Last updated Oct 15th, 2026
0

জুমজার্নালের আর্কাইভে একই কাহিনি তিনটি ভাষায় তিনবার আছে — তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা আর ম্রো। তিনটি আলাদা জনগোষ্ঠীর তিনজন আলাদা লেখকের লেখা, অথচ কাঠামো প্রায় হুবহু এক।
গল্পটি সরল: বাঘ আর শূকরের বন্ধুত্ব হয়, তারপর বাঘ একটি স্বপ্নের দোহাই দিয়ে বন্ধুকে খেতে চায়, বিচার বসে, আর একটি পেঁচা ঠিক একই যুক্তিতে পাল্টা দাবি তুলে শূকরকে বাঁচায়।
কিন্তু তিনটি পাঠের আকার এক নয় — ৩,৪২৯ শব্দ, ৯০৬ শব্দ আর ৭৫৪ শব্দ। আর সেই ফারাকের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুখে-মুখে চলা একটি গল্প কীভাবে বদলায় তার ছবি।
তিনটি পাঠ আর্কাইভে আলাদা আলাদা জনগোষ্ঠীর বিভাগে আছে, আর তিনটির শিরোনামও আলাদা। ম্রো পাঠটির শিরোনামে ক্রম উল্টো — শূকর আগে, বাঘ পরে।
| তঞ্চঙ্গ্যা | মারমা | ম্রো | |
|---|---|---|---|
| শিরোনাম | বাঘ ও শূকরের মিতালী | বাঘ ও শূকরের গল্প | পাক হন প্রি (শূকর ও বাঘ) |
| শব্দ | ৩,৪২৯ | ৭৫৪ | ৯০৬ |
| লেখক | বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা | পুলু প্রু | সিং ইয়ং মুরুং |
| উৎস-গ্রন্থ | তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথা লোককাহিনী ও কিংবদন্তী | পাঠে নেই | পাঠে নেই |
| ছবি | পাঠে নেই | পাঠে নেই | চিত্রায়নঃ তনময় চাকমা |
| বিচারক | পশুরাজ সিংহ | রাজা | বিচারক |
| শেষ বাক্যে | সিংহের ফরমান | রাজার রায় | একটি মুরুং প্রবাদ |
তিনটি পাঠে একটি জিনিস কখনো বদলায় না — উকিলটি পেঁচা। অন্য কোনো প্রাণী নয়, আর তিনটিতেই সে একই যুক্তি ব্যবহার করে।
তিনটি পাঠ পাশাপাশি রাখলে একই সাতটি ধাপ পাওয়া যায়, আর ধাপগুলোর ক্রমও এক। এই অভিন্নতাই বলে দেয় তিনটি আলাদা গল্প নয় — একই গল্পের তিনটি রূপ।
সপ্তম ধাপটিই গল্পের কেন্দ্র, আর তার যুক্তিটি নিখুঁত। বাঘের দাবি মানলে পেঁচার দাবিও মানতে হয় — আর পেঁচার দাবি মানা বিচারকের নিজের পক্ষে অসম্ভব।
অর্থাৎ পেঁচা বাঘের যুক্তি খণ্ডন করে না; সে সেই যুক্তিটি বিচারকের নিজের ঘরে ফিরিয়ে দেয়। এই গঠনটি তিনটি পাঠেই এক, আর কেবল এর বিস্তার আলাদা।
তিনটি পাঠেই ঘটনার সূত্রপাত একটি ঝড়ে, কিন্তু কে আশ্রয়হীন হয় আর কে আশ্রয়দাতা — তা তিন রকম।
মারমা পাঠে ঝড় দেখে শূকর আগেভাগে প্রস্তুত হয়: সে তাড়াতাড়ি বাঁশঝাড়ের নিচে গিয়ে “বিভিন্ন লতা-পাতা দিয়ে নিজের জন্য ঘর” বানিয়ে ফেলে। বাঘ আসে পরে, আশ্রয় চাইতে।
ম্রো পাঠে দু’জনের আগে কোনোদিন দেখাই হয়নি, আর কারণটি স্থানিক — “বাঘ বাসা বাঁধত গাছের ডালে আর শূকর বাসা বাঁধত গাছের নীচে।” ঝড়ে ডালের বাসা ভেঙে খানখান হয়ে যায়, বাঘ নিচে পড়ে যায়, আর তখনই নিচের সুন্দর বাসাটি দেখতে পায়।
ম্রো পাঠের এই বিশদটি আলাদা মনোযোগের দাবি রাখে। বাঘ গাছের ডালে বাসা বাঁধে — এটি প্রাণীবিদ্যার তথ্য নয়, গল্পের স্থাপত্য। উপরের বাসিন্দা আর নিচের বাসিন্দা, আর ঝড় সেই স্তরভেদ ভেঙে দেয়।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে ঝড় নেই, আর সেটিই সবচেয়ে বড় ফারাক। এখানে বন্ধুত্বের কারণ অনেক গভীর: শিকারির গুলিতে মা-হারা এক ব্যাঘ্রশাবককে এক সদ্যপ্রসূতি শূকরী “আপন শাবকের ন্যায় স্নেহের সাথে নিজের দুধ পান করিয়ে” বাঁচিয়ে রাখে ও লালন করে।
অর্থাৎ তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে বাঘ ও শূকর এক রাতের অতিথি-গৃহকর্তা নয় — দুধভাই। আর সেই কারণেই পরের বিশ্বাসভঙ্গটি অনেক বেশি ভারী।
মারমা ও ম্রো — দুটি পাঠেই আশ্রয় দেওয়ার আগে একটি দরকষাকষি হয়, আর শূকরের আপত্তির ভাষা দুটিতে আলাদা।
মারমা পাঠে শূকরের আপত্তি শক্তির অসাম্য নিয়ে — “বন্ধু তা কি করে হয়, তুমিতো শক্তিশালী প্রাণী আর আমি অত্যন্ত দুর্বল প্রাণী।” তারপর সে জায়গার অভাবের কথাও বলে।
বাঘের মিনতিটি তিনটি শর্তে ভাগ করা: দুই হাত জোড় করে এক রাতের আশ্রয় চাওয়া, কোনো ক্ষতি না করার প্রতিশ্রুতি, আর “ভোর হওয়ার আগেই তোমার ঘর ছেড়ে চলে যাবো”। শেষে বাঘ বলে সে দরজার পাশে ঘুমাবে — আর সেটিই পরে শূকরের ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ দরজা আটকে থাকায় সে বাইরে যেতে পারে না।
ম্রো পাঠে শূকরের আপত্তি আরও সরাসরি ও ভীত — “না, না, আমি দরজা খুলতে পারবো না। তুমি আমাকে খাওয়ার জন্য এখানে এসেছো।”
আর বাঘের উত্তরটি এই গল্পের সেরা বাক্য, কারণ সেটিই পরে সে নিজে ভাঙে: “না, না, আমি তোমাকে খেতে আসিনি। বিপদের দিনে আশ্রয়দাতাকে কেউ কি কোনদিন খায়?”
রাতের বর্ণনাটিও ম্রো পাঠে আছে, আর তা খুব মানবিক — বাঘের ভয়ে আর নাক ডাকার শব্দে শূকর ভালো করে ঘুমাতে পারে না।
তিনটি পাঠেই বাঘের দাবির ভিত্তি একটি নিয়ম, আর সেই নিয়মটি সে নিজের জাতির নিয়ম হিসেবে পেশ করে।
মারমা পাঠে বাঘ বলে, “আমাদের বাঘের মধ্যে যে কেউ স্বপ্ন দেখলে তা অবশ্যই করতে হয়”, আর শূকরের প্রতিবাদে তার উত্তর — “আমাদের নিয়ম আমি কোন প্রকারেই ভাঙ্গতে পারবো না। কাজেই তোমাকে অবশ্যই আমি খাবো।”
অর্থাৎ বাঘ তার লোভকে একটি আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে উপস্থাপন করে। সে বলছে না যে সে খেতে চায়; বলছে যে তার আর কোনো উপায় নেই।
ম্রো পাঠে একই দাবি আরও ছোট করে — স্বপ্নে হত্যা করে খেয়েছি, “তাই আজ বাস্তবেও তোমাকে খেয়ে ফেলবো”। আর শূকরের প্রশ্নটি যুক্তির — “স্বপ্ন কি কখনো বাস্তবরূপ নেয়?”
বাঘের জবাবটিই তাকে আদালতে নিয়ে যায়: “অবশ্যই বাস্তবরূপ নেয়। তা যদি বিশ্বাস না হয়, তাহলে রাজদরবারে বিচারকের নিকট চলল।” অর্থাৎ বিচারে যাওয়ার প্রস্তাবটি বাঘেরই।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে বাঘ স্বপ্নে আরও একটি জিনিস দেখে, আর সেটিই পরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে — স্বপ্নে “বনের রাজা সিংহও অতি আনন্দের সঙ্গে তোমার তাজা রক্ত মাংস খেয়ে লাফাতে শুরু করেছে।”
এই সংযোজনটি কাঠামোগতভাবে চতুর। বাঘ কেবল নিজের অধিকার দাবি করছে না — সে বিচারকের জন্য ভাগও রেখে দিচ্ছে, আর তা স্বপ্নের ভেতরেই।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে এর আগে আরেকটি দৃশ্যও আছে, যা অন্য দুটিতে নেই — বাঘ একবার শূকরের গলায় হালকা কামড় বসিয়ে অভিনয় করে, আর ধরা পড়ে গেলে অজুহাত দেয় যে সে কেবল “তালিম” নিচ্ছিল।
তিনটি পাঠের সবচেয়ে বড় কাঠামোগত ফারাক এখানেই। বিচার কার কাছে যায়, তা তিনটিতে তিন রকম — আর তাতে গল্পের অর্থও বদলে যায়।
| পাঠ | বিচারক | কাদের সভা |
|---|---|---|
| মারমা | রাজা | রাজদরবার; রাজার কন্যা প্রাসাদে থাকে |
| ম্রো | বিচারক (পদবি ধরে) | রাজদরবার; বিচারকের ছোট মেয়ে আছে |
| তঞ্চঙ্গ্যা | পশুরাজ সিংহ | বনের পশু-পাখিদের সভা; হাতি, গন্ডার, শিয়াল সবাই উপস্থিত |
মারমা ও ম্রো পাঠে বিচারের জগৎ মানুষের — রাজা, দরবার, কন্যা, প্রাসাদ। অথচ পক্ষগুলো পশু।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে পুরো জগৎটাই বনের, আর তার একটি পূর্ণ ব্যাখ্যাও পাঠে দেওয়া আছে — সিংহ কেন রাজা, কীভাবে সে “নিজেকে সমগ্র বনাঞ্চলের সম্রাট বলে জাহির করে”, আর কেন হাতি-গন্ডারের শরীর বড় হলেও শাসনের ক্ষমতা নেই।
পাঠে বনের ভাষার প্রশ্নটিও তোলা হয়েছে, আর তার জন্য একটি আধুনিক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে: বন্য পশু-পাখিদের একটি সার্বজনীন ভাষা আছে, “এটি তাদের লিংগুয়াফ্রাংকাই”, আর সেই ভাষা দিয়েই সিংহ শাসন পরিচালনা করে।
মারমা পাঠেও ভাষার সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে, কিন্তু অন্য উপায়ে — “তখন আবার সত্য যুগ, সবাই কথা বলতে জানত।” আর্কাইভের চাকমা ও চাক গল্পেও সত্যযুগ একই কাজ করে।
মারমা ও ম্রো — দুটি পাঠেই বিচার শুরুর আগেই বিচারক কেনা হয়ে গেছে, আর দুটিতেই দাম একই: শূকরের মাংসের ভাগ।
মারমা পাঠে চুক্তিটি পরিষ্কার — রাজা ও বাঘের মধ্যে সন্ধি হয়, আর শর্ত হলো বিচারে বাঘ জিতলে “শূকরের অর্ধেক অংশ রাজা ও অর্ধেক অংশ বাঘ পাবে”।
ম্রো পাঠে উদ্যোগটি বাঘের, আর পাঠে তা নাম ধরে বলা হয়েছে — সাত দিনের ফাঁকে বাঘ “চালাকী করে বিচারক মহোদয়ের কাছে গিয়ে চুক্তি করলো শূকরকে মেরে মাংস ভাগাভাগি করবে বলে”, আর ভাগ পাবেন বলে বিচারক “ভারী খুশী” হলেন।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে ঘুষটি চুক্তির আকারে নয়, স্বপ্নের আকারে — বাঘের স্বপ্নেই সিংহ শূকরের মাংস খেয়ে আনন্দে লাফায়। অর্থাৎ ভাগের প্রস্তাবটি আগেই দেওয়া হয়ে গেছে, কিন্তু কথায় নয়।
তিনটি পাঠে এই উপাদানটি থাকার অর্থ একটিই: গল্পটি কেবল বিশ্বাসভঙ্গের নয়, বিচারব্যবস্থার। বাঘ জিততে যাচ্ছিল কারণ সে শক্তিশালী নয় — কারণ সে বিচারকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে রাজি ছিল।
তিনটি পাঠেই শূকর সময় চায় উকিল জোগাড় করার জন্য, কিন্তু সময়ের পরিমাণ এক নয় — মারমা ও ম্রো পাঠে সাত দিন, আর তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে সে এক মাস চায় আর পায় পনের দিন।
মারমা পাঠে কারণটি আইনি: রায় শোনার পর শূকর “জলভা চোখে রাজার কাছে সাত দিনের সময় প্রার্থনা করে তার পক্ষে উকিল খোঁজার জন্য” বেরিয়ে যায়। অর্থাৎ সে সরাসরি উকিল খুঁজতে বেরোয়।
ম্রো পাঠে কারণটি ব্যক্তিগত: শূকর “আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করবার জন্য” সাত দিন সময় নেয় — অর্থাৎ সে বিদায় নিতে চায়, লড়তে নয়।
দুটি পাঠেই সেই সাত দিনে শূকরের শরীর ভেঙে পড়ে, আর বর্ণনাটি প্রায় একই। মারমা পাঠে ছয় দিন পেরিয়ে যায়, উকিল মেলে না, আর “এতদিন না খেয়ে শূকর ঠিকমত হাঁটতে পারছে না”। ম্রো পাঠে “চার-পাঁচ দিন চিন্তায় চিন্তায় না খেয়ে শূকরের শরীর কাঠ হয়ে গেলো”।
এই সমান্তরালটি লক্ষণীয়, কারণ এটি কাহিনির ঘটনা নয় — এটি একটি শরীরের বর্ণনা, আর দুটি আলাদা ভাষায় প্রায় একই।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে দরকষাকষিটি আদালতেই হয়। শূকর বলে, “আমাকে একমাস অবকাশ দিন, আমি আমার পক্ষে কথা বলার জন্য কাউকে হাজির করব” — আর সিংহ দেন মাত্র পনের দিন, এক মাস নয়, সঙ্গে হুঁশিয়ারি: শেষ দিন উকিল হাজির করতে না পারলে “আর কোন ক্ষমা নেই”।
আর সেই পনের দিনের ভেতরে শূকর সাত দিন একটানা হাঁটে। পাঠের ভাষায়, “কোন দিকে চলছে নিজেরও খেয়াল নেই, দিন-রাত শুধু চলছেই। দু’চোখ ভরে তার পানি।”
তিনটি পাঠেই উকিল না পাওয়ার কারণটিও একই রকম — কেউ বাঘের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে রাজি নয়। তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে তা স্পষ্ট করে বলা: তৃণভোজী ও সমগোত্রীয় পশু-পাখিদের কাছে “অনেক অনুনয়-বিনয় করে”ও শূকর কাউকে পায় না।
তিনটি পাঠেই উদ্ধারকর্তা পেঁচা, কিন্তু তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পরিস্থিতি তিন রকম — আর মারমা পাঠে সেটি সবচেয়ে বিস্তারিত।
মারমা পাঠে দেখা হয় একটি দুর্ঘটনায়। ক্লান্ত শূকর একটি শুকনো গাছে হেলান দিয়ে বসে পড়ে, আর সেই গাছে শিকারির ফাঁদে পড়া একটি পেঁচা সারা শরীরে আলকাতরা-জাতীয় কিছু লেগে উড়তে না পেরে পা দিয়ে কোনোরকমে আঁকড়ে ছিল। শূকরের হেলান দেওয়ায় পেঁচা মাটিতে পড়ে যায় আর রেগে বকা দেয়।
শূকরের উত্তরটি গল্পের বন্ধুত্বের সূত্র: “ভাই, আমি ইচ্ছে করে একাজ করিনি। আমিও একজন দুঃখী।” তারপর দুঃখের কথা শুনে পেঁচাও দুঃখিত হয়, আর দু’জনের বন্ধুত্ব হয়ে যায়।
এরপর একটি বিনিময় হয়, যা কেবল মারমা পাঠে আছে — পেঁচা শূকরকে তার শরীর চুষে পরিষ্কার করে দিতে বলে, আর তা হয়ে গেলে বলে, “বন্ধু, তুমি কোন চিন্তা করবে না। ঠিক সময় তুমি রাজ দরবারে হাজির হবে।”
অর্থাৎ মারমা পাঠে সাহায্যটি দু’মুখো — শূকর পেঁচাকে উড়তে সক্ষম করে, আর পেঁচা শূকরকে বাঁচায়।
ম্রো পাঠে দেখা হয় বনের ভেতর, আর পেঁচা নিজেই এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে — “তোমার কি হয়েছে? তোমাকে এতো গম্ভীর দেখাচ্ছে কেন?” তার প্রতিশ্রুতিটি আত্মবিশ্বাসে ভরা: “এটা কি কোন ব্যাপার হলো? যাও, চিন্তা মুক্ত করো।”
আর শূকরের সন্দেহটিও পাঠে লেখা, যা গল্পকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে — “পেঁচা তো সামান্য ক্ষুদ্র জীব। কিভাবে আমাকে সাহায্য করবে।”
তিনটি পাঠেই পেঁচার যুক্তি হুবহু এক — সে স্বপ্নে বিচারকের বা রাজার কন্যাকে বিয়ে করেছে, তাই বাঘের নিয়ম অনুযায়ী তাকেও তা বাস্তবে পেতে হবে। কিন্তু সে কথাটি কীভাবে তোলে, তা তিন রকম।
মারমা পাঠে পেঁচা উকিল হিসেবে হাজির হয়ে প্রথমেই রাজাকে প্রণাম করে আর্জি পেশের অনুমতি নেয়। তারপর একটি সম্পূর্ণ আলিবাই তৈরি করে — গত রাতে সে রাজকন্যার প্রাসাদের আলোয় এত বেশি উড়াপোকা খেয়েছিল যে উড়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই সে প্রাসাদেই ঘুমিয়ে পড়ে।
অর্থাৎ স্বপ্নটি কোথায় দেখা হলো, তার একটি ঠিকানা আছে — আর সেই ঠিকানাটি রাজকন্যার প্রাসাদ। যুক্তিটি এতে অনেক শক্ত হয়ে যায়।
আর সবচেয়ে ভালো চালটি শেষে — পেঁচা বলে, “আপনি আমার কথা বিশ্বাস করলে বাঘ ভাইকে জিজ্ঞেস করে দেখুন”, আর বাঘের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। কারণ ঠিক এই কথাটিই বাঘ আগে বলেছিল।
ম্রো পাঠে কৌশলটি অভিনয়ের। পেঁচা বিচারকের কাছে ঘুমানোর অনুমতি চায় — বাচ্চার অসুস্থতার কারণে রাতে ঘুম হয়নি বলে — আর অনুমতি পেয়ে সভার খাটে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
পুরো বিচার তখন বাঘের পক্ষে চলে যায়, আর সবাই শূকরকে পরিহাস করে — “তোমার পেঁচা উকিল তো এখনো ঘুমাচ্ছে।” শূকরের মনে পেঁচার প্রতি “ঘৃণাও” হয়।
রায় হয়ে যাওয়ার পর পেঁচাকে জাগানো হয়, আর সে “হাই তুলতে তুলতে” বলার অনুমতি চায়। তার স্বপ্নটিও ধূর্ত — বিচারকের ছোট মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে, আর সে এমনভাবে বলে যেন এটি একটি সুখবর: শূকর হত্যার অনুষ্ঠানেই বিয়েটা হয়ে যাবে।
পাঠ শেষে কৌশলটি ব্যাখ্যাও করে দেয়: “বিচারের সময় পেঁচা ঘুমাচ্ছিলো না। একটি ফন্দি বের করবার জন্য সে ঘুমের ভান করেছিলো।”
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে পেঁচার দাবি দুটি — রাজকন্যা এবং সিংহাসন। আর সে স্বপ্নের বর্ণনায় সিংহকে সরাসরি জড়িয়ে ফেলে, যেমন বাঘ করেছিল।
এখানে আরেকটি জিনিস ঘটে যা অন্য দুটিতে নেই — বনের অন্য পশুরা পক্ষ নেয়। হাতি কান-লেজ নেড়ে শুঁড় তুলে বলে, বাঘের স্বপ্নের কথা সে বিশ্বাস করত না, এবার বিশ্বাস করল; গন্ডার গোঁ গোঁ করে বলে, সে আগেই বলেছিল শুধু বাঘ নয়, আরও অনেকেই স্বপ্ন দেখতে পারে।
আর তৃণভোজী প্রাণীরা তখন উল্লসিত হয়ে দাবি তোলে — রাজকন্যার সঙ্গে পেঁচার বিয়ে এখনই হোক, পেঁচাকে সিংহাসন দেওয়া হোক, আর বনের সবাইকে বিয়ের ভোজ খাওয়ানো হোক।
পেঁচার যুক্তি তিনটি পাঠেই কাজ করে, কিন্তু বিচারক কীভাবে পিছু হটেন — তা তিন রকম, আর সেখানেই তিনটি পাঠের চরিত্র আলাদা হয়ে যায়।
মারমা পাঠে রাজা কোনো ভুল স্বীকার করেন না। রাজকন্যা কেঁদে প্রাসাদ ফাটিয়ে ফেলে, আর রাজা পড়েন মহাবিপদে — পাঠের ভাষায়, “আইন সমানভাবে প্রয়োগ করতে গেলে রাজার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।”
তাই তিনি দু’পক্ষকেই দরবার থেকে তাড়িয়ে দেন, আর একটি সাধারণ নিয়ম জারি করেন: “স্বপ্নে দেখলে কেউ কাউকে খেতে বা বিয়ে করতে পারবেনা।”
অর্থাৎ রাজা আইনটি বদলে দেন, কিন্তু নিজের পক্ষপাত স্বীকার করেন না।
ম্রো পাঠে বিচারক ভুল স্বীকার করেন, আর তা-ও প্রকাশ্যে — “পেঁচার যৌক্তিকতা দেখে বিচারক তার ভুল বিচার স্বীকার করলো এবং মাথায় করে পেঁচার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলো।”
সভা ভেঙে যায়, শূকরকে আর হত্যা করা হয় না, আর “বাঘ নিরাশ হয়ে ক্ষুধার জ্বালায় গজরাতে গজরাতে” ফিরে যায়।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে সিংহ ভুল স্বীকার করেন না, ক্ষমাও চান না — তিনি একটি ফরমান জারি করেন। স্বপ্ন অনুসারে শূকরকে ভক্ষণ করার যে অধিকার তিনি বাঘকে দিয়েছিলেন, তা নাকচ হয়; আর তার সঙ্গে একটি নতুন শর্ত জোড়া হয় — “শূকরটির কোন বিপদ হলে তাতে বাঘকেই দায়ী করা হবে।”
পাঠের শেষ বাক্যটি রাজনৈতিক, আর তা কথকের নিজের মূল্যায়ন: এই ফরমান জারি করে পশুরাজ “নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়াস পেল”।
অর্থাৎ তিনটি সমাপ্তিতে তিন রকম ক্ষমতার ভঙ্গি — মারমায় এড়িয়ে যাওয়া, ম্রোতে ক্ষমা চাওয়া, আর তঞ্চঙ্গ্যায় মুখরক্ষা।
৩,৪২৯ শব্দের তঞ্চঙ্গ্যা পাঠটি অন্য দুটির চার-পাঁচ গুণ, আর বাড়তি অংশটুকু কাহিনি নয় — ব্যাখ্যা।
বনের বর্ণনা। পাঠ শুরুই হয় মাংসভোজী ও তৃণভোজী পশুর ভাগ দিয়ে, আর তাদের স্বভাবের কারণ ব্যাখ্যা করে — তৃণভোজীরা কেন সর্বদা সন্ত্রস্ত, পাখিরা কেন নির্ভয়, আর শিয়াল কেন ধূর্ত বুদ্ধির আশ্রয় নেয়।
অরণ্যের আইন। পাঠে বলা হয়, বনেও আইন-শৃঙ্খলা আছে, কিন্তু “সে আইন শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ আলাদা। অরণ্যের আইন নিতান্তই বন্য।” আর দুর্বলেরা সিংহের কাছে বিচার চায়, যা সিংহ সভাসদের পরামর্শে নিষ্পত্তি করে।
সিংহ কেন রাজা। ব্যাখ্যাটি অর্থনৈতিক — হাতি-গন্ডারের শরীর বড় হলেও তাদের “প্রকান্ড শরীরগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য অহরহ খাদ্য অন্বেষণ করতে হয়”, তাই অন্য কিছু ভাববার সময় নেই; অথচ সিংহ একটি হরিণ বা শূকর মারলে ক’দিন চলে যায়, আর “নানা চিন্তা ভাবনা করার সময় তার আছে”।
বনের ভাষা। পশু-পাখিদের একটি সার্বজনীন ভাষা আছে, আর পাঠে তাকে বলা হয়েছে তাদের লিংগুয়াফ্রাংকা। সেই ভাষাতেই সিংহ শাসন চালায়।
দুধভাইয়ের সম্পর্ক। শিকারির গুলিতে মা-হারা ব্যাঘ্রশাবককে এক শূকরী নিজের দুধ পান করিয়ে বাঁচায়, আর শূকরছানা ও ব্যাঘ্রশাবক একসঙ্গে বড় হয়।
এই শেষ উপাদানটি গল্পের নৈতিক ভার পুরোপুরি বদলে দেয়। শূকর যখন বাঘকে মনে করায় — “আমার মায়ের দুধ একসঙ্গে ভাগাভাগি করে খেয়ে বড় হয়েছি” — বাঘের উত্তরটি সবচেয়ে ঠান্ডা: “কি আজেবাজে বলছ! বাঘের বাচ্চা কখনও শুকরের দুধ খায় নাকি?”
অর্থাৎ তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে বাঘ কেবল প্রতিশ্রুতি ভাঙে না — সে ইতিহাসটাই অস্বীকার করে।
ম্রো পাঠের নিজস্ব সংযোজন তিনটি, আর তিনটিই কৌশল ও পরিণতি নিয়ে।
এক — ঘুমের ভান। পেঁচা পুরো বিচার ঘুমিয়ে কাটায়, আর শেষে পাঠ নিজেই ব্যাখ্যা করে দেয় যে সে ঘুমাচ্ছিল না, ফন্দি আঁটছিল। এটি গল্পটিকে একটি আদালত-নাটকে পরিণত করে।
দুই — শূকরের সন্দেহ ও ঘৃণা। শূকর পেঁচার ক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ করে, আর ঘুমন্ত উকিল দেখে তার মনে ঘৃণাও জন্মায়। অন্য দুটি পাঠে শূকর শেষ পর্যন্ত আশাবাদী থাকে।
তিন — প্রবাদ। পাঠের একেবারে শেষ বাক্যটি গল্পের বাইরের: “মুরুং ভাষায় প্রবাদ আছে, যেখানে বন্যশূকর থাকবে সেখানে অবশ্যই পেঁচাকেও দেখা যাবে।”
এই শেষ সংযোজনটি গল্পের ধরনই বদলে দেয়। ম্রো পাঠে কাহিনিটি কেবল একটি গল্প নয় — একটি প্রচলিত কথার ব্যাখ্যা। অর্থাৎ গল্পটি শেষ হয় না; প্রতিবার শূকর আর পেঁচা একসঙ্গে দেখা গেলেই তা মনে পড়ে।
আরেকটি ছোট কিন্তু কার্যকর বিশদ — আদালতে দেরি করে পৌঁছানোর অজুহাত: “আমাদের আসার রাস্তা খুব দুর্গম।” পাহাড়ের বাস্তবতা এখানে গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
৭৫৪ শব্দের মারমা পাঠটি তিনটির মধ্যে ক্ষুদ্রতম, অথচ এর দুটি উপাদান অন্য দুটিতে নেই।
এক — পারস্পরিক সাহায্য। পেঁচা ফাঁদে পড়ে শরীরে আঠালো কিছু লেগে উড়তে পারছিল না, আর শূকর তার শরীর চুষে পরিষ্কার করে দেয়। অর্থাৎ উকিল নিজেই আগে উদ্ধার পেয়েছে, আর সেই ঋণ শোধ করতেই সে আদালতে দাঁড়ায়।
দুই — রাজকন্যার প্রতিক্রিয়া। পেঁচার দাবির কথা কানে যাওয়ামাত্র রাজকন্যা “কেঁদে কেঁদে প্রাসাদ ফাটিয়ে” ফেলে, আর কিছুতেই পেঁচাকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি নয়।
এই দ্বিতীয় উপাদানটি গল্পের কৌতুকের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে চাপটি বিচারকের উপর থেকে সরে পরিবারের ভেতরে চলে যায়। রাজা আইনের কারণে নয়, মেয়ের কান্নার কারণেও পিছু হটতে বাধ্য হন।
আর শূকরের উকিল খোঁজার ছয় দিনের ব্যর্থতাটিও কেবল মারমা পাঠে আছে — “একদিন-দুইদিন-তিনদিন এভাবে ছয়দিন পার হতে চলল উকিল মিলছে না।”
অর্থাৎ ক্ষুদ্রতম পাঠটিই আদালতি প্রক্রিয়ার দিক থেকে সবচেয়ে সম্পূর্ণ — রায়, আপিলের সময়, উকিল খোঁজা, আর্জি পেশের অনুমতি, আর শেষে একটি সাধারণ নিয়ম জারি।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠের বিচার-দৃশ্যটি আর্কাইভের সবচেয়ে বিস্তারিত আদালত-দৃশ্য, কারণ সেখানে কেবল দুই পক্ষ নয় — পুরো বন কথা বলে, আর প্রতিটি প্রাণীর যুক্তি আলাদা।
সিংহের প্রথম রায়টি ধর্মীয় যুক্তির উপর দাঁড়ানো, আর তার ভাষাটি গুরুত্বপূর্ণ: “স্বপ্ন হল স্বর্গীয় ব্যাপার। এটি সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ।” অর্থাৎ বাঘের স্বপ্নকে তিনি ঈশ্বরের আদেশ বলে ঘোষণা করেন, আর তাই “বাঘ শূকরকে এখন খেতে পারবে”।
প্রথম আপত্তি আসে বন্য কুকুর ও শিয়ালের কাছ থেকে, আর তা-ও “ভয়ে ভয়ে চাপা কন্ঠে”। তাদের যুক্তিটি নজিরের — স্বপ্নে যা দেখা যায় তা বাস্তবে হতে হবে, এমন কোনো নজির নেই।
সিংহের উত্তরটি যুক্তি নয়, চরিত্রহনন: “শিয়াল, কুকুর তোমারও মাংস পেলে ছাড় না… তোমাদের মুখে এ কথা সাজে না, চুপ কর।” আর গর্জনে তারা “গুটিশুটি মেরে” বসে থাকে।
দ্বিতীয় আপত্তি হাতির, আর এটিই সভার সবচেয়ে ধারালো যুক্তি। হাতি বলে, সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ হলে “স্বপ্নের মধ্যে শূকর মরে যেত… সেতো এখনো বেঁচে আছে। কাজেই এ স্বপ্নটি মিথ্যা।”
অর্থাৎ হাতি বাঘের দাবিকে তার নিজের ভিত্তিতেই পরীক্ষা করে — যদি স্বপ্ন সত্যিই ঈশ্বরের আদেশ হয়, তবে তা ইতিমধ্যেই ঘটে যেত।
গন্ডার পাল্টা যুক্তি দেয়, আর তার আক্রমণটি হাতির অভিজ্ঞতার উপর: তুমি জঙ্গলের সবচেয়ে প্রকাণ্ড জন্তু, বনের অন্যদের সঙ্গে তোমার তেমন সংশ্রব নেই, “কে কী রকম স্বপ্ন দেখে তুমি জানবে কিভাবে?”
তারপর গন্ডার বিচারকের পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ে — বাঘের স্বপ্নকে সে বিশ্বাস করে, আর সিংহকে রায় ঘোষণা করতে বলে। পাঠে লেখা, গন্ডারের কথায় সিংহ “আহ্লাদিত” হয়ে রায় দেন।
তৃতীয়বার হাতি আবার হস্তক্ষেপ করে, আর এবার শারীরিকভাবে — বাঘ আক্রমণের জন্য উদ্যত হলে হাতি তার সামনে গিয়ে গতিরোধ করে সিংহকে বলে, শূকরকে কিছুদিনের অবকাশ দিন।
এই একটি দৃশ্যে পুরো বিচারব্যবস্থাটির ছবি আছে: ছোট প্রাণীর যুক্তি ধমকে থামে, বড় প্রাণীর যুক্তি শোনা হয়, আর সবচেয়ে বড় প্রাণীর হস্তক্ষেপেই সময় মেলে।
শূকরের নিজের প্রস্তাবটিও লক্ষণীয়ভাবে সংযত। সে বাঘকে বলেছিল, সিংহ যদি রায় দেন তবে তার আপত্তি নেই — “বন্ধুর জন্য আমার এ দেহ হাসিমুখে বিসর্জন দেব।” অর্থাৎ সে বিচার মানতে রাজি, কেবল বিচারটি হতে হবে।
আর বাঘের হিসাবটিও পাঠে খোলাসা করা আছে — সে জানত শূকর কোনোদিন তার নাগালের বাইরে যেতে পারবে না, আর “মহাপরাক্রমশালী পশুরাজ সিংহ অবশ্যই তার পক্ষেই রায় দেবে”। সেজন্যই সে বিচারে যেতে রাজি হয়।
তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে পেঁচা শূকরকে সাহায্য করে কেবল দয়ায় নয় — তার নিজের একটি পুরনো হিসাব আছে, আর সেই হিসাবটি সিংহের সঙ্গে।
পাঠে পূর্বকথাটি বিস্তারে দেওয়া। একবার বনের পাখিদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা হয়েছিল — পাঠের ভাষায়, “সংগীতের কিংবা সে ধরণের এক প্রতিযোগিতা”।
পেঁচাই সারারাত ডাকাডাকি করে সবার চেয়ে বেশি যোগ্যতা দেখিয়েছিল, কিন্তু ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়ে সময়মতো সিংহের সামনে হাজির হতে পারেনি।
আর তখনই কাঠঠোকরা — পেঁচার ডাকাডাকিতেই যার ঘুম ভেঙেছিল — ভোররাতে দরবারে গিয়ে “কিচির-মিচির কক কক কোকর” ধ্বনি করে। অন্য কাউকে না দেখে সিংহ তাকেই সোনার মুকুট দিয়ে পুরস্কৃত করেন।
পাঠে উপসংহারটিও দেওয়া: “সে সময় থেকে কাঠঠোকরার মাথায় সোনার মুকুট শোভা পাচ্ছে।” অর্থাৎ এটি একটি উৎপত্তি-কাহিনি, আর তা বসানো আছে আরেকটি গল্পের ভেতরে।
এর ফলে পেঁচার চরিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। সে নিছক একজন চতুর উকিল নয় — সে একজন ভুক্তভোগী, আর তার অভিযোগটি ঠিক একই বিচারকের বিরুদ্ধে। পাঠে তা স্পষ্ট: “এ কারণে পেঁচা পশুরাজ সিংহের প্রতি খুবই ক্ষুব্দ।”
আর তার প্রথম প্রতিক্রিয়াটিও সেই ক্ষোভেরই — সিংহকে উদ্দেশ্য করে তাচ্ছিল্যভরে সে বলে, “সিংহের কী রকম বিচার এটা! আচ্ছা দেখা যাবে।”
তারপর সে তার কৌশলের বীজটিও সেখানেই বুনে রাখে, কথার ছলে: স্বপ্ন স্বর্গীয় বটে, “আমিও কত স্বপ্ন দেখি, সে সবই স্বর্গীয়। একটু আগেও আমি রাজ সিংহাসনে বসে এ বনে রাজত্ব করতে স্বপ্ন দেখলাম।”
এই একই কাঠঠোকরা-পেঁচার মোটিফটি আর্কাইভে আরেকবার আছে — চাকমা সৃষ্টিকথায়। সেখানে মাহ লখী মা-র আগমনের খবর পেঁচা সারারাত উড়ে উড়ে ছড়ায়, ভোরে একটু বিশ্রামে ঝোপের আড়ালে বসে, আর গ্রামবাসীরা সোনার টোপর পরিয়ে দেয় একটি কাঠঠোকরাকে।
দুটি পাঠে জনগোষ্ঠী আলাদা, কাহিনি আলাদা, কিন্তু অভিযোগটি হুবহু এক: সারারাতের পরিশ্রম গেল পেঁচার, আর পুরস্কার পেল কাঠঠোকরা। চাকমা পাঠে পেঁচার স্বগতোক্তিতে কারণটিও একই — “একটুখানি অলসতার দরুণ”।
[দুটি পাঠে এই মোটিফের মিল কোনো পঠিত উৎসে আলোচিত হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]
পেঁচার দিনের বেলায় লুকিয়ে থাকার কারণটিও তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে ব্যাখ্যা করা — তার চোখের পাতা নেই বলে সে সূর্যালোকে বের হতে পারে না, তাই ঝোপের আড়ালে দিন কাটায় আর সারারাত আহারের সন্ধান করে।
৩,৪২৯, ৯০৬ আর ৭৫৪ — তিনটি পাঠের শব্দসংখ্যা। কিন্তু ঘটনার সংখ্যা প্রায় এক। অর্থাৎ ফারাকটি কাহিনির নয়, বর্ণনার।
| যা পাঠে আছে | তঞ্চঙ্গ্যা | মারমা | ম্রো |
|---|---|---|---|
| সাতটি মূল ধাপ | আছে | আছে | আছে |
| বন ও তার আইনের ব্যাখ্যা | আছে | নেই | নেই |
| বন্ধুত্বের পূর্বকথা (দুধভাই) | আছে | নেই | নেই |
| ঝড় ও আশ্রয়ের দরকষাকষি | নেই | আছে | আছে |
| ঘুষের চুক্তি | স্বপ্নের ভেতরে | স্পষ্ট চুক্তি | স্পষ্ট চুক্তি |
| পেঁচার পাল্টা স্বপ্ন | আছে | আছে | আছে |
| বনের অন্য পশুদের মত | আছে | নেই | নেই |
| পেঁচার ঘুমের ভান | নেই | নেই | আছে |
| শেষে প্রবাদ | নেই | নেই | আছে |
ছকটি থেকে একটি কথা বেরিয়ে আসে: তিনটি পাঠে বাদ পড়া অংশগুলো আলাদা, আর বাড়তি অংশগুলোও আলাদা — কিন্তু কেন্দ্রের সাতটি ধাপ অক্ষত।
লোককথা মুখে মুখে চললে সাধারণত এটিই ঘটে। কাঠামোটি টেকে, কারণ সেটিই গল্পটিকে মনে রাখার যোগ্য করে; আর বিস্তারটি প্রতিবার কথকের নিজের।
তিনটি পাঠের মধ্যে কোনটি আগে, কোনটি পরে — তা এই তিনটি পাঠ থেকে বলা যায় না। [তিনটি রূপের মধ্যে সম্পর্ক বা অগ্রাধিকার নিয়ে কোনো পঠিত উৎসে আলোচনা পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
তিনটি রূপ পাশাপাশি রাখলে গল্পটির বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়, আর তা বন্ধুত্ব নয় — ক্ষমতা।
বাঘ শূকরকে খেতে চায় এটি গল্পের শুরু, শেষ নয়। গল্পের আসল ঘটনা হলো, সে খেতে চায় আইনের ভাষায় — একটি নিয়মের দোহাই দিয়ে, যে নিয়মটি কেবল তার নিজের জাতির।
আর তিনটি পাঠেই সেই দাবি আদালতে জিততে যাচ্ছিল, কারণ বিচারকের ভাগ ছিল। মারমা ও ম্রো পাঠে চুক্তি স্পষ্ট, আর তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে ভাগটি বাঘের স্বপ্নের ভেতরেই রাখা।
পেঁচার সমাধানটিও তাই আইনেরই। সে প্রমাণ করে না যে বাঘ মিথ্যা বলছে — সে কেবল দেখিয়ে দেয়, নিয়মটি সবার জন্য প্রযোজ্য হলে বিচারকের নিজের ঘরও তার আওতায় পড়ে।
এই কারণেই তিনটি পাঠে পেঁচার দাবির লক্ষ্য একই — বিচারকের কন্যা। অন্য কিছু দাবি করলে যুক্তিটি কাজ করত না।
তিনটি সমাপ্তির ফারাকও তাই অর্থবহ। মারমা পাঠে রাজা আইনটি বদলে দেন কিন্তু ভুল স্বীকার করেন না; ম্রো পাঠে বিচারক প্রকাশ্যে ক্ষমা চান; আর তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে সিংহ ফরমান জারি করে “নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়াস” পান।
অর্থাৎ তিনটি জনগোষ্ঠীর তিনজন কথক একই গল্প বলেছেন, কিন্তু ক্ষমতা ভুল স্বীকার করে কি না — এই প্রশ্নে তিনজন তিন রকম উত্তর দিয়েছেন।
আর্কাইভের অন্য গল্পেও বাঘ বারবার হারে — চাকমা গল্পে শামুকের কাছে, ত্রিপুরা গল্পে কচ্ছপের কাছে, সাঁওতাল গল্পে খরগোশের কাছে। কিন্তু এই তিনটি পাঠেই কেবল বাঘ হারে আদালতে, শক্তিতে নয়।
তিনটি পাঠের তিনজন আলাদা লেখক, আর তিনজনের নামই নিজের জনগোষ্ঠীর।
কেবল তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে উৎস-গ্রন্থের নাম আছে, আর সেই বইয়ের শিরোনামেই তিনটি শব্দ — রূপকথা, লোককাহিনী ও কিংবদন্তী। অর্থাৎ সংকলনকারী নিজেই তিনটি ধরনকে আলাদা করেননি।
ম্রো পাঠটির লেখকের নাম আর্কাইভে তিন বানানে আছে — সিংইয়ং ম্রো, সিংইয়ং মুরুং ও সিং ইয়ং মুরুং — আর এই পাঠে তৃতীয়টি। [তিনটি বানান একই ব্যক্তির কি না তা নিশ্চিত করা যায়নি]
আর্কাইভে আরেকটি শূকর-পেঁচার গল্পও আছে — ত্রিপুরা বুননা শূকর ও ইঁদুর — কিন্তু সেটি এই কাহিনি নয়; সেখানে শূকরের সঙ্গী ইঁদুর, আর গল্পের শেষে চিল ও ইঁদুরের বন্ধুত্ব।
প্রতিটি জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সূচি আছে আলাদা পাতায় — মারমা রূপকথা, ম্রো রূপকথা, আর সব জনগোষ্ঠীর হিসাব পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।
জুমজার্নালের আর্কাইভে তিনটি — তঞ্চঙ্গ্যা বাঘ ও শূকরের মিতালী (৩,৪২৯ শব্দ), ম্রো পাক হন প্রি (শূকর ও বাঘ) (৯০৬ শব্দ) আর মারমা বাঘ ও শূকরের গল্প (৭৫৪ শব্দ)। তিনজন আলাদা লেখকের লেখা, অথচ কাঠামো প্রায় এক।
সাতটি ধাপ — ঝড় বা কোনো দুর্যোগ, শূকরের ঘরে বাঘের আশ্রয়, ক্ষতি না করার প্রতিশ্রুতি, সকালে বাঘের স্বপ্নের দাবি, বিচারে যাওয়া, শূকরের অবকাশ চাওয়া (মারমা ও ম্রো পাঠে সাত দিন, তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে পনের), আর শেষে পেঁচার পাল্টা স্বপ্নের দাবি।
তিনটি পাঠেই বাঘ দাবি করে, স্বপ্নে দেখা জিনিস বাস্তবে করা তার জাতির নিয়ম। মারমা পাঠে তার কথা — “আমাদের নিয়ম আমি কোন প্রকারেই ভাঙ্গতে পারবো না।” অর্থাৎ সে নিজের লোভকে একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে পেশ করে।
বাঘের যুক্তিটিই সে বিচারকের বিরুদ্ধে ঘুরিয়ে দেয় — সে দাবি করে, স্বপ্নে সে বিচারকের বা রাজার কন্যাকে বিয়ে করেছে, তাই একই নিয়মে তাকেও তা বাস্তবে পেতে হবে। বাঘের দাবি মানলে পেঁচার দাবিও মানতে হয়, আর সেটি বিচারকের নিজের পক্ষে অসম্ভব।
তিন রকম। মারমা পাঠে রাজা, ম্রো পাঠে একজন বিচারক, আর তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে পশুরাজ সিংহ — সেখানে সভায় হাতি, গন্ডার ও অন্য পশুরাও উপস্থিত থাকে এবং মত দেয়।
তিনটি পাঠেই বিচার শুরুর আগেই ভাগ ঠিক হয়ে গেছে। মারমা পাঠে রাজা ও বাঘের সন্ধি হয় — বাঘ জিতলে শূকরের অর্ধেক রাজা, অর্ধেক বাঘ পাবে। ম্রো পাঠে বাঘ নিজে গিয়ে বিচারকের সঙ্গে মাংস ভাগাভাগির চুক্তি করে। তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে ভাগের প্রস্তাবটি বাঘের স্বপ্নের ভেতরেই আছে।
না। মারমা পাঠে রাজা দু’পক্ষকেই তাড়িয়ে দিয়ে নিয়ম জারি করেন — “স্বপ্নে দেখলে কেউ কাউকে খেতে বা বিয়ে করতে পারবেনা।” ম্রো পাঠে বিচারক প্রকাশ্যে ভুল স্বীকার করে পেঁচার কাছে ক্ষমা চান। তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে সিংহ ক্ষমা চান না, বরং ফরমান জারি করেন যে শূকরের কোনো বিপদ হলে বাঘকেই দায়ী করা হবে।
বাড়তি অংশটুকু কাহিনি নয়, ব্যাখ্যা — বনের মাংসভোজী ও তৃণভোজী পশুর স্বভাব, অরণ্যের আইন, সিংহ কেন রাজা, বনের সার্বজনীন ভাষা, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বাঘ ও শূকরের বন্ধুত্বের পূর্বকথা।
শিকারির গুলিতে মা-হারা এক ব্যাঘ্রশাবককে এক সদ্যপ্রসূতি শূকরী নিজের দুধ পান করিয়ে বাঁচায় ও লালন করে, আর শূকরছানার সঙ্গে সে একসঙ্গে বড় হয়। পরে শূকর যখন সেই কথা মনে করায়, বাঘ তা অস্বীকার করে — “বাঘের বাচ্চা কখনও শুকরের দুধ খায় নাকি?”
সে ঘুমের ভান করেছিল। বিচারকের কাছে অনুমতি নিয়ে সে সভার খাটে ঘুমিয়ে পড়ে, পুরো বিচার বাঘের পক্ষে চলে যায়, আর রায় হওয়ার পর তাকে জাগানো হলে সে পাল্টা দাবি তোলে। পাঠ শেষে নিজেই ব্যাখ্যা করে — “একটি ফন্দি বের করবার জন্য সে ঘুমের ভান করেছিলো।”
দুর্ঘটনায়। ক্লান্ত শূকর একটি শুকনো গাছে হেলান দিতে গিয়ে শিকারির ফাঁদে পড়া পেঁচাটিকে মাটিতে ফেলে দেয়। পেঁচার শরীরে আঠালো কিছু লেগে থাকায় সে উড়তে পারছিল না; শূকর তার শরীর চুষে পরিষ্কার করে দেয়, আর সেই ঋণেই পেঁচা উকিল হিসেবে দাঁড়ায়।
“মুরুং ভাষায় প্রবাদ আছে, যেখানে বন্যশূকর থাকবে সেখানে অবশ্যই পেঁচাকেও দেখা যাবে।” অর্থাৎ ম্রো পাঠে গল্পটি কেবল একটি কাহিনি নয় — একটি প্রচলিত কথার ব্যাখ্যা।
তিনটি পাঠ থেকে তা বলা যায় না। কেবল তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে উৎস-গ্রন্থের নাম আছে, বাকি দুটিতে কেবল লেখকের নাম; আর কোনো পাঠে সংগ্রহের বছর বা স্থান দেওয়া নেই।
শূকর আছে আর্কাইভের ৩০টি পাঠে, সবচেয়ে বেশি ত্রিপুরা সংগ্রহে — ১৫টিতে। ত্রিপুরা বুননা শূকর ও ইঁদুর-এ শূকরের সঙ্গী ইঁদুর, আর বনের এক বিচারক-এ বুনোশূকরই বাঘের বাচ্চাকে বাঁচায়। তবে এই তিনটি পাঠের কাহিনি-কাঠামো আলাদা কোনো গল্পে নেই।
বন্য কুকুর ও শিয়াল ভয়ে ভয়ে বলে, স্বপ্নে দেখা জিনিস বাস্তবে হতে হবে এমন নজির নেই — আর সিংহ তাদের ধমকে থামিয়ে দেন। হাতি বলে, সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ হলে “স্বপ্নের মধ্যে শূকর মরে যেত”, তাই স্বপ্নটি মিথ্যা। গন্ডার হাতির অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাঘের পক্ষ নেয়।
তার একটি পুরনো ক্ষোভ আছে। পাঠ অনুযায়ী পাখিদের একটি প্রতিযোগিতায় পেঁচাই সারারাত ডাকাডাকি করে সবচেয়ে বেশি যোগ্যতা দেখিয়েছিল, কিন্তু ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়ে সময়মতো হাজির হতে পারেনি — আর সিংহ সোনার মুকুট দিয়ে দেন কাঠঠোকরাকে। পাঠে লেখা, “এ কারণে পেঁচা পশুরাজ সিংহের প্রতি খুবই ক্ষুব্দ।”
আর্কাইভে আরেকবার — চাকমা সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী-তে। সেখানে মাহ লখী মা-র আগমনের খবর পেঁচা সারারাত উড়ে ছড়ায়, ভোরে একটু বিশ্রাম নেয়, আর গ্রামবাসীরা সোনার টোপর পরিয়ে দেয় একটি কাঠঠোকরাকে। দুটি পাঠে জনগোষ্ঠী ও কাহিনি আলাদা, কিন্তু অভিযোগটি এক।
এই পাতার সব তুলনা জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত তিনটি পাঠের নিজের লেখা থেকে করা — শব্দসংখ্যা, ঘটনাক্রম, সংলাপ, লেখকের নাম ও উৎসের নামসহ। তিনটি পাঠই সম্পূর্ণ পড়া হয়েছে, আর উদ্ধৃতিগুলো হুবহু।
সব ব্যক্তির নাম, জনগোষ্ঠীর নাম ও মূল ভাষার শব্দ আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে। তুলনাটি তিনটি পাঠের ঘটনাক্রম ধরে করা; কোনো পাঠকে অন্যটির চেয়ে প্রামাণিক বলা হয়নি। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।
প্রসঙ্গ:তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ম্রো, রূপকথা, লোককাহিনী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।