Last updated Oct 15th, 2026
0

জুমজার্নালের আর্কাইভে মারমা জনগোষ্ঠীর ১৯টি রূপকথা ও লোককাহিনী আছে — ত্রিপুরা সংগ্রহের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম। এই পাতাটি সেই ১৯টির পূর্ণ ভাণ্ডার।
মোট ২৭,৩৮৮ শব্দ, গড় গল্প ১,৪৪১ শব্দের — ত্রিপুরা সংগ্রহের গড়ের চেয়ে বেশি। দীর্ঘতম পাঠ ২,৯৬২ শব্দের, আর ক্ষুদ্রতমটি ১৬৪ শব্দের, যা পুরো আর্কাইভেরও ক্ষুদ্রতম।
এই সংগ্রহের সবচেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য লেখকের নাম। ১৬টি পাঠে লেখকের নাম ছাপা আছে, আর তাঁদের প্রায় সবাই মারমা — অর্থাৎ গল্পগুলো অন্য কারও সংকলন থেকে অনুবাদ করে আনা নয়, নিজেদের লেখা।
আর্কাইভে মারমা গল্পের সংখ্যা ১৯। এর মধ্যে ১৬টির শিরোনামে “মারমা রূপকথা”, তিনটিতে “মারমা লোককথা” আর তিনটিতে “মারমা লোককাহিনী” — সংখ্যাগুলো যোগ করলে ১৯-এর বেশি হয়, কারণ কিছু গল্প একাধিক লেবেল বহন করে।
শিরোনামের গঠনে মারমা সংগ্রহ অন্য পাহাড়ি সংগ্রহগুলোর থেকে আলাদা। ম্রো, খেয়াং, চাক ও খুমী সংগ্রহে শিরোনামে মূল ভাষার নাম আর বন্ধনীতে বাংলা অর্থ থাকে; মারমা সংগ্রহে তা প্রায় নেই। ১৯টির মাত্র তিনটির শিরোনাম মারমা ভাষায় — লুম্বোওয়াইং খইয়ক, ন ক নিং ও সুহওয়েন্না সামাহ — আর তিনটির কোনোটিতেই বন্ধনীতে বাংলা অর্থ দেওয়া নেই।
সেই তিনটি শিরোনামের অর্থ পাঠের ভেতরেও স্পষ্ট করা হয়নি। [তিনটি মারমা শিরোনামের বাংলা অর্থ কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
চারটি লেবেলের পূর্ণ ব্যাখ্যা আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।
১৯টি পাঠের ১৬টিতে লেখকের নাম ছাপা আছে, আর সেই নামগুলোর সংখ্যা তেরো। এটি আর্কাইভে একটি বড় ফারাক — ত্রিপুরা সংগ্রহের ৩৯টি পাঠের অর্ধেকের বেশি একই হাতের, আর মারমা সংগ্রহে প্রায় প্রতিটি গল্প আলাদা হাতের।
| লেখকের নাম | যত পাঠে |
|---|---|
| মং সিংজ্ঞা | ২ (একই গল্প দুই পোস্টে) |
| মং সিং ঞো | ২ |
| টহ-ওয়ে | ২ |
| চাই সুই হ্র | ১ |
| রূপশী নেওয়ার মণি | ১ |
| মং ক্য শশায়ে নু | ১ |
| মংচাই শে ম্যা | ১ |
| মং চাই শৈ ম্যা | ১ |
| মা উ চিং | ১ |
| পুলু প্রু | ১ |
| হ্লা থোয়াই চিং মারমা | ১ |
| মাসিঞো মারমা | ১ |
| উ শৈ সিং | ১ |
দুটি নাম প্রায় একই — মংচাই শে ম্যা ও মং চাই শৈ ম্যা। সম্ভবত একই ব্যক্তি, দুই বানানে। [একই ব্যক্তি কি না তা কোনো পঠিত উৎসে নিশ্চিত করা যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
তালিকার একটি নামের সঙ্গে শ্রেণিও আছে: মাসিঞো মারমা (সপ্তম শ্রেণী), যাঁর লেখা বিপদের রাজা। অর্থাৎ আর্কাইভে স্কুলছাত্রদের লেখা গল্প কেবল চাকমা ও ত্রিপুরা সংগ্রহে নয়, মারমা সংগ্রহেও আছে।
নামগুলোর ধরনও একটি তথ্য। প্রায় সবই মারমা নাম, আর সেগুলোর বানান বাংলা লিপিতে — মং, চাই, হ্লা, টহ, পুলু, উ, মা। এর অর্থ, গল্পগুলো মারমা লেখকদের নিজের লেখা, কোনো বাইরের সংকলন থেকে অনুবাদ নয়।
মারমা সংগ্রহে উৎস-গ্রন্থের নাম আছে মাত্র তিনটি পাঠে, আর তিনটিতেই একই নাম — ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা।
প্রথম দেখায় অসঙ্গত লাগে — মারমা গল্প ত্রিপুরার বইয়ে কেন। কারণটি সরল: বইটির নামে “ত্রিপুরা” একটি ভূখণ্ড, জনগোষ্ঠী নয়। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে মারমা জনগোষ্ঠীর বসবাস আছে, আর বইটি সেই রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর লোককথার সংকলন।
সেই একই বই থেকে আর্কাইভে এসেছে চাকমা পাঁচটি, ত্রিপুরা চারটি, কলই একটি ও হালাম একটি গল্প — অর্থাৎ একটি সংকলন থেকেই ছয়টি জনগোষ্ঠীর গল্প।
বাকি ১৬টি পাঠে বইয়ের নাম নেই; সেগুলোতে কেবল লেখকের নাম আছে। এর অর্থ মারমা সংগ্রহের প্রায় সবটাই সরাসরি লেখকদের কাছ থেকে এসেছে, কোনো মুদ্রিত সংকলনের মধ্যস্থতা ছাড়াই।
সংগ্রাহক, কথক ও বইয়ের ভূমিকা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ের লোককথা কে সংগ্রহ করেছিলেন-এ।
আর্কাইভের সবচেয়ে আত্মসচেতন পাঠটি মারমা সংগ্রহের ন ক নিং। গল্পটি শুরুই হয় নিজের ধরনটি চিনিয়ে দিয়ে, আর সেখানে চারটি চেনা নাম এসে পড়ে।
পাঠের প্রথম বাক্যেই লেখা — “‘ন ক নিং’ — ঠক, প্রতারণার এক সার্থক চরিত্র।” তারপর তুলনা: বাংলা সাহিত্যে গোপাল ভাঁড়ের গল্প, বীরবলের হাল খাতা, হোজ্জা নাসিরুদ্দীনের গল্প সম্ভার, আর ঠক চাচার কাহিনী — এগুলো যেমন হাস্যরসে সমৃদ্ধ, তেমনই ন ক নিং।
এই একটি অনুচ্ছেদ কয়েকটি কাজ একসঙ্গে করে। এটি গল্পটিকে একটি আন্তর্জাতিক ধারার ভেতরে বসায় — বাংলা, ভারতীয় ও তুর্কি-ফারসি ঠক-চরিত্রের পাশে একটি মারমা ঠক-চরিত্র।
আর্কাইভে ঠক-কাহিনি আরও আছে। ঠকের গল্প (২,৯২১ শব্দ) পুরোটাই একজন ঠকের কাণ্ডকারখানা, আর লুম্বোওয়াইং খইয়ক-এ সাত বন্ধু যারা কোনো কাজ গুরুত্ব দিয়ে করতে পারে না। ত্রিপুরা সংগ্রহে একই ধারার চরিত্র নাডেং ডেং।
পার্থক্যটি লক্ষণীয়: ন ক নিং-এর শেষে ঠক শাস্তি পায় না — সে মন্দির থেকে বেরিয়ে “নাক বরাবর পূর্বদিকে” হাঁটা শুরু করে, অজানার উদ্দেশ্যে। আর ঠকের গল্প শেষ হয় বিয়েতে, বাবা-মায়ের খুশিতে।
আর্কাইভে আরেকটি পাঠ নিজের বিষয়কে বাইরের একটি চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করে — মারমা ফৌহ, যেখানে সরাসরি ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলার কথা এসেছে।
পাঠের শুরুতেই ড্রাকুলার বর্ণনা — দিনের বেলা কফিনে মৃতের মতো শুয়ে থাকা, আর রাতে বেরিয়ে পড়া। তারপর সেই ছাঁদে ফৌহ-র পরিচয় দেওয়া হয়।
গল্পটি শেষ হয় একটি স্বীকারোক্তিতে, যা লোককথা সংগ্রহের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ: এই বিশ্বাস ও কাহিনিগুলো পার্বত্যাঞ্চলের গ্রামে “লোকের মুখে মুখে প্রচলিত”, আর “অনুসন্ধান করা হলে অনেক কাহিনী জানা যাবে”।
অর্থাৎ লেখক নিজেই বলছেন সংগ্রহটি সম্পূর্ণ নয়। আর্কাইভে এই ধরনের স্বীকারোক্তি আর কোনো পাঠে নেই, আর এটিই পাঠটিকে একটি গল্পের বেশি কিছু করে তোলে — একটি অসম্পূর্ণ মাঠ-নোট।
মারমা সংগ্রহের তিনটি পাঠে ভূত বা প্রেত আছে — ভূতের গল্প, ফৌহ আর লজ্জাবতী গাছের গল্প। আর্কাইভে কোনো একটি জনগোষ্ঠীর সংগ্রহে এটিই সর্বোচ্চ।
সংখ্যাটি ছোট শোনায়, কিন্তু তুলনায় নয়। আর্কাইভের ১২৫টি পাঠের মাত্র ১৪টিতে ভূত বা প্রেত আছে, আর তার মধ্যে তিনটি মারমা সংগ্রহের — খেয়াং সংগ্রহের তিনটির সমান, তবে খেয়াং তিনটি আসলে একই গল্পের তিনটি কপি।
এর মধ্যে একটি পাঠ গঠনেই আলাদা — ভূতের গল্প, যা একটি নয়, কয়েকটি গল্প একসঙ্গে। পাঠ শুরু হয় “গল্প-১” দিয়ে, তারপর একের পর এক। শব্দের ঘনত্বেও এটি আর্কাইভে দ্বিতীয় — ১,১৩১ শব্দে বাইশবার।
প্রথম গল্পের শুরুতেই পাহাড়ের জীবিকা আছে: দুই গরিব বন্ধু ফাঁদ পেতে বন-মোরগ ধরত, আর শামুক-ঝিনুক-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করত, আর নয়-দশ দিনের খোরাকি নিয়ে গভীর বনে যেত।
পাঠের শেষ লাইনটি আর্কাইভের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত উপসংহার। ঘর-ফেরা একজন দূর থেকে দেখে, সেই লোকটা আনমনে বিড়ি ফুঁকছে — আর ভাবে: “ভূত হলেই দুষ্ট হয় না, ভদ্র ভূতও আছে।”
পাহাড়ের ভয়ের জগৎ, তার নিয়ম আর প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি ভূতের গল্পে।
মারমা সংগ্রহের তিনটি পাঠ কোনো একটি জিনিসের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে, আর তিনটিরই শেষ বাক্যে “তখন থেকে” শব্দবন্ধ।
| গল্প | যা ব্যাখ্যা করে |
|---|---|
| লজ্জাবতী গাছের গল্প | লজ্জাবতী গাছের বিস্তার কীভাবে শুরু হলো — রাজপুত্রের কবরে ছড়ানো লতা থেকে |
| পাখিদের চিকিৎসক কোকিল | কোকিলের ডিম কেন কংরং পাখি ফুটিয়ে বাচ্চা লালন করে |
| বাঘ ও শূকরের গল্প | বাঘ ও শূকর কীভাবে আজীবন বন্ধু হয়ে গেল |
লজ্জাবতী গাছের গল্প-এর গঠনটি লক্ষণীয়। গাছটির নামের ভেতরেই তার আচরণ আছে — স্পর্শে নুয়ে পড়া — আর গল্পটি সেই আচরণের একটি কারণ দেয়। পাঠে ছবির কৃতিত্বও আছে: চিত্রটি এঁকেছেন তন্ময় চাকমা।
পাখিদের চিকিৎসক কোকিল-এ ব্যাখ্যাটি জীববিজ্ঞানের একটি বাস্তব আচরণ ঘিরে — কোকিল অন্য পাখির বাসায় ডিম রাখে। গল্পটি সেই আচরণকে কোকিলের চিকিৎসক-ভূমিকার পুরস্কার হিসেবে দেখায়।
অর্থাৎ এই গল্পগুলো প্রকৃতির একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে শুরু করে, তারপর তার একটি কারণ বানায়। পর্যবেক্ষণটি সত্য, কারণটি গল্প — আর দুটোই একসঙ্গে পাঠে আছে।
আর্কাইভে একই কাহিনি-কাঠামো তিনটি জনগোষ্ঠীর সংগ্রহে তিন নামে আছে, আর মারমা রূপটির নাম সবচেয়ে সরল — বাঘ ও শূকরের গল্প।
মারমা রূপটিতে শুরুটি ঝড় দিয়ে — শূকর বাঁশঝাড়ের নিচে লতা-পাতা দিয়ে আশ্রয় বানায়, আর সেখানেই বাঘের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুত্বের সূত্রপাত।
সংকটটি আসে একটি স্বপ্ন থেকে, আর তার মীমাংসা করে একটি পেঁচা। পেঁচার রায়টি পাঠে হুবহু আছে: “স্বপ্নে দেখলে কেউ কাউকে খেতে বা বিয়ে করতে পারবেনা।”
এই রায়ের ফলেই শূকর প্রাণে বাঁচে, আর দু’জনের মধ্যে আজীবন বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তিনটি ভাষার তিনটি রূপ পাশাপাশি রেখে তুলনা আছে আলাদা লেখায়: বাঘ ও শূকরের মিতালি, তিন ভাষায়।
লক্ষণীয়, মারমা সংগ্রহে বাঘ আছে মাত্র দুটি পাঠে — অথচ শূকর তিনটিতে, আর সাপ নয়টিতে। মারমা সংগ্রহের প্রধান প্রাণী বাঘ নয়, সাপ।
মারমা সংগ্রহের দীর্ঘতম পাঠ রোসাঙ রাজা ও এক শিল্পীর কাহিনী (২,৯৬২ শব্দ), আর তার পটভূমি একটি ঐতিহাসিক নাম — রোসাঙ, যা বাংলা সাহিত্যে আরাকান রাজসভার পরিচিত নাম।
শুরুর বর্ণনাটি রাজসভার — “মন্ত্রী-সান্ত্রী উজিরনাজির- কবি শিল্পীতে গমগম করত তাঁর রাজসভা।” অর্থাৎ গল্পের জগৎ জুমের গ্রাম নয়, একটি দরবার।
কাহিনির কেন্দ্রে একজন শিল্পী ও রানির প্রতিকৃতি, আর সেখান থেকে সন্দেহ ও হত্যার পরিকল্পনা। শেষটি অস্বাভাবিক — রাজা নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান, আর শিল্পী “শুধু মুচকি হেসে তাঁর নীরব সম্মতি” জানান।
পাঠের উৎস হিসেবে লেখা ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা। অর্থাৎ আরাকান রাজসভার একটি কাহিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের একটি সংকলনে উঠেছে, আর সেখান থেকে এসেছে আর্কাইভে।
মারমা জনগোষ্ঠীর ইতিহাসে আরাকানের সম্পর্ক নিয়ে আলাদা আলোচনা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীগুলো-র লেখায়। [গল্পটি কোন রোসাঙ রাজার সময়ের, তা পাঠে বলা নেই — যাচাই প্রয়োজন]
রোসাঙ রাজা ও এক শিল্পীর কাহিনী-র কেন্দ্রে একটি ছবি, আর গল্পের পুরো সংকটটি দাঁড়িয়ে আছে সেই ছবির একটি ছোট্ট বিশদের উপর — রানির বাঁ পায়ের হাঁটুর একটু উপরের একটি জন্মদাগ।
ঘটনাটি শুরু হয় একটি প্রতিযোগিতায়। রাজসভার শিল্পীরা রানির প্রতিকৃতি আঁকেন, আর রোসাঙ রাজ্যের এক শিল্পীর ছবিটিই হুবহু বলে নির্বাচিত হয়। পাঠে সেই শিল্পীর পরিচয়ও বিস্তারে দেওয়া — তিনি কেবল আঁকতেন না, কবিতা লিখতেন, গান করতেন, আর “মন্ত্র-তন্ত্র জপ-তপের মাধ্যমে অনেক অসাধ্য সাধন করতেন”।
ছবিটি দেখে রাজা প্রথমে মুগ্ধ। পাঠে বর্ণনাটি দীর্ঘ — কাঁচা হলুদের মতো গায়ের রং, ডালিমের মতো ওষ্ঠ, কাজলকালো দীর্ঘ চুল, আলতা-রাঙা চরণ।
তারপরই মোচড়। রাজার মনে পড়ে জন্মদাগটির কথা, আর ছবিতে সেই দাগটিও আঁকা। রাজার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক: শিল্পীর মৃত্যুদণ্ড, কারণ কাপড়ের ভেতরের দাগ তিনি দেখবেন কীভাবে।
গল্পের সবচেয়ে ভালো অংশটি এরপর, আর তার নায়ক শিল্পী নন — মন্ত্রী। তিনি প্রথমে রানির পক্ষে দাঁড়ান, তারপর শিল্পীর পক্ষে, আর যুক্তিটি দেন তাঁর দিব্যদৃষ্টির — শিল্পী “তন্ত্র মন্ত্রে পারদর্শী দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন এক মহানুভব ব্যক্তি”।
রাজা মানেন না, আর তখন মন্ত্রী কেবল সময় চান — “হঠাৎ ঝোঁকের মাথায় এত বড় একটা পাপ কাম করবেন না।” এই একটি বাক্যেই গল্পের নীতিটি আছে, আর শেষে রাজা নিজেই ক্ষমা চান।
অর্থাৎ গল্পটি বিচারব্যবস্থার, প্রেমের নয়। প্রমাণ কীভাবে ভুল পড়া যায়, আর তাড়াহুড়োর বিচার কীভাবে অন্যায় হয়ে ওঠে — এই দুটিই এর বিষয়।
মারমা সংগ্রহের সবচেয়ে সংযত পাঠ অলস ছেলে, আর তার কেন্দ্রীয় কথাটি শিরোনামেই লুকিয়ে — নামটি ভুল, আর গল্পটি সেই ভুল নামের জীবনের।
ছেলেটি অনাথ, মামা-মামীর ঘরে বড় হচ্ছে। পাঠ জানায়, মামা-মামী কাজে বেরিয়ে যাবার পরই তার উপর শুরু হত অত্যাচার, আর সংসারের সব কাজই তাকে করতে হত।
গল্পের সবচেয়ে ধারালো মুহূর্তটি একটি প্রশ্ন, আর ছেলেটি সেটি নিজেকেই করে: “আমি এত কাজ করি, তারপরও আমি অলস ছেলে? এত কাজ করার পরও মামী আমার নাম ‘অলস ছেলে’ রাখল কেন?”
প্রশ্নটি শেষ হতে পারে না, কারণ ঠিক তখনই মামীর ডাক এসে পড়ে — গাছের গুঁড়ি কেটে লাকড়ি বের করতে হবে, আর গালিটিও সঙ্গে: “অলসের পেঁকি কোথাকার।”
এরপর পাঠে একটি ব্যাখ্যা আছে, যা গল্পের ভেতরে বসানো একটি পর্যবেক্ষণ: “একজন লোক যদি সারাক্ষণই শুধু গাল-মন্দ শুনে বা গাল-মন্দ শোনার ভয়ে আতঙ্কিত থাকে তাহলে তার চিন্তা-শক্তি এমনিতেই ভোঁতা হয়ে যাবে।”
অর্থাৎ গল্পটি বলছে ছেলেটি বোকা নয় — তাকে বোকা বানানো হয়েছে। মামা মারা যাওয়ার পর উনিশ বছর বয়সে সংসারের ভার তার কাঁধে পড়ে, সে শহরে কাজ নেয়, আর উপার্জন হারায়।
শেষটি কোনো রায় নয়, একটি দৃশ্য — ছেলেটির প্রশ্নের উত্তরে মামী কিছুই বলেন না, কেবল “তার চোখ দিয়ে তখন ঝরতে লাগল অঝোরে অনুতপ্তের তপ্ত অশ্রু”। লেখক রূপশী নেওয়ার মণি।
মারমা সংগ্রহের তৃতীয় দীর্ঘতম পাঠে লোভের গল্পটি শুরু হয় তার উল্টো দিক থেকে — সততা দিয়ে।
মংগ্রী গরিব, কিন্তু পাঠে তার চরিত্রের বর্ণনা স্পষ্ট: সহজ, সরল, সত্যবাদী ও ধার্মিক, কোনো কাজে ফাঁকি দিত না, কারও জিনিস চুরি করত না — তাই গ্রামের সকলে তাকে ভালোবাসত।
গল্পের প্রথম মোড় একটি ছোট পুরস্কারে। জমিদারের বাড়িতে দৈনিক হাজিরার কাজে তার যত্ন দেখে জমিদার খুশি হয়ে এক কাঠা ধান দেন — আর পাঠে লেখা, জীবনে এই প্রথম সে এতগুলো ধান একসঙ্গে পেয়েছে।
এরপরের সিদ্ধান্তটি গল্পের সবচেয়ে বাস্তব অংশ: সে ধানের অর্ধেক বীজের জন্য রেখে বাকিটা ভেঙে সেদিন পরিবারের সঙ্গে পেট ভরে খায়। একজন জুমচাষির হিসাবটি এখানেই।
তারপর আসে স্বপ্ন — গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু-মহিষ, দীঘি ভরা মাছ, কর্মচারী ভর্তি বাড়ি। আর স্বপ্নের ভেতরেই সে নরম গদিতে শুয়ে কোলবালিশ টানতে গিয়ে “ধুপ করে মাটিতে পড়ে যায়”; জেগে দেখে, সে ভাঙা বাঁশের মাচা থেকে মাটিতে পড়েছে।
এই একটি দৃশ্যেই গল্পের পুরো বক্তব্য আছে, আর তা শেষের প্রবাদের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। স্বপ্নের গদি আর বাস্তবের বাঁশের মাচা — দুটো একই বাক্যে।
শেষে লোভের পরিণতি আসে সাপের দংশনে, আর পাঠ তার রায় দেয় উদ্ধৃতিচিহ্নে: “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।” উৎস ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা।
মারমা সংগ্রহের একটি স্পষ্ট ধারা হলো সরাসরি নীতিবাক্য — গল্প শেষ হওয়ার পর কথক একটি রায় দেন, প্রায়ই উদ্ধৃতিচিহ্নে।
সবচেয়ে সরাসরি উদাহরণ সাদা টিয়াপাখির দেশ, যা শেষ হয় একটি প্রবাদে — “লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু।” তার আগের বাক্যটিই ঘটনা: “অতি লোভে সমস্ত পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল।”
অনুতপ্ত কৃষক ১৬৪ শব্দের, আর্কাইভের ক্ষুদ্রতম পাঠ — কিন্তু তার কাঠামো সম্পূর্ণ। পোষা বেজি কৃষকের দু’বছরের ছেলের সঙ্গে খেলত; ভুল বুঝে কৃষক বেজিটিকে মেরে ফেলে, আর তারপর তার নিজের কথাতেই রায়: “সন্তানও গেল, বেজীওগেল।”
সুহওয়েন্না সামাহ-তে রায়টি ধর্মীয় — পিতা-মাতার সেবার সুফল ইহলোক ও পরলোক দুই জায়গায়, আর সেটি “সুমহান পবিত্র কুশল-কর্মও বটে”। “কুশল” শব্দটি বৌদ্ধ পরিভাষা, আর মারমা জনগোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী।
অলস ছেলে-র শেষটি রায় নয়, একটি দৃশ্য — মামী কিছুই বলেন না, কেবল তাঁর “চোখ দিয়ে তখন ঝরতে লাগল অঝোরে অনুতপ্তের তপ্ত অশ্রু”। এই সমাপ্তিটিই আর্কাইভের মারমা সংগ্রহে সবচেয়ে সংযত।
ন ক নিং পাঠটি আর্কাইভে গঠনে অনন্য, কারণ এটি একটি গল্প নয় — পাঠে স্পষ্ট লেখা আছে, “এখানে পাঁচটি খন্ড উপস্থাপন করা হল।” অর্থাৎ একটি চরিত্রের পাঁচটি পর্ব, নামসহ।
প্রথম খণ্ডের নাম “জন্ম কথা”। নিঃসন্তান এক দম্পতির দীর্ঘ অপেক্ষা, আর তারপর স্ত্রীর একটি অদ্ভুত স্বপ্ন — “সাগরের দুই পাড়ে দুটি পা রেখে উপুড় হয়ে পানি পান করা”।
স্বপ্নের অর্থ জানতে তাঁরা যান বিদাং ছারা-র কাছে, আর শব্দটির অর্থ পাঠেই বন্ধনীতে দেওয়া: পন্ডিত। ঘরে তখন আরও কয়েকজন দর্শনার্থী, আর স্বপ্নের বিবরণ শুনে তাঁরা “হিহি করে হেসে” ফেলেন।
ভবিষ্যদ্বাণীটি গল্পের পুরো কাঠামো ঠিক করে দেয়, আর তার ভাষা অসাধারণ: ঘরে এমন একজন আসবেন যিনি মহাজ্ঞানী বলে পরিচিত হবেন — “কিন্তু এখন তা হবে না। কারণ ঐ মেহমানের আত্মিক সত্তাকে হাস্যরসে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপরও তিনি বিখ্যাত হবেন।”
অর্থাৎ যে হাসি দিয়ে তাঁর জ্ঞানী হওয়া নষ্ট হলো, সেই হাসিই তাঁকে বিখ্যাত করবে — একজন ঠক-চরিত্রের জন্মবৃত্তান্ত হিসেবে এর চেয়ে নিখুঁত ব্যাখ্যা কম। আর পাঠ জানায়, বিদাং ছারা কিসের উপর বিখ্যাত হবেন তা বলেননি।
দ্বিতীয় খণ্ডের নাম “গৃহত্যাগ”, আর তার শুরুতেই পরিবারের অর্থনীতি — গরিবের সংসারে নতুন সন্তান আসায় ন ক নিং-এর পিতা করাতি দলে যোগ দেন।
পাঁচ খণ্ডের এই গঠনটিই পাঠটিকে একটি চরিত্র-চক্র করে তোলে, একক গল্প নয় — যেমন গোপাল ভাঁড় বা হোজ্জার গল্প একটি নয়, একটি সিরিজ। পাঠে সেই তুলনাটিও আগেই করে দেওয়া হয়েছে।
ঠকের গল্প ২,৯২১ শব্দের, আর তার প্রথম কাণ্ডটিই আর্কাইভের সবচেয়ে নিষ্ঠুর কৌশল — ছেলে মাকে বাবার মিথ্যে মৃত্যুসংবাদ দেয়।
পটভূমিটি পাহাড়ের বাস্তব জীবিকা। বাবা ঠিক করেন দূর বনে গিয়ে অনেক বাঁশ কাটবেন, সেই বাঁশ দিয়ে ভেলা বানিয়ে নদীপথে গ্রামে ফিরবেন, আর বাঁশ বিক্রি করে টাকা হবে। বাপ-বেটা কয়েক দিনের খাবার নিয়ে বনে যান।
খাবার ফুরিয়ে এলে বাবা ছেলেকে গ্রামে পাঠান চাল-ডাল আনতে, আর নিজে বনে থেকে যান। ফেরার পথেই ছেলের ফন্দি তৈরি হয় — “কি করে মা-বাবাকে বোকা বানিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে দেশ ভ্রমণে যাওয়া যায়?”
বাড়ি ফিরে সে কান্নাকাটি করে, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে বিলাপ করে — বাবা বাঁশ কাটতে গিয়ে পা পিছলে খাদে পড়ে মারা গেছেন। মা-ও কাঁদতে বসেন।
দ্বিতীয় ধাপটি আরও ঠান্ডা মাথার। কিছুদিন পর, মায়ের দুঃখ কিছুটা কমলে, সে ফিরে এসে প্রস্তাব দেয়: বন থেকে ফেরার পথে এক গ্রামে সে “অবিকল আমার বাবার মত একজন লোককে” দেখে এসেছে, যাঁর স্ত্রী মারা গেছে আর সন্তান নেই — মা রাজি থাকলে সে গিয়ে বিয়ের কথা বলতে পারে।
অর্থাৎ ছেলেটি নিজের বাবাকে তাঁর নিজের স্ত্রীর কাছে অন্য একজন হিসেবে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করে। কৌশলটির নিষ্ঠুরতা আর বুদ্ধি সমান।
গল্পের শেষটি অবশ্য শান্ত — ঠক একটি বউ নিয়ে ঘরে ফেরে, আর তার মা-বাবা “মহাখুশি”। শাস্তি নেই, অনুতাপও নেই। লেখক মং সিংজ্ঞা।
আর্কাইভে এই ধারার আরও চরিত্র আছে — ত্রিপুরা সংগ্রহে নাডেং ডেং, আর মারমা সংগ্রহে ন ক নিং ও লুম্বোওয়াইং খইয়ক-এর সাত বন্ধু।
মারমা সংগ্রহের কয়েকটি পাঠে বৌদ্ধ পরিভাষা সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে — আর্কাইভের অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর সংগ্রহে এমন নেই।
সবচেয়ে স্পষ্ট সুহওয়েন্না সামাহ। গল্পের কেন্দ্রে দুই তরুণ — ধুকুল্লা ও প্যারিক্কা — যাঁদের বিয়ে হয়েছিল অভিভাবকদের অঙ্গীকারে, “পাত্র-পাত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে উপেক্ষা করে”।
পাঠে তাঁদের আচরণ নাম ধরে বর্ণিত: দু’জনেই মাছ-মাংস খান না, পশু-পাখি-মাছ শিকারে যান না, কেউ এনে দিলেও স্পর্শ করেন না, বিক্রিও করেন না। আর একই ঘরে থাকলেও তাঁদের মধ্যে দাম্পত্যের কোনো লক্ষণ নেই।
অভিভাবকদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁরা অনুমোদন চান — “আমরা দুজনেই আজ প্রজ্যা গ্রহণ করবো… আপনাদের অনুমোদন পেলে আমরা আজই বনবাসে বের হবো। সন্ন্যাস জীবন-যাপন করবো।”
শব্দটি লক্ষণীয়। প্রজ্যা — বৌদ্ধ পরিভাষায় প্রব্রজ্যা, অর্থাৎ গৃহত্যাগ করে সংঘে প্রবেশ। মারমা জনগোষ্ঠী বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, আর গল্পের পথটিও সেই ধর্মেরই।
পাঠের শেষ বাক্যে রায়টিও বৌদ্ধ ভাষায়: পিতা-মাতার সেবার সুফল “ইহলোক-পরলোক প্রতিটি জন্ম-জন্মান্তরে” প্রসারী, আর এটি “সুমহান পবিত্র কুশল-কর্মও বটে”। কুশল-কর্ম শব্দটি বৌদ্ধ পুণ্যকর্মের পরিভাষা।
এছাড়া বিদাং ছারা (পন্ডিত) শব্দটি ন ক নিং-এ, আর ন ক নিং-এর এক খণ্ডে মন্দিরের উল্লেখ আছে। [এই শব্দগুলোর মূল পালি বা আরাকানি রূপ কোনো পঠিত উৎসে যাচাই করা যায়নি]
মারমা পাঠগুলোর পটভূমিতে জীবিকার বিবরণ নাম ধরে আছে, আর সেগুলো একসঙ্গে রাখলে পাহাড়ের অর্থনীতির একটি তালিকা তৈরি হয়।
বন থেকে। বাঁশ কেটে ভেলা বানিয়ে নদীপথে নিয়ে এসে বিক্রি; ফাঁদ পেতে বন-মোরগ ধরা; শামুক-ঝিনুক-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ; আর নয়-দশ দিনের খোরাকি নিয়ে গভীর বনে যাওয়া।
জুম ও জমি। জুমচাষ, বীজের জন্য ধানের অর্ধেক রেখে দেওয়া, গোলা ভরা ধান, আর জমিদারের বাড়িতে দৈনিক হাজিরার কাজ — এই শেষ শব্দবন্ধটি মজুরি-শ্রমের সরাসরি উল্লেখ।
মাছ ধরা। সুহওয়েন্না সামাহ-তে মেঘাওয়াদী নদীর দুই কূলে দুটি গ্রাম, আর প্রতিটিতে “প্রায় পাঁচ শত মৎস্যজীবী জেলে পরিবার” — আর্কাইভে কোনো গল্পে দেওয়া সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা-হিসাব।
অন্য কাজ। করাতি দল, গোয়ালার ঘরে মজুরি, কৃষকের ঘরে কাজ, আর গরু চরানো।
এই বিবরণগুলো গল্পের সাজসজ্জা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এগুলোই কাহিনির ইঞ্জিন। বাঁশ কাটতে যাওয়াই ঠকের সুযোগ তৈরি করে, আর এক কাঠা ধানই মংগ্রীর লোভের শুরু।
পাহাড়ের খাবার ও রান্নার পদ্ধতি নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে।
আর্কাইভের অন্য সংগ্রহগুলোতে প্রধান প্রাণী বাঘ; মারমা সংগ্রহে তা সাপ। নয়টি পাঠে সাপ আছে, আর দুটি পাঠে শব্দটি কুড়িবারের বেশি।
সর্বোচ্চ সর্প মানব-এ — সাতাশবার, আর সেখানে সাপই কেন্দ্রীয় চরিত্র। এক বুড়ো দম্পতির তিন বিবাহযোগ্য কন্যা, আর বাড়ির পাশেই সাপের উপস্থিতি দিয়ে গল্পের শুরু। শেষটি সংযত ও করুণ: সাপটি ভাবে ছেলে বড় হলে তাকে ভয় পাবে, লজ্জিত হবে — তাই সে “আরও দূরে গহীন জঙ্গলে চলে গেল চিরদিনের জন্য”।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ একটি অজগর সাপের গল্প — ষোলবার। শুরু নদীর ঘাটে ময়লা জামা ধোয়া বুড়ো-বুড়ির খিদে দিয়ে, আর শেষে মেয়েকে হারিয়ে ফিরে পাওয়া, আর বাবা-মায়ের কান্না।
ভূমিকার দিক থেকে সাপ তিন রকম কাজ করে এই সংগ্রহে:
তৃতীয় ভূমিকাটিই সবচেয়ে কার্যকর, কারণ সেখানে সাপ কোনো দৃশ্যে আসে না — তার অনুপস্থিতিই ভুল বোঝাবুঝির কারণ, আর তার মৃতদেহই সত্য প্রকাশ করে।
অনুতপ্ত কৃষক পুরো আর্কাইভের ক্ষুদ্রতম পাঠ — ১৬৪ শব্দ, দীর্ঘতমটির পঁয়তাল্লিশ ভাগের এক ভাগ। অথচ এর কাঠামোয় কিছুই অনুপস্থিত নেই।
শুরুটি পরিস্থিতির: এক কৃষকের দু’বছরের ছেলে, আর শখ করে পোষা একটি বেজি, যা এতই পোষ মেনেছিল যে ছেলের সঙ্গে খেলা করত। পাঠে এর একটি ব্যাখ্যাও আছে, এক লাইনে — “দরিদ্র পরিবারে সন্তানের জন্য সুন্দর চিত্ত-বিনোদনের ব্যবস্থা।”
তারপর দৃশ্য: কৃষক মাঠ থেকে ফিরে উঠোনে পা ফেলেই দেখেন ছেলের মৃতদেহ, দেহে রক্ত, আর পাশে বেজিটিরও সারা গায়ে রক্ত — বিশেষ করে মুখে।
সিদ্ধান্তটি তাৎক্ষণিক, আর ভাষাও: “নিশ্চয় আমার সন্তানকে এই শয়তান বেজীটিই হত্যা করেছে।” লাঠি এনে তিনি বেজিটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলেন।
উল্টো তথ্যটি আসে তার পরেই — উঠোনের অন্য প্রান্তে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় মরে পড়ে আছে বিরাট একটি বিষধর সাপ। বেজিটি লড়েছিল, আর জিতেছিলও।
শেষ বাক্যটি কৃষকের নিজের মুখে, আর তাতে কোনো উপদেশ নেই, কেবল হিসাব: “এখন আমার দুই-ই গেল — সন্তানও গেল, বেজীওগেল।”
গল্পটির কাজ করার কারণ তার সংক্ষিপ্ততাই। প্রমাণ দেখে তাড়াহুড়োর সিদ্ধান্ত কীভাবে অন্যায় হয়ে ওঠে — আর্কাইভের দীর্ঘতম মারমা পাঠ রোসাঙ রাজা-ও একই কথা বলে, ২,৯৬২ শব্দে। এখানে তা ১৬৪ শব্দে।
দুটো পাঠের লেখকও আলাদা, উৎসও আলাদা — একটিতে মং চাই শৈ ম্যা, অন্যটিতে ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা। [দুটি গল্পের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা কোনো পঠিত উৎসে নেই]
মারমা সংগ্রহে চরিত্র ও জায়গার নামগুলো মারমা ভাষার, আর সেগুলো বাংলা লিপিতে লেখা — বদলে বাংলা নাম বসানো হয়নি।
চরিত্রের নাম: মংগ্রী, কংজাই, দুমা, ন ক নিং — আর গল্পের শিরোনামেই আছে লুম্বোওয়াইং খইয়ক, সুহওয়েন্না সামাহ, ফৌহ।
জায়গা ও নদী: রোসাঙ রাজ্য, ব্রাইম্মা পুরাহু দেশ, মেঘাওয়াদী নদী, বারনসী। প্রথমটি আরাকানের পরিচিত নাম; বাকি তিনটির ভৌগোলিক পরিচয় পাঠে দেওয়া নেই।
পাখির নাম: কংরং পাখি, যার বাংলা নাম পাঠে নেই, কিন্তু গল্পে তার কাজ স্পষ্ট — কোকিলের ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা লালন করা।
আর্কাইভের নিয়ম মেনে এই পাতায় সব নাম মূল বানানে রাখা হয়েছে। [মেঘাওয়াদী নদী ও ব্রাইম্মা পুরাহু দেশ আজকের কোন জায়গা, তা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
মারমা সংগ্রহে দুটি জোড়া আছে যেগুলো দেখতে একরকম, কিন্তু প্রকৃতিতে আলাদা — একটি নকল, অন্যটি দুটি আলাদা গল্প।
নকলটি: ঠকের গল্প দুইবার প্রকাশিত — একবার “মারমা লোককাহিনী” নামে ২,৯২১ শব্দে, একবার “মারমা রূপকথা” নামে ২,৯১৭ শব্দে। দুটোরই লেখক মং সিংজ্ঞা, আর পাঠ কার্যত এক।
নকল নয় যেটি: সাদা টিয়াপাখির দেশ (২,৩১০ শব্দ) ও সাদা টিয়ে পাখির গল্প (৬৭৫ শব্দ) — শিরোনাম প্রায় একই, কিন্তু গল্প দুটো আলাদা। প্রথমটি গরিব মংগ্রীর লোভের কাহিনি, উৎস ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা; দ্বিতীয়টি বারনসীর কংজাই-দুমা দম্পতির, লেখক হ্লা থোয়াই চিং মারমা।
পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। শিরোনামের মিল দেখে দুটোকে এক ধরে নেওয়া সহজ, কিন্তু একটি সাদা টিয়ে এখানে দুটি আলাদা গল্পের কেন্দ্রে — অর্থাৎ পাখিটি নিজেই একটি মোটিফ।
দুটোরই শেষে সাপ আছে — প্রথমটিতে দংশনে পরিবার ধ্বংস, দ্বিতীয়টিতে শর্ত ভাঙার পর “সাপ আর সাপ”। মারমা সংগ্রহে সাপ নয়টি পাঠে, আর এই দুটোতে তার ভূমিকা একই — শাস্তির বাহক।
নিচে ১৯টি গল্প, আকার অনুযায়ী বড় থেকে ছোট। প্রতিটির সঙ্গে শব্দসংখ্যা আর ভেতরে কী ঘটে তার সারকথা — গল্পের নিজের পাঠ থেকে নেওয়া।
তালিকার প্রথম তিনটি দুই হাজার শব্দের বেশি, আর শেষ তিনটি সাতশোর কম। আর্কাইভের ক্ষুদ্রতম পাঠটি এই তালিকার শেষে — ১৬৪ শব্দের অনুতপ্ত কৃষক।
১৯টি — ত্রিপুরা সংগ্রহের পরেই দ্বিতীয় বৃহত্তম। মোট ২৭,৩৮৮ শব্দ, গড় গল্প ১,৪৪১ শব্দের। দীর্ঘতম পাঠ ২,৯৬২ শব্দের, আর ক্ষুদ্রতমটি ১৬৪ শব্দের, যা পুরো আর্কাইভেরও ক্ষুদ্রতম।
১৬টি পাঠে লেখকের নাম আছে, আর নামের সংখ্যা তেরো — মং সিংজ্ঞা, মং সিং ঞো, টহ-ওয়ে, চাই সুই হ্র, রূপশী নেওয়ার মণি, মং ক্য শশায়ে নু, মংচাই শে ম্যা, মং চাই শৈ ম্যা, মা উ চিং, পুলু প্রু, হ্লা থোয়াই চিং মারমা, মাসিঞো মারমা ও উ শৈ সিং। প্রায় সবই মারমা নাম।
মাত্র তিনটি পাঠে বইয়ের নাম আছে, আর তিনটিতেই একই নাম — ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা। বাকি ১৬টিতে কেবল লেখকের নাম, কোনো সংকলনের উল্লেখ নেই।
বইটির নামে “ত্রিপুরা” একটি ভূখণ্ড, জনগোষ্ঠী নয় — ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, যেখানে মারমা জনগোষ্ঠীর বসবাস আছে। একই বই থেকে আর্কাইভে চাকমা, ত্রিপুরা, কলই ও হালাম গল্পও এসেছে।
মারমা লোককথার একটি ঠক-চরিত্র। পাঠের প্রথম বাক্যেই তাকে “ঠক, প্রতারণার এক সার্থক চরিত্র” বলা হয়েছে, আর সঙ্গে তুলনা টানা হয়েছে গোপাল ভাঁড়, বীরবল, হোজ্জা নাসিরুদ্দীন ও ঠক চাচার সঙ্গে। গল্পের শেষে সে শাস্তি পায় না, বরং অজানার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে।
পার্বত্যাঞ্চলের গ্রামে মুখে মুখে প্রচলিত একটি রক্তশোষক-বিশ্বাস। পাঠে একে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ব্রাম স্টোকারের ড্রাকুলার সঙ্গে তুলনা করে — দিনে মৃতের মতো, রাতে সক্রিয়। লেখক নিজেই শেষে লিখেছেন, অনুসন্ধান করা হলে এ বিষয়ে আরও অনেক কাহিনি জানা যাবে।
তিনটি পাঠে — ভূতের গল্প, ফৌহ আর লজ্জাবতী গাছের গল্প। আর্কাইভের ১২৫টি পাঠের মাত্র ১৪টিতে ভূত বা প্রেত আছে, তাই তিনটিই কোনো একটি সংগ্রহে সর্বোচ্চ। প্রথম পাঠটি শুধু ভূতের গল্পেরই সংকলন, যা শুরু হয় “গল্প-১” দিয়ে আর শেষ হয় এই লাইনে — “ভূত হলেই দুষ্ট হয় না, ভদ্র ভূতও আছে।”
একটি উৎপত্তি-কাহিনি। পাঠ অনুযায়ী রাজপুত্রের কবরে লতা জাতীয় গাছ ছড়িয়ে পড়ে, যেগুলো কোনো কিছুর স্পর্শে নুয়ে পড়ত — আর তখন থেকে লজ্জাবতী গাছের বিস্তার ঘটল। ছবি এঁকেছেন তন্ময় চাকমা।
পাখিদের চিকিৎসক কোকিল অনুযায়ী কোকিল বনের পাখিদের চিকিৎসা করত, আর তার পুরস্কার হিসেবে কংরং পাখি কোকিলের ডিম ফুটিয়ে বাচ্চাদের স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত লালন করে — পাঠের ভাষায়, তখন থেকে আজও সেই নিয়ম চলে আসছে।
ঝড়ের সময় বাঁশঝাড়ের নিচে আশ্রয় নেওয়া শূকরের সঙ্গে বাঘের অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব হয়। সংকট আসে একটি স্বপ্ন থেকে, আর মীমাংসা করে একটি পেঁচা — তার রায়: “স্বপ্নে দেখলে কেউ কাউকে খেতে বা বিয়ে করতে পারবেনা।” এভাবেই শূকর প্রাণে বাঁচে।
মারমা সংগ্রহের দীর্ঘতম পাঠ রোসাঙ রাজা ও এক শিল্পীর কাহিনী-তে, ২,৯৬২ শব্দের। রোসাঙ বাংলা সাহিত্যে আরাকান রাজসভার পরিচিত নাম। গল্পের শেষে রাজা নিজের ভুল স্বীকার করে শিল্পীর কাছে ক্ষমা চান।
হ্যাঁ, একটি — ঠকের গল্প। একবার “মারমা লোককাহিনী” নামে ২,৯২১ শব্দে, একবার “মারমা রূপকথা” নামে ২,৯১৭ শব্দে। দুটোরই লেখক মং সিংজ্ঞা।
আছে, আর দুটো আলাদা গল্প — সাদা টিয়াপাখির দেশ (২,৩১০ শব্দ, উৎস ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা) এবং সাদা টিয়ে পাখির গল্প (৬৭৫ শব্দ, লেখক হ্লা থোয়াই চিং মারমা)। শিরোনামের মিল থাকলেও কাহিনি দুটো আলাদা, আর দুটোরই শেষে সাপ আছে।
সাপ — নয়টি পাঠে। এরপর হাতি পাঁচটিতে, শূকর তিনটিতে, আর বাঘ মাত্র দুটিতে। অর্থাৎ আর্কাইভের অন্য সংগ্রহগুলোর তুলনায় মারমা গল্পে বাঘের উপস্থিতি কম, আর সাপের বেশি।
না। পাঠে স্পষ্ট লেখা আছে — “এখানে পাঁচটি খন্ড উপস্থাপন করা হল।” অর্থাৎ এটি একটি চরিত্রের পাঁচ পর্বের চক্র, যার প্রথম দুটির নাম “জন্ম কথা” ও “গৃহত্যাগ”। গঠনে এটি গোপাল ভাঁড় বা হোজ্জার গল্পের সিরিজের মতো।
আছে। সুহওয়েন্না সামাহ-তে দুই চরিত্র “প্রজ্যা গ্রহণ” করে বনবাসে যেতে চান — প্রজ্যা অর্থাৎ প্রব্রজ্যা, গৃহত্যাগ করে সংঘে প্রবেশ। একই পাঠের শেষে পিতা-মাতার সেবাকে বলা হয়েছে “সুমহান পবিত্র কুশল-কর্ম”, আর ন ক নিং-এ “বিদাং ছারা” শব্দের অর্থ দেওয়া আছে পন্ডিত।
এই পাতার সব তথ্য জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত ১৯টি মারমা পাঠের নিজের লেখা থেকে নেওয়া — শব্দসংখ্যা, লেবেল, লেখকের নাম, শিল্পীর নাম, উৎস-গ্রন্থের নাম ও পাঠে দেওয়া উদ্ধৃতিসহ। প্রতিটি গল্পের লিংক উপরে তার নিজের অংশে আছে।
সব ব্যক্তির নাম, স্থানের নাম, জনগোষ্ঠীর নাম ও মারমা ভাষার শব্দ আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে। গল্পের শিরোনাম থেকে কেবল লেবেল-উপসর্গ বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গল্পের সারকথা সেই গল্পের নিজের পাঠ থেকে; কোনো ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন যোগ করা হয়নি। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।
প্রসঙ্গ:মারমা, মারমা রূপকথা, মারমা লোককাহিনী, রূপকথা, লোককথা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।