Jumjournal Logo

চাকমা রূপকথা ও লোককথা: আর্কাইভের দশটি গল্পের সূচি

Last updated Oct 15th, 2026

0

Featured image

জুমজার্নালের আর্কাইভে চাকমা রূপকথা ও লোককথা মিলিয়ে দশটি গল্প আছে। এই পাতাটি সেই দশটির সূচি — প্রতিটির নাম, কোন বই বা কার মুখ থেকে এসেছে, ভেতরে কী ঘটে, আর পড়ার সরাসরি লিংক।

সূচি বানানোর কারণ সরল। গল্পগুলো আলাদা আলাদা পাতায় ছড়িয়ে আছে, একটি থেকে অন্যটিতে যাওয়ার পথ নেই, আর কোন গল্প কোন বই থেকে এসেছে তা জানতে প্রতিটি পাতার একেবারে শেষে যেতে হয়। এক পাতায় দশটি একসঙ্গে সাজানো ছিল না।

দশটির মধ্যে তিনটি একটি বই থেকে, পাঁচটি আরেকটি বই থেকে, একটি লিখেছেন নবম শ্রেণির একজন ছাত্র, আর একটি বাংলা ভাষায় লেখাই নয় — চাকমা ভাষায়।

আর একটি গল্প বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ে গিয়েছিল।

সূচিপত্র

আর্কাইভে কতটি চাকমা গল্প, আর কোন লেবেলে

জুমজার্নালের রূপকথা বিভাগে চাকমা গল্পের সংখ্যা দশ। এর মধ্যে চারটির শিরোনামে আছে “চাকমা রূপকথা”, পাঁচটিতে “চাকমা লোককথা”, আর একটির শিরোনামে আছে “পশ্চন” — যা চাকমা ভাষার শব্দ। তিনটি আলাদা লেবেল, একই বিভাগে।

লেবেলগুলো কঠোরভাবে আলাদা নয়। একই গল্প একসঙ্গে “চাকমা রূপকথা” ও “চাকমা লোককথা” — দুটো ট্যাগই বহন করে, যেমন সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী।

তাই এই পাতায় লেবেল ধরে ভাগ করা হয়নি। ভাগ করা হয়েছে উৎস ধরে — কোন গল্প কোথা থেকে এল, সেটিই পাঠকের বেশি কাজে লাগে।

পাহাড়ের অন্য জনগোষ্ঠীর গল্পের সূচি ও চারটি লেবেলের পূর্ণ ব্যাখ্যা আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।

দুটি বই, একজন ছাত্র, একজন কবি

দশটি গল্পের উৎস চার রকম। তিনটি এসেছে বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের চাকমা রুপকাহিনী (২০০০) থেকে; পাঁচটির শেষে লেখা আছে ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা; একটির লেখক একজন নবম শ্রেণির ছাত্র; আর একটি চাকমা ভাষায় লেখা, লেখকের নাম ও তারিখসহ।

উৎসকতটিকোন গল্প
বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান, চাকমা রুপকাহিনী (২০০০), রাঙামাত্যা৩অমগদ চাকমা · হঅ্’বি আর ধঅ্’বি · টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ
ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা৫দশ ক্ষুদে মুরগী ছানার প্রতিশোধ · সাদা কাক কালো হল কেন · সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ · বাঘ ও শামুকের দৌড় · শিয়ালনীর উপস্থিত বুদ্ধি
বিধায়ক চাকমা (নবম শ্রেণী)১তিন পাখির গপ্পো
আলোময় চাকমা, ২৮.০৬.২০১৭১সনার চিঝির পশ্চন — মেঘঅ পিধে

চারটি ভিন্ন ধরনের উৎস — একটি সংকলন-গ্রন্থ, একটি প্রতিবেশী রাজ্যের সংকলন, একজন স্কুলছাত্র, আর একজন সমকালীন লেখক। একটি জনগোষ্ঠীর গল্প কীভাবে লিখিত রূপ পায়, এই ছকটিই তার উত্তর।

বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের ‘চাকমা রুপকাহিনী’ (২০০০)

তিনটি গল্পের শেষে একই লাইন ছাপা আছে — “বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান, চাকমা রুপকাহিনী – ২০০০ ইং, রাঙামাত্যা (রাঙ্গামাটি)”। অর্থাৎ বইটির নাম চাকমা রুপকাহিনী, প্রকাশের সন ২০০০, আর স্থান রাঙামাত্যা — রাঙ্গামাটির চাকমা নাম।

এই তিনটি গল্পের একটি বৈশিষ্ট্য অন্য সাতটিতে নেই: পাদটীকা। গল্পের ভেতরের অচেনা শব্দ বা বস্তুর ব্যাখ্যা নিচে নম্বর দিয়ে দেওয়া আছে।

উদাহরণ তিনটি, বই থেকেই:

  • রংরাং — “এক রকমের অতিকায় পাখি। চেহারায় ধনেশ পাখির মত, কিন্তু আকারে অনেক বড়। (King hornfil)”
  • একটি মাটির জলপাত্রের ব্যাখ্যা — “দেখতে অনেকটা গাড়ুর মত, গলাটা সরু আর লম্বা”
  • আরেকটি — “চাল রাখার জন্যে এক প্রকার বেতের টুকরী”

আর অমগদ চাকমা গল্পের পাদটীকায় ব্যাখ্যা করা আছে একটি কাজ: “ব্যবসার উদ্দেশ্যে দূর বনে গিয়ে বাঁশ, গাছ ইত্যাদি কেটে নিয়ে আসা”।

পাদটীকার এই অভ্যাসটি বলে দেয় বইটি কাদের জন্য তৈরি হয়েছিল — যাঁরা গল্পটি জানেন না, এবং যাঁদের কাছে রংরাং পাখি বা বেতের টুকরী ব্যাখ্যা ছাড়া বোঝা যাবে না।

চাকমা গল্প ত্রিপুরার বইয়ে কেন

পাঁচটি চাকমা গল্পের শেষে লেখা আছে “তথ্যসূত্র: ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা” — অর্থাৎ বইটির শিরোনামে ত্রিপুরা, কিন্তু গল্পগুলো চাকমা।

এতে অসঙ্গতি নেই। ত্রিপুরা শব্দটি এখানে একটি জনগোষ্ঠীর নাম নয়, একটি ভূখণ্ডের — ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, যেখানে চাকমা জনগোষ্ঠীর বসবাস আছে। বইটি সেই রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর লোককথার সংকলন, আর তার মধ্যে চাকমা গল্পও আছে।

একই বই থেকে আর্কাইভে এসেছে আরও গল্প — মারমা তিনটি, কলই একটি, হালাম একটি। [বইটির লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশকের নাম গল্পগুলোর পাঠে নেই — যাচাই প্রয়োজন]

পাঠকের জন্য এর একটি ব্যবহারিক অর্থ আছে: সীমান্তের দুই পাশের একই জনগোষ্ঠীর গল্প একই সংকলনে ওঠে। চাকমা জনগোষ্ঠীর রাজবংশ ও প্রশাসনিক ইতিহাস আলাদা করে আছে চাকমা রাজবংশের ইতিহাস-এ।

যে গল্পটি পাঠ্যবইয়ে গিয়েছিল

টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ গল্পের পাতার শেষে একটি বাক্য আছে, যা বাকি নয়টিতে নেই: “এই রূপকথাটি বাংলাদেশের কারিকুলামের বাংলা বইয়ে সংযোজিত হয়েছিল।”

