Last updated Oct 15th, 2026
0

জুমজার্নালের আর্কাইভে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ৩৯টি লোককাহিনী ও রূপকথা আছে — কোনো একটি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সংগ্রহ, আর পুরো রূপকথা বিভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই পাতাটি সেই ৩৯টির পূর্ণ সংকলন।
সংখ্যাগুলো আর্কাইভের নিজের পাঠ গুনে বের করা। মোট ৫০,১৭৯ শব্দ, গড় গল্প ১,২৮৬ শব্দের। দীর্ঘতম পাঠ ৫,৮৩৩ শব্দের, ক্ষুদ্রতম ২৬৫।
এই সংগ্রহটি আর্কাইভে সবচেয়ে ভালোভাবে নথিবদ্ধও। ২১টি পাঠে লেখক বা বর্ণনাকারীর নাম ছাপা আছে, ২০টিতে উৎস-গ্রন্থের নাম, আর সাতটিতে ছবির শিল্পীর নাম।
ত্রিপুরা সংগ্রহের ৩৯টি পাঠে তিনটি আলাদা লেবেল ব্যবহৃত — ২২টিতে “লোককাহিনী”, ২৮টিতে “রূপকথা” আর সাতটিতে “লোককথা”। সংখ্যাগুলো যোগ করলে ৩৯-এর বেশি হয়, কারণ অনেক গল্প একসঙ্গে একাধিক লেবেল বহন করে।
শিরোনামে জনগোষ্ঠীর নামের বানানও এক নয় — কোথাও “ত্রিপুরা”, কোথাও “ত্রিপুরী”। দুটোই একই জনগোষ্ঠী বোঝাতে ব্যবহৃত।
লেবেলগুলো যে কাহিনির ধরন বিচার করে বসানো হয়নি, তার সরাসরি প্রমাণও এই সংগ্রহে আছে — একই গল্প দুইবার প্রকাশিত, একবার “লোককাহিনী” আর একবার “রূপকথা” নামে। চারটি লেবেলের পূর্ণ ব্যাখ্যা আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।
গল্পগুলোর পটভূমি কেবল ত্রিপুরা রাজ্য নয়। একটি গল্পের শুরু মিজোরামের পাহাড়ে, আরেকটিতে ত্রিপুরা-লুসাই-কুকী তিন রাজ্যের সীমানা, আর অনেকগুলোতে গোমতী ও মনু নদীর নাম।
৩৯টি পাঠের ২০টিতে উৎস-গ্রন্থের নাম ছাপা আছে, আর সেখানে চারটি আলাদা নাম ফিরে আসে।
| উৎস | যত পাঠে |
|---|---|
| ত্রিপুরা আদিবাসী লোককাহিনী | ১৩ |
| ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা | ৪ |
| ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি (২০১২ ইং) | ২ |
| মোনঘর উচ্চ বিদ্যালয় | ১ |
তৃতীয় নামটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটিই আর্কাইভের একমাত্র উৎস যার প্রকাশসন পাঠে লেখা আছে — ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি, ২০১২ ইং। দুটো পাঠেই সঙ্গে লেখকের নামও আছে: মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা।
প্রথম দুটি নাম প্রায় একই শোনায়, কিন্তু আলাদা — একটিতে “লোককাহিনী”, অন্যটিতে “লোককথা”। [দুটি আলাদা বই, না একই বইয়ের দুই রকম উল্লেখ — তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয়, যাচাই প্রয়োজন]
বাকি ১৯টি পাঠে উৎস-গ্রন্থের নাম নেই; সেগুলোতে কেবল লেখক বা বর্ণনাকারীর নাম আছে, কিংবা কিছুই নেই।
আর্কাইভের ত্রিপুরা সংগ্রহের সবচেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো নাম — ২১টি পাঠে লেখক বা বর্ণনাকারীর নাম ছাপা আছে, যা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর সংগ্রহে নেই।
| নাম | যত পাঠে | যেভাবে উল্লিখিত |
|---|---|---|
| আবু রেজা | ১৭ | “লেখক : আবু রেজা” |
| শোভা ত্রিপুরা | ৫ | “লেখকঃ শোভা ত্রিপুরা”, একটিতে “মিসেস শোভা ত্রিপুরা” |
| মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা | ২ | বইয়ের নাম ও সনের সঙ্গে |
| সত্যহা পানজি | ১ | “লেখক: সত্যহা পানজি” |
| যগেশ্বর ত্রিপুরা | ১ | “দশম শ্রেণী, মোনঘর উচ্চ বিদ্যালয়” |
| জাফর আহমদ হানাফী | ১ | “রূপকথাটি জাফর আহমদ হানাফী কর্তৃক বর্ণিত” |
শেষ দুটি সারি লক্ষণীয়। যগেশ্বর ত্রিপুরা-র নামের সঙ্গে শ্রেণি ও স্কুলের নাম দুটোই আছে — অর্থাৎ গল্পটি একজন স্কুলছাত্রের লেখা, আর মোনঘর আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই আর্কাইভে এসেছে।
আর জাফর আহমদ হানাফী-র ক্ষেত্রে শব্দটি “লেখক” নয়, “বর্ণিত” — অর্থাৎ তিনি গল্পটি বলেছেন, লেখেননি। লোককথা সংগ্রহে এই দুই ভূমিকার ফারাক গুরুত্বপূর্ণ, আর আর্কাইভে সেটি একটিমাত্র পাঠে স্পষ্ট করা আছে।
সতেরোটি পাঠে আবু রেজার নাম থাকার অর্থ, ত্রিপুরা সংগ্রহের প্রায় অর্ধেক একই হাত দিয়ে এসেছে। পাঠগুলোর ভাষা ও দৈর্ঘ্যেও তার ছাপ আছে — এই সতেরোটির বেশিরভাগই পাঁচশো থেকে এক হাজার শব্দের মধ্যে, আর প্রতিটির শেষে একটি স্পষ্ট উপসংহার।
সংগ্রাহক, কথক ও বইয়ের ভূমিকা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ের লোককথা কে সংগ্রহ করেছিলেন-এ।
সাতটি পাঠে ছবির শিল্পীর নাম ছাপা আছে, আর তাঁদের চারজনের নাম আলাদা করে পাওয়া যায়।
কৃতিত্বের শব্দগুলো এক নয় — “ছবি”, “চিত্রায়ন”, “ছবিটি এঁকেছেন” — অর্থাৎ পাঠগুলো আলাদা আলাদা সময়ে আলাদা হাতে তৈরি হয়েছে।
লক্ষণীয়, ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর গল্পের ছবি এঁকেছেন চাকমা ও রাখাইন শিল্পীরা। [শিল্পীরা জুমজার্নালের জন্যই এঁকেছেন কি না, কিংবা ছবিগুলো মূল বই থেকে এসেছে — তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয়, যাচাই প্রয়োজন]
৩৯টি পাঠের অন্তত নয়টি কোনো একটি জিনিসের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে, আর বেশিরভাগই একই ধরনের বাক্যে শেষ হয় — “সেই থেকে”, “তখন থেকে”, “এরপর থেকে”।
| গল্প | যা ব্যাখ্যা করে |
|---|---|
| চিংড়ির সাজা | চিংড়ির মাথায় বিষ্ঠা কেন জমে |
| ক্ষণিকের বন্ধুত্ব | ব্যাঙ কেন বুকে ভর দিয়ে চলে, সোজা দাঁড়াতে পারে না |
| স্বর্গের ফুল খেরেঞ্জবার | খেরেঞ্জবার ফুল দেখতে সুন্দর হলেও কেন গন্ধ নেই |
| ধনেশপাখি | ধনেশপাখির মা কেন ডিমে বসে থাকে আর বাবা খাবার আনে |
| কথা বোলো না | পাখিরা উড়তে উড়তে কেন ডাকে “কোক-তা-সাদি” — অর্থ, কথা বোলো না |
| লাল ঘন্টা | ডারলং আদিবাসী নামটি কোথা থেকে এল |
| রক্তপিয়াসি দেবতা | চৌদ্দ দেবতার পূজায় ছাগল বলির প্রথা কীভাবে শুরু হলো |
| অলস পুরোহিত | বুড়াচা পূজা কেন বাধ্যতামূলক, আর ‘ডেঙ্গা ওচাই’ কে |
| বনের এক বিচারক | বাঘ ও শূকর কেন আলাদা বসবাস করে |
তালিকাটি থেকে একটি কথা স্পষ্ট হয়: এই গল্পগুলোর কাজ কেবল বিনোদন নয়। চারটি গল্প প্রাণীর চেহারা বা আচরণ ব্যাখ্যা করে, দুটি ধর্মীয় প্রথার সূচনা ব্যাখ্যা করে, আর একটি একটি জনগোষ্ঠীর নামের উৎপত্তি।
শেষ তিনটি আলাদা গুরুত্ব বহন করে, কারণ সেগুলো গল্প হয়েও ইতিহাস বা আচারের ব্যাখ্যা — অর্থাৎ কিংবদন্তির কাছাকাছি। সেজন্যই সম্ভবত একটি উৎস-গ্রন্থের নামে “কিংবদন্তি” শব্দটি আছে।
আর্কাইভের ত্রিপুরা সংগ্রহে একটি মোটিফ বারবার ফিরে আসে — মানুষ ও পশুর বিয়ে, কিংবা মানুষের পশু হয়ে যাওয়া। অন্তত পাঁচটি পাঠে এটি আছে, আর দুটির শিরোনামেই তা লেখা।
দুটি শিরোনাম পাশাপাশি রাখলে মোটিফের দুই দিকই দেখা যায় — বানর বউ-এ পশু হলো বউ, আর বানর জামাই-এ পশু হলো জামাই। দুটোর পরিণতিও আলাদা।
হরিণ-মাতা-য় রূপ বদল উল্টো দিকে যায়: শেষে হরিণ-মাতা শিমুল গাছ থেকে মাছ হয়ে যান, আর তাঁর ছেলেমেয়েরাও মাছ হয়ে সমুদ্রে নিরাপদে বসবাস করতে থাকে। অর্থাৎ পশু হওয়াটি এখানে শাস্তি নয়, আশ্রয়।
চাঁদের ছেলে সোনাব্যাঙ-এ নিঃসন্তান এক জুম চাষীর ঘরে আসে সোনাব্যাঙ, আর শেষে সে রাজা হয়ে প্রজাদের লালন করে — প্রজারা তাকে ডাকে ফা, যার অর্থ পাঠে দেওয়া: পিতা।
এই মোটিফটি পাহাড়ের অন্য জনগোষ্ঠীর গল্পেও আছে, আর তিন ভাষার তুলনা করা আছে আলাদা লেখায়: পশু বর ও পশু বউয়ের মোটিফ।
আর্কাইভের ১২৫টি পাঠে বাঘ আছে ৩১টিতে, আর তার মধ্যে ১১টিই ত্রিপুরা সংগ্রহের — কোনো একটি জনগোষ্ঠীর গল্পে সর্বোচ্চ। শূকর আরও বেশি: ১৫টি ত্রিপুরা পাঠে।
| প্রাণী | যত ত্রিপুরা পাঠে |
|---|---|
| রাজা (চরিত্র হিসেবে) | ২০ |
| পাখি | ১৬ |
| শূকর | ১৫ |
| বাঘ | ১১ |
| জুমিয়া | ১০ |
| বানর | ৯ |
| হাতি | ৯ |
| মুরগি | ৮ |
| দেবতা | ৮ |
| ভূত বা প্রেত | ২ |
| বিড়াল | ৫ |
| কাঁকড়া | ৩ |
বাঘের ভূমিকা একরকম নয়, আর সেটিই লক্ষণীয়। বাঘ এবং একটি কচ্ছপ-এ সে বোকা বনে যায়; অবিরাম বৃষ্টি-তে এক কাঁকড়ার বিষদাঁতে তার মৃত্যু হয়; চার বন্ধুর জুমচাষ-এ তার গর্জনেই বন্ধুত্ব ভেঙে যায়; আর বনের এক বিচারক-এ সে কৃতজ্ঞতা ভুলে যায়।
শূকরের ভূমিকাটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উল্টো — সে সাহায্য করে, বাঁচায়, কিংবা শিকার হয়। বনের এক বিচারক-এ বুনোশূকরই বাঘের বাচ্চাকে বাঁচায়, আর মিষ্টি বাশির সুর শুরু হয় এক তেষ্টায় কাতর বুনো শূকরকে দিয়ে।
জুমিয়া শব্দটি দশটি পাঠে আছে, আর বেশিরভাগ গল্পের নায়ক একজন জুমচাষি — রাজা বা জমিদার নন। অর্থাৎ ২০টি পাঠে রাজা থাকলেও কাহিনির কেন্দ্র সাধারণত জুমের সংসার।
ছকের শেষ সারিটি নিয়ে একটি কথা বলা দরকার। ভূত বা প্রেত আছে মাত্র দুটি ত্রিপুরা পাঠে — ভূতের কুকুর-ভীতি ও রক্তপিয়াসি দেবতা। গণনাটি শব্দ-সীমানা ধরে করা, আর অদ্ভুত ধরনের শব্দ বাদ দেওয়া হয়েছে, কারণ তার ভেতরেও একই বর্ণক্রম থাকে কিন্তু অর্থ আলাদা।
কুড়িটি পাঠে রাজা আছেন, আর তার মধ্যে চারটিতে রাজা কেবল পটভূমি নয় — কাহিনির কেন্দ্র।
লাংগাই রাজা পাঠটি আর্কাইভে আলাদা, কারণ এটি গল্প হয়েও ভূগোল ও প্রশাসনের হিসাব দেয়। শুরুতেই তিনটি রাজ্যের নাম — ত্রিপুরা, লুসাই ও কুকী — আর সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠী-নামের সমার্থক শব্দ: কুকীদের অনেকে “বারকিহালাম”ও বলেন।
গ্রামের হিসাবটিও পাঠে সংখ্যা ধরে দেওয়া: তিপ্রা রাজা কাসকুর রাজ্যে ছিল ছয়কুড়ি ছয়টি গ্রাম, আর প্রতি গ্রামে ছয়কুড়ি ছয় পরিবার। কুড়ি-ভিত্তিক গণনার এই ভঙ্গিটি নিজেই একটি তথ্য।
রক্তপিয়াসি দেবতা-য় রাজা ত্রিলোচন ও রানি-মা হিরাবতীর নাম আছে, আর শেষে একটি প্রথার সূচনা — চৌদ্দ দেবতার পূজায় ছাগল বলি, যা পাঠ অনুযায়ী আষাঢ় মাসের শুক্লা অষ্টমী থেকে সাত দিন ধরে চলে।
নিয়তির পরিহাস সবচেয়ে ছোট রাজ-কাহিনি, মাত্র ৩৯৪ শব্দের, আর তার সমাপ্তি সবচেয়ে কঠিন — রাজকুমারের আঁকা বাঘের ছবিতে চোখ বসানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি জ্যান্ত হয়ে ওঠে।
আর্কাইভের ত্রিপুরা সংগ্রহে দুটি পাঠ আছে যেগুলো একই উৎস থেকে, একই লেখকের হাতে, আর দুটোরই বিষয় প্রেম — পুন্দা তান্নায় (লালমতির প্রেম কাহিনী) ও খুম কামানি (পুষ্পচয়ন/ফুল গাছে আরোহন)।
দুটোর শেষেই লেখক মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরার নাম, আর উৎস ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি (২০১২ ইং) — আর্কাইভের একমাত্র উৎস যার প্রকাশসন পাঠে লেখা।
কিন্তু দুটোর আকার ও গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। পুন্দা তান্নায় ৫,৮৩৩ শব্দের একটি পূর্ণ আখ্যান — সমাজপতি দাংগুই বুড়ার নাতনি লালমতি, তার প্রেমিক, ছাগলরূপী এক যোগী, যুদ্ধ, আর শেষে গোঁসাইন রাজার রায়ে সম্পত্তি ফেরত। খুম কামানি ৯৬৪ শব্দের, আর তার গঠন অনেকটা স্মৃতিকথার।
শেষ বাক্য দুটি পাশাপাশি রাখলে ফারাকটি স্পষ্ট হয়। পুন্দা তান্নায় শেষ হয় স্মরণে — “লালমতির প্রেম ও সুমন্তের বীরত্ব চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।” আর খুম কামানি শেষ হয় একটি চলমান কিংবদন্তিতে: সেই প্রেম “নাকি আজো অক্ষুণ্ন রয়েছে”, আর তারা “প্রতি বৎসরের শেষে মিলিত হয়”।
দ্বিতীয়টির গঠনই তাকে কিংবদন্তির কাছে নিয়ে যায়, কারণ ঘটনাটি শেষ হয়ে যায় না — প্রতি বছর ফিরে আসে। উৎস-গ্রন্থের নামে “কিংবদন্তি” শব্দটি থাকার কারণ সম্ভবত এটিই।
দুটো পাঠের শুরুও একই ছাঁদে — দুটোই শৈশবের বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু। খুম কামানি-তে দাবিং পাড়ার দুই শিশু “বালি এবং নানা রকম গাছের কচি পাতা নিয়ে খেলা করত”, আর তাদের ভাব এতই ছিল যে একজনকে বাদ দিয়ে অন্যজন থাকত না।
৪,৪১৮ শব্দের লাংগাই রাজা আর্কাইভের ত্রিপুরা সংগ্রহের দ্বিতীয় দীর্ঘতম পাঠ, আর গঠনে সবচেয়ে অস্বাভাবিক — কারণ এটি গল্প বলার আগে মানচিত্র আঁকে।
শুরুর অনুচ্ছেদেই তিনটি রাজ্যের নাম ও তাদের অবস্থান — ত্রিপুরা, তার সীমান্তে লুসাই, তারপর কুকী। সঙ্গে একটি সমার্থক নামও দেওয়া: কুকীদের অনেকে “বারকিহালামও বলে থাকেন”।
তারপর আসে প্রশাসনের হিসাব, আর তা সংখ্যা ধরে: তিপ্রা রাজা কাসকুর রাজ্যে ছিল ছয়কুড়ি ছয়টি গ্রাম, আর প্রতি গ্রামে ছয়কুড়ি ছয় পরিবার। কুড়ি-ভিত্তিক এই গণনার ভঙ্গিটি নিজেই একটি নৃতাত্ত্বিক তথ্য — সংখ্যাটি একশো ছাব্বিশ, কিন্তু বলার ধরনটি সম্পূর্ণ আলাদা।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিতাং, আর তার বীর হয়ে ওঠার পর্বটি একটি স্বপ্ন দিয়ে শুরু। স্বপ্নে এক রমণী তাকে নির্দেশ দেন — অমাবস্যার রাতে একা গুমতি নদীর পাড়ে একটি বিরাট বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, আর কাউকে স্বপ্নের কথা বলা যাবে না।
এরপর আসে আর্কাইভের সবচেয়ে বিস্তারিত গণনামূলক বর্ণনাটি: নদীতে ভেসে আসবে সাতটি অজগর — প্রথমটির সাতটি মাথা, সাতটি ঝুঁটি আর সাতটি প্রদীপ; দ্বিতীয়টির ছয়; তৃতীয়টির পাঁচ; এভাবে নেমে এসে সপ্তমটির একটি মাথা, একটি ঝুঁটি, একটি প্রদীপ।
শর্তটি সরল — সাতটির মধ্যে যেকোনো একটি ধরলেই সে “অশেষ গুণবান এবং বীর” হবে।
পরের অংশটি গল্পটির সবচেয়ে মানবিক দিক, আর সেটিও ঘরোয়া। বিতাং মাকে সরাসরি কিছু বলতে পারে না, তাই ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে অমাবস্যা কবে; মা বলেন আগামী শনিবার। তারপর সে নিরামিষ খেতে চায়, আর মা “মনে মনে খুশীই” হয়ে অমাবস্যার দিনে শুদ্ধভাবে নিরামিষ রেঁধে ছেলেকে খাওয়ান — অথচ কারণটি তিনি জানেন না।
গল্পের শেষটি যুদ্ধ নয়, ক্ষমা প্রার্থনা। বিতাং সসৈন্যে দেশে ফিরে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে “কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে”।
৩৯টি ত্রিপুরা পাঠের মাত্র সাতটিতে “সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগল” ধরনের সমাপ্তি আছে। বাকি ৩২টির শেষ অন্য রকম — কখনো ব্যাখ্যা, কখনো নীতিবাক্য, আর কয়েকটিতে সরাসরি মৃত্যু।
সুখী সমাপ্তির সাতটি: জন্মান্তর, আংটি কথা বলে, বানর বউ, দুই বালিকা, রাজহাঁস, স্বর্গের ফুল খেরেঞ্জবার আর হরিণ-মাতা।
কঠিন সমাপ্তির উদাহরণও নাম ধরে দেওয়া যায়। দুই বালিকা-র শেষে একটি পাত্র খুলে ছিন্ন মাথা দেখে একটি চরিত্র অজ্ঞান হয়ে মারা যায়। নিয়তির পরিহাস-এ রাজকুমারের আঁকা বাঘের ছবিতে চোখ বসানোর সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি জ্যান্ত হয়ে তার ঘাড় মটকে দেয়। সারস বালিকা-য় মেয়ে আর কখনো ফিরে আসে না, আর বাবা “কপাল চাপড়ে অনেক কাঁদল”।
এই অনুপাতটি লক্ষণীয়, কারণ বাংলা রূপকথার প্রচলিত ছবিতে সুখী সমাপ্তিই নিয়ম। আর্কাইভের ত্রিপুরা সংগ্রহে তা ব্যতিক্রম — পাঁচটির মধ্যে একটিরও কম।
কারণটি সম্ভবত গঠনে। যেসব গল্প কোনো জিনিসের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে, সেগুলোর শেষ বাক্য স্বভাবতই একটি ব্যাখ্যা — সুখ বা দুঃখ নয়। আর যেসব গল্পের কাজ নীতিশিক্ষা, সেগুলোর শেষ বাক্য একটি রায়, যেমন “নির্বোধ ব্যক্তির জীবনে কখনো উন্নতি হয় না।”
[সুখী সমাপ্তির গণনাটি “সুখে-শান্তিতে”, “সুখে শান্তিতে” ও “পরম সুখে” — এই শব্দবন্ধগুলো খুঁজে করা; এর বাইরে অন্য ভাষায় লেখা সুখী সমাপ্তি গণনায় আসেনি]
ত্রিপুরা সংগ্রহের কয়েকটি পাঠে ধর্মীয় আচারের নাম ও পদের নাম সরাসরি ব্যাখ্যা করা আছে — অর্থাৎ গল্পের ভেতরে একটি ছোট শব্দকোষ বসে আছে।
| শব্দ | পাঠে দেওয়া ব্যাখ্যা | কোথায় |
|---|---|---|
| ওচাই | “গ্রামের পুরোহিত” | ভূতের কুকুর-ভীতি |
| অচাইগিরি | “পুরুগিরি” | নাডেং ডেং |
| ডেঙ্গা ওচাই | “যে পূজার অনুষ্ঠান পরিচালনা করে” | অলস পুরোহিত |
| বুড়াচা | বাধ্যতামূলক পূজা, বিপদ-আপদ বা রোগমুক্তির জন্য | অলস পুরোহিত |
| চৌদ্দ দেবতা | আষাঢ়ের শুক্লা অষ্টমী থেকে সাত দিনের পূজা | রক্তপিয়াসি দেবতা |
| গড়িয়া পূজা | চৈত্রমাসের সময়কাল হিসেবে উল্লিখিত | স্বর্গের ফুল খেরেঞ্জবার |
| ফা | “পিতা” | চাঁদের ছেলে সোনাব্যাঙ |
এই শব্দগুলো গল্পের অলংকার নয়; পাঠে এগুলোর ভূমিকা আছে। অলস পুরোহিত গল্পটি শেষই হয় বুড়াচা পূজার ব্যাখ্যা দিয়ে, আর ভূতের কুকুর-ভীতি-র শুরু হয় ওচাইয়ের কাছে মন্ত্র শিখতে চাওয়া দিয়ে।
দুটি পাঠে ভূত-সংক্রান্ত বিশ্বাসও নিয়মের আকারে লেখা আছে — শেষ লাইনেই বলা হয়, এরপর থেকে তারা বিশ্বাস করে ভূত সব সময় কুকুরকে ভয় পায়। পাহাড়ের ভয়ের জগৎ নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি ভূতের গল্পে।
ত্রিপুরা সংগ্রহে দুটি আলাদা ঘটনা আছে, আর দুটোকে এক করে ফেলা সহজ — একটি হলো একই গল্প দুইবার প্রকাশিত, অন্যটি একই মোটিফের দুটি আলাদা গল্প।
প্রথমটি নকল। জেলে ও বোয়ালমাছ দুইবার প্রকাশিত — একবার “ত্রিপুরা লোককাহিনী” নামে (২,০২৫ শব্দ), একবার “ত্রিপুরা রূপকথা” নামে (১,৯৮৫)। দুটো পাঠ কার্যত এক, আর দুটোতেই লেখক শোভা ত্রিপুরা।
দ্বিতীয়টি নকল নয়। মিষ্টি বাশির সুর (১,৫১৮ শব্দ) আর বুননা শূকর ও ইঁদুর (৯৬৮) — দুটো আলাদা গল্প, আলাদা শুরু, কিন্তু দুটোই শেষ হয় একই জায়গায়: পাখির হাড়ের বাঁশি, আর চিল ও ইঁদুরের একসঙ্গে বসবাস।
পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ক্ষেত্রে একটি পোস্ট বাড়তি; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে একই কাহিনির দুটি মুখে-মুখে চলা রূপ — লোককথা সংগ্রহে যা স্বাভাবিক ও মূল্যবান।
একইভাবে প্রতিশোধ পরায়ণ মুরগিছানা আর মুরগি ও চালের পিঠা — দুটোতেই বিড়ালের হাত থেকে মুরগিছানাদের বাঁচা ও প্রতিশোধ, কিন্তু ঘটনাক্রম আলাদা। চাকমা সংগ্রহেও এই মোটিফের একটি রূপ আছে — দশ ক্ষুদে মুরগী ছানার প্রতিশোধ।
ত্রিপুরা সংগ্রহের একটি বড় সম্পদ হলো নাম। গল্পগুলোতে চরিত্রের নাম সাধারণ “এক রাজা, এক রানি” নয় — নাম ধরে লেখা, আর অনেকগুলো ত্রিপুরা ভাষার।
মানুষের নাম যেমন — দাংগুই বুড়া, লালমতি, সুমন্ত, কাসকু, বিতাং, থুতুরু, পিলেহা, খেলাংতি, ছিপিঙতুই, মইরুঙতুই, অগুরায়, নারান, রালেকা, সেনেরইয়া, কাচক রায়, সমপরি, শ্যামাচরণ, ধনঞ্জয়, ত্রিলোচন, হিরাবতী, মানিক, আরতি, নাডেং ডেং, টটেমা।
জায়গা ও নদীর নামও আছে — গোমতী নদী, মনু নদী, মিজোরামের পাহাড়, দাবিং পাড়া, ঢাবিং পাড়া, রিয়াং পাড়া, নয়নমণি গ্রাম।
আর কয়েকটি গাছ-ফুল-পাখির নাম ত্রিপুরা ভাষায় — খেরেঞ্জবার (ফুল), খুম কামানি (পুষ্পচয়ন বা ফুল গাছে আরোহন), পুন্দা তান্নায়, পরি বিবি চিনিন (সাত বোন পরী)। প্রতিটির বাংলা অর্থ শিরোনামে বন্ধনীতে দেওয়া।
এই নামগুলো এই পাতায় আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে — বানান বদলানো হয়নি।
আর্কাইভের ত্রিপুরা সংগ্রহে একটি পাঠ আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার সংলাপ ত্রিপুরা ভাষায় লেখা আর প্রতিটির পাশে বন্ধনীতে বাংলা অনুবাদ দেওয়া — পরি বিবি চিনিন (সাত বোন পরী)।
পাঠে এরকম চৌদ্দটি জায়গায় মূল ভাষার কথা আর তার বাংলা পাশাপাশি আছে। দুটি উদাহরণ:
এই গঠনটি আর্কাইভে বিরল। অন্য পাঠগুলোতে মূল ভাষার কেবল শব্দ রাখা হয়েছে — এখানে রাখা হয়েছে পুরো বাক্য, আর সেটিও সংলাপের ভেতরে।
এর একটি ব্যবহারিক মূল্য আছে। সংলাপগুলো পাশাপাশি থাকায় পাঠটি একসঙ্গে গল্প এবং একটি ছোট ভাষা-নমুনা — আর্কাইভে এই দুটি কাজ একসঙ্গে করা পাঠ আর নেই।
এছাড়া আলাদা আলাদা পাঠে ত্রিপুরা ভাষার শব্দ রাখা হয়েছে বাংলা অর্থসহ — যেমন ওচাই (গ্রামের পুরোহিত), অচাইগিরি (পুরুগিরি), ফা (পিতা), খুম কামানি (পুষ্পচয়ন বা ফুল গাছে আরোহন), পরি বিবি চিনিন (সাত বোন পরী), কোক-তা-সাদি (কথা বোলো না)।
কয়েকটি শব্দের অর্থ পাঠে দেওয়া নেই, যদিও প্রসঙ্গ থেকে অনুমান করা যায় — লাইসাম্পি (শীতের পোশাক বা কাঁথা হিসেবে ব্যবহৃত), গোদকভাত (ভোরের খাবার), খারা (পিঠে বহনের ঝুড়ি), রিসা। [এই শব্দগুলোর অর্থ কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
পাহাড়ি ভাষার লিপি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার অবস্থা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা-য়।
দুই হাজার শব্দের বেশি আটটি পাঠের মধ্যে তিনটির গঠন আলাদা করে লক্ষ করার মতো, কারণ তিনটিই আলাদা রকমের গল্প — একটি জাদুর, একটি রূপ বদলের, আর একটি নিছক বোকামির।
গল্পের শুরু মা-হারা দুই বোনের সংসারে, আর তার প্রথম এক-তৃতীয়াংশ কার্যত জুমচাষের বর্ণনা। পৌষের শুরুতে কার্পাসের বীজ পেকে ফেটে গেছে, “সারা জুম ক্ষেত সাদা হয়ে আছে”, আর চারজনে মিলে দু’তিন দিনে সব কার্পাস ঘরে তুলে আনে।
গল্পের মোড়টি আসে একটি ঘরোয়া বিরক্তি থেকে। বড় মেয়ে ঘরে বসে তুলো ধুনছিল, সারা ঘর আঁশে ভরে যাওয়ায় মা বকেন; উঠোনে গেলে শুকনো পাতা মিশে যায়; শেষে সে টংঘরের চালে উঠে বসে — আর তখনই দমকা বাতাস সব তুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়।
এরপর বাতাস নিজেই কথা বলে ওঠে, আর মেয়েটি তাকে “মামা” সম্বোধন করে। বাতাসের বাড়িতে যাওয়া, আর সেখান থেকে কৌটো পাওয়া — এই পথেই গল্পটি জাদুর দিকে ঢোকে।
শেষ বাক্যটি নীতিবাক্য, আর পাঠে তা সরাসরি লেখা: “এখন বুঝতে পেরেছি পরিশ্রম করেই ধন উপার্জন করতে হয়। সম্মান পেতে হয় ভাল কাজ করে আর ভালবেসে।”
জমিদারের সাত ছেলের ছয়জনের সুন্দরী বউ আছে; ছোট কুমারকে ধনুক আর সাতটি তীর দিয়ে পাঠানো হয় বউ আনতে। ছয়টি তীরই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
তখন আকাশপথে যাচ্ছিল সাত বোন পরী — পাঠে তাদের কাজও লেখা আছে: “তারা সন্ধ্যার তারা ফুটাতো আকাশে।” ছোট পরীটি গাছের শাখায় বানর সেজে বসে থাকে, আর ছোট কুমারের শেষ তীরটি সে খপ করে ধরে ফেলে।
এরপর গল্পের বড় অংশ অপমানের — বৌদিদের হাসাহাসি, কানাঘুষা, আর ছোট কুমারের বেত দিয়ে মারা। পরিণতি আসে কাপড় বোনার পরীক্ষায়, যেখানে বানর-বউয়ের বোনা কাপড়টিই সবচেয়ে ভালো হয়।
এই পাঠটিই আর্কাইভের একমাত্র গল্প যেখানে প্রতিটি সংলাপ ত্রিপুরা ভাষায়, আর পাশে বাংলা অনুবাদ।
শিরোনামের অর্থ পাঠেই দেওয়া — “পাড়ার সবাই ডাকতত বেদমান বুড়ো অথ্যাৎ বোকা বুড়ো বলে।” বউটি চালাক, আর ঘরে তরকারি নেই; তাই বুড়োকে বনে পাঠানো হয় ফাঁদ আর ভাঙা ঝুড়ি নিয়ে।
বনের বর্ণনাটি গল্পের সবচেয়ে ভালো অংশ, আর সেখানে পাহাড়ের খাদ্যতালিকা নাম ধরে আছে — ব্যাঙের ছাতা, চেঁকি শাক, বন মোরগ, বুনো পাখির মাংস, আর “বাঁশ বনের কচি বাঁশের ডগা — ওগুলি পাহাড়ীয়া মানুষগুলি রান্না করে খায়।”
বোকামিটি স্পষ্ট হয় একটি বিশ্বাসে: বুড়ো ঝরনার ধারে শুয়ে পড়ে, কারণ তার ধারণা নারায়ণ দয়া করলে “তরিতরকারি আপনিই এসে ফাঁদের ভিতর ঢুকবে”। ফাঁদে আটকা পড়ে একটি বকের ছানা, আর তার কান্নায় বুড়োর ঘুম ভাঙে।
গল্পের শেষটি কঠিন — এক লোকের ঘাড় মটকে দেয় বাঘ, আর বুড়ি ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করে। লেখক শোভা ত্রিপুরা।
ত্রিপুরা সংগ্রহের একটি কম-আলোচিত মূল্য হলো তথ্য। গল্পগুলোর পটভূমি কল্পনার হলেও তার ভেতরে জুমজীবনের দৈনন্দিন কাজ, খাবার, পোশাক ও ঘরের গঠন নাম ধরে ধরে আছে।
জুমের কাজ। মাঘ-ফাল্গুনে নতুন টিলার খোঁজ, পৌষে কার্পাসের বীজ পেকে ফাটা, তুলো ধোনা, জ্বালানি কাঠ আনা, আর জুম থেকে ফসল তোলা — একটি গল্পেই এই পুরো চক্রটি আছে।
খাবার। গোদকভাত, ব্যাঙের ছাতা, চেঁকি শাক, কচি বাঁশের ডগা, বন মোরগ, বুনো পাখির মাংস, শূকর, ছাগল, কাছিম — আর কলা পাতার মোচায় বাঁধা ভাত, যা বনে নিয়ে যাওয়ার খাবার।
ঘর ও জিনিস। টংঘর (পাঁচটি পাঠে), পিঠের খারা অর্থাৎ বহনের ঝুড়ি (ছয়টি পাঠে), ভাঙা বাঁশের ঝুড়ি, তাঁত, পাখি ধরার ফাঁদ, আর শীতের লাইসাম্পি ও লেপ-তোষক।
বাণিজ্য। একটি গল্পে একটি বাক্য আছে যা পাহাড় ও সমতলের সম্পর্ক ধরে রাখে — সমতলের চাষি বন্ধুরা আগেই বলে রেখেছিল তারা লেপ, তোষক বানাবে, তাই এবার কার্পাসের বীজ বেশি বোনা হয়েছিল।
এই বিবরণগুলো গল্পের অলংকার নয়; এগুলোই গল্পের পটভূমি। তাই পাঠগুলো কেবল লোককথা নয় — জুমজীবনের একটি পরোক্ষ নথিও। জুমচাষের পদ্ধতি ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে।
দুই হাজার শব্দের বেশি আটটি পাঠ। এগুলোতে একাধিক পর্ব, নামসহ বহু চরিত্র আর প্রায়ই একটি রাজসভা আছে।
যেসব গল্পের প্রধান চরিত্র পশু বা পাখি, আর মানুষ পটভূমিতে কিংবা নেই।
যেসব গল্প শেষে কোনো একটি জিনিসের কারণ ব্যাখ্যা করে — প্রাণীর চেহারা, ফুলের গন্ধ, পাখির ডাক, প্রথার সূচনা কিংবা একটি নামের উৎপত্তি।
যেসব গল্পের কেন্দ্রে বুদ্ধি, ঠকামি বা বোকামি, আর শেষে প্রায়ই একটি সরাসরি উপসংহার।
চারটি দলে মোট ৩৯টি গল্প। দলভাগটি পাঠের ভেতরের ঘটনা দেখে করা, আর্কাইভের লেবেল দেখে নয় — তাই একই গল্প অন্য দলেও বসানো যেত। [এই দলভাগ কোনো প্রকাশিত শ্রেণিবিন্যাস অনুসরণ করে না]
৩৯টি — কোনো একটি জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সংগ্রহ, আর পুরো রূপকথা বিভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সব মিলিয়ে ৫০,১৭৯ শব্দ, গড় গল্প ১,২৮৬ শব্দের।
২০টি পাঠে উৎস-গ্রন্থের নাম আছে। সবচেয়ে বেশি ত্রিপুরা আদিবাসী লোককাহিনী — তেরোটি পাঠে, এরপর ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা চারটিতে, ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি (২০১২ ইং) দুটিতে, আর মোনঘর উচ্চ বিদ্যালয় একটিতে।
একুশটি পাঠে নাম ছাপা আছে। আবু রেজা সতেরোটিতে, শোভা ত্রিপুরা পাঁচটিতে, মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা দুটিতে, আর সত্যহা পানজি, যগেশ্বর ত্রিপুরা ও জাফর আহমদ হানাফী একটি করে। শেষজনের ক্ষেত্রে শব্দটি “বর্ণিত”, অর্থাৎ তিনি গল্পটি বলেছেন।
পুন্দা তান্নায় (লালমতির প্রেম কাহিনী) — ৫,৮৩৩ শব্দ, যা পুরো আর্কাইভের দ্বিতীয় দীর্ঘতম পাঠ। লেখক মহেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, উৎস ত্রিপুরা লোককাহিনী ও কিংবদন্তি (২০১২ ইং)।
বাঘ এবং একটি কচ্ছপ — ২৬৫ শব্দ। এক ক্ষুধার্ত বাঘ আর একটি কচ্ছপের গল্প, যার শেষে বাঘ বোকা বনে যায়। লেখক আবু রেজা।
আছে, অন্তত পাঁচটি — বানর বউ, বানর জামাই, হরিণ-মাতা, সারস বালিকা ও চাঁদের ছেলে সোনাব্যাঙ। প্রথম দুটির শিরোনামেই মোটিফটি লেখা, আর দুটির পরিণতি আলাদা।
দুটি সরাসরি। রক্তপিয়াসি দেবতা-য় চৌদ্দ দেবতার পূজায় ছাগল বলির প্রথা কীভাবে শুরু হলো তা বলা আছে, আর অলস পুরোহিত-এ বুড়াচা পূজা কেন বাধ্যতামূলক এবং ‘ডেঙ্গা ওচাই’ কে, তা ব্যাখ্যা করা আছে।
আর্কাইভের একটি পাঠে বাংলা অর্থ সরাসরি দেওয়া আছে — “গ্রামের পুরোহিত”। আরেকটি পাঠে ‘অচাইগিরি’ শব্দের অর্থ দেওয়া আছে “পুরুগিরি”, আর তৃতীয়টিতে ‘ডেঙ্গা ওচাই’ ব্যাখ্যা করা হয়েছে — যে পূজার অনুষ্ঠান পরিচালনা করে।
হ্যাঁ, একটি — জেলে ও বোয়ালমাছ। একবার “ত্রিপুরা লোককাহিনী” নামে ২,০২৫ শব্দে, আরেকবার “ত্রিপুরা রূপকথা” নামে ১,৯৮৫ শব্দে। দুটোতেই লেখক শোভা ত্রিপুরা।
আছে। মিষ্টি বাশির সুর আর বুননা শূকর ও ইঁদুর আলাদা গল্প, কিন্তু দুটোই শেষ হয় একই জায়গায় — পাখির হাড়ের বাঁশি আর চিল-ইঁদুরের একসঙ্গে বসবাস। একইভাবে প্রতিশোধ পরায়ণ মুরগিছানা ও মুরগি ও চালের পিঠা একই মোটিফের দুই রূপ।
এগারোটি পাঠে — আর্কাইভের ৩১টি বাঘ-গল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। শূকর আরও বেশি, পনেরোটিতে। আর বেশিরভাগ গল্পে বাঘ হারে, আর হারায় তার চেয়ে ছোট কোনো প্রাণী — কচ্ছপ, কাঁকড়া বা সজারু।
সাতটি পাঠে শিল্পীর নাম আছে — সুরেশ চাকমা পাঁচটিতে, আর তনময় চাকমা, সাক্ষর চাকমা ও জওয়াং রাখাইন একটি করে। কৃতিত্বের শব্দ তিন রকম: “ছবি”, “চিত্রায়ন” আর “ছবিটি এঁকেছেন”।
না। একটি গল্পের শুরু মিজোরামের পাহাড়ে, আরেকটিতে ত্রিপুরা-লুসাই-কুকী তিন রাজ্যের সীমানা। নদীর নাম হিসেবে এসেছে গোমতী ও মনু, আর গ্রামের নাম হিসেবে দাবিং পাড়া, ঢাবিং পাড়া, রিয়াং পাড়া ও নয়নমণি।
৩৯টি পাঠের মাত্র সাতটিতে — জন্মান্তর, আংটি কথা বলে, বানর বউ, দুই বালিকা, রাজহাঁস, স্বর্গের ফুল খেরেঞ্জবার আর হরিণ-মাতা। বাকিগুলোর শেষ হয় কোনো ব্যাখ্যা, নীতিবাক্য কিংবা মৃত্যু দিয়ে।
আছে, একটিতে — পরি বিবি চিনিন (সাত বোন পরী)। সেখানে চৌদ্দ জায়গায় সংলাপ ত্রিপুরা ভাষায় লেখা আর প্রতিটির পাশে বন্ধনীতে বাংলা অনুবাদ দেওয়া। আর্কাইভের আর কোনো পাঠে পুরো বাক্য এভাবে দুই ভাষায় নেই।
এই পাতার সব তথ্য জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত ৩৯টি ত্রিপুরা পাঠের নিজের লেখা থেকে নেওয়া — শব্দসংখ্যা, লেবেল, লেখকের নাম, শিল্পীর নাম, উৎস-গ্রন্থের নাম ও পাঠে দেওয়া শব্দার্থসহ। প্রতিটি গল্পের লিংক উপরে তার নিজের অংশে আছে।
সব ব্যক্তির নাম, স্থানের নাম, জনগোষ্ঠীর নাম ও ত্রিপুরা ভাষার শব্দ আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে। গল্পের শিরোনাম থেকে কেবল লেবেল-উপসর্গ বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গল্পের বর্ণনা সেই গল্পের নিজের পাঠ থেকে; কোনো ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন যোগ করা হয়নি। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।
প্রসঙ্গ:ত্রিপুরা, ত্রিপুরা রূপকথা, ত্রিপুরা লোককাহিনী, রূপকথা, লোককাহিনী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।