ্ঞান হয়নি যে কী হারাচ্ছে! কোন বিপদে পড়তে যাচ্ছে।
সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ যে টাকা পেয়েছে, সেসব দিয়ে রাঙামাটি গিয়ে কলের গান কিনে এনেছে কেউ কেউ। গ্রাম ছাড়ার সময় নতুন জায়গায় যাবার সময় কেউ কেউ কলের গান বাজিয়ে বাজিয়ে এসেছে।
আর কেউ নৌকায় বসে করুণ সুরে ‘বেলা বাজিয়ে বাজিয়ে জায়গা ছাড়ার দুঃখকে ভুলতে চেয়েছে। নৌকার মাঝি ছিল বাঙালি। মেয়েরা গ্রাম ছাড়ার সময় কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে। আর অনেকে খুব ফুর্তি সহকারে গ্রাম ছেড়েছে।
আমাদের গ্রাম ডুবে যেতে ১ দিন ১ রাত লেগেছিল। সুবলং এলাকায় যে বৌদ্ধমন্দিরটি ছিল, সে বৌদ্ধমন্দিরটি পানিতে তলিয়ে গেলে বুদ্ধমূর্তিটিও ডুবে যায়। সেটি আর পানির নিচ থেকে উদ্ধার করা যায়নি। আমরা এখান থেকে শুনি এখনো নাকি সেই বুদ্ধমূর্তিটাকে মাঝে মাঝে দেখা যায় পানির উপরে ভেসে থাকতে।
আশপাশে কোনো লঞ্চ না থাকলে সেটি ভেসে উঠে আর লঞ্চ দেখলেই ডুবে যায়! সত্য মিথ্যা জানি না। আমরা এখান থেকে এসব শুনি। আমরা যে বুদ্ধমূর্তিটি দেশ থেকে বয়ে এনেছিলাম সেটি নেফার বুদ্ধ পেদা চাকমা চুরি করেছিল ক্যাম্প থেকে।
দেমাগ্রীতে নাম লেখার আগে আমরা বলেছিলাম আমাদের কাছে বুদ্ধমূর্তি আছে। তারা সেখান থেকে ক্যাম্পে একটা কাগজ পাঠায়, যেখানে লেখা ছিল ২২ নম্বর গ্রুপে একটা বুদ্ধমূর্তি আছে। সেই বুদ্ধমূর্তিটা ঠিকমতো পৌছালো না পৌছালো?- একদিন ক্যাম্প কমান্ডার সেই কাগজ নিয়ে আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি আসার সময় কী এনেছো? কোনো কাগজ আছে কিনা? আমি তাকে বললাম, আমার স্ত্রীর একটা কানের দুল ছিল, সেটি সে এনেছে। সেটি আমরা জমা দিইনি।
তারা আবার জিজ্ঞেস করলো, আরো কিছু ছিল কিনা যেটি আমরা জমা দিইনি? যারা জিজ্ঞেস করতে এসেছিল তারা আসামিজ। আমি তাদের কথা কিছু বুঝি কিছু বুঝি না। তাই তারা একজন বাঙালিকে ডেকে নিয়ে আসে তিনি আমাকে বুঝিয়ে বলেন যে তারা একটা বুদ্ধমূর্তি খোজ করছেন।
আমি তখন বললাম, আমার সেই বুদ্ধমূর্তিটা কেউ একজন চুরি করেছে। তখন তারা সেই বুদ্ধমূর্তিটাকে খুঁজতে শুরু করলেন। অবশেষে সেটা পাওয়া গেল। নেফার বুদ্ধ পেদা চাকমার বাড়িতে। এখন সেই বুদ্ধমূর্তি আশ্বিন ছড়া, আন্ধার ছড়াতে আছে।
এখন আমার বয়স একেবারে শেষের দিকে। এখন এই মন্দিরে শ্রমণ হিসাবে আছি। কখন কি হয়। এই কাপ্তাই বাঁধের ঘটনা নিয়ে নিজেরা নিজেরা আলোচনা করলেও এভাবে কেউ জিজ্ঞেস করেনি। বয়সের কারণে এখন অনেক কিছু ভুলে গেছি। আসলে সময়ে আর বয়সের সাথে সাথে সব শেষ হয়ে যায়।
একা থাকলে বা দেশের কাউকে পেলে কত স্মৃতি এসে ভীড় করে। পুরোনো জায়গা, নতুন জায়গা কত কষ্ট করে জঙ্গল সাফ করে বসতি করেছি, সে জায়গা ছেড়ে নতুন দেশে পালিয়ে আসা! কাপ্তাই বাঁধে ডুবে যাবে আজু পিজুদের জায়গা সম্পত্তি, তাদের শ্মশান, আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে আসার সময় কত হা-পিত্যেস! কত কান্না! শুধু কি আমাদের কান্না, পশু পক্ষীর কান্না ছিল শরীর হিম করে দেওয়ার মতো।
ছন্নছাড়ার মতো কুকুর বিড়াল শিয়াল চিৎকার করতো। তাদের চিৎকারে আমাদের প্রাণ হিম হয়ে যেতো। প্রাণে ভরপুর গ্রাম প্রাণহীণে পরিণত হয়েছিল। চারিদিকে মৃত মানুষের মতো আমরা ঘোরাফেরা করতাম একে অপর থেকে বিদায় নিতাম।
মারিশ্যার বঙলতুলির লোকেরা আগে বর-পরং যাবে বলে দেশ ছেড়েছিল। আমরা ত্রিপুরাতে আসার পর ত্রিপুরার চাকমারা অনেক সাহায্য করেছিল। কতদিন আধাপেটা করে খেতে হয়েছে আমাদের। অথচ কি ছিল না আমাদের, আমাদের দেশে। সেসব এখন পানির তলে।
আমাদের পুরোনো জায়গায় বিশাল মাটির বাড়ি ছিল শন দিয়ে। এখানে এসে আমরা টিনের চাল দিয়ে ঘর বানিয়েছি ঠিকই কিন্তু শরণার্থী তো। কি আর করা! ভগবান হয়তো এভাবেই আমাদের দেখতে চেয়েছে।
এখানে আসার পর অনেক পরে আমি কংগ্রেসে যোগদান করি। এখন শ্রমণ হিসাবে আছি। দেশ ছাড়ার পর থেকে আমি আর ফিরিনি আমাদের দেশে। আমার পরিবারের লোকেরা গিয়েছিল আমার শ্বশুর মৃত্যুর সময়। দেশে যেতে কতো ইচ্ছে করে।
ইচ্ছে কি- মনে মনে তো আমি সেখানেই থাকি। আজু পিজুরা তো ওখানেই রয়ে গেছে। কিন্তু নানা কারণে আমার আর যাওয়া হয়নি। না যাওয়ার অন্যতম কারণ ওখানে গেলে আমার আত্মীয়-স্বজন হয়তো আমাকে ঠাট্টা করবে, আমাদের চলে আসা নিয়ে। হয়তো বলবে এইবার কেন মরতে এলে। সেটা আমার সহ্য হবে না। তাই যাওয়া হয়নি। হয়তো আর কখনো আমার দেশকে দেখা হবে না।
লেখকঃ বুদ্ধধন চাকমা
৯ নম্বর মারিশ্যা চর মৌজা, কাপ্তাই বাঁধের পর মধ্য বাঘাইছড়ি, রাঙামাটি।
২২ নং গ্রুপের নেতা*
তথ্যসুত্র : “কাপ্তাই বাঁধ : বর-পরং – ডুবুরীদের আত্মকথন” – সমারী চাকমা।
প্রসঙ্গ:কাপ্তাই বাঁধ, পার্বত্য চট্টগ্রাম, বড়পরং
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।