Last updated Oct 15th, 2026
1

পাহাড়ের লোককথায় ভূত নিছক ভয়ের উপকরণ নয়। জুমজার্নালের আর্কাইভের ১৪টি পাঠে ভূত বা প্রেত আছে, আর সেগুলোতে ভূতের সঙ্গে চলার নিয়মও আছে — কী দিয়ে ঠেকানো যায়, কখন তার শক্তি কমে, কীসে সে ভয় পায়, আর কীভাবে তাকে কাজে লাগানো যায়।
এই পাতায় সেই নিয়মগুলো একসঙ্গে সাজানো হলো — আটটি জনগোষ্ঠীর পাঠ থেকে, নাম ধরে ধরে।
আর একটি কথা শুরুতেই: আর্কাইভের ভূতেরা সবসময় শত্রু নয়। একটি পাঠ শেষ হয় এই বাক্যে — “ভূত হলেই দুষ্ট হয় না, ভদ্র ভূতও আছে।”
আর্কাইভের ১২৫টি পাঠের ১৪টিতে ভূত বা প্রেত আছে — অর্থাৎ প্রতি নয়টির একটিতে। আর তা আটটি জনগোষ্ঠীর গল্পে ছড়ানো।
গণনাটি শব্দ-সীমানা ধরে করা। অদ্ভুত বা কিম্ভুত ধরনের শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ তাদের ভেতরেও একই বর্ণক্রম থাকে কিন্তু অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা — আর এই শব্দগুলো আর্কাইভে ঘন ঘন ব্যবহৃত।
| জনগোষ্ঠী | যত পাঠে ভূত বা প্রেত আছে |
|---|---|
| খেয়াং | ৩ (একই গল্পের তিনটি কপি) |
| মারমা | ৩ |
| চাকমা | ২ |
| ত্রিপুরা | ২ |
| তঞ্চঙ্গ্যা | ১ |
| ম্রো | ১ |
| রাখাইন | ১ |
| সাঁওতাল | ১ |
খেয়াং তিনটি আসলে একই গল্পের তিনটি কপি — ঘুঘু পাখির গল্প, যেখানে শব্দটি একবার করে এসেছে। সেই হিসেবে আলাদা পাঠ ১২টি, আর কোনো একটি জনগোষ্ঠীর সংগ্রহে সর্বোচ্চ মারমা — তিনটি।
শব্দের ঘনত্ব আর উপস্থিতি অবশ্য আলাদা জিনিস। চারটি পাঠে শব্দটি ষোলোবারের বেশি, আর বাকি দশটিতে এক থেকে তিনবার — অর্থাৎ ভূত আসলে কাহিনির কেন্দ্রে আছে চারটি পাঠেই।
সেই চারটি পাঠ নিচে:
| পাঠ | জনগোষ্ঠী | শব্দ | যা আছে |
|---|---|---|---|
| চাকমা রূপকথা – অমগদ চাকমা | চাকমা | ১,২৪৩ | ভূত ঠেকানোর তিনটি উপায়, আর ভূত আর দেখা যায় না কেন |
| ভূতের কুকুর-ভীতি | ত্রিপুরা | ৫৭১ | মন্ত্র দিয়ে ভূত আনা, আর ভূত কুকুরকে ভয় পায় কেন |
| মারমা রূপকথা: ভূতের গল্প | মারমা | ১,১৩১ | দুটি আলাদা গল্প — একটি প্রেতের, একটি ভদ্র ভূতের |
| রাখাইন রূপকথা: ভূতের কাহিনী | রাখাইন | ৪৯৮ | ভূত দেখার উপায়, আর মানুষ তা হারাল কীভাবে |
শব্দ গুনে দেখলে ভূতের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি চাকমা অমগদ চাকমা-য় — ১,২৪৩ শব্দের পাঠে শব্দটি চুয়ান্নবার।
প্রতিটি জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সূচি আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।
আর্কাইভের ভূত-সংক্রান্ত পাঠগুলোর সবচেয়ে ব্যবহারিক দিক হলো নিয়ম। একটি পাঠে প্রতিরোধের তিনটি উপায় নাম ধরে দেওয়া, আর বাকিগুলোতে আরও কয়েকটি।
| প্রতিরোধ বা নিয়ম | কোন পাঠে |
|---|---|
| মশাল জ্বেলে নেওয়া — “আগুনকে নাকি ভূতেরা ভয় পায়” | চাকমা অমগদ চাকমা |
| মেইয়্যা শাক খাওয়া ও ঘরের পাশে বোনা | চাকমা অমগদ চাকমা |
| হাতে তাগল্ (দা) রাখা | চাকমা অমগদ চাকমা |
| রাতে কারও ডাকে সাড়া না দেওয়া | চাকমা অমগদ চাকমা |
| ভোর পর্যন্ত টিকে থাকা — ভোরে ভূতের শক্তি কমে | মারমা ভূতের গল্প |
| কুকুর — “ভূত সব সময় কুকুরকে ভয় পায়” | ত্রিপুরা ভূতের কুকুর-ভীতি |
তালিকাটি লক্ষণীয়ভাবে বাস্তব। ছয়টির চারটিই ঘরে বা হাতের কাছে থাকে — আগুন, একটি শাক, একটি দা আর একটি কুকুর।
চাকমা পাঠে ভূতের আচরণের নিয়মও দেওয়া আছে। সেকালে ভূতেরা “অত অদেখা হয়ে থাকত না, হর হামেশা তাদের দেখা যেত”, তাই সন্ধ্যার পর কেউ ঘর থেকে বেরোত না।
আর সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলটি সাড়া দেওয়া: “রাতের বেলা কেউ কাউকে ডাকলে কিংবা কারো ডাকে সাড়া দিলেই মুশকিল! তখন ঠিক ঐ মানুষ্টার রূপ ধরে নির্ঘাৎ একটা ভূত ঘরে এসে উঠবে।”
অর্থাৎ ভূতের প্রধান ক্ষমতা রূপ ধরা, আর তার প্রবেশপথ একটি কথার উত্তর।
চাকমা পাঠে সবচেয়ে বিস্তারিত নিয়মটি দা নিয়ে, আর তার ভেতরে একটি মোচড় আছে যা অন্য কোনো পাঠে নেই — আগুন একইসঙ্গে রক্ষা করে আর অস্ত্র নষ্ট করে।
প্রথম অংশটি সরল: “ভূতেরা মেলা ‘তাগল’ ভয় করে। যখন কারো হাতে ‘তাগল’ থাকে তখন সে একাই একশো ভূতের কাছে। ভূত আর তার কাছে ঘেঁষেনা ভয়ে।” পাঠে শব্দটির অর্থও বন্ধনীতে দেওয়া — তাগল্ (দা)।
দ্বিতীয় অংশটি সতর্কবাণী, আর সেটিই আকর্ষণীয়: “কিন্তু খবরদার! হাতের ‘তাগল’ এ একটুখানি আগুন ঠেকিয়েছ কী মরেছ! তখন আর কিচ্ছু ভয় পাবে না ভূতেরা।”
কারণটিও দেওয়া: “আগুন ছোঁয়ালে ‘তাগল’ নাকি মরে যায় আর তা’ দিয়ে সারাদিন কোপালেও ভূতের কিচ্ছু হবেনা তাতে।”
অর্থাৎ নিয়মটি স্বতঃবিরোধী শোনায় — মশাল ভূত তাড়ায়, কিন্তু সেই আগুন দা-কে অকেজো করে দেয়। দুটি প্রতিরোধ একসঙ্গে ব্যবহার করা যায় না।
গল্পের চূড়ান্ত দৃশ্যেও এই নিয়মটি কাজ করে। বৌটার স্বামী সারা রাত অপেক্ষা করে, আর দা শান দেওয়ার শব্দটি পাঠে ধ্বনিসহ আছে — “কেজেরেখ্, কেজেরেখ্!” — আর শান দিয়ে “সাদা ঝক্ঝকে” ধার উঠলে তা শোবার ঘরে রেখে দেওয়া হয়।
পরিণতিটি এক কোপে — ভূতের মুন্ডু ধড় থেকে আলাদা হয়ে আসে। আর পরদিন লাশ দেখতে গিয়ে গ্রামের লোক পায় “শুধু একটা মরা দাঁড় কাক”, গলা দু’ভাগ করা।
একটি বিষয় লক্ষণীয়: গল্পে ভূতটিকে ধরা পড়ে একটি শরীরগত অসামঞ্জস্যে। সে কাঁকড়া ধরার অজুহাতে এক হাত গর্তে ঢুকিয়ে রাখে, আর চুলের ঝুঁটি ধরে তোলার পর দেখা যায় “কনুইয়ের উপরে কাটা হাতের বাকী অংশটা খালি সেখানে ঝুলছে”।
আর্কাইভের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধটি একটি শাক, আর পাঠে তার চেহারার বর্ণনাও দেওয়া আছে।
পাঠ অনুযায়ী আগুনের পরেই ভূতেরা ভয় করে মেইয়্যা শাক। আর চাকমাদের বিশ্বাস ছিল, “মেইয়্যা শাক যারা খায় তাদেরও ভূত কিছু করতে পারে না”।
তাই এটি কেবল খাওয়ার জিনিস ছিল না, একটি ব্যবস্থাও — “ভূত যাতে ধারে কাছে ঘেষতে না পারে তাই চাকমারা তখনকার দিনে মেলাই মেইয়্যা শাক বুনে দিত ঘরের আশে পাশে।”
আর পালানোর পথও সেটিই: ভূতের তাড়া খেলে “একবার যদি মেইয়্যা শাকের বনে ঢোকা যায়, তখন আর ভূতের বাপের সাধ্য নেই তাকে ধরে”।
গাছটির পরিচয় পাঠে তুলনা দিয়ে দেওয়া — “মেইয়্যা শাক অনেকটা মুলো শাকের মত। খাওয়া যায়, তবে মুলো হয় না।”
এই এক বাক্যে গাছটি চেনা যায় না, কিন্তু আলাদা করা যায় — মুলো শাকের মতো দেখতে, অথচ মুলো ধরে না।
[মেইয়্যা শাকের প্রচলিত বাংলা বা বৈজ্ঞানিক নাম কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
পাহাড়ের শাক-সবজি ও রান্না নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে।
মারমা ভূতের গল্প-এর প্রথম কাহিনিটি আর্কাইভের একমাত্র পাঠ যেখানে মানুষ ভূতের সঙ্গে সরাসরি কুস্তি লড়ে — আর জেতে একটি নিয়ম জানার কারণে।
পটভূমিটি জীবিকার। দুই গরিব বন্ধু ফাঁদ পেতে বন-মোরগ ধরত, আর “শামুক-ঝিনুক-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ” করত, নয়-দশ দিনের খোরাকি নিয়ে গভীর বনে যেত।
রাত কাটানোর জায়গা মেলে একটি বৌদ্ধ বিহারের বড় রান্নাঘরে, জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুর অনুমতিতে।
সন্দেহটি শুরু হয় একটি কণ্ঠে। শয়নকক্ষ থেকে ভেসে আসে — “এই তোরা চুক চুক করে কি চুষে খাচ্ছিস্, চুক চুক চুক আমাকে একটু দে।”
আর শনাক্তকরণের যুক্তিটি পাঠে দেওয়া, আর তা সাংস্কৃতিক: তারা জানে ভিক্ষুরা রাতে খান না — তাই এটি ভিক্ষু নয়, প্রেত।
এরপর একটি বিরাট জিহ্বার অগ্রভাগ রান্নাঘরে ঢোকে, আর তারা একের পর এক দিতে থাকে — শামুক, তারপর ঝিনুক, তারপর কাঁকড়া।
শামুক-ঝিনুক শেষ হলে কৌশলটি শুরু হয়, আর সেটিই গল্পের বুদ্ধি। তারা জানত ভোর হলে ভূত-প্রেতের শক্তি কমে আর মানুষের শক্তি বাড়ে — তাই মোরগটি তারা অল্প অল্প করে দিতে থাকে: প্রথমে পালক, পরে চামড়া, পরে মাংস।
লড়াইয়ের পরিকল্পনাটিও একই নীতির: দু’জন একসঙ্গে লড়বে না, লড়বে পালাক্রমে — একজন ক্লান্ত হলে অন্যজন নামবে, আর প্রথমজন জল খেয়ে হাতমুখ ধুয়ে তাজা হয়ে নেবে।
ফলটি গাণিতিক: “দুই বন্ধুর কেউই ক্লান্ত হলো না।” আর ভোর যত এগোয়, “একাকী ভূত ক্লান্ত হতে লাগল, শক্তি কমে যেতে লাগল”।
সমাপ্তিটি মুক্তিপণের — ভূত সোনার ও রূপার পাতিল দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, সিঁড়ির গোড়ায় মাটির নিচে পোঁতা। এক বন্ধু গিয়ে যাচাই করে আসে, তারপর সূর্য ওঠার পর ভূতকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পাঠে ছবির কৃতিত্বও আছে — ছবি তোষন চাকমা।
ত্রিপুরা ভূতের কুকুর-ভীতি ৫৭১ শব্দের, আর তার পুরো কাঠামো একটি অসম্ভব কাজের উপর দাঁড়ানো — কুকুরের বাঁকা লেজ সোজা করা।
শুরু একটি অনুরোধে। এক জুমিয়া ওচাই-য়ের কাছে মন্ত্র শিখতে চায়, আর পাঠে শব্দটির অর্থও দেওয়া: “ওচাই হল গ্রামের পুরোহিত।”
ভূতের কৌশলগুলো একের পর এক, আর প্রতিটিই যৌক্তিক। প্রথমে সে দু’হাতে লেজটি ধরে সোজা করে — ছেড়ে দিলেই আবার বাঁকা। তারপর দড়ি দিয়ে বেঁধে কিছুদিন রেখে দেয় — বাঁধন খুললেই আবার বাঁকা। তারপর একটি বাঁশের চোঙে ঢুকিয়ে রাখে — বের করলেই আগের মতো।
তিনটি চেষ্টাই ব্যর্থ, আর তিনটিই আলাদা পদ্ধতির — হাত, দড়ি, আর একটি ছাঁচ।
তারপর ভূতের মনে পড়ে শর্তটি, আর ভয় পেয়ে সে পালায় — “তারপর আর কখনো ফিরে আসেনি।”
শেষ বাক্যটি একটি বিশ্বাসের জন্ম: “এরপর থেকে তারা বিশ্বাস করে, ভূত সব সময় কুকুরকে ভয় পায়।”
গল্পের বুদ্ধিটি দ্বিস্তর। জুমিয়া ভূতকে হারায় না — সে ভূতের নিজের শর্তের ছাঁচেই একটি পাল্টা শর্ত বসিয়ে দেয়, আর তারপর একটি অসম্ভব কাজ দেয়।
এই গঠনটি আর্কাইভে আরেক জায়গায়ও আছে — বাঘ ও শূকরের মিতালি-তে পেঁচা বাঘের যুক্তিটিই বিচারকের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেয়।
আর্কাইভে ভূতকে কাজে লাগানোর পদ্ধতিও আছে, আর তা সংখ্যা ধরে দেওয়া — এক হাজার বার মন্ত্র পড়তে হবে।
ওচাই প্রথমে রাজি হন না, কিন্তু নাছোড়বান্দা জুমিয়ার অনুরোধে শিখিয়ে দেন, আর শর্তটিও বলে দেন: “এক হাজার বার মন্ত্র পড়লেই একটি ভূত এসে হাজির হবে। সে তোমার সব কাজ করে দিবে।”
ভূতের আত্মপরিচয়টি সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক — “প্রভু আজ থেকে আমি আপনার ভৃত্য। হুকুম করুন মালিক।” আর প্রতিশ্রুতি: কোনো সময় নষ্ট না করে সব আদেশ “অক্ষরে অক্ষরে” পালন।
কিন্তু চুক্তিতে একটি শর্ত আছে, আর সেটিই গল্পের ফাঁদ: “আপনি যদি আমাকে কাজ দিতে না পারেন, তবে আমি আপনার ঘাড় মটকাব।”
জুমিয়া শর্তটি হালকাভাবে নেয়, কারণ তার ধারণা কাজের অভাব হবে না। আর তারপরই সমস্যাটি স্পষ্ট হয়।
কাজগুলো পাঠে ক্রমানুসারে দেওয়া, আর সবই জুমজীবনের: জুমখেত পরিষ্কার করা, মাঠ থেকে বাঁশ ও গাছ তুলে ফেলা, আর বাড়ি থেকে জুমখেত পর্যন্ত একটি সড়ক তৈরি করা।
প্রতিটিই ভূত “নিমিষে” শেষ করে ফেলে, আর ফিরে এসে আরও কাজ চায়। জুমিয়া তখন সত্যিকারের বিপদে — তার কাজ ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর শর্ত অনুযায়ী তার মানে মৃত্যু।
সমাধানটি তাই কঠিন কাজ দিয়ে নয়, অসম্ভব কাজ দিয়ে — আর সেটিও পাঠে উপস্থাপিত হয় “খুব সহজ একটি কাজ” হিসেবে।
রাখাইন ভূতের কাহিনী ৪৯৮ শব্দের, আর আর্কাইভে এটিই একমাত্র পাঠ যা ভূত দেখার পদ্ধতি দেয় — একটি নির্দিষ্ট গাছের একটি নির্দিষ্ট শিকড়।
পটভূমিটি একটি গ্রামের পথের ধারে একটি বটগাছ, আর সেখানে বাস করে এক ভূত পরিবার — মা, বাবা, এক বড় বোন আর এক ছোট ভাই।
দৃশ্যটি ঘরোয়া: মা-বাবা কাজে বাইরে, আর বড় বোন বটগাছের ডালে চার দিকে চারটি দড়ি দিয়ে বানানো দোলনায় “শ্লোক গেয়ে” ছোট ভাইকে ঘুম পাড়াচ্ছে।
ছোট ভাইয়ের ঘুম না আসায় বোনটি বিরক্ত হয়ে পথচারী একজনকে ডাক দেয় — “দাদা-দাদা, আপনি গ্রামে যাচ্ছেন বুঝি!” — কারণ সে মা-বাবাকে খবর পাঠাতে চায়।
লোকটি কিছু দেখতে পায় না, আর সেখানেই পদ্ধতিটি আসে। ভূত বলে, “লোকেরা আমাদেরকে দেখতে পায় না। আমাদেরকে দেখতে চাইলে আমার কথা মত করতে হবে।”
নির্দেশটি সুনির্দিষ্ট: “এ বটগাছের পূর্বদিকে প্রসারিত শিকড়টি কুড়িয়ে মুখে দিলে আমাকে দেখতে পাবে।”
লোকটি শিকড় খুঁজে পায় না, তাই ভূত নিজেই নেমে এসে তা হাতে দেয় — আর মুখে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে পুরো ভূত পরিবারটিকে দেখতে পায়।
কিন্তু উপকারটি সঙ্গে একটি বিপদও আনে। পথে সে দেখে ফেলে “এক দল ভূত মৃত মানুষের মাংস বন্টন করে চলেছে” — কারও হাতে দা, কারও হাতে ঝুড়ি, কারও মাথায় পাগড়ি।
আর পাঠে তুলনাটিও দেওয়া, যা দৃশ্যটিকে আরও ঠান্ডা করে তোলে: “লোকেরা যেমন গরু কিংবা শূকরের মাংস ভাগ করে খায়, তেমনি মানুষের লাশ পেলে ভূতরা খাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়।”
ভূতের দল তাকে দেখে ফেলে, আর তাদের উপলব্ধিটিই আক্রমণের কারণ — “লোকেরা আমাদেরকে দেখতে শিখেছে।”
আর্কাইভে একই প্রশ্নের দুটি আলাদা উত্তর আছে, আর দুটিই দুই জনগোষ্ঠীর পাঠে — মানুষ আজ ভূত দেখতে পায় না কেন।
রাখাইন ব্যাখ্যা: শিকড়টি হাতছাড়া হয়ে গেছে। হামলার সময় লোকটির মুখ থেকে বটের শিকড়টি পড়ে যায়। ঘটনাস্থলে ছুটে আসে একটি কুকুর আর উড়ে এসে বসে একটি কাক; কুকুর শিকড়টি মুখে নিয়ে কামড় দেয়, আর কাক তার অবশিষ্টাংশ নিয়ে যায়।
ফলাফল পাঠে স্পষ্ট: লোকটি আর ভূত দেখতে পায় না, কিন্তু কুকুর ও কাক ভূত দেখার শক্তি পেয়ে যায়। আর শেষ বাক্য — “সেদিন থেকে লোকেরা ভূতকে দেখতে পায় না।”
এই ব্যাখ্যাটি একইসঙ্গে দুটি জিনিস করে। এটি বলে কেন মানুষ ভূত দেখে না, আর কেন কুকুর ও কাক মাঝে মাঝে এমন কিছুর দিকে তাকিয়ে ডেকে ওঠে যা কেউ দেখতে পায় না।
চাকমা ব্যাখ্যা: ভূতেরা ভয়ে লুকিয়ে আছে। অমগদ চাকমা-র শেষে বলা হয়, সেই এক কোপের পর ভূতেরা ভয়ে লুকিয়ে গেছে, আর “এখন শুধু আড়ালে আবডালে ভূতের শব্দ সাড়া মিলে”।
পাঠে কারণটিও দেওয়া, আর তা হাস্যরসে মোড়া: “আসলে ভূতেরাই আর আগের মত বার হয়না ভয়ে। কী জানি কোথায় কোন ‘অমগদ’ চাকমা আছে আর একটুখানি কসুর হলেই অমনি ‘ঘ্যাচাং’।”
দুটি ব্যাখ্যার ফারাকটি কাঠামোগত। রাখাইন পাঠে মানুষ একটি ক্ষমতা হারিয়েছে; চাকমা পাঠে ভূতেরা নিজেরাই সরে গেছে। প্রথমটিতে দায় দুর্ঘটনার, দ্বিতীয়টিতে কৃতিত্ব মানুষের।
আর্কাইভে ভূতের জন্য আলাদা একটি শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে — প্রেত — আর তা মারমা পাঠে, একটি বৌদ্ধ বিহারের ভেতরে।
শব্দের পছন্দটি অর্থবহ। মারমা জনগোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, আর প্রেত বৌদ্ধ পরিভাষায় একটি নির্দিষ্ট অবস্থা — অতৃপ্ত ক্ষুধার্ত সত্তা।
গল্পে সেই ক্ষুধাই চরিত্রটির একমাত্র বৈশিষ্ট্য। সে কোনো হুমকি দেয় না, কোনো দাবি করে না — কেবল খেতে চায়, আর থামে না।
প্রবেশের ভঙ্গিটিও শরীরগত, যুদ্ধের নয়: একটি বিরাট জিহ্বার অগ্রভাগ রান্নাঘরে ঢোকে, “জলে ভেজা, লালসার জল টপটপ করে পড়ছে”। আর খাওয়ার শব্দ — “কট্টর মটর করে চিবিয়ে”।
চেহারার বর্ণনা আসে পরে, যখন সে বেরিয়ে আসে — “কালো বিরাট একটা কাঠের গুঁড়ির মত”, সারা শরীরে লম্বা লোম, আর “চোখ দুটো ফুটবলের মত জ্বল জ্বল করছে”।
লক্ষণীয়, গল্পে প্রেতটি বিহারের ভিক্ষুর শয়নকক্ষ থেকে ডাকে — অর্থাৎ পবিত্র জায়গাটিই তার আশ্রয়। আর শনাক্তকরণও সেই প্রসঙ্গেই: ভিক্ষুরা রাতে খান না, তাই রাতে যে খেতে চায় সে ভিক্ষু নয়।
পরিণতিতে সে ক্ষমা চায় — “আমায় ছেড়ে দে ভাই তোরা, আমাকে মাফ কর, ভাই” — আর মুক্তির বিনিময়ে সম্পদের ঠিকানা দিয়ে দেয়।
অর্থাৎ আর্কাইভের প্রেতটি ভয়ংকর, কিন্তু অপরাজেয় নয় — আর তার পরাজয়ের কারণ শক্তি নয়, ভোর।
আর্কাইভের ভূত-সংক্রান্ত পাঠগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত গল্পটি মারমা ভূতের গল্প-এর দ্বিতীয় অংশ, আর সেখানে কেউ কারও ক্ষতি করে না।
পরিস্থিতিটি সম্পূর্ণ সাধারণ। শীতকালের পড়ন্ত বেলায় একজন লাকড়ি বোঝাই নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরছে, আর তার একটি বিড়ি টানার ইচ্ছে — কিন্তু দেশলাই নেই।
আগুনের খোঁজেই দেখা। নদীর কিনারার এক ঢালু জায়গায় একজন আনমনে ধূমপান করছে, আর সে অনায়াসে আগুন দেয়।
সংলাপটি গল্পের সেরা অংশ, আর তা এগোয় কৌতূহল থেকে আতঙ্কে, ধীরে ধীরে। বিড়ির আলোয় মুখ দেখে লোকটি জিজ্ঞেস করে, আপনার মুখ কয়লার মতো কালো কেন?
উত্তরটি অকপট — “কয়লার মত কালো হবে না? আমাকে যে গতকাল পোড়ানো হয়েছিল।”
পরের দুটি প্রশ্নোত্তর পুরো গল্পটি ঘুরিয়ে দেয়। লোকটি ভাবে কেউ তাকে নিষ্ঠুরভাবে পুড়িয়েছে, আর ভূত তা সংশোধন করে দেয়: “না না কেউ নিষ্ঠুর ছিল না। আমি মরে গিয়েছিলাম, তাই।”
মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞেস করলে উত্তরটি বিরক্তির সুরে আসে — সাপে কামড়েছিল, “শুনেন নি?” — আর কী সাপ তা সে জানে না, কারণ “যদি দেখতাম, তাহলে কামড়াতে পাড়ত?”
সম্বিৎ ফেরে তখন, আর লোকটি আশপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারে — এটি শ্মশান।
পালানোর চেষ্টাটি ব্যর্থ হয় একটি ব্যবহারিক ভুলে: নৌকা মোটেও নড়ে না, কারণ রশি খোলা হয়নি। আর তখন ভূতটি যা করে, সেটিই গল্পের উপসংহার — “নিন নিন নৌকা ফেরাতে হবে না, আমিই রশিটা খুলে দিচ্ছি।”
শেষ ছবিটি শান্ত। অনেক দূরে গিয়ে ফিরে তাকিয়ে লোকটি দেখে, “ঐ লোকটা আনমনে বিড়ি কুঁকছে” — আর তখনই তার মনে হয়: “ভূত হলেই দুষ্ট হয় না, ভদ্র ভূতও আছে।”
আর্কাইভে একটি পাঠ নিজের বিষয়কে একটি বিদেশি চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করে — মারমা ফৌহ, যেখানে সরাসরি ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলার কথা এসেছে।
পাঠের শুরুতেই ড্রাকুলার বর্ণনা — দিনের বেলা কফিনে মৃতের মতো শুয়ে থাকা, আর রাতে বেরিয়ে পড়া। তারপর সেই ছাঁদেই ফৌহ-র পরিচয়।
তুলনাটির কাজ দুটি। এটি পাঠককে একটি চেনা ছবি দেয়, আর একইসঙ্গে ফৌহ-কে একটি আন্তর্জাতিক শ্রেণির ভেতরে বসায়।
আর্কাইভে এই ভঙ্গিটি আরেকবার আছে, আর তা-ও মারমা সংগ্রহেই — ন ক নিং পাঠে ঠক-চরিত্রটিকে গোপাল ভাঁড়, বীরবল ও হোজ্জা নাসিরুদ্দীনের পাশে বসানো হয়েছে। আর বম উসুর পাঠেও গোপাল ভাঁড়ের সঙ্গে তুলনা।
কিন্তু ফৌহ-র সবচেয়ে মূল্যবান অংশ তার শেষ কয়েকটি বাক্য, যা একটি স্বীকারোক্তি। এই বিশ্বাস ও কাহিনিগুলো পার্বত্যাঞ্চলের গ্রামে “লোকের মুখে মুখে প্রচলিত”, আর “অনুসন্ধান করা হলে অনেক কাহিনী জানা যাবে”।
অর্থাৎ লেখক নিজেই বলছেন সংগ্রহটি অসম্পূর্ণ — আর্কাইভে এমন স্বীকারোক্তি আর কোনো পাঠে নেই।
[ফৌহ-সংক্রান্ত বাকি কাহিনিগুলো আর্কাইভে আসেনি; সেই অনুসন্ধানের কোনো ফল কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি]
আর্কাইভের ভূতেরা কোনো অনির্দিষ্ট অন্ধকারে থাকে না। চারটি কেন্দ্রীয় পাঠে তাদের ঠিকানা নির্দিষ্ট, আর প্রতিটিই এমন জায়গা যেখানে মানুষ যায়।
| কোন পাঠে | ভূত কোথায় থাকে |
|---|---|
| রাখাইন ভূতের কাহিনী | গ্রামের পথের ধারে একটি বটগাছ — আর সেখানে একটি পুরো পরিবার |
| মারমা ভূতের গল্প (প্রথম) | একটি বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষুর শয়নকক্ষ |
| মারমা ভূতের গল্প (দ্বিতীয়) | নদীর কিনারার এক ঢালু জায়গা — পরে বোঝা যায় তা শ্মশান |
| চাকমা অমগদ চাকমা | জঙ্গল, আর রাতে ঘরের বেড়ার বাইরে |
| ত্রিপুরা ভূতের কুকুর-ভীতি | কোনো স্থির জায়গা নেই — মন্ত্রে ডাকলে হাজির হয়, কাজ শেষে অদৃশ্য |
তালিকার প্রথম তিনটি লক্ষণীয়, কারণ তিনটিই পথের ধারে — একটি গাছ, একটি বিহার, একটি নদীর ঘাট। অর্থাৎ ভূতের সঙ্গে দেখা হয় যাওয়ার পথে, খুঁজতে গিয়ে নয়।
আর তিনটিতেই মানুষটি একা, আর সন্ধ্যা বা রাত। রাখাইন পাঠে লোকটি বাড়ি ফিরছে; মারমা দুটিতে একজন নৌকায় ফিরছে আর দু’জন রাত কাটানোর জায়গা খুঁজছে।
চাকমা পাঠে ঘরটিই সীমানা। ভূত ঘরে ঢুকতে পারে না, কিন্তু বেড়ার ফুটো দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিতে পারে — আর সেই হাতই তার পরিচয় ফাঁস করে দেয়।
বটগাছটি আর্কাইভে আটটি পাঠে আছে, আর অন্তত তিনটিতে তা অলৌকিক কিছুর আশ্রয় — রাখাইন পাঠে ভূত পরিবারের, ম্রো এক দরিদ্র রাজপুত্রের কাহিনী-তে একটি রাক্ষসের, আর চাকমা সৃষ্টিকথায় গোজেনের ধ্যানের আসন।
আর্কাইভের ভূতেরা দেখতে কেমন — এ নিয়ে পাঠগুলো একমত নয়, আর সেটিই আকর্ষণীয়। চারটি পাঠে চার রকম শরীর।
চাকমা পাঠে ভূত দেখতে মানুষের মতো, কারণ সে মানুষের রূপ ধরে। তার ধরা পড়ার কারণও তাই শরীরগত অসামঞ্জস্য — কাঁকড়া ধরার অজুহাতে এক হাত গর্তে ঢুকিয়ে রাখা, আর চুলের ঝুঁটি ধরে তোলার পর দেখা যায় “কনুইয়ের উপরে কাটা হাতের বাকী অংশটা খালি সেখানে ঝুলছে লট্ পট্ করে”।
আর তার মৃত্যুর পর যা পড়ে থাকে, তা মানুষও নয় — “শুধু একটা মরা দাঁড় কাক”, গলা দু’ভাগ করা। দুটি চোখের বর্ণনাও আছে: “দুটো চোখই মরার মত সাদা ফ্যাকাসে।”
মারমা প্রেতের শরীর বিরাট ও লোমশ — “কালো বিরাট একটা কাঠের গুঁড়ির মত”, সারা শরীরে লম্বা লোম, আর “চোখ দুটো ফুটবলের মত জ্বল জ্বল করছে”। তার আগমনের ভঙ্গিটিও শরীরগত: সে হাঁটে না, গড়িয়ে আসে।
আর প্রবেশ করে শরীরের একটি অংশ দিয়ে — একটি বিরাট জিহ্বার অগ্রভাগ, “জলে ভেজা, লালসার জল টপটপ করে পড়ছে”।
মারমা ভদ্র ভূতের শরীর পোড়া। বিড়ির আলোয় তার মুখ স্পষ্ট দেখা যায় — “সেকি বিশ্রী মুখ, আর কয়লার মত কালো তার দেহটা”। আর কারণটি সে নিজেই বলে দেয়: গতকাল তাকে পোড়ানো হয়েছিল।
এই একটি বিশদ পুরো গল্পটিকে অন্য স্তরে নিয়ে যায়। ভূতের চেহারা এখানে অলৌকিক নয় — এটি একটি সদ্য-দাহ করা মৃতদেহের চেহারা।
রাখাইন পাঠে ভূতের শরীর স্বাভাবিক, কিন্তু অদৃশ্য। তারা পোশাক পরে — পাঠে তালিকা দেওয়া: কারও মাথায় পাগড়ি, কেউ লুঙ্গি, কেউ নেংটি। আর হাতে কাজের সরঞ্জাম — দা, ঝুড়ি, ছোট দা।
অর্থাৎ রাখাইন ভূতেরা দেখতে গ্রামের মানুষের মতোই, আর তাদের ভয়ংকর দিকটি চেহারায় নয় — কাজে। তারা মৃতদেহ ভাগ করে, ঠিক যেমন মানুষ গরু বা শূকরের মাংস ভাগ করে।
আর্কাইভের ১৪টি ভূত-সংক্রান্ত পাঠের দশটিতে শব্দটি এক থেকে তিনবার আসে, আর সেখানে ভূত কোনো চরিত্র নয় — একটি তুলনা, একটি ভয়, কিংবা একটি ভুল।
ভুল বোঝাবুঝি হিসেবে। তঞ্চঙ্গ্যা তেন্দেরার পচ্ছন-এ অন্ধকারে ধরা পড়ে ফুলরেণু “ভূত ভূত বলে চিৎকার” করে, আর অন্যজন তাড়াতাড়ি বলতে থাকে “না–না আমি ভূত নই”। অর্থাৎ ভূত এখানে একটি আতঙ্ক, উপস্থিত কেউ নয়।
সংক্ষিপ্ত উল্লেখ হিসেবে। চাকমা হঅ্’বি আর ধঅ্’বি, ম্রো তাকুই হন তালিপ, খেয়াং ঘুঘু পাখির গল্প (তিনটি কপি), ত্রিপুরা রক্তপিয়াসি দেবতা, মারমা লজ্জাবতী গাছের গল্প আর সাঁওতাল নাপিতের বুদ্ধি — এই পাঠগুলোতে শব্দটি একবার বা দু’বার, আর কাহিনির গতিপথে তার কোনো ভূমিকা নেই।
এই ভাগটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একটি সহজ ভুল আটকায়। শব্দ খুঁজে পাওয়া মানেই গল্পটি ভূতের গল্প নয় — আর্কাইভে ভূত আসলে কাহিনির কেন্দ্রে আছে চারটি পাঠে, আর সেগুলোর শব্দসংখ্যা মিলিয়ে মাত্র ৩,৪৪৩।
গণনার আরেকটি সীমাও বলে রাখা দরকার। আর্কাইভে অলৌকিক সত্তা আরও আছে, কিন্তু তাদের নাম ভূত নয় — রাক্ষস (ম্রো এক দরিদ্র রাজপুত্রের কাহিনী, ত্রিপুরা জন্মান্তর), মায়াবী রাক্ষসী ও ডাইনী (তঞ্চঙ্গ্যা কলাখু কন্যা পসন, ম্রো এক ডাইনীর গল্প, মারমা সর্প মানব), আর দেবতা ও পরী।
তাই এই পাতার ছকগুলো পাহাড়ের অলৌকিক জগতের পূর্ণ তালিকা নয় — কেবল যাদের পাঠে ভূত বা প্রেত বলা হয়েছে, তাদের।
[পাহাড়ি ভাষাগুলোতে ভূত-জাতীয় সত্তার নিজস্ব নাম আছে কি না, আর থাকলে সেগুলো কী — তা আর্কাইভের পাঠে বা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি, একটি ব্যতিক্রম ছাড়া: মারমা ফৌহ]
আর্কাইভের ভূত-সংক্রান্ত পাঠগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো সমাপ্তির ভঙ্গি। তিনটি পাঠই শেষ হয় একটি বর্তমান বিশ্বাস বা অবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে — অর্থাৎ গল্পটি শেষ হলেও তার ফল রয়ে যায়।
ত্রিপুরা পাঠের শেষ বাক্য: “এরপর থেকে তারা বিশ্বাস করে, ভূত সব সময় কুকুরকে ভয় পায়।”
রাখাইন পাঠের শেষ বাক্য: “সেদিন থেকে লোকেরা ভূতকে দেখতে পায় না।”
চাকমা পাঠের উপসংহার: ভূতেরা ভয়ে লুকিয়ে গেছে, আর “এখন শুধু আড়ালে আবডালে ভূতের শব্দ সাড়া মিলে”।
তিনটির গঠন এক — “সেই থেকে” বা “এরপর থেকে”, তারপর একটি বর্তমান সত্য। আর্কাইভে এই গঠনটি ভূতের গল্পের বাইরেও আছে; চাকমা সাদা কাক কালো হল কেন, মারমা লজ্জাবতী গাছের গল্প আর ত্রিপুরা চিংড়ির সাজা — সবগুলোই একই ছাঁদে শেষ হয়।
কিন্তু ভূতের গল্পে এই গঠনটির কাজ আলাদা, আর তা ব্যবহারিক। প্রাণীর রঙ বা গাছের আচরণ ব্যাখ্যা করলে পাঠকের কিছু করার থাকে না; ভূতের নিয়ম ব্যাখ্যা করলে থাকে।
অর্থাৎ এই পাঠগুলো একইসঙ্গে গল্প ও পরামর্শ — রাতে সাড়া দেবেন না, মশাল নিন, দা ধারালো রাখুন কিন্তু তাতে আগুন ছোঁয়াবেন না, আর কুকুর সঙ্গে রাখুন।
চতুর্থ পাঠটি অবশ্য কোনো নিয়ম দেয় না। মারমা ভূতের গল্প-এর দ্বিতীয় অংশ শেষ হয় একটি উপলব্ধি দিয়ে, আর তা একজনের নিজের ভাবনা — “ভূত হলেই দুষ্ট হয় না, ভদ্র ভূতও আছে।”
আর্কাইভের ভূত-সংক্রান্ত সব পাঠের মধ্যে এটিই একমাত্র সমাপ্তি যা কোনো প্রতিরোধ শেখায় না — বরং একটি পূর্বধারণা ভাঙে।
আটটি জনগোষ্ঠীর পাঠে ভূত আছে, আর তার চরিত্র এক নয়। পাশাপাশি রাখলে একটি ছক তৈরি হয়।
| জনগোষ্ঠীর পাঠে | ভূতের প্রধান ক্ষমতা | কীভাবে মোকাবিলা হয় |
|---|---|---|
| চাকমা | মানুষের রূপ ধরা, আর ডাকে সাড়া পেলে ঘরে ঢোকা | ধারালো তাগল্, মশাল, মেইয়্যা শাক |
| ত্রিপুরা | সীমাহীন কর্মক্ষমতা — যেকোনো কাজ নিমিষে | একটি অসম্ভব কাজ, আর একটি পাল্টা শর্ত |
| মারমা (প্রেত) | অতৃপ্ত ক্ষুধা, বিরাট জিহ্বা | সময় কাটানো, আর ভোর পর্যন্ত পালাক্রমে কুস্তি |
| মারমা (ভদ্র ভূত) | কোনো ক্ষতি করে না; আগুন ধার দেয় | মোকাবিলার প্রয়োজন পড়ে না |
| মারমা (ফৌহ) | রাতে সক্রিয় রক্তশোষক | পাঠে কোনো প্রতিরোধ দেওয়া নেই |
| রাখাইন | অদৃশ্য থাকা; দলবদ্ধ হয়ে মৃতদেহ ভাগ করা | মোকাবিলা নয় — শিকড় হারিয়ে দেখা বন্ধ হয়ে যায় |
| তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খেয়াং, সাঁওতাল | প্রসঙ্গক্রমে উল্লিখিত — কাহিনির কেন্দ্রে নয় | — |
ছকটি থেকে একটি কথা স্পষ্ট হয়: আর্কাইভে ভূতকে হারানো হয় বুদ্ধিতে বা ধৈর্যে, কখনো মন্ত্রে বা পূজায় নয়।
চারটি কেন্দ্রীয় পাঠের তিনটিতেই সমাধানটি একটি কৌশল — একটি অসম্ভব কাজ, একটি পালাক্রমের হিসাব, কিংবা সারা রাত অপেক্ষা করে ধারালো একটি দা।
বাকি দশটি পাঠে ভূত কেবল প্রসঙ্গক্রমে — কখনো একটি তুলনায়, কখনো একটি চিৎকারে। তঞ্চঙ্গ্যা তেন্দেরার পচ্ছন-এ শব্দটি আসে একটি ভুল বোঝাবুঝিতে: অন্ধকারে ধরা পড়ে ফুলরেণু “ভূত ভূত বলে চিৎকার” করে, আর অন্যজন বলতে থাকে “না–না আমি ভূত নই”।
আর চতুর্থটিতে কোনো সমাধানই নেই, কারণ সেখানে ভূতের সঙ্গে কোনো বিরোধও নেই।
চারটি কেন্দ্রীয় পাঠ পাশাপাশি রাখলে একটি কথা স্পষ্ট হয়: গল্পগুলো ভূতকে নিয়ে নয়, ভূতের সামনে মানুষ কী করে তা নিয়ে।
চারটিতেই মূল চরিত্র মানুষ, আর চারজনই সাধারণ — একজন স্বামী, একজন জুমিয়া, দুই গরিব বন্ধু, আর একজন পথচারী। কোনো ওঝা নেই, কোনো রাজা নেই, কোনো দেবতাও নেই।
আর তাদের হাতিয়ারও সাধারণ। একটি দা, একটি কুকুর, একটি মোরগ, আর একটি বিড়ি — এই চারটি জিনিসেই চারটি গল্পের মীমাংসা হয়।
জয়ের ধরনও একরকম নয়। চাকমা পাঠে মানুষ জেতে ধৈর্যে — সারা রাত ঘাপটি মেরে বসে থেকে। ত্রিপুরা পাঠে বুদ্ধিতে — একটি অসম্ভব কাজ আর একটি পাল্টা শর্ত দিয়ে। মারমা পাঠে হিসাবে — পালাক্রমে লড়ে ভোর পর্যন্ত টিকে থেকে।
আর রাখাইন পাঠে মানুষ জেতে না। সে একটি ক্ষমতা পায়, তারপর হারায় — আর সেই হারানোটিই গল্পের উপসংহার।
জীবিকার বিবরণও চারটিতেই আছে, আর তা পটভূমি নয় — কাহিনির কারণ। দুই বন্ধু বনে যায় কারণ তারা ফাঁদ পেতে বন-মোরগ আর শামুক-ঝিনুক-কাঁকড়া ধরে বাঁচে; জুমিয়া মন্ত্র শেখে কারণ তার জুমের কাজ অনেক; আর নৌকার লোকটি আগুন খোঁজে কারণ শীতে একটি বিড়ি টানতে চায়।
অর্থাৎ ভূতের সঙ্গে দেখা হয় কাজের পথে — আর সেজন্যই গল্পগুলোর শেষে যে নিয়মগুলো দেওয়া হয়, সেগুলোও কাজের মানুষের জন্য।
১২৫টি পাঠের ১৪টিতে ভূত বা প্রেত আছে, আটটি জনগোষ্ঠীর গল্প মিলিয়ে — খেয়াং ৩ (একই গল্পের তিনটি কপি), মারমা ৩, চাকমা ২, ত্রিপুরা ২, আর তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, রাখাইন ও সাঁওতাল একটি করে। এর মধ্যে ভূত কাহিনির কেন্দ্রে আছে চারটি পাঠে। গণনায় অদ্ভুত ধরনের শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে।
চাকমা অমগদ চাকমা-য় তিনটি উপায় নাম ধরে দেওয়া — মশাল জ্বালানো, মেইয়্যা শাক খাওয়া ও ঘরের পাশে বোনা, আর হাতে তাগল্ অর্থাৎ দা রাখা। সঙ্গে একটি নিয়মও: রাতে কারও ডাকে সাড়া দেওয়া যাবে না, নইলে ভূত সেই মানুষের রূপ ধরে ঘরে ঢুকে পড়বে।
পাঠ অনুযায়ী হাতে তাগল্ থাকলে একজন “একাই একশো ভূতের কাছে”। কিন্তু সেই তাগল্-এ একটুখানি আগুন ছোঁয়ালেই তা “মরে যায়”, আর তখন সারাদিন কোপালেও ভূতের কিছু হয় না। অর্থাৎ আগুন মানুষকে বাঁচায়, কিন্তু অস্ত্রটিকে অকেজো করে দেয়।
চাকমা পাঠে বর্ণিত একটি শাক, যা ভূত ঠেকায়। পাঠে লেখা, যাঁরা এই শাক খান তাঁদেরও ভূত কিছু করতে পারে না, আর ভূতের তাড়া খেলে একবার মেইয়্যা শাকের বনে ঢুকে পড়লেই রক্ষা। চেহারার বর্ণনাও দেওয়া — “অনেকটা মুলো শাকের মত। খাওয়া যায়, তবে মুলো হয় না।”
ত্রিপুরা ভূতের কুকুর-ভীতি। এক জুমিয়া মন্ত্র পড়ে ভূত আনে, কিন্তু ভূতের শর্ত ছিল কাজ দিতে না পারলে সে ঘাড় মটকাবে। শেষে জুমিয়া তাকে কুকুরের বাঁকা লেজ সোজা করার কাজ দেয়, সঙ্গে শর্ত — না পারলে কুকুর তাকে টুকরো করে ফেলবে। তিনবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ভূত ভয়ে পালায়।
ত্রিপুরা পাঠ অনুযায়ী ওচাই অর্থাৎ গ্রামের পুরোহিতের কাছ থেকে একটি মন্ত্র শিখতে হয়, আর এক হাজার বার সেই মন্ত্র পড়লেই একটি ভূত এসে হাজির হয়। সে সব কাজ করে দেয়, কিন্তু শর্ত একটি — কাজ দিতে না পারলে সে ঘাড় মটকাবে।
আছে, রাখাইন ভূতের কাহিনী-তে। ভূতের নির্দেশ অনুযায়ী বটগাছের পূর্বদিকে প্রসারিত শিকড়টি কুড়িয়ে মুখে দিলে ভূত দেখা যায়। লোকটি তা করে পুরো ভূত পরিবারটিকে দেখতে পায়।
আর্কাইভে দুটি ব্যাখ্যা। রাখাইন পাঠে ভূতের হামলায় লোকটির মুখ থেকে বটের শিকড় পড়ে যায়, আর তা মুখে নেয় একটি কুকুর ও একটি কাক — তাই তারা ভূত দেখার শক্তি পায়, আর “সেদিন থেকে লোকেরা ভূতকে দেখতে পায় না”। চাকমা পাঠে কারণটি উল্টো — এক কোপে এক ভূত মারা যাওয়ার পর ভূতেরাই ভয়ে লুকিয়ে গেছে।
মারমা ভূতের গল্প অনুযায়ী ভোর হলে ভূত-প্রেতের শক্তি কমে আর মানুষের শক্তি বাড়ে। দুই বন্ধু এই নিয়ম জানত, তাই তারা মোরগের মাংস অল্প অল্প করে দিয়ে সময় কাটায়, আর কুস্তি লড়ে পালাক্রমে — ফলে তারা ক্লান্ত হয় না, কিন্তু একাকী ভূত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
আর্কাইভে মারমা পাঠে আলাদা শব্দ হিসেবে “প্রেত” ব্যবহৃত, আর তা একটি বৌদ্ধ বিহারের প্রসঙ্গে। সেখানে প্রেতের একমাত্র বৈশিষ্ট্য অতৃপ্ত ক্ষুধা — সে হুমকি দেয় না, কেবল খেতে চায়, আর একটি বিরাট জিহ্বা দিয়ে খাবার টেনে নেয়।
আছে। মারমা ভূতের গল্প-এর দ্বিতীয় অংশে এক ভূত নৌকাযাত্রীকে বিড়ির আগুন ধার দেয়, আর পালানোর সময় তার নৌকার রশিও খুলে দেয়। পাঠের শেষ বাক্য — “ভূত হলেই দুষ্ট হয় না, ভদ্র ভূতও আছে।”
মারমা পাঠে বর্ণিত পার্বত্যাঞ্চলের একটি রক্তশোষক-বিশ্বাস। পাঠে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলার সঙ্গে তুলনা করে — দিনে মৃতের মতো, রাতে সক্রিয়। লেখক শেষে লিখেছেন, এসব কাহিনি গ্রামে মুখে মুখে প্রচলিত আর অনুসন্ধান করা হলে আরও অনেক জানা যাবে।
মারমা ভূতের গল্প-এর প্রথম কাহিনি। দুই গরিব বন্ধু একটি বৌদ্ধ বিহারের রান্নাঘরে রাত কাটাতে গিয়ে প্রেতের মুখোমুখি হয়। তারা পালাক্রমে কুস্তি লড়ে ভোর পর্যন্ত টিকে থাকে, আর ক্লান্ত প্রেত ক্ষমা চেয়ে সিঁড়ির গোড়ায় পোঁতা সোনা-রূপার পাতিলের ঠিকানা দিয়ে দেয়।
রাখাইন ভূতের কাহিনী-তে। একটি বটগাছে বাস করে এক ভূত পরিবার — মা, বাবা, বড় বোন আর ছোট ভাই। গল্পের শুরুতেই বড় বোন ডালে চার দড়ির দোলনায় শ্লোক গেয়ে ছোট ভাইকে ঘুম পাড়াচ্ছে।
আছে, আর তাদের নাম ভূত নয় — রাক্ষস (ম্রো এক দরিদ্র রাজপুত্রের কাহিনী, ত্রিপুরা জন্মান্তর), মায়াবী রাক্ষসী ও ডাইনী (তঞ্চঙ্গ্যা কলাখু কন্যা পসন, ম্রো এক ডাইনীর গল্প, মারমা সর্প মানব), আর দেবতা ও পরী। এই পাতার গণনায় কেবল যাদের পাঠে ভূত বা প্রেত বলা হয়েছে তারাই আছে।
চারটি পাঠে চার রকম। চাকমা পাঠে সে মানুষের রূপ ধরে, আর তার চোখ “মরার মত সাদা ফ্যাকাসে”; মরার পর পড়ে থাকে একটি মরা দাঁড় কাক। মারমা প্রেত “কালো বিরাট একটা কাঠের গুঁড়ির মত”, লোমশ, আর চোখ ফুটবলের মতো জ্বলজ্বলে। মারমা ভদ্র ভূতের দেহ কয়লার মতো কালো, কারণ তাকে আগের দিন পোড়ানো হয়েছিল। আর রাখাইন ভূতেরা দেখতে গ্রামের মানুষের মতোই — পাগড়ি, লুঙ্গি বা নেংটি পরা — কিন্তু অদৃশ্য।
এই পাতার সব তথ্য ও উদ্ধৃতি জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত পাঠগুলোর নিজের লেখা থেকে নেওয়া। চারটি কেন্দ্রীয় পাঠ সম্পূর্ণ পড়া হয়েছে, আর ভূত-সংক্রান্ত গণনা ১২৫টি পাঠের পূর্ণ লেখা ঘেঁটে করা।
সব ব্যক্তির নাম, জনগোষ্ঠীর নাম ও মূল ভাষার শব্দ আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে। এই পাতায় কোনো বিশ্বাসকে সমর্থন বা খণ্ডন করা হয়নি — কেবল পাঠে যা লেখা আছে তা তুলে ধরা হয়েছে। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।
প্রসঙ্গ:চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, রাখাইন, রূপকথা, লোককাহিনী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।