অর্থাৎ একটি চাকমা রূপকথা জাতীয় পাঠ্যক্রমের বাংলা বইয়ে জায়গা পেয়েছিল।

গল্পটি নিজেই ছোট — ১,৩২০ শব্দ — আর এর কেন্দ্রে একটি মিথ্যে। কুনোব্যাঙ শহর থেকে ফিরে বন্ধু টুনটুনিকে বলে ঝড় আসছে, যা “একদম ডাহা মিথ্যে, টুনটুনির তাক্‌ লাগাবার জন্যই শুধু বলা”। গল্পের ভাষ্যে কারণটিও আছে — “পাড়াগাঁয় শহর ফেরত লোক অমন উটকো খবর একটা না একটা কিছু বলেই থাকে।”

[কোন শ্রেণির বইয়ে, কোন সালে — সেই তথ্য গল্পের পাতায় নেই, আর কোনো পাঠ্যক্রম-নথি এই লেখার জন্য দেখা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]

দশটি গল্প, এক এক করে

নিচে দশটি গল্প, উৎস অনুযায়ী সাজানো। প্রতিটির সঙ্গে শব্দসংখ্যা, উৎস, আর ভেতরে কী ঘটে তার সারকথা। সারকথাগুলো গল্পের নিজের পাঠ থেকে নেওয়া।

১. চাকমা রূপকথা – অমগদ চাকমা

১,২৪৩ শব্দ · বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান, চাকমা রুপকাহিনী · ছবি: অমগদ চাকমা

গল্পের শুরু একটি সময়ের বর্ণনা দিয়ে — যখন পৃথিবী জঙ্গলে ভরা ছিল, মানুষ কম, আর ভূতেরা “অত অদেখা হয়ে থাকত না, হর হামেশা তাদের দেখা যেত”। সন্ধ্যার পর কোনো চাকমা ঘর থেকে বেরোত না; রাতে কারও ডাকে সাড়া দিলে সেই মানুষের রূপ ধরে ভূত ঘরে ঢুকে পড়ত।

গল্পে প্রতিরোধের তিনটি উপায় নাম ধরে লেখা আছে — মশাল, মেইয়্যা শাক ও তাগল্‌ (দা)। মেইয়্যা শাক পাঠে ব্যাখ্যা করা আছে — “অনেকটা মুলো শাকের মত। খাওয়া যায়, তবে মুলো হয় না।” পাঠ অনুযায়ী যাঁরা এই শাক খান তাঁদেরও ভূত কিছু করতে পারে না, তাই ঘরের আশেপাশে প্রচুর মেইয়্যা শাক বোনা হতো; আর ভূতের তাড়া খেলে একবার মেইয়্যা শাকের বনে ঢুকে পড়লেই রক্ষা।

তাগল্‌ নিয়ে গল্পে একটি নিয়ম বেঁধে দেওয়া আছে, আর তাতে একটি মোচড় আছে। হাতে তাগল্‌ থাকলে একজন “একাই একশো ভূতের কাছে” — কিন্তু সেই তাগল্‌-এ একটুখানি আগুন ছোঁয়ালেই তা “মরে যায়”, আর তখন সারাদিন কোপালেও ভূতের কিছু হয় না। অর্থাৎ আগুন মানুষকে বাঁচায়, কিন্তু আগুন অস্ত্রটিকে অকেজোও করে দেয়।

শেষে ধারালো তাগল্‌-এর এক কোপে ভূতের মুন্ডু আলাদা হয়ে আসে। পরদিন লাশ দেখতে গিয়ে গ্রামের লোক পায় “শুধু একটা মরা দাঁড় কাক”, গলা দু’ভাগ করা। গল্পের উপসংহারে একটি কারণ ব্যাখ্যা করা হয়: সেই থেকে ভূতেরা ভয়ে লুকিয়ে গেছে, আর তাই আজ তাদের দেখা মেলে না — “কী জানি কোথায় কোন ‘অমগদ’ চাকমা আছে।”

একটি বিষয় লক্ষণীয়। গল্পে নায়কের নাম নেই — তাঁকে বলা হয়েছে “বৌটার স্বামী”। আর ‘অমগদ’ শব্দটি পাঠে প্রতিবারই উদ্ধৃতিচিহ্নের ভেতরে, একটি ধরন বোঝাতে: “অমগদ চাকমা আর কাকে বলে?” শিরোনামে শব্দটি নাম হিসেবে দেখালেও পাঠে তা একটি বিশেষণ। [‘অমগদ’ শব্দের অর্থ পাঠে বা কোনো পঠিত উৎসে দেওয়া নেই — যাচাই প্রয়োজন]

গল্পটি পড়ুন →

২. হঅ্’বি আর ধঅ্’বি

৫,৩৫৭ শব্দ · বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান, চাকমা রুপকাহিনী · আর্ট: তৃপ্তা চাকমা

আর্কাইভের চাকমা গল্পগুলোর মধ্যে দীর্ঘতম, আর অন্যগুলোর চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বড়।

শুরু এক বুড়ো-বুড়ির জুমচাষের সংসারে। মেয়ের নাম হঅ্’বি। জুমে ধান, তিল, কার্পাস (জুম্ম তুলো), কুমড়ো, মার্‌পা, চিনার ফলে — পাঠে ফসলের তালিকাটি নাম ধরে দেওয়া আছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে জুম বাছার দৃশ্য দিয়ে দুঃখের অংশ শুরু হয়; জুম পোড়ার আগুনে গাছগুলোর “সব ন্যাড়া মাথা”।

গল্পে একটি ভাষাগত মোচড় আছে, যা পাঠেই ব্যাখ্যা করা: “চাকমা ভাষায় দুর বললে কচ্ছপকেও বোঝায়” — আর সেই দ্ব্যর্থতার উপর গল্পের মোড় ঘোরে (নিচে আলাদা অংশে বিস্তারিত)। বাঘিনী মানুষের গলায় কথা বলে, একটি সাপ হঅ্’বিকে এক চুংগা দুধ দেয়, রাজপুত্র তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, আর ধঅ্’বি হিংসায় জ্বলে।

শেষে একটি কিংবদন্তি জুড়ে দেওয়া হয়: “আমাদের দেশে যে হলুদ পাখি দেখা যায়, হঅ্’বিই সে পাখি হয়ে এখনো আছে।”

গল্পটি পড়ুন →

৩. টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ

১,৩২০ শব্দ · বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান, চাকমা রুপকাহিনী · আর্ট: তৃপ্তা চাকমা · পাঠ্যবইয়ে সংযোজিত

ঝোপের পাতায় তৈরি বাসায় থাকে টুনটুনি, আর ঝোপের নিচের গর্তে কুনোব্যাঙ — “দু’জনের মধ্যে ভারি দোস্তি”। কুনোব্যাঙের মিথ্যে ঝড়ের খবরে টুনটুনি ঘর ছেড়ে ছোটে।

গল্পের শেষাংশে একটি বিচার ও শাস্তির দৃশ্য আছে, আর সেখান থেকে দুটি জিনিসের ব্যাখ্যা বেরোয়। জল্লাদের বেতের প্রতিটি ঘায়ে কুনোব্যাঙ ফুলে ওঠে আর তার গা বেয়ে “আঠার মত সাদা সাদা এক রকমের ক্ষীর” বেরোয়; পঁচিশ ঘা বেতে সেই ক্ষীর লেগে যায় যে কাঁঠাল গাছে তাকে বাঁধা হয়েছিল, তার গুঁড়িতেও।

গল্পের উপসংহার দুটি: সেই থেকে কুনোব্যাঙের গা খসখসে ঢিবি-ভরা, আর কাঁঠাল গাছে আঘাত দিলে সাদা ক্ষীর বেরোয়।

গল্পটি পড়ুন →

৪. তিন পাখির গপ্পো

৩৬৭ শব্দ · লেখক: বিধায়ক চাকমা (নবম শ্রেণী)

