Last updated Oct 15th, 2026
0

জুমজার্নালের আর্কাইভে পাঁচটি ছোট জনগোষ্ঠীর ১৮টি রূপকথা ও লোককাহিনী আছে — খেয়াং ১১, চাক ৩, খুমী ২, আর বম ও হালাম একটি করে। এই পাতাটি সেই ১৮টির পূর্ণ সূচি।
সংগ্রহগুলো ছোট, কিন্তু ভেতরে কয়েকটি জিনিস আছে যা আর্কাইভের বড় সংগ্রহেও নেই — একটি জনগোষ্ঠীর অভিবাসনের পুরো কাহিনি, একটি নামের অর্থ, একটি ঠক-চরিত্রের চক্র, আর একই গল্পের তিনটি কপি।
একটি কথা শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার। এই সংখ্যা এই জনগোষ্ঠীগুলোর লোককথার ভাণ্ডারের আকার নয় — এগুলো কেবল জুমজার্নালের আর্কাইভে কী উঠেছে তার হিসাব, আর তা-ও কেবল অন্তর্জালে। মুদ্রিত সংকলনে কী আছে তা সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন, আর এই লেখার জন্য এই পাঁচটি জনগোষ্ঠীর কোনো আলাদা মুদ্রিত সংকলন দেখা হয়নি।
আর্কাইভে এই পাঁচ জনগোষ্ঠীর পোস্টের সংখ্যা ১৮। তবে খেয়াং সংগ্রহে দুটি গল্প একাধিকবার প্রকাশিত — একটি তিনবার, একটি দু’বার — তাই আলাদা গল্পের সংখ্যা ১৫।
| জনগোষ্ঠী | পোস্ট | আলাদা গল্প | মোট শব্দ |
|---|---|---|---|
| খেয়াং | ১১ | ৮ | ১৮১৮৩ |
| চাক | ৩ | ৩ | ২৭৮২ |
| খুমী | ২ | ২ | ২০৪৯ |
| বম | ১ | ১ | ৪৩৫ |
| হালাম | ১ | ১ | ১০০৮ |
| মোট | ১৮ | ১৫ | ২৪,৪৫৭ |
আকারে এই সংগ্রহগুলো আর্কাইভের দুই প্রান্তেই পড়ে। খেয়াং সংগ্রহের গড় ১,৬৫৩ শব্দ — আর্কাইভের বড় সংগ্রহগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ, অথচ আর্কাইভের ক্ষুদ্রতম পাঁচটি পাঠের তিনটিও এই সংগ্রহের।
কারণটি দুটি পাঠে। লুঙ্সা গ্রামের রূপকথা শিরোনামের দুটি পাঠ ৩,৫৯৮ ও ২,৮৩৩ শব্দের, আর বাকি নয়টি তিনশো থেকে দুই হাজার ছয়শোর মধ্যে।
বম সংগ্রহের একমাত্র পাঠটির শিরোনামে লেখা আছে “২য় পর্ব” — অর্থাৎ প্রথম পর্বটি রূপকথা বিভাগে নেই। [প্রথম পর্বটি অন্য বিভাগে আছে কিনা তা যাচাই করা যায়নি]
চারটি বাংলা লেবেলের পূর্ণ ব্যাখ্যা আর সব জনগোষ্ঠীর হিসাব আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।
পাঁচটি সংগ্রহের মধ্যে খেয়াং সবচেয়ে বড় — ১১টি পোস্ট, মোট ১৮,১৮৩ শব্দ। তবে নকল বাদ দিলে আলাদা গল্প আটটি।
লেবেলে জনগোষ্ঠীর নামের দুই বানানই ব্যবহৃত — খেয়াং আটটি পাঠে, খিয়াং তিনটিতে। একই গল্পের তিনটি কপির দুটিতে “খিয়াং”, একটিতে “খেয়াং”।
| লেখকের নাম | যত পাঠে | কোন গল্প |
|---|---|---|
| ক্য সা মং খেয়াং | ৪ | ঘুঘু পাখির গল্প (তিন পোস্টে) ও গুণবতী রাণীর গল্প |
| চেই থোয়াই প্রু খেয়াং | ২ | তিন যুবকের গল্প (দুই পোস্টে) |
| টিং হাউ খেয়াং | ১ | কুনো ব্যাঙের গল্প |
| চিং সা উ খেয়াং | ১ | লাল গাল মাছের গল্প |
| অনুপম খিয়াং | ১ | বুদ্ধিমান ও ধনী লোক |
| — (লেখকের নাম নেই) | ২ | লুঙ্সা গ্রামের দুটি পাঠ |
অর্থাৎ নয়টি পাঠের লেখকের নাম আছে, আর তাঁরা পাঁচজন। শেষ সারির দুটি পাঠে লেখকের নাম নেই, কেবল উৎস-গ্রন্থের নাম — লুঙ্সা গ্রামের লোককথা ও অন্যান্য।
লক্ষণীয়, চারজন লেখকের নামের শেষে “খেয়াং”, আর একজনের “খিয়াং”। বানানের ফারাকটি কেবল লেবেলে নয়, মানুষের নামেও।
খেয়াং সংগ্রহের ছয়টি শিরোনামে একই শব্দ আছে — খুই — আর বন্ধনীতে দেওয়া বাংলা অনুবাদ পাশাপাশি রাখলে তার অর্থ বেরিয়ে আসে: গল্প।
| খেয়াং শিরোনাম | বন্ধনীতে দেওয়া বাংলা |
|---|---|
| কংখোনূপঃ খুই | ঘুঘু পাখির গল্প |
| উহাম চ খুই | কুনো ব্যাঙের গল্প |
| ঙুলুই বেঙসেন চঃ খুই | লাল গাল মাছের গল্প |
| চোংক্লং পোচোং গুম খুই | তিন যুবকের গল্প |
| প্রেংঞাম মংপিয়া খুই | গুণবতী রাণীর গল্প |
পাঁচটি শিরোনামেই বাংলা অনুবাদের শেষ শব্দ “গল্প”, আর খেয়াং শিরোনামের শেষ শব্দ খুই। অর্থটি এর চেয়ে স্পষ্ট হওয়া কঠিন।
এটি আর্কাইভে একটি ধারা তৈরি করে। বাংলায় যাকে রূপকথা বা গল্প বলা হয়, পাহাড়ের ভাষাগুলোতে তার নিজের শব্দ আছে — চাকমা পশ্চন, তঞ্চঙ্গ্যা পচ্ছন, ম্রো সাংচিয়া, আর খেয়াং খুই।
শিরোনাম থেকে আরও কয়েকটি শব্দও তোলা যায় — কংখোনূপঃ (ঘুঘু পাখি), উহাম চ (কুনো ব্যাঙ), চোংক্লং (যুবক), প্রেংঞাম বা প্রেইঙ্যামঃ (বুদ্ধি বা গুণ), কোঃমঃ (ধনী লোক)। [শব্দগুলোর সীমানা কোথায় শেষ — অর্থাৎ কোন অংশটি কোন শব্দ — তা পাঠে ভাঙা করে দেখানো হয়নি, যাচাই প্রয়োজন]
পাহাড়ি ভাষার লিপি ও বানান-প্রমিতকরণ নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা-য়।
আর্কাইভে কোনো একটি গল্প সর্বোচ্চ তিনবার প্রকাশিত হয়েছে, আর সেটি এই সংগ্রহের — কংখোনূপঃ খুই (ঘুঘু পাখির গল্প)।
| পোস্ট | লেবেল | শব্দ |
|---|---|---|
| প্রথম | খেয়াং লোককাহিনী | ২,৫৯৮ |
| দ্বিতীয় | খিয়াং রূপকথা | ২,৫৯৫ |
| তৃতীয় | খিয়াং লোককাহিনী | ২,৫৯৫ |
তিনটির পাঠ শব্দ ধরে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, আর মিল কার্যত শতভাগ। যে সামান্য ফারাক আছে তা কাহিনির নয় — লেখকের নামের আগে কোলন আর বিসর্গের ফারাক, আর কয়েকটি যুক্তাক্ষর।
তিনটিতেই লেখক ক্য সা মং খেয়াং, আর তিনটিরই শেষ বাক্য এক।
গল্পটি নিজেই লক্ষণীয়। শুরু রাজপ্রাসাদের আঙিনার এক কোণে একটি ছোট শিমের মাচায় — সেখানে বাস করত এক যুগল ঘুঘু আর তাদের দুটি ছানা। অর্থাৎ রাজকাহিনির ভেতরে কেন্দ্রীয় চরিত্র একটি পাখির পরিবার।
শেষটি আরও অপ্রত্যাশিত। রাজা “নিজেও গেরুয়া পড়ে সন্যাসির বেশে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গভীর বনে চলে” যান, আর সেখানেই নির্বাসিত হয়ে বাকি জীবন কাটান।
আর্কাইভে আরেকটি খেয়াং গল্পও দু’বার আছে — চোংক্লং পোচোং গুম খুই (তিন যুবকের গল্প), আর সেখানে শিরোনাম ও লেবেল দুটোই হুবহু এক। অর্থাৎ আর্কাইভের পাঁচটি নকল-দলের দুটিই এই এক সংগ্রহে।
আর্কাইভের সবচেয়ে স্পষ্ট আন্তঃজনগোষ্ঠীগত মিলটি এই সংগ্রহে লুকিয়ে আছে। খেয়াং উহাম চ খুই (কুনো ব্যাঙের গল্প) আর চাকমা টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ — দুটি আলাদা জনগোষ্ঠীর দুটি গল্প, কিন্তু শেষে একই জিনিসের ব্যাখ্যা।
খেয়াং পাঠটির শুরু একটি গাছ ঘিরে: তিত্তির পাখির বাসা গাছের ডালে, আর সেই গাছের তলায় একটি ছোট গর্তে থাকে ব্যাঙ।
শেষ বাক্যটি কার্যত একটি প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণ: কুনো ব্যাঙ নড়াচড়া করলে গুটি থেকে এক প্রকার দুধের মতো সাদা তরল বের হয়, আর পাঠে তার পরিচয়ও দেওয়া — “এটি কাঁঠাল গাছের আঠা ছাড়া আর কিছুই নয়”।
চাকমা পাঠটিতে একই দুটি জিনিস ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কিন্তু কারণ হিসেবে একটি শাস্তির দৃশ্য আছে — কুনোব্যাঙকে কাঁঠাল গাছে বেঁধে পঁচিশ ঘা বেত মারা হয়, আর তার গা বেয়ে বেরোনো সাদা ক্ষীর গাছের গুঁড়িতেও লেগে যায়।
| চাকমা টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ | খেয়াং উহাম চ খুই | |
|---|---|---|
| ব্যাঙের সঙ্গী | টুনটুনি | তিত্তির পাখি |
| কারণ | বিচার ও পঁচিশ ঘা বেত | পাঠে শাস্তির দৃশ্য নেই |
| যা ব্যাখ্যা করে | ব্যাঙের খসখসে গা ও কাঁঠালের সাদা ক্ষীর | ব্যাঙের গুটির সাদা তরল ও কাঁঠালের আঠা |
| শব্দ | ১,৩২০ | ৮৪৩ |
দুটি গল্পের সম্পর্ক কী — একটি থেকে অন্যটি এসেছে, নাকি দুটোই একই পুরনো কাহিনির দুই রূপ — তা এই দুটি পাঠ থেকে বলা যায় না। যা বলা যায় তা হলো, একই পর্যবেক্ষণ দুটি ভাষায় দুটি আলাদা গল্প তৈরি করেছে।
[দুটি গল্পের সম্পর্ক নিয়ে কোনো পঠিত উৎসে আলোচনা পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
চাকমা পাঠটি আছে চাকমা রূপকথার সূচিতে।
খেয়াং সংগ্রহের একটি পাঠ গঠনে আর্কাইভে অনন্য — প্রেইঙ্যামঃ লা কোঃমঃ (বুদ্ধিমান ও ধনী লোক), যেখানে প্রধান দুই চরিত্রের নামই তাদের গুণ।
পাঠের প্রথম বাক্যেই দুটো নামের বাংলা অর্থ দেওয়া — প্রেইঙামঃ (বুদ্ধিমান) আর কোঃমঃ (ধনী লোক) — আর তাদের মধ্যে “গলায় গলায় ভাব” ছিল।
সংকটের কারণটিও সরাসরি: “ক্ষমতা নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়ে গেল দু’জনের।”
গল্পের শেষটি একটি প্রশ্ন, আর তা জিজ্ঞেস করা হয় হারা পক্ষকে — কি বন্ধু, এখন বুঝলে কার ক্ষমতা বেশি, প্রেইঙ্যা (বুদ্ধি) নাকি কোঃ (ধনের)?
লক্ষণীয়, শেষ বাক্যে শব্দগুলো ছোট হয়ে গেছে — প্রেইঙ্যামঃ থেকে প্রেইঙ্যা, আর কোঃমঃ থেকে কোঃ। অর্থাৎ শেষে ব্যক্তির নাম নয়, গুণটিই রয়ে গেছে — বুদ্ধিমান লোক নয়, বুদ্ধি; ধনী লোক নয়, ধন।
লেখক অনুপম খিয়াং। আর্কাইভে গুণ-ভিত্তিক চরিত্রের আরেকটি উদাহরণ ম্রো উদমা ম্লা, যেখানে সূর্য, মেঘ ও বাতাস চরিত্র হিসেবে কথা বলে।
খেয়াং সংগ্রহের একটি বড় মূল্য ভাষার। পাঠগুলোতে খেয়াং শব্দ বদলে বাংলা শব্দ বসানো হয়নি — শব্দটি রেখে পাশে বন্ধনীতে অর্থ দেওয়া হয়েছে, আর সেই অর্থগুলো একসঙ্গে রাখলে কুড়িটিরও বেশি শব্দের একটি তালিকা তৈরি হয়।
| খেয়াং শব্দ | পাঠে দেওয়া অর্থ | কোন গল্পে |
|---|---|---|
| খুই | গল্প | পাঁচটি শিরোনামে |
| কংখোনূপঃ | ঘুঘু পাখি | ঘুঘু পাখির গল্প |
| উহাম চ | কুনো ব্যাঙ | কুনো ব্যাঙের গল্প |
| ঙলুই বেঙসেন | লাল গাল মাছ | লাল গাল মাছের গল্প |
| টিংবাকচঃ | গাছের ডাল | লাল গাল মাছের গল্প |
| উইচেনচঃ | কুকুর | লাল গাল মাছের গল্প |
| নুলা-ম্রঃ পঃ | কুঁজো বুড়ো-বুড়ী | লাল গাল মাছের গল্প |
| মারপা | জুমের একটি ফসল হিসেবে উল্লিখিত | লাল গাল মাছের গল্প |
| চোংক্লং | যুবক | তিন যুবকের গল্প |
| আলুইপ | মোরগ | তিন যুবকের গল্প |
| বেও বেও | নানী নানী | তিন যুবকের গল্প |
| আলানসু | শত্রু | তিন যুবকের গল্প |
| থাবিং | পরার কাপড় | তিন যুবকের গল্প |
| ডাংহলা | বাঁশের তৈরী চাকু | তিন যুবকের গল্প |
| পিদুম | ভোমরা | তিন যুবকের গল্প |
| এচেতলমা | পাঠে অর্থ দেওয়া নেই | তিন যুবকের গল্প |
| আসাম পোএই | পাঠে অর্থ দেওয়া নেই; শব্দ করা অর্থে ব্যবহৃত | তিন যুবকের গল্প |
| প্রেইঙ্যামঃ / প্রেংঞাম | বুদ্ধিমান; গুণ | বুদ্ধিমান ও ধনী লোক; গুণবতী রাণীর গল্প |
| কোঃমঃ | ধনী লোক | বুদ্ধিমান ও ধনী লোক |
| নাটটওছ | মদিরা | গুণবতী রাণীর গল্প |
তালিকার দুটি জায়গা আলাদা করে লক্ষণীয়।
প্রথম, মারপা। শব্দটি খেয়াং পাঠে জুমের একটি ফসল হিসেবে এসেছে, আর একই শব্দ চাকমা হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তেও আছে — সেখানেও জুমের ফসলের তালিকায়, মার্পা বানানে। অর্থাৎ শব্দটি একটি জনগোষ্ঠীর নয়, পাহাড়ের।
দ্বিতীয়, নাটটওছ — মদিরা। এটি গুণবতী রাণীর গল্প-এ রাজার ভোগবিলাসের বর্ণনায় এসেছে, আর পাঠে বন্ধনীতে বাংলা অর্থ দেওয়া।
দুটি শব্দের অর্থ পাঠে নেই — এচেতলমা ও আসাম পোএই। প্রসঙ্গ থেকে দ্বিতীয়টি শব্দ করা বোঝায় বলে মনে হয়, কিন্তু তা অনুমান। [দুটি শব্দের অর্থ কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
২৭৯ শব্দের ঙুলুই বেঙসেন চঃ খুই (লাল গাল মাছের গল্প) আর্কাইভের ক্ষুদ্রতম পাঠগুলোর একটি, অথচ এর গঠন সবচেয়ে নিখুঁত — এটি একটি দোষের শিকল, আর তা শেষ হয় একটি প্রবাদে।
শুরু ছড়ায় মাছ ধরা দিয়ে। নিঃসন্তান বুড়ো-বুড়ি একটি কুয়ো দেখতে পান, আর কুয়োর মধ্যখানের পাথর সরিয়ে বুড়ো পান একটি লাল গাল মাছ।
তারপর আসে গল্পের শর্তটি, আর এটিই পুরো শিকলটিকে সম্ভব করে: “বুড়োটা কিন্তু সমস্ত ভাষা জানত, পাথর, মাটি, গাছ, মাছ এবং অন্যান্য জীবজন্তুর ভাষাসহ।”
অর্থাৎ বুড়ো একজন অনুসন্ধানকারী, আর তিনি একের পর এক জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকেন। প্রতিটি উত্তর একই ছাঁদে — “ইচ্ছাকৃতভাবে করিনি, কারণ…”:
শিকলটি এখানেই থামে, আর তা থামে একটি বৃত্তে — বানর দিয়ে শুরু হওয়া দায় শেষে বানরেই ফিরে আসে। অর্থাৎ কেউ নির্দোষ নয়, আর কেউ একাই দোষীও নয়।
শেষ বাক্যটি বুড়োর নিজের, আর সেটিই গল্পের উপসংহার: “একজনের দোষের কারণে অনেকজনকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।”
গঠনের দিক থেকে এটি আর্কাইভের তিনটি অন্য পাঠের আত্মীয় — চাকমা সাদা কাক কালো হল কেন (অনুরোধের শিকল), ম্রো রবখার সাংচিয়া (দুর্ঘটনার শিকল) আর ম্রো উদমা ম্লা (ক্ষমতার শিকল)। এটি চতুর্থ ধরনের — দায় এড়ানোর শিকল।
২৭৮ শব্দের চোংক্লং পোচোং গুম খুই (তিন যুবকের গল্প) আর্কাইভে বিষয়ের দিক থেকে অনন্য — এটি একটি জাদু-মন্ত্রের দ্বৈরথ, আর তার নিয়মগুলো পাঠে ধরে ধরে আছে।
শুরু একটি অদ্ভুত প্রশ্নে। এক যুবক গ্রামে বেড়াতে যাচ্ছিল, আর পথে দুই যুবক তাকে জিজ্ঞেস করে — “তুমি মুরগী নাকি মোরগ?” সে ভাবে, যেহেতু সে পুরুষ, তাই সে মোরগ — পাঠে খেয়াং শব্দটিও দেওয়া: আলুইপ।
প্রশ্নটির তাৎপর্য বোঝা যায় পরে। গ্রামের এক বৃদ্ধার বাড়িতে রাত কাটাতে গিয়ে সে ঘটনাটি বলে, আর বৃদ্ধা জানেন সেই দুই যুবক তাঁর আলানসু — শত্রু।
প্রতিরক্ষার উপায়টি সম্পূর্ণ ঘরোয়া, আর সেটিই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর বিশদ। বৃদ্ধা নিজের পরার কাপড় দিয়ে বিছানা করে দেন, আর শরীরের উপরেও চাপিয়ে দেন নিজের পরার থাবিং।
রাতের আক্রমণটি দৃশ্যময়: ঘুমিয়ে থাকা বিছানার উপরে উড়তে থাকে বাঁশের তৈরি চাকু (ডাংহলা) আর বিভিন্ন ধরনের ভোমরা (পিদুম), সঙ্গে নানা শব্দ। পাঠে কারণটিও বলা — দুই যুবক মন্ত্র করে এসব পাঠিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু আক্রমণ ব্যর্থ হয়, আর যুবকটির ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে যায়। দুই যুবক ভাবে সে মরে গেছে — তারপর তাকে জীবিত দেখে ভয় পায়, কারণ তাদের ধারণা হয় “যুবকটি আমাদের চেয়ে অনেক দক্ষ”।
দ্বিতীয় রাতের দ্বৈরথে জেতার কৌশলটি মন্ত্র নয়, ভয়। যুবকটি একটি ছাগলছানার গায়ে বিভিন্ন রং লাগিয়ে জানালা দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়, আর ছানাটি লাফাতে লাফাতে দৌড়াদৌড়ি করতে থাকে।
পরিণতি এক বাক্যে: “দুই যুবক হঠাৎ নার্ভাস হয়ে মারা গেল।”
অর্থাৎ গল্পটি মন্ত্রের গল্প হয়েও মন্ত্রে শেষ হয় না। যারা মন্ত্র জানে, তারাই নিজের ভয়ে মরে — আর অস্ত্রটি ছিল একটি রং-করা ছাগলছানা।
লেখক চেই থোয়াই প্রু খেয়াং। এই পাঠটিই আর্কাইভে দু’বার প্রকাশিত, আর দু’বারের শিরোনাম ও লেবেল হুবহু এক।
আর্কাইভে একটি নির্দিষ্ট ধারণা দুটি আলাদা জনগোষ্ঠীর গল্পে প্রায় একই ভাষায় ফিরে আসে — সত্যযুগে মুখের কথা ফলে যেত। আর দুটি গল্পেই সেই ধারণাটি কাহিনির ইঞ্জিন।
চাক শরিমনবিক মননাং (চাকদের রঙধনু গল্প)-এ বাক্যটি এরকম: “তখনকার আমল কিন্তু সত্যযুগ। যা মুখে বলে তাই ঘটে।”
আর চাকমা হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তে: “সেকালটা ছিল সত্যযুগ, লোকের কথায় কথায় মুখের বাক্য ফলে যেত।”
দুটি গল্পেই এই শর্তটি একটি অনিচ্ছাকৃত পরিণতি তৈরি করে। চাকমা গল্পে বিরক্ত বুড়োর মুখ থেকে বেরোনো একটি শব্দ তাকে ও তার স্ত্রীকে কচ্ছপ বানিয়ে দেয়। চাক গল্পে ভাই-বোনকে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী বলতে বাধ্য করা হয়, আর সেই কথাটিই ফলে যায়।
চাক গল্পের পরিস্থিতিটি নিষ্ঠুর, আর পাঠ তা গোপন করে না। প্রলয়ের পর পৃথিবীতে পানি শুকিয়ে গেছে; তৃষ্ণার্ত য়ুনচকবা ও য়ুনচকমে একটি কামারের দোকান ছাড়া কিছুই পায় না। কামার পানি দেওয়ার আগে জানতে চায় তারা পরস্পরের কী — আর ভাইবোন শুনে বলে, “ভাইবোন হলে পানি দিতে পারব না। তবে স্বামীস্ত্রী হলে পানি দিতে পারি।”
প্রথমবার তারা উত্তর না দিয়ে ফিরে আসে। গাছের ছায়ায় বসে আলোচনা করতে করতে বোন বলে, “মরণের চেয়ে স্বামীস্ত্রী পরিচয় দিয়ে কামারের কাছে পানি পান করি” — আর ভাই লজ্জায় কথাটি বলতে পারে না; বলে বোন।
গল্পের উপসংহারটি রঙধনুর। পাঠ অনুযায়ী ভাই লজ্জায় পালিয়ে আত্মহত্যা করে, আর সেই লজ্জার কারণেই আকাশে ওঠার সময় সে অস্পষ্টভাবে দেখা দেয় — অর্থাৎ রঙধনু কেন আবছা, তার ব্যাখ্যা।
[দুটি গল্পে “সত্যযুগ” ধারণার এই মিল কোনো পঠিত উৎসে আলোচিত হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]
খেয়াং সংগ্রহের ১,১৭৮ শব্দের প্রেংঞাম মংপিয়া খুই (গুণবতী রাণীর গল্প) গঠনে আলাদা, কারণ এর কেন্দ্রে কোনো দৈত্য বা জাদু নেই — আছে স্বামী-স্ত্রীর একটি তর্ক।
শুরুটি রাজসভার ভোগবিলাসের বর্ণনায়, আর সেখানেই খেয়াং শব্দটি বন্ধনীসহ আসে — নানা দেশের সুন্দরী যুবতীর সমাবেশ, নৃত্যগীত আর মদিরার (নাটটওছ) আসর।
তবু সম্পর্কটি ঘনিষ্ঠ। পাঠে লেখা, রাজা “রাণীর অনুমতি ব্যতীত কোথাও যেত না”, আর বাণিজ্যে (কুনপও) যাওয়ার প্রস্তাবেও রানি খুশি মনে সায় দেন। ধনসম্পদ ও লোক-লস্করে বারোটি জাহাজ পূর্ণ করে দু’জনে বণিকের বেশে রওনা হন।
তর্কের সূত্রপাত একটি দৃশ্যে। নির্জন সমুদ্র-বেলাভূমির (তুইকমচা) তীরে লতা-পাতার ছাউনি দেওয়া একটি ছোট কুঁড়েঘর থেকে এক সুন্দরী কলসি কাঁখে জল নিতে আসছে, আর তার দারিদ্র্য দেখে রাজা আক্ষেপ করেন।
রানির উত্তরটি দীর্ঘ, আর তা গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর বক্তব্য: উপার্জন স্বামীর দায়িত্ব, কিন্তু সেই উপার্জন “স্ত্রীর চতুরতা ও কর্মদক্ষতায় ভরে ওঠে”; আর যার স্ত্রী এ বিষয়ে অপটু, তার স্বামী হাজার উপার্জন করলেও তা “বাঁধ ভাঙা জলের মতো”।
এরপর তিনি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছান — মেয়েটির দারিদ্র্যের দায় মেয়েটির নিজের, আর রাজা তা “কিছুতে মেনে নিতে পারল না”। শুরু হয় তুমুল বাক-বিতণ্ডা, আর কেউ হার মানতে রাজি নয়।
পাঠের এই অংশটি তার নিজের সময়ের নীতিবোধে লেখা, আর আজকের পাঠকের কাছে রানির যুক্তিটি কঠোর শোনাতে পারে। বক্তব্যটি এখানে পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই দেওয়া হলো, বদল ছাড়া — কারণ তর্কটিই গল্পের ভিত্তি।
গল্পের শেষটি অবশ্য তর্কের নয়, পুনর্মিলনের — দীর্ঘ বিরহের পর রাজা ও রানি “উভয়ে আবার একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে” থাকেন। লেখক ক্য সা মং খেয়াং।
আর্কাইভে খেয়াং লেবেলে থাকা দুটি পাঠের ভেতরের কাহিনি খেয়াং নয় — দুটোরই পটভূমি নাগাভূমি, আর একটিতে জনগোষ্ঠীর নামও স্পষ্ট লেখা আছে: লোথা।
প্রমাণ পাঠের প্রথম বাক্যেই। কোহিটোর কুয়ো শুরু হয় — “নাগাভূমির বড় শহর কোহিমা। তার থেকে আশি-একাশি মাইল দূরে জুনহেববাটোও মোটামুটি শহর। সেই শহরের আশেপাশে ছিল অনেকগুলি নাগা বসতি।”
আর লুঙ্সা গ্রামের রূপকথা শুরু হয় — “নাগাভূমির একটি ছোট্ট গ্রাম। তার নাম লুঙসা। লুঙসায় লোথাদের বসতি।”
অর্থাৎ কোহিমা ভারতের নাগাল্যান্ডের রাজধানী, লোথা সেই রাজ্যের একটি নাগা জনগোষ্ঠী, আর লুঙসা সেখানকার একটি গ্রাম। দুটি পাঠের উৎসও সেটিই বলে — লুঙ্সা গ্রামের লোককথা ও অন্যান্য।
আর্কাইভে এই দুটি পাঠ খেয়াং ট্যাগে আছে, আর সেই কারণেই এই সূচিতেও খেয়াং অংশে রাখা হয়েছে — তালিকাটি আর্কাইভের নিজের লেবেল অনুসরণ করে। তবে পাঠ অনুযায়ী এগুলো নাগা লোককথা, আর পাঠকের তা জানা দরকার।
[লুঙ্সা গ্রামের লোককথা কোনোভাবে খেয়াং সংগ্রহের অংশ কি না, কিংবা ট্যাগটি ভুলবশত বসেছে — তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয়, যাচাই প্রয়োজন]
দুটি পাঠই আর্কাইভে উল্লেখযোগ্য দীর্ঘ — ৩,৫৯৮ ও ২,৮৩৩ শব্দ, আর দুটোই পূর্ণ আখ্যান।
কোহিটোর কুয়ো-র বিষয়টি সামাজিক মর্যাদা। ছেলেবেলা থেকেই কোহিটো সমাজে গণ্যমান্য হতে চায়, কিন্তু উপায় জানে না। বন্ধু সিখোসার পরামর্শটি ব্যবহারিক — “এমন একটা কিছু যদি করতে পার, যাতে সমাজের সকলের মঙ্গল হয়” — আর সমাধানটি আসে জলের অভাব থেকে: একটি কুয়ো খোঁড়া।
কুয়োর জায়গা বাছাইয়ের বিবরণটি গল্পের সবচেয়ে বাস্তব অংশ — গ্রাম থেকে বেশি দূরে হলে চলবে না, উঁচুতে হলে জল না-ও পাওয়া যেতে পারে, আর কাজটি গোপন রাখতে হবে বলে জায়গাটি হতে হবে একটু আড়ালে।
লুঙ্সা গ্রামের রূপকথা-র বিষয় বন্ধুত্ব ও একটি বিয়ের শর্ত। লিমো ও টোমো দুই যুবক, দিন-রাত একত্রে শিকার করে। টুনলার বাবা — গ্রামের সর্দার — শর্ত দিয়েছেন, যে একটি নির্দিষ্ট কেঁদো বিশাল বাঘকে মারতে পারবে তার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেবেন।
শর্তের পেছনে একটি বিশ্বাসও পাঠে লেখা: কোনো বাঘ যদি কারও পিছু নেয়, তবে হয় সেই বাঘকে মারতে হবে, “নতুবা সে বাঘ একদিন তাকে খেয়ে ফেলবেই”।
গল্পের শেষটি দুই গ্রামের — “গ্রাম দুটি আজও পাশাপাশি, অর্থাৎ ওপরে-নিচে বন্ধুভাবে বাস করছে। এ গল্পটা আজও তাদের মুখে মুখে ঘোরে।”
চাক সংগ্রহের তিনটি পাঠ মিলিয়ে ২,৭৮২ শব্দ। এর একটি সাধারণ রূপকথা নয় — এটি চাক জনগোষ্ঠীর অভিবাসনের কাহিনি, আর তার সঙ্গে জনসংখ্যা কম হওয়ার একটি ব্যাখ্যা।
চাকদের “য়োছা” কাহিনী শুরুই হয় একটি শব্দের অর্থ দিয়ে — “‘চাক’ শব্দের অর্থ ‘দাঁড়ানো’।” তারপর আসে ভূগোল: নাইক্ষ্যংছড়ি থানার বাইশারী মৌজা, নাইক্ষ্যংছড়ি মৌজা, বাঁকখালী মৌজা, কামিছড়া মৌজা।
এরপর ইতিহাস, আর তা গল্পের আকারে। পাঠ অনুযায়ী চাকদের এককালে ঐতিহ্যবাহী রাজ্য ছিল, আর তাঁরা বাস করতেন শাক্যেংদং-এ। আরাকানীদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তাঁরা বার্মার শাক্যেংদং ত্যাগ করে বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসতে শুরু করেন।
পথে দলটি দু’ভাগ হয়ে যায়, আর তার কারণটিই গল্পের সবচেয়ে স্মরণীয় অংশ। প্রথম দল পিছিয়ে-পড়া দ্বিতীয় দলের সুবিধার জন্য পথে পথে কলাগাছ কেটে কেটে চিহ্ন রেখে যায়।
কিন্তু দ্বিতীয় দলের দেরি হয়ে যায় একটি রান্নার কারণে — চিংড়ি রাঁধতে গিয়ে। পাঠে যুক্তিটি কৌতুকের আকারে: “চিংড়ি রাঁধলে কি কখনও সাদা হয়? কখন যে সাদা হবে — এই অপেক্ষাতেই বেশী দেরী হয়ে যায়।”
ততদিনে কাটা কলাগাছের উপর নতুন অঙ্কুর-পাতা গজিয়ে গেছে, আর সেই চিহ্ন দেখে দ্বিতীয় দল বুঝে নেয় প্রথম দলের সঙ্গে আর দেখা হবে না — তাই তারা সেই পথ ছেড়ে ইয়ংছা মৌজায় থেমে যায়। প্রথম দল পৌঁছায় আলীকদমে।
গল্পের উপসংহারটি সরাসরি জনসংখ্যার: আজকের চাক জনগোষ্ঠী সেই “য়োছা কাহিনীর তিন পরিবারের লোকজন”, আর “এজন্যে চাক উপজাতির সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য”।
দ্বিতীয় পাঠ শরিমনবিক মননাং (চাকদের রঙধনু গল্প) একটি উৎপত্তি-কাহিনি। পৃথিবীতে প্রলয়ের পর বেঁচে যায় এক ভাই-বোন, আর শেষে রঙধনু অস্পষ্টভাবে দেখা দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করা হয় — লজ্জায়।
তৃতীয় পাঠ এক বুড়ো আর বুড়ি-র উৎস আর্কাইভে বিরল: মংড়ী চাক; বিদ্যালয় বার্ষিকী, ১৯৮৯-৯০, মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়, রাঙামাত্য — অর্থাৎ একটি স্কুল-বার্ষিকী, আর সন দিয়ে।
চাক জনগোষ্ঠীর পরিচয়, ভাষা ও জনসংখ্যা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্রতম জনগোষ্ঠীগুলো-তে।
খুমী সংগ্রহে দুটি পাঠ, মোট ২,০৪৯ শব্দ, আর দুটোরই শিরোনামে মূল খুমী নাম ও বন্ধনীতে বাংলা অর্থ।
আমুয়ু হই অমনন (দুই বোন ও সাপ) শুরু হয় জুমচাষ দিয়ে — দুই বোন জুম চাষ করতে করতে ধান কাটার সময় এসে যায়, আর বড় বোন বলে তার খুব শীত লাগছে। লেখক প্রেমি খুমী।
গল্পের শেষটি আর্কাইভে সবচেয়ে কঠোর বিচারের একটি — রাজা বড় রানিদের সঙ্গে ঠিক সেই আচরণই করেন যা ছোট রানির সঙ্গে করা হয়েছিল।
তাআই হই চিংল্যাই (কাঁকড়া আর টুনটুনি)-র শুরুও দারিদ্র্য দিয়ে। কাঁকড়া পরিবার নিয়ে এক বর্ণা-য় বাস করত, আর “কাঁকড়ার কাজ করার মত কোন উপায় ছিল না” — এমনকি সূর্যের আলোও বেশি পড়ত না। লেখক লোনাং খুমী।
শেষ বাক্যটি একটি নিষেধের ব্যাখ্যা: কাঁকড়ার অভিশাপের কারণে টুনটুনির জন্য নদীর জল নিষিদ্ধ।
দুটি শিরোনামেই হই শব্দটি আছে, আর দুটোরই বাংলায় সেই জায়গায় “আর” বা “ও” — অর্থাৎ খুমী ভাষায় হই মানে “ও”, যেমন ম্রো ভাষায় হন। [দুটি শব্দের সম্পর্ক কোনো পঠিত উৎসে আলোচিত নয় — যাচাই প্রয়োজন]
বম সংগ্রহের একমাত্র পাঠটি ৪৩৫ শব্দের, আর তার প্রথম বাক্যেই চরিত্রটির পরিচয় একটি তুলনায় দেওয়া — “বাঙালীদের যেমন গোপাল ভাড়, বমদের উসুর।”
অর্থাৎ উসুর একটি একক গল্পের চরিত্র নয়, একটি ঠক-চক্রের চরিত্র — যেমন মারমা ন ক নিং, আর ত্রিপুরা নাডেং ডেং। আর্কাইভে এই তিনটি জনগোষ্ঠীর তিনটি ঠক-চরিত্র আছে।
পাঠে উসুরের আদি নিবাস নিয়ে অনিশ্চয়তাও স্বীকার করা আছে — “উসুরের আদি নিবাস নিয়ে নানান মত।” তবে ভূগোলটি দেওয়া: তাঁর অধিকাংশ হাস্যরস শংখ নদী ও তার দু’কূলের মানুষকে ঘিরে, আর উল্লেখ আছে তারাছা খালের ওদিকের বমদের কথা।
শিরোনামে লেখা “২য় পর্ব” — অর্থাৎ এটি একটি ধারাবাহিকের দ্বিতীয় কিস্তি, আর প্রথম পর্বটি রূপকথা বিভাগে নেই।
গল্পের শেষটি উসুর-চরিত্রের ভঙ্গিতেই — এক বিধবা বৃদ্ধা একটি গর্ত দেখে ভাবেন কোনো দয়াবান ব্যক্তি তাঁর কচু লাগানোর জন্য গর্ত করে দিয়েছেন, আর যত্ন করে একটি কচুগাছ সেই গর্তে ফেলেন।
লেখক জির কুং সাহু। [উসুরের প্রথম পর্ব ও বাকি গল্পগুলো আর্কাইভে নেই; কোনো মুদ্রিত সংকলনে আছে কি না তা যাচাই করা যায়নি]
হালাম সংগ্রহের একমাত্র পাঠটি ১,০০৮ শব্দের চিনার কন্যা, আর তার উৎস আর্কাইভের পরিচিত একটি নাম — ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা।
অর্থাৎ সেই একটি সংকলন থেকেই আর্কাইভে এসেছে ছয়টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর গল্প — চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, কলই, হালাম, আর তার সঙ্গে আরও।
গল্পের শুরু দুই বোনের দায়িত্বে। তাদের কোনো ভাই না থাকায় বাবা-মায়ের কাছে তারাই একমাত্র আশ্রয়, আর তারা কিছু এনে না দিলে বাবা-মায়ের খাওয়াই হতো না।
শেষটি রূপ বদলের, আর তা অসমাপ্ত অর্থে করুণ — বড় বোন নিচে নেমে আসা পাখিদের ঝাঁকে মিশে গিয়ে “সারা জীবনের জন্য পাহাড়ের আরো উপরে শুণ্যে মিলিয়ে যায়”।
এই সমাপ্তিটি আর্কাইভের আরেকটি পাঠের কাছাকাছি — ত্রিপুরা সারস বালিকা, যেখানে মেয়ে আর কখনো ফিরে আসে না। দুটোই একই সংকলন-ঘরানার, আর দুটোরই বিষয় একটি মেয়ের চলে যাওয়া।
[হালাম জনগোষ্ঠীর অন্য কোনো লোককথা আর্কাইভে নেই; মুদ্রিত সংকলনে কী আছে তা দেখা হয়নি]
নিচে জনগোষ্ঠী অনুযায়ী ১৮টি পোস্ট, প্রতিটির শব্দসংখ্যা আর ভেতরে কী ঘটে তার সারকথাসহ — গল্পের নিজের পাঠ থেকে নেওয়া।
খেয়াং — ১১টি পোস্ট
চাক — ৩টি
খুমী — ২টি
বম — ১টি
হালাম — ১টি
তালিকার খেয়াং অংশে এগারোটি পোস্ট, কিন্তু আলাদা গল্প আটটি — ঘুঘু পাখির গল্প তিনবার আর তিন যুবকের গল্প দু’বার থাকার কারণে। পাঁচটি সংগ্রহ মিলিয়ে ১৮টি পোস্টে ১৫টি আলাদা গল্প।
এগারোটি পোস্ট, মোট ১৮,১৮৩ শব্দ। তবে দুটি গল্প একাধিকবার প্রকাশিত — ঘুঘু পাখির গল্প তিনবার, তিন যুবকের গল্প দু’বার — তাই আলাদা গল্প আটটি।
গল্প। পাঁচটি খেয়াং শিরোনামে শব্দটি আছে, আর প্রতিটির বন্ধনীতে দেওয়া বাংলা অনুবাদের শেষ শব্দ “গল্প” — যেমন কংখোনূপঃ খুই মানে ঘুঘু পাখির গল্প, উহাম চ খুই মানে কুনো ব্যাঙের গল্প।
খেয়াং কংখোনূপঃ খুই (ঘুঘু পাখির গল্প) — তিনটি আলাদা পোস্টে, আর তিনবারের লেবেল আলাদা: খেয়াং লোককাহিনী, খিয়াং রূপকথা ও খিয়াং লোককাহিনী। তিনটিরই লেখক ক্য সা মং খেয়াং, আর পাঠের মিল কার্যত শতভাগ।
আর্কাইভে দুটোই ব্যবহৃত। আটটি পাঠের লেবেলে “খেয়াং”, তিনটিতে “খিয়াং”। এমনকি লেখকের নামেও — চারজনের নামের শেষে “খেয়াং”, একজনের “খিয়াং”। কোনটি জনগোষ্ঠীর নিজের পছন্দ তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয়।
আর্কাইভে দুটোই খেয়াং ট্যাগে আছে, কিন্তু পাঠ অনুযায়ী দুটোরই পটভূমি নাগাভূমি। একটির প্রথম বাক্যে কোহিমার উল্লেখ, আর অন্যটিতে স্পষ্ট লেখা — “লুঙসায় লোথাদের বসতি”। উৎসও তাই বলে: লুঙ্সা গ্রামের লোককথা ও অন্যান্য।
দুটি, দুই জনগোষ্ঠীর। খেয়াং উহাম চ খুই (কুনো ব্যাঙের গল্প)-এ বলা হয়েছে কুনো ব্যাঙের গুটি থেকে বেরোনো সাদা তরল “কাঁঠাল গাছের আঠা ছাড়া আর কিছুই নয়”। আর চাকমা টুনটুনি ও কুনোব্যাঙ-এ একটি শাস্তির দৃশ্য দিয়ে একই দুটি জিনিস ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
চাকদের “য়োছা” কাহিনী অনুযায়ী আরাকানীদের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চাকরা বার্মার শাক্যেংদং ত্যাগ করে পালিয়ে আসেন, পথে দু’ভাগ হয়ে যান, আর আজকের চাক জনগোষ্ঠী সেই কাহিনির তিন পরিবারের বংশধর — পাঠের ভাষায়, “এজন্যে চাক উপজাতির সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য”।
আর্কাইভের একটি পাঠের প্রথম বাক্যেই অর্থ দেওয়া আছে — “দাঁড়ানো”। একই পাঠে চাকদের বসতির মৌজার নামও আছে: নাইক্ষ্যংছড়ি থানার বাইশারী, নাইক্ষ্যংছড়ি, বাঁকখালী ও কামিছড়া মৌজা।
চাক অভিবাসনের কাহিনিতে। প্রথম দল পিছিয়ে-পড়া দ্বিতীয় দলের সুবিধার জন্য পথে পথে কলাগাছ কেটে চিহ্ন রেখে যায়। কিন্তু চিংড়ি রাঁধতে গিয়ে দ্বিতীয় দলের দেরি হয়ে যায় — “চিংড়ি রাঁধলে কি কখনও সাদা হয়?” — আর ততদিনে কাটা কলাগাছে নতুন অঙ্কুর গজিয়ে যায়।
দুটি, মোট ২,০৪৯ শব্দ — আমুয়ু হই অমনন (দুই বোন ও সাপ), লেখক প্রেমি খুমী, আর তাআই হই চিংল্যাই (কাঁকড়া আর টুনটুনি), লেখক লোনাং খুমী। দুটোরই শিরোনামে “হই” শব্দটি আছে, যার বাংলা “ও” বা “আর”।
বম লোককথার একটি ঠক-চরিত্র। পাঠের প্রথম বাক্যেই তুলনা দেওয়া — “বাঙালীদের যেমন গোপাল ভাড়, বমদের উসুর।” তাঁর অধিকাংশ হাস্যরস শংখ নদী ও তার দু’কূলের মানুষকে ঘিরে। আর্কাইভের পাঠটি “২য় পর্ব”, আর প্রথম পর্বটি রূপকথা বিভাগে নেই।
তিনটি জনগোষ্ঠীর তিনটি — বম উসুর, মারমা ন ক নিং আর ত্রিপুরা নাডেং ডেং। তিনটিই একক গল্পের চরিত্র নয়, বরং চক্রের চরিত্র; বম ও মারমা দুটি পাঠেই বাইরের ঠক-চরিত্রের সঙ্গে তুলনা টানা হয়েছে।
একটি — চিনার কন্যা, ১,০০৮ শব্দ, উৎস ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা। সেই একটি সংকলন থেকেই আর্কাইভে এসেছে ছয়টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর গল্প।
এই সংখ্যা কেবল আর্কাইভের হিসাব, আর তা-ও কেবল অন্তর্জালে প্রকাশিত অংশের। মুদ্রিত সংকলনে বা মাঠপর্যায়ের সংগ্রহে কী আছে তা আলাদা প্রশ্ন, আর এই লেখার জন্য এই পাঁচটি জনগোষ্ঠীর কোনো আলাদা মুদ্রিত সংকলন দেখা হয়নি।
আছে। ঙুলুই বেঙসেন চঃ খুই (লাল গাল মাছের গল্প) পুরোটাই একটি দোষের শিকল — মাছ, পাথর, গাছের ডাল, বানর, কুকুর আর কুঁজো বুড়ো-বুড়ি, প্রত্যেকে বলে “ইচ্ছাকৃতভাবে করিনি, কারণ…”। শেষে দায়টি বানরেই ফিরে আসে, আর উপসংহার — “একজনের দোষের কারণে অনেকজনকে ভোগান্তি পোহাতে হয়।”
দুটি জনগোষ্ঠীর দুটি গল্পে প্রায় একই ভাষায়। চাক রঙধনু গল্প-এ — “তখনকার আমল কিন্তু সত্যযুগ। যা মুখে বলে তাই ঘটে।” আর চাকমা হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তে — “সেকালটা ছিল সত্যযুগ, লোকের কথায় কথায় মুখের বাক্য ফলে যেত।” দুটি গল্পেই এটি অনিচ্ছাকৃত পরিণতি তৈরি করে।
এই পাতার সব তথ্য জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত ১৮টি পাঠের নিজের লেখা থেকে নেওয়া — শব্দসংখ্যা, লেবেল, শিরোনামের বন্ধনীতে দেওয়া বাংলা অর্থ, লেখকের নাম ও উৎসের নামসহ। পাঠগুলোর মিল মাপা হয়েছে শব্দ ধরে ধরে। প্রতিটি গল্পের লিংক উপরে তার নিজের অংশে আছে।
সব ব্যক্তির নাম, স্থানের নাম, জনগোষ্ঠীর নাম ও মূল ভাষার শব্দ আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে — বানানের অসংগতিসহ, কারণ সেটিও একটি তথ্য। গল্পের শিরোনাম থেকে কেবল লেবেল-উপসর্গ বাদ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।
প্রসঙ্গ:খুমী, খেয়াং, চাক, বম, রূপকথা, লোককাহিনী, হালাম
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।