আর্কাইভের চাকমা গল্পগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্রতম, আর একমাত্র গল্প যার লেখক হিসেবে একজন স্কুলছাত্রের নাম ও শ্রেণি ছাপা আছে।

গল্পে তিন জাতের পাখি — ভিরেজ (পাঠে বাংলা অর্থ দেওয়া: ফিঙে), কাক ও চড়ুই। ভিরেজরা রাজা, কিন্তু কাকেরা তা মানে না, কারণ রাজা কাকদের চেয়ে চড়ুইদের বেশি স্নেহ করেন। দ্বন্দ্ব যুদ্ধে গড়ায়; চড়ুইরা সভা করে কাকদের পক্ষ নেয়।

শেষে ভিরেজ-রাজা দলবল নিয়ে জঙ্গল ছেড়ে যান, যাওয়ার আগে কাকদের কাছে অনুরোধ রেখে যান চড়ুইদের যত্ন করার। কাকেরা রাজি হয় — কিন্তু “দিন কয়েক পেরিয়ে যেতে না যেতেই কাকেরা আবার পুরানো স্বভাব বের করলো”।

গল্পটি শেষ হয় একটি প্রবাদে, যা পাঠে চাকমাদের প্রবাদ হিসেবেই উল্লিখিত: “চড়ুইদের পালানো, আর কাকদের তাড়ানো”।

গল্পটি পড়ুন →

৫. সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী

২,৩১৫ শব্দ · ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা

এই গল্পটি দশটির মধ্যে আলাদা, কারণ এটি কেবল একটি কাহিনি নয় — একটি সৃষ্টিকথা, আর তার সঙ্গে জুমচাষ শুরু হওয়ার ব্যাখ্যা।

শুরুর অবস্থাটি পাঠে তালিকা করে দেওয়া: “ছিল না বায়ু, রোদ, বৃষ্টি, আলো, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, পশু, পাখি এবং মানুষ। এমন কি ছিল না পৃথিবীও। ছিল কেবল অপার-অনন্ত স্থির জলরাশি এবং নিঃসীম অন্ধকার।”

তারপর গোজেন — পাঠের ব্যাখ্যায় ‘অর্থাৎ ঈশ্বর’ — সমুদ্রের ওপর একটি বিশাল বটগাছ সৃষ্টি করেন, তার কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে আসন করে ধ্যানে বসেন। সেই ধ্যানের সময় এক কাঁকড়া-দৈত্য সমুদ্রের তলা থেকে মাটি এনে বটগাছের শিকড় ঘিরে জমাতে থাকে — আর তা থেকেই স্থলভাগ তৈরি হয়।

গল্পের দ্বিতীয় অংশে মাহ লখী মা জুমচাষের ব্যবস্থা করে দিয়ে যান, আর যাওয়ার আগে বলে যান কোন ঘরে তিনি থাকেন আর কোন ঘরে থাকেন না — শর্তগুলো পাঠে নাম ধরে লেখা আছে। শেষে তিনি জানান, তিনি অদৃশ্যভাবে থাকবেন “ধানছড়া’ (অর্থাৎ ধানের শিষ) এবং ধান ও চালের ঝুড়িতে”।

গল্পটি পড়ুন →

৬. সাদা কাক কালো হল কেন

১,২১৭ শব্দ · ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা

একটি ধবধবে সাদা কাক পাকা শ্রীফল খেতে গেলে শ্রীফল আপত্তি করে — “ছিঃ ছিঃ, তোমার ঠোটটি এঁটো।” ঠোঁট ধুতে গেলে নদীর জল আপত্তি করে, হাঁড়ি চাইতে গেলে কুমোর শর্ত দেয়, আর এভাবে একটির পর একটি শর্তের শিকল তৈরি হয়।

গল্পের শেষে কাক আগুন নিয়ে উড়তে গিয়ে নিজেই জ্বলে ওঠে, আর প্রাণ বাঁচাতে কালো রঙের জলে ভরা গামলায় ডুব দেয়। সেই থেকে কাকের রঙ কালো।

আর শিকলটি শেষ হয় উল্টো দিক থেকে গুনে — আগুন পৌঁছায়নি, তাই কাস্তে বানানো হয়নি, ঘাস কাটা হয়নি, গাভীর ঘাস খাওয়া হয়নি… এবং শেষ পরিণতি: “কাকের আর কক্ষনো খাওয়া হলো না অমন লোভনীয় টকটকে লাল শ্রীফল।”

গল্পটি পড়ুন →

৭. দশ ক্ষুদে মুরগী ছানার প্রতিশোধ

১,০৫৭ শব্দ · ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা

একটি বুনো মুরগি এগারোটি ডিমে তা দেয়, আর একটি বুনো বিড়াল তার আস্তানা খুঁজে বের করে। পাঠে মুরগির সতর্কতা ও ভয়ের বর্ণনা আছে — সে বিড়ালের “মতিগতি আঁচ করতে পারে”, কিন্তু ডিম না ফুটিয়ে সরে যাওয়ার উপায় নেই।

গল্পের দ্বিতীয় অংশে দশটি ছানা মায়ের হত্যার প্রতিশোধ নেয় — নিজে লড়ে নয়, বাড়ির জিনিসপত্র ও প্রাণীদের সঙ্গে জোট বেঁধে। পচা শসায় পা পিছলে বিড়াল চৌকাঠে পড়ে, সেখানে মুগুর তৈরি হয়েই ছিল, তারপর উঠোনে কুকুরের সামনে।

শেষে ছানারা লাউয়ের খোল থেকে বেরিয়ে এসে দেখে বিড়ালের নিথর দেহ, আর “সহযোগী বন্ধুদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারা নিজেদের আস্তানায় ফিরে গেল”।

গল্পটি পড়ুন →

৮. বাঘ ও শামুকের দৌড় প্রতিযোগিতা

৭৯৭ শব্দ · ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা

গল্পটি শুরু হয় একটি ভূমিকা দিয়ে, যা বিরল — কথক নিজেই স্বীকার করেন বিষয়টি অবিশ্বাস্য শোনায়, কারণ “প্রতিযোগিতা সাধারণত হয়ে থাকে প্রায় সমান সমান দুই শক্তিধরের মধ্যে”, অথচ এখানে বাঘের সঙ্গে “একরত্তি শামুকের”।

কৌশলটি গল্পের কেন্দ্রে, আর পাঠ থেকে স্পষ্ট: বাঘ যতবার দৌড়ে থেমে হাঁক দেয়, ততবার দশ-বারো হাত দূর থেকে অন্য একটি শামুক সাড়া দেয়। অর্থাৎ শামুকেরা জায়গায় জায়গায় ছড়িয়ে থাকে।

শেষ দৌড়ে বাঘ প্রায় একশো হাত যায়, আর তবুও সাড়া আসে সামনের দিক থেকে। তখন সে “কিংকর্তব্যবিমূঢ়” হয়ে লেজ বাঁকিয়ে বনের গভীরে পালায়, আর কোনোদিন সেই ঝরনার দিকে পা বাড়ায় না।

গল্পটি পড়ুন →

৯. শিয়ালনীর উপস্থিত বুদ্ধি

১,২৯২ শব্দ · ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা

গল্পের শুরু একটি ব্যবহারিক সমস্যায় — এক শিয়াল-শিয়ালনীর জুটি নতুন, তাই তাদের “নির্দিষ্ট কোনো আস্তানা নেই”, আর শিয়ালনীর প্রসবের দিন ঘনিয়ে এসেছে। গর্ত খুঁজতে বেরিয়েই তার প্রসববেদনা শুরু হয়।

শেষাংশে শিয়ালনীর বুদ্ধিতে বাঘ ও বানরের লেজ একসঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। বানর চিৎকার করে বাঘকে সতর্ক করে — “ও মামা, শিয়ালনী মিথ্যে কথা বলছে” — কিন্তু বাঘ থামে না।

গাছের গুঁড়িতে আটকে গিয়ে বাঁধন খুলে যায়; বাঘ পালায়, বানর ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে থাকে, আর শিয়ালনী “বেজায় হাসতে হাসতে পেটে খিল” ধরায়।

গল্পটি পড়ুন →

১০. সনার চিঝির পশ্চন — মেঘঅ পিধে

৭৯২ শব্দ · আলোময় চাকমা, ২৮.০৬.২০১৭ · চাকমা ভাষায়

এই পাঠটি বাংলা নয় — চাকমা ভাষায় লেখা, বাংলা লিপিতে। শিরোনামের পশ্চন শব্দের অর্থ পাতাটিতেই বন্ধনীতে দেওয়া আছে: শিশুতোষ গল্প।

বিষয়টি বোঝা যায় শিরোনাম থেকেই — মেঘঅ পিধে, অর্থাৎ মেঘের পিঠে। পাঠে এক শিশু মেঘের রঙের তালিকা দেখে: “রাঙাঁ মেঘ, রাঙুঁচ্যে মেঘ, ধুব মেঘ, ধোলোচ্যে মেঘ”। শেষে ঘুম ভাঙলে দেখা যায় বাইরে বৃষ্টির শব্দ।

এই একটি পাঠ আর্কাইভের চাকমা সংগ্রহকে আলাদা করে দেয়: দশটি গল্পের নয়টি বাংলায়, একটি চাকমা ভাষায়।

পাঠটি পড়ুন →

সৃষ্টিকথার পূর্ণ ধারা: গোজেন, কেদুগা, বিয়াত্রা, মাহ লখী মা

আর্কাইভের চাকমা সেটের সবচেয়ে ঘন পাঠটি সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী, কারণ এটি একটি গল্প নয় — পরপর কয়েকটি পর্বে সাজানো একটি ধারা, যার শুরু শূন্যতায় আর শেষ জুমের ধান কাটায়।

পর্বগুলো পাঠ থেকে ধরে ধরে তোলা যায়।

প্রথম মানব ও মানবী। বটগাছের আসনে ধ্যানরত গোজেন একজনকে দেখে পরপর তিনবার প্রশ্ন করেন, তিনবারই উত্তর নেই। তারপর বুঝতে পারেন “এতো নিজেরই ছায়া”। সেই ছায়াকে প্রাণ দিয়ে নাম দেন কেদুগা — পৃথিবীর প্রথম মানব। এরপর সঙ্গিনীর প্রয়োজনে নিজের শরীরের ময়লা (পাঠে চাকমা শব্দ ড্রিং) থেকে সৃষ্টি করেন কেদুগী।

প্রথম দুর্ভিক্ষ। বংশ বাড়ে, বহু বছর কাটে, তারপর নামে প্রচণ্ড হিমপাত। ফলবান গাছ কমে যায়, আর দেখা দেয় কভাৎ — পাঠে অর্থ দেওয়া: মন্বন্তর।

প্রথম দেবতা, আর একটি অভিশাপ। গোজেন পাঠান কালেইয়্যা দেবতাকে। হিমপাত থামে, কিন্তু দুর্ভিক্ষ থামে না। দেবতা গাছেদের জিজ্ঞেস করেন কে কতদিন প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতে পারবে; সুস্বাদু ফলের গাছেরা বলে এক-দু’মাস বা এক বছর, আর জঘনা প্রজাতির গাছেরা বলে “আমরা চিরকাল এদের বাঁচিয়ে রাখতে পারবো”। কিন্তু এক-দু’মাসেই সব জঘনা ফল শেষ হয়ে যায়। রেগে গিয়ে দেবতা জঘনা গাছদের অভিশাপ দেন — সেই থেকে জঘনা ফল মানুষের অখাদ্য।

দ্বিতীয় দেবতা, আর প্রথম প্রযুক্তি। এরপর আসেন গঙ্গাপুত্র বিয়াত্রা। তিনি ফলাহারের বাইরে ভুট্টা, যব ও জোয়ার খাওয়ার ব্যবস্থা চালু করেন, আর মানুষকে শেখান আগুনের ব্যবহার ও গৃহ নির্মাণের কৌশল।

আমন্ত্রণের দুই রকম ফল। স্বর্গ থেকে মাহ লখী মা-কে আনার জন্য প্রথমে যান কালেইয়্যা। আপ্যায়নের মদ্য ও ভাং তিনি গ্রহণ করে মাতাল হয়ে পড়েন, আর মাহ লখী মা-কে কখনো ‘মা’ কখনো ‘দিদি’ ডাকতে থাকেন — তাতে তিনি যেতে রাজি হন না। পরে যান বিয়াত্রা; তিনিও আপ্যায়ন গ্রহণ করেন, কিন্তু পান করেন না, লুকিয়ে এক কোণায় রেখে দেন। তাতে মাহ লখী মা প্রসন্ন হয়ে তাঁর সঙ্গে পৃথিবীতে আসতে সম্মত হন।

দুধ-সাগর পার। পথে পড়ে বিশাল এক দুধ-সাগর। বিয়াত্রা আগেই পাড়ে রেখে এসেছিলেন একটি কাঁকড়া, একটি শুকর ও একটি মাকড়সা। কাঁকড়া ভাসে, শুকর তার পিঠে দাঁড়ায়, মাকড়সা পেটের আঁশ দিয়ে এপার-ওপার বেঁধে দেয়, আর মে-মে ছাগলী পাখিটি মাহ লখী মা-কে পিঠে নিয়ে শুকরের পিঠে গিয়ে বসে।

চারটি বর। পার হয়ে মাহ লখী মা প্রত্যেককে একটি করে বর দেন, আর সেই চারটি বরই উৎপত্তি-ব্যাখ্যা: কাঁকড়া জলে-স্থলে সমানভাবে চলতে পারবে; শুকর পশুকুলে সবচেয়ে বেশি চর্বির অধিকারী হবে; মাকড়সার পেটের আঁশ কখনো ফুরোবে না; আর বিয়াত্রা দেবপূজায় সবার আগে পূজা পাবেন।

পেঁচা ও কাঠঠোকরা। আগমনের খবর রাতভর উড়ে উড়ে ছড়ায় পেঁচা — কু-লু-লু, কু-লু-লু শব্দে। ভোরে সে একটু বিশ্রামে ঝোপের আড়ালে বসে, আর গ্রামবাসীরা সোনার টোপর নিয়ে বেরিয়ে ভুল করে পরিয়ে দেয় একটি কাঠঠোকরাকে। পেঁচার স্বগতোক্তিটি গল্পের সবচেয়ে মানবিক লাইন — সারারাতের পরিশ্রম গেল, আর “একটুখানি অলসতার দরুণ” টোপর পেল অন্য পাখি।

মাহ লখী মা যে শর্ত দিয়ে গিয়েছিলেন

গল্পের শেষাংশে মাহ লখী মা জুমের মাঝখানে একটি উঁচু মঞ্চে উঠে আত্মপরিচয় দেন, জুমচাষের প্রতিটি পর্ব বিস্তারে বর্ণনা করেন, আর তারপর শর্ত দিয়ে যান — কোন ঘরে তিনি থাকবেন আর কোন ঘরে থাকবেন না।

পাঠ অনুযায়ী তিনি কেবল সুগৃহিনী ও সৎচরিত্র ব্যক্তিদের ঘরেই অবস্থান করেন। যে ঘরে তিনি থাকেন না, তার তালিকাটিও নাম ধরে দেওয়া: যে নারী কটুভাষী, হিংসা-পরায়ণ, পতিভক্তিহীন বা দুশ্চরিত্রা; আর যে পুরুষ অলস, মদ্যপ, জুয়ায় আসক্ত, ব্যভিচারী বা পরনারী হরণকারী।

তালিকাটি লক্ষণীয়ভাবে দু’পক্ষের — নারী ও পুরুষ দুয়ের জন্যই শর্ত আছে। পাঠের ভাষা অবশ্য তার সময়ের, আর শর্তগুলো নীতিবাক্যের ছাঁদে লেখা।

একটি পাঠগত অসঙ্গতিও আছে, আর তা গোপন না করাই সৎ। শর্তের তালিকার মধ্যে একটি বাক্য ছাপা আছে এভাবে — “যে ঘরে সকাল-সন্ধ্যে অকথ্য ভাষা উচ্চারিত হয় সে ঘরে আমি থাকি।” আগের-পরের বাক্যগুলোর সঙ্গে এটি সোজা উল্টো দাঁড়ায়, তাই এটি সম্ভবত মুদ্রণ বা প্রতিলিপির একটি ভুল। [মূল মুদ্রিত বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]

বিদায়ের বাক্যটি দিয়ে গল্প শেষ হয়: তিনি স্বশরীরে আর থাকবেন না, তবে অদৃশ্যভাবে চিরকাল থাকবেন ধানছড়া — অর্থাৎ ধানের শিষ — এবং ধান ও চালের ঝুড়িতে।

আগাছার গর্ত: একটি নিষেধ আর তার পরিণতি

জুমচাষ শেখানোর পর্বে একটি ছোট উপকাহিনি আছে, যা পাহাড়ের চাষির একটি বাস্তব কষ্টকে গল্পে রূপ দেয় — নিড়ানি।

মাহ লখী মা জুমের আগাছা সাফ করে সেগুলো জুমের উত্তর প্রান্তের একটি বিরাট গর্তে ঢুকিয়ে মুখটি পাথর চাপা দিয়ে আসেন। পরে বুড়োকে জুম দেখতে পাঠানোর সময় একটি নিষেধ জুড়ে দেন — “তুমি কখনো জুমের উত্তর প্রান্তে যাবে না।”

কৌতূহলে বুড়ো নিষেধ অগ্রাহ্য করেন, গর্তের কাছে গিয়ে চাপা কান্নার শব্দ শুনে পাথরটি সরিয়ে দেন — আর আগাছারা “হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এসে সারা জুমক্ষেত জুড়ে” বসে পড়ে।

বুড়ির মন্তব্যটিই গল্পের উপসংহার: “বুড়ো, তুমি জুমচাষীদের জুম নিড়ানির কাজটা শুধু শুধু বাড়িয়ে দিয়ে এলে।” অর্থাৎ জুমে আজ যে আগাছা নিড়াতে হয়, তার দায় একটি লঙ্ঘিত নিষেধের।

পরদিন বুড়ি নিজে গেলে আগাছারা পালাতে থাকে, আর তিনি কিছু ধরে এনে আবার গর্তে পাথর চাপা দিয়ে আসেন — গল্পে তাই আগাছা পুরোপুরি নির্মূল হয় না, কেবল কমে।

‘কেন এমন হলো’ — উৎপত্তির গল্পের দল

দশটি গল্পের মধ্যে অন্তত চারটি একই কাজ করে: কোনো একটি জিনিস আজ যেমন, তেমন কেন হলো তার ব্যাখ্যা দেয়। লোককথার আলোচনায় এই ধরনকে উৎপত্তি-কাহিনি বলা হয়।

গল্পযা ব্যাখ্যা করে
সাদা কাক কালো হল কেনকাকের রঙ কালো কেন
টুনটুনি ও কুনোব্যাঙকুনোব্যাঙের গা খসখসে কেন; কাঁঠাল গাছে সাদা ক্ষীর কেন
চাকমা রূপকথা – অমগদ চাকমাভূতেদের আর দেখা যায় না কেন
হঅ্’বি আর ধঅ্’বিহলুদ পাখিটি কে
সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষপৃথিবী ও স্থলভাগ কীভাবে হলো; জুমচাষ কীভাবে এল

অর্থাৎ পাঁচটি গল্পে এই গঠন আছে — দশটির অর্ধেক। গল্পগুলো কেবল বিনোদনের নয়; প্রতিটি একটি কেন-র উত্তর দেয়।

লক্ষ করার মতো একটি ব্যাপার: টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ একটি গল্পে দুটি ব্যাখ্যা দেয় — একটি প্রাণীর, একটি গাছের।

‘দুর’ শব্দের দুই অর্থ, আর একটি অভিশাপ

আর্কাইভের চাকমা গল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অস্বাভাবিক মোড়টি একটি শব্দের দুই অর্থের উপর দাঁড়িয়ে আছে। হঅ্’বি আর ধঅ্’বি গল্পে পাঠ নিজেই ব্যাখ্যা করে দেয়: “চাকমা ভাষায় দুর বললে কচ্ছপকেও বোঝায়।”

ঘটনাটি এরকম। জলতেষ্টায় কাতর বুড়ো যখন খাচ্ছে, বুড়ি এসে ভাগ চায়; বিরক্ত বুড়ো “খেঁকী কুকুরের মত” খেঁকিয়ে ওঠে — “দুরর! দুরর! দুরর!” বাংলায় যা নিছক তাড়িয়ে দেওয়ার শব্দ।

কিন্তু গল্পে একটি শর্ত আগেই বসানো আছে: “সেকালটা ছিল সত্যযুগ, লোকের কথায় কথায় মুখের বাক্য ফলে যেত।” তাই বলার সঙ্গে সঙ্গেই বুড়ো আর বুড়ি দুজনেই কচ্ছপ হয়ে যায় — একটি গালি অনিচ্ছাকৃত অভিশাপে পরিণত হয়।

গঠনটির দিক থেকে এটি গল্পের কেন্দ্রীয় ইঞ্জিন, কারণ এর পরেই হঅ্’বি অভিভাবকহীন হয়ে পড়ে আর সৎমা-সৎবোনের অংশটি শুরু হয়। অর্থাৎ পুরো আখ্যানের ভার একটি শব্দের দ্ব্যর্থতার উপর।

এর একটি ব্যবহারিক ফলও আছে। গল্পটি বাংলায় পুরোপুরি অনুবাদ করা যায় না — চাকমা শব্দটি সরিয়ে দিলে কারণ-ফল সম্পর্কটিই উঠে যায়। সম্ভবত সেজন্যই সংকলনকারী শব্দটি রেখে পাশে ব্যাখ্যা বসিয়েছেন, বদলে দেননি।

পাহাড়ি ভাষাগুলোর লিপি ও শিক্ষার অবস্থা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা-য়।

শিকলের গল্প: একটি ঠোঁট ধোয়ার জন্য গোটা জগৎ

সাদা কাক কালো হল কেন গল্পটির গঠন বাকি নয়টির থেকে আলাদা — এটি একটি শিকল, যেখানে প্রতিটি সাহায্য পরের একটি শর্তের উপর নির্ভর করে।

শিকলটি গল্পের শেষে উল্টো দিক থেকে গুনে দেখানো হয়েছে, আর সেটিই পাঠ থেকে তোলা যায়: আগুন → কামার → কাস্তে → ঘাস → গাভী → দুধ → বাঘ → মোষ → শিং → মাটি খোঁড়া → কুমোর → হাঁড়ি → জল → ঠোঁট ধোয়া → শ্রীফল খাওয়া।

চৌদ্দটি ধাপ, আর একটি ধাপ আটকে গেলে পুরো শিকল ভেঙে পড়ে। গল্পের শেষ বাক্যে সেটাই ঘটে — কাকের ঠোঁট ধোয়া হয় না, তাই শ্রীফলও খাওয়া হয় না।

এই ধরনের শিকল-গঠন শিশুদের মুখস্থ করার জন্য সুবিধাজনক, কারণ প্রতিটি ধাপ পরেরটিকে মনে করিয়ে দেয়। [এই গঠনটির প্রচলিত পরিভাষা ও তুলনীয় উদাহরণ কোনো পঠিত উৎসে নেই — যাচাই প্রয়োজন]

যে পাঠটি বাংলা নয়: পশ্চন

আর্কাইভের চাকমা সংগ্রহের দশম পাঠটি চাকমা ভাষায়, আর তার শিরোনামে আছে একটি পরিভাষা — পশ্চন। পাতাটিতে বন্ধনীতে অর্থ দেওয়া: শিশুতোষ গল্প।

একই শব্দের আরেকটি রূপ আর্কাইভের তঞ্চঙ্গ্যা সংগ্রহে পাওয়া যায় — পচ্ছন — আর সেখানে পাঠের নিচে বাংলা অর্থ দেওয়া আছে সরাসরি: “পচ্ছন – রূপকথা”।

অর্থাৎ বাংলায় যাকে রূপকথা বলা হয়, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় তার নিজের শব্দ আছে। এই তথ্যটি সূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিরোনামে “রূপকথা” শব্দ না থাকলেও একটি পাঠ রূপকথাই হতে পারে।

পাহাড়ের ভাষাগুলোর অবস্থা ও লিপি নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা-য়।

বাঘ: আর্কাইভের ৩১টি গল্পে, নয়টি জনগোষ্ঠীর

জুমজার্নালের ১২৫টি লোককথার পাঠ ঘেঁটে দেখা যায়, বাঘ আছে ৩১টি গল্পে — অর্থাৎ প্রতি চারটির একটিতে — আর তা নয়টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর গল্পে ছড়ানো। চাকমা সেটে বাঘ আছে চারটিতে।

জনগোষ্ঠীবাঘ আছে যত গল্পে
ত্রিপুরা১১
চাকমা৪
খেয়াং৪
সাঁওতাল৩
গারো২
তঞ্চঙ্গ্যা২
মারমা২
ম্রো২
খাসিয়া১

চাকমা চারটিতে বাঘের ভূমিকা একরকম নয়। বাঘ ও শামুকের দৌড়-এ সে প্রতিযোগী আর পরাজিত; শিয়ালনীর উপস্থিত বুদ্ধি-তে সে প্রতারিত; সাদা কাক কালো হল কেন-তে সে শিকলের একটি ধাপ — দুধ চেয়ে নেওয়া হয় তার কাছে; আর হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তে বাঘিনী মানুষের গলায় কথা বলে।

চারটির অন্তত দুটিতেই বাঘ হারে, আর হারায় তার চেয়ে অনেক ছোট একটি প্রাণী — শামুক ও শিয়ালনী। পাহাড়ের গল্পে সবচেয়ে বড় শিকারি প্রাণীটি নিয়মিত বুদ্ধির কাছে হারছে, এই ধারাটি আর্কাইভের অন্য জনগোষ্ঠীর গল্পেও ফিরে ফিরে আসে।

কোন গল্পে কোন প্রাণী

দশটি গল্পের নয়টিতেই প্রাণী আছে, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাণীরাই প্রধান চরিত্র। একমাত্র ব্যতিক্রম চাকমা ভাষার পাঠটি, যেখানে কোনো প্রাণী নেই — আছে মেঘ।

গল্পপাঠে যে প্রাণীরা আছে
হঅ্’বি আর ধঅ্’বিবাঘ, কাক, মুরগি, কচ্ছপ, সাপ, হাতি, কুকুর, হরিণ, পাখি
সাদা কাক কালো হল কেনকাক, বাঘ, হাতি, মোষ, গাভী
টুনটুনি ও কুনোব্যাঙকুনোব্যাঙ, টুনটুনি, সাপ, মুরগি, হরিণ
সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষকাঁকড়া, শুকর, মাকড়সা, পেঁচা, কাঠঠোকরা, মে-মে ছাগলী
দশ ক্ষুদে মুরগী ছানার প্রতিশোধবুনো মুরগি, বুনো বিড়াল, কুকুর, কাঁকড়া
শিয়ালনীর উপস্থিত বুদ্ধিশিয়াল, শিয়ালনী, বাঘ, বানর
বাঘ ও শামুকের দৌড়বাঘ, শামুক
তিন পাখির গপ্পোভিরেজ (ফিঙে), কাক, চড়ুই
চাকমা রূপকথা – অমগদ চাকমাদাঁড় কাক (শেষে), কাঁকড়া (ছুতো হিসেবে)
সনার চিঝির পশ্চন—

তালিকায় কাক সবচেয়ে বেশিবার — পাঁচটি গল্পে, আর দুটিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। একটিতে তার রঙের ব্যাখ্যা আছে, আরেকটিতে ভূত মরে কাক হয়ে পড়ে থাকে, আর আরেকটিতে কাকেরা রাজার আদেশ মানে না।

যাঁরা ছবি এঁকেছেন

দশটি গল্পের মধ্যে তিনটিতে ছবির শিল্পীর নাম ছাপা আছে।

  • তৃপ্তা চাকমা — হঅ্’বি আর ধঅ্’বি ও টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ। পাঠে ছবির নিচে ক্যাপশনসহ কৃতিত্ব দেওয়া, যেমন “আর্ট: তৃপ্তা চাকমা”।
  • অমগদ চাকমা — একই নামের গল্পে তিনটি ছবির কৃতিত্ব, ক্যাপশনসহ: “ছবি ১ঃ অমগদ চাকমা — ভূতেরা কিন্তু তক্কে তক্কে থাকে”।

ক্যাপশনগুলো নিজেই পড়ার মতো, কারণ সেগুলো গল্পের মুহূর্ত ধরে রাখে — “উঁ-হু — ভূতটার কিন্তু দেখা নেই ধারে কাছে”, কিংবা “হঅ্’বির অপরূপ সৌন্দর্য দেখে কুমারও মুগ্ধ হয়ে গেল”।

বাকি সাতটি গল্পে শিল্পীর নাম পাঠে নেই।

গল্পের ভেতরে চাকমা শব্দ, বাংলা অর্থসহ

গল্পগুলোর একটি অভ্যাস লক্ষণীয় — চাকমা শব্দ বদলে বাংলা শব্দ বসানো হয়নি; শব্দটি রেখে পাশে বা নিচে বাংলা অর্থ দেওয়া হয়েছে।

শব্দপাঠে দেওয়া অর্থকোথায়
তাগল্‌দাঅমগদ চাকমা
রুপেকচ্ছপহঅ্’বি আর ধঅ্’বি
কার্পাসজুম্ম তুলোহঅ্’বি আর ধঅ্’বি
রংরাংধনেশের মতো অতিকায় পাখি (King hornfil)টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ
ভিরেজফিঙেতিন পাখির গপ্পো
নাবালাংদাড়কিনাবাঘ ও শামুকের দৌড়
ড্রিংময়লাসৃষ্টির আদিকথা
ধানছড়াধানের শিষসৃষ্টির আদিকথা
পশ্চনশিশুতোষ গল্পমেঘঅ পিধে
মেইয়্যা শাক“অনেকটা মুলো শাকের মত। খাওয়া যায়, তবে মুলো হয় না”অমগদ চাকমা
তাল’দাসৃষ্টির আদিকথা
লেই’বেতের ঝুড়িসৃষ্টির আদিকথা
কভাৎমন্বন্তরসৃষ্টির আদিকথা
মে-মে ছাগলী“এক ধরনের ছোট্ট পাখি”সৃষ্টির আদিকথা
ড্রিং(শরীরের) ময়লাসৃষ্টির আদিকথা

তালিকাটি থেকে একটি কথা বেরিয়ে আসে: গল্পগুলো অনুবাদ নয়, দ্বিভাষিক পাঠ। একই শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ জানা থাকলেও মূল শব্দটি রাখা হয়েছে, আর অর্থ বসানো হয়েছে পাশে — যেমন তাগল্‌ ও তাল’ দুটোই একই জিনিস বোঝায়, কিন্তু দুই গল্পে দুই বানানে।

লক্ষণীয়, মে-মে ছাগলী-র নামে ‘ছাগলী’ থাকলেও পাঠে একে ছাগল বলা হয়নি — বন্ধনীতে লেখা আছে “এক ধরনের ছোট্ট পাখি”, আর গল্পে প্রাণীটি উড়ে গিয়ে শুকরের পিঠে বসে।

কথকের স্বর: সংলাপ, সম্বোধন আর বিরতির চিহ্ন

দশটি পাঠের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো লিখিত গল্পের চেয়ে বলা গল্পের মতো শোনায় — সংলাপে ভারী, আর পাঠককে সরাসরি সম্বোধন করে।

সংলাপের ঘনত্ব গুনে দেখা যায়। হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তে উদ্ধৃতিচিহ্নে ঘেরা সংলাপ ঊনপঞ্চাশ জায়গায়; শিয়ালনীর উপস্থিত বুদ্ধি-তে তেইশ; টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ-এ চৌদ্দ; অমগদ চাকমা-য় তেরো। অথচ দশ ক্ষুদে মুরগী ছানার প্রতিশোধ ও সাদা কাক কালো হল কেন-তে উদ্ধৃতিচিহ্নযুক্ত সংলাপ একটিও নেই — ওখানে সবই বর্ণনা।

বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের সংকলন থেকে আসা তিনটি পাঠে একটি আলাদা মুদ্রণ-অভ্যাস চোখে পড়ে: লম্বা বিন্দু-সারি দিয়ে বিরতি বোঝানো, যেমন “সদয় হয়ে রাজা বললেন, ……… ‘যা ব্যাটা…’”। মুখে বলার সময় কথক যেখানে থামেন, ছাপায় সেখানে বিন্দু বসেছে।

পাঠককে সম্বোধনও আছে। টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ-এ শাস্তির দৃশ্যের আগে কথক জিজ্ঞেস করেন — “তারপর আর কী …………?” আর বাঘ ও শামুকের দৌড় শুরুই হয় কথকের নিজের সন্দেহ দিয়ে, যেন শ্রোতার আপত্তি আগেই মেনে নেওয়া হচ্ছে।

ধ্বনি-অনুকরণও পাঠে রাখা হয়েছে — দা শান দেওয়ার শব্দ “কেজেরেখ্‌, কেজেরেখ্‌”, পেঁচার “কু-লু-লু”, আর ভূতের মুন্ডু ওড়ার “ঘ্যাচাং”।

দীর্ঘতম ও ক্ষুদ্রতম

দশটি গল্পের আকারের ফারাক অনেক বড় — দীর্ঘতমটি ক্ষুদ্রতমটির প্রায় চৌদ্দ গুণ।

গল্পশব্দউৎস
হঅ্’বি আর ধঅ্’বি৫,৩৫৭চাকমা রুপকাহিনী
সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ২,৩১৫ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা
টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ১,৩২০চাকমা রুপকাহিনী
শিয়ালনীর উপস্থিত বুদ্ধি১,২৯২ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা
অমগদ চাকমা১,২৪৩চাকমা রুপকাহিনী
সাদা কাক কালো হল কেন১,২১৭ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা
দশ ক্ষুদে মুরগী ছানার প্রতিশোধ১,০৫৭ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা
বাঘ ও শামুকের দৌড়৭৯৭ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা
সনার চিঝির পশ্চন৭৯২আলোময় চাকমা
তিন পাখির গপ্পো৩৬৭বিধায়ক চাকমা (নবম শ্রেণী)

একটি ধারা দেখা যায়: বই থেকে আসা তিনটি গল্পের দুটি সবচেয়ে বড়গুলোর মধ্যে, আর সবচেয়ে ছোটটি একজন ছাত্রের লেখা। মুখে বলা গল্প লিখিত সংকলনে গেলে সাধারণত দীর্ঘ হয় — তবে এই দশটি নমুনা থেকে সেরকম কোনো সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

জুমজার্নালে চাকমা রূপকথা কতটি আছে?

রূপকথা বিভাগে চাকমা গল্পের সংখ্যা দশ। এর মধ্যে চারটির শিরোনামে “চাকমা রূপকথা”, পাঁচটিতে “চাকমা লোককথা”, আর একটিতে চাকমা ভাষার শব্দ “পশ্চন”। দশটির লিংক এই পাতায় এক জায়গায় আছে।

চাকমা রূপকথাগুলো কোন বই থেকে এসেছে?

তিনটি এসেছে বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের চাকমা রুপকাহিনী (২০০০, রাঙামাত্যা) থেকে — অমগদ চাকমা, হঅ্’বি আর ধঅ্’বি, এবং টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ। পাঁচটির শেষে লেখা আছে ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা। একটির লেখক বিধায়ক চাকমা (নবম শ্রেণী), আর একটির আলোময় চাকমা।

কোন চাকমা রূপকথা পাঠ্যবইয়ে ছিল?

টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ। গল্পের পাতার শেষে লেখা আছে — “এই রূপকথাটি বাংলাদেশের কারিকুলামের বাংলা বইয়ে সংযোজিত হয়েছিল।” কোন শ্রেণির বইয়ে বা কোন সালে, সেই তথ্য পাতাটিতে নেই।

চাকমা সৃষ্টিকথায় কী আছে?

সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী অনুযায়ী শুরুতে ছিল কেবল স্থির জলরাশি ও নিঃসীম অন্ধকার। গোজেন — পাঠে ‘অর্থাৎ ঈশ্বর’ — সমুদ্রের ওপর একটি বটগাছ সৃষ্টি করে তার পাতায় আসন গেড়ে ধ্যানে বসেন, আর এক কাঁকড়া-দৈত্য সমুদ্রতল থেকে মাটি এনে শিকড় ঘিরে জমিয়ে স্থলভাগ তৈরি করে।

জুমচাষ শুরু হওয়ার গল্প কোনটি?

একই গল্পের দ্বিতীয় অংশে। পাঠ অনুযায়ী মাহ লখী মা বিয়াত্রা দেবতার আমন্ত্রণে মানুষের অন্নসংস্থানের জন্য পৃথিবীতে এসে জুমচাষের ব্যবস্থা করে দিয়ে যান, আর যাওয়ার আগে বলেন তিনি অদৃশ্যভাবে থাকবেন ধানের শিষ এবং ধান ও চালের ঝুড়িতে।

‘পশ্চন’ শব্দের অর্থ কী?

আর্কাইভের পাতায় বন্ধনীতে অর্থ দেওয়া আছে “শিশুতোষ গল্প”। একই শব্দের আরেকটি রূপ পচ্ছন তঞ্চঙ্গ্যা একটি পাঠে পাওয়া যায়, আর সেখানে বাংলা অর্থ দেওয়া আছে সরাসরি — “পচ্ছন – রূপকথা”।

কোন চাকমা গল্পটি বাংলা ভাষায় নয়?

সনার চিঝির পশ্চন — মেঘঅ পিধে, লেখক আলোময় চাকমা, তারিখ ২৮.০৬.২০১৭। পাঠটি চাকমা ভাষায়, বাংলা লিপিতে লেখা। শিরোনামের অর্থ মেঘের পিঠে, আর ভেতরে মেঘের রঙের একটি তালিকা আছে।

কোন গল্পগুলো ব্যাখ্যা করে ‘কেন এমন হলো’?

অন্তত পাঁচটি — সাদা কাক কালো হল কেন (কাকের রঙ), টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ (কুনোব্যাঙের খসখসে গা ও কাঁঠালের সাদা ক্ষীর), অমগদ চাকমা (ভূত আর দেখা যায় না কেন), হঅ্’বি আর ধঅ্’বি (হলুদ পাখির পরিচয়), আর সৃষ্টির আদিকথা (পৃথিবী ও জুমচাষ)।

দীর্ঘতম চাকমা রূপকথা কোনটি?

হঅ্’বি আর ধঅ্’বি, ৫,৩৫৭ শব্দ — ক্ষুদ্রতমটির প্রায় চৌদ্দ গুণ। এটি বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের সংকলন থেকে, আর এর ছবি এঁকেছেন তৃপ্তা চাকমা।

ক্ষুদ্রতম কোনটি, আর কে লিখেছেন?

তিন পাখির গপ্পো, ৩৬৭ শব্দ। লেখক হিসেবে নাম ও শ্রেণি দুটোই ছাপা আছে — বিধায়ক চাকমা (নবম শ্রেণী)। গল্পটি শেষ হয় একটি চাকমা প্রবাদে: “চড়ুইদের পালানো, আর কাকদের তাড়ানো”।

গল্পগুলোর ছবি কারা এঁকেছেন?

দশটির তিনটিতে শিল্পীর নাম আছে। তৃপ্তা চাকমা এঁকেছেন হঅ্’বি আর ধঅ্’বি ও টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ-এর ছবি; অমগদ চাকমার নামে তিনটি ছবির কৃতিত্ব আছে একই নামের গল্পে। বাকি সাতটিতে শিল্পীর নাম পাঠে নেই।

চাকমা গল্প ‘ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা’ বইয়ে কেন?

ত্রিপুরা শব্দটি সেখানে একটি ভূখণ্ডের নাম — ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, যেখানে চাকমা জনগোষ্ঠীর বসবাস আছে। বইটি সেই রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর লোককথার সংকলন। একই বই থেকে আর্কাইভে মারমা, কলই ও হালাম গল্পও এসেছে।

চাকমা গল্পে বাঘ কতবার আছে?

চারটি গল্পে — হঅ্’বি আর ধঅ্’বি, সাদা কাক কালো হল কেন, বাঘ ও শামুকের দৌড়, এবং শিয়ালনীর উপস্থিত বুদ্ধি। আর্কাইভের ১২৫টি লোককথার পাঠে বাঘ আছে ৩১টিতে, নয়টি জনগোষ্ঠীর গল্প মিলিয়ে; সবচেয়ে বেশি ত্রিপুরা গল্পে — এগারোটি।

চাকমা লোককথায় প্রথম মানুষের নাম কী?

সৃষ্টির আদিকথা অনুযায়ী প্রথম মানব কেদুগা — গোজেনের নিজের ছায়াকে প্রাণ দিয়ে সৃষ্ট — আর প্রথম মানবী কেদুগী, যাঁকে গোজেন নিজের শরীরের ময়লা (চাকমা ভাষায় ‘ড্রিং’) থেকে সৃষ্টি করেন।

যা এখনো জানা যায়নি

  • ‘ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা’ বইটির লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশক — গল্পগুলোর পাঠে কেবল বইয়ের নাম আছে, আর কিছু নেই।
  • পাঠ্যবইয়ের তথ্য — টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ কোন শ্রেণির বইয়ে ও কোন সালে সংযোজিত হয়েছিল, তা পাতাটিতে নেই; কোনো পাঠ্যক্রম-নথি এই লেখার জন্য দেখা হয়নি।
  • ‘অমগদ’ শব্দের অর্থ — পাঠে শব্দটি বারবার উদ্ধৃতিচিহ্নে ব্যবহৃত, কিন্তু অর্থ কোথাও দেওয়া নেই।
  • মেইয়্যা শাক ও জঘনা — মেইয়্যা শাককে পাঠে মুলো শাকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আর জঘনাকে অভিশাপে অখাদ্য হওয়া ফল বলা হয়েছে; কিন্তু দুটিরই বাংলা বা বৈজ্ঞানিক পরিচয় কোনো পঠিত উৎসে নেই।
  • শর্তের তালিকার একটি উল্টো বাক্য — মাহ লখী মা-র শর্তের মধ্যে ছাপা একটি বাক্য আগের-পরের বাক্যের সঙ্গে সোজা বিপরীত; মূল মুদ্রিত বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়নি।
  • বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ানের বইটির পূর্ণ সূচি — বইয়ে মোট কতটি গল্প আছে, আর আর্কাইভে তার কতটি এসেছে, তা জানা যায়নি।
  • শিকল-গঠনের পরিভাষা — সাদা কাক কালো হল কেন-র চৌদ্দ-ধাপের গঠনটির প্রচলিত নাম ও তুলনীয় উদাহরণ কোনো পঠিত উৎসে নেই।
  • কথকের নাম — পাঁচটি গল্পে কেবল বইয়ের নাম আছে; কার মুখ থেকে গল্পটি লেখা হয়েছিল, তা নেই।
  • মার্‌পা ও চিনার — হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তে জুমের ফসলের তালিকায় এই দুটি নাম আছে, কিন্তু পাঠে অর্থ দেওয়া নেই।

তথ্যসূত্র

এই পাতার সব তথ্য জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত দশটি গল্পের নিজের পাঠ থেকে নেওয়া — শব্দসংখ্যা, উৎসের নাম, শিল্পীর নাম, পাদটীকা ও শব্দার্থসহ। প্রতিটি গল্পের লিংক উপরে তার নিজের অংশে আছে।

  1. বঙ্কিম কৃষ্ণ দেওয়ান, চাকমা রুপকাহিনী, ২০০০ ইং, রাঙামাত্যা (রাঙ্গামাটি) — তিনটি গল্পের পাঠে উদ্ধৃত উৎস।
  2. ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা — পাঁচটি গল্পের পাঠে উদ্ধৃত উৎস।
  3. বিধায়ক চাকমা (নবম শ্রেণী) — তিন পাখির গপ্পো-র লেখক হিসেবে পাঠে উল্লিখিত।
  4. আলোময় চাকমা, ২৮.০৬.২০১৭ — সনার চিঝির পশ্চন-এর লেখক ও তারিখ হিসেবে পাঠে উল্লিখিত।
  5. ছবির কৃতিত্ব: তৃপ্তা চাকমা (দুটি গল্প), অমগদ চাকমা (একটি গল্পে তিনটি ছবি) — পাঠে ক্যাপশনসহ উল্লিখিত।

চাকমা ভাষার শব্দ (পশ্চন, তাগল্‌, রুপে, ভিরেজ, রংরাং, নাবালাং, হঅ্’বি, ধঅ্’বি) ও সব ব্যক্তির নাম মূল রূপে রাখা হয়েছে। গল্পের সারকথা গল্পের নিজের পাঠ থেকে; কোনো ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন যোগ করা হয়নি। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।

প্রসঙ্গ:চাকমা, চাকমা রূপকথা, চাকমা লোককথা, রূপকথা, লোককথা